আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের কারণ ও ফলাফল – যা বৈদেশিক আক্রমণ এর অন্তর্ভুক্ত।
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের কারণ ও ফলাফল

আলেকজান্ডার ছিলেন ম্যাসিডনের রাজা ফিলিপের পুত্র। বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ছিলেন তাঁর গৃহশিক্ষক। কিন্তু অ্যারিস্টটলের দর্শন শিক্ষার চেয়ে হারকিউলিস বা সাইরাসের মত মহাবীরদের অভিযানের কাহিনী জানতে তিনি ছিলেন বেশি আগ্রহী। ৩৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ফিলিপের মৃত্যু হলে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি সিংহাসনে বসেন।
সিংহাসনে বসে তিনি বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি ভারতবর্ষও আক্রমণ করেন। তাঁর ভারত অভিযানের কাহিনী অবশ্য ভারতীয় কোন সাহিত্যিক উৎস থেকে পাওয়া যায় না। আমরা প্রধানত গ্রিক লেখকদের বিবরণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস থেকে তাঁর আক্রমণের বিবরণ পাই ।
ভারত আক্রমণের কারণ
আলেকজান্ডারের আক্রমণের প্রাক্কালে উত্তর পশ্চিম ভারত অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে কোনটি ছিল রাজতান্ত্রিক, আবার কোনটি ছিল প্রজাতান্ত্রিক। গ্রিক লেখকদের বিবরণে এ রাজ্যগুলোর পরিচয় পাওয়া যায়। এ রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল-
পূর্ব গান্ধার অর্থাৎ সিন্ধু নদের পূর্বতীরে অবস্থিত তক্ষশীলা রাজ্য। এই রাজ্যের রাজধানীর নামও ছিল তক্ষশীলা। হিন্দুশাস্ত্রে জ্ঞানলাভের কেন্দ্র হিসাবেও তক্ষশীলার খ্যাতি ছিল। রাজপুত্র ও ধনী ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তানদের ষোল বছর বয়সে তাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ করার জন্য তক্ষশীলায় পাঠানো একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিল। একটি বিদ্যাশিক্ষার শহর হিসাবে তখন তক্ষশীলার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় তক্ষশীলার রাজা ছিলেন অস্তি।
ঝিলাম ও চেনাব নদীর মধ্যবর্তী স্থানে ছিল রাজা পুরুর রাজ্য। তাঁর বিশাল সৈন্যবাহিনীতে ৫০ হাজার পদাতিক, ৩ হাজার অশ্বারোহী, ১০০ রথ এবং ১৩০টি হাতি ছিল। এ রাজ্যটি ছিল উর্বর। তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা গ্রিক লেখকদের প্রশংসা লাভ করেছে। কাশ্মিরের পুঞ্চ ও নওশেরা জেলা নিয়ে গঠিত ছিল অভিসারের রাজ্য। তিনি ছিলেন পুরুর বন্ধু এবং তাঁরা দুজন আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে যৌথভাবে বাধা প্রদান করেছিলেন ।
সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল পুষ্কলাবতী রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা ছিলেন অষ্টক। আলেকজান্ডারকে বাধা দিতে গিয়ে তিনি যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এ ছাড়া রাভি নদীর পূর্ব তীরে অনেকগুলো প্রজাতান্ত্রিক রাজ্য ছিল। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত ছিল ক্ষুদ্রক, মল্লক, ক্ষত্রি প্রভৃতি। উত্তর পশ্চিম ভারতের এসব রাজ্যের রাজা ও শাসকদের মধ্যে কোন ঐক্য বা সম্ভাব ছিলনা। তাঁরা প্রায়ই একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতেন। এ অবস্থা আলেকজান্ডারের জয়কে সহজ করেছিল।
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের প্রথম ও প্রধান কারণ ছিল তাঁর উচ্চাশা। সমস্ত বিশ্বজুড়ে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। উত্তর-পশ্চিম ভারত তখন ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। ফলে পারস্যের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযানের অংশ হিসেবেই আলেকজান্ডার সে অঞ্চল আক্রমণ করেছিলেন। পারস্য এক সময় গ্রিস আক্রমণ করেছিল।
এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিনি পারস্য আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারায়ুসকে লেখা চিঠিতে আলেকজান্ডার তাঁর এই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছিলেন।দারায়ুস দূত পাঠিয়ে আলেকজান্ডারকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শেষে ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দারায়ুসকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে তিনি ভারতের দিকে অগ্রসর হন। তাছাড়া পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধের সময় কিছু কিছু ভারতীয় রাজা আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে সৈন্য দিয়ে পারস্য সম্রাটকে সাহায্য করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন রাজা পুরু। এ সব রাজাকে শাস্তিদানও আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল।
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় উত্তর-পশ্চিম ভারত বহু ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত থাকায় এবং সেগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য বা সদ্ভাব না থাকায় আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পুষ্কলাবতীর শাসক ছিলেন অষ্টক এবং পুরু ছিলেন ঝিলাম ও চেনাব নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের রাজা। তক্ষশীলার রাজা অস্তি পুরুর শক্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে অষ্টকের এক শত্রু সঞ্জয়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে পুরুর বিরুদ্ধে আলেকজান্ডারের সাহায্য প্রার্থনা করেন। দেশীয় রাজাদের মধ্যে অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে আলেকজান্ডার পারস্য সম্রাজ্যের ভারতীয় অঞ্চল দখল করার জন্য অগ্রসর হন।
অ্যারিস্টটলের শিষ্য আলেকজান্ডার মনে করতেন যে পৃথিবীতে গ্রিক সভ্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই তিনি বিশ্বব্যাপী গ্রিক সভ্যতা বিস্তারের উদ্দেশ্যেও ভারত আক্রমণ করেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। উল্লেখ্য যে আলেকজান্ডার শুধু এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়েই ভারত অভিযান করেন নি। তাঁর সঙ্গে বহু লেখক, পন্ডিত, ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং শিল্পীও এসেছিলেন।
তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পরবর্তীকালে ভারত বিষয়ক বিবরণ লিখেছিলেন।
হেরোডোটাস ও অন্যান্য গ্রিক লেখকেরা ভারতবর্ষকে প্রভূত সম্পদশালী দেশ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। ভারতের ঐশ্বর্যও আলেকজান্ডারকে ভারত আক্রমণে প্রলুব্ধ করেছিল বলে ধারণা করা হয়। গ্রিসের আর্থিক অবস্থা তখন তেমন সচ্ছল ছিল না। আলেকজান্ডার ভারতের ধনরত্ন দিয়ে গ্রিসের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে চেয়েছিলেন। অধ্যাপক বিউরির মতে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধি করাও আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের অন্যতম কারণ ছিল।
অ্যারিয়ান, কার্টিয়াস, ডায়াডোরাস, প্লুটার্ক, জাস্টিন প্রভৃতি লেখকদের রচনায় আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতবর্ষে প্রবেশের আগেই আলেকজান্ডার নিকাইয়া নামক স্থান থেকে তক্ষশীলার রাজা অম্ভির কাছে বিনাযুদ্ধে বশ্যতা স্বীকার করার জন্য দূত পাঠান।দূত তক্ষশীলা পৌঁছার আগেই অম্ভি নিজ রাজ্যের নিরাপত্তার শর্তে আলেকজান্ডারকে তাঁর বশ্যতা স্বীকার ও সাহায্য দানের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন।
কার্টিয়াসের বিবরণ অনুসারে অস্তি আলেকজান্ডারকে ৬৫টি হাতি এবং ৩০০০ ষাঁড় উপহার দিয়েছিলেন। অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার অম্ভির এ বশ্যতা স্বীকারকে ভারতের ইতিহাসে কোনো রাজার পক্ষে বিশ্বাসঘাতকতার প্রথম দৃষ্টান্ত হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।পুরুর প্রতি শত্রুতার কারণেই অম্ভি এ কাজ করেছিলেন।
এরপর কয়েকটি ছোট রাজ্যের রাজা এবং প্রজাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর জনসাধারণ আলেকজান্ডারকে বাধাদানের চেষ্টা করে। পুষ্কলাবতীর রাজা দীর্ঘ ত্রিশ দিন আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রাণদান করেন। অশ্বায়ন ও অশ্বকায়ন জাতিও আলেকজান্ডারকে প্রতিহত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ভারতবর্ষে আলেকজান্ডারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হয়েছিল পুরুর সঙ্গে। পুরু ছিলেন বীর যোদ্ধা এবং তাঁর দেশাত্মবোধ ছিল প্রখর। ভারতীয় অন্য রাজারা আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করে নিলেও তিনি তা করেননি। আলেকজান্ডার তাঁর কাছেও বশ্যতা স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে দূত পাঠিয়ে ছিলেন।
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দের মে মাসে আলেকজান্ডারের সাথে পুরুর যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধ ঝিলামের যুদ্ধ নামে খ্যাত। প্রথমে যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুর পুত্র নিহত হলে পুরু নিজে ত্রিশ হাজার পদাতিক, চার হাজার অশ্বারোহী, তিন শত রথ এবং দুইশত হাতি নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে পুরু যুদ্ধে আহত ও পরাজিত হন।
পুরুর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার পুরুকে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন। সে সঙ্গে তাঁকে কয়েকটি প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যও দেওয়া হয়। পুরুর প্রতি আলেকজান্ডারের এ ধরনের আচরণের বোধ হয় একটা কূটনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। তিনি স্থানীয় রাজাদের সহযোগিতার মূল্য উপলব্ধি করেছিলেন। নিজ সম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে ভারত ছিল বহু দূরে। স্থানীয় রাজাদের সহযোগিতা ছাড়া এত দূরে সদ্য বিজিত অঞ্চল নিজ অধিকারে রাখা অসম্ভব হবে এ বিবেচনায় তিনি তাদের বন্ধুত্বলাভের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এ আশা করেছিলেন যে দূরবর্তী এ অঞ্চলে এরা তাঁর অধিকার টিকিয়ে রাখবে এবং প্রয়োজনে বিপরীতে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করবে। পুরুর স্বদেশ প্রেম তাঁকে ভারতের ইতিহাসে অমরত্ব দান করেছে।
পুরুর বিরুদ্ধে জয়লাভের পর আলেকজান্ডার আরও কয়েকজন রাজা ও প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যের শাসককে পরাজিত করেছিলেন। তিনি বিপাশা নদীর তীর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন এবং আরও পূর্বদিকে ভারতের অভ্যন্তরে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর রণক্লান্ত সৈন্যবাহিনী আর অগ্রসর হতে রাজি না হওয়ায় বাধ্য হয়েই তাঁকে দেশে ফেরার যাত্রা শুরু করতে হয়।
তিনি তাঁর সৈন্যদলকে দুদলে ভাগ করে একদলকে নৌ-সেনাপতি নিয়ারকসের নেতৃত্বে জলপথে দেশে পাঠান।অন্যদল আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে স্বদেশ যাত্রা করেন। পথে ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনে তাঁর মৃত্যু ঘটে। বিজয়ী ম্যাসিডনীয় সৈন্যবাহিনীর ভারতের অভ্যন্তরে আরও অগ্রসর না হয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ ছিল।
দেশ থেকে বহু দূরে বহু দিন ধরে অবস্থান করার ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজ দেশে আত্মীয়- আপনজনদের কাছে ফিরে যেতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছিল। ক্রমাগত যুদ্ধ করে করে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কাজেই তারা আর যুদ্ধের জন্য এদেশে থাকতে চায়নি।
সম্ভবত পুরুর বীরত্বে তারা যুদ্ধেও ভীত হয়ে পড়েছিল। ছোট এক রাজ্যের রাজার শক্তিতে ভীত হয়ে তারা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিশাল মঘধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হতে রাজি হয়নি। গাঙ্গেয় উপত্যকায় তখন নন্দবংশীয় রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর সৈন্যবাহিনীতে ছিল ৮০ হাজার অশ্বরোহী, ২ লক্ষ পদাতিক, ৮ হাজার যুদ্ধরথ এবং ৬ হাজার যুদ্ধ- হস্তি। এছাড়া এ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কেও গ্রিকদের কোন ধারণা ছিলনা। কাজেই রণক্লান্ত গ্রিক সৈন্যবাহিনী অপরিচিত পরিবেশে বিশাল নন্দবাহিনীর সম্মুখীন হতে রাজি হয়নি।
প্লুটার্ক বলেছেন, যে পুরুর বীরত্ব গ্রিক সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিল এবং তারা আর অগ্রসর হতে উৎসাহ বোধ করেনি। আলেকজান্ডার ছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রপরিচালক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য আরও বিস্তার লাভ করলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে এবং তাঁর মধ্য এশীয় সাম্রাজ্যে বিশৃক্মখলা দেখা দিতে পারে। কাজেই সম্ভবত প্রশাসনিক বাস্তব চিন্তা তাঁকে আর অগ্রসর হতে দেয়নি।
ভিনসেন্ট স্মিথ বলেছেন যে, ইউরোপীয় রণনীতি, দক্ষতা ও শৃক্মখলার বিপক্ষে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর অন্তঃস্থায়ী দুর্বলতাই ভারতীয়দের পরাজয়ের কারণ। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, আলেকজান্ডার যুদ্ধ করেছিলেন ছোট ছোট রাজ্যের রাজা ও প্রজাতান্ত্রিক উপজাতিগুলোর বিরুদ্ধে। এ থেকে ইউরোপীয়দের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না। তদানীন্তন ভারতের শ্রেষ্ঠশক্তি নন্দরাজার সঙ্গে আলেকজান্ডারের কোন যুদ্ধ হয়নি।প্লুটার্ক নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আলেকজান্ডারের সৈন্যদল নন্দরাজার বাহিনীর সম্মুখীন হতে ভয় পেয়েছিল।উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজারা মিলিতভাবে বাধা দিলে আলেকজান্ডার ব্যর্থও হতে পারতেন।
ভারতীয়দের পরাজয়ের কারণ
ভারতীয়দের পরাজয়ের জন্য নিম্নলিখিত কারণগুলো দায়ী ছিলঃ
আলেকজান্ডারের সৈন্যরা উন্নততর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। তাদের যুদ্ধ-কৌশলও ছিল ভারতীয়দের চেয়ে উন্নততর। ভারতীয়রা চামড়ার বর্ম দিয়ে বুক ও মাথা ঢেকে যুদ্ধ করতো। তাদের ঢালও ছিল চামড়ার তৈরি। তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল তলোয়ার এবং তীর। মাটিতে ধনুক রেখে এ তীর ছুঁড়তে হতো। অন্যদিকে গ্রিক সৈন্যরা ব্রোঞ্জের বর্ম দিয়ে মাথা ও বুক ঢেকে লম্বা বল্লম দিয়ে যুদ্ধ করতো যা ভারতীয়দের শিরস্ত্রাণ ভেদ করে তাদের আঘাত হানতে পারতো।
গ্রিকরা ছিল অশ্বারোহী যোদ্ধা। অন্যদিকে ভারতীয়দের হাতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা ছিল কঠিন। নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ভারতীয় হস্তিবাহিনী গ্রিক পদাতিক বাহিনীকে বিদীর্ণ করতে পারতো, কিন্তু হস্তিবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে ভারতীয় হস্তিবাহিনী নিজেদের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাও আলেকজান্ডারের সাফল্যের সহায়ক হয়েছিল। যুদ্ধের সময় বৃষ্টি হওয়ায় কর্দমাক্ত মাঠে পুরুর সৈন্যরা মাটিতে ধনুকের মাথা রেখে গুণ দিয়ে লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি।
আলেকজান্ডারের দক্ষ সমর পরিচালনা তাঁর সাফল্যের একটি কারণ। তিনি তাঁর বাহিনীর পিছনের দিক সব সময় সুরক্ষিত রাখতেন যাতে শত্রুরা পিছন থেকে আক্রমণ করতে না পারে। অধিকৃত এলাকায় তিনি দুর্গ নির্মাণ করে সেখান থেকে অগ্রসরমান সৈন্যবাহিনীর খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতেন।
ভারতীয় রাজাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আলেকজান্ডারের বিজয়কে সহজ করেছিল। পুষ্কলাবতীর রাজা অষ্টকের সঙ্গে শত্রুতা ছিল বলে তক্ষশীলার রাজা অস্তি আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করেন। তিনি আলেকজান্ডারকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন এবং গ্রিকদের ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ দেখিয়ে দেন। অন্য একজন রাজা শশীগুপ্তও আলেকজান্ডারকে সাহায্য করেছিলেন। এমনকি পুরুও তাঁর পরাজয়ের পর সৈন্য ও পরামর্শ দিয়ে আলেকজান্ডারকে সাহায্য করেছিল।
ভারত আক্রমণের ফলাফল
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের ফলাফল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ভারতীয় ইতিহাস বা রাজনীতির ওপর এর তেমন কোন প্রভাব দেখা যায় না। প্রাচীন ভারতীয় কোনো উৎসেও এ অভিযানের উল্লেখ দেখা যায় না। আলেকজান্ডারের অভিযানের মাধ্যমেই প্রথম প্রাচীন ইউরোপের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের পরিচয় ঘটে। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ-
বহু লেখক ও ঐতিহাসিক আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। তাঁরা ভারত সম্পর্কে বিবরণ লিখেছেন এবং আলেকজান্ডারের বিভিন্ন অভিযানের তারিখ উল্লেখ করেছেন। ফলে পরবর্তীকালের ইতিহাসের কালক্রম আমাদের পক্ষে নিশ্চিতভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এ কারণেই আলেকজান্ডারের আক্রমণ ভারতের ইতিহাসের প্রধান নোঙর হিসেবে বিবেচিত। গ্রিক লেখকদের বিবরণ থেতে তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন রীতি-নীতি আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানা যায়। আলেকজান্ডারের সঙ্গী অ্যারিস্টোবোলাসকে অনুকরণ করে স্ট্র্যাবো লিখেছেন যে, দরিদ্র পিতা-মাতা মেয়ের বিয়ে দিতে অক্ষম হয়ে তাদের বাজারে বিক্রি করে দিতো।
মৃতদেহ খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হতো এবং চিল-শকুন তা খেয়ে নিত। তিনি বহু বিবাহ এবং সতীদাহ প্রথার কথাও উল্লেখ করেছেন। সতী হতে অনিচ্ছুক বিধবাদের নিচু চোখে দেখা হতো। আলেকজান্ডারের নৌ-সেনাপতি ভারতীয়দের পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, ভারতীয়রা সাদা ধূতি ও চাদর পরিধান করে। তারা কানে দুলও ব্যবহার করে যা হাতির দাঁতের তৈরি। তবে এ অলঙ্কারের ব্যবহার শুধুমাত্র অতি ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রখর রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা ছাতাও ব্যবহার করে।
এ অভিযান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগাযোগের দ্বার খুলে দিয়েছিল। এ অভিযানের ফলে জলপথে পারস্য উপসাগরের পথে একটি এবং বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের গিরিপথগুলো দিয়ে তিনটি স্থলপথ ব্যবহারযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়। এসব পথে গ্রিস থেকে পশ্চিম এশিয়া, ইরান হয়ে গ্রিক সেনাবাহিনীর ভারত আগমনের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ পথগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যেবাণিজ্যিক কর্মকান্ড বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। এ পথগুলো দিয়েই ভারতীয় পণ্য আফগানিস্তান, ইরান, এশিয়া মাইনর হয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে রপ্তানি করা হতো।
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফলাফল ছিলনা। তিনি বিজিত রাজ্যগুলোকে সাতটি প্রদেশে ভাগ করেন। এদের পাঁচটি ছিল ভারতে এবং দুটি ভারতের বাইরে। পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে তিনি গ্রিক গভর্নর নিয়োগ করেছিলেন। অন্য তিনটিতে ভারতীয় রাজারা দায়িত্ব পেয়েছিলেন। উত্তর পাঞ্জাবে অম্ভি, ঝিলাম অঞ্চলে পুরু এবং অভিসার ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অভিসাররাজ শাসনভার গ্রহণ করেন। ৩১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউডিসাসের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতে গ্রিক সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রচেষ্টার অবসান ঘটে।
আলেকজান্ডারের অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারতে কয়েকটি গ্রিক উপনিবেশ স্থাপন। এগুলোর মধ্যে ছিল আলেকজান্ড্রিয়া, বুকেফেলা, নিকাইয়া ইত্যাদি। দেশ থেকে অনেক দূরে এসব উপনিবেশে স্বভাবতই গ্রিকরা বসবাস করতে ইচ্ছুক ছিলনা। অশোকের শিলালিপিতে এগুলোর উল্লেখ পাওয়া গেলেও এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মৌর্য সম্রাটগণ কিছু কিছু গ্রিককে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নিয়োগ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ তুশাস্পের নাম উলেখ করা যেতে পারে। তিনি ছিলেন সৌরাষ্ট্রে মৌর্য রাষ্ট্রীয় বা প্রদেশপাল ।
আলেকজান্ডারের অভিযানের ফলে ভারতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো ধ্বংস হওয়ায় ভারতের রাজনৈতিক ঐক্যস্থাপন ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পক্ষে বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করা সহজ হয়েছিল। আলেকজান্ডারের প্রত্যাবর্তনের পর ঐ এলাকায় রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল এবং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সে সুযোগ গ্রহণ করে সে অঞ্চল দখল করেন। অধ্যাপক হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী মন্তব্য করেছেন যে, পূর্ব-ভারতে উগ্রসেন-মহাপদ্মকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পূর্বসুরী যদি বলা যায়, তাহলে উত্তর-পশ্চিম ভারতে আলেকজান্ডারকেও তাই বলা চলে।
আলেকজান্ডারের অভিযানের ফলে স্থাপিত যোগাযোগের মাধ্যমে পরবর্তীকালে ভারতীয় শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ধর্মনীতির ওপর গ্রিক প্রভাব পড়ে। ভারতের গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদির জ্ঞানও ঐ সূত্রেই পশ্চিমের দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করেছিল। ভারতের গান্ধার শিল্পরীতিতে গ্রিক প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তির নাক, কান ও মাথা গ্রিকদের অনুকরণে তৈরি করা হয়। বলা যায় যে, গান্ধার শিল্পকলা ছিল ভারতীয় বিষয়বস্তু নিয়ে গ্রিক রীতিতে ভারতীয় শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম। অনেকের মতে পাটলিপুত্রে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের কাঠের প্রাসাদেও গ্রিক প্রভাব রয়েছে।
ভারতীয় নাটকে যবনিকা বা পর্দার ব্যবহারও সম্ভবত গ্রিকদের কাছ থেকেই ভারতীয়রা শিখেছিল বলে অনেকে মনে করেন। ধারণা করা হয় যে, গ্রিকদের সংস্পর্শে এসে বৌদ্ধ ধর্মেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। পরবর্তীকালে বৌদ্ধদের মধ্যে যে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়েছিল তাও গ্রিক দৃষ্টান্ত দ্বারা প্রভাবিত।
অন্যদিকে অনেকে মনে করেন যে, ‘নষ্টিক’ বা তপশ্চর্যায় বিশ্বাসী খ্রিস্ট ধর্ম পদ্ধতি বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রভাবিত। জ্যোতির্বিদ্যায় ভারতের ওপর গ্রিক প্রভাব অনস্বীকার্য। জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক বহু ভারতীয় শব্দ স্পষ্টতই গ্রিকদের কাছ থেকে নেওয়া। ভারতীয় সভ্যতায় যে গ্রিক প্রভাব রয়েছে তার সবগুলোই ছিল আলেকজান্ডারের আক্রমণের পরোক্ষ ফল। তবে উল্লেখ্য যে এ অভিযান ভারতে কোন গভীর প্রভাব ফেলতে পারেনি। এ অভিযান ভারতীয় রাজনীতি বা সমাজ কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনেনি। এমন কি সমর-বিজ্ঞানেও ভারতীয়রা গ্রিকদের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেনি। পরবর্তীকালেও ভারতীয় রাজারা যুদ্ধে হাতি, রথ ও বিশাল পদাতিক বাহিনীর ওপরই নির্ভরশীল ছিল।

সারসংক্ষেপ
পিতা ফিলিপের মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার ৩৩৬ খ্রিস্টপূর্বে ম্যাসিডনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। সিংহাসনে বসে তিনি বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি পারস্য ও ভারত আক্রমণ করেন। তৎকালীন উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় রাজ্যগুলোর অনৈক্য, ভারতবর্ষের প্রভূত সম্পদ তাঁকে ভারত আক্রমণে প্রলুব্ধ করেছিল বলে অনেকে মনে করেন। ভারতীয় অন্যান্য রাজারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করলেও ঝিলাম ও চেনাব নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের রাজা পুরু আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেও পুরু পরাজিত হন। তাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার তাঁকে স্বরাজ্যসহ অপর কয়েকটি প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যের শাসনভার অর্পণ করেন। আলেকজান্ডারের রণক্লান্ত সৈন্যরা আরও পূর্বদিকে ভারতের অভ্যন্তরে অগ্রসর হতে রাজি হয়নি। সম্ভবত: রণক্লান্ত সৈন্যরা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিশাল মগধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে ভীত হয়েছিল। ফলে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু পথিমধ্যে ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যবিলনে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের কোন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফলাফল ছিল না। তবে ভারতের গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, ধর্মনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে গ্রিক প্রভাব রয়েছে তার সবগুলোই ছিল আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পরোক্ষ ফল।
