আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ

আজকে আমরা আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ সম্পর্কে আলোচনা করবো,  যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর অন্তর্ভুক্ত।

সব কালের সব যুগের সব দেশের যুগান্তকারী ঘটনাবলীর ন্যায় লাহোর প্রস্তাবও একটা নুতন ইতিহাসের সৃষ্টি করিয়াছে । বিরুদ্ধ পরিবেশে মানবের দেহ মন ও মস্তিষ্কের উন্নতি ও পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। মানুষ পরিবেশের মধ একদা আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণও স্বীকার করেন। বিরুদ্ধ পরিবেশে পূর্ণ ইসলামিক মনোভাব এবং সমাজ বিধান গড়ে তোলা সব নয় ।

ভারতে মুসলমানগণ বহু শতাব্দীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হইতে এই মহাসত্য উপলব্ধি করিয়াই বিরুদ্ধ পরিবেশ বা দারুল হরবের পরিবর্তে ইসলামিক পরিবেশ বা দারুল ইসলাম কায়েম করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল। কিন্তু পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হইলেও শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের জন্য প্রতিষ্ঠিত করিবার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা প্রভাবান্বিত ইসলাম বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা তাহাদের ছিল না।

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ
আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ

 

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ

 

“বর্তমানে ধৰ্ম্ম অর্থে কতকগুলো ধর্মমত ও নীতিতে অন্ধ বিশ্বাস এবং আনুষ্ঠানিক উপাসনা বুঝায়। এর সাথে মানুষের বাস্তব ও বস্তু জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু বর্তমান সভ্যজগৎ ধর্ম সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে ধর্ম সম্পর্কে ইসলামের ধারণা তা হ’তে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র আধুনিক যুগে ধৰ্ম্ম হলো সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ব্যাপার এবং এটা শুধু আমার অস্তিত্ব এবং তার সাথে মানুষের সম্পর্ক নিয়েই বাস্ত এবং মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য ধর্মের আওতার বাইরে।

বর্তমানে বন্ধু জগৎ হতে সম্পর্কহীনভাবে ধর্ম নিছক পারলৌকিক বিশ্বাস ও চিন্তাভাবনার ব্যাপার। ইহকাল রাষ্ট্রের উপর এবং পরকাল ধর্মের উপর নাও। ব্যক্তি জীবন স্রষ্টার এবং সমাজ জীবন রাষ্ট্রের, ধর্ম্মের এইরূপ ধারণা এবং অর্থই এখন বিশেষ প্রচলিত এবং সার্ব্বজনীন। ”

“ধর্মে অবিশ্বাস ধর্ম সম্পর্কে এই প্রচলিত অর্থ হতেই উদ্ভুত। ধর্মের এই সাধারণ ও প্রচলিত অর্থে ইসলাম ধর্ম নয়। ইসলাম একটি সামগ্রিক মানব সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি । ইসলাম মানব জীবনের সব দিকে সুষ্ঠু ও সুন্দর সমন্বয় সাধন করে।

ইসলামের সত্যিকার স্বরূপ উপলব্ধি এবং জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ মানুষের চিরন্তন সুখ, শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তি নিয়ে আসে এবং আদর্শ সভ্যতা ও মানব গোষ্ঠি গড়ে তোলে। কিন্তু ইসলাম অন্যান্য মতবাদের ন্যায় মানুষকে নিজের ঘুসীমত গড়ে না তুলে, স্রষ্টার ইচ্ছা এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি অনুসারেই গড়ে তোলে। কারণ, শুধু মানুষের তৈরী উপায় ও পদ্ধতি দ্বারা মানবজীবন গড়ে তুলবার প্রচেষ্টা কোনক্রমেই সৰ্ব্বাঙ্গীন সুন্দর হতে পারে না।”

“ইসলাম বৈজ্ঞানিক উপায় ও পদ্ধতিকে স্বীকার করে কিন্তু মানুষের গড়া বৈজ্ঞানিক উপায়, পদ্ধতি ও সমাধান চরম সত্তা ও পরিপূর্ণ হতে পারে না। তাই ইসলাম বিশ্ব পালনের বৈজ্ঞানিক ও বস্তুবাদী উপায় ও পদ্ধতির সাথে আরার উপায় ও পদ্ধতির এবং মানুষের মনের ও সমাজের ভিতর অহরহ বিপরিতমুখি গতি ও প্রবৃত্তির যে লড়াই হচ্ছে তার সমন্বয় সাধন করে। সমন্বয়েই শাস্তি। অতএব সৃষ্টির শেষ উদ্দেশ্য শান্তি- চিরন্তন শান্তি একমাত্র ইসলামই আনতে পারে। তাই তার নাম ইসলাম-শান্তির ধর্ম।”

“খোলাফায়ে রাশেদার পর হইতে মানবের প্রতি আশির্বাদ স্বরূপ ইসলামকে ব্যক্তি, দল ও শ্রেণী বিশেষের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ভুল ব্যাখ্যা করা এবং অন্যায় ও অসাধুভাবে কাজে লাগানো হইতেছে। খেলাফৎ বা আত্মার প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা সুলতানাৎ বা রাজতন্ত্রে পরিণত হইয়াছে এবং ফলে দুনিয়ার কোথায়ও সত্যিকার ইসলামিক রাষ্ট্র ও প্রাণবন্ত সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান নাই।”

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থতি বিবেচনা পূর্ব্বক পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে যে, পাকিস্তান ইসলামের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপ দান করিতে না পারিলে আগামী কয়েক শতাব্দীর ভিতর ইসলামের প্রসার ও প্রচারের কোন সম্ভাবনা নাই। এদিক দিয়া আমাদের ব্যর্থতা কমিউনিজমের ব্যাপক প্রসার ও প্রতিষ্ঠার পথই সুগম করিয়া দিবে।

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ
আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ

 

 

সুতরাং পূর্ব্ব পাকিস্তানের সংগ্রামী বা জেহাদী জনগণ ইসলামের নাম ও ইচ্ছ ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের প্রসার প্রচারের জন্য কোন মতেই বরদাস্ত করিবে না। পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বা সত্যিকার মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছে।

ইসলামের পরিভাষায় মুসলিম রাষ্ট্রকে খেলাফ বা আত্মার প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র বলে। পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহ তালার উপর খেলাফ বা ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা ন্যস্ত। আল্লাহ তালার প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের হাতেই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা ন্যস্ত রহিয়াছে। যখন কোন রাষ্ট্রে আল্লাহ এবং আল্লার প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের সাৰ্ব্বভৌমত্ব কায়েম হয় তখনই সেই রাষ্ট্রকে খেলাফৎ বা ইসলামী রাষ্ট্র বলা চলে।

সুতরাং পাকিস্তান বৃটিশ কমনওয়েলথের বাহিরে একটি পূর্ণ স্বাধীন ও সার্ব্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র হইবে। বিরুদ্ধ পরিবেশের ভিতর যতদিন না পাকিস্তানে স্বাধীন ও সার্বভৌম ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র কায়েম হইবে ততদিন প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর পক্ষে জেহাদ বা সংগ্রাম করা অপরিহার্য কর্তব্য।

জেহাদের অবস্থায় গাজী বা বিজয়ী এবং শহীদ বা মৃত্যু ছাড়া মুজাহিদের সামনে তৃতীয় কোন পথ খোলা নাই। এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হইয়া দেশের স্বাধীনতা বা সাৰ্ব্বভৌমত্ব কারেন হইবার পর কোন ব্যক্তি, দল, জাতি বা শ্রেণীবিশেষের প্রাধান্য বা প্রভুত্ব কায়েম না হইয়া যাহাতে আত্মার নিয়ম এবং আল্লার প্রতিনিধি জনগণের সার্বভৌমত্ব কায়েম হয় তাহার জন্য প্রত্যেক মুসলিমকে অবিরাম জেহাদ বা সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে হইবে এবং আল্লার নিয়মের এবং জনগণের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব খর্ব করার প্রত্যেক প্রচেষ্টাকে সর্ব্বান্তঃকরণে এবং সর্ব্বশক্তি প্রয়োগে রোধ করিতে হইবে।

পবিত্র কোরআনে বলা হইয়াছে “আল্লাহ সরকারের দায়িত্ব পালন করার গুরুভার উপযুক্ত ব্যক্তিদের উপর অর্পণ করিবার বা আমানত রাখিবার জন্য নির্দ্দেশ করিতেছেন এবং তোমাদের ভিতর হইতে যাহারা খলিফা হইবেন তাহারা এই পবিত্র কর্তব্য ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিবে যাহা সর্ব্বোৎকৃষ্ট তাহাই আল্লাহ তোমাদের জন্য দান করেন, নিশ্চয়ই তিনি সব দেখেন এবং সব শোনেন।” এই আয়াতের প্রথম অংশে সরকারকে পবিত্র আমানত- মার রূপে বর্ণনা করিয়া জনসাধারণকে নিজেদের ভিতর হইতেই খলিফা বা রাষ্ট্রনায়কগণকে নির্ব্বাচিত করিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। “তিনি তোমাদিগকে দুনিয়ার উপর তাহার খলিফা বা প্রতিভূ হিসাবে সৃজন করিয়াছেন”।

পবিত্র কোরআনের এই বানী জনগণের হাতেই খেলাফৎ বা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করে। খলিফা বা রাষ্ট্রনায়ক এবং সরকার জনগণের দ্বারাই নির্ব্বাচিত হইবেন। অতঃপর রাষ্ট্র পরিচালনার শুরুতার শুধু উপযুক্ত, চরিত্রবান ও যোগ্য ব্যক্তিগণের হাতে অর্পন করিবার নির্দেশ ইসলামী গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট। খলিফা বা রাষ্ট্রনায়ক এবং অন্যান্য প্রতিনিধিদিগকে সততা, কর্তব্যপরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার সাথে শাসন ভার পরিচালনা করার নির্দেশের ভিতর দায়িত্ব ।

কর্তব্য পালনে অবহেলার জন্য অপসারণের ইঙ্গিত রহিয়াছে। আমাদের সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দ্বারা বর্তমান পরিবেশের আওতার বাহিরের কিছুই আমরা জানিতে শুনিতেও দেখিতে পারি না। তাই যিনি সব জানেন, দেখেন ও শোনেন সেই পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহ মানুষের সব যুগের সব দেশের সব সমস্যার সমাধান করে খেলাফ বা আল্লাহ এবং তাঁর প্রতিভূ হিসাবে জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকেই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শাসন- ব্যবস্থা বলিয়া নির্ধারিত করিয়া দিয়াছেন।

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ
আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ

 

খেলাফত বা ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে জনগণের যারা জনগণের সমষ্টিগত কল্যানের জন্যই গঠিত হইবে। সরকার সকলের জন্য, সমগ্র জাতির জন্য, সমগ্র মানব গোষ্ঠির ও সৃষ্টির সমরীগত সুখ, শান্তি, উন্নতি প্রগতি ও কল্যাণের জন্য কাজ করিবে।

পবিত্র কোরআনে মূলনীতিগুলিই লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। “মুসলমানেরা অবশ্যই সবকিছু নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা ও পরামর্শ করিয়াই করিবে”। খলিফা বা রাষ্ট্রনায়ক এমন কি নবী বা রসুলও আইন প্রণয়নের মূল উৎস ছিলেন না। রসুলে করিমকে রাষ্ট্র কার্য পরিচালনার জন্য জনগণের সহিত পরামর্শ করিবার জন্য নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। ‘মজলিশ-ই-তরা’ বা উপদেষ্টা সতা খলিফাদের পরামর্শ দিতেন।

রসুলে করিমও তাঁহার সাহাবীদের মূল্যবান এ জ্ঞানগত উপদেশ গ্রহণ করিতেন। বর্তমানে মন্ত্রীসভাই রাষ্ট্রনায়ককে উপদেশ দিবেন। রসুলে করিম ও খোলাফা-এ- রাশেদার যুগে মদিনার মসজিদে সবাইকে চীৎকার করিয়া জমায়েত করা হইত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করা হইত।

বর্তমান গণভোট মারফত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত গ্রহণ করিতে হইবে। তবে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের দ্বারা নির্বাচিত আইন সভার মধ্যস্থতায়ই আইন প্রণয়ন করা হইবে । কিন্তু সৰ্ব্বদাই এ বিষয়ে দৃষ্টি সজাগ রাখিতে হইবে যে জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি যাহারা নন তাহাদের হয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পণ করিলে জনগণের সর্ব্বোভৌমত্ব ও অধিকার ধর্ম করা হয়।

সাৰ্ব্বজনীন প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনেই জনসাধারণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্ব্বাচিত হইতে পারেন, অবশ্য ইনি সেই নির্বাচনে অর্থ, সামাজিক অবস্থা, রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা কিংবা অস্ত্রশস্ত্রের হস্তক্ষেপ না থাকে। অনুরূপ অবাধ সার্বজনীন প্রতিনিধিত্বমূলক নির্ব্বাচনে নির্ব্বাচিত জনসাধারণের প্রতিনিধিদের উপর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পরিচালনার ভার সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নাস্ত করা কর্তব্য। নির্ব্বাচক মণ্ডলীর প্রতি বিশ্বাসঘাতক প্রতিনিধিদের অপসারণের বন্দোবস্ত করিয় নির্বাচন ব্যবস্থা অধিকতর প্রতিনিধিত্বমূলক করিতে হইবে।

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ
আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর মুখবন্ধ

 

আল্লাহ তালার সার্ব্বভৌম ক্ষমতা ও প্রভূত্ব মানুষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে । কোন খলিফা ব রাষ্ট্রনায়ক এমন কি নবী বা রসুলও আল্লার দেওয়া মূল নিয়ম ও নীতির পরিবর্তন করিতে সক্ষম ছিলেন না। এখন এবং ভবিষ্যতেও কেউ সক্ষম হইবেনা। পবিত্র কোরআন ও ছহি হাদিসে বর্ণিত মুল নিয়ম ও নীতির সহিত সমা রক্ষা করিয়াই নূতন আইন প্রনয়ণ করিতে হইবে।

পবিত্র কোরআন, ছহি হাদিস, খোলাফা-এ-রাশেদা ও ইজতেহাদকে ভিত্তি করিয়া গড়িয়া উঠা মানুষের অর্জিত জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যই হইবে ইসলামী আইনের মূল বুনিয়াদ ইজতেহাদ সবকাল, সরযুগ, সবদেশ ও সব অবস্থায় সব সমস্যার সমাধান করিয়া ইসলামকে যুগোপযোগী করে।

বর্তমান আইন ও আইন প্রণয়নকারীদের সম্মুখে ইজতেহাদ এক বিরাট সম্ভাবনার সূচনা করে। পবিত্র কোরআনে মৌলিক আদর্শ ও নীতি রহিয়াছে। ইহাকে ভিত্তি করিয়া যুক্তি, জ্ঞান, বিবেক, বিচার-বুদ্ধি প্রতিভা দ্বারা নূতন যুগের নূতন দেশের নূতন অবস্থার নূতন সমস্যার সুষ্ঠু ও সুন্দরতম সমাধান সম্পর্কীয় যাবতীয় আইন প্রণয়নের পূর্ণ আজসী মানুষকে দেওয়া হইয়াছে।

রব বা স্রষ্টা হিসাবেই সৃষ্টির বিশেষ করিয়া সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব মানুষের সাথে আল্লার সব চাইতে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। বস্তুতঃ রব বা স্রষ্টা, পালন বা পোষনকর্তা হিসাবে রবুবিয়াৎ বা বিশ্বপালন অর্থাৎ বিশ্ব ও সৃষ্টিকে কতকগুলি স্থায়ী ও সাধারণ বা ক্রমবিকাশ ও ক্রমোন্নতির নিয়মানুসারে এক অবস্থা হইতে অপর অবস্থার ভিতর দিয়া জাতি ধৰ্ম্ম ও বর্ণ নির্ব্বিশেষে সমগ্র মানব, পশু, পক্ষী, কীট পতঙ্গ, জীবজন্তু ও জানোয়ার, মাছগাছ, তরুলতা, এককথায় সৃষ্টির সবাইকে প্রয়োজন মত সব কিছু সরবরাহ করিয়া সমগ্র বিশ্বকে চরম সুখ, শান্তি ও পূর্ণতা প্রাপ্তির দিকে আগাইয়া নিবেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ শুধু মুসলমানের নয় জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবের। রবই আত্মার সত্যিকার পরিচয়। রব হিসাবে অনুবিয়াত বা বিশ্বপালনই তাঁর প্রথম কাজ সুতরাং দুনিয়ার উপর আল্লার খলিফা বা প্রভৃতি |প্রতিভূ হিসাবে মানব এবং খেলাফৎ হিসাবে রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান কাজ ও কর্তব্য হইবে আল্লার উপায় ও পদ্ধতি অনুসারে বিশ্বের পালন করা এবং জাতি ধর্ম ও বর্ণ নির্ব্বিশেষে মানুষের সামগ্রিক সুখ, শান্তি, উন্নতি কল্যাণ ও পূর্ণ বিকাশের জন্য চেষ্টা, সাধনা ও সংগ্রাম করা।

আল্লাহ প্রদর্শিত পথ, উপায় ও পদ্ধতি বা রব্বিয়াত অনুসারে তাঁর উদ্দেশ্য বিশ্বপালন ও পোষণ অর্থাৎ রবুরিয়াৎ এর কাজ করার নামই রব্বানিয়াৎ বা বিশ্বপালন || দিন | দীন] বা ইসলামী সমাজবাদকে ভিত্তি করিয়া মানুষের বহু শতাব্দী সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দ্বারা আমরা নিত্য নূতন সমস্যার নিত্য নূতন সমাধান খুঁজিয়া বাহির করিয়া আদর্শতম মানব গোষ্ঠি গড়িয়া তুলিব এবং দুনিয়ার উপর চিরন্তন সুখ ও শান্তি কায়েম করিব।

 

এই উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপায়িত করিতে হইলে সৰ্ব্বব্যাপারে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ও সুদৃঢ় করা প্রত্যেক মুসলীম তথা প্রত্যেক মানুষেরই অবশ্য কর্তব্য। আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে শান্তি রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা যেমন রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী হওয়া প্রত্যেক রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষেও তাই উচিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও স্থায়ী রাখার ব্যাপারে অগ্রনী [অগ্রণী হওয়া। স্বার্থে স্বার্থে সংঘাত লাগিয়া সমস্ত পৃথিবীর আবহাওয়া বর্তমানে ভারাক্রান্ত ও বিপজ্জনক হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

সম্রোজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়গুলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোড় জোড় শুরু করিয়াছে। এই তোড় জোড় প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়া বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন চিরিস্থিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমরসজ্জা ও যুদ্ধঘাটি স্থাপনের মধ্য দিয়া ।

সৈন্যদলের p, দর্শন ও অ্যাটম হাইড্রোজেন বোমার হুমকি এই প্রস্তুতির সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক আবহাওয়ায় এক মাইগ্রেস অবস্থার সৃষ্টি করিয়া তুলিয়াছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচিত এই সাম্রাজ্যবাদী ও যুযুৎসু প্রচেষ্টাকে নিরুৎসাহ করা এবং ইহার বিরুদ্ধে দৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

পৃথিবীর সমস্ত দেশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ হইতে পৃথিবীকে যুক্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানকে অংশীদার হইতে হইবে এবং শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সৰ্ব্বব্যাপী বিজয় অভিযানকে জয়যুক্ত করিবার জন্য অন্যান্য জনতার গণতান্ত্রিক ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সংগে সর্ব্বপ্রকার প্রগতিশীল ও জনকল্যানকর আন্দোলন ও কর্মধারায় সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতা করিতে হইবে। দুনিয়ার সমস্ত জালিমদের সহিত সংগ্রাম করিয়া মজলুমদিগকে মুক্ত করাই হইবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে] পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য।

পাকিস্তানে এই মূলনীতিগুলিকে কার্যকরী করিয়া তুলিতে হইলে আজ প্রয়োজন নূতন চিন্তাধারা নুতন নেতৃত্ব এবং নূতন সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতি ও কর্মসূচিকে ভিত্তি করিয়া জনগণের সত্যিকার জাতীয়। প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ বা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলার।

এই পবিত্র উদ্দেশ্য বাস্তবে রূপ দিবা [দিবার] জনাই ইং ১৯৪৯ সনের ২৩শে ও ২৪শে জুন তারিখে ঢাকার [ঢাকায়] অনুষ্ঠিত পূর্ব্ব পাকিস্তান মুসলীম লীগ কর্মী সম্মেলনে পূৰ্ব্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠন কমিটি গঠিত হয়। সেই অবধি পূর্ব্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ সকল শ্রেণীর জনগণের দাবী দাওয়া অভাব অভিযোগ পূরণ, ইসলামের দোহাই দিয়া অন্যায় অবিচার, অত্যাচার জুলুম, উৎপীড়ন, চোরা কারবার, স্বজন প্রীতি, দুর্নীতি প্রভৃতি সৰ্ব্ব প্রকার সমাজ বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং পাকিস্তানকে সত্যিকার ইসলামী পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র বা দারুল ইসলাম হিসাবে গড়িয়া তুলিবার জন্য বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন করিয়া আসিতেছে এবং দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করিতেছে যে এই গুরুদায়িত্ব, মহান ও পবিত্র কর্তব্যকে বাস্তবে রূপায়িত করিবার জন্য পূর্ব্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ অবিরাম সংগ্রাম চালাইয়া যাইবে।

পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ আরও মনে করে যে অস্পষ্ট ও অনির্ধারিত নীতির ধুয়া তুলিয়া জনসাধারণের ভাব প্রবণতার অযথা সুযোগ গ্রহণ করিবার ফলেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দুর্ব্বিপাক দেখা দিয়াছে। জনগণ শোচনীয়ভাবে প্রতারিত হইয়াছে এবং সর্ব্বত্র ব্যার্থতার ভাব দেখা দিয়াছে। অতএব পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ মনে করে যে, পূর্ব্ব পাকিস্তানের জনগণের জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক, নৈতিক সামাজিক বুদ্ধিগত রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক উন্নয়নের ব্যাপারে পাকিস্তান কিরূপ কার্য্যপন্থা বা কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা করা হইয়াছে তাহা সুষ্পষ্টভাবে ব্যক্ত করিবার সময় আসিয়াছে।

এইরূপে সুনির্দিষ্টভাবে নীতি ব্যক্ত করিলে শুধু যে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সময় মুসলিম সমাজ অনুপ্রাণিত হইয়া উঠিবে তাহাই নহে ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্র সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা পোষণকারী লক্ষ লক্ষ অমুসলিমদের অন্ধ ধারনা অহেতুক ভীতি জড়িত মন ও প্রাগেও ইহা পুনরায় আশা ও আস্থার সকার করিবে।

আমরা জনগণের দাবীর এই সনদ পাকিস্তান গণ পরিষদের সামনে পেশ করিতেছি। তাহারা যেন ইহা গ্রহণ করেন। সর্ব্বসাধারন যাহাতে আলোচনা ও মতামত প্রকাশ, সমর্থন সংশোধন ও যোগদান করিয়া আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ ও সাবদ্ধ ভাবে আন্দোলন করিতে পারেন তাহার জন্য ইহা আমরা সর্ব্বসাধারনের সমক্ষেও প্রকাশ করিতেছি। এই সনদ আমাদের জনগণ এবং সরকারের সামনে পেশ করিবার প্রাক্কালে আমরা সরল বিশ্বাসের সহিত এই আশা পোষণ করি যে, ইহা শুধু ভাবী কালের মুক্তি ও স্বাধীনতার সনদ রূপেই গৃহীত হইবেনা ইহা আজিকার সব চাইতে বড় প্রয়োজন ও একমাত্র কর্মপদ্ধতি রূপেই পরিগণিত হইবে।

Leave a Comment