জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ  এবং ৭ই মে তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ  এবং ৭ই মে তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন । যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ 

এবং ৭ই মে তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন

 

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ  এবং ৭ই মে তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন

 

সংগ্রামী সহযোদ্ধাগণ,

আপনারা সকলেই জানেন, ২১শে মার্চ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি এরশাদের ভাষণে বিরোধী দল সম্পর্কে উক্তিসমূহ ছিল। ন্যক্কারজনকভাবে উস্কানিমূলক। তাঁর ভাষণে বিরোধী রাজনৈতিক জোট ও দলসমূহের কতিপয় নারী শর্ত সাপেক্ষে পুরণের কথা থাকলেও কিছু দাবী ছিল অপূর্ণ।

১৫ দলীয় ঐক্যজোট জেঃ এরশাদের ভাষণের অব্যহিত পরে ভাষণের কলে সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং বিরাজমান বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে জরুরী ভিত্তিতে বৈঠক-এ মিলিও হয়। একই সময় ৭ দলীয় ঐক্যজোট এবং জামাতে ইসলামীও একই উদ্দেশ্যে বৈঠকে বসে।

দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট, ৭ দলীয় ঐক্যজোট এবং জামাতে ইসলামী প্রেসিডেন্টের ঘোষণা কার্যকর করা হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২২শে মার্চের পূর্বঘোষিত হরতালের কর্মসূচী অপরিবর্তিত রাখা হয়।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমসমূহে পরদিন ১৫ দলীয় ঐক্যজোট, ৭ দলীয় একাজোট ও জামাতে ইসলামীর এ সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়।

বস্তুতঃ রক্তস্নাত জাতীয় নারী ৫ দফার মর্মবাণী ছিল সামরিক শাসনের চির অবসানের মাধ্যমে সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমত হস্তান্তরের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার তথা জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

বলাছিল, নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদ সাংবিধানিক প্রশ্নের সমাধান করবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোন সামরিক সরকারই গণ-প্রতিনিধিত্বশীল সার্বভৌম সংসদ চায় না। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে আমরা জাতীয় দাবী ৫ দফা আদায়ের লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন সমা করেছি। এ সংগ্রামে বহু রক্ত করেছে।

জাতি আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সর্বাগ্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ও পরবর্তিতে একই দিনে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের এরশাদের পাঁয়তারা ব্যর্থ করে দিয়ে সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবী মেনে নিতে তাঁকে বাধ্য করে। জেঃ এরশাদের ঘোষিত ‘৮৪-র উপজেলা নির্বাচন ছাত্র-জন বুকের রক্ত দিয়ে প্রতিহত করে। সরকারকে নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করতে হয়।

৮৫ সালে এরশাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও তার পরবর্তী আচার-আচরণ এ কথা সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণ করেছে যে, বিরোধী দল ও জোটগুলোকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দিয়ে এরশাদ কোনরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে আদৌ আন্তরিক ছিলেন না।

তাই একতরফাভাবে ৮৫ সালের ঘোষিত নির্বাচন স্থগিত করে তার ক্ষমতার ভীত রচনার মানসে সমস্ত রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেন এবং তথাকথিত গণভোট ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রহসনের আয়োজন করেন এবং এ বাহানায় উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনে তাঁর দলীয় লোকদের ক্ষমতায় বসিয়ে একটা অবস্থার সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

একই কায়দায় এবারও প্রেসিডেন্ট এরশাদ তাঁর ২রা মার্চের ভাষণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি বিরোধী দল ও জোট নির্বাচনে অংশ নিলে ‘৮৫ সালে ঘোষিত সুযোগ-সুবিধার অনুরূপ সুযোগ- সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। পনের দল প্রেসিডেন্টের ঘোষণাকে অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট আখ্যায়িত করে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবী করে ।

তিনি আমাদের দাবীকে পাশ কাটিয়ে তার নীলনক্সার নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বলতে শুনে করলেন : ‘এক আল্লাহ ছাড়া নির্বাচনের ঘোষিত তারিখ পরিবর্তনের সাধ্য কারো নেই। একই সাথে তিনি বতেন । আমি জীবিত থাকতে এই তারিখ আর কেউ বদলাতে পারবেনা। অর্থাৎ ছাব্বিশে এপ্রিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেই।

আমরা বিরোধী দল গুলো ২২শে মার্চ পূর্ণ দিবস হরতাল পালনের কর্মসূচী নিয়ে আসর হলাম। আন্দোলনের মুখে এরশাদ তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন। একুশে মার্চের ভাষণে তিনি নির্বাচনী, মন্ত্রীসভা হতে নির্বাচনপ্রার্থী মন্ত্রীদের পদত্যাগ, আঞ্চলিক, উপ-আঞ্চলিক ও জেলা সামরিক আইন প্রশাসকের পদ ও অফিস এবং সামরিক আদালত বিলুপ্তি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানসহ প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত কোন দল বা শক্তি নির্বাচনী প্রচার কার্যে সরকারী সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার না করার কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি ঘোষণা দিলেন।

পাঁচ দফা আদায়ের লক্ষ্য হিসাবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী চ্যালের গ্রহণ করলাম। আপনারা জানেন, আওয়ামী লীগ তার দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের সংগ্রাম ও আন্দোলনের বাঁকে বাঁকে চুয়ান্ন এবং সত্তরে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ব্যালট বিপ্লব সংঘটিত করেছে। সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠার দাবীতেই আমরা আন্দোলন করে আসছিলাম এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যয় নিয়েই আমরা নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম।

এছাড়া এরশাদ সরকার বিরোধী জোট ও দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ না দিয়ে পাকিস্তানী টাইলে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তার নীলনক্সা বাস্তবায়ন করার প্রয়াসে লিপ্ত ছিলেন। এ উদ্দেশ্য কার্যকর করার জন্য তিনি পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাথে মিলিত হতে শুরু করলেন এবং এসব খবর রেডিও, (টেলিভিশনসহ জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলো সচিত্র প্রচার ও প্রকাশ করতে লাগলো। ২০শে মার্চ প্রতিটি রোগা ও উপজেলায় সেনাবাহিনী, বিডিআর এবং পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হলো।

আওয়ামী লীগ এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আপামর জনতাকে সাথে নিয়ে সংগ্রাম করে এদেশ স্বাধীন করেছে। একটি দায়িত্বশীল জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে আমরা সমস্ত বিষয় বিচার বিবেচনা করলাম। বিবেচনায় আনলাম তথাকথিত গণভোট ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রহসন এবং সে-সব গ্রহসনমূলক নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচী এবং সফলতা বিফলতার বিষয়সমূহ। আমরা বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করলাম আন্দোলন ও সংগ্রামের গণ সম্পৃক্ততার স্তর।

আমাদের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত যে নির্ভুল ছিল, তা আজ বাস্তব ও স্বীকৃত সত্য। দুর্ভাগ্যজনক যে, সেদিন আমাদের ঐকান্তিক প্রয়াস সত্ত্বেও দলীয় ঐক্যজোট এবং পনের দলীয় ঐক্যজোটের কিছু শরীকদল জাতীয় দারী পাঁচ দফা আদায়ের এ নবতর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করে নিজেদের গৃহীত সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে নির্বাচনবিরোধী অবস্থান গ্রহন করল।

তারা তাদের প্রচার-প্রচারনা ও সমস্ত কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগসহ পনর দলীয় নির্বাচনী জোটের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে স্বৈরাচারের হাতকেই শক্তিশালী করল। এতদসত্ত্বেও আমরা পূর্বোক্ত সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে শরীক করতে সমস্ত শক্তি নিয়ে সচেষ্ট রইলাম। সাত দলীয় ঐক্যজোট ১২০টি আসনে এবং পনর দলীয় ঐক্যজোট ১৮০টি আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে গড়তে প্রথমে স্বীকৃত হয়েও অজানা কারণে পরে সরে দাঁড়ালো।

আমরা ২৪শে মার্চ আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী বোর্ড গঠন করলাম। ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিশাল গণ-মিছিল অনুষ্ঠিত হলো।

৪ঠা এপ্রিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ সংক্রান্ত মত বিনিময় হলো। আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় ঐক্যজোট ১৮০টি আসন এবং বিএনপিসহ ৭ দলীয় ঐক্যজোট ১২০টি আসনে নির্বাচন করবে- এ কথায় প্রথমে রাজী হয়েও অদৃশ্য সুতোর টানে তারা ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করল। ৬ই এপ্রিল মনোনয়নপত্র ।৮ই এপ্রিল ১৫ দলীয় জোট গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি কর্তৃক নির্বাচন বানচালের চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বিবৃত্তি প্রদান কর।

১২ই এপ্রিল আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় ঐক্যজোট নির্বাচনী মোর্চা গঠন করে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করল। ১৩ই এপ্রিল ১৫ দলীয় মোর্চা সরকারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতার ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগ এনে বিবৃতি প্রদান কাল। আর আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে নির্বাচনে কারচুপি প্রতিরোধের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হলো।

২৩শে এপ্রিল নির্বাচনী মোর্চার উদ্যোগে স্টেডিয়াম সেইটে অনুষ্ঠিত হলো জা ২৬শে এপ্রিল আওয়ামী লীগ জাতির সামনে দলের নির্বাচনী বক্তব্য ঘোষণা করল। ২৮শে এপ্রিল আওয়ামী শ্রীগদলীয় সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য রবিউল আউয়াল কিরণ দুষ্কৃতিকারীদের হাতে নিহত হলেন। ২৯শে এপ্রিল ১৫ দলীয় নির্বাচনী মোর্চা নির্বাচনী ঘোষণাপত্র প্রকাশ করল। এ ঘোষণায় রক্তপাত জ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ঘোষণা করা হলো।

জাতীয় সংসদের নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসতে থাকল, ততই সারা বাংলায় প্রতিটি নির্বাচনী । আওয়ামী লীগ তথা ১৫ দলীয় জোটের প্রার্থী ও নৌকা প্রতীকের পক্ষে অভূতপূর্ব নির্বাচনী জোয়ার সৃষ্টি হলো। স্বৈর- সামরিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক শাসন তথা জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার এ নির্বাচনী লড়াই-এ দেশের আপামর জনতা ঐক্যবদ্ধ হলো।

জনতার এ অচিন্তনীয় জাগরণ দেখে এরশাদশাহী প্রমাদ গুনল। তারা বুঝতে পেল, নির্বাচনের ন্যূনতম সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকলে গণতান্ত্রিক শক্তি তথা আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় প্রার্থীরা দুশিতের অধিক আসনে নিশ্চিতভাবে বিজয়ী হবেন। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা হতে সরকারী গোয়েন্দা বাহিনীসহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদেও সামরিক সরকার এরশাদের সাধের জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের করুণ চিত্র দেখতে পেল।

এলাকায় স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার নির্বাচনে জনতার রায় বানচাল করে দেয়ার বহুমুখী যড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। বিভিন্ন সেনাছাউনিগুলোতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের তলব করে নিয়ে নির্বাচনের ফল জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে ছিনতাই করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হলো।

স্তুতঃ ১লা মে তারিখ হতে সারা দেশে ব্যাপক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হলো। প্রকাশ্যে বেআইনী অস্ত্রের মহড়া চললো। জায়গায় জায়গায় বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের ব্যাপকভাবে গ্রেফতার করতে শুরু করে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় জনমনে আতংক সৃষ্টি করা হলো।

৫ই মে হতে প্রতিটি উপজেলা” সদরে সেনাবাহিনীর জোয়ান ও অফিসারগণ গিয়ে হাজির হলো। জোয়ানরা রাস্তায় রাস্তায় টহল দিল। জাতীয় পার্টির নির্বাচনপ্রার্থী মাসেলম্যান ও ভাড়াটিয়া সমর্থকদের সাথে বিশেষ বাহিনীর লোক, প্রশাসন ও পুলিশদের দহরম মহরম। জনসমক্ষে নম্রভাবে প্রকাশ পেল।

প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একটা থমথমে ভাব। একদিকে ভোটারদের স্বৈরাচারবিরোধী প্রার্থী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রদানের দৃঢ় প্রত্যয়, অন্যদিকে বিশেষ বাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারী দলের গুণ্ডাবাহিনীর সন্ত্রাসের ফলে ৭ই মে ‘৮৬, বস্তুতঃ ৫ই মে দিনগত রাত হতেই, প্রায় প্রতিটি।

নির্বাচন এলাকাকে এক একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হলো। বেআইনী পিস্তল, স্টেনগান, রাইফেল, এস, এল, আর এবং হাতবোমা ও গ্রেনেড বিস্ফোরণে গ্রামবাসী ভয়ে কেঁপে উঠলো। এমনটি তারা আগে আর দেখেনি, শুনেনি। ভোর না হতেই শুরু হলো কমাণ্ডো অপারেশন।

ট্রাকবোঝাই, জীপভর্তি বেআইনী আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, কিরিছ, লাঠি নিয়ে সরকারী গুণ্ডা বাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় জাতীয় পার্টির মাসেলম্যান, ভাড়াটে গুণ্ডারা একটির পর একটি ভোট কেন্দ্র দখল করে অস্ত্রের মুখে ব্যালট বই কেড়ে নিয়ে লাংগল প্রতীকে সীল দিয়ে বাক্স ভর্তি করেছে। সারাদেশে হত্যা, বোমাবাজি, ব্যালট ডাকাতি ও সন্ত্রাসের মধ্যে ৭ই মে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

সন্ধ্যা হতে শুরু হলো রেডিও, টেলিভিশন হতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা। প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেল, বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। ৮ তারিখ দুপুর পর্যন্ত ধীর লয়ে ফলাফল প্রচার অব্যাহত রাখা হলো। দেখা গেল, এত সন্ত্রাস ও ডাকাতির মাঝেও বিরোধী দলের বহু প্রার্থী জয়লাভ করেছেন এবং ফলাফলের ধারা দেখে স্পষ্ট ধরা পড়ল যে, সরকারবিরোধী প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হতে চলেছেন।

এমনি সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে কোনরূপ কারণ ব্যাখ্যা না করে হঠাৎ করে জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রগুলো। নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেয়া হলো। সারা জাতি ও বিশ্ব বিস্ময়ে হতবাক হলো। দীর্ঘ ত্রিশ ঘণ্টা ফলাফল ঘোষণা বন্ধ রইলো। ফলাফল ঘোষণা বন্ধের আগে বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের ৫৬টিতে বিজয়ী ঘোষণা করে পরক্ষণে তা ৫৩ বলে ঘোষণা করা হলো।

তারিখে নির্বাচনে ৮ই মে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সংবাদ সম্মেলন করলো। ৯ই মে কারচুপি, সন্ত্রাস ও মিডিয়া ক্যুর প্রতিবাদে ১৪ই মে হরতাল ঘোষণা করা হলো।

১০ই মে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের উদ্যোগে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো প্রতিবাদ সভা। ১২ই মে ১৫ দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী করল। ১৫ই মে ভোট ডাকাতি, সন্ত্রাস ও মিডিয়া ক্যুর প্রতিবাদে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হলো।

২০শে মে কয়েকটি স্থগিত কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় লীগসহ বিরোধীদলীয় প্রকৃত বিজয়ী প্রার্থীদের প্রায় সকলকে প্রশাসন ও বিশেষ বাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ ও , করে হারিয়ে দিল। ২৪শে মে হতে ২৮শে মে পর্যন্ত একটানা চলল আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা এবং ২৯, ৩০ এবং ৩১শে মে অনুষ্ঠিত হলো কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা।

সভার সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত ছিল : ৭ই মে’র জাতীয় সংসদ নির্বাচনে১৭, ১৮,১৯ ও আওয়ামী অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে আমাদের যে-সব প্রার্থীকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের বিজয়ী ঘোষণা করতে হবে। যে-সব নির্বাচনী এলাকায় ভোট ডাকাতি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে আমাদের প্রার্থীদের বিজয় নস্যাৎ করা হয়েছে সে-সব এলাকায় পুনঃ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ জনতার সংগ্রামী চেতনার স্তরকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। সক্ষম হয়েছে গোটা জাতিকে স্বৈর-সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতে। উন্মোচিত হয়েছে এরশাদের নগ্ন চেহারা সারা জাতি ও সমগ্র বিশ্বের কাছে।

বেসামরিক আলখেল্লাপরা সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশে আজ সুতীর ঘৃণা। এ ঘৃণার আগুন ৭ই মে পার্লামেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে শুধু মিছিল, মিটিং আর হরতালের ছক-বাঁধা আন্দোলন করে পাঁচ বছরেও স্বৈর-সরকার বিরোধী ক্ষোভ ও ঘৃণাকে এত তীব্রতর করা যেত না।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ২১শে মার্চ তারিখে গৃহীত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্তে অটল থেকে ৭ দলীয় জোটের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলে আজ বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্নতর হতে পারত।

দেশের দশ কোটি মানুষ জানে, ৭ই মে তারিখের নির্বাচনে মানুষ আওয়ামী লীগ তথা গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতীক ১৫ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেয়। সন্ত্রাস সৃষ্টি ও ভোট ডাকাতি করা না হলে ন্যূনপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে আমাদের প্রার্থীদের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত।

ভোটকেন্দ্রে ভোট ডাকাতির পরও যেটুকু গণরায় অবশিষ্ট ছিল, পরবর্তীতে মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে সে রায়কে পাল্টে দেয়া না হলেও আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হতাম। সরকার আমাদের বিজয় ছিনতাই করে তাদের অবৈধ ক্ষমতার আসন আঁকড়ে রয়েছে।

একটা জাতির গোটা জনগোষ্ঠির ধিক্কার, অনাস্থা আর ঘৃণা নিয়ে কেউ ক্ষমতার আসনে টিকে থাকতে পারে না।এরশাদও টিকে থাকতে পারবে না। স্বৈর এরশাদশাহীর পতন এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র।

১লা জুন ‘৮৬ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনোত্তর বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই বর্ধিত সভার আলোকে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা শেষে কেন্দ্রীয় ১৫ দল এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ঘোষণা করল “সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার চক্রান্ত চলছে।”

২৪শে জুন ১৫ দল এরশাদ-আহূত সংসদ অধিবেশনের দিন ১০ জুলাই সংসদ অভিযানের কর্মসূচী ঘোষণা করল। সংসদ অভিযানের কর্মসূচীর সমর্থনে ৯ই জুলাই বায়তুল মোকাররম চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে ঘোষণা করা হলো : “সামরিক আইন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ১৫ দলীয় সংসদ সদস্যগণ সংসদে বসবেন না।

” অবশ্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ইতিপূর্বে সুস্পষ্টভাবে দেশবাসী ও সরকারকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সামরিক আইনে শৃঙ্খলিত সংসদে আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যরা যেতে পারেন না।।

১০ই জুলাই ‘৮৬ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও ১৫ দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দলীয় সংসদ সদস্যগণ দলীয় নেতৃবৃন্দসহ এক বিশাল জনতার মিছিল সহকারে সংসদ অভিযানের কর্মসূচীর অংশ হিসাবে শোভাযাত্রাসহ রাজপথ প্রদক্ষিণ করে সংসদ ভবনের সামনে সমবেত হন।

জনতা রাজপথে ােগান মুখর, আর জনতার নেত্রী তাদের রায় নিয়ে শতাধিক সংসদ সদস্যসহ অবস্থান নিলেন সংসদ ভবনের প্রধান ফটকে। দেশী- বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরলেন জনতার দাবী : আর একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে সামরিক আইন তুলে নাও।

২২শে জুলাই জাতীয় সংসদের শূন্য ৮টি আসনের উপনির্বাচন ২৬শে আগষ্ট অনুষ্ঠিত হবার কথা সরকার ঘোষণা কাল। ১৫ দলের বৈঠকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। পরবর্তীতে ৭ই মে’র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ঐক্যবদ্ধভাবে উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আহ্বান জানাল। কিন্তু যতই নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে, সরকারী দলের সন্ত্রাসী তৎপরতা ততই বৃদ্ধি পেতে ৬ই আগষ্ট ভোট ডাকাতির চক্রান্ত নস্যাৎ করে উপ-নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্য দেশবাসীর প্রতি ১৫ দল বাধা প্রদান নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হলো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তানী পরোয়ানা ও হুলিয়া জারী, বাড়া বাড়ী তল্লাশী করে ব্যাপক হয়রানি শুরু হলো।

১৫ দল ও আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে সরকারকে এর পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিয়ে উপ-নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি ও সন্ত্রাস বন্ধের জন্য বারবার দাবী জানানো হলো। কিন্তু চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী। সরকার কোন রকম ন্যায়নীতি, এমনকি- শালীনতার তোয়াক্কা না করে সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করে ২৬শে আগষ্টের উপ-নির্বাচনে ৮টি আসনেই নিজেদের প্রার্থীকে বিজয় ঘোষণা করল।

এমনকি, টুঙ্গীপাড়াসহ গোপালগঞ্জের আসন দুটিতে ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে আসতে না দিয়েই নিজেদের ইচ্ছামত ব্যালটে পূর্ব রাতেই সীল মেরে, পূর্ব নির্ধারিত ফলাফল সীটে প্রিজাইডিং অফিসারদেরকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করল। এই উপলক্ষে একমাত্র গোপালগঞ্জেই প্রায় এক ডিভিশন সৈন্য নিয়োজিত করা হয়।

উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের নগ্ন চেহারা চূড়ান্তভাবে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয়ে গেল। সমগ্র জাতি ও বিশ্ববাসী এরশাদ সাহেবকে জানালো প্রচণ্ড ঘৃণা আর ধিক্কার। দেশবাসীর কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এরশাদ সাহেবকে ক্ষমতায় রেখে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান মোটেই সম্ভব নয়।

সামরিক শাসনের গায়ে বেসামরিক লেবাস পরানোর জন্য যে-কোন হীন কাজ করতেও তাঁর বিবেকে বিন্দুমাত্র সংশয় সৃষ্টি হবে না। নিজের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করার জন্য যে কোন কিছু তিনি করতে পারেন। এমনিতর অবস্থায় সরকার ১৫ই অক্টোবর ‘৮৬ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করল।

৭ই ও ৮ই সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ১৫ দলের সভায় সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রপতি এরশাদের পদত্যাগের দাবীতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয় এবং ১৫ই অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

১৫ দল সামরিক আইন ও শাসন প্রত্যাহার, এরশাদের পদত্যাগ, পাটের সর্বনিম্ন মূল্য মণপ্রতি ৫০০/০০ টাকা ধার্যকরণসহ কতিপয় দাবীতে ১২ই সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ দিবস পালন করে।

১৪ই সেপ্টেম্বর ‘৮৬, ১৫ দল তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিরোধের কর্মসূচী ঘোষণা করে। কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ১৭ই সেপ্টেম্বর সমাবেশ এবং নির্বাচনের দিন ১৫ই অক্টোবর সকাল থেকে সন্ধ্যা সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।

১৭ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে সামরিক আইন ও শাসন বহাল রেখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভানেত্রীত্বে অনুষ্ঠিত ১৫ দলের সভায় তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য পুনরায় দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয় এবং ২৭শে সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।

তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেনারেল এরশাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেল। ১৯৭৫ সনে জাতির জনকের হত্যাকারী আত্ম-স্বীকৃত খুনী ফারুককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে তাকে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ও জাতির জনক সম্পর্কিত অশালীন ও অমার্জনীয় বক্তব্য প্রদান ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত অসত্য, অশোভন ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে নিজের অব্যক্ত ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে থাকে।

প্রকাশ থাকে যে, পূর্ববর্তী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরকে বিদেশী দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে গেছেন এবং বর্তমান সামরিক শাসক এরশাদ দায়িত্ব নিয়েছেন তাদেরকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করার।

কাজেই দেখা যায় যে, ১৫ই আগষ্টের পর কয়েকবার ক্ষমতার হাত বদল ঘটলেও খুনীদের সাথে আজকের এরশাদ পর্যন্ত প্রত্যেকের একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র বিদ্যমান ছিল এবং এরা প্রত্যেকেই একই আন্তর্জাতিক চক্রের হাতের পুতুল হিসেবে দেশ শাসন করে চলেছে। যা হোক, সমগ্র জাতি এই মারা ষড়যন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ জানালো।

 

দলমত-নির্বিশেষে সকল বিবেকবান মানুষ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের দাবী জানালেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিহত করা, খুনী ফারুকের বিচারের দাবীতে ও ১৫ই অক্টোবরের হরতালকে সফল করার লক্ষ্যে দেশের সর্বত্র অনুষ্ঠিত হতে লাগল সভা, সমাবেশ, বিক্ষোভ ও মিছিল।

এমনি এক অবস্থায় ৬ই অক্টোবর সামরিক ফরমান বলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনবিরোধী সকল কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচীর অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা সারাদেশে ব্যাপক সফরের কর্মসূচী গ্রহণ করলেন। আঁতকে উঠল এরশাদ চক্র।

৬ই অক্টোবর ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সভানেত্রীকে না নিয়েই বাংলাদেশ বিমানের সৈয়দপুরগামী ফ্লাইট ছেড়ে গেল। উদ্দেশ্য- তিনি যাতে রংপুর ও সৈয়দপুরের নির্ধারিত জনসভায় যোগ দিতে না পারেন। পরের দিন ৭ই অক্টোবর তিনি সড়কপথে বগুড়া গেলেন এবং সামরিক-বিধি লংঘন করে সেখানে এক বিশাল জনসমুদ্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখলেন।

সেখান থেকে ৮ই অক্টোবর পূর্ব-নির্ধারিত রাজশাহী জনসভায় যাওয়ার পথে নাটোরের কাছাকাছি সেনাবাহিনীর লোকজন ১৫ দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের গতিরোধ করলেন এবং তাঁকেসহ নেতৃবৃন্দকে রাজশাহী যেতে দেওয়া হলো না। সভানেত্রী ঢাকায় ফিরে এসে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করলেন এবং সাংবাদিকদের সামনে সমস্ত ঘটনা তুলে ধরলেন।

বগুড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জনাব আবদুল মান্নান, সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব তোফায়েল আহাম্মদ এম.পি, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জনাব আবদুল জলিল এমপিসহ ১৫ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে সামরিক আইনে মামলা দায়ের করা হলো।

৮ই অক্টোবর ১৫ দলের সমাবেশের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হলো আওয়ামী লীগের যুব সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ নাসিম এম.পি, কেন্দ্রীয় নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জনাব আবুল কাসেম, আওয়ামী লীগ কর্মী মোহাম্মদ শাজাহানসহ অনেক কর্মীকে। গ্রেফতারের প্রাক্কালে পুলিশের টিয়ার গ্যাসে আহত হলেন জনাব মোহাম্মদ নাসিম এম.পি। সারা দেশে শুরু হলো ব্যাপক ধরপাকড়, মিথ্যা মামলা দিয়ে দলীয় কর্মীদেরকে করা হলো হয়রানী।

১৩ই অক্টোবর ১৫ দল ঘোষিত কালো দিবসে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জনসভায় জননেত্রী শেখ হাসিনাকে যেতে দেওয়া হলো না। ৩২ নম্বর সড়কের মাথায় তাঁর গতিরোধ করে দাঁড়াল পুলিশ বাহিনী। সভানেত্রী সাথে সাথে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদেরকে ঘটনা অবহিত করলেন।

প্রকাশ থাকে, জননেত্রী শেখ হাসিনা পূর্বঘোষিত সমাবেশে যাতে অংশ নিতে না পারেন, তজ্জন্য ঐ দিন সকালেই জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেত্রীর কামরায় নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করে পুলিশ গিয়ে তাকে সভায় না যেতে অনুরোধ করে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলীয় নেত্রীর কার্যালয় বন্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশ প্রদান করে।

১৪ই অক্টোবর সারাদিন সভানেত্রীকে ৩২ নম্বর সড়কস্থ বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। তাঁকে কড়া পুলিশ প্রহরায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়। অন্যদিকে নেতৃবৃন্দের বাড়ীতে বাড়ীতে চলে পুলিশী তল্লাশী। শুধু তাই নয়, সারাদেশে আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় নেতা- কর্মীদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ মহসীনসহ শত শত কর্মী-নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। সৃষ্টি করা হয়। নজিরবিহীন সশস্ত্র সন্ত্রাস। এহেন অত্যাচার, নির্যাতন ও সন্ত্রাসের মাঝে ১৫ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সমগ্র জাতি তীব্র ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সারা দেশে পালিত হয় অভূতপূর্ব সর্বাত্মক হরতাল।

শতকরা এক ভাগ লোকও ভোটকেন্দ্রে যাননি। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। ১৫ই অক্টোবর সন্ধ্যায়ই জাতির জনকের বাসভবনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে একটা মহা-প্রহসন হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং সর্বাত্মক হরতাল পালন ও এরশাদের তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সর্বোতভাবে প্রত্যাখ্যান করার জন্য দেশবাসীকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানান।

তিনি দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে ভোটারবিহীন এই নির্বাচনী মহা-প্রহসনের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাতিলের দাবী জানান। সমগ্র বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল, ১% ভোট না পেয়েও এরশাদ সাহেব নিজেকে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন।

চরিত্রহীন, লম্পট, প্রতারক, দুর্নীতিবাজ এরশাদের সকল কুকর্মের ফিরিস্তি বের হতে শুরু করল বিভিন্ন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী পত্র-পত্রিকায়। আর অন্যদিকে দেশবাসী এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে আরো সোচ্চার হলো। এরশাদের পদত্যাগের দাবীতে পালন করা হলো কালো দিবস। অনুষ্ঠিত হলো অনেক সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল।

তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের কুক্ষিগত ক্ষমতাকে বৈধতার লেবাস পরানোর জন্য এরই মধ্যে এরশাদ সাহেব ১০ই নভেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকলেন। ২৫শে অক্টোবর ‘৮৬ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় জাতীয় সংসদের মাধ্যমে

এরশাদের সামরিক অধ্যাদেশ ও কর্মকাণ্ডকে বৈধ করার প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করার জন্য বিরোধী দলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হলো। ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা দিবসে ষ্টেডিয়াম গেটে শেখ হাসিনার সভানেত্রীত্বে আওয়ামী লীগের এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হলো এবং সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও এরশাদের পদত্যাগের জোর দাবী জানান হলো।

পরবর্তীতে সপ্তম সংশোধনী বীলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ তিনদিনব্যাপী কর্মসূচী ঘোষণা করে এবং বিরোধীদলীয় ও স্বতন্ত্র সদস্যদেরকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়, জনগণের দেয়া রায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না এবং ৭ম সংশোধনী বীল পাশ হতে দিবেন না। ৯ই নভেম্বর ১৫ দলীয় সংসদ সদস্যগণ সামরিক আইন তুলে না দেওয়া পর্যন্ত সংসদ অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১০ই নভেম্বর সপ্তম সংশোধনী বীলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-ঘোষিত তিনদিনব্যাপী কর্মসূচীর শেষ দিনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ ও বিক্ষোভ-মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় কিছু সংসদ সদস্যের সহায়তায় এরশাদ সাহেব ৭ম সংশোধনী বীল পাশ করিয়ে নেন। এভাবে জাতিকে বেসামরিক লেবাসে সামরিক শাসনের জিঞ্জিরে আবদ্ধ করা হয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ সকল গণতান্ত্রিক শক্তি এর তীব্র প্রতিবাদ করল। দলীয় সভানেত্রী বললেন, “সংবিধানকে সামরিকীকরণ করা হয়েছে। ৭ম সংশোধনীর মাধ্যমে হত্যা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতির ধারাকে অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং এই ৭ম সংশোধনী ৮ম সংশোধনীর পথে দেশকে নিয়ে যাবে।”

৭ম সংশোধনী পাশের মাধ্যমে যে দেশে গণতন্ত্রের ধারা সূচিত হয়নি, তার প্রমাণ পাওয়া গেল মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে। ১৫ই নভেম্বর বায়তুল মোকাররম চত্বরে জনসভা অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং ছাত্র রাজনীতি বন্ধের হুমকি প্রমাণ করে যে, শুধুমাত্র সামরিক ফরমানের গায়ে একটা প্রচ্ছন্ন সাদা লেবাস আঁটা হয়েছে।

এমনি এক শাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যদিয়ে আমরা যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পালন করি এবং সমগ্র জাতি বেসামরিক লেবাসে চেপে বসা সামরিক গণতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তির জন্য দৃঢ় শপথ গ্রহণ করে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ন্যায় একটি বিশাল সংগঠনের ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ইং পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছরের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা একটি দুরূহ কাজ। তবুও সামরিক শাসন বিরোধী ৫ দফার আন্দোলন এবং কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরার সাথে সাথে এই দীর্ঘ ৬ বছরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিবেদন আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো।

এই প্রতিবেদনটি তৈরী করার সময় একটি জিনিসের প্রতি মূলতঃ আমি দৃষ্টি রেখেছি যে, এই প্রতিবেদনের মধ্যদিয়ে যাতে একজন নেতা বা কর্মী দলীয় সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও একই দীর্ঘ ৬ বছরের দেশের সার্বিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মোটামুটি প্রাথমিক ধারণা লাভ করতে পারেন।

সেই লক্ষ্যকে সামনে রাখতে গিয়ে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকারের বিবরণে ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রে বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তাই আমি এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করতে চাই যে, প্রতি বছরই আমরা ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারী মহান শহীদ দিবস,

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর দিবস, ১লা মে ঐতিহাসিক মে দিবস, ঐতিহাসিক ৮ই জুন, ১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস, ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা দিবস, ৫ই ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী, ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় ও জাতীয় দিবস যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করে এসেছি।

এছাড়া শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের ও বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী এবং সামরিক স্বৈরশাসন বিরোধী ৫ দফার সংগ্রামে শহীদ আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজ উদ্দিন আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা সেলিল (সেলিম) দেলোয়ার ও কিশোর তিতাসের মৃত্যুবার্ষিকী।

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর প্রয়াত বাবু ফনা মজুমদার বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী মরহুম মোল্লা জালাল উদ্দিন ও বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহকর্মী গাজী গোলাম মোস্তফার মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদাকারে পালন করা আওয়ামী লীগ নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকার ছাড়াও কেন্দ্রীয়ভাবে ।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থা বিভিন্ন সমস্যাভিত্তিক আন্দোলনও গড়ে তোলে বা তোলার চেষ্টা করে এবং সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচীও শা বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে পাট ও আত্মসহ কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণের জন্য ও দেশের সর্বত্র বি মওকুফ, ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি রুটিনের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ঘেরাও আন্দোলনসহ বিভিন্ন কর্মসুচী প বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারী মদদপুষ্ট বিশেষ গোষ্ঠীর দুর্নীতি ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোজার প্রতিবাদ ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় বা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ,

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি যে, সুশৃজন কর্মীবাহিনী ছাড়া কোন আদর্শই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এমনকি, ইস্যু-ভিত্তিক কোন সফল আন্দোলন পর্যন্ত করা সম্ভব। নয়। সেই লক্ষ্যে সংগঠনকে আরো গতিশীল করা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সুবিশাল এই কর্মীবাহিনীকে ভিত্তির উপর দাঁড় করানো আজ আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

সেই দায়িত্ব পালনে আছ আমাদের প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও নবীনদের তারুণ্যের সুষ্ঠু সমন্বয় একান্তভাবে প্রয়োজন। যেখানেই প্রবীণদের অভিজ্ঞতার আলোকে নবীনদের কর্ম প্রেরণাকে কাজে লাগানো হয়েছে, সেখানেই আমরা ভাল ফল পেয়েছি।

১৯৮৩ সালে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হওয়ার পর থেকে দলের সর্বস্তরের নেতা ও কর্মীদের সহযোগিতায় ও দলীয় সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সার্বিক পরামর্শক্রমে দলীয় গঠনতন্ত্র মোতাবেক সংগঠনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।

দলের প্রবীণ নেতাদের বিশাল অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এবং অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নবীনদের কর্ম টিদাম সংগঠনকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে আমাকে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে সভাপতিমণ্ডলীর দু’জন সদস্য, সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদক মণ্ডলী ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অনেক সদস্যের দল ত্যাগের পর সকলের সহযোগিতা না পেলে আমার পক্ষে সংগঠনের যাবতীয় কর্মকা এগিয়ে নেওয়া কোন মতেই সম্ভব হতো না।

বিশেষ করে ঢাকা মহানগরী আওয়ামী লীগ তাদের ব্যাপক সাংগঠনিক শূন্যতার পরও যে-ভাবে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কেন্দ্রীয় কমিটিকে সাহায্য করেছে এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগে নূতনভাবে যে প্রাণ-শক্তির সঞ্চার করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।

১৯৮৩ সালে কিছু লোকের দল আগের পর কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সাময়িকভাবে হলেও যে সাংগঠনিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় তা আমরা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬৯টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৬৫টি সাংগঠনিক জেলায় ইতিমধ্যেই আমরা ধি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠান করে সংগঠনে নূতন করে গতির সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছি।

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ  এবং ৭ই মে তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটি পুনর্গঠন ৩ কুড়িগ্রাম জেলায় এডহক কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বাকী ৪টি জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, বরিশাল ও রংপুর সাংগঠনিক জেলার দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন কিছু বাস্তবতার কারণেই অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি।

তবুও আমি আশাবাদী, খুব শীঘ্রই উপরোক্ত ৪টি জেলার দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন সমাপ্ত হয়ে যাবে। জেলা দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অন্তবর্তী সময়ের জন্য উপরোক্ত ৪টি জেলায় গঠনতন্ত্রের বিধি মোতাবেক এডহক কমিটি গঠন করা হয়।

Leave a Comment