আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক আদর্শ

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –অর্থনৈতিক আদর্শ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

অর্থনৈতিক আদর্শ

 

অর্থনৈতিক আদর্শ

 

আওয়ামী লীগের আদর্শ স্বাধীন, শোষণহীন ও শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম করা। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমানে শোষণ, বৈষম্য, অবিচার ও দুর্দশার হাত হইতে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব বলিয়া আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

শিল্প :

যুগ যুগ ধরিয়া নির্মম শোষণের ফলে পাকিস্তান সামগ্রিকভাবে অনুন্নত অবস্থায় রহিয়া গিয়াছে। দেশের মানোন্নয়নের জন্য ইহার প্রাকৃতিক ও কৃষিজ সম্পদের ব্যবহার দ্বারা সুসমভাবে দেশকে শিল্পায়িত করা আওয়ামী লীগের আশু লক্ষ্য। শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রে কোন প্রকারের একচেটিয়া অধিকার স্বীকার করা হইবে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের মূলধন সরবরাহ ও অন্য সকল ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করা হইবে।

ভৌগলিক অবস্থা, ভূমির পরিমাণ ও জনসংখ্যা এবং প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানকে অধিকতর শিল্পায়িত করার ব্যাপক পরিকল্পনা অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে।মূল, ভারী ও বৃহৎ শিল্প, যথা- নিজ শিল্প, ইস্পাত শিল্প, সমর শিল্প, বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক শিল্প, জাতীয়করণ করিতে হইবে এবং ইহাদের পরিচালনার ভার রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গঠিত ও পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর ন্যস্ত করিতে হইবে। ব্যাঙ্ক, বীমা, গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন ও যোগাযোগ প্রভৃতি প্রত্যক্ষ জনস্বার্থমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহও জাতীয়করণ করা

হইবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য রাষ্ট্রীয়ত্বাধীনে পরিচালিত হইবে। পাকিস্তান, বিশেষভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মত জনবহুল কৃষিপ্রধান দেশে কুটির শিল্প প্রসারের প্রয়োজনীয়তা, উপযোগিতা ও সাফল্য অনস্বীকাৰ্য্য। সহজ অর্থনীতির খাতিরে কুটির শিল্পকে সর্বপ্রকার সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করিতে হইবে। দেশের সকল অঞ্চলে উহার বহুল প্রসারের ব্যবস্থা করিতে হইবে। বর্তমানে চলতি ও ক্ষীয়মান কুটির শিল্পগুলিকে টিকাইয়া রাখার জন্য সর্ব প্রকার সাহায্য প্রদান ও ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে এবং নূতন ও প্রয়োজনীয় কুটির শিল্পের প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।

কৃষি:

কৃষি উন্নয়নের জন্য যে সকল স্বভাবজাত, উপাদানের প্রয়োজন পাকিস্তান, বিশেষভাবে পূর্ব পাকিস্তান সেই সকল উপাদানে সমৃদ্ধ। কিন্তু স্বভাবজাত প্রাচুর্য্যের মধ্যেও এই দেশের কৃষক সমাজ কঠিন দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে জর্জরিত ও মুমূর্ষু। এই বেদনাদায়ক অবস্থার প্রতিকারের জন্য কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত ও সভ্য পর্যায়ে আনয়নের উদ্দেশ্যে এক ব্যাপক ও বহুমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অগৌণে কার্য্যকরী করিতে হইবে।

পূর্ব পাকিস্তানের ভূমি প্রাকৃতিক সম্পদে ঐশ্বর্যবান। এই ভূমি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সমবায় পদ্ধতিতে দেশে যৌথ চাষাবাদের প্রচলন করিতে হইবে। পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি কৃষকের জমির পরিমাণ এত অল্প এবং তাহাও এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিক্ষিপ্ত যে সমবায় পদ্ধতিতে চাষাবাদ ব্যতীত এখানে কৃষির উন্নয়নের কোন উপায় নাই। অতি সত্বর দেশের সর্বত্র যৌথ খামার সৃষ্টি করিতে হইবে।

কৃষি ব্যাঙ্কের, সমবায় ব্যাঙ্কের এবং অন্যান্য কৃষি ঋণের টাকা কৃষকদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে বিতরণ না করিয়া সমবায় পদ্ধতিতে পরিচালিত কৃষির জন্য উহা ব্যয় করা উচিত। ইহার ফলে কৃষকদের প্রধান সমস্যা মূলধন সমস্যার সমাধান অনেকাংশে সম্ভব হইবে।সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি ব্যবস্থার ফলে আধুনিক চাষ ও জলসেচের যন্ত্রপাতি ক্রয়, উন্নত বীজ সংগ্রহ এবং উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা সহজ হইবে।

আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সর্ব প্রকার যন্ত্রপাতি পূর্ব পাকিস্তানে প্রস্তুত করিবার জন্য কারখানা স্থাপন করিতে হইবে। উন্নত ধরনের বীজ সরবরাহের, জমিতে সার প্রদানের ও সেচ ব্যবস্থার এবং গবাদি পশুর উন্নতির সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। বিভিন্ন প্রকারের পোকা-মাকড় ও রোগের ফলে শস্যাদির ব্যাপক ক্ষতির উপযুক্ত প্রতিরোধক ব্যবস্থা কার্যকরী করিয়া তুলিতে হইবে।সরকার কর্তৃক পর্যাপ্ত সংখ্যক আদর্শ খামার প্রচলিত করিয়া কৃষকদিগকে কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষি উন্নয়নের আধুনিক পন্থা প্রদর্শন করিতে হইবে।

পাট :

পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করিতে হইবে। সরকারী তত্ত্বাবধানে গঠিত ও পরিচালিত একটি পাট-ক্রয় ও পাট- রফতানীকারী প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত সংখ্যক শাখার মাধ্যমে কৃষকদের পাট সরাসরিভাবে ক্রয়ের ব্যবস্থা করিতে হইবে। এই প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকিবে না। তবে পাট বিক্রয় ও রফতানীর মাধ্যমে যে মুনাফা অর্জিত হইবে উহা পাটচাষীদের কল্যাণে এবং পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনের গবেষণায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করিতে হইবে।

পার্ট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা এত দিন আংশিকভাবে করা হইয়াছিল তাহা ব্যর্থ হইয়াছে। পাট ব্যবসা জাতীয়করণের জন্য একটি সুষ্ঠু ও সামগ্রিক পরিকল্পনা আবশ্যক। উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় মূলধন থাকিতে হইবে যাহাতে উহা দেশের সমস্ত পাট ক্রয় করিতে সক্ষম হয়।

 

বন্যা :

সাম্প্রতিককালে পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা একটি জাতীয় বিপর্যয় ও সঙ্কটরূপে দেখা দিয়াছে। পূর্ব পাকিস্তানে বর্ষার শুরুতে উত্তরের নদীপথে বন্যা আসিয়া এক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে। অপর দিকে দক্ষিণের সমুদ্র হইতে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানি সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলাসমূহের ধন-প্রাণ ও শস্যের বিপুল ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ করিবার জন্য ক্রুগ মিশনের রিপোর্ট ও পরবর্তীকালীন উপদেষ্টাদের মতামতের আলোকে একটি সুষ্ঠু ও কার্য্যকরী পরিকল্পনা রচনায় সত্বর হাত দিতে হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা সমস্যাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যারূপে গ্রহণ করিয়া জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইহার সমাধান করিতে হইবে।

খাজানা ও ভূমি ব্যবস্থা:

কৃষি ও কৃষকের মানোন্নয়নের জন্য ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার আশু প্রয়োজন। পূর্ব পাকিস্তানে সামস্ত ভূ-স্বামীদের উচ্ছেদ সাধন করা হইলেও সামন্তবাদী অবস্থা এখনও বর্তমান রহিয়াছে। সদা বর্ধিষ্ণু উচ্চহারের খাজানা, গুরুভার বিবিধ কর ও আদায়কারী আমলাদের হৃদয়হীন জুলুমবাজী ও অবৈধ উত্তল কৃষককূলকে প্রিয়মাণ করিয়া রহিয়াছে।

এই অভিশাপের নাগপাশ হইতে ক্লেশজর্জরিত কৃষককূলকে মুক্ত করিবার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ২৫ (পঁচিশ) বিঘা পর্যন্ত জমির মালিক প্রত্যেক কৃষকের জমির খাজানা মওকুফ করিয়া দিতে হইবে। পরবর্তী পর্যায়ে প্রকৃত কৃষকের স্বার্থে নূতন ভূমি ব্যবস্থা কায়েম করিয়া সকল কৃষকের জমির খাজানা মওকুফ করিয়া দিতে হইবে।

শ্রমিকের অধিকার :

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার গৃহীত সুপারিশ ও কনভেনশনের ভিত্তিতে শ্রমিকদের সকল প্রকার অধিকার ও সুযোগ- সুবিধামূলক আইন প্রণয়ন করিয়া প্রত্যেক শ্রমিকের সুষ্ঠু, উন্নত ও সুন্দর জীবনযাপনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। জীবন যাত্রার মান ও ব্যয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া প্রত্যেক শ্রমিকের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করিতে হইবে। তাহাদের চাকুরীর নিরাপত্তা প্রদান করিতে হইবে।

শ্রমিকদের ও শ্রমিক পরিবারের জন্য বিনা ভাড়ায় বাসযোগ্য গৃহের বন্দোবস্ত করিতে হইবে। বিনা ব্যয়ে তাহাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে হইবে। পীড়িত থাকাকালীন শ্রমিকদের পূর্ণ বেতনে ছুটির ব্যবস্থা থাকিবে। পূর্ণ বেতনে বৎসরে অন্ততঃ একমাস প্রত্যেক শ্রমিকের ছুটির ব্যবস্থা করিতে হইবে। শ্রমিকদের উন্নত ধরনের কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে। তাহাদের ছেলেমেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা- অন্ততঃ মাধমিক স্তর পর্যন্ত করিতে হইবে।

শিল্পের মুনাফার একটি নির্দ্দিষ্ট অংশ শ্রমিকদের শেয়ার হিসাবে সংরক্ষিত রাখিয়া শ্রমিকদিগকে শিল্পের অংশীদার হওয়ার সুযোগ প্রদান করিতে হইবে।শ্রমিক সংঘ গঠন ও ধর্মঘট করিবার অধিকার স্বীকার করিতে হইবে। কলকারখানা পরিচালনার ব্যাপারে শ্রমিকদের মতামত গ্রহণ করার ব্যবস্থা থাকিতে হইবে।বেকার শ্রমিকদিগকে ভাতা দিতে হইবে এবং সকল শ্রমিকের বার্ধক্যের জন্য উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। বেসরকারী ও আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মচারীদিগকে উপযুক্ত বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করিতে হইবে।

 

অর্থনৈতিক আদর্শ

 

বেকার সমস্যা:

ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সুষ্ঠু ও ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। সাকুল্য জনশক্তিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের সার্বিক উন্নয়নে নিয়োগ করতঃ জনশক্তির অপচয় রোধ করিতে হইবে এবং জাতীয় অর্থনীতির উপর হইতে বেকারত্বের অবাঞ্ছিত চাপ অপসারণ করিয়া উহাকে স্বাভাবিক ও গতিশীল রাখিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে।

Leave a Comment