আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে শিক্ষার যে সুযোগ উম্মোচন করে তা এদেশে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশে প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখে। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী পরবর্তীকালে সকল রাজনৈতিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন হতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অসামান্য অবদান রয়েছে।
এছাড়া সমাজ, অর্থনীতিসহ যাবতীয় কর্মকান্ডে দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বড় অংশ বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। গণসচেতনার মূলকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তাই বলা হয় ‘জাতীয় রাজনীতি ও আন্দোলনের সূতিকাগার’ ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো নিরূপ-
পূর্ববঙ্গে মুসলমান শিক্ষা বিস্তার:
মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষাবিমুখতা, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, ব্রিটিশ বিভেদ ও বৈষম্যনীতির কারণে প্রকৃতপক্ষে বঙ্গভঙ্গের আগে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা ও শিক্ষিত সম্পদ্রায় ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। বঙ্গভঙ্গ পূর্ব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ শ্লথ গতিতে হওয়ায় শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল।
১৮৬১ সালে বাংলার সরকারি চাকরিতে হিন্দু ও মুসলমানদের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৬% ও ৫%। বঙ্গভঙ্গের ফলে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বঙ্গভঙ্গের ১ বছরের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানদের চাকরি ক্ষেত্রে অনুপাত দাঁড়ায় ৫:১, যা ১৯১১ সালে এসে দাঁড়ায় ৪:১। বঙ্গভঙ্গের আগে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা একটি পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২০টি সাধারণ শিক্ষা কলেজ, মেডিকেল ও প্রকৌশল কলেজ থাকলেও পূর্ববঙ্গে ছিল মাত্র ৯টি। অবিভক্ত বাংলার মোট ৪৫টি কলেজের মধ্যে ৩০টি ছিল পশ্চিম বাংলায়, বাকি ১৫টি পূর্ববঙ্গ ও আসামে।উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায় পূর্ববঙ্গের ছাত্রদের বড় অংশ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যেতেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ২৭,২৯০ জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ৭,০৮৭ জন ছিলেন পূর্ববঙ্গ ও আসামের। যদিও বঙ্গভঙ্গের ফলে এ অবস্থার অনেক উন্নতি হয়। মুসলিম ছাত্র সংখ্যা ১৯০৭ সালে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার ছিল সেখানে পাঁচ বছরের ব্যবধানে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লক্ষ ২০ হাজার।
এসব শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার পর এদের বড় অংশ আর্থিক অসচ্ছলতা, যোগাযোগ সমস্যা ইত্যাদি কারণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতেন না। তাই নতুন শিক্ষিত সম্প্রদায় পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে সমর্থন দেন।
ভারতের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা:
ব্রিটিশ সরকার অন্যান্য অধিভূক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে পূর্ববঙ্গে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। যা হবে বাংলার তৎকালীন গভর্নর লিটনের ভাষায় (১৯২২) “সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সৃষ্টি করবে উচ্চ মেধাসম্পন্ন মানুষ” ।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় অভিহিত করে বলেন “কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যা কোন দিনই হয়ে ওঠতে পারেনি তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করবে।” প্রকৃতপক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অত্যাধিক চাপ হ্রাসও ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণ হিসেবে কাজ করে।
বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ:
বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। ব্রিটিশ বিভেদনীতির স্বরূপ তাদের কাছে উম্মোচিত হয়। মুসলিম তরুণদের বড় অংশ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের জন্য মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
হতাশগ্রস্ত তরুণ মুসলমানদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হতে ফিরিয়ে আনতে ১৯১১ সালে সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গের রদ ঘোষণার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেন। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য একটি সান্ত্বনা পুরস্কার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য পি.জে. হার্টগ এবং বাংলার গভর্নর ও আচার্য লর্ড লিটনও এক বক্তৃতায় মুসলমান ক্ষতিপূরণ প্রদানের দিকটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য:
বিভেদ-নীতির প্রবক্তা ব্রিটিশ সরকারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সক্রিয় ছিল। ব্রিটিশ সরকার নিয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন তাদের সুপারিশে বলেন, পূর্ববঙ্গের মুসলিম ছাত্ররা শুধু আরবি-ফার্সি অধ্যায়নের জন্যই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে। সুচতুরভাবে পূর্ববাংলার মুসলমান ছাত্র সমাজকে জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দূরে রাখার এটা ছিল ঘৃণ্য প্রচেষ্টা।
এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আরবি বিভাগের প্রধান করা হয় একজন ইউরোপিয়কে যিনি ছিলেন একজন খৃস্টান। আচার্য লর্ড লিটন প্রথম ব্যাচের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুসলমানদের শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ কারণে প্রথম থেকেই ব্রিটিশদের প্ররোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
কোন কোন বিশেষজ্ঞ অভিমত প্রকাশ করেন যে, ব্রিটিশ বিভেদ নীতির একটি কৌশল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ইংরেজ কর্মকর্তা রিজলির বক্তব্য এখানে প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “ঐক্যবদ্ধ বাংলা ইংরেজদের জন্যে একটি বিপদজ্জনক শক্তি, বিভক্ত হলে বাংলা আর আমাদের তেমন বিপদে ফেলতে পারবে না।”
ব্রিটিশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ও চাকরির ব্যাপ্তি ঘটিয়ে খানিকটা অগ্রসর করে হিন্দু প্রধান পশ্চিমবঙ্গকে চাপে রাখতে চেয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের চলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাত চাঙ্গা করে নির্বিঘ্নে দেশ শাসন করতে চেয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশদের এ পরিকল্পনা পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য শাপে বর হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের অবহেলিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আশা-আকাক্ষার সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে তা সম্পূর্ণভাবে ধুলিস্যাৎ হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য ১৯১২ সালে জানুয়ারি মাসে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ১৯০৫-১১ সালে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ অংশে যে অগ্রগতি হয়েছে তা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন।
এই সফরের পরই তিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার সুপারিশ করেন। যদিও হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ এর বিরোধিতা করেন। ড. রাসবিহারী ঘোষের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মানেই বাংলা ভাগ হয়ে যাবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অবিভক্ত বাংলার দরদী হিসেবে তাঁরা একথা বলছেন।
অবশ্য এই বিরোধিতা সত্ত্বেও ভাইসরয় ১৯১২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলা সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা পেশের আহ্বান জানান। এর ভিত্তিতে পরের মাসেই বাংলা সরকার এস. নাথালের নেতৃত্বে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশন ঢাকায় একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনও ১৯১৭ সালে প্রতিবেদনে পূর্ববঙ্গে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরে। যদিও প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোন অগ্রগতি হয়নি। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট পাশ করা হয়। এই এ্যাক্টের আওতায় ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।
৩টি অনুষদের অধীনে ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৩টি আবাসিক হল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ছিলেন। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বড় অংশই ছিলেন হিন্দু। ১৯৩৭ সালে এসেও একই অবস্থা বিরাজ করে। তখন মুসলমান শিক্ষার্থী ছিলেন ৩৯৫ জন এবং হিন্দু ১,৯৩৭ জন। প্রতিষ্ঠালগ্নের ৬০ জন শিক্ষকের মধ্যে শুধু ৮ জন ছিলেন মুসলমান।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ
বঙ্গভঙ্গের আগে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হলেও তা ধীর গতিতে হয়েছে। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী বেশ কিছু ব্যাপারে হিন্দু ভদ্রলোকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়। সাহিত্য, শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায়।
ব্রিটিশ নীতির ফলে বঙ্গভঙ্গ পূর্ববর্তী সময়ে এসব ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা লাভে মুসলমানদের ব্যর্থতা ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের অগ্রগতির ফলে মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংহতি ও হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই দ্বন্দ্ব মুসলমানদের বাঙালি আত্মপরিচয়কে আড়াল করে মুসলমান জাতীয়তাবাদে উদ্ধুদ্ধ করে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ, পরের বছর মুসলিম লীগ গঠনের পর হিন্দুদের বিরোধিতার ফলে মুসলিম জাতীয়তাবাদ আরো চাঙ্গা হয়। ১৯০৫-১১ সাল পর্যন্ত শিক্ষা, চাকুরি, কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে মুসলিম মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এতোদিন অভিজাত সম্প্রদায় থেকেই শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হয়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে গ্রামীণ উদ্বৃত্ত কৃষক পরিবারকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত করে।
তাই বলা যায় যে, বঙ্গভঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলার মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত শ্রেণীর একাংশের সাথে এসে যুক্ত হয় কৃষক সন্তানরাও। এভাবে বিশ শতকের গোড়ার দিকেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশের ফলে হিন্দু মধ্যবিত্তের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়। গ্রাম থেকে শুরু করে শহরে ব্যবসা, চাকুরি ও অন্যত্র হিন্দু-মুসলিম মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্ব জন্ম দেয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতে।
বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মধ্যবিত্তের বিকাশের ধারা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। ১৯০৫-১১ সাল পর্যন্ত গোটা ভারতবর্ষে শিক্ষার্থী ৩৭% বৃদ্ধি পায়, অথচ পূর্ববঙ্গে এ বৃদ্ধির হার ছিল ৮২.৯% যা সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ। এদের মধ্যে মধ্যবিত্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ওয়াকিল আহমদ তাঁর ‘উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানদের চিন্তাচেতনার ধারা’ গ্রন্থে বলেছেন, উনিশ শতকে যে সমস্ত উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান ব্যক্তিত্ব সমাজ ও রাজনীতিতে বিশিষ্ট ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বঙ্গভঙ্গের পর শিক্ষা বিারের এই ধারা অব্যাহত থাকে। এছাড়া মুসলমান সংস্কারকদের প্রভাবে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটে।
শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা শিক্ষার পর জীবিকার নিশ্চয়তা ও ব্যবসায় সুযোগ না পেয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে বিভিন্ন দাবি পেশ করে। বঙ্গভঙ্গকালীন সময়ে চাকুরির ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালায়। ১৯৩০-এর দশকে এসে তাই মুসলিম মধ্যবিত্তরাও হিন্দু নেতাদের সাথে একমত ছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমেই কেবলমাত্র মুক্তি সম্ভব।
যদিও স্বদেশী আন্দোলনের কারণে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সে সময় বাধাগ্রস্থ হয়- যা আর কখনো দু’সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের ঐক্য ঘটাতে পারেনি। তবে উভয় সম্প্রদায় স্বায়ত্তশাসনের দাবি অব্যাহত রাখে। প্রকৃতপক্ষে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের জিয়ে রাখা সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ড ক্রমান্বয়ে ভারত বিভাগের রাজনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ফজলুল হক মন্ত্রিসভা গঠন এবং পরবর্তী এক দশক (১৯৪৭ পর্যন্ত) বাংলায় মুসলিম শাসনের ফলে নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এসময় বিশেষ করে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার গৃহীত কর্মসূচির ফলে জমি ও কৃষিভিত্তিক জীবন থেকে উঠে আসা নতুন মধ্যবিত্ত সমাজ আচার-আচরণ, পোশাকে, রাজনীতিতে, সাংস্কৃতিতে নব্য বাঙালিতে রূপান্তরিত হয়।
ফজলুল হক কৃষক সমাজকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করায় হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পাশাপাশি মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ দ্রুত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে থাকে। অবশ্য ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন বড় অংশই ছিলেন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, কৃষক-প্রজা পার্টি যে ৩৬টি আসন পায় তার সবকটি গ্রামে এবং মুসলিম লীগ যে ৩৯টি আসন পায় তার মধ্যে ৬টি শহরের আসনে জয়ী হয়।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানি জাতিগত নিপীড়নের ফলে পূর্ববাংলায় বাঙালি মুসলিম শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে নব চেতনার বীজ বপন হয় যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষা আন্দোলনে। অবশ্য এ পর্যায়ে বাঙালি হিন্দু-মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ধর্মীয় সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব পরিবর্তিত হয়ে বাঙালি-অবাঙালি তথা জাতিগত মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এতদিন হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বারা শহর ও গ্রামাঞ্চলে মুসলমানরা নিয়ন্ত্রিত হতো। সংখ্যায় কম, শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতা এবং পেশায় পশ্চাতপদতার কারণে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী শুধু জমিদার ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। মুসলমানদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের শূন্যতাও ছিল।
বিশ দশকের মাঝামাঝি বাঙালি মুসলমান বলে উপমহাদেশে যে শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে, তার মূল স্রষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ। ত্রিশের দশকে এসে দেখা যায় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়নকারী ছাত্রদের বড় অংশ ক্ষুদ্র তালুকদার ও কৃষকের সন্তান। এভাবে বিশ-ত্রিশের দশকের মধ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজের উত্থানের মধ্যদিয়ে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় নিয়ামক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।
এ অবস্থা চল্লিশের দশক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। গ্রামীন বিত্তবানের সন্তানরা তখনো কলকাতামুখী, কারণ কলকাতাই তখন সব। ঢাকায় পড়া মানে মফস্বল পড়া- বিদ্যমান একরকম একটা মনোভাবের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অগ্রাধিকার পায় স্বল্প সুযোগপ্রাপ্ত এবং কলকাতায় গিয়ে অধ্যায়নে অসামর্থ মুসলিম কৃষক ও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা। তারা চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের পূর্ববঙ্গে একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও গড়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে নবগঠিত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে একটি শক্তিশালী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভিত গড়ে ওঠে। এর প্রাণস্বরূপ বিরাজ করতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ। ছাত্র জীবন সমাপ্ত করে এরা বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি চাকুরিতে যোগ দেয়। এদের মধ্য থেকেই গড়ে ওঠে আইনজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, মধ্যবর্তী স্তরের সকল পদে এরা নিযুক্ত হন।
এদের নিয়েই গড়ে ওঠে পূর্ববঙ্গে উঠতি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী। একারণেই আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পূর্ববঙ্গে নতুন প্রশাসনে বাঙালি মুসলমানের যোগ্য লোকের অভাব দেখা দেয়নি। বরং একটা ভাল ‘টিম’ নতুন পূর্ববঙ্গ পেয়ে যায়। সচিবালয় থেকে আদালতে কোথাও লোকের অভাব হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রজন্মের অনেকেই পরবর্তীকালে বিভিন্ন বড় পদও গ্রহণ করেছেন
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাঁচজন মন্ত্রী নিযুক্ত হন যারা ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।এছাড়া পূর্ববঙ্গের মন্ত্রিসভার তিনজন গভর্নর, একজন হাইকোর্টের বিচারপতি, তিনজন উপাচার্য, একজন চিফ হুইপ, একজন স্পিকারও এ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছিলেন। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের প্রায় অর্ধেকেই এসেছেন গ্রামের ক্ষুদ্র ভূস্বামী, জোতদার, তালুকদার এবং সমর্থ কৃষক অর্থাৎ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে।
অন্যরাও ছিলেন শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তান। পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রাপ্ত এলিট হিসেবে এরা ছিলেন গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের উর্ধ্বে। বাঙালি মধ্যবিত্তের মধ্যে তাই পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বদলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। একারণে তারা জিন্নাহসহ উর্দুভাষীদের প্রত্যাখান করে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ প্রত্যাশার প্রচেষ্টা ।
পূর্ববাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রভাব
পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভূমিকা রয়েছে-
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাব:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে ঢাকা শহর পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের কেন্দ্রে পরিণত হয়। হল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বক্তৃতা অনুষ্ঠানে শহরের এলিটরা অংশ নিতেন। অনেক বিদেশী বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীর আগমনে বিশ্ববিদ্যালয় মুখরিত হতো। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা হল, মুসলিম হল, জগন্নাথ হলে বক্তৃতা দেন। পরের বছর কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন।
তাঁদের বক্তৃতা শোনার জন্য শহরের সাহিত্যপ্রেমীরা ভীড় করেন। এমনি করে ঢাকার বাঙালি শিক্ষিতজনদের এক নতুন জগতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২৬ সালে গঠিত হয় ‘সাহিত্য সমিতি’। পরের বছর আবুল হুসেনের নেতৃত্বে এক বিশাল সাহিত্য সম্মেলনে এক হাজার সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবী যোগ দেন। বিশের দশকের এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে স্বতন্ত্র সাহিত্য শিল্প ধারা সৃষ্টি হয়।
এসময় একদল মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে ‘শিখা’ নামক সাময়িকী প্রকাশিত হয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বড় অংশ ছিলেন বাম চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী। কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-যুবকদের ওপর শিখার চিন্তা-চেতনার দ্রুত প্রসার ঘটে। এভাবে শিখা শুধু ঢাকা নয়, বাংলার মুসলমান মানসে অভূতপূর্ব প্রভাব সৃষ্টি করে ।
সামাজিক প্রভাব:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে যে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটে এর ফলে ক্রমান্বয়ে একটি প্রগতিশীল ধারার সৃষ্টি হয়। পূর্ববঙ্গের গোড়া মুসলমান সমাজের রক্ষণশীলতা ভাঙতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মন্ত্র-মুগ্ধের মতো কাজ করে। প্রথমবস্থায় সহশিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে এই অঞ্চলে অনাগ্রহ থাকলেও পরে কোনো যুক্তিই এক্ষেত্রে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি।
ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা এখানে এসে বিদ্যার্জন করেছেন। সামাজিক বাধা অতিক্রম করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ ১৯২১ সালে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এম.এ. ডিগ্রীধারী। এরপর ১৯২৩ সালে তিনজন মেয়ে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে ছাত্রী সংখ্যা বেড়ে ৩৯ ও পরের বছর ৫৯-এ উন্নীত হয়। ১৯৪৬-৪৭ সালে ছাত্রী সংখ্যা ১০০ জনে উন্নীত হয়।
অবশ্য এদের বড় অংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের। মুসলিম মধ্যবিত্তের জড়তা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সংশয় সামগ্রিকভাবেই কাটতে সময় লেগেছিল। মুসলিম ঘরের মেয়েরাও তাই বাঙালি হিন্দুদের অনুসরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন ফয়জুননেছা। তিনি ১৯২৫ সালে ভর্তি হন।
প্রথম মহিলা শিক্ষক করুণাকনা গুপ্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৩৫ সনে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রতিক্রিয়াশীলতার মূলেই আঘাত হানেনি, চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। ইংরেজি শিক্ষা এতোদিন মুসলমানরা বর্জন করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে ইংরেজি শিক্ষা তারা গ্রহণ করতে শুরু করে ।
রাজনীতিতে প্রভাব :
ত্রিশের দশকে বিপ্লবী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল ছিল পূর্ব বঙ্গের বিপ্লবী কর্মকান্ডের প্রধান কেন্দ্র। বিপ্লবী দল হিসেবে ‘অনুশীলন সমিতি’ গঠিত হয় ঢাকাকে কেন্দ্র করে পুলিন বিহারী দাসের নেতৃত্বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পরে শিক্ষক প্রফুল্ল চন্দ্র মুখার্জী ছিলেন ‘শ্রী সংঘের’ সদস্য।
অনিল রায় গঠন করেছিলেন ‘দিশারী সংঘ। তাঁর যোগ্য সহযোগী ছিলেন লীলা নাগ। ইতিহাস বিভাগের কৃতি ছাত্র হরিশচন্দ্র ভট্টাচার্য সূর্যসেনের নেতৃত্বে অস্ত্রাগার লুন্ঠনে অংশ নেন ও জেল খাটেন। অনিল রায় ও লীলা নাগসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার হন। ১৯৩২ সালে আশালতা সেনের নেতৃত্বে ঢাকার মহিলারা আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষিকা করুণাকনাও বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৩৮ সনে গ্রেপ্তার হন। পরের বছরই তিনি ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। অবশ্য ব্রিটিশ আমলে বিপ্লবীদের অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ক্রমান্বয়ে স্বার্থগত কারণে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে দূরে সরে আসতে থাকে।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা, মুদ্রা, ডাকটিকেট থেকে বাংলা বাদ দেয়ার ফলে বাঙালি ছাত্ররা প্রতিবাদ জানান। সরকারি উচ্চপদে নিয়োগের শর্ত হিসেবে উর্দুতে পরীক্ষা দেয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিনিধি দল মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিবাদ জানায়। এসময় মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে তাদের প্রতিষ্ঠা, রুটি-রোজগার নিয়ে ভাবিয়ে তোলে।
তাই এ শ্রেণী প্রথম থেকেই ভাষা সমস্যাকে কেবল সাংস্কৃতিক সমস্যা নয়, বরং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবি আদায়ের সংগ্রাম হিসেবে দেখতে শুরু করে।
যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ১৯৪০ সালের পর হিন্দু আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছে এবং এক পর্যায়ে লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনী নিয়ে ফজলুল হক-জিন্নাহ দ্বন্দ্ব হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে অবাঙালি জিন্নাহকে সমর্থন করেছে, তারাই আবার উর্দুর পৃষ্ঠপোষক জিন্নাহকে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
এসময়ে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি শিক্ষিত শ্রেণী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়েছে। এভাবে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি বিরোধী ধারা সৃষ্টি হয়েছে, তারাই ষাটের দশকে তুলে ধরেছে অর্থনৈতিক শোষণের চিত্র। এভাবে বাঙালি জনগণ এগিয়ে গেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে।
সেখানেও নেতৃত্ব, আত্মত্যাগের মহিমায় এ বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জন শিক্ষক, ১১৫ জন ছাত্র ও ২৮ জন কর্মচারী শহীদ হন।
সারসংক্ষেপ
পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রসার, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ও বিকাশ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পশ্চাৎপদ পূর্ববঙ্গকে কলকাতা কেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে শিক্ষা- সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অবস্থান নেয়ার জন্য প্রস্তুত করতে এ বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ধারা সৃষ্টি করে যা ছিল প্রগতিশীল ও সংস্কারমুক্ত।
ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে নতুন এই বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীই ক্রমে সমাজ ও রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নবজাগ্রত বাঙালি জাতীয়তাবাদের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে যারা আগ্রহী ভূমিকা পালন করেন তাদের বড় অংশও এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই সৃষ্টি।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। রতনলাল চক্রবর্তী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ ১৯২১-২০০০, ঢাকা, কল্যাণ প্রকাশন, ২০০২ ।
২। মোহাম্মদ হাননান, বাঙালির ইতিহাস, ঢাকা, অনুপম, ১৯৯৮ ।
৩। আতিউর রহমান ও লেনিন আজাদ, ভাষা আন্দোলন, অর্থনৈতিক পটভূমি, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯০।
৪। জাহেদা আহমেদ, “রাষ্ট্র ও শিক্ষা”, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, তৃতীয় খন্ড, ঢাকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০০ ।
৫। Muhammad Abdur Rahim, The History of the University of Dacca Dacca, University of Dacca, 1981.

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশের বর্ণনা দিন ।
২। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা লিখুন ।
রচনামূলক প্রশ্ন :
১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণ কি ছিল লিখুন। পূর্ববাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব বিশ্লেষণ করুন।
২। বিশ শতকের গোড়া থেকে বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ বর্ণনা করুন। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলোচনা করুন ।
