ঢাকা মেডিকেল কলেজ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পূর্ববাংলার উঁচু স্তরের প্রথম পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৬ সালের ১লা জুলাই। ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রায় ১১১ বছর পর এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঔপনিবেশিক ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এই মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে অনেক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্ববাংলায় কোনো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নানা কারণে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হতে বিলম্ব হলেও প্রধানত অর্থনৈতিক ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতার কারনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ১৯২৯ সালে নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তি জগমোহন পাল এর অনুদানের ওপর ভিত্তি করে এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পূর্ববাংলার সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও জনসাধারণের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং ১৯৪৩ সালে গঠিত হেলথ সার্ভে এন্ড ডেভেলপমেন্ট কমিটি’ বা ‘ভোর কমিটি’র সুপারিশের ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য (১৯৪৭-১৯৭১) সূচিপত্র

প্রথম অধ্যায় : ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
- অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থা
- ঔপনিবেশিক ভারতের স্বাস্থ্যগত নানাসংস্কার, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন (১৮৩৫-১৯১২)
- ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব (১৯১২)
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্ট সংকটের কারণে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় পরিবর্তন
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন (১৯১৭-১৯১৯) এর প্রতিবেদনে মেডিসিন অনুষদ গঠনের প্রস্তাব
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট এ মেডিসিন অনুষদ অন্তর্ভুক্তিতে বিশিষ্টজনের নানা মতামত
- মেডিসিন অনুষদ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা
- অর্থনৈতিক সংকট
- জগমোহন পাল এর অনুদান
- মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় রমেশচন্দ্র মজুমদার এর পদক্ষেপ
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট
- মেডিকেল স্কুলকে কলেজে রূপান্তরের প্রস্তাব বহাল ও পূর্ববাংলার জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া
দ্বিতীয় অধ্যায় : ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাথমিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়ন ১-৭-১৯৪৬ – ১৫৮-১৯৪৭
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাথমিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়ন
তৃতীয় অধ্যায় : ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাডেমিক ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও বিকাশ, ১৫-৮-১৯৪৭ – ৩১-১২-১৯৭১
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাডেমিক ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও বিকাশ
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন একাডেমিক বিভাগের উন্নয়ন
- প্রি-ক্লিনিক্যাল বিভাগ
- এনাটমি বিভাগ
- ফিজিওলজি বিভাগ
- ফার্মাকোলজি বিভাগ
- কেমিস্ট্রি বিভাগ
- প্যাথলজি বিভাগ
- ফরেনসিক মেডিসিন ও মেডিকেল জুরিসপ্রুডেন্স বিভাগ
- হাইজিন ও পাবলিক হেলথ বিভাগ
- ক্লিনিক্যাল বিভাগ
- তৃতীয় অতিরিক্ত ফিজিশিয়ানের ওয়ার্ড
- সার্জিক্যাল ইউনিট
- ক্লিনিক্যাল সার্জারি বিভাগ
- অতিরিক্ত সার্জনের ওয়ার্ড
- অবসটেট্রিকস ও গাইনোকোলজি ইউনিট
- ক্লিনিক্যাল মিডওয়াইফারি ও গাইনোকোলজি বিভাগ
- অফথালমোলজি বিভাগ
- রেডিওলজি ও রেডিও থেরাপেটিক বিভাগ
চতুর্থ অধ্যায় : ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও বিকাশ, ১৫-৮-১৯৪৭ ৩১-১২-১৯৭১
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও বিকাশ
- মেডিকেল কলেজ ভবনের সংযোজন ও পরিবর্তন
- ভর্তি প্রক্রিয়া
- সংক্ষিপ্ত এম.বি.বি.এস. কোর্স
- পরীক্ষা পদ্ধতি ও ফলাফল
- বৃত্তি প্রদান
- শিক্ষক নিয়োগ
- বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ
- বিদেশি চিকিৎসকদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ পরিদর্শন
- লাইব্রেরি ও গবেষণাগার
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতি
- মেডিকেল অধ্যাদেশ এর সংযোজন, পরিবর্তন ও সংশোধন
পঞ্চম অধ্যায় : ঢাকা মেডিকেল কলেজের নারী চিকিৎসক: জ্ঞান আহরণ ও সেবা
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের নারী চিকিৎসক: জ্ঞান আহরণ ও সেবা
- ঔপনিবেশিক ভারতে চিকিৎসাশিক্ষা ও সেবায় নারীদের আগমন
- পূর্ববাংলার নারীদের চিকিৎসাশিক্ষায় আগমন
- ঢাকা মেডিকেল কলেজে নারী শিক্ষার্থীদের আগমন
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সেবা ও অবদান
ষষ্ঠ অধ্যায় : ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবদান
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবদান
- সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজ
- মেডিকেল কলেজের খেলাধুলা
- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের অবদান
- ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের অবদান
- ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের অবদান
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দাবিদাওয়া
- জনকল্যাণমূলক বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ
- মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের অবদান

উপসংহার
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভারতের ঔপনিবেশিকতার প্রথম দিকে ইংরেজ শাসকগণ প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো হস্তক্ষেপ করেনি, বরং ইংরেজ চিকিৎসকগণের সহকারী হিসেবে দক্ষ দেশীয় চিকিৎসকদের সামরিক ও বেসামরিক কাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কলকাতা মাদ্রাসা (১৭৮১) ও কলকাতা সংস্কৃত কলেজ (১৮২৪) প্রতিষ্ঠিত হলে পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষার সাথে দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির ক্লাস শুরু হয়।
১৮৩৫ সালে কলকাতা মাদ্রাসা ও কলকাতা সংস্কৃত কলেজের চিকিৎসাশিক্ষার ক্লাস বন্ধ করে দিয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার অবনতি শুরু হয়। দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা সরকারি পৃষ্ঠপোষকহীনভাবে চলছিল। এটা কবিরাজদের নিজ উদ্যোগে চলতে থাকে।
এরপর (১৮৩৫) থেকে ব্রিটিশ সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি অনুসারে ভারতে দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনো স্থান ছিল না, ছিল শুধু পাশ্চাত্য চিকিৎসা ব্যবস্থা। ব্রিটিশ শাসকদের লক্ষ্য হলো পাশ্চাতা জ্ঞান ক্রমান্বয়ে ভারতীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।
তাদের এই নীতি সাধারণ শিক্ষা থেকে শুরু করে পাশ্চাতা চিকিৎসাশিক্ষা পর্যন্ত ব্যাপ্তি লাভ করে। এটা ছিল ব্রিটিশদের ক্ষমতা ও জ্ঞানের আধিপত্য, কারণ তাদের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হলে পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষা প্রচলন করা সম্ভব হয়। এই আধিপত্যের প্রভাব কেবল কলকাতা নয় পূর্ববাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে।
পূর্ববাংলার প্রথম পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষার কলেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের জ্ঞানের আধিপত্য আরো বিস্তার লাভ করে। এই মেডিকেল কলেজ পাশ্চাত্য জ্ঞানের আধিপত্যের ফসল হলেও পূর্ববাংলার সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদসহ সর্বসস্তরের জনসাধারণ পাশ্চাত্যের উঁচুস্তরের এই চিকিৎসাশিক্ষাকে স্বাগত জানায়। কারণ তাঁরা ঢাকায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎকালীন ভারত সরকারের কাছে দাবি জানায়।
ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের জনগণ পাশ্চাত্য চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিবাচক দিক ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে অবগত হয়। তারা পূর্ববাংলার ঢাকায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়। অর্থনৈতিক কারণে এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা বিলম্বিত হতে থাকলে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি তথা জগমোহন পাল এর অনুদানের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
ব্যক্তি উদ্যোগের প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করেই সরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয়। অর্থ্যাৎ ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় সরকারি বেসরকারি উহা দিক থেকে সহায়তা করা হয়, তবে ব্যক্তি প্রচেষ্টার পরিমাণ সামান্য হলেও সরকারি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সহায়তা করা হয়।
সরকারি বেসরকারি উভয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে পূর্ববাংলার প্রথম মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে এই অঞ্চলের জনগণের চাওয়া পাওয়া পূরণ হয়। এর ফলে একদিকে যেমন উন্নত চিকিৎসক শ্রেনি তৈরির পথ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্বে পূর্ববাংলার সর্বসাধারণ এই চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত ছিল।
পূর্ববাংলার প্রথম মেডিকেল কলেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মান যাতে বিশ্বমানসম্মত হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়। এজন্য কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুতে ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে মেধাবী এবং কম মেধাবী ছাত্রদের প্রাক- মেডিকেল পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়।
এ ক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণকে উপেক্ষা করা হয় বরং মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের (হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, তপশিলি জন্য সুনির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ থাকলেও যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা অন্য সম্প্রদায়ের যোগ্য প্রার্থীদের দ্বারা পূরণ করা হয়। উপরস্ত্র ভর্তির ক্ষেত্রে এই মেডিকেল কলেজ অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দেয়া।
পূর্ববাংলা মুসলমান অধুষ্যিত অঞ্চল হলেও মেডিকেল প্রতিষ্ঠান শুরু থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ১% প্রতিনাকে কেন্দ্র করে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা যেন না হয়, এই ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষ পূর্ব থেকেই সজাগ ছিলেন। তৎকালীন সময়ে নারী শিক্ষার হার কম হওয়ায় এবং মার্তমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় নারীরা যাতে চিকিৎসক হয়ে এই অঞ্চলের মা ও শিশুর সুচিকিৎসা নিতে পারে, সেজন্য নারীদের জন্য কিছু আসন (১০টি) সংরক্ষণ করা হয়। প্রথম ব্যাচে দুইজন ছাত্রী ভর্তি হলেও পূর্ববাংলার কোনো নারী শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি।
ভর্তি প্রক্রিয়াকে যথেষ্ঠ যাচাই বাছাই করে সম্পন্ন করা হয়। কখনও কখনও জেনারেল কমিটির চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। জেনারেল কমিটি কর্তৃক অযোগ্য ছাত্রকে ভর্তির জন্য সুপারিশ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি তা নাকচ করে দেয়।
মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম এক (১) বছরের মধ্যে দেশ বিভাগ হলে কলেজে পুনরায় ভাঙ্গা গড়া প্রক্রিয়া শুরু হ্যা।
কলেজের অধিকাংশ হিন্দু শিক্ষক, ছাত্র কলকাতা মেডিকেল কলেজে চলে যায় এবং কলকাতা মেডিকেল কলেজের পূর্ববাংলার ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসে। সরুতে এই মেডিকেল কলেজের সাজসরঞ্জামাদি ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, অবকাঠামোগত অভাব বিদ্যমান ছিল। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রথম দশ (১০) বছরের মধ্যে এই মেডিকেল কলেজ পরিপূর্ণতা লাভ করে। মেডিকেল কলেজের মান বিশ্বমানসম্মত করার জন্য লক্ষ দেশি বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়।
এই দক্ষ শিক্ষকগণ কলকাতা মেডিকেল কলেজের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা নিয়ে পূর্ববাংলায় আসে। এসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিগন এই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করে। ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত নতুন রাষ্ট্রের নানা বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের অগ্রগতি আজ পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে।
বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি পূরণের জন্য দেশ বিভাগের কারণে উত্তরাধিকারসূত্রে পূর্ববাংলার যে অংশ প্রাপ্য ছিল তা পশ্চিম বাংলার সাথে ভাগাভাগি করার প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণে যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে ক্রয় করা হয়।
দেশ বিভাগের পরপরই ঢাকা মেডিকেল কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায়। এই উন্নয়ন সময়ের প্রয়োজনের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। যে কারণে মেডিকেল কলেজ ভবনকে কখনও সংযোজন ও পরিবর্তন করা হয়। এই উন্নয়নের ধারা চলমান ছিল এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন বিভাগের উন্নয়ন ও সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
শুরুতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নানা রকম সমস্যা থাকলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান অব্যাহত ছিল, কেননা কলেজে কিছু বিভাগ (গাইনোকোলজি, সংক্রামক রোগ, নাক, কান, গলা ও দপ্ত) ভালোভাবে সুসজ্জিত না হওয়ায় মিটফোর্ড হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল স্কুলে পাঠদান সম্পন্ন হতো।
চিকিৎসাশিক্ষার অন্যতম একটি বিষয় হলো এনাটমি। শুরুতে এই কলেজে ডাইসেকশন হল ा কा প্রথম মাস ডাইসেকশন ক্লাস মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হতো। পরবর্তীতে দেশ বিভাগের কারণে এনাটমির ক্লাস বন্ধ থাকেনি। পুরাতন শিক্ষক চলে গেলেও নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিক এবং দেশ বিভাগের কারণে সাময়িক সমস্যা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, বরং দেশ বিভাগের পর মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়। এই উন্নয়নের ওপর কলেজের স্বীকৃতির ব্যাপারটি জড়িত ছিল।
স্বীকৃতির দ্বারা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসাশিক্ষার মান বিশ্বমানসম্মত কিনা তা নির্দেশ করে। পাকিস্তান শাসন আমলের শুরুতে স্বীকৃতির ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষের রক্ষণশীল মনোভার ও উদাসীনতা থাকলেও ছাত্রছাত্রীর দাবির কাছে এবং পাকিস্তান মেডিকেল কাউন্সিলের পরিদর্শন কমিটি কর্তৃক কলেজে ত্রুটি বিচ্যুতি চিহ্নিত করায়, অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। এই উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মেডিকেল কাউন্সিল এবং ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল ঢাকা মেডিকেল কলেজকে স্বীকৃতি দেয়।
ব্রিটিশ জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপরটি ছিল এই কলেজের জন্য বিরাট সফলতা। এর দ্বারা ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসাশিক্ষার পঠন পাঠন, সিলেবাস, শিক্ষক, চিকিৎসাশিক্ষা পদ্ধতি তথা কলেজের সামগ্রিক চিকিৎসাশিক্ষার ব্যবস্থা যে বিশ্বমানের, তা নির্দেশ করে। এই কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজকে এডিনবার্গ অব দি ইস্ট’ বলা হয়।
এই ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে উল্লেখ করা হয় যে, বার্থ অব দি ইস্ট কলার পেছনে কারণ ছিল সর্বোচ্চ মানের শিক্ষক মন্ডল দেশের সবচেয়ে বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর পাশাপাশি মেধাবী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে ভারত উপমহাদেশে পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষা প্রবর্তনে বাধার সম্মুখীন হলেও পূর্ববাংলা কোনো বাধার সম্মুখীন হয়নি। ব্রিটিশ শাসন আমলের সমাপ্তির পরে পাকিস্তান শাসন আমলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য ব্যাপক আন্দোলন করতে হয়।
এ ছাড়া কলেজের ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসকগণ পেশাগত মর্যাদা, উচুস্তরের বেতনভাতার জন্য আন্দোলন করে। তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৮ সালে সরকারি চাকুরিরত চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেনির কর্মকর্তার পাবি এবং ১৯৭০ সালে সদ্য পাশ করা চিকিৎসকদের ইন্টার্নিশিপ ব্যবস্থার দাবি মেনে নেয়।
পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও চিকিৎসকের স্বল্পতা ছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। পাশ করা চিকিৎসকদের বেশিরভাগ উল্লিখিত উপযুক্ত সুযোগসুবিধা না পাওয়ায় বিদেশ গমন করে। ১৯৫৯ সালে করাচিতে বিজ্ঞান মেডিকেল ইনস্টিটিউট উদ্বোধনের সময় প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান বলেন, উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত ডাক্তারের অভাব দেশের একটি প্রাথমিক সমস্যা ছিল। তবে কড়িশার মেডিকেল কলেজ স্থাপন করায় এই সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়।
কিন্তু এখনও যথেষ্ট সংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষালা মার্কারের অভাব রয়েে ১৯৬০ এর দশকের শুরু পর্যন্ত পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা বের হতো। একটি মাত্র মেডিকেল কলেজের পাশ করা ছাত্রদের দ্বারা সমগ্র দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া এই মেডিকেল কলেজের অধিকাংশ ছাত্র চাকুরি ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যেত।
এর ফলে চিকিৎসকদের ঘাটতি বরাবরই বিদ্যমান ছিল। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারি চিকিৎসক সমিতির অনুষ্ঠিত এক বার্ষিক সাধারণ সভায় সার্বজনীন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এবং সকলের ঘরে সমানভাবে চিকিৎসার সুযোগসুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে আনার প্রস্তাব করা হয়।
এজন্য উপযুক্ত চিকিৎসকগণকে যথাযথ বেতন ও ভাতা দিয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিল ও বিভিন্ন হাসপাতালে নিযুক্ত করার দাবি জানানো হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশ করা চিকিৎসকগণ বেশিরভাগ রাজধানী ঢাকাসহ, জেলা শহর হাসপাতালগুলোতে চাকুরি করত। মফস্বলে তাঁরা চাকুরি করত না। তৎকালীন সময়ে এই মেডিকেল কলেজের পাশ করা চিকিৎসকগণ সরকারি চাকুরিতে সুযোগসুবিধা কম থাকায় ৮০% বিদেশে চলে যেতেন।
ফলশ্রুতিতে দেশে উপযুক্ত, দক্ষ, চিকিৎসকের ঘাটতি ছিল। এ ব্যাপারে ১৯৬৬ সালের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা থেকে জানা যায় যে দেশে ডাকারের সংখ্যাসল্পতার কথাও এ প্রসঙ্গে আসিয়া পড়ে। জাকারি পাশ করার পর থেকেই গ্রামে যেতে চান না কিংবা সুযোগ চাইলে বিদেশে গিয়া দেশের কথা ভুলিয়া যান।
তৎকালীন সময়ে চিকিৎসকদের এই সুযোগসুবিধা কম থাকার জন্য পাকিস্তান শাসক শ্রেণি দায়ী ছিল। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের চিকিৎসকদের সবধরনের সুযোগসুবিধা দিলেও পূর্ব পাকিস্তানের চিকিৎসকগণের সুযোগসুবিধা দিতে অনীহা প্রকাশ করে।
পাকিস্তান শাসন আমলে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক, সামরিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্যসহ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নাম বৈষম্য দূর করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। তারাই স্বাস্থ্যখাতের এই বৈষম্য দূরীকরণের নেতৃত্ব দেয়। যা পূর্ববর্তী একটি অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সকল চিকিৎসক তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পেতে সক্ষম হন। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের সাথে পাকিস্তান ঔপনিবেশিক যুগের পার্থক্য ছিল।
ব্রিটিশ শাসকবর্গের ঔপনিবেশিক ভারতে রাজনৈতিক, খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তকরণ, সামরিক, সাম্রাজ্যিক আধিপত্য স্থাপনে মুখ্য এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হলেও পাশ্চত্য জ্ঞানের আধিপত্য দ্বারা এই দেশের সমাজে যেসব কুসংস্কার ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় অবৈজ্ঞানিক চর্চা রয়েছে, তা পূর করা তাদের লক্ষ্য হয়ে পাড়ায়। পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে ভারতীয় জনগণের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুগান্তরী ভূমিকা পালন করে।
যার সুফল সমগ্র ভারতবর্ষের জনগণ আজও ভোগ করছে। পাকিস্তানি শাসকবর্গ ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজের উন্নয়নে তেমন কোনো আগ্রহ দেখাননি। উপরন্ত এই দেশীয় কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পাকিস্তানি শাসকবর্গের সামনে উপস্থাপন করেননি। ফলে কলেজের উন্নয়নসহ জনস্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এসব বৈদমা চিহ্নিতকরণ ও দূরীকরণে এই মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের আরেকটি লক্ষনীয় দিক হলো কোনোরকম সামাজিক বিধি নিষেধ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের বাধা ছাড়াই এই অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তেমন না থাকায় চল্লিশের দশকের চেয়ে পঞ্চাশের দশক থেকে বিপুল সংখ্যক ছাত্রী মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কলেজে ভর্তি হয়।
এসব পাশ করা ছাত্রীরা পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের নারীদের চিকিৎসাসহ সমগ্র জনগণের চিকিৎসা সেবায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের চিকিৎসায় বহু মা ও শিশু সুস্থ হয়েছে। পূর্বে যেখানে সন্তান জন্মদানের সময়ে মাতৃমৃত্যু স্বাভাবিক ছিল, বর্তমান সময়ে এটা কল্পনাও করা যায় না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে অনেক জটিল অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা করা হয়। এই কলেজের ছাত্রীদের লক্ষ হাতে প্রতিবছর স্বাভাবিক ও সিজারের মাধ্যমে সন্তান ভূমিষ্ঠ লাভ করছে। ফলে অনেক মা ও শিশু প্রসবকালীন জটিলতা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। মেডিকেল কলেজের অনেক কৃতী ছাত্রী স্ত্রীরোগ ও প্রসুতি এবং শিশু রোগের ওপর বিশেষজ্ঞ হয়ে বাংলাদেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সব ছাত্রীই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হননি। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের চেয়ে অন্যান্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বেশি। কেউ কেউ রেডিওলজিস্ট, কেউ অ্যানাসনিসিস্ট, কেউ মেডিসিন প্রভৃতি বিশেষজ্ঞ হন। সে সময় নারী চিকিৎসকদের অধিকাংশ সরকারি চাকুরির চেয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস করতেন। তবে নারীদের ইংল্যান্ড) একই অবস্থা বিরাজমান ছিল। এর প্রধান কারণ অন্যান্য বিশেষজ্ঞের চেয়ে একজন গাইনোকোলজিস্টদের কষ্ট ও পরিশ্রম বেশি।
তবে পুরুষ গাইনোকোলজিস্টের চেয়ে নারী গাইনোকোলজিস্ট বেশি দক্ষ এবং অভিজ্ঞ দক্ষ হয়ে থাকেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একজন না চিকিৎসক যত সহজে একজন নারী রোগীকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, তা পুরুষ চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ একজন নারী রোগী পুরুষ গাইনোকোলজিস্টের কাছে সবকিছু খোলামেলা বলতে অপারগ ছিলেন।
যে কারণে নারী গাইনোকোলজিস্ট বেশি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্রীরা গাইনোকোলজিস্ট হয়ে দেশ বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার কাছে বিদেশি চিকিৎসকগণও হার মানেন। আবার এই মেডিকেল কলেজে পাশ করা ছাত্রীরা উচ্চ শিক্ষা নিয়ে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন এবং নতুন চিকিৎসক তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
তাদের অনুসরণ করে প্রতি বছর দক্ষ, যোগ্য চিকিৎসক কলেজ থেকে বের হয় এবং তারা দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা পালন করছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ ও জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পূর্বে এই অঞ্চলের জনগণকে উন্নত চিকিৎসা সেবা নেওয়ার জন্য কলকাতা অথবা পশুনে যেতে হতো।
পূর্ববাংলার অধিকাংশ জনগোষ্ঠী পবিত্র হওয়ায় সবার পক্ষে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার জন্য কলকাতা বা লন্ডনে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া পূর্ববাংলা থেকে কলকাতায় গিয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা নেওয়া কষ্টকর ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলা তথ্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই মেডিকেল কলেজকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে উঁচু স্তরের চিকিৎসক শ্রেণি তৈরির সূচনা হয়। পূর্বে কবিরাজ, বৈদ্য এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল স্কুল থেকে এল.এম.এফ. ডিগ্রি অর্জনকারী নিচু স্তরের চিকিৎসক শ্রেনি ছিল।
ফলে সমাজে উঁচু স্তরের পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষায় পারদর্শী একটি নতুন চিকিৎসক শ্রেনির সৃষ্টি হয়। এই শ্রেনি পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের বা বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ও জনস্বাস্থ্যক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। তারা শুধু চিকিৎসাসেবা দিয়েই নয়, নানা রকম জনকল্যাণমূলক কাজের সাথে যুক্ত থেকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাদের অর্জিত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান বর্তমান বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবাকে আধুনিক থেকে আরো আধুনিক, যুগোপযোগী করে তুলছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাশিক্ষার কঠিন ও জটিল অধ্যয়নের পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা ছিলেন ব্যতিক্রম চরিত্রের। তারা সংগীত, নাটক, নৃত্য, অচন, সাহিত্য প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগাতা দিয়ে শুধু কলেজেই নয়, সমগ্র দেশে খ্যাতি অর্জন করেন। কলেজের কেউ কেউ চিকিৎসাশিক্ষার চেয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতি বেশি মনোযোগী ছিলেন।
আবার কেউ কেউ মেডিকেল কলেজ ছেড়ে সাংস্কৃতিক জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তবে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ছাত্রজীবন শেষে সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রামেননি। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে, তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মেডিকেল কলেজের বর্তমান সময়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে কোনো ছাত্রসংগঠন ছিল না। ১৯৪৯-৫০ সালে প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন (বর্তমান নাম ছাত্র সংসদ) গঠিত হয়। কলেজ ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্যরা শুরু থেকে জাতীয় ও স্থানীয় সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তারা তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ১৯৫২ সালের একুশের আন্দোলনে এই ইউনিয়নই নেতৃত্ব দেয়। উক্ত ইউনিয়নের সহ-সভাপতি গোলাম মাওলা ও সাধারণ সম্পাদক শরফুদ্দিন আহমদ অবিস্মরনীয় ভূমিকা পালন করেন।
গোলাম মাওলার নেতৃত্বেই এবং বদরুল আলম এর নকশা অনুযায়ী সম্মীলিত সবার প্রচেষ্টায় প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়। এটা মেডিকেল কলেজ ছাত্রদের অমূল্য কীর্তি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১৯৪৯ ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্র আহমদ যথাযথই বলেন, শহীদ স্মৃতি অর্থাৎ প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ, পরিকল্পনা, স্থান, নির্বাচন এবং প্রাথমিক উদ্যোগ পুরোটাই মেডিকেল কলেজে হামদের সমন্বিত প্রয়াস।
এটা ব্যারাকের রাজনীতি সচেতন কয়েকজন হারের স্বতঃস্ফূর্ত ও তাৎক্ষনিক বা চিন্তা স প্রথম শহীদ মিনারের উত্তরসুরি আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। আজ তা বাঙালি জাতির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা বিশ্ব পরবারে উপস্থাপিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির এই দিনটিকে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তা উদযাপন করছে। এই ইতিহাস সৃষ্টির পেছনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অন্যতম।
তৎকালীন সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হলো মেডিকেল ব্যারাক নির্ভর রাজনীতি। মেডিকেল ব্যারক ছিল ছাত্ররাজনীতির নিরাপদ আশ্রয় স্থান। এই ব্যারাকে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্র নেতারা পুলিশি দমন পীড়ন থেকে রক্ষা পাবার জন্য আশ্রয় নিতেন। মেডিকেল ব্যারাকে বিভিন্ন মতাদর্শের (ডানপন্থী, বামপন্থী, উদারপন্থী, ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন) ছাত্র ছিল।
ব্যারাকে বামপন্থীদের প্রাধান্য থাকলেও বেশিরভাগ ছিল মধ্যপন্থী। বিভিন্ন মতাদর্শের হলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে এসব ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ ছিল। ছাত্রদের মধ্যে মতাদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য, শৃঙ্খলা ও শান্তির স্বার্থে পরম্পর হানাহানি দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে বিরত ছিল। সে সময় মেডিকেল কলেজের রাজনীতির পরিবেশ ছিল সুষ্ঠু, সুন্দর ও উন্মুক্ত।
জাতীয় সংকটে ঐক্যবদ্ধ থাকায় ১৯৬২’র ছাত্র আন্দোলন, হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে এই মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশাত্মবোধ থেকে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
অন্যদিকে এই কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্র, শিক্ষ চিকিৎসকগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন। এদের কেউ অস্ত্র হাতে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, আবার কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, অর্থ ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সমগ্র বাংলাদেশের শহীদ চিকিৎসকদের সংখ্যার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশ করা চিকিৎসকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এভাবেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা চিকিৎসা সেবা দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করেন, অন্যদিকে জীবন নিয়ে দেশকে স্বাধীন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা শুধু চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেননি, রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংগঠক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন।
