জৈন ধৰ্ম

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় জৈন ধৰ্ম – যা আর্য সমাজ ও সভ্যতা এর অন্তর্ভুক্ত।

জৈন ধৰ্ম

 

জৈন ধৰ্ম

 

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে এক প্রচন্ড আলোড়ন দেখা দেয়। ধর্মের ক্ষেত্রে এ চিন্তা শুধুমাত্র ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না- গ্রিস, মিশর, ব্যাবিলনিয়া, পারস্য, চীন প্রভৃতি দেশগুলোতেও ধর্ম বিপ্লব দেখা গিয়েছিল। এ আলোড়নের কারণগুলো অন্যান্য দেশে কি ছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও ভারতে এটা ছিল মুখ্যত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ধর্ম, সৃষ্টিকর্তা এবং মুক্তির উপায় সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ ও শিক্ষা নিয়ে এ সময় বহু নতুন ধর্মের উদ্ভব হয় যার মধ্যে ভারতে প্রধান দুটি ছিল জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম। ভারতে এ দুটি ধর্মের উদ্ভবের বহু কারণ ছিল।

বৈদিক ধর্ম সাধারণ মানুষের মনে কোন গভীর রেখাপাত করতে পারেনি। দুই উচ্চবর্ণ, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা ছাড়া বৈদিক ধর্মাচরণ অন্যান্যরা পালন করতো না। সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্যরা তাদের নিজেদের ধর্মই পালন করতো। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে পশুবলি ও ব্যয়বহুল এবং জটিল অনুষ্ঠানাদির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। পরবর্তী বৈদিক যুগে ঋগ্বৈদিক যুগের সহজ ও অনাড়ম্বর পূজা পদ্ধতি নিষ্প্রাণ ও যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, যা ধর্মপ্রাণ মানুষের আধ্যাত্নিক তৃষ্ণা মেটাতে ব্যর্থ হয়। পশুবলির আনুষ্ঠানিকতা ও ব্যয়বহুলতা অনেককেই ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। পশুবলি অনেকের মনেই আঘাত দেয়। ব্রাহ্মণরা ব্যয়বহুল যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে ক্ষত্রিয়দের বাধ্য করতো।

কর ও জমির আয় থেকে ক্ষত্রিয় শাসকরা যা আয় করতো ব্রাহ্মণরা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে তা নিয়ে নিত। এক একটি যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পর রাজাকে বহু সোনা, রূপা, দাস-দাসী, গাভী, খাদ্য ও বস্ত্র দান করতে হতো। ফলে ক্ষত্রিয়রা প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে। ব্যয়বহুল যাগযজ্ঞ ও নিষ্ঠুর পশুবলিতে আত্মার মুক্তিলাভ সহজ হয় কিনা সে সম্পর্কেও মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। ফলে মানুষ একটি সহজতর ধর্মের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে।

ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ব্যাখ্যা নিয়েও ব্রাহ্মণদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। তা ছাড়া জীবনধারণের প্রয়োজনে ব্রাহ্মণরা ধর্মকর্ম ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের জাগতিক পেশায় নিয়োজিত হয়। এর ফলে তাদের প্রতি জনসাধারণের ভক্তি ও বিশ্বাস কমে যায় । বর্ণপ্রথার কঠোরতাও নতুন ধর্মের উদ্ভবে সহায়ক হয়েছিল। ব্রাহ্মণরাই শুধু বেদ স্পর্শ করতে পারতো। সমাজে তারাই বিবেচিত হতো শ্রেষ্ঠ শ্রেণী হিসাবে। ব্রাহ্মণদের এ শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য কেউই সহজভাবে গ্রহণ করেনি। এ সময়ে এ দুই শ্রেণীরই যথেষ্ঠ ক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটেছিল। ফলে তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরোধিতা করতে থাকে।

ক্ষত্রিয়রা দেশ শাসন করতো। তারা যুদ্ধ করে দেশকে রক্ষা করতো। এ যুগে লোহার ব্যবহার শুরু হওয়ায় লোহার তৈরি অস্ত্রশস্ত্র তাদের আরো বেশি শক্তিশালী করে তোলে। ফলে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য তাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে।
লোহার ব্যবহার কৃষি ও বাণিজ্যে লিপ্ত বৈশ্যদের আরো ধনী করে তোলে। লোহার লাঙ্গলের ব্যবহারের ফলে কৃষিকর্মের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটলে তারা আরো বিত্তশালী হয়ে ওঠে। যাগযজ্ঞে এক সঙ্গে বহু পশুবলি দেওয়ায় কৃষিকাজে ব্যাঘাত ঘটে বলে তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরোধিতা করতে থাকে। এ সময় বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসারও বৈশ্যদের ধনশালী করে তোলে। তখন তারাও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্ব মানতে অস্বীকার করে।

তাছাড়া বৈদিক ধর্মে সমুদ্র যাত্রাকে সুনজরে দেখা হতো না। কিন্তু বাণিজ্যের জন্য বণিকদের সমুদ্র পাড়ি দিতে হতো। বৈদিক ধর্মে সুদের ব্যবসাকেও পাপ বলে ঘোষণা করা হয় এবং সুদ ব্যবসায়ীদের নীচু চোখে দেখা হতো। অথচ মহাজনদের সুদের ব্যবসা করতে হতো। এ কারণে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে তারা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেনি। অধ্যাপক ব্যাশাম বলেছেন যে, বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের বিকাশ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছিল। পুরনো উপজাতীয় ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভেঙ্গে যায় এবং তাদের জায়গায় আঞ্চলিক রাজ্য গড়ে ওঠে। এগুলো শাসন করতো স্বেচ্ছাচারী ও যুদ্ধপ্রিয় রাজারা।

এ যুগে নগরের উদ্ভব হয় যেখানে বিভিন্ন উপজাতির ছিন্নমূল মানুষ এসে আশ্রয় নেয়। জীবনযাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকলে মানুষের মনে অস্থিরতা জন্ম নেয়। রাজারা যখন রাজ্যের সীমানা এবং ব্যবসায়ীরা তাদের সম্পদ বৃদ্ধিতে ব্যস্ত তখন বহু সংবেদনশীল ও চিন্তাশীল ব্যক্তির কাছে বর্তমান জীবন সন্তোষজনক মনে হয়নি। তারা তখন গৃহত্যাগী হয়ে সন্ন্যাস জীবন অবলম্বন করে মুক্তির নতুন পথ খুঁজতে থাকেন। কাজেই দেখা যায় যে নতুন ধর্মগুলোর উদ্ভবের বহু আগে থেকেই ভারতীয় চিন্তাজগতে এমন অগ্রগতি ঘটেছিল যার ফলে নতুন ধর্মের বিকাশের পথ তৈরি হয়েছিল।

জৈন ধর্মের প্রবর্তক হিসাবে বর্ধমান মহাবীরের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জৈন কিংবদন্তী অনুসারে ২৪ জন তীর্থঙ্কর এই ধর্ম প্রচার করেছিলেন। বর্ধমান মহাবীর ছিলেন শেষ তীর্থঙ্কর। মহাবীর ছাড়া অন্য তীর্থঙ্করের মধ্যে শুধুমাত্র তাঁর পূর্বসুরী পার্শ্বনাথই ছিলেন ঐতিহাসিক ব্যক্তি, অন্যদের সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।

পার্শ্বনাথ ছিলেন বেনারসের রাজা অশ্বসেনের পুত্র। মহাবীরের প্রায় ২৫০ বছর আগে তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল। ৩০ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগী হন এবং ৮৪ দিন সাধনার পর সত্যজ্ঞান লাভ করেন। জীবনের অবশিষ্ট ৭০ বছর তিনি তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। তাঁর প্রধান চারটি শিক্ষা ছিল, (১) প্রাণী হত্যা না করা (২) মিথ্যা কথা না বলা (৩) চুরি না করা এবং (৪) সম্পত্তির অধিকারী না হওয়া। শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর এর সাথে সংসারী না হওয়ার শিক্ষা যোগ করেছিলেন।
শেষ বা ২৪তম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর আনুমানিক ৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশালীর নিকটবর্তী কুন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতা সিদ্ধার্থ ছিলেন জ্ঞাত্রিক গোষ্ঠীর নেতা এবং মা ত্রিশলা ছিলেন লিচ্ছবি বংশের কন্যা। যুবরাজ হিসাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহাবীর ছিেেলন বিবাহিত এবং এক কন্যার জনক। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ৩০ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগী হন এবং প্রায় ১৩ মাস ধরে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও তপস্যা করেন। এর পর তিনি তাঁর গায়ের পোশাকও ত্যাগ করেন। জীবনের বাকি দিনগুলো তিনি সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেন। ত্রয়োদশ বছরে তিনি সত্যজ্ঞান লাভ করেন এবং কেবলিন (সর্বজ্ঞ), জিন (জয়ী) এবং মহাবীর আখ্যা লাভ করেন। জীবনের অবশিষ্ঠ ৩০ বছর তিনি গাঙ্গেয় উপত্যকায় বিভিন্ন রাজ্যে তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন এবং ৭২ বছর বয়সে রাজগৃহের নিকটবর্তী পাবা নগরে অনশনে প্রাণত্যাগ করেন।

সম্ভবত ৪৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাঁর দেহাবসান ঘটে। উল্লেখ্য যে গাঙ্গেয় উপত্যকায় যে সব রাজা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন তাঁরা জৈন ধর্মেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
প্রথম দিকে জৈন ধর্ম প্রধানত মগধ, কোশল, বিদেহ এবং অঙ্গ রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মৌর্য যুগে জৈন ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত শেষ জীবনে জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কলিঙ্গরাজ খরবেলও জৈন ধর্মাবলম্বী ছিলেন।

জৈনরা বেদকে ঐশ্বরিক গ্রন্থরূপে স্বীকার করেনা। তারা আত্মার মুক্তিলাভে পশুবলির কার্যকারিতাও স্বীকার করে না। অহিংসা নীতিকে তারা অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করে। ঈশ্বর বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা একথাও জৈনরা মানেনা। তাদের মতে বিশ্ব জগৎ এবং মানুষের জীবন সব কিছুই এক সার্বজনীন নিয়মের অধীন। নিয়মটা হল এই যে উত্থানের পর পতন এবং পতনের পর উত্থান আসবে। উন্নতির পর্যায় শেষ হলে অবনতি আসবে এবং প্রতি পর্যায়ে তীর্থঙ্কর আসবেন পথ প্রদর্শক হিসাবে। জৈনরা গাছপালা, পাহাড়, পাথর, নদী – সব কিছুতেই প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলে বিশ্বাস করে। তারা হিন্দুদের মত কর্মফলে বিশ্বাসী।

গত জীবনের কর্মফল থেকে মুক্তিলাভই তার লক্ষ্য। এ মুক্তি লাভের তিনটি উপায় আছে যথা – সৎ বিশ্বাস, সৎ জ্ঞান এবং সৎ আচরণ, যা একসঙ্গে ত্রি-রত্ন নামে পরিচিত। মুক্তিলাভের জন্য কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর তারা অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করে।

 

জৈনদের বিশেষ কোন সামাজিক রীতিনীতি নেই। জন্ম, মৃত্যু বা বিয়ের মত তাদের আচার-অনুষ্ঠানগুলো হিন্দুদের মতই। খ্রিস্টিয় শতকের গোড়ার দিকে জৈন মন্দিরে তীর্থঙ্কদের মূর্তি স্থান লাভ করে। মধ্যযুগে জৈন পূজা পদ্ধতি হিন্দুদের মত হয়ে পড়ে- ধূপ, ফুল ইত্যাদি দিয়ে তারা তীর্থঙ্করদের পূজা করতে শুরু করে।

এমনকি প্রধান প্রধান কিছু হিন্দু দেবতার মূর্তিও জৈন মন্দিরগুলোতে স্থান লাভ করে। একজন জৈন ভিক্ষুর জীবন অত্যন্ত কঠোর নিয়মে আবদ্ধ । দীক্ষা গ্রহণের সময় তারা মাথার চুল না কামিয়ে টেনে টেনে তোলা হতো। আত্ম-নিপীড়ন মুক্তিলাভের সহায়ক – এ বিশ্বাস থেকে জৈনরা নিজেদের অসহ্য যন্ত্রণা দিতো। প্রখর রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা অথবা পীড়াদায়ক ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা তাদের জন্য ছিল মুক্তিলাভের সাধারণ উপায়। অহিংসার ব্যাপারেও তারা ছিল চরমপন্থী। স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোনভাবেই যেন জীবহত্যা না হয় সে ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সজাগ থাকে।

সংসারী বা ভিক্ষু -সবার জন্যই মাংস ভক্ষণ ছিল নিষিদ্ধ। তারা খুব সূক্ষ্ম বস্ত্র দিয়ে পানি ছেঁকে খেত। পায়ের নীচে পিষ্ট হয়ে কোন কীটপতঙ্গ যেন মারা না যায় সে জন্য রাস্তায় হাঁটার সময় জৈন ভিক্ষুরা রাস্তা ঝাড়ু দিতে দিতে অগ্রসর
হয়। তারা অত্যন্ত মিহি কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখে যাতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবও নাক-মুখে ঢুকে মারা না যায়।

অহিংসা সম্পর্কে এত চরমপন্থী হওয়ায় জৈনদের পক্ষে কৃষিজীবী হওয়া সম্ভব ছিলনা। কৃষিকাজের জন্য কীটপতঙ্গ মারতে এবং আগাছা ধ্বংস করতে হয়। ফলে সব কিছুরই প্রাণ আছে এ বিশ্বাসে একজন জৈনর পক্ষে কৃষক হওয়া এবং কঠোরভাবে অহিংসা পালন করা কঠিন। প্রাণী হত্যার ভয়ে জৈনরা ব্যবসা ছাড়া অন্য কোন পেশা গ্রহণ করতে পারে না। জৈন ধর্মে ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সে নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র ভূসম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ভারতের পশ্চিম উপকূলের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং সে সাথে জড়িত আর্থিক লেনদেন জৈনদের একমাত্র পেশা হয়ে দাঁড়ায়।

জৈন ধর্মের অনুশাসনগুলো প্রথমে মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মৃত্যুর পর জৈন সন্ন্যাসী স্থূলভদ্রের আহ্বানে পাটলিপুত্রে অনুষ্ঠিত জৈন মহাসভায় ১২টি অনুশাসন লিপিবদ্ধ করা হয় যার নাম দ্বাদশ অঙ্গ। পরে খ্রিস্টিয় ৫ম শতাব্দীতে কাথিয়াওয়াড়ের বলভীতে অনুষ্ঠিত মহাসভায় আরো ১২টি অনুশাসন যোগ করা হয় যা দ্বাদশ উপাঙ্গ রূপে পরিচিত।

পুঁথি নকল করাকে জৈন সন্ন্যাসীরা পুণ্যকর্ম মনে করতেন। ফলে পশ্চিম ভারতের প্রাচীন জৈন বিহারগুলো অসংখ্য দুস্প্রাপ্য জৈন ও অজৈন পুঁথির ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। মধ্য যুগে জৈন সন্ন্যাসীরা প্রাকৃত ও সংস্কৃত ভাষায় বহু টীকা ভাষ্য রচনা করেছিলেন। সংস্কৃত সাহিত্যের শেষ বড় কবি নয়চন্দ্র ছিলেন একজন জৈন সন্ন্যাসী। কালিদাসের টীকাকার হিসাবে বিখ্যাত মল্লিনাথও ছিলেন জৈন ।

প্রথম দুই শতাব্দী ধরে জৈনরা সংখ্যায় ছিল নিতান্তই অল্প এবং জৈন ধর্ম পূর্ব ভারতে মগধ, কোশল, বিদেহ এবং অঙ্গ রাজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। জৈন কিংবদন্তী অনুসারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শেষ বয়সে সিংহাসন ত্যাগ করে জৈন ভিক্ষু হয়েছিলেন। ফলে তখন জৈন ধর্মের বেশ প্রসার ঘটে। চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বের শেষ দিকে উত্তর ভারতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে অনেক জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যে চলে যান। তিনি মহাবীরের অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলার এবং জৈনদের নগ্ন থাকার পক্ষপাতি ছিলেন।

ফলে তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা দিগম্বর নামে পরিচিত হন। উত্তর ভারত থেকে যাওয়া জৈনদের নেতা ছিলেন স্থুলভদ্র এবং তিনি তাঁর অনুসারীদের শ্বেতবস্ত্র পরিধানের নির্দেশ দেন এবং এ জন্য তারা শ্বেতাম্বর নামে পরিচিত হন। দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়লেও তাদের মধ্যে কোনো মৌলিক মতভেদ নেই এবং দিগম্বরপন্থী জৈনরাও বস্ত্র পরিধান করে।

মৌর্য এবং গুপ্তযুগের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্বে উড়িষ্যা থেকে পশ্চিমে মথুরা পর্যন্ত জৈনরা ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীকালে জৈন ধর্ম প্রধানত দুটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। পশ্চিমে কাথিয়াওয়ার, গুজরাট এবং রাজস্থানের কিছু অংশে শ্বেতাম্বর জৈনরা প্রাধান্য লাভ করে। অন্যদিকে দাক্ষিণাত্য, মহীশুর এবং হায়দ্রাবাদে দিগম্বরদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য যে জৈন ধর্ম কখনও ভারতের বাইরে বিস্তার লাভ করেনি। বা ভারতেও বৌদ্ধধর্মের মত ব্যাপক প্রসার লাভ করেনি। জৈনধর্ম ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং আজও তার অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তবে বৌদ্ধ ধর্মের মত জৈনধর্ম কখনও ভারতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মত হুমকিরও সম্মুখীন হয়নি।

 

জৈন ধৰ্ম

 

সারসংক্ষেপ

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতাব্দীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় ভারতেও ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে এক প্রচন্ড আলোড়ন দেখা দেয়। ধর্ম, সৃষ্টিকর্তা এবং মুক্তির উপায় সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ ও শিক্ষা নিয়ে এ সময় ভারতে প্রধানত দুটি ধর্মের উদ্ভব হয়। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জৈন ধৰ্ম। মূখ্যত, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহস্বরূপ এসব নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটে। জৈন ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে বর্ধমান মহাবীরের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জৈন কিংবদন্তী অনুসারে ২৪ জন তীর্থঙ্কর এই ধর্ম প্রচার করেছিলেন। শেষ তীর্থঙ্কর ছিলেন বর্ধমান মহাবীর। অন্যান্য তীর্থঙ্করদের মধ্যে পার্শ্বনাথ ছাড়া অন্যদের সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।

তিনি ছিলেন বেনারসের রাজা অশ্বসেনের পুত্র। মহাবীরের প্রায় ২৫০ বছর আগে তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল। তাঁর প্রধান চারটি শিক্ষা ছিল- (১) প্রাণী হত্যা না করা, (২) মিথ্যা কথা না বলা, (৩) চুরি না করা এবং (৪) সম্পত্তির অধিকারী না হওয়া। শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর এ সঙ্গে সংসারী না হওয়ার শিক্ষা যুক্ত করেন। মহাবীর আনুমানিক ৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশালীর নিকটবর্তী কুন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৩০ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগী হন এবং ত্রয়োদশ বছরে সত্যজ্ঞান লাভ করে কেবলিন (সর্বজ্ঞ), জিন (জয়ী) এবং মহাবীর আখ্যা লাভ করেন। প্রায় ৩০ বছর তাঁর ধর্মমত প্রচারের পর ৭২ বছর বয়সে পাবা নামক গ্রামে অনশনে তিনি প্রাণত্যাগ করেন ।

জৈন ধর্মে অহিংসা ও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জৈনরা কর্মফলে বিশ্বাসী। গত জীবনের কর্মফল থেকে মুক্তিলাভের তিনটি উপায় (ত্রিরত্ন) হল – সৎ বিশ্বাস, সৎ জ্ঞান, সৎ আচরণ। রাজপৃষ্ঠপোষকতা লাভের ফলে জৈন ধর্মের বেশ প্রসার ঘটে। পরবর্তী সময়ে জৈনরা দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর- এ দুটি ভাগে বিভক্ত হলেও তাদের মধ্যে কোন মৌলিক মতভেদ নেই। জৈন ধর্ম ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং আজও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

Leave a Comment