জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘৯৬ এর  নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকা

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘৯৬ এর  নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকা। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘৯৬ এর  নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকা

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচন '৯৬ এর  নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকা

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকে বাংলার শোষিত বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দুঃখ দুর্দশা বিমোচনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। বাঙালি জাতির সকল সংগ্রাম ও আন্দোলনে আওয়ামী লীগ পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা।

‘৪৮ ও ‘৫২-র ভাষা আন্দোলন, ‘৫৪-র নির্বাচন, ‘৫৮-র সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৪-তে দাঙ্গা বিরোধী আন্দোলন, ‘৬৬-তে স্বাধিকার আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর নির্বাচন এবং সকল আন্দোলনের মিলন মোহনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পালন করেছে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভূমিকা ।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গতিশীল ও সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে গেছে সুদৃঢ় প্রত্যয়ে। বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ কখনো আপোষের পথে পা বাড়ায়নি বা কোন প্রকার ষড়যন্ত্র মোকাবেলায়ও পিছপা হয়নি। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং স্বাধীন জাতিসমূহের মাঝে বাঙালির আসন নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবদান।

সংগ্রামের এই ঐতিহ্যময় ধারাবাহিকতায় বিগত প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনতার পাশে থেকে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই পরিচালনা ক’রে যাচ্ছে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যে সরকার দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, জাতির দুর্ভাগ্য, অচিরেই ঐ সরকার এক স্বৈরাচারী সরকারে পরিণত হয়।

জনগণের আশা আকাংক্ষাকে পদদলিত ক’রে পতিত বিএনপি সরকার দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে সমগ্র দেশকে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ, লুটপাট, হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, রাহাজানি ইত্যাদি অপকর্মে দেশ ছেয়ে যায়। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার পদে পদে ভূলুণ্ঠিত হয়।

এহেন দুঃসহ পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও দেশের সকল পেশা ও সর্বস্তরের মানুষ পুনরায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এক দীর্ঘ ও সুকঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হয়।

কিন্তু ক্ষমতাসীন শাসকদল গণদাবীর নিকট মাথা নত না ক’রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাকে উদ্ভট ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তাদের ক্ষমতার মসনদকে পাকাপোক্ত করার অশুভ লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এক ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের আয়োজন করে।

ঐ নির্বাচন দেশ ও বিদেশের কোথাও কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ১২৪টি তাজা প্রাণের বিনিময়ে, বিরোধী দলীয় হাজার হাজার নেতা-কর্মীর কারাভোগ, নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তাহলে নিরীহ অগণিত মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস হতো না, দেশবাসীর দুর্ভোগ হতো না।

বিএনপি’র ক্ষমতা গণঅভ্যুত্থানে সূচিত হয় জনতার বিজয়। অথচ, যদি যথাসময় বিরোধীদলের ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেয়া হতো লিলাই এসব জীবনহানি, সম্পদ ধ্বংস ও জনগণের দুর্ভোগের জন্য দায়ী। বাংলাদেশের বীর জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও অকুণ্ঠ সমর্থন এবং অংশগ্রহণের ফলেই এ গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় অবৈধ ও স্বৈরাচারী বিএনপি সরকারের; প্রতিষ্ঠিত হয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

 

বিএনপি সরকারের তল্পিবাহক নির্বাচন কমিশন হয় পুনর্গঠিত। জনতার সমর্থনপুষ্ট এ সরকার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মাধ্যমে সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে, দেশবাসীর এটাই প্রত্যাশা, জনগণ নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে নিজ পছন্দ অনুসারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাঁদের কাংক্ষিত সরকার নির্বাচিত করতে পারলেই শহীদদের আত্মত্যাগ আর নির্যাতিতদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বিজয় সত্যিকারভাবে সার্থক ও সফল হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক সুখী সমৃদ্ধশালী ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর এ আকাংক্ষা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

দেশবাসীকে সাথে নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে প্রেরণা হিসাবে গ্রহণ ক’রে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নবতর সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করবে।

বিগত পাঁচ বছরে বিএনপি সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, দলীয়করণ, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও দুঃশাসনের ফলে দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্যে জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে উঠে দুঃসহ ও বিপর্যস্ত।

বিনিয়োগকারীরা নিরুদ্যম ও হতাশ হয়ে পড়েন। বহু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বদলে কৃষি উৎপাদন আজ নিম্নমুখী। বাংলাদেশের কৃষক সমাজের আজ বড়ই দুর্দিন।

দেশের এ দুঃসময়ে বিএনপি’র মন্ত্রী, নেতারা দুর্নীতি ও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ক’রে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। রাতারাতি তারা হয়েছে শত শত কোটি টাকার মালিক। দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় বিরাজমান বর্তমান বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাস্তবমুখী ও কার্যকর কর্মসূচী গ্রহণ করে তার বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

একটি আধুনিক যুযোপযোগী এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন কৌশলের ভিত্তিতে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশবাসীর সামনে দলীয় কর্মসূচী উপস্থাপন করছে। একবিংশ শতাব্দী আজ আমাদের দ্বারপ্রান্তে।

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচন '৯৬ এর  নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকা

 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কার ও প্রয়োগ বিশ্বকে দ্রুত অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের এ অগ্রযাত্রায় আমরাও শরীক হতে চাই, পিছিয়ে থাকতে চাই না। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই।

আমরা চাই সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। শাস্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাংলার গণমানুষের রায়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের উপর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব আর্পিত হলে ঘোষিত নীতিমালার ভিত্তিতে ঈস্পিত লক্ষ্য অর্জনে, ইনশাআল্লাহ, আমরা এগিয়ে যাবো সুদৃঢ় পদক্ষেপে।

Leave a Comment