নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ – ব্যক্তিগতভাবে এবং রিপোর্টার হিসেবে ১৯৭১ ছিল আমার জন্য এক উল্লেখযোগ্য বছর। এর আগেও অন্যায় সঙ্ঘটিত হতে দেখেছি, তা নিয়ে লিখেছি, কেননা নির্যাতন-নিপীড়ন তো দুনিয়াজোড়া ছড়ানো রোগবীজ, কিন্তু এমন ব্যাপক আকারে এবং এতো পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার প্রতিপালন কখনো দেখি নি। পাকিস্তানে নতুন পার্লামেন্টের নির্বাচনে পূর্বাংশের বাঙালিরা অর্জন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, কিন্তু পশ্চিমাংশের পাঞ্জাবিরা-দেশের হতাকর্তা হয়ে থাকতে যারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল এবং কাজটি করতো সামরিক সরকারের মাধ্যমে ঠিক করলো নির্বাচনের এমনি ফলাফল মান্য করা যায় না।

নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ
মার্চ
মার্চ ২৭ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণ-অভিযান
মার্চ ২৮ পূর্ব পাকিস্তানে ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে লাঠি ও বর্ণা
এপ্রিল
এপ্রিল ৪ পাকিস্তান: ‘এসবই খেলার রীতি’—তবে ভয়ঙ্কর ও নির্দয় এক খেলা
এপ্রিল ৭ পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে আসা বিদেশীরা বলছে ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের কথা
এপ্রিল ১৩ অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বাঙালিদের মন্ত্রিসভা গঠন
এপ্রিল ১৩ আটক বাঙালি অফিসারের ভয়ঙ্কর প্রহরগুলো
এপ্রিল ১৩ তছনছ অর্থনীতি
এপ্রিল ১৪ গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাঙালিরা
এপ্রিল যুদ্ধের নরক যন্ত্রণা পোহাচ্ছে কেবল এক পক্ষই
মে
মে ১৬ পাকিস্তানি শরণার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ভারতীয় দরিদ্রজনের উম্মার কারণ হয়েছে
মে ২১ ভারতে বাঙালি শরণার্থীদের দুর্দশা
জুন
জুন ১৬ হতাশার ট্রেনে চেপে চলছে বাঙালি শরণার্থীদল
জুন ২৫ সেনাভিযানের তিন মাস পরও ঢাকা ভীতসন্ত্রস্ত
জুন ২৬ অধিকাংশ যানবাহন অকেজো হওয়ার ফলে অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি
জুন ২৯ পূর্ব পাকিস্তানের শহরে সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসের লক্ষ্য হচ্ছে হিন্দু জনগণ
জুন ২৯ বাঙালিদের ‘ভীতুর ডিম’ আখ্যায়িত করেছে এক পাকিস্তানি
জুলাই
জুলাই ৪ বিদেশী বাহিনী’ চাপিয়ে দিচ্ছে স্বীয় কর্তৃত্ব
জুলাই ১৪ বাঙালি দমনের নীতি অনুসরণ করছে পশ্চিম পাকিস্তান
সেপ্টেম্বর
সেপ্টেম্বর ৫ আমেরিকার সঙ্গে ভারতের ফারাক বাড়ছে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ হচ্ছে
সেপ্টেম্বর ১২ সৈন্যদের হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ অব্যাহত
সেপ্টেম্বর ২৯ ভারতে শরণার্থী শিশু: ‘হাজারে হাজারে’ মৃত্যু
অক্টোবর
অক্টোবর বিভক্ত পাকিস্তান
অক্টোবর ১০ গেরিলা এলাকায় জীবন ফিরে পাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানি শহর
অক্টোবর ১১ বাঙালিদের জন্য অস্ত্রের চালান আসছে কলকাতায়
অক্টোবর ১৭ বাংলাদেশের জন্য দাঁতে দাঁত চাপা যুদ্ধ
অক্টোবর ১৯ সীমান্ত জুড়ে মুখোমুখি ভারতীয় ও পাকিস্তানি সৈন্য
অক্টোবর ২৩ ভারত-পাকিস্তান: তারা যুদ্ধের কথা বলছে, তারা যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে
নভেম্বর
নভেম্বর ২ কঠোর নীতি নিচ্ছে ভারত
নভেম্বর ২৩ সীমান্তে এগিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সামরিক বহর, যশোর এলাকায় পাকিস্তানের দুর্বল প্রতিরোধ
নভেম্বর ২৪ অনুপ্রবেশের কথা স্বীকার করেছে ভারত, বলেছে এটা আত্মরক্ষামূলক
ডিসেম্বর
ডিসেম্বর ৮ মুক্ত’ যশোরে বাঙালিদের নৃত্য
ডিসেম্বর ১১ বড় কথা হচ্ছে পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণা
ডিসেম্বর ১১ উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে অসম্মতি
ডিসেম্বর ১২ পশ্চিম পাকিস্তানের সমর্থকরা শহরে ঢুকছে
ডিসেম্বর ১৬ ঢাকা অভিযানের শেষ পর্ব-এক টেবিলে দু’জন মানুষ
ডিসেম্বর ২০ যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা
ভূমিকা
নতুন সংবিধান নিয়ে আলাপ-আলোচনার ভণিতার আড়ালে তারা শাদা পোশাকে সৈন্য পাঠাতে থাকে ঢাকায়। ২৫ মার্চের ভেতর সম্পন্ন হয়েছিল তাদের প্রস্তুতি। রাত নেমে আসার সাথে সাথে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনকামী আন্দোলনের ওপর শুরু হলো আক্রমণ। এটা ছিল পুরোপুরিই পাইকারি হত্যাকাণ্ড।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে মিলিটারি কর্তৃক আটক অন্যান্য বিদেশী সাংবাদিকের সঙ্গে একাদশতলার জানালা থেকে আমিও দেখি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসা গোলা এবং এর ফলে রাতের আকাশকে আলোকিত-করা আগুনের লেলিহান শিখা। আমাদের নিচের রাস্তায় কিছু ছাত্র মিছিল করে এগিয়ে আসছিল। তাঁরা উচ্চকণ্ঠে স্বাধীনতার স্লোগান দিচ্ছিল; জিপের ওপর বসানো মেশিনগানের গুলি তাঁদের কচুকাটা করে ফেললো।

এভাবেই বয়ে চললো ঘটনা-সেই রাত ও তার পরের প্রায় নয় মাস জুড়ে- হত্যা ও নিষ্ঠুরতার এমন এক খেলা যা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে ভারতে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো। এর কোনো শেষ ছিল না যতক্ষণ পর্যন্ত না ভারতীয় বাহিনী ডিসেম্বরে সীমান্ত অতিক্রম করে এবং পাক আর্মির টুটি চেপে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের দলিল যখন স্বাক্ষরিত হলো জন্ম নিলো এক নতুন দেশ বাংলাদেশ। দেশটি তখনো অতিশয় দরিদ্র-এক বছর বন্যা ও পরের বছর দুর্ভিক্ষে পীড়িত-কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা অর্জন করলো স্বাধীনতা। এবং যাঁরা প্রত্যক্ষ করেছে এই দেশটির মুক্তি, আগামীদিনের কঠিন পরীক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিতি থাকা সত্ত্বেও, নিপীড়নের অবসান দেখতে পাওয়ার আনন্দময়তা চিরদিনের মতো তাঁদের হৃদয়কে উদ্বেলিত করেছিল।
