আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় দ্বিতীয় চন্দ্ৰগুপ্ত – যা প্রাচীন ভারতের সাম্রাজ্য এর অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয় চন্দ্ৰগুপ্ত

সিংহাসনারোহণ
সমুদ্রগুপ্ত জীবিতাবস্থায় তাঁর দ্বিতীয় পুত্র চন্দ্রগুপ্তকে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত মনে করে স্বীয় উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। এই মনোনয়ন অনুসারে তিনি ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে পৈত্রিক রাজ্য লাভ করে অতীব যোগ্যতার সাথে রাজকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। চন্দ্রগুপ্তের পিতামহের নামও চন্দ্রগুপ্ত ছিল বলে নতুন ভূ-পতি ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেছেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বলে। তিনি জীবনের শেষভাগে ‘বিক্রমাদিত্য’ (সূর্যসম পরাক্রান্ত) উপাধি ধারণ করেন। অবশ্য তিনি আরো বেশ কিছু নামে অভিহিত ছিলেন, যথা- নরেন্দ্রচন্দ্র, সিংহচন্দ্র, দেবরাজ, দেবশ্রী, দেবগুপ্ত ইত্যাদি।
কতিপয় আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে, সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যু হলে তাঁর প্রথম সন্তান রামগুপ্ত রাজা হন। তিনি এতো দুর্বলচেতা ছিলেন যে, ব্যক্তিগত মান-সম্মানও রক্ষা করতে পারতেন না। একদা তিনি প্রাণের ভয়ে তাঁর সহধর্মিণী ধ্রুবদেবীকে এক অত্যাচারী শক শাসকের হাতে তুলে দিতে সম্মত হন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এই নরপিশাচকে হত্যা করে রাণীর মর্যাদা রক্ষা করেন। অতঃপর তিনি অগ্রজ রামগুপ্তের প্রাণ সংহার করে সিংহাসন লাভের একমাত্র কন্টক দূর করার মাধ্যমে ধ্রুবদেবীকে পরিণয় পাশে আবদ্ধ করেন।
অবশ্য আজ পর্যন্ত এ কাহিনীর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। এমনকি সমসাময়িক উৎকীর্ণ কোনো লিপিতেও রামগুপ্ত নামে কোনো যুবরাজের উল্লেখ দেখা যায় না। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বের প্রায় দুইশত বছর পরে সপ্তম শতাব্দীর ‘হর্ষচরিত’ রচয়িতা বাণভট্টের ‘দেবী চন্দ্রগুপ্তম্’ নাটকে প্রথম চোখে পড়ে যে, চন্দ্রগুপ্ত প্রণয়িনীর ছদ্মবেশে অন্তঃপুরে প্রবেশ করে কামার্ত শকরাজ যখন পরকীয়া প্রেমে মত্ত ছিলেন তখন তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেন। এই শক রাজার নাম রুদ্রসিংহ হলেও আখ্যায়িকায় রামগুপ্ত বা ধ্রুবদেবীর উল্লেখ নেই। এ অবস্থায় অধিকতর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
রাজ্যবিস্তার
উত্তরাধিকারসূত্রে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন। পিতার ন্যায় তিনিও উচ্চাভিলাষী ছিলেন। প্রথম হতেই তিনি ‘বিশ্বজয়’ (এখানে সংকীর্ণ অর্থে ভারত জয়) করার প্রবল বাসনা অন্তরে পোষণ করতেন।এই উদ্দেশ্যে প্রায়ই তিনি পরবর্তীকালীন ইউরোপের হ্যাপসবার্গ ও বুরবন এবং ভারতবর্ষের ‘মহান’ মোগলদের ন্যায় বৈবাহিক সম্বন্ধ দ্বারা শক্তিশালী রাজাদেরকে মিত্রতামূলক সন্ধিতে আবদ্ধ করার চেষ্টা করতেন, অন্যথায় সামরিক শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করা হতো।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবি রাজদুহিতা কুমারদেবীকে বিবাহ করে যে রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন, সমুদ্রগুপ্ত বৈদেশিক রাজকুমারীদেরকে উপঢৌকনস্বরূপ গ্রহণ করে যে রাজ্যের স্থায়িত্ব এনে দেন, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তও একই পন্থায় সেই রাজ্যের শক্তি ও স্থিতিশীলতা অনেক বৃদ্ধি করেন। তিনি নাগ ও বাকাটক রাজবংশের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধের মাধ্যমে গুপ্ত সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেন। তিনি নিজে নাগ রাজকন্যা কুবেরদেবীকে বিবাহ করেন ও তার ফলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে গুপ্ত সাম্রাজ্যসীমা বিস্তৃত হয়। এরপর তিনি নিজ কন্যা প্রভাবতীর সঙ্গে বাকাটক নৃপতি দ্বিতীয় রুদ্রসেনার বিবাহ দিয়ে ঐ রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্কে আবদ্ধ হন।
নাগ ও বাকাটকদের সাথে এই বন্ধুত্বপুর্ণ সম্বন্ধ পশ্চিম ভারতের শকগণের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল, কারণ তাঁরা যে ভূ-খন্ডে রাজত্ব করতেন তা হতে গুজরাট ও সৌরাষ্ট্রের শক রাজ্য আক্রমণকারী উত্তর ভারতীয় শাসককে তাঁরা যথেষ্ট সাহায্য অথবা বাধা প্রদান করতে পারতেন।
মুদ্রার সাক্ষ্য হতে জানা যায় যে, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত পরবর্তী সময়ে শক রাজ্যগুলো অধিকার করেন। শকদের ধ্বংস করে তিনি ‘শকারি’ উপাধি নেন। শকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাকাটকদের সক্রিয় সাহায্য দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সাফল্য নিশ্চিতকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
পশ্চিম মালব, গুজরাট ও কাথিওয়ার বা সৌরাষ্ট্রে শক শাসনের অবসানের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্য আরব সাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এর ফলে পাশ্চাত্য দেশগুলোর সাথে ভারতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এভাবে গুপ্ত আমলে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির পথও হয় প্রশস্ত। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত প্রথমে পাটলিপুত্র এবং পরে উজ্জয়িনীতে সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। কালক্রমে উজ্জয়িনী গুপ্ত সাম্রাজ্য তথা ভারতের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
‘শকারি বিক্রমাদিত্য ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
কিংবদন্তীর রাজা বিক্রমাদিত্য ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য একই ব্যক্তি কিনা, বলা দুরূহ। জনশ্রুতি অনুসারে, প্রাচীন ভারতে উজ্জয়িনীতে বিক্রমাদিত্য নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি মালব, গুজরাট, সৌরাষ্ট্র বা কাথিওয়ারের শকদেরকে পরাজিত করে ‘শকারি’ উপাধি গ্রহণ করেন।
‘বিক্রম সম্বৎ নামে একটি নতুন সাল গণনা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে উৎসাহ দান এবং নয়জন পন্ডিতকে নিয়ে ‘নবরত্ন’ সভা গঠন তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। অদ্যাপি উৎকীর্ণ লিপি, মুদ্রা বা স্তম্ভ লিপিতে এরূপ কোনো রাজার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়নি। কিন্তু উল্লিখিত প্রায় সব কাজই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সম্পন্ন করেছিলেন বলে জানা যায় (বিক্রম সম্বতের প্রচলন ব্যতিত)। মহাকবি কালিদাস তাঁর সমসাময়িক ছিলেন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। নিজ বাহুবলের ওপর নির্ভর করে তিনি শকদের রাজধানীতে প্রবেশ করতে অসাধারণ সাহস ও নৈপূণ্য প্রদর্শন করেন। বহুদিন পর তাঁর শক বিজয়ের কাহিনী কিংবদন্তী আকারে চারিদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
সুতরাং কিংবদন্তীর নায়ক ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত অভিন্ন ব্যক্তি হতে পারেন। এ মতের বিরোধীতা করে অনেকে বলেন, ‘নবরত্ন সভার অনেকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময় জীবিত ছিলেন না। যেমন, জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির যে তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না একথা নিশ্চিত।
এছাড়া কিংবদন্তী অনুসারে বিক্রমাদিত্য ‘বিক্রম সম্বৎ’ প্রবর্তন করেন খ্রিস্টপূর্ব ৫২ অব্দে। সুতরাং কোনোক্রমেই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে এর প্রবর্তক বলা চলে না। তবে সম্ভবত এই অব্দের সাথে ‘বিক্রম’ নামের যোগাযোগ পরবর্তী যুগের আবিষ্কার। যাই হোক না কেন, বিক্রমাদিত্যের কিংবদন্তী জনমানসে পরবর্তী যুগে একাধারে সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয়, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সংস্কৃতি প্রয়াস ও স্কন্ধগুপ্তের হূণ বিজয়কে মিশ্রিত করে গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
পাশ্চাত্য দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্বন্ধ স্থাপনে উজ্জয়িনীর স্থান
অতি প্রাচীনকাল হতেই ব্রোচ, সোপার, কাম্বে প্রভৃতি ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত বন্দরগুলো সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। পাশ্চাত্য দেশ হতে বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য নিয়ে বিদেশী বণিকগণ এ সকল বন্দরে আসতেন। চন্দ্রগুপ্ত মালব, গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র অধিকার করায় এ বন্দরগুলো তাঁর হাতে পড়ে— ফলে বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ রাজকোষে জমা হয়। এদিকে বণিকদের সামুদ্রিক বন্দরে যেতে উজ্জয়িনীর পথই প্রশস্ত; উজ্জয়িনীতে পণ্যদ্রব্য গুদামজাত করে বিভিন্ন বন্দরে প্রেরণ করা সহজ এবং নিরাপত্তা ও আর্থিক দিক দিয়ে ছিল অধিকতর সুবিধাজনক।
বস্তুত আবহমান কাল ধরে উজ্জয়িনী ছিল স্থল বাণিজ্যের স্নায়ুকেন্দ্র। হিন্দুদের কাছে বারাণসীর পরই এটি ছিল দ্বিতীয় পবিত্র স্থান। সর্বোপরি এই অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত উর্বরা। প্রতি বছর এখানে প্রচুর ফসল জন্মাতো। ফসল হতে আবার ব্যবসায়িক উন্নতি ঘটে ও যথেষ্ট অর্থাগম হয়। এর সুবিধা নিয়ে বহির্বাণিজ্য দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথও সুগম হয়। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এই অঞ্চলের সামগ্রিক সুবিধা অত্যন্ত বুদ্ধির সাথে ব্যবহার করেন।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের চরিত্র ও কৃতিত্ব
গুপ্তবংশের প্রধান রাজাদের মধ্যে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ব্যতিত সকলেই দীর্ঘকাল রাজত্ব করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের বেলাতেও এই সত্যের ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি ৪১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চৌত্রিশ বছর রাজত্ব করেন। এ সময়ের মধ্যে অশান্তি বা বিদ্রোহের কথা তেমন শোনা যায়নি। এটা রাজার শক্তিমত্তা, বিচক্ষণতা ও কঠোরতার পরিচায়ক। চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে কেউ কোনোদিন শৃক্মখলাবিরোধী কাজ করতে বা রাজাদেশ লংঘন করতে সাহস পেতেন না।
রাজা যেমন জমকালো উপাধি ভালোবাসতেন তেমনি বাহ্যিক আড়ম্বর পছন্দ করতেন। তাঁর আমলে প্রকাশিত দুই ধরনের স্বর্ণমুদ্রা দেখা যায়। কতোগুলো স্বর্ণমুদ্রায় তিনি তীর-ধনুক হাতে বীর বেশে দন্ডায়মান। আবার অপর কয়েকটিতে তিনি সিংহের সাথে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ। বিদ্যা ও জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করা তাঁর এক অনন্য সাধারণ গুণ। কথিত আছে, তাঁর রাজসভা ‘নবরত্ন’ নামে নয়জন পন্ডিত দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। মহাকবি কালিদাস তাঁর সভার অন্যতম অলঙ্কার ছিলেন।
যাহোক দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য উন্নতি ও গৌরবের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। সমুদ্রগুপ্তকে যদি গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তারকর্তা বলা যায় তবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে সেই সাম্রাজ্যের সংগঠক বলা চলে । তিনি ছিলেন একাধারে একজন বীরযোদ্ধা, সুদক্ষ শাসক ও সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক।

সারসংক্ষেপ
সমুদ্রগুপ্তের উত্তরাধিকারী হিসাবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেন। পশ্চিম ভারত থেকে শকদের বিতাড়ন তার মুখ্য সামরিক কৃতিত্ব। এ কারণে তিনি ‘শকারি’ উপাধি গ্রহণ করেন। এছাড়াও অন্যান্য দিকে তিনি সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ এবং দৃঢ় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তিনি নাগ ও বাকাটক বংশীয় রাজাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। মহাকবি কালিদাসসহ অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি তাঁর সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। শৌর্য-বীর্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নতির পরিচয় বহন করে তাঁর রাজত্বকাল।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই সম্ভবত কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্য। তাঁর রাজত্বকালে চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন ভারত সফর করেন। ফা-হিয়েনের বিবরণে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়কার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনচিত্রের অনেকটাই বিধৃত হয়ে আছে।
