পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

আজকে আমরা পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট সম্পর্কে আলোচনা করবো।

সাংগঠনিক রিপোর্ট-১৯৫৩

 

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট
পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

জনাব সভাপতি, মাননীয় কাউন্সিল সদস্যবর্গ

আওয়ামী মুসলীম লীগের বর্তমান অধিবেশনের গুরুত্ব যে কত বেশি আমরা প্রত্যেকই আমাদের সচেতন প্রচেষ্টা বলিষ্ঠ তৎপরতার মধ্যে দিয়াই তাহা উপলব্ধি করিতে পারিয়াছি। আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মের পরে ইহাই আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল অধিবেশন।

আমাদের আভ্যন্তরীণ সংকট ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগের ঘনঘটার মধ্যে এই কাউন্সিল অধিবেশনের গুরুত্ব অত্যধিক। কিন্তু প্রত্যেক কাজেরই কার্য্যকারণ বিচার করিতে হয়। আর বিশ্লেষণ করিতে হয় পরিবেশের। এই পরিবেশকে পর্যালোচনা করিতে প্রয়োজন অতীত ও বর্তমানের ভিতর ও বাহিরের ঘটনা প্রবাহের। ইহার মধ্য দিয়া আমরা প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করিতে পারি। এবং ইহাই ব্যাখ্যা করিতে পারে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তৎপরতা।

১৯৪৯ সালের ২৩শে ও ২৪শে জুনে গণদরদী মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঢাকায় পূর্ব পাক আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্মের পর দেশে গণমন ও সামাজিক অবস্থায় হইয়াছে গভীর পরিবর্তন। কিন্তু ১৯৪৯ সালে অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ১৯৪৭ সালের ১৪ই অগাস্ট মানুষের মনে যে স্বপ্নজাল সৃষ্টি করিয়াছিল, সরকারের হাতে উহা বার্থ হইলেও মানুষ তখনও সরকারী ভাওতা সম্যক বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই।

সরকারও এই ব্যর্থতাকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি হইতে দূরে রাখিবার জন্য নূতন নূতন বিভ্রান্ত্রির [[বিভ্রান্তির সৃষ্টি করিতে উন্মুখ। তারা কাশ্মীর, হায়দারাবাদ, জুনাগড়, সাম্প্রদায়িক বিভীষিকা সৃষ্টির মধ্য দিয়া মানুষের চিন্তাধারাকে অন্য পথে পরিচালিত করিতে চায়। মানুষও তখন আজাদী বিলুপ্তির আশঙ্কায় সরকারের প্রতি মোহমুক্তি গঠিতে (ঘটিতে) থাকলেও আন্দোলনমুখী হইয়া উঠে নাই। রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিরাট শূন্যতা ও গণমানসের শঙ্কিত নীরবতা দেশে ধীরে ধীরে ভীতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করিতে লাগিল।

 

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট
পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

জালেম সরকার এইবার তার ব্যর্থতাকে ঢাকিতে আর করিল জুলুমের রাজত্ব। এই পরিস্থিতিতে দেশের চিন্তাজীবীরা জাগিয়া উঠিল। মুসলীম লীগ সরকারের ব্যর্থতা ও জুলুম, মুসলীম লীগের কোটারী প্রতিষ্ঠা ও সরকারী দালালী করিতে যাইয়া মুসলীম লীগের গণদুষমণিতে পাকিস্তান সংগ্রামের অনেক নেতাই এই সর্বনাশের প্রতিবাদ করিতে আগাইয়া আসিলেন। সংগঠনী তৎপরতা শুরু হইল।

আমাদের অতীতের গতানুগতিক রাজনীতি, চেতনাবোধ ও বাস্তব পরিবেশের জন্য এই তৎপরতা ধীরে ধীরে চলিতে লাগিল। সরকার ও সরকার-বিরোধী এই প্রবাহ ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে মুখোমুখী দাঁড়াইলেও ইহা চিন্তাজীবী বনাম সরকারী সংঘর্ষই হইয়া রহিল। তখনও কর্মীরা উহাকে প্রকৃত গণরূপ দিতে পারে নাই। এই বিরোধ স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় টাঙ্গাইল উপনির্ব্বাচনে। সর্ব প্রকারের অত্যাচারের মুখেও সম্মিলিত শক্তি সরকারকে রুখিয়া দাঁড়াইল ।

নির্বাচনের মধ্য দিয়া গণতান্ত্রিক শক্তি বুঝিল যে প্রতিক্রিয়ার দূর্গ লীগশাহীর খতম করিতে হইলে বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টা নয়- সংগঠিত তৎপরতাই প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক শক্তি এইও বুঝিল জমিদার জোতদার ও বড় বড় ধনীকরাই আজ তাদের স্বার্থে লীগ সরকারকে ব্যবহার করিতেছে। আর তাদের স্বার্থরক্ষা করিতেই সরকার রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে সাধারণ মানুষের ভবিষ্যতকে বিপন্ন করিয়া তুলিয়াছে ।

জনতা ও বুদ্ধিজীবীদের এই সচেতন প্রতিরোধ প্রচেষ্টাতেই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। এই প্রগতিবাদী চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করিয়াছে বলিয়াই উপযুক্ত সময়ে না হইলেও ১৯৪৯ সালের ১১ই অক্টোবরের খাদ্য মিছিলের উপর সরকার হামলা করিয়া মওলানা ভাসানী, জনাব শামসুল হক, শেখ মজিবর রহমান ও অন্যান্য বহু কর্মীকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রাখিয়াও গণতন্ত্রের দুষমণ লীগ সরকার আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করিতে পারে নাই।

অ জনতার খাদ্য মিছিল প্রত্যক্ষ করিয়াও মরহুম লিয়াকত আলী সাহেব আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব অস্বীকার করিয়া আওয়ামী লীগকে বানচাল করিতে পারেন নাই। জেল-জুলুমের পরেও আওয়ামী লীগের অপ্রতিহত গতিতে ব্যাকুল হইয়া জনাব লিয়াকত আলীর মত লোকও আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘শির কুচাল দেঙ্গে’ ধ্বনি করিয়াও আওয়ামী লীগকে ভেঙে দিতে পারেন নাই ।

১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারীর রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা গণতান্ত্রিক শক্তিকে সাময়িক ভাবে দুর্বল করিলেও গণতান্ত্রিক শক্তি বুঝিয়াছে যে গণ-আন্দোলনকে ব্যাহত করিবার ইহা গণ-দুষমণদের একটু [একটি| হাতিয়ার মাত্র, আর তাদের এই হাতিয়ারকে ধ্বংস করিয়া দিতে হইবে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়া। মানুষের এই চেতনাই ১৯৫০ সালের দাঙ্গার শিক্ষা।

পাকিস্তানের জন্মের পর হইতে ১৯৫০ সালের দাঙ্গা পর্যন্ত সরকারই সকল ব্যাপারে আক্রমণ চালাইয়াছে। গণতান্ত্রিক শক্তি আত্মরক্ষা মূলক ব্যবস্থা ও সংগঠিত উদ্যম ছাড়া তেমন কিছু করিয়া উঠিতে পারে নাই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি, [সম্প্রীতি] ব্যক্তি-স্বাধীনতা, ভাষা বর্ণ সংগ্রাম এবং ছাত্র ও অন্যান্ন (অন্যান্য | আন্দোলন আংশিক সফলতার বেশী সাফল্য অর্জন করিতে পারে নাই। কিছুদিন পরেই সরকার বি.পি.সি. রিপোর্ট পেশ করিতে বাধ্য হয়।

গোটা দেশ ইহার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনে ঝাপাইয়া পড়ে। সরকার রিপোর্ট প্রত্যাহার করে। বি.পি.সি. রিপোর্ট যতবারই পূর্ব পশ্চিমে বিভেদ বা মানুষে মানুষে স্বার্থ-সংঘাত সওগাত লইয়া আসিবে ততবারই উহা তীব্র গণ বিক্ষোভের মুখে ভাসিয়া যাইবে ৷ মানুষের এই সচেতনতার পরিপূর্ণ বিকাশ ১৯৫২ সালের রক্তরাঙ্গা ফেব্রুয়ারীর ভাষা সংগ্রাম। মানুষ সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে যাইয়া রক্ত স্বাক্ষরে শপথ লিখিয়াছে জীবনের পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা না পাইলে তাদের আন্দোলন থামিবে না ।

 

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট
পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

১৯৪৯ সালের স্বাধীনতা লুপ্তির আশঙ্কা, সরকারের প্রতি মোহ, পাক-ভারত তিক্ত সম্পর্ক, হিন্দু-মুসলমানে একটা সন্দেহের ভাব ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতার অভাব এবং সাংগঠনিক শূন্যতার পরিবেশ আজ চির বিদায় নিয়াছে। আজ মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে সরকার বিরোধী। স্বাধীনতাকে স্বার্থক করিতে চায়। জীবন ও জীবিকার পরিপূর্ণ বিকাশের মধ্য দিয়া। জীবন ও জীবিকার লড়াইতে প্রত্যেকটা মানুষ বর্ণ সম্প্রদায় নির্বিশেষে দুষমনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হইতে চায়। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধকে তারা সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিরোধ বলিয়া মনে করেন না। তার উপর আমাদের প্রতিবেশী ভারতের সহিত সম্পর্ক পরিবর্তনের সূচনাতে আভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক। সম্পর্কেও উহার প্রভাব পড়িতে বাধ্য।

১৯৫৩ সালের এই পরিবর্তিত অবস্থায় ১৯৪৯ সালের সাংগঠনিক রূপকে অবশ্যই আমাদের বিবেচনা করিতে হইবে। আমাদের মনে হয় আওয়ামী মুসলীম লীগের গভীর বাস্তবতাবোধই একদিন আওয়ামী লীগকে জনতা ও বুদ্ধিজীবিদের সংগঠন করিয়া তুলিয়াছিল। আজও যেন আমরা আর একবার বাস্তবাদীবোধের পরিচয় দিয়া অগ্রগতি অব্যাহত রাখিতে পারে | পারি। আশা করি আমরা সকলেই একমত যে, গোটা সরকার বিরোধী শক্তির ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গ্রহণই আওয়ামী লীগের কর্তব্য। বর্তমান অবস্থায় বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ছাড়াছাড়িতে ফ্রান্সের কনভেনসনিষ্টদের মত অবস্থা যেন আমাদের না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে আমরা গোটা কাউন্সিলকে আহ্বান জানাইতেছি।

এতক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলনের গতিধারার সাধারণ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়া আওয়ামী লীগের অতীত ও বর্তমান সাংগঠনিক রূপায়নের পরিণতির দাবীর প্রশ্ন উত্থাপণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি। এইবার কর্মসূচী ও তথ্যগতভাবে আওয়ামী লীগকে আপনাদের সামনে উত্থাপিত করিব।

পাকিস্তানের অন্যতম স্রষ্টা জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি পাক-ভারত মৈত্রী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যে বলিষ্ট আওয়াজ তুলিয়াছিলেন পূর্ব পাক আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্মের পরে আওয়ামী মুসলীম লীগও সেই আওয়াজকে কর্মসূচীভূক্ত করে। অতঃপর পূর্বপাক আওয়ামী মুসলীম লীগ বিনা খেসারতে জমিদারী উচ্ছেদ, ল যার জমি তার ভিত্তিতে ভূমি বন্টন, জাতীয়করণের ভিত্তিতে শিল্পায়ণ, প্রত্যেকের কাজের ব্যবস্থা- প্রত্যেকের স্বাহা, শিক্ষার নিরাপত্তার ভিত্তিতে এক কর্মসূচী গ্রহণ করে। কিন্তু আওয়ামী মুসলীম লীগ ভাল করিয়াই বুঝিয়াছিল শুধু আভ্যন্তরীন কর্মসূচীতে সব সমস্যার সমাধান হইবে না।

বিশ্ব বর্তমান অবস্থায় একান্ত পারস্পরিক হইয়া উঠিয়াছে। এই নির্ভরশীলতার প্রতি দৃষ্টি দিয়াই আওয়ামী মুসলীম লীগ উহার আভ্যন্তরীণ নীতির প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া বৈদেশিক নীতি নির্ধারিত করিয়াছে। আওয়ামী লীগ ঘোষণা করিয়াছে কমনওয়েলথ-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হইবে। তারা আরও দেখিয়াছে কৃষ্টি ও শিল্পে তারা যে প্রগতিবাদী কর্মসূচী গ্রহণ করিয়াছে উহা সামন্তবাদী ও সম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একান্ত পরিপন্থী। তাই আওয়ামী লীগ কমনওয়েলথ ত্যাগই নহে- সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্কহীন সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করিয়াছে।

আওয়ামী মুসলীম লীগ এই নীতির অনুকূল শান্তি অন্দোলনেও সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়াছে। পূর্ব-পাক আওয়ামী মুসলীম লীগের সহ-সভাপতি জনাব আতাউর রহমান খান পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সভাপতি ও এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি কমিটির অন্যতম সহ-সভাপতি। শান্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়া আওয়ামী মুসলীম লীগ যুগ যুগ ব্যাপী মানুষের প্রতিভা ও সাধনার প্রতিভূ মানব সভ্যতা রক্ষার জন্য বিশ্ব ফাংসী রণ লাগল সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে। আওয়ামী মুসলীগ লীগ আজ নীতিগতভাবে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির মহান নেতা।

আওয়ামী মুসলীম লীগ গত কয়েক বৎসরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া স্পষ্ট করিয়া বুঝিয়াছে যে, সরকারী নীতির গতানুগতিক সমালোচনাই বিরোধী দলের কাজ নহে। বিরোধীদলকে । মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করিতে চাই গণস্বার্থের ও গণসমৃদ্ধির পরিপুরক কর্মসূচী। সম্রাজ্যবাদ কুক্ষিগত অবস্থায় বিরোধী দলের যে ভূমিকা ছিল বর্তমান পরিস্থিতিতে উহার ভূমিকা ও কর্তব্যের বিস্তৃতি অবশ্যম্ভাবী। আর এই অবস্থার বিশেষ স্বীকৃতির মধ্যেই আওয়ামী মুসলীম লীগ নীতিগতভাবে মুসলীম লীগ হইতে তফাৎ।

মুসলীম লীগ আভ্যন্তরী নীতিতে সামন্তবাদী বলিয়াই বৈদেশিক নীতিতে সাম্রাজ্যবাদীঃ তাই তারা শাস্তি ও প্রগতির দুষমন। আর তাদের এই বন্ধ্যানীতির জন্যই দেশের পুনর্গঠন কার্য্য সম্ভব হইতেছে না। গোটা দেশ আজ দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি, বেকারী, আর্থিক ও সামাজিক সংকটে ধ্বংস হইতে চলিয়াছে। তাদের এই সংকট তাদেরকে উত্তরোত্তর সাম্রাজ্যবাদীদের করুণার পাত্র করিয়া তুলিয়াছে।

 

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট
পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

লীগ সরকার আজ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে পর্যন্ত বিকাইয়া দিতে বসিয়াছে। পূর্বাহেই আওয়ামী মুসলীম লীগ ঘোষণা করিয়াছিল সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে দেশের সংকটের সমাধান করিতে পারিলে সাম্রাজ্যবাদীরা কখনও এই দেশ ছাড়িয়া যাইত না। আওয়ামী লীগের সাবধান বাণী আজ প্রতিটা মানুষের কল্পনাকেই স্পর্স (স্পর্শ) করে নাই, প্রতিটি মানুষকেও উহার পক্ষে সংগঠিত প্রেরণার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে। মামাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস যে আওয়ামী মুসলীম লীগের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিল অধিবেশন উহার এই আদর্শবাদী নেতৃত্বের পরিপূর্ণ সাংগঠনিক রূপ দিতে তৎপর হইবেন।

এই বার সাংগঠনিক দিক লইয়া আমরা কয়েকটা কথা পাড়িব। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে, আজ পূর্ব বাংলার প্রতিটা জিলায় কেন অধিকাংশ ইউনিয়নেও আওয়ামী মুসলীম লীগ গঠিত হইয়াছে। বি.পি.সি আন্দোলনের পরে ভাষা সংগ্রামের মধ্য দিয়া সম্বিতহারা জাতি শহীদদের রক্ত প্রবাহের মধ্যে যে রাজনৈতিক চেতনা লাভ করিয়াছে, উহা একান্ত অনবদ্য। পূর্ব বাংলার অধিকার সচেতন চাষী, সজাগ মধ্যবিত্ত, জাগ্রত ছাত্র সমাজ, জীবন-জিজ্ঞাসার উদ্বুদ্ধ যুবশক্তি আজ তাদের বর্তমান অবস্থার অবসান করিতে কর্ম চঞ্চল ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

তাদের এই তৎপরতার সাংগঠনিক সুযোগ সম্বন্ধে আওয়ামী মুসলীম লীগ নিশ্চয়ই বিবেচনা করিয়া দেখিবে। ঢাকা সিটি হইতে আরম্ভ করিয়া সুদূর মফঃস্বল পর্যন্ত সর্বশ্রেণীর লোকের মধ্যে আমরা নিশ্চয়ই সমালোচনা শুনিতেছি যে, আওয়ামী মুসলীম লীগ আদর্শগত, ভাবে সকল স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করিলেও উহার সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার জন্য সকলকে সমবেত করিতে পারিতেছে না। পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই কাউনসিল অধিবেশন এই দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিবেন বলিয়া আমাদের একান্ত বিশ্বাস।

সংগঠণের এই বিশেষ বিবেচনা ভিন্ন অন্যান্য দিকের প্রতিও আমাদের নজর দেওয়া দরকার। প্রত্যেকটী উ কমিটি হইতে নিম্ন কমিটি, প্রত্যেকটা নিম্ন কমিটী হইতে উচ্চ কমিটির সাথে আমাদের আরও দৃঢ় যোগাযোগ স্থাপন করিতে হইবে। প্রদেশের সর্ব্বত্র ব্যাপক গণ-সংযোগ করিয়া আমাদের কর্মসূচীকে জনপ্রিয় করিয়া তুলিতে হইবে। আমাদের স্মরণ রাখিতেই হইবে যে, লীগ সরকার জনপ্রিয়তা হারাইলেও জনসাধারণকে এখনও আমরা পরিপূর্ণভাবে সাংগঠণ সচেতন করিয়া তুলিতে পারি নাই, অথচ মানুষের এই চেতনার উপরেই আসন্ন নির্বাচনের মধ্য নিয়া গণতান্ত্রিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

আমাদের কর্মসূচীতে আমাদের কাজ ও কর্তব্যের বিস্তৃত আলোচনা ও নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও উহার প্রয়াগ-দিকের (প্রয়োগ-দিকের প্রতি দৃষ্টি দিয়া কর্মসুচীর উপর একটা আলোচনা করিতে চাই। এই আলোচনা আরম্ভের পূর্বে আমাদের কর্মসূচীর গোড়ায় যে মহান প্রেরণা কাজ করিতেছে সে সম্বন্ধেও কিছু বলা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক, রাজনৈতিক, আর্থিক ও সংস্কৃতির নিরাপত্তার পরিপূর্ণ আশ্বাসই আমাদের কর্মসূচীর মূল প্রেরণা।

গতিধারা ও মানব সমাজের ক্রমবিকাশের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি দিয়া আমরা উপলব্ধি করিয়াছি যে, এই ত্রৈমন্ত্রের উপরই আমাদের সামাজিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। আমরা আমাদের ব্যবহারিক দৈনন্দিন জীবনের উপর আলোচনা করিতে যাইয়া আমাদের ঐহিক জীবনের বিকাশের পর্যালোচনা চালাইলে আমাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কে কোন সংশয়েরই অবকাশ থাকিবে না। শোষক আর শোষিতের সংঘাত ভঙ্গুর ধ্বংসোন্মুখ সমাজকে ধ্বংসের হাত হইতে উদ্ধার করিবার জন্য শোষণের অস্ত্রগুলির উপর আক্রমণই আমাদের প্রথম কাজ।

 

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট
পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

এই শোষণই মানুষকে মানুষের মর্যাদা হইতে বঞ্চিত করিয়া তাকে করিয়া তুলিয়াছে শোষকের মুনাফার পণা। পণ্য হিসেবে নয়- মানুষ মানুষের পরিপূর্ণ মর্যাদা লইয়া বাঁচিতে চায়। আওয়ামী মুসলীম লীগ এই বাণী লইয়া বঞ্চিত মানুষের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছে, এই মানবিক সম্পর্কের প্রতিষ্ঠার শপথই আওয়ামী মুসলীম লীগের কর্মসূচীর মধ্য দিয়া প্রতিভাত হইয়াছে। আওয়ামী লীগ ভাল করিয়াই বুঝিয়াছে জাতির সম্পদের উপযুক্ত উৎপাদন ও বন্টনের মধ্যেই মানব মুক্তির এই মহান পথ নিহিত।

বর্তমান সমাজ বিধানের গলদ ও উহার প্রতিশোধকের মধ্য দিয়াই উহার সংকটের অবসান করিয়া মানুষের সমৃদ্ধি রচনা করিতে হইবে। আওয়ামী মুসলীম লীগের কর্মসূচীর বিশ্লেষণ করিয়া আমরা এই কথা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি যে আওয়ামী মুসলীম লীগ এই মহান নীতিরই বাহক। আওয়ামী মুসলীম লীগ উহার ভূমি নীতি ঘোষণা করিয়া বলিয়াছে যে বিনা খেসারতে জমিদারী উচ্ছেদ করিয়া লাঙ্গল যার জমি তার নীতিতে ভূমি বন্টণ করিবে। এই ঘোষনায় এই কথা পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে যে, আওয়ামী লীগ ভূমি ব্যবস্থায় সর্বপ্রকার শোষকের উচ্ছেদ করিয়া চাষীকেই প্রকৃত মালিক করিবে।

ইহাতে ভূমি বিকেন্দ্রীকরণের সাথে সাথে উৎপাদিত পণ্যেরও কেন্দ্রীয়করণ ক্ষমতা লোপ পাইবে, উৎপাদশী তৎপরতা বৃদ্ধি পাইবে, সংগঠিত শিল্পায়িত উৎপাদনের পথ সুগম হইবে; উৎপাদনে মুনাফা লুটিবার প্রবৃত্তি হইতে মানুষের প্রয়োজনের সজাগ দৃষ্টি জাগিবে, সমাজের নিশ্চয়তা দেখা দিবে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়িবে, রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি পাইবে। আমাদের এই কথার সততা [সত্যতা।

মুসলীম লীগ সরকারের তথাকথিত খেসারত দিয়া জমিদারী ক্রয় করিয়া জোতদার বহাল ও কৃষক উচ্ছেদ ব্যবস্থা হইতে পরিষ্কার হইয়া উঠে। সরকার জমিদারী ক্রয় আরম্ভ করিয়াছে। ফল হইয়াছে- সুৰ্য্যাপ্ত নোটাশে চাষীর উচ্ছেদ। কাছারীর অত্যাচারে চাষীর সর্বনাশ, কিছু সংখ্যক নুতন জোতদার সৃষ্টির ফলে লীগ সরকারের দলীয় ফায়দা, উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার জন্য ও মুনাফা লোভের তাড়ণায় খাদ্য সংকট, ৬০ কোটা টাকা খেসারতের ফলে চাষীর উপর কর বৃদ্ধি ও সরকারী ভাণ্ডার উজাড়।

আমরা ভূমি ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন চাই। কিন্তু ভূমি ব্যবস্থার সাথে সাথে শিল্পায়ন প্রচেষ্টাও আমাদের সংগঠিত করিতে হইবে। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের কাঁচামাল, উৎপাদিত পণ্যের বাজার, নিয়োজিত মূলধনের যোগান হিসাবে আমাদের দেশকে ব্যবহার করিয়াছে বলিয়াই আমাদের কৃষি ও শিল্পের এই দুর্গতি আজও তারা আমাদেরে [আমাদেরকে) কমনওয়েলথের জোয়ালে জুড়িয়া ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী আঁতাতে ভিড়াইয়া আমাদের ভবিষ্যৎ পূর্ণ গঠনকে [পুনর্গঠনকে ব্যাহত করিতেছে।

আমাদের ইহা পরিষ্কারভাবে বুঝিতে হইবে যে, সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের শিল্পায়নকে সাহায্য করিয়া তাদের সর্বনাশ করিতে পারে না। একমাত্র পরিচালনা ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ব্যাপারে তানেরে সর্বময় কর্তৃত্ব দিলে তাদের নিজেদের শিল্পের সর্বনাশ না হয় এমন দুই একটি প্রতিষ্ঠান তারা গড়িলেও গড়িতে পারে। কিন্তু পরিচালনা ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের কর্তৃত্ব তাদের হাতে দেওয়া যে কি ভয়াবহ তা আজ আমাদের দেশবাসীরা পারশ্য, মালর প্রত্যেকটা দেশের অভিজ্ঞতা হইতে বুঝিতে পারিয়াছে।

তাই সমস্ত দিক বিবেচনা করিয়া আজ সরকারের উচিত ছিল ষ্টার্লিং পাওনা আদায় করিয়া জাতীয় শিল্প গড়িয়া তোলা। সরকার যে তার সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা নীতির জন্য ইহা করিয়া উঠিতে পারে নাই লীগ সরকারের কাশ্মীর নীতি হইতে বর্তমান খান্য নীতি পৰ্য্যন্ত পর্যালোচনা করিলে উহা পরিষ্কার হইয়া উঠে। দুই একটা ছিটা ফোটা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিতে দেখিয়া আমরা মোটেই যেন সরকারি ভাতাও [ভাওতায়। বিভ্রান্ত না হই।

আমাদের দেখিতে হইবে এই প্ৰচেষ্টা মুল শিল্প সৃষ্টির সহায়ক কি না এবং এই উৎপাদন ও বন্টনে সাধারণ মানুষের স্থান কোথায় । সমস্ত ত্রুটিবিচ্যুতি বাদ দিয়াও কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎ পরিকল্পনার কোন কোন দিককে আমরা শিল্প বিচারের মাপকাঠীতে যাচাই করিতে পারিতাম ।

কিন্তু শুনা যাইতেছে বিসমিল্লায় গলন ও স্বার্থের হানাহানিতে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা পানি হইয়া গিয়া কর্ণফুলীর পরিকল্পনা আজ বানচাল হইতে বসিয়াছে। এই সকল অপরিকল্পিত প্রচেষ্টার দুর্বলতা ও দুর্নীতি আওয়ামী লীগ পূর্বাহ্নে উপলব্ধি করিয়াই মুল শিল্পকে জাতীয়করণের আওতায় (আওয়াজ তুলিয়াছে। জাতীয় শিল্পের বিরাট সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতিও আওয়ামী মুসলীম লীগ দিয়াছে।

কিন্তু লীগ সরকার এই সম্ভাবনা ত দূরের কথা উহার স্বীকৃত কাঠামোতেও শিল্পকে রক্ষা করিতে পারিতেছে না। আমাদের বস্ত্র বিশেষ করিয়া তাঁত শিল্প এক দারুণ বিপর্যয়ের মুখে। বস্ত্রের বিরাট বাজার থাকা সত্ত্বেও আজ মানুষ একদিকে বস্ত্রের অভাবে লজ্জা নিবারণ করিতে না পারিয়া ফাঁসী দিয়া মরিতেছে, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ তাঁতী পরিবার অনাহারে ধ্বংস হইয়া যাইতেছে। সরকারের বাণিজ্য নীতির দেউলিয়াত্ব আজ আমাদের এই ছোটখাট শিল্পকেও এমনি প্রচণ্ড আঘাত করিয়া দেশকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দিতেছে।

তাদের এই নীতিই দেশ বিদেশে তিক্ত রাজনৈতিক সম্পর্কের সৃষ্টি করিয়াছে। আর তারা ইঙ্গো-মার্কিন তাবেদার সাজিয়া কুলরক্ষায় নামিয়াছে। তাদের এই দীনতার জন্যই আমাদের কাগজ, চামড়া, ম্যাচ ও অন্যান্য শিল্প গড়িয়া উঠিতে পারিতেছে না। সরকারের এই বাণিজ্য ও শিল্প নীতির জন্যই তারা তাদের পথে পাটের কোন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করিতে পারিল না। তাদের নীতির জন্য একদিকে চাষী ( চাষীর সর্বনাশ হইল, অন্যদিকে পাটের বাজারও সংকুচিত হইল।

ব্যবসায়ীদের চাষী ঠকানো ও বিদেশে মুনাফা লুটার অতিরিক্ত সুযোগ করিয়া দিয়াই সরকার পাটের ভবিষ্যৎ এমনি দুর্যোগপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে। পাটের এই অবস্থায় শুধু চাষীরাই সর্বনাশ হইবে না গোটা দেশেরও ভরাডুবি হইবে। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জ্জনে পাট অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। পাটের সর্বনাশে আমাদের মুদ্রা সংকট তীব্র হইতে বাধ্য। অথচ এই পাট নিয়াও সরকারের ক্ষমাহীন ব্যর্থতার অবধি নাই। তাই আওয়ামী মুঃ লীগ ঘোষণা করিয়াছে পাট শিল্পের জাতীয়করণ, দেশী বাজারে পাটের সর্ব্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ ও বিদেশী বাজারের সঙ্গতি রাখিয়া পাট সংক্রান্ত বাণিজ্যিক নীতি পরিচালনা।

 

পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট
পূর্ব পাক আওয়ামী [মুসলিম] লীগ কাউন্সিল অধিবেশন সাংগঠনিক রিপোর্ট

সরকারের শিল্প, বাণিজ্য ও ভূমি নীতির আর বিস্তৃত পৰ্যালোচনায় না গিয়া অন্যদিকে দৃষ্টি দিলেও সরকারী ব্যর্থতা প্রতিভাত হইয়া উঠিবে। আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে শোষণই সরকারী নীতির মূল উদ্দেশ্য। জমিদার কর্তৃক প্রজা, মালিক কর্তৃক শ্রমিক শোষনের নীতিই লীগ সরকারের নীতি। লীগ সরকার রচিত বি.পি.সি. রিপোর্টের মধ্যেও তাদের এই রূপ স্পষ্ট হইয়া উঠে। এই রিপোর্টেও লীগ সরকার এক অংশ অন্য অংশের উপর খবরদারী, জমিদারের জমিদারীতে ও মালিকের শোষণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিয়াছে করিয়াছে বলিয়াই গোটা দেশ উহার বিরুদ্ধে গর্জিয়া উঠিয়াছিল।

আওয়ামী মুসলিম লীগ এই বিরাট আন্দোলনের মধ্যে জাগ্রত মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবীর প্রতিনিধি হিসাবে সংগ্রাম চালাইতেছে। আওয়ামী লীগ দাবী করিয়াছে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আর্থিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক। তাই বলিয়াই মুসলিম লীগ সরকার যখন সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে ভাষা আন্দোলনকে ধ্বংস করিতে আসিল গোলাগুলি লইয়া, আওয়ামী মুসলিম লীগ তখন পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবীতে সংগ্রাম [সংগ্রামে] ঝাঁপাইয়া পড়ে।

শহীদরা সরকারের খুন- পিপাসা মিটাইয়াছে। সরকার কিন্তু মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী মিটাইতে পারে নাই। তাই আওয়ামী লীগের পবিত্র দায়িত্ব জাতির এই সংগ্রামকে সফল করা। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠীত করা।

ভাষা আন্দোলনের সময় গোটা পূর্ব বাংলার জনতার সাথে থাকিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগ্রাম করিয়াছে। ভাষা সংগ্রামকে সংগঠিত করিয়া আগাইয়া লইয়া গিয়াছে। শহীদদের শপথকে আওয়ামী লীগ ভুলে নাই। আওয়ামী লীগ জেল জুলুমে কম নিষ্পেষিত হয় নাই। বৃদ্ধ গণনেতা মওলানা ভাসানী সাহেব সহ শত শত নেতা ও কর্মী কারাবরণ করিয়াছেন। কারাগারে মওলানা সাহেবের জীবনও সংশয়াপন্ন হইয়া উঠিয়াছিল। আজও শত শত দেশপ্রেমিক কারাগারের অন্তরালে তিলে তিলে ধ্বংস হইতে বসিয়াছে।

আওয়ামী মুসলিম লীগ সরকারের এই শুধু বর্গীমুক্তি দাবী করে নাই ঘোষণাও করিয়াছে মুসলীম লীগ সরকার যে নীতির প্রতিনিধিত্ব করিতেছে উহার দিন শেষ হইয়া আসিয়াছে, ব্যক্তি ও গণ-জীবনের উপর তাদের এই আক্রমণ মরণ কামড় মাত্র। তাই আওয়ামী মুসলিম লীগ। ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার অপরাজের ঘাটি। আঃ মুঃ লীগ প্রত্যেকটা রাজবন্দীর আর মুক্তিই চায় না, সমাজগত ভাবে বন্দী প্রত্যেকটা মানুষেরও প্রকৃত আজাদী প্রতিষ্ঠিত করিতে চায়।

আওয়ামী লীগ জানে সম্পদ বঞ্চিত মানুষের উদ্দেশ্যে লৌকিক গণতান্ত্রিক অধিকার ঘোষণা ভণ্ডামী ছাড়া কিছু নয়। আর লীগ সরকার শোষণ ও স্বৈরাচারকে রক্ষা করিতে এই লৌকিক গণতন্ত্রের নামে বারবার জনসাধারণকে হামলা করিয়া উত্তরোত্তর সংকট সৃষ্টি করিতেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও সরকারী ব্যর্থতাকে ঢাকিবার জন্য চণ্ডন নীতির ষ্টীম রোলার প্রত্যেক্ষ করা যায়। নুতন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢালাই করিতে বার্থ হইয়া পুরানো শিক্ষার মানকেও বাঁচাইতে না পারিয়া সরকার এক দারুণ ি সংকটের সম্মুখীন হইয়াছে। অথচ শিক্ষার্থী ছাত্র সমাজ সার্বজনীন উন্নত শিক্ষার দাবীতে চঞ্চল।

সরকার বহুবার গোলাগুলি জেল জুলুম দিয়া জবাব দিয়াও ছাত্রদের দাবী সমাইতে পারে নাই। আজ আবার সরকার সারা প্রদেশব্যাপী ছাত্র-শিক্ষক বিরোধের উস্কানি দিয়া গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করিয়া দিতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানের ছাত্র সংগ্রাম এই বিভেদ ও ব্যভিচারের মূর্ত প্রতিবাদ। মুসলীম লীগ সরকারের এই ব্যর্থতা কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া আওয়ামী মুঃ লীগ ঘোষণা করিয়াছিল শিক্ষা সমাজ বজ্জিত নয়। মুসলীম লীগ সরকার যে সমাজের প্রতিনিধি ঐ সামাজিক সংকটের চাপই শিক্ষা ব্যবস্থায়ও প্রতিফলিত হইয়াছে। আঃ মুঃ লীগ তাই উহার কর্মসূচীতে শোষণ মুক্ত সমাজের কথাই ঘোষণা করে নাই- উহা প্রতিষ্ঠার শপথও ঘোষণা করিয়াছে।

 

আমাদের কর্মসূচীতে নীতিগত ভাবে যেসকল বিষয়ের অবতারণা করা হইয়াছে কেবল আমাদের গত কয়েক বৎসরের কর্মের ভিত্তিতে উহা ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টা করিয়াছি। সকল কিছুর পর্যালোচনা অবশ্য আপাততঃ সম্ভবও নয় আর দুই একটা জরুরী আর সমস্যার উল্লেখ করিতে চাই। আমাদের দেশ আজ এক চরম খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়া চলিয়াছে। প্রতিদিনই অনাহারজনিত মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যাইতেছে।

১৩৫০-এর লক্ষ লক্ষ গৃহ হারাই নহে শোষণের ঢাকায় দলিত যুগের ছিন্নমূল মানুষের সাথে বর্তমান সংকটে রিফ অজস্র মানুষ আজ রাস্তা ঘাটে ভিক্ষুকের মিসিলে সামিল হইতেছে। গ্রামে আর শহরে তারা ছিন্নপত্রের মত ভরিয়া গিয়াছে। এই রিক্ত মানুষের মূল্য কতখানি। রংপুর, মোমেনশাহী, খুলনা, বরিশাল ও অন্যান্য জায়গায় মানুষ খাদ্য আন্দোলনও গড়িয়া তুলিতেছে ভূখ মিছিল ও মূর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটির মধ্য দিয়া।

মরার পূর্বে বাঁচিবার জন্য মানুষের এই সংগ্রামকে শুধু আঃ মুঃ লীগ প্রত্যক্ষ করিয়াই ক্ষান্ত হইতে পারে না উহাকে মানুষের বাঁচিবার সংগ্রামে রূপান্তরিত করাও আঃ মুঃ লীগের কর্তব্য। আমরা বিশ্বাস করি আঃ মুঃ লীগ কাউনসিল দেশের সামনে ইহার একটা সুষ্ঠ (সুষ্ঠু) কর্মপন্থা তুলিয়া ধরিবে

বেকারীর অভিশাপে দক্ষ দেশ আবার সরকারী হামলায় ক্ষুব্ধ ও চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। সরকারী নেতৃত্বের ছাটাই অভিযান সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ হইতে লক্ষাধিক লোককে ইতিমধ্যেই চাকুরি হারা করিতে যাইতেছে। স্বল্প বেতন চাকুরিয়াদের মাহিনা হ্রাস প্রস্তাব মধ্যবিত্তের চির ঘাটতি বাজেটকে আরও ঘাটতি করিয়া তাদের অর্ধাহারকে অনাহারে পরিণত করিবে।

আঃ মুঃ লীগের এই কাউনসিল অধিবেশন নিশ্চয়ই এই ধ্বংস যজ্ঞের প্রতিরোধ করে উপযুক্ত কর্মসূচি লইয়া আগাইয়া আসিবে। বাহিরের এই অর্ধাহারে অনাহারের সাথে দেশপ্রেমিক রাজবন্দীদের দুর্বিসহ বন্দী জীবনের আত মুক্তির একটা বলিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণ করিতেও আমরা কাউনসিলকে আহ্বান জানাইতেছি। আমাদের এই মহান কাউনসিল অধিবেশন সাংগঠনিক ও অন্যান্য ব্যাপারে এমন গভীর বাস্তব ধর্মী সিদ্ধান্ত করিবে যে, উহা আমাদের সংগঠনকে উদ্দীপিত, বিরোধীদের নিরত্ন ও সংশয়বাদীদেরে আমাদের সংগঠনের প্রতি আকৃষ্ট করিয়া বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক দুনিয়ার জন্য এক অমর ইতিহাস সৃষ্টি করিবে।

Leave a Comment