অভ্যন্তরীণ প্রশাসন

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় অভ্যন্তরীণ প্রশাসন

অভ্যন্তরীণ প্রশাসন

 

অভ্যন্তরীণ প্রশাসন

অভ্যন্তরীণ প্রশাসন

মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির মুক্তির সংগ্রামকে সুসংগঠিতভাবে সফলতার দিকে এগিয়ে নেয়ার মূল দায়িত্বটিই পালন করে মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন। মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়, যথা:

ক. সামরিক প্রশাসন এবং

খ. বেসামরিক প্রশাসন

সামরিক প্রশাসন

অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সামরিক প্রশাসন। সামরিক প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হতো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও উপসচিবের দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে আব্দুস সামাদ এবং আকবর আলী খান । অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সশস্ত্র বাহিনী দপ্তর পরিচালন।

এ দপ্তরই ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান ও মূল অঙ্গ সংস্থা। সশস্ত্র বাহিনী দপ্তরের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন কর্ণেল ওসমানী। এ ছাড়া সেনাপ্রধান ছিলেন লে. কর্নেল আব্দুর রব, উপপ্রধান সেনাপতি ও বিমান বাহিনী প্রধান ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার, মেডিকেল সার্ভিসেস-এর মহাপরিচালক ছিলেন কর্নেল সামছুল হক । প্রতিরক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

১। বাংলাদেশের সমগ্র যুদ্ধাঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে অধিনায়ক নিযুক্ত করা এবং যুদ্ধ পরিচালনা তদারকি করা।

২। তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের সাথে ঘনিষ্ট সহযোগিতা রেখে কাজ করা।

৩। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে ঘনিষ্ট সহযোগিতা বজায় রেখে নিয়মিত বাহিনী ও গণবাহিনীর জন্য চিকিৎসা ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

৪। সশস্ত্র বাহিনী সদস্যদের সাহসিকতাস্বরূপ পুরস্কার প্রদান ইত্যাদি।

এছাড়া পরবর্তীতে তিনজন সেক্টর কমান্ডার-এর নেতৃত্বে এস. ফোর্স (কে. এম. সফিউল্লাহর নেতৃত্বে), জেড ফোর্স (জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে) এবং কে. ফোর্স (খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে) নামক তিনটি বিগ্রেড গঠন ও তা পরিচালনা করাও ছিল

বেসামরিক প্রশাসন

অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় ছিল বেসামরিক প্রশাসন। বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।

অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়:

মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট সমূহের অন্যতম হচ্ছে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে সরকার যে সকল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন তা হচ্ছে-

  • বাজেট প্রণয়ন ও আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ,
  • বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগৃহীত সম্পদের হিসাব প্রস্তুত,
  • বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গকে অর্থ প্রদানের দায়িত্ব পালন ও বিধিমালা প্রণয়ন,
  • আর্থিক শৃক্মখলা প্রবর্তন,
  • রাজস্ব ও শুল্ক আদায়,
  • আর্থিক অনিয়ম তদন্তের জন্য কমিটি গঠন।

উল্লেখ্য, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকারের) পূর্ণাঙ্গ বাজেট ছিল। আয়-ব্যয়ের হিসেব সংবলিত এই বাজেটে শুধু সরকারের নয়, বিভিন্ন দফতর, অঙ্গ প্রতিষ্ঠান, জোনাল অফিস, যুব ক্যাম্প, শরণার্থী, বেতার, প্রচারণা ইত্যাদির ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা ছিল।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়:

অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং তাঁর অধীনে অল্প সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়। এ সচিবালয়ের দায়িত্ব ছিল-

  • গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি মন্ত্রিপরিষদের নিকট/সভায় পেশ করা,
  • মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ,
  • বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ,
  • মন্ত্রিপরিষদের সাথে সম্পর্কিত নয় কিন্তু কোন মন্ত্রণালয়/বিভাগের আওতাধীনও নয় এমন অন্যান্য বিষয়াদি তদারকি এবং
  • আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সাধন ।

উল্লেখ্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের দায়িত্বও পালন করতেন।

সাধারণ প্রশাসন বিভাগ:

সাধারণ প্রশাসন বিভাগে একজন পূর্ণ সচিব নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করতেন। এই বিভাগটি সরকারের সংস্থাপন বিষয়ক কাজ যথা- প্রবেশন, নিয়োগ, বদলি, পোস্টিং, শৃক্মখলা রক্ষা, সরকারি নিয়োগের নীতিমালা বাস্তবায়ন, মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকারী সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর তালিকা সংরক্ষণ,

নিয়োগের জন্য প্যানেল তৈরী, আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিলের অধীন সকল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে লোক নিয়োগ ইত্যাদি কাজ ছিল সাধারণ প্রশাসনের দায়িত্ব। মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংস্থাপন মন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং) নিজে সরকারের অধীন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সকল পদে নিয়োগ দান করতেন।

এছাড়া আঞ্চলিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য বিভাগের (ডিপার্টমেন্টের) কর্মকর্তাদের অফিসসমূহের ব্যবস্থা করা, অফিসসমূহের বাজেট অনুমোদন ইত্যাদি ছিল সাধারণ প্রশাসনের আওতাভুক্ত।

আঞ্চলিক প্রশাসন:

আঞ্চলিক প্রশাসন সৃষ্টি মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। মূল পরিকল্পনার অধীনে ৫টি অঞ্চল (জোন) সৃষ্টি করা হলেও দেশব্যাপী সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জুলাই মাসে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করে সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে আঞ্চলিক চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হয়।

প্রতিটি অঞ্চলে একজন করে আঞ্চলিক প্রশাসকও নিয়োগ করা হয়। প্রশাসকগণ কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। শরণার্থী সমস্যা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সামরিক বেসামরিক বিষয়াবলির সুষ্ঠু সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণভার এই প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোর ওপর ন্যস্ত ছিল। আঞ্চলিক প্রাদেশিক পরিষদের প্রত্যক্ষ ভোটে আঞ্চলিক চেয়ারম্যান নির্বাচন চেয়ারম্যান তাঁদের অধীনস্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক সমন্বয়কারী হিসেবে সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

আঞ্চলিক প্রশাসনের দায়িত্বসমূহ ছিল নিম্নরূপ :
  • মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত সেক্টর কমান্ডারদের সংগে কাজের সমন্বয় সাধন ও পূর্ণ সহযোগিতা করা,
  • মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পগুলো পরিচালনা এবং সতর্কতার সংগে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট ও ট্রেনিং-এ পাঠানোর ব্যবস্থা করা,
  • শরণার্থীদের দেখাশোনা ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সংগে কাজের সমন্বয় সাধন করা,
  • তথ্য দপ্তর থেকে প্রকাশিত হাজার হাজার পুস্তিকা, প্রচারপত্র পোস্টার শরণার্থী ক্যাম্পগুলো ছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিতরণের ব্যবস্থা করা,
  • পাকবাহিনী কর্তৃক দখলকৃত অঞ্চল থেকে কোন সরকারি কর্মচারি এসে হাজির হলে তার নাম ও পরিচয় লিপিবদ্ধ করে যোগ্যতা অনুসারে কাজে লাগানো ও বেতনের ব্যবস্থা করা।

বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর শাসনভার গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত এই প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর ছিল। আঞ্চলিক (জোনাল) কাউন্সিল ও দপ্তরসমূহ থাকার ফলে দেশ পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল- যে কারণে ১৬ ডিসেম্বরের আগেই কোন কোন ক্ষেত্রে সেসব এলাকার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কর্মকর্তারা স্ব স্ব পদে যোগদান করে কালবিলম্ব না করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 

স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিভাগ:

প্রাথমিকভাবে একজন মহাপরিচালকের অধীনে গঠন করা হয় স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিভাগ। পরে মহাপরিচালককে সরকারের সচিবের মর্যাদা প্রদান করা হয়। এ বিভাগের কার্যাবলী দু’টি পৃথক ক্যাটেগরীতে ভাগ করা হয়েছিল, যথা-

  • সামরিক বাহিনীর স্বাস্থ্য চিকিৎসা এবং
  • বেসামরিক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও কল্যাণ।

সামরিক বাহিনীর স্বাস্থ্য চিকিৎসা: সামরিক বিভাগের চিকিৎসা সেবার জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা হয়-

  • সার্জন ও চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা,
  • আহত/মৃত ব্যক্তিদের বহনের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা,
  • ঔষধপত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ,
  • শল্য চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি সংগ্রহ,
  • মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসা দল গঠন,
  • যুদ্ধাহতদের আরোগ্যের পর বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা,
  • যুদ্ধে শহীদদের ওপর নির্ভরশীলদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা,
  • সম্পূর্ণরূপে অক্ষমদের জন্য পেনশন/ভরণপোষণের ব্যবস্থা এবং, আংশিক অক্ষমদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা।

উপরোক্ত কাজের জন্য প্রায় দশ লক্ষ রুপি অর্থ-সংস্থানের ব্যবস্থাও করা হয়।

বেসামরিক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও কল্যাণ:

বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের নাগরিকদিগকে চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং এই কাজের জন্য ৯,৫০,০০০.০০০ রুপি নির্দিষ্ট করা হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহ:

উদ্বাস্তু শিবিরের তত্ত্বাবধানের জন্য ভারত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত বাংলাদেশী চিকিৎসকদের বিভিন্ন কাজের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন বন্ধুসুলভ সংস্থা থেকে অনুদান হিসাবে ঔষধ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং রিকুইজিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সেক্টরে সেগুলি পাঠানোর দায়িত্বও ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। বিভিন্ন সেক্টরের জন্য সরঞ্জামাদি, এম্বুলেন্স ইত্যাদি বন্ধুদেশগুলো থেকে পাওয়া না গেলে সংগ্রহের দায়িত্বও স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর অর্পন করা হয়।

তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়:

মুজিবনগর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ইউনিট ছিল তথ্য ও প্রচার বিভাগ। স্বাধীন বাংলা বেতার সরকারের অধীন সর্বপ্রথম সংস্থাসমূহের অন্যতম। প্রাথমিক অবস্থায় টাঙ্গাইলের আওয়ামী দলীয় এম.এন.এ. আবদুল মান্নানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে রেডিও স্থাপন করা হয়। স্বাধীন বাংলা বেতারে ১০০-এর অধিক লোক নিয়োগ করা হয়েছিল।

বেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রচার মাধ্যম বিধায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেবল যুদ্ধ পরিচালনার পরেই এর স্থান। সরকার সব সময় এর জন্য বিশেষ আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধের খবর এবং পাকবাহিনীর হত্যা ও অত্যাচারের কাহিনী প্রচার করার পাশাপাশি পাকবাহিনীকে ধিক্কার ও বিদ্রুপ করে এম. আর. আখতার মুকুল রচিত ও পঠিত চরমপত্র প্রচার করত যা অবরুদ্ধ দেশবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দারুণভাবে উৎসাহিত করত।

বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে যে বাড়িতে কলকাতায় আসার পর তাজউদ্দিন আহমদ প্রথম উঠেছিলেন তারই একটি কক্ষে চাদর-কাপড় ঝুলিয়ে সাউন্ডপ্রুফ রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা করা হয়। রেকর্ডিং-এর জন্য সম্বল ছিল দু’টো ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডার। ভারত সরকারের কাছ থেকে পঞ্চাশ কিলোওয়াটের একটি ট্রান্সমিটার যন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। সকল দিকে প্রচার জোরদার করার উদ্দেশে মিত্র সরকারসমূহের অধীনড় তথ্য সংস্থা প্রধানদের সাথে পর্যায়ক্রমিক সভা অনুষ্ঠিত হতো ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ১ম দিনের অনুষ্ঠান:

২৫ মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানসূচিতে ছিল কোরান তেলাওয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ অনুষ্ঠান অগ্নিশিখা, সাহিত্যের অনুষ্ঠান রক্তস্বাক্ষর, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ভিত্তিক অনুষ্ঠান বজ্রকণ্ঠ, বাংলা ও ইংরেজি সংবাদ এবং চরমপত্র। কামাল লোহানী সংবাদ সংগঠনের দায়িত্ব নেন।

কোরান তেলাওয়াত করেন জয়বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী। হাসান ইমাম সালেহ আহমদ ছদ্মনাম নিয়ে বাংলা খবর পড়েন। ইংরেজি খবর পড়েন পারভিন হোসেন। মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা টি. হোসেনের স্ত্রী মিসেস টি. হোসেন পারভিন ছদ্মনাম নিয়ে ইংরেজি খবর পড়েন। বাংলা সংবাদের ইংরেজি অনুবাদের পান্ডুলিপি তৈরী করেন এম. কামাল উদ্দিন আহমেদ ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়:

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একজন পূর্ণ সচিব নিযুক্ত ছিলেন। তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার নিকট সেগুলো প্রেরণ করা ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রধান কাজ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ৪টি রেঞ্জের জন্য ৪ জন ডিআইজি এবং প্রতি জেলার জন্য একজন এসপি নিয়োগ করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিলসমূহের দায়িত্ব পালন করতেন। এ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কাজগুলো ছিল নিম্নরূপ :

  • অবমুক্ত এলাকার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন,
  • ভ্রমণ ডকুমেন্ট ইস্যু করা,
  • তদন্ত পরিচালনা ইত্যাদি।

সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়:

পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এটি দেখাশুনা করতেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি সমস্যাদি সমাধানের দায়িত্ব পালন করত এই বিভাগ।

কৃষি বিভাগ:

এ বিভাগটি পুরোপুরি সংগঠিত ছিল না। কেবল একজন সচিব নিয়োগ করা হয়েছিল- যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের নক্সা ও পরিকল্পনা তৈরী করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

প্রকৌশল বিভাগ:

এ বিভাগে একজন প্রধান প্রকৌশলীর অধীনে জোনাল ইঞ্জিনিয়ারগণ সেক্টর কমান্ডারদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। মুক্ত এলাকার প্রকৌশল বিষয়ক সমস্যাদি সমাধানেও তারা দায়িত্ব পালন করতেন।

উপদেষ্টা পরিষদ গঠন:

মুজিবনগর সরকারের একটি বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল দল-মত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সমর্থনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা। এজন্য ন্যাপের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মণি সিং, ন্যাপ (মোজাফফর)-এর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ও কংগ্রেসের শ্রী মনোরঞ্জন ধরের সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়।

সারসংক্ষেপ

মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল দায়িত্বটি পালন করে মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন। অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ছিল সামরিক ও বেসামরিক- এ দু’ভাগে বিভক্ত। সামরিক প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হতো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে- যার দায়িত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বয়ং।

বাংলাদেশের সমগ্র যুদ্ধাঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে অধিনায়ক নিযুক্ত করা ও যুদ্ধ পরিচালনা তদারকি করা ছিল এ মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ। বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাধারণ প্রশাসন এবং তথ্য ও বেতার বিভাগ। সাধারণ প্রশাসন বিভাগটি নিয়োগ, বদলি, পোস্টিং, শৃঙ্খখলা রক্ষা ইত্যাদি দায়িত্ব অর্থাৎ সরকারের সংস্থাপন বিষয়ক যাবতীয় দায়িত্ব পালন করত।

আঞ্চলিক প্রশাসনও ছিল বেসরকারি প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আঞ্চলিক প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন একজন চেয়ারম্যান ও একজন প্রশাসক। শরণার্থী সমস্যা, আঞ্চলিক সামরিক-বেসামরিক বিষয়াবলীর সুষ্ঠু সমন্বয় ইত্যাদি ছিল আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান কাজ। এছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

এ বেতার কেন্দ্রে প্রায় ১০০ লোক নিয়োগ করা হয়েছিল। বিভিন্ন রণাঙ্গনের যুদ্ধের খবর, পাকবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের খবর এবং পাকবাহিনীকে ধিক্কার দিয়ে ও বিদ্রুপ করে রচিত চরমপত্র এই বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রচার করা হতো। এ বেতার কেন্দ্রটি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করত।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। প্রফেসর সালাহউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৭১ ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭, ।

২। এ.এস.এম. সামছুল আরেফিন সম্পাদিত, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি অবস্থান, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৫।

৩। মঈদুল হাসান, মুলধারা ‘৭১ ।

৪। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, ৩য় ও ৮ম খন্ড, ঢাকা, ত মন্ত্রণালয়, ১৯৮২।

 

অভ্যন্তরীণ প্রশাসন

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। মুজিবনগর সরকারের সাধারণ প্রশাসন বিভাগের কার্যাবলী আলোচনা করুন।

২। মুজিবনগর সরকারের আঞ্চলিক প্রশাসনের সদর দপ্তরসমূহের নাম লিখুন ।

৩। আঞ্চলিক প্রশাসনের দায়িত্বসমূহ আলোচনা করুন।

৪ । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানসমূহের বিবরণ দিন।

৫। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যগণের নাম লিখুন।

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। মুজিবনগর সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের বিবরণ দিন।

২। মুজিবনগর সরকারের আঞ্চলিক প্রশাসনের বিবরণ দিন।

৩। পরিকল্পনা কমিশনের গঠন ও কার্যাবলী আলোচনা করুন।

Leave a Comment