আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় কুতুবউদ্দিন আইবক – যা দিল্লি সালতানাত এর অন্তর্ভুক্ত।
কুতুবউদ্দিন আইবক

প্রথম পর্বের তুর্কি সুলতান
ভারতে মুহাম্মদ ঘোরীর উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর প্রধান অনুচর ও সহকর্মী কুতুবউদ্দিন আইবক। কুতুবউদ্দিন প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ সাধারণভাবে ‘দাসবংশ নামে পরিচিত – যদিও এই নামকরণের পিছনে তেমন কোনো যুক্তি নেই। কেননা, ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দিল্লিতে তিনটি পৃথক রাজবংশের কুতুবউদ্দিন, ইলতুৎমিশ এবং বলবন রাজত্ব করেন।এদের কেউই সিংহাসনারোহণের সময় ক্রীতদাস ছিলেন না।তাছাড়া সকলেই নিয়মানুগভাবে ‘দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। এমন কি অনেকেই রাজপরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।
যাহোক কুতুবউদ্দিন আইবক থেকে শুরু করে পরবর্তী একশ বছর পর্যন্ত যাঁরা ক্ষমতায় আরোহণ করেছেন তাঁদেরকে পাঠান, দাস, আদি তুর্কি সুলতান, তুর্কি মামলুক, ইলবারি তুর্কি ইত্যাদি নামে অভিহিত না করে ‘দিল্লি সুলতানি প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বের তুর্কি সুলতান’ হিসাবে আখ্যা দেয়াই যুক্তিযুক্ত বলে অনেকে মনে করেন। সুতরাং কুতুবউদ্দিনকে ‘দাস’ সুলতান হিসাবে বর্ণনা করার পিছনে শক্তিশালী ঐতিহাসিক যুক্তি নেই। কেননা তিনি মুহাম্মদ ঘোরীর কাছ থেকে ‘মুক্তি সনদ’ লাভ করেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই কুতুবউদ্দিন ও পরবর্তী শাসকদেরকে ‘মামলুক সুলতান হিসাবেও অনেকে আখ্যা দিতে চান। আরবি শব্দ ‘মামলুক’-এর অর্থ হলো ‘স্বীয় অধিকারভুক্ত’।
প্রথম জীবন ও সিংহাসনারোহণ
তুর্কিস্থানের এক ‘আইবক’ উপজাতি পরিবারে কুতুবউদ্দিনের জন্ম হয়। বাল্যকালেই ক্রীতদাসরূপে তিনি জীবন আরম্ভ করেন। প্রথমে নিশাপুরের কাজি ফকরুদ্দিন আবদুল আজিজ কুফী তাঁকে কিনেন এবং কাজির নিকটে থাকা অবস্থাতেই কুতুবউদ্দিন বিদ্যাশিক্ষা করেন। অশ্বারোহণ এবং তীরন্দাজিতে তিনি বিশেষভাবে পটু হন। কাজির মৃত্যুর পর কুতুবউদ্দিনকে মুহাম্মদ ঘোরীর কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। সমসাময়িক উৎস হতে জানা যায় কুতুব দেখতে কুৎসিত হলেও গুণবিচারে তিনি যথেষ্ট আকর্ষণীয় ছিলেন।
তাঁর অধ্যাবসায়, সাহসিকতা, প্রভুভক্তি, সেবা ও বদান্যতায় ঘোরী মুগ্ধ হন। তিনি কুতুবউদ্দিনকে সৈন্যবাহিনীর এক শাখার অধিনায়ক পদে নিযুক্ত করেন। এভাবে ‘আমীর-ই-আখুর’ বা সুলতানের ‘অশ্বশালার অধিপতি হিসাবে কুতুবউদ্দিন সর্বপ্রথম তাঁর যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। মুহাম্মদ ঘোরীর যুদ্ধাভিযানসমুহে কুতুবউদ্দিন বিশেষভাবে সাহায্য করেন এবং ভারত বিজয়কালে বিচক্ষণ সমর নায়করূপে স্বীকৃতি লাভ করেন।
উত্তর ভারত বিজয়ের পর সঙ্গত কারণেই কুতুবউদ্দিন বিজিত রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত হন। ১১৯২ হতে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি মীরাট, দিল্লি, রণথম্ভোর, বারাণসী; ১১৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দে কনৌজ, কালিঞ্জর দখলে ভূমিকা রাখেন। এভাবে কুতুবউদ্দিন উত্তরোত্তর বিজয় লাভ করে মুহাম্মদ ঘোরীর ভারতীয় রাজ্যের শ্রী ও শক্তি বৃদ্ধি করেন। মুহাম্মদ ঘোরী যখন মধ্য এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যস্ত, তখন কুতুবউদ্দিন একান্ত অনুগত প্রতিনিধি হিসাবে ভারতে ঘোর রাজ্য রক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম অধিকারের সীমানাও বৃদ্ধি করে যান।
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ ঘোরীর আকস্মিক মৃত্যু হলে কুতুবউদ্দিন স্বাধীনতা ঘোষণা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। অবশ্য এরই মধ্যে তিনি স্বীয় শক্তির স্থায়িত্বের জন্য সমসাময়িক রীতি অনুসারে উপযুক্ত বৈবাহিকসূত্রের ব্যবস্থা করেন। তিনি নিজে মুহাম্মদ ঘোরীর এক সেনাপতি তাজউদ্দিন ইয়ালদুজের কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। নিজের ভগ্নীকে মুহাম্মদ ঘোরীর অপর এক সেনাপতি নাসিরউদ্দিন কুবাচার সঙ্গে বিয়ে দেন। তাঁর এক কন্যাকে বিয়ে দেন তাঁরই সুযোগ্য ক্রীতদাস ইলতুৎমিশের সঙ্গে।
রাজ্যশাসন
কুতুবউদ্দিন মাত্র চার বছর রাজত্ব করেন। ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে গজনীর সিংহাসনে মুহাম্মদ ঘোরীর উত্তরাধিকারী গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ কর্তৃক তিনি ‘সুলতান’ উপাধিতে ভূষিত হন। রাজ্যশাসনের চার বছরের মধ্যে তিনি নতুন কোনো রাজ্য জয় করেননি। শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারেও তেমন নতুন কিছু অর্জিত হয়নি। তবে ঘোরীর সেনাপতি থাকাকালেই তিনি কতিপয় অনধিকৃত অঞ্চল অধিকার করেন এবং কতিপয় বিদ্রোহীকে শায়েস্তা করেন। ফলে বিজিত অঞ্চলে মুসলমান শাসন স্থায়ী হওয়ার পথ সুগম হয়। সুলতান হবার পর কুতুবউদ্দিন কেবল বাংলার মুসলমান রাজধানী লখনৌতি স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আনেন।
কুতুবউদ্দিন একটি বিরাট এলাকা শাসনের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন- তাঁর রাজ্য পশ্চিমে লাহোর হতে পূর্বে বাংলা এবং উত্তরে দিল্লি হতে দক্ষিণে গুজরাট ও কালিঞ্জর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। মাত্র চার বছরের শাসনকালে কুতুবউদ্দিনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের দৃঢ়ীকরণ। যে কারণে তিনি এ সময় নতুন কোনো রাজ্য জয় না করে সাম্রাজ্যের সমস্যা- সংকটের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। এ কাজে তাঁর সাফল্য নির্ভর করছিল তাঁর ওপর তুর্কি অভিজাতদের আস্থা ও বিশ্বস্ততা স্থাপনের ওপর।
কিন্তু সে কাজ ঠিকমতো সম্পন্ন করার আগেই ১২১০ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১২১২ খ্রিস্টাব্দে) কুতুবউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। অবশ্য বাংলা বিহারে কুতুবউদ্দিন কিছুটা সাফল্য প্রদর্শন করেছিলেন। বখতিয়ার খলজীর পর আলী মর্দান খলজী বাংলার ক্ষমতায় আরোহণ করেন। কিন্তু আলী মর্দানের বিরোধী খলজী মালিক মুহাম্মদ শিরান খলজী তাঁকে পদচ্যুত ও বন্দি করেন। আলী মর্দান কুতুবউদ্দিনের দ্বারস্থ হন। কুতুবউদ্দিন অযোধ্যার শাসকের সাহায্যে আলী মর্দানকে বাংলার শাসন- কর্তৃত্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
কৃতিত্বের মূল্যায়ন
কুতুবউদ্দিন আইবককে তুর্কি অধিকৃত ভারতের সর্বপ্রথম সার্বভৌম নৃপতি বলা যায় কিনা সে সম্বন্ধে মতভেদ আছে। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, তিনি নিজ নামাঙ্কিত মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এ জাতীয় কোনো মুদ্রা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ইবনে বতুতা কুতুবউদ্দিনকে ভারতের প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসাবে স্বীকার করেননি। তবে এ কথাটি অস্বীকার করা চলে না যে, কুতুবউদ্দিনই গজনীর সার্বভৌম ক্ষমতা থেকে ভারতভূমিকে মুক্ত করে স্বাধীন সুলতানি সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচনা করেছিলেন। মুহাম্মদ ঘোরীর সহকর্মী হিসাবে তিনি যেমন রণক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শন করেন, তেমনি ঘোর অধিকৃত ভারত-ভুখন্ডের উপ-শাসক হিসাবেও যথেষ্ট কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত কুতুবউদ্দিন একজন অনুগত শাসক, নিষ্ঠাবান সমরকুশলী সৈনিক হিসাবে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি আধা-স্বাধীন শাসনের সূচনা করেন। অতঃপর দাসত্বমুক্ত হয়ে বৈধভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন শাসন পরিচালনা করেন। যাহোক প্রথম পর্বে কুতুবউদ্দিন আইবক ছিলেন দক্ষ যোদ্ধা, দ্বিতীয় পর্বে তিনি একজন কূটনীতিক এবং শেষ পর্বে তিনি ছিলেন নতুন এক সম্রাজ্যের সংগঠক। ডঃ এস. আর. শর্মা কুতুবউদ্দিনের অবদানকে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপয়িতা বাবরের অবদানের সাথে তুলনা করেন।
ডঃ ঈশ্বরী প্রসাদ তাঁকে ভারতে ‘মুসলিম বিজয়ের অন্যতম পথিকৃৎ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বস্তুত সামান্য ক্রীতদাস থেকে ভারতের অধীশ্বরের আসনে অধিষ্ঠিত হবার অনন্য কৃতিত্বে কুতুবউদ্দিন আলোকিত। তাঁর কোনো রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল না, দেশে বিদেশে শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বীরও কোনো অভাব ছিল না। তথাপি কোনোরকম বিচলিত না হয়ে তিনি স্বাধীন শাসন কায়েম করেন। মধ্যযুগের লেখক হাসান নিজামি কুতুবের ন্যায়পরায়ণতা ও কর্তব্যবোধের প্রশংসা করেছেন। দানশীলতার জন্য তিনি ‘লাখবক্স’ বা লক্ষদাতার খ্যাতি অর্জন করেন।
দিল্লি ও আজমিরে তিনি ‘কুয়াত-উল- ইসলাম’ এবং ‘আড়হাই-দিন-কা ঝোপড়া’ নামে দুটি মসজিদও নির্মাণ করেন। বিখ্যাত কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ তাঁর আমলেই শুরু হয়েছিল। ড. এ. বি. এম. ঘাবিবুল্লাহ কুতুবউদ্দিনের চরিত্রে তুর্কি ও পারসিক ধারার সমন্বয় ঘটেছে বলে মনে করেন। বস্তুত, তুর্কি জাতির নির্ভীকতা এবং পারসিকদের উদারতার সমন্বয়ে কুতুবউদ্দিন যে শক্তি ও মনের অধিকারী হয়েছিলেন তা তাঁকে ভারতবর্ষে নতুন সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন কাজে যথাযথভাবে পরিচালিত করেছিল। তবে কুতুবউদ্দিন সম্পর্কে নানা ধরনের বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে।
তিনি আদৌ স্বাধীন শাসক ছিলেন কিনা সে প্রশ্নও কেউ কেউ তুলে থাকেন। তাঁকে দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আখ্যা দেবার ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকগণ একমত নন। তবে একথাটি স্বীকার করতেই হবে, ভারতে বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে মুক্ত স্বাধীন সুলতানি প্রতিষ্ঠার পথ কুতুবউদ্দিনই প্রশস্ত করে গিয়েছেন। এই বিচারে দিল্লির মুসলিম রাজ্যের প্রধান স্থপতি বলা যায় কুতুবউদ্দিন আইবককে।

সারসংক্ষেপ
দিল্লি সুলতানি প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বের তুর্কি সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২১০ খ্রিস্টাব্দ (মতান্তর ১২১২খ্রি:) পর্যন্ত রাজত্ব করেন। কুতুবউদ্দিনের জীবন শুরু হয় ক্রীতদাস হিসেবে। দেখতে কুৎসিত হলেও গুণবিচারে তিনি যথেষ্ট আকর্ষণীয় ছিলেন।
কুতুবউদ্দিনের রাজ্য পশ্চিমে লাহোর হতে পূর্বে বাংলা এবংউত্তরে দিল্লি হতে দক্ষিণে গুজরাট ও কালিঞ্জর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্ভবত কুতুবউদ্দিনই গজনীর সার্বভৌম ক্ষমতা থেকে ভারতভূমিকে মুক্ত করে স্বাধীন সুলতানি সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচনা করেন। তাই তাঁকেই দিল্লি সালতানাতের প্রধান স্থপতি হিসেবে অনেকেই আখ্যা দেন। এ কথাটি একান্তই সত্য যে, সামান্যক্রীতদাস থেকে ভারতের অধীশ্বরের আসনে অধিষ্ঠিত হবার অনন্য কৃতিত্বে কুতুবউদ্দিন আলোকিত।
