আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘৯৬ এর নির্বাচনী ইশতেহারসমূহ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৯৬ এর নির্বাচনী ইশতেহারসমূহ

১. স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক সরকারঃ
ক) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় জীবনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করবে।
খ) রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটা।দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সুশৃঙ্খল প্রশাসন- ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিরূপণকল্পে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
গ) প্রজাতন্ত্রের কর্মবৃত্তে নিয়োজিত কর্মকর্তা/কর্মচারীগণের জন্য সম্মানজনকভাবে জীবন ধারণের উপযোগী ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে এবং এতদুদ্দেশ্যে বেতন কমিশন গঠন করা হবে।
ঘ) জাতীয় সংসদ হবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের প্রাণকেন্দ্র। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জাতীয় ঐকমত্যের উপর গুরুত্বারোপ করা হবে এবং তাতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
২.আইন শৃঙ্খলাঃ
সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ চাই, নিরাপদ জীবন চাই দেশবাসীর এ আকাংক্ষা আকৃতির বাস্তব রূপ দিতে আইন-শৃ পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রয়াস নেওয়া হবে।
দলমত নির্বিশেষে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ক’রে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন,ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, রাহাজানিসহ সকল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করা হবে। মানুষের সম্পদ ও ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা হবে। সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে আওয়ামী লীগ নাগরিক জীবনে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এই লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হবে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধান নিশ্চিত করা হবে। আনসার, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ও দমকল বাহিনীর সদস্যদের ন্যায়সঙ্গত দাবী-দাওয়া গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের চাকুরীর মান ও মর্যাদা উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৩. দুর্নীতি উচ্ছেদ কার্যক্রমঃ
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে চাই— জনগণের এ প্রত্যাশা বাস্তবায়নে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। যারা দেশের সম্পদ লুট করছে, অবৈধ পথে সম্পদ গড়ছে, সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার ক’রে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করছে বা করবে তাদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ভিত্তিতে দেশের প্রচলিত আইনানুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৪. কৃষক ও কৃষিঃ
ক) পাঁচ বছরে বিএনপি সরকার দেশের কৃষি-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শুধুমাত্র ন্যায্যমূল্যে সারের দাবিতে পতিত সরকারের শাসনামলে ১৮ জন কৃষককে গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছে। খাদ্যে বিদেশ- নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে ।
আওয়ামী লীগ এ ব্যবস্থার অবসান করবে। স্বল্প ও ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, ঔষধ, সেচের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে কৃষি উৎপাদনে কৃষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। প্রয়োজনে এ খাতে যথোপযুক্ত ভর্তুকি দেওয়া হবে।
প্রকৃত কৃষকের নিকট সহজ শর্তে কৃষি ঋণ পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থকরী ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি চালু করাসহ প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কৃষিপণ্যের মূল্য কৃষকের জন্য লাভজনক এবং স্থিতিশীল রাখার কার্যকর নীতিমালা ও বাস্তবমুখী কর্মসূচী প্রণয়ন করা হবে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করার জন্য আধুনিক ও প্রয়োজনীয় কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা হবে।
খ) ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ করা হবে। মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগী ও গবাদিপশু পালন আধুনিকীকরণেরকার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ব্যাপক ভিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে।
গ) ভূমি সংস্কার ও ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও আধুনিক কর্মসূচী প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা হবে।
ঘ) ব্যাপকহারে বৃক্ষ রোপণ এবং বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৫. শিল্পায়ন ও বাণিজ্যঃ
আওয়ামী লীগের শিল্পোন্নয়নের মূল লক্ষ্য হবে দেশজ শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি। আওয়ামী লীগ পোশাক ও বস্ত্রশিল্প, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চা, চামড়া ও অন্যান্য রপ্তানীমুখি শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে অগ্রাধিকার দেবে।
তাঁত শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং বিকাশের লক্ষ্যে তাঁতীদের নিকট ন্যায্য মূল্যে সুতা সরবরাহ, তাঁত ঋণ মওকুফ, ঋণদান ও উৎপাদিত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হবে। কামার, কুমার, জেলেসহ বিভিন্ন কর্মজীবীর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মুক্তবাজার অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুসরণ ক’রে ব্যক্তি-উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প খাতকে সকল প্রকার সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান করা হবে। শিল্প ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইন-কানুন ও পদ্ধতিসমূহ সংস্কার ক’রে সরলীকরণ করা হবে। শিল্পায়নের সুষম প্রসারের জন্য জেলা ও থানা পর্যায়ে শিল্প স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
ক্ষুদ্র, মাঝারি, কুটির শিল্প ও শ্রমঘন শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে দেশের বেকার যুব সম্প্রদায়ের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ক’রে এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতামূলক লাভজনক সংস্থায় পরিণত করা হবে। অবাধ ব্যবস্থা করা হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় আমুল পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে কর্মদক্ষতা ও বাণিজ্যনীতির পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানির অসমতা দূর ক’রে বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন দ্রুততর করা হবে। ব্যক্তিমালিকানাধীন কোন আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হবে না।
৬. শ্রমনীতিঃ
শ্রমের ন্যায্যমূল্য প্রদান করা আওয়ামী লীগের নীতি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। তাদের কর্মের মূল্যায়ন ও জীবনের মানোন্নয়ন করার জন্য সুষ্ঠু নীতিমালা গ্রহণ করা হবে। উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে শ্রমিক শ্রেণীর একনিষ্ঠ অবদান ব্যতীত দ্রুত শিল্পায়ন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্য অর্জনে সৌহার্দ্যপূর্ণ শ্রমিক-মালিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এ উদ্দেশ্যে ত্রি-পক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যকর শ্রমনীতি প্রণয়ন করা হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিজনিত সুফল শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মজুরির সম্পৃক্ততা সৃষ্টির প্রয়াস নেওয়া হবে।
শিল্প বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শিল্প-শান্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে যৌথ আলাপ-আলোচনায় আপোষ মীমাংসা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম কনভেনশনের বিধান মোতাবেক স শিল্প বিরোধ মীমাংসার পদ্ধতিসমূহের উন্নতি সাধন করা হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি ও প্রচলিত এম আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, চিত্তবিনোদন, কার্য পরিবেশ ইত্যাদি শ্রম কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। শিশুশ্রম রোধ কল্পে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৭. সরকারী প্রচার মাধ্যম ও সংবাদপত্রঃ
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অবাধ তথ্য প্রবাহ এবং সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। রেডিও, টেলিভিশন ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রদান করা হবে। সরকারী মালিকানাধীন সংবাদপত্রসমূহকে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হবে।
৮. বিচার বিভাগঃ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মৌল নীতি অনুসারে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হবে। এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
৯. স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনঃ
আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা ভিত্তিক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও দায়িত্ব ন্যস্ত করা হবে। অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা ক’রে এ সকল স্থানীয় সরকারের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা হবে।
১০. শিক্ষা ও মানব সম্পদঃ
শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও মান উন্নয়নকে দেশের উন্নয়ন কর্মসূচীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করা হবে। দশ বছরের মধ্যে দেশকে যাতে নিরক্ষতার অভিশাপমুক্ত করা যায় সে জন্য সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত ক’রে এক জাতীয় আন্দোলন সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
প্রতি গ্রামে গ্রামে একটি ক’রে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। প্রতি থানায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ধর্মীয় ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে উন্নতমানের ও আধুনিকীকরণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ডঃ কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। যুগোপযোগী উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে এবং সকল প্রকার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সামগ্রিকভাবে উন্নত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা থাকে।
সেশন জট নিরসনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শোষিত দারিদ্র্যক্লিষ্ট অবহেলিত বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানব-সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেয়া হবে।
১১. নারী ও শিশুর সার্বিক উন্নয়নঃ
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী সমাজের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। নারী সমাজকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা হবে। নারী নির্যাতন রোধ ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী অবহেলিত নারী ও শিশুদের মর্যাদা, অধিকার ও ভাগ্যোন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
১২. স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাঃ
সকলের জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রতি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রতি থানায় আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অসমাপ্ত কার্যক্রম বাস্তবায়িত করা হবে।
দুস্থ ও গরীব মানুষের কল্যাণে স্বল্প মূল্যে আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পরিকল্পিত পরিবার গড়ে তোলার যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
১৩. দারিদ্র্য বিমোচন ও সমাজ কল্যাণঃ
দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীকে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ও আত্মনির্ভর জনশক্তিতে রূপান্তর করার সুষ্ঠু নীতিমালা গ্রহণ করা হবে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করা হবে। বাংলাদেশে বিদ্যমান বাস্তবতায় উন্নয়ন কৌশলের লক্ষ্য হবে দারিদ্র্য নিরসন, স্বাবলম্বিতা অর্জন ও মানব সম্পদের উন্নয়ন।
এজন্য শ্রম, মেধা ও সম্পদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হবে। দারিদ্র্য নিরসনের কৌশল হবে বহুমুখী, বাস্তবানুগ ও সামগ্রিক উন্নয়ন ধারার সাথে সংগতিপূর্ণ। ছিন্নমূল নরনারী ও শহরের বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১৪. ভৌত অবকাঠামোঃ
কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার উপর যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে। রেল ও রাজপথসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিটি ইউনিয়নকে থানার সঙ্গে এবং থানাকে জেলা সদরের সঙ্গে উন্নত সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট, ব্রীজ ও সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়া হবে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত ক’রে আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল দেশের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। প্রস্তাবিত পদ্মা, মেঘনা, রূপসাসহ সকল বৃহৎ নদীর উপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। অভ্যন্তরীণ জলপথ ও নদীবন্দরসমূহের উন্নয়ন সাধন করার উপর গুরুত্বারোপ করা হবে।
চট্টগ্রাম ও চালনা সমুদ্র বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পল্লী বিদ্যুতের ব্যাপক সম্প্রসারণসহ বিদ্যুতায়নকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হবে। স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
১৫. পানি সম্পদ, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক সম্পদঃ
পানি সম্পদ কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌলিক উপাদান। পানি সম্পদ বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। নদনদী খনন, নদীর গতি নির্ধারণ, জলাধার নির্মাণ, ভাঙ্গন রোধ ও স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
প্রাকৃতিক গ্যাস, সৌরশক্তি, আণবিক শক্তি ও পানি সম্পদ ব্যবহার ক’রে আগামী ১০ বছরের মধ্যে সমগ্র দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। তেল, গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে নিজস্ব উদ্যোগে সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক প্রযুক্তি, সাহায্য এবং পুঁজি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে। হাওর ও বাঁওড় অঞ্চল, ভাটি এলাকা ও সমুদ্র উপকূলবর্তী দ্বীপাঞ্চলের সম-উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
১৬. পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও অনুন্নত সম্প্রদায়ঃ
ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সম-অধিকার ও সুযোগের পরিপন্থী সকল আইনের বিলোপ সাধন করা হবে। ন্যায় বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত করার লক্ষ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দেশের অবহেলিত পশ্চাৎপদ উপজাতীয় অঞ্চলসমূহকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে উন্নত করার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হবে। পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও অনুন্নত সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের মতই সর্বক্ষেত্রে সমভাবে সমুদয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ অন হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা হবে এবং তাদের সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ও ধর্মীয় আচার বিধি পালনের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
১৭. ভাষা ও সংস্কৃতিঃ
সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার উপরও গুরুত্বারোপ করা হবে। জাতির সাংস্কৃতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে শিল্প, সাহিত্য, নাট্যকলা ও অন্যান্য কলাশিল্পের উৎকর্ষ সাধনের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হবে। নাট্যশিল্প চর্চার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বর্তমান অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল করে সময়োপযোগী ও সংস্কারমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।
১৮. ক্রীড়াঃ
ক্রীড়া ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, মনোযোগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে ঈন্সিত মাত্রায় অগ্রগতি হয়নি। আওয়ামী লীগ দেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং বর্তমান ক্রীড়া অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করবে। আন্তর্জাতিক মান অর্জনের লক্ষ্যে যুগোপযোগী ক্রীড়া নীতি প্রণয়ন করা হবে।
১৯. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাঃ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসাবে দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও সীমান্তরক্ষা বাহিনীগুলোকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য যুগোপযোগীভাবে সুসজ্জিত করা হবে।
সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজ স্থাপন করা হবে। অফিসার ও সৈনিকদের পেশাগত উন্নয়ন ও চাকুরীর নিরাপত্তা বিধানের জন্য ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইন পরিবর্তন করা হবে।
২০. পররাষ্ট্রনীতিঃ
সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরীতা নয়’- বঙ্গবন্ধুর নির্ধারিত এই মৌলিক নীতি অনুসরণ ক’রেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে।
ক) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সুরক্ষিত রাখা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রয়াস গ্রহণ করা হবে।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, কমনওয়েলথ, মুসলিম রাষ্ট্র সম্মেলন (ওআইসি) এবং সার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থবহ ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আওয়ামী লীগ সচেষ্ট থাকবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সহযোগিতা ও সুসম্পর্কের ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার প্রয়াস গ্রহণ করা হবে। আওয়ামী লীগ সার্ক-এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সার্ক-এর কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করবে।
খ) বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি নবায়ন করা হবে না। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীনতা অর্জনকারী রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই চুক্তির বিশেষ প্রয়োজন ছিল। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও সার্ক ভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে এই চুক্তি নবায়ন করার প্রয়োজন নেই। মিথ্যাচার ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই চুক্তি সম্বন্ধে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা করা হয়েছে। বিগত বিশ বছরে কোন
সরকারই এই চুক্তি বাতিল করার কথা মুখে উচ্চারণ করেন নি। এমন কি এই চুক্তির কোন সমালোচনাও তখন তারা করেন নি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জনগণকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যেই বিএনপি এই চুক্তি সম্বন্ধে বিষোদ্গার ও উস্কানীমূলক প্রচারণা শুরু করেছে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলেই বাংলাদেশ পাকিস্তানী হানাদারদের দখলমুক্ত হওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহৃত হয়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক হিসাবে আওয়ামী লীগ শেষ রক্ত বিন্দু দিয়েও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখবে।
গ) আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায্য দাবির ভিত্তিতে গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্নে বিএনপি’র সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ভারতের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ৪৪ হাজার কিউসেক পানি পাওয়া নিশ্চিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান সাড়ে ৩৪ হাজার কিউসেক-এর ভিত্তিতে চুক্তি স্বাক্ষর ক’রে মাত্র ২৭ হাজার কিউসেক পানি আনতে পেরেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ আনতে পেরেছিলেন ২০ হাজার কিউসেক। খালেদা জিয়ার সময় পানির হিস্যা কমে মাত্র ৯০০০ কিউসেকে এসে দাঁড়ায়। এর ফলে এবং কোন চুক্তি না থাকায় সারা উত্তরবঙ্গ আজ দ্রুত মরু অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। ফারাক্কা সমস্যা সমাধানে বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ফারাক্কা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদন ক’রে সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধান করবে। অন্যান্য আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নেও বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

২১. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিঃ
সারা বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বর্তমান উন্নয়ন ধারার সঙ্গে সংগতি রেখে মানব কল্যাণ ও উন্নতি বিধানে লাগসই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কারসমূহের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া হবে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থাগুলোকে যুগোপযোগী ও উন্নতমানের করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
