বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রের প্রস্তাবনা

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রের প্রস্তাবনা। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রের প্রস্তাবনা

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রের প্রস্তাবনা

 

বাংলাদেশের বিপ্লবী গণমানুষের বিজয়ের অক্ষয় গৌরবের প্রতীক স্বরূপ স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বিশ্বের সকল স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণা যোগাইতে থাকিবে । একটি মহান লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই দেশের সংগ্রামী মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক তদানীন্তন পুলিশ, ই.পি.আর. এবং সশস্ত্র বাহিনী-বাঙালী যুবকগণ সেই দিন ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর শোষণ এবং বর্বর হামলার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিয়াছিল। সেই মহান লক্ষ্য হইল তথা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা,

বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত এই চার মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত এক শোষণমুক্ত সমাজ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের গৌরব এবং দেশ ও বাঙালী জাতির পরম সৌভাগ্য এই যে সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়িয়াছিল বঙ্গবন্ধুর উপর-আওয়ামী লীগের উপর। যুদ্ধ শেষ হইয়াছে। কিন্তু বিপ্লব এবং বিপ্লবের ন্যস্ত কর্তব্যগুলি শেষ হয় নাই ।

বাংলাদেশ আজ বিধ্বস্ত-লুণ্ঠিত। বিধ্বস্ত ঘর-বাড়ী, ভস্মীভূত হাট-বাজার, ধ্বংসকৃত পুল, সড়ক, নগর-বন্দর ও পোতাশ্রয়। পরিত্যক্ত খেত-খামার নিস্তব্ধ কল-কারখানা, নির্জীব কুটির শিল্প অপদস্ত মসজিদ-মন্দির, স্কুল-কলেজ, বিরান সংসার-দিকে দিকে লক্ষ-কোটি অন্নহীন, বস্ত্রহীন, স্বাস্থ্যহীন, নারী, শিশু, বেকার ও বিকলাংগের আর্তনাদ। স্বাধীনতার লগ্নে এই সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা এবং ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়াইয়া দেশ ও জাতির প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হইতে হইয়াছে। আজকের বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসাবে গড়িয়া তোলার, একটি শোষণমুক্ত নূতনসমাজ গড়িয়া তোলার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করিবার কর্মসূচী গ্রহণ করিতে হইতেছে।

ইতিহাসের ন্যস্ত এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে জনশক্তিই আমাদের প্রধান সম্বল। সেই জনশক্তির উপর আসিয়াছে চরম আঘাত-ধ্বংস। কিন্তু আমরা নিরাশ হই নাই। নিরাশ হইবার কারণও নাই। কেন না যে জাতি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত এবং সুগঠিত ইয়াহিয়ার সেনা বাহিনীকে পরাস্ত করিবার দুরা-তিক্রম্য সকল বাধা, বিপত্তি লংঘন করিতে সক্ষম হইয়াছে; সেই অপরাজেয় বাংলার মানুষ জাতীয় পুনর্গঠনের সকল প্রকার চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায়ও সক্ষম হইবে।

 

আওয়ামী লীগ সামাজিক বিপ্লবের পথ ধরিয়া অগ্রসর হইয়াছে। বাস্তব অবস্থার উপর ভিত্তি করিয়াই আমরা দেশবাসীকে প্রতিশ্রতি দিতেছি। কঠিন বাস্তব অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়াইয়া আমরা উপলব্ধি করিয়াছি জনগণ চায় সমাজ-ব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তাহারা এমন একটি নূতন সমাজ চায় যে সমাজ হবে সকল প্রকার অনাচার, অত্যাচার, বৈষম্য এবং শোষণ থেকে মুক্ত। যে সমাজ গঠনে তাহাদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা এবং ন্যায্য স্বার্থও থাকিবে। যে সমাজে তাহাদের বংশধরদের ভবিষ্যতও হইবে সুনিশ্চিত।

সংগ্রামের মধ্য দিয়াই আওয়ামী লীগের অগ্রগতি। চরম নির্যাতনের মুখেও আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন হইতেই ইহার বঞ্চিত, শোষিত এবং লাঞ্ছিত মানুষের মধ্যেই আওয়ামী লীগের জন্য এবং তাহাদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনের নেতা ও কর্মীবৃন্দ এই শোষিত ও লাঞ্ছিত মানুষের পাশে দাঁড়াইয়া তাহাদের দুঃখ-দুর্দশার অংশীদার হইয়া ক্ষমতাসীন শোষক ও অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়াছে। বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাশীল, নির্ভীক এবং সংগ্রামী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলার মানুষকে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে এবং একটি জাতি হিসাবে নিজেদের ঐতিহ্য এবং স্বতা প্রতিষ্ঠা করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছে।

এই কারণেই সাড়ে সাত কোটি বাঙালী আওয়ামী লীগকে বুকে টানিয়া লইয়াছে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কবল হইতে দেশ মাতৃকার মুক্তি এবং নিজেদের ভবিষ্যত গড়িয়া তোলার মাধ্যম হিসাবে। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সাফল্য, আওয়ামী লীগের প্রতি বাংলার গণমানুষের এই বিশ্বাস এবং ভরসা প্রমাণ করিয়াছে। আবার ১৯৭১ সনের মার্চ মাসের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন এবং ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ও মুক্তির ঐতিহাসিক আহ্বানে বাংলাদেশের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সাফল্য ও বাংলাদেশের গণমানুষের এই অবিচল আস্থার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করিতেছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সাফল্যের ইতিহাস জাতীয়তাবাদের নীতিতে উদ্বুদ্ধ বাঙ্গালী জাতির সার্থক ঐক্যের অক্ষয় ইতিহাস। সেই ইতিহাস সৃষ্টি করিয়াছে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীগণ তাই সংগত কারণেই আওয়ামী লীগ আজ গর্ববোধ করিতে পারে যে, সেই ইতিহাসের পরিণতিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালী জাতির যুগ যুগ সঞ্চিত মুক্তির বাসনা চরিতার্থ করিতে সক্ষম হইয়াছে।

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রের প্রস্তাবনা

 

কিন্তু লক্ষ লক্ষ শহীদানের অঢেল রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা রক্ষা করা, উহাকে সার্থক ও সুদৃঢ় করিবার কার্যক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের বিশেষ দায়িত্ব রহিয়াছে। তাই পুনরায় আমাদের উৎসর্গ করিতে হইবে নিজেদেরকে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি নীতির উপর এক শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মাতৃভূমিকে সোনার বাংলায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিব। কেননা এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করিবার উদ্দেশ্যেই আমাদের লক্ষ লক্ষ ভাই-বোনের নিজেদের জীবন দান করিয়াছেন- শহীদ হইয়াছেন।

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আমরা সচেতন। কিন্তু শত্রুদের প্রতিরোধে ও বাংলাদেশ গড়ার জাতীয় কর্মসূচীতে বাংলার গণমানুষের অপরাজেয় শক্তির প্রতি আমরা আস্থাশীল। তাই দেশবাসীর আশা-ভরসার প্রতীক আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সহকর্মীদের কর্মশক্তি ও দেশাত্মবোধের উপর আস্থা রাখিয়া আমরা আমাদের দলীয় ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচী উপস্থাপিত করিতেছি।

Leave a Comment