যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি [ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল ]

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –নির্বাচনের পর পরিস্থিতি। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি

 

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি

 

নির্বাচনের পর যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারী পার্টির প্রথম সভা মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হ’ল এবং জনাব হক সর্বসম্মতিক্রমে পার্লামেন্টারী পার্টির নেতা নির্বাচিত হলেন। উক্ত সভায় পূর্ববর্তী গণ-পরিষদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে, গণপরিষদকে ভেঙ্গে দেওয়ার দাবী জানিয়ে এবং পূর্ব পাকিস্তান হতে নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্যদেরকে সদস্যপদ ত্যাগ করার অনুরোধ জানিয়ে জনাব শহীদ সোহরাওয়াদ্দীর উথ্যাপিত | উত্থাপিত] প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল।

জনাব হক নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং তার আত্মীয় ও তার দলভূক্ত পরিষদ সদস্য মিঃ আজিজুল হক, মিঃ আবু হোসেন সরকার ও নেজামে ইসলাম দলভূক্ত পরিষদ সদস্য মিঃ আশরাফউদ্দীন চৌধুরীকে নিয়ে এক ক্ষুদ্রায়তন মন্ত্রিসভা গঠণ করে করাচী অভীমুখে রওয়ানা হলেন। এইরূপে তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে আওয়ামী লীগ দলভুক্ত পরিষদ সদস্যদেরকে মন্ত্রিসভায় গ্রহণ না করে মিঃ মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে পরামর্শ করে নতুন ফন্দি ফিকির আঁটতে করাচীতে উপস্থিত হলেন।

করাচী যেয়েই জনাব হক ঘোষণা করলেন “মুসলিম লীগের সঙ্গে আমাদের সংগ্রামের অবসান হয়েছে।” ভাইসব, একথা বোধ হয় আপনাদের স্মরণ আছে যে, যুক্তফ্রন্ট গঠণ করার মূল উদ্দেশ্য ছিল গণদাবীর দুষমণ জালেম মুসলিম লীগ সরকারকে কেন্দ্র এবং প্রদেশ থেকে নির্বাচণী যুদ্ধে পরাজিত করে কেন্দ্র এবং প্রদেশে যুক্তফ্রন্ট সরকার কায়েম করে গণ দাবীর মহাসনদ একুশ দফাকে বাস্তবে রূপায়িত করা।

 

কিন্তু জনাব হক শুধু প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ পরাজিত হওয়ার পরই কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনগণের যে সংগ্রাম ছিল তার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। শুধু তাই নয় পাকিস্তান গণপরিষদের পূর্ব বঙ্গীয় সদস্যরা তাদেরকে পদত্যাগ করা সম্বন্ধে জনাব হকের কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বলেছিলেন যে, “আমি এখনো গণপরিষদের সদস্য পদে ইস্তেফা দিই নি।”

অর্থাৎ পরোক্ষ ভাবে তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে তারা যেন পদত্যাগ না করেন। এইভাবে তিনি স্বয়ং যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারী পার্টির প্রথম বৈঠকের সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবের খেলাপ করেন। এর পরই তিনি ঢাকায় ফিরে এসে চিকিৎসার অজুহাতে কোলকাতায় চলে যান এবং তথায় বিভিন্ন সভায় আপত্তিকর ও রাষ্ট্রবিরোধী উক্তি করেন।

ঢাকায় ফিরে এসে তিনি উপলব্ধি করলেন যে তার ঐ-সব উক্তিতে জনগণ বিক্ষুদ্ধ হয়েছে এবং তিনি আরও জানতে পারলেন যে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার তার ঐসব উক্তির জন্য তার বিরুদ্ধে বিরূপ ভাবাপন্ন হয়েছে। নিজের দুর্বলতা বুঝতে পেরে তিনি তাড়াতাড়ি তার মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানালেন।

আমাদের শ্রদ্ধেয় সভাপতি পল্টন ময়দানের জনসভায় হক সাহেবের পাকিস্তান বিরোধী আপত্তিকর বিবৃতির প্রতিবাদ করে তাঁর নিকট কৈফিয়ৎ তলব করলেন। উত্তরে হক সাহেব জানালেন যে তিনি ঐরূপ কোন উক্তি করেন নি এবং সংবাদপত্রগুলি তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা বিবৃতি পরিবেশন করেছে। আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানানোর পরে আমাদের শ্রদ্ধেয় সভাপতির পরামর্শক্রমে স্থিরিকৃত হল যে একুশ দফাকে বাস্তবে রূপায়িত করবার জন্য যুক্তফ্রন্টের ঐক্য অটুট রেখে প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ শাহীর মোকাবিলা করতে হবে।

 

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি

 

কাজেই হক সাহেবের মন্ত্রিসভায় যোগদান করা আওয়ামী লীগের উচিত। এই কারণেই, আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় যোগদান করেছিল। কিন্তু গণ দাবীর দূষমণ প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ দল তাদের নির্বাচনী চরম পরাজয়ের গ্লানিকে দূরিভূত করার জন্য যুক্তফ্রন্ট সরকারকে অপসারণ করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। এবং আওয়ামী লীগ হক সাহেবের মন্ত্রিসভায় যোগদানের পণের দিনের মধ্যেই আদমজীর শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গাও হক সাহেবের কলিকাতার উক্তি সমূহকে কারণ স্বরূপ দাঁড় করিয়ে পূর্ব বঙ্গ মন্ত্রীসভা বাতিল করে ও প্রদেশে ৯২-ক জারী করে পূর্ব বাংলার সাড়ে চার কোটি নর নারীর বিজয়কে নস্যাৎ করে দিল।

Leave a Comment