আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –জিয়ার মৃত্যু ও রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
জিয়ার মৃত্যু ও রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন

প্রিয় কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,
জিয়ার দুঃখজনক মৃত্যুর পর উদ্ভুত অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র, হত্যা, ক্যু, অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলের বিপরীতে দেশবাসীর প্রতি শাসনতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানায়।
এ কথা আর একবার প্রমাণিত হয় যে, আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এবং গণতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা হস্তান্তরে দৃঢ় আস্থাশীল।দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জিয়া হত্যার পরও বিএনপি সরকারের বোধোদয় হয়নি।
তারা জাতীয় জীবনের প্রকৃত সংকটকে পাশ কাটিয়ে ছাত্তার সাহেবকে দিয়ে জিয়ার অনুসৃত পথ ধরে দেশ শাসন অব্যাহত রাখল। অপরদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে সার্বভৌম পার্লামেন্ট নির্বাচনের দাবী উত্থাপন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত ও জোরদার করা হলো।
মহান ৭ই জুনের সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর প্রতি রাজনীতির সাথে তাদেরকে না জড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মহান ও পবিত্র দায়িত্বের প্রতি অবিচল থাকার আহ্বান জানালেন।
২১শে জুন ‘৮১ ময়মনসিংহে এবং ১লা জুলাই রাজশাহীতে তিনি দু’টি বিশাল জনসভায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার প্রতি আওয়ামী লীগের দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করলেন।
বিচারপতি ছাত্তার তখনও জেনারেল জিয়ার নিযুক্ত উপরাষ্ট্রপতি, সরকারী বেতনভুক কর্মচারী। সংবিধানের বিধানমতে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য। এই অযোগাত ঢাকার জন্য এবং রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনে খেয়ালখুশীমত প্রশাসনযন্ত্রের ব্যবহার করে নির্বাচনী ফল ঘোষণা করা যাবে না আশংকা করে ৩রা জুলাই ‘৮১ তারিখে জাতীয় সংসদে ৬ষ্ট সংশোধনী বীল উত্থাপন করা হলো।
এ গণবিরোধী ও স্বেচ্ছাচার মূলক বীলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা সংসদের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেন এবং ৮ই জুলাই বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষর গ্রহণের মাধ্যমে এ ঘৃণ্য বালটি যেন পাস হতে না পারে, তার জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন সৃষ্টি করেন।
তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বেও সংসদে ও সংশোধনী বাল এবং সারাদেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা আদেশ গৃহীত হলো। ১৫ই আগস্ট পূর্ণ মর্যাদায় ভাব-গম্ভীর পরিবেশে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হলো। ঢাকাসহ সারা দেশে জনগণ বিপুলভাবে জাতীয় শোকদিবসের অনুষ্ঠানসমূহে অংশ গ্রহণ করে এবং জাতির পিতার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে গণ-মানুষের অধিকার আদারের শপথ গ্রহণ করে।
১৬ই আগষ্ট আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম চত্বরে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে ৪ দফা দাবী পেশ করা হলো এবং ঐ ৪-দফা দাবী আদায়ের লক্ষ্যে ২৬শে আগষ্ট দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়া হলো।
আওয়ামী লীগের আহ্বানে সাড়া দিয়ো ২৬শে আগষ্ট সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হলো। ৪ দফা দাবী নিয়ে ৪ঠা সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাথে সরকার আলোচনায় বসল। ১৯শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনবিদ, সাবেক আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের অন্যতম সদস্য ডঃ কামাল হোসেনকে প্রার্থী করে সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা, কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা নির্বাচনী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
২৭শে সেপ্টেম্বর হতে নির্বাচনী প্রচার অভিযান শুরু হলো। জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনপ্রার্থী ডঃ কামাল হোসেন ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপক সফর শুরু করলেন। দেশে নির্বাচনী জোয়ার সৃষ্টি হলো।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ঘোষণা করলেন, “নির্বাচনে জয়ী হলে আওয়ামী লীগ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেবে। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। সংসদ হবে সার্বভৌম। সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ ধরে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী বাস্তবায়িত করে শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করা হবে।”
সারা অক্টোবর মাস ধরে নির্বাচনী প্রচারণা চলল। ৩১শে অক্টোবর ‘৮১ আমাদের সংগঠনের সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা, ত্যাগী পুরুষ, প্রেসিডিয়ামের অন্যতম সদস্য, জননেতা শ্রী ফনিভূষণ মজুমদার পরলোক গমন করলেন। আমরা সংগঠনের পক্ষ হতে পরলোকগত নেতার স্মরণে সপ্তাহব্যাপী শোক দিবস পালন করলাম।
৩রা নভেম্বর পালিত হলো জেলহত্যা দিবস। জাতীয় চার নেতা স্মরণে আয়োজিত শোক সভায় সভানেত্রী ঘোষণা করলেন, “বি. এন. পি. সরকার আইনের শাসনকে হত্যা করেছে।” ১১ই নভেম্বর শেরে বাংলা নগরে অনুষ্ঠিত হলো বিশাল নির্বাচনী সভা।
এরই মধ্যে সারা দেশে আওয়ামী প্রার্থীর পক্ষে জনতার জোয়ার সৃষ্টি হলো। সরকার প্রমাদ গুনল। সংবিধান, দেশের প্রচলিত আইন ও সেনাবাহিনীর শৃংখলা ভংগ করে সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদ ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।
সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি ঘোষণা করলেন- বিচারপতি ছাত্তার তাঁর এবং সেনাবাহিনীর প্রার্থী। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট হয়ে এবং প্রশাসন যন্ত্রকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে ১৫ই নভেম্বর ৮১ তারিখে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলকে ছাত্তার সাহেব স্বপক্ষে নিয়ে নিলেন।
সারা দেশে বি,এন,পি’র লেলিয়ে দেয়া মাস্তান ও প্রতাবাহিনীর হাতে অসংখ্য আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও যুবলীগের নেতা, কর্মী আহত হলেন। টাংগাইলে ছাত্রলীগ নেতা কল্যাণ বিহারী দাস বি.এন.পি, সরকারের শ্বেত সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ নিল।
অন কর্মীর ঘরবাড়ী সৃষ্ঠিত হলো, অগ্নি সংযোগ করা হলো। অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে পুলিশী নির্যাতন ও হ্যারানির শিকারে পরিণত করা হলো। পূর্বাহ্নে প্রস্তুতকরা নির্বাচনী ফলাফল আওয়ামী লীগ প্রত্যাখ্যান করল।

১৮ই নভেম্বর ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ কারচুপি ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করল। ২১শে নভেম্বর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হলো বিশাল প্রতিবান জনসভা।
জনসভায় গণতান্ত্রিক অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার শপথ উচ্চারিত হলো। ২৪শে নভেম্বর নির্বাচনে কারচুপি ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে দেশব্যাপী প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দিবস পালিত হলো।
