বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ  দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন ৭৮

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ  দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন ৭৮। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

 দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন ৭৮

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ  দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন ৭৮

 

প্রিয় কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা, 

উপস্থিত সম্মানিত অতিথি ও সুধীবৃন্দ, 

আজকের এই মহান দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বপ্রথমে আমি এদেশের অগণিত গণমানুষের অবিসম্বাদিত জননায়ক নির্বাচিত শোষিত মানুষের মুখপাত্র, তথা গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর, পথিকৃৎ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার প্রতি পরম শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁরই একনিষ্ঠ সহকর্মী চারজন জাতীয় নেতৃবৃন্দ জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ, জনাব এম. মনসুর আলী, জনাব এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং এদেশের গণমানুষের ভাষার স্বীকৃতির প্রশ্নে, তাদের রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে যে সমস্ত অগণিত স্বর্ণঝরা অগ্নিসন্তানেরা নিঃস্বার্থভাবে ঢেলে দিয়েছিল তাদের বুকের তাজা রক্ত, সেই সমস্ত স্বর্ণকরা কিশলয় সন্তানদের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি আপনাদের সম্মুখে আমার সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করছি।

বিগত ১৯৭৭ সালের ৩রা ও ৪ঠা এপ্রিল তারিখে ঢাকা ইডেন হোটেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন সর্বসম্মতভাবে দলের জন্য একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশ, বাঙালী জাতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সেই ক্রান্তিলগ্নে উক্ত সাংগঠনিক কমিটির আহ্বায়িকার গুরুদায়িত্ব সর্বসম্মতিক্রমে আমার উপর ন্যস্ত করেন। ঐতিহ্যমণ্ডিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মত বিশাল রাজনৈতিক সংগঠনের নীতি-নির্ধারণী কমিটির আহ্বায়িকা হিসাবে কার্যভার গ্রহণ আমার কাছে ছিল অকল্পনীয় বিষয়।

আমাদের মহান শিক্ষক, বাঙালী মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক সমকালীন বিশ্বের বহুল পরিচিত ও অভিনন্দিত নেতা, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পথিকৃৎ, মুক্তিকামী মানুষের অন্যতম মুখপাত্র সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ উপনিবেশবাদ নয়া উপনিবেশবাদ ও বর্ণ বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার বজ্রকন্ঠ, জোট-নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্বের অনন্য প্রবক্তা নিরস্ত্রীকরণে বিশ্বাসী শাস্তিরদূত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সকল অনুভূতি আর উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন এই সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান। অবিশ্বাস্য হলেও নিাম সত্য যে বঙ্গবন্ধু আজ আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। আর একথাও ঠিক, সকল মহৎ মৃত্যুই অমরত্ব দান করে।

তাই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই, তিনি অমর। অমর তাঁর প্রাণপ্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়ে যখন প্রশিক্ষিত ক্যাডার বা কর্মীবাহিনী গঠন ও কর্মসূচী বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের এদেশীয় বিশ্বাসঘাতক প্রতিক্রিয়াশীল অনুচরদের সহায়তায় শুধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই নিহত হলেন না, তাঁর পরিবারের কেহই রেহাই পেলেন না।

তারা কাপুরুষের মত হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠপুত্র ও ছাত্রনেতা শেখ কামাল, পুত্রবধূ বেগম সুলতানা কামাল, মেজ পুত্র শেখ জামাল, পুত্রবধূ বেগম রোজি জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা শেখ নাসেরকে। কাপুরুষ ঘাতকেরা, আরো হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী সভার বিশিষ্ট সদস্য জনাব আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের সম্পাদক তরুণ বুদ্ধিজীবী ও যুব নেতা শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনিকে।

এই জঘন্য চক্রান্ত এখানেই শেষ হলো না। ক্ষমতালোভী ঘাতকের রক্তাক্ত হস্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রাে প্ররোচনায় পরবর্তীকালে প্রবেশ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করে ৪ নেতাকে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং গৌরবময় জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করেন- বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ, তদান অর্থমন্ত্রী ও দেশের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী জনাব এম. মনসুর আলী এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামানকে।

এমনিভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার বিশ্ব সহকর্মী জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বাংলাদেশে শুধু নেতৃত্বের শূন্যতাই করল না, তারা স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মহান নেতৃত্বে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক হয়েছিল তাও ধীরে ধীরে একে একে পাল্টায়ে দিতে শুরু করল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সেদিন বিশ্ব-বিবেক চমকে উঠে। দেশে দেশে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়।

আর বাংলাদেশের শাসকেরা? বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্র সেদিন জাতির জনকের প্রতি দেখায় চা অসম্মান-তাঁর মরদেহ সিঁড়ির উপর পড়ে থাকে অনাদৃত অবস্থায়। শেষে তাঁর শাহাদাতের দু’দিন পর তাঁর মৃতদেহ দায়সারা গোছেরভাবে সমাহিত করা হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় এক নিভৃত প্রান্তরে, সমগ্র জাতির অলক্ষ্যে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোন তদন্ত হল না, ঘাতকদের বিচারেরও কোন ব্যবস্থা হলো না।

এই খানেই ঘটনার শেষ নয়। এই ঘৃণ্য চক্রান্তের পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় আওয়ামী লীগ নেত সর্বজনাব শেখ আবদুল আজিজ, আব্দুস সামাদ আজাদ, কোরবান আলী, জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, গাজী গোলাম মোস্তফা, সরদার আমজাদ হোসেন, রওশন আলী, এখলাস উদ্দিন, আবদুল মান্নান, নূরুল হক, মাহমুদুর রহমান বেলায়েত, কাজী মোজাম্মেল হক, রহমত আলী, আবদুল জলিল, আবদুল মান্নান, মোজাম্মেল হক সমাজী, রওশনুল হক, আব্দুর রাজ্জাক, বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগনসহ হাজার হাজার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও কৃষক লীগের নেতা ও কর্মীদেরকে।

নেতা ও কর্মীদের উপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। সকল স্তরের কর্মী ও নেতৃবৃন্দকে পাইকারীভাবে গ্রেফতার, অন্তরীণাবদ্ধসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশে ও বিদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে নষ্ট করার জন্য নগ্নভাবে চালাতে থাকে কুৎসিত অপপ্রচার। পরবর্তীকালে ইতিহাসের সর্বকালের নজিরবিহীন জেলহত্যার বেদনাদায়ক সংবাদ বয়ে আনে। ঘরভাঙা সাইক্লোনের মত সে অশুভ সংবাদ সমস্ত। অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে আমাকে নাড়া দিয়েছিল। এমনি রক্তাক্ত শাড়ির আঁচল জড়িয়ে নেমে এসেছিলাম পথে।

শত অত্যাচারের মুখেও আওয়ামী লীগের কর্মী ও নেতৃবৃন্দ আদর্শ হতে বিচ্যুত হননি, তাঁরা বিপুল উদ্যোগে সংগঠনের কাজ করে যেতে থাকেন। তারই পটভূমিতে ১৯৭৬ সালের মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী উদযাপন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য প্রগতিশীল দলের কর্মী ও নেতৃবৃন্দ এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকগণ কৰি জসীম উদ্দীনকে সভাপতি, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসকে আহ্বায়ক এবং কাজি জহিরুল কাইউমকে কোষাধ্যক করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৩০১ জন সদস্য সমবায়ে জাতীয়ভাবে যখন প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে নেমে আসে সরকারী নির্যাতন।

ফলে ঢাকায় গ্রেফতার হন প্রাক্তন মন্ত্রী জনাব মতিয়ুর রহমান, উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক জনাব খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, আওয়ামী লীগ কার্যকরী সংসদের সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম। পরবর্তীকালেও বিভিন্ন স্থানে নেতৃবৃন্দ ও বহু কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। তৎপর রাজনৈতিক দলবিধি আইনের আওতায় দলের নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেন। সংগঠনের এই সীমিত তৎপরতাকেও স্তব্ধ করে দিবার অসৎ উদ্দেশ্যে সরকার নেমে আসে অত্যাচারের খড়গহস্ত নিয়ে।

ফলে সাবেক স্পীকার জনাব আব্দুল মালেক উকিল, দলের সহ-সভাপতি জনাব রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া, প্রাক্তন মন্ত্রী জনাব আব্দুল মোমেন তালুকদার, সংগঠনের ভারলীগ সম্পাদিকা বেগম সাজেদা চৌধুরী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জনাব সালাউদ্দীন ইউসুফ, ঢাকা নগর আওয়ামी সম্পাদক জনাব মোজাফফর হোসেন পল্টু প্রভৃতিকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জনাব মহিউদ্দিন আহম্মদের নামেও গ্রেফতারী পরওয়ানা জারি হয়।

পরবর্তী পর্যায়ে কার্যকরী পরিষদের সদস্য জনাব ফজলুল হক বি.এস.সি. ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব মনসুর আহম্মদ সহ বহু নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। জেল অভ্যন্তরেও আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ফলে অনেকে গুরুতরভাবে আহত হন এবং নানা রোগের শিকার হন। এতদসত্ত্বেও সংগঠনের নেতৃবৃন উদ্যোগে কাজ করে যেতে থাকেন। সেই মুহূর্তে সাবেক মন্ত্রী বাবু ফণীভূষণ মজুমদার ও মতিয়ুর রহমান সাহেব গ্রেফতার হন।

উক্ত গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দের মধ্যে জনাব মতিয়ুর রহমান, জনাব আব্দুল মোমিন তালুকদার, জনাব আব্দুর রাজ্জাক, বেগম সাজেদা চৌধুরী, জনাব সালাউদ্দীন ইউসুফ, জনাব আমির হোসেন আমু (এমপি) কমান্ডান্ট মানিক চৌধুরী (এমপি), এ. বি. এম. তালেব আলী (সাবেক এমপি), জনাব আব্দুল হামিদ, কাজী মোজাম্মেল হক এমপি সহ অন্যান্যের আটকাদেশ মহামান্য হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্ট বেআইনী ও অবৈধ ঘোষণা করায় মুক্তিলাভ করেন।

শত অত্যাচারের-অবিচারের মুখেও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীবাহিনী বিপুল উদ্যোগে কাজ করে যেতে থাকেন। পরিবর্তিত অবস্থার সুযোগে স্বাধীনতার বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তারা মহান স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে কদর্য মন্তব্য ও কটাক্ষ্য করতে থাকে। পবিত্র ধর্মের মূল লক্ষ্যকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও সংহতিকে বিনষ্ট করার হীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের অশুভ চক্রান্ত এবং যে মহান অনুভূতি ও পটভূমি স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার বিরামহীন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই ঘৃণ্য কার্যকলাপের প্রেরণার উৎস কোথায় দেশবাসীর তা অজানা নয়।

 

বন্ধুগণ,

আপনাদের স্মরণ আছে, ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে সরকার রাজনৈতিক দলবিধি (পি.পি.আর) জারি করেন। তখন দলের সংগ্রামী নেতা ও কর্মীবৃন্দ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসারে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করার জন্য পি.পি.আর. এর অধীনেই সংগঠনের অনুমোদন লাভ করেন। তদনুসারে ১৯৭৬ সালে নভেম্বর মাসেই শুরু হয় দলের সাংগঠনিক তৎপরতা। সংগঠনের এই সীমিত তৎপরতাকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে সরকার নেমে আসে অত্যাচারের খড়গদণ্ড নিয়ে।

ফলে সেই থেকে আজ পর্যন্ত চলছে ঘরোয়া পরিবেশে “সীমিত পরিসরে” আওয়ামী লীগের মত একটি বিরাট দলের সাংগঠনিক কাজ এবং রুদ্ধদ্বারে এতবড় বিশাল দলের সাংগঠনিক তৎপরতা যে কি দুরূহ ব্যাপার আপনারা সবাই তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন ও পাচ্ছেন। কারণ আওয়ামী লীগ জনগণের সংগঠন। বাংলাদেশের পঁয়ষট্টি হাজার গ্রামের সঙ্গে তার নাড়ীর সংযোগ। সেই জনগণকে আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য আইনের কত বেড়াজাল কি নির্ঘুম অপচেষ্টা।

ভাই ও বোনেরা,

আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকেই গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ছিল বজ্রকণ্ঠে সোচ্চার এবং আওয়ামী লীগ এই সকল অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। আর সে জন্যেই আওয়ামী লীগের উপরে নেমে আসে সার্বিক নগ্ন হামলা। সামরিক শাসনের অবশ্যম্ভাবী নিয়ম অনুসারে বন্ধ হয়ে যায় সকল গণতান্ত্রিক কার্যক্রম। বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ হরণ করা হয় সকল প্রকার শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশের অধিকার। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে বাংলাদেশকে অকটোপাশের মত আঁকড়ে ধরে আমলাতান্ত্রিক চক্র। আকাশচুম্বি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর বহুমুখী অমানবিক কার্যাবলী স্থান পায় সমাজদেহে।

চরম প্রচারের মুখেও সকল প্রকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষত-বিক্ষত হয় দেশের অর্থনীতি। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, অন্যদিকে জমির খাজনা, ইউনিয়ন ট্যাক্সসহ অন্যান্য ট্যাক্স বৃদ্ধি, রেশনের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, রেল, বাস, লঞ্চ প্রভৃতির ভাড়া বৃদ্ধি, পাঠ্যপুস্তকের মূল্য বৃদ্ধি মাথাভারি শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন, আখ পার্টসহ কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্যের অভাব জনজীবনকে অসহায় ও পর্যুদস্ত করে তুলেছে। সামঞ্জস্যবিহীন ও অসঙ্গতিপূর্ণ বেতন-কমিশনের রিপোর্ট সর্বক্ষেত্রে এক চরম হতাশা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। মিল কল-কারখানায় উৎপাদনে দেখা দিয়েছে চরম মন্দাভাব। কৃত্রিম লাভ দেখানোর জন্যে উৎপাদিত্ত শিল্প-দ্রব্যের উপর আরোপ করা হয়েছে বর্ধিত মূল্য।

জনগণের ক্রয়ক্ষমতা নেমে এসেছে দুর্যোগ সীমার নীচে। বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থের তাগিদে ঢালাও ভর্তুকি দেওয়া হয় কতিপয় দ্রব্যের উপর। পরিকল্পনাহীন মুদ্রা প্রচলন বয়ে এনেছে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি । সমাধানের পথ খুঁজে পেতে হয়। কাজটি কঠিন, কাজটি বিজ্ঞানভিত্তিক। এ কারণে পরিকল্পনাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিজ্ঞান-মানস লালন করা অপরিহার্য। পরিকল্পনাবিদ রাজনীতিক না হলে পরিকল্পনা সুদ্ধ ও নির্ভুল হয় না, অ থেকে দেখা গেছে।

একথা স্মরণে রেখে জাতীয় রাজনৈতিক দলকে বিজ্ঞানসম্মত পথে অগ্রসর হতে হয়। আমাদের সৌভাগ্য ছিল বিষয়টি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধ্যান-ধারণা এত সুষ্ঠু ছিল যে তিনি ইতিহাসের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সাফল্য থেকে বাঙালী জনমানসের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনার কারিগর সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সফল ও সার্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের জন্যে রাজনৈতিক দল পরিকল্পনা-কর্মী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি এক যুগান্তকারী সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর বর্তমান যুগে সেটাই হচ্ছে প্রকৃত নেতার কাজ।

সংগ্রামী কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয়ে আমাদের সংগ্রামী ঐক্যকে হাতিয়ার করে শত বাধাবিঘ্নের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালনের জন্য। সফলতা অথবা ব্যর্থতার হিসাব কারে গিয়ে আমি আপনাদের বিব্রত করব না। বিগত দিনের কার্যাবলীর একটা বিবরণ দেওয়ার শুরুতেই আমি বলতে চাই- “যা কিছু সুন্দর তা হোক সংগঠনের- যা কিছু অসুন্দর যা কিছু অকল্যাণ তা হোক আমার নিজের।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

এবার আমি আমাদের কার্যকালের তৎপরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণী পেশ করছি। ১৯৭৭ সালের ১লা মে আমরা দেশব্যাপী মহান মে দিবস পালন করার মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণী তথা মেহনতী মানুষকে আত্মত্যাগের মহিমায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। ৭ই জুন আলোচনা সভা ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ৬-দফা দিবস পালন করা হয়।

১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে দেশব্যাপী “জাতীয় শোক দিবস” পালিত হয়। এ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির পক্ষ থেকে মিলাদ মাহি পবিত্র কোরানখানির জন্য ৩২নং সড়কে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার মাধ্যমে বাড়ীটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট অনুরোধ জানাই। অনুমতি না পাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আমরা দলীয় কার্যালয়ে পবিত্র কোরানখানি মিলাদ-মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করি।

৩রা নভেম্বর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে দেশব্যাপী “ঢাকা জেল-হত্যা প্রতিবাদ দিবস” পালিত হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে শহীদ জাতীয় নেতৃবৃন্দের মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, কোরানখানি ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে “ঢাকা জেলহত্যা প্রতিবাদ দিবস” পালন করা হয়। ৫ই ডিসেম্বর গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চতুর্দশ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

ঐ দিন সকালে মরহুমের মাজার জেয়ারত ও মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়। ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে আমরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করি। ঐদিন বিকালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারী অমর একুশে উদযাপন-দিনের কর্মসূচীর মধ্যে ছিল প্রভাতফেরী, আজিমপুরে শহীদদের মাজার জেয়ারত এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ।

বিকেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাস থেকে আমরা সাংগঠনিক সফর শুরু করি। সর্বশেষ ২৬শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত আমরা ৫৭টি সাংগঠনিক জেলায় দলীয় কর্মী সমাবেশে যোগদান করি। এসব এলাকার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যু শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিসহ সংগঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করি।

প্রিয় কাউন্সিলার-ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা,

আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে দীর্ঘদিন যাবত আওয়ামী লীগ, ছাত্র যুবলীগ, কৃষক লীগ ও শ্রমিক লীগের হাজার হাজার নেতা ও কর্মী আটক রয়েছেন। কারাবাসের নিঃসঙ্গ জীবন, বন্ধ পরিবেশের সুষিত আবহাওয়া, আহারের অনুপযোগী খাদ্য পরিবেশন সীমान সর্বোপরি, মানান ধরনের অত্যাচার নির্যাতনের ফলে রাজবন্দীদের অনেকেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ছটফট করছেন।

অনেক রাজবীর পরিবারবর্গ নিদারুণ আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে পাত রাজবন্দীদের মুক্তি আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। সেই থেকে আমাদের সীমিত অধিকারের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি “লিগ্যাল এইড কমিটি” ও “রাজবন্দী কমিটি” গঠন করেছি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রথম পর্যায়ে। বিভিন্ন জেলা শাখায়ও অনু কমিটি গঠন করা হয়েছে।ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের ফলে ক্ষতিরান্ত সর্বহারা মানুষের সাহায্যার্থে আমরা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য রিলিফ সামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির কার্যভার গ্রহণের পর ৪ঠা মে, ১৯৭৭ থেকে ২৮শে ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির সর্বমোট ১০টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যে দুটি ছিল সাংগঠনিক কমিটির বর্ধিত সভা। প্রায় প্রতি সভাতেই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিসহ সংগঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উল্লেখিত সভাসমূহে গৃহীত প্রস্তাবাবলীর মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দান এবং জেলহত্যার তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের দাবী জানান হয়।

এছাড়া অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের পুনর্বাসন, মৌলিক অধিকার ফেরৎ দান, ঘরোয়া রাজনীতির সীমিত অধিকার থেকে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ দান, প্রকাশ্য স্থানে সভা-সমিতি-মিছিলের অধিকার, সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দাবী, অসুস্থ বন্দীদের সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত, রাজনৈতিক কারণে জারিকৃত গ্রেফতারী পরোয়ানা ও হুলিয়া প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের উপর সকর প্রকার নির্যাতন, অত্যাচার ও হয়রানী বন্ধ করা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, জরুরী আইন ও বিশেষ আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিলের দাবী জানানো হয়।

এ ছাড়া এসব সভায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রণত অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ, জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় প্রত্যর্পণের প্রতিবাদ জ্ঞাপন, সুষ্ঠু শ্রমনীতি ঘোষণার দাবী, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারসহ শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা, শ্রমিক-নির্যাতন ও হয়রানী বন্ধ করা, আটক শ্রমিক নেতাদের মুক্তি দাবী, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবী জানানো হয়।

কৃষিপণ্যের যথার্থ মূল্য দান, গরীব কৃষকদের যথাযথ ঋণদানের ব্যবস্থা, কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দানসহ হাট-বাজারে ও জলমহালে ইজারদারী প্রথা বাতিলের দাবী জানানো হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানের এবং অনুন্নত অঞ্চলের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর সমস্যাবলীর সমাধানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানানো হয়। এ ছাড়াও শিক্ষাক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থায় দুঃখ প্রকাশ করে পাঠ্যবই-এর মূল্য হ্রাসসহ শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতনের দাবী জানানো হয় এসব সভায় ।

যদিও সরকার বারবার ঘোষণা করছে জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা, কিন্তু বাস্তবে তার কোন লক্ষণ আমরা দেখছি না। উপরন্তু একটার পর একটা জারী করা হচ্ছে নতুন নতুন বিধি। একটা বিশেষ সময়ের জন্য “জননেতা সম্পত্তি হিসাব” দাখিলের নামে একটা বিশেষ দলকে আইনের যাঁতাকলে নিষ্পেষণের এক নতুন দুরভিসন্ধিও আমরা লক্ষ্য করছি সাম্প্রতিককালে। দেশের প্রচলিত আইন-আদালতকে এড়িয়ে যেয়ে বিশেষ বিশেষ আদালতে বিচারের নামে সাজা দেওয়া হয়েছে বহু জনপ্রিয় জননেতাকে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপীলের অধিকার ও করা হয় গর্ব।

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ  দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন ৭৮

 

সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা,

আপনারা জানেন, ইতিপূর্বে সারা বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিপুলভাবে জয়ী করেছেন। কিন্তু সারাদেশে পৌরসভার নির্বাচনে চেয়ারম্যান জনগণের ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। ঢাকায়ও সরকার সেই ব্যবস্থা করেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পরোক্ষ নির্বাচন বিধি চালু করা হয় এবং হাত তুলে ঢাকা পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচন প্রথা জারি করে গণতান্ত্রিক বিধি ন্যক্কারজনকভাবে সরকার নিজেই লঙ্ঘন করেন। আমরা তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছি।

বন্ধুগণ,

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আহ্বায়িকা হিসাবে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রবাহমান রাজনৈতিক তরঙ্গে কতখানি অবদান রাখতে পেরেছি তা নির্ণয় করবেন আপনারা যারা সকল প্রকার ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আরদ্ধ কাজ সমাপ্ত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি হিসেবে আপনাদের গচ্ছিত পবিত্র আমানত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোই আমাদের উদ্দেশ্য। তাই আজ আমরা জীবনের সকল প্রকার ঝুঁকি নিয়ে পথে নেমেছি। সীমিত রাজনৈতিক সুযোগের আবর্তে ঘুরেছি বাংলার পথে-ঘাটে-মাঠে-প্রান্তরে, ঘুরেছি বাংলার নিপীড়িত জনপদে শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের অঙ্গনে, যেখানে ছড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু আর তাঁর ৪ জন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর প্রাণের স্পন্দন। এসবই সম্ভব হয়েছে একমাত্র নেতৃবৃন্দ এবং আপনাদের সকলের সহযোগিতায়।

ভাই ও বোনেরা,

আপনারা জানেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করা হয়েছে। আমরা মনে করি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আর চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ রাখা যায় না। বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির যে পশ্চাৎপদতা সৃষ্টি হয়েছে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শক্তি দিয়েই প্রতিহত করতে হবে। এই মুহূর্তে আমরা যদি নির্লিপ্ত থাকি তা হলে ভবিষ্যতের বংশধরগণ কোনক্রমেই ক্ষমা করবে না।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সর্বাগ্রে সংগঠনের কথা এসে যায়। সংগঠন হচ্ছে আদর্শের বাহন। কর্মীবাহিনী সংগঠনের প্রাণ। কর্মসূচী সংগঠনের খাদ্য ও আন্দোলন হচ্ছে জীবনীশক্তি। উল্লেখিত দর্শনের নিরিখে আহ্বায়িকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে আমরা অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমরা জানি জয় আমাদের সুনিশ্চিত। কারণ দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গে আগেও ছিলেন, এখনও আছেন।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত কাউন্সিলার ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা, সম্মানিত অতিধিবৃন্দ ও সুধীমণ্ডলী,

আমাদের সাধ ছিল অনেক কিন্তু সাধ্য সীমিত। কাজেই সার্বিক আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে। থাকলে তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এই দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য। যারা সর্বতোভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে এবং সম্মেলন ১৯৭৮ সফল হোক- এই কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন 

আহ্বায়িকা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ 

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু !! জয় আওয়ামী লীগ !!!

Leave a Comment