আজকে আমদের আলোচনার বিষয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন ও বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন ও বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন ও বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর নির্বিচারে গণহত্যার যে সূচনা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী করেছিল ১৬ ডিসেম্বর ২৭৬ দিন পর তাদের আত্মসমর্পনের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই পরাজয়ের মাধ্যমে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ফসল পাকিস্তানের সমাপ্তি ঘটলো, বিজয়ী বাঙালি জাতি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন দেশের জন্ম দিল। শুরু হল নতুন জাতি ও নতুন দেশের নবযাত্রা ।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পনের প্রেক্ষাপট
গেরিলা যুদ্ধের ভয়াবহতা ও পাকবাহিনীর বিপর্যয়:
২৬ মার্চ থেকে বাঙালি যুবক, তরুণ, সেনাবাহিনী ও পুলিশের অপরিকল্পিত প্রতিরোধ জুন মাস থেকে সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধের ফলে সুসংগঠিত হয়। ভারত থেকে আগত ও স্থানীয় ভিত্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি গেরিলারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর আক্রমণ চালালে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। নভেম্বর থেকে স্থল যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিপর্যয় চূড়ান্ত হয়।
৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই মুক্তিবাহিনী অনেক এলাকা শত্রুমুক্ত করে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকবাহিনীর ২৩৭ জন অফিসার, ১৩৬ জন জেসিও এবং অন্যান্য শ্রেণীর ৩,৫৫৯ জন সৈন্য নিহত হয়। লে. জেনারেল নিয়াজির জনসংযোগ অফিসার মেজর সিদ্দিক সালিক পাকবাহিনীর ব্যাপক মৃত্যু সম্পর্কে বলের, “প্রথম দিকে লাশ আমরা আকাশ পথে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়েছি।
কিন্তু জুলাই-আগস্ট মাসে সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে আত্মীয়- স্বজনের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টির ভয়ে মৃতদের পশ্চিম পাকিস্তান পাঠানো বন্ধ করে দেয়া হয়।” ভারত সর্ব্বক যুদ্ধ শুরু করলে এক সপ্তাহের বেশি পাকবাহিনী টিকে থাকতে পারেনি।
নৌ-কমান্ডোদের আক্রমণ ও নৌপথে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ সমস্যা:
স্থল যুদ্ধে পাকবাহিনীর বিপর্যয়ের পাশাপাশি বাঙালি নৌ-কমান্ডোর আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা, নদী ও সমুদ্র বন্দরে ব্যাপক অভিযান চালায়। আগস্ট মাসে অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরে এম.ভি. হুরমুজ ও এম.ভি. আব্বাস জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। পরের মাসে নৌ-কমান্ডোরা ২০টি পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করে।
গেরিলাদের আক্রমণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধে বড় ধরনের ৪৫টি অভিযানে ১২৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হলে একদিকে পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে, অন্যদিকে বিশ্ব দরবারে মুক্তিযুদ্ধ পরিচিতি লাভ করে। এই জাহাজগুলোর বড় অংশই ছিল বিদেশী মালিকানাধীন।
তাই সেপ্টেম্বর থেকে চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দরে কোন বিদেশী জাহাজ আসতে রাজী হয়নি। এতে পাকবাহিনীর অস্ত্র ও রসদ সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। সেপ্টেম্বর থেকে স্থল ও নৌপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম যোগাযোগ হয়ে দাঁড়ায় বিমান ।
যুক্ত কমান্ড গঠন ও পাকবাহিনীর পশ্চাদাপসরণ:
মূলত মধ্য নভেম্বর থেকে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিক্ষিপ্তভাবে প্রবেশ করতে থাকে। ১৩ নভেম্বর ট্যাংক সহ দুই ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য যশোরে ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৯ নভেম্বর পাকবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে আকাশ অভিযান পরিচালনা করলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। ২১ নভেম্বরও পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় এবং ৩ ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধের আগ পর্যন্ত আর আক্রমণের সাহস পায়নি পাকবাহিনী।
যশোরে ভারতীয় বাহিনীর এই সাফল্য তাদের অন্যান্য এলাকায় সরাসরি প্রবেশে অনুপ্রাণিত করে। তবে এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আরো সুদৃঢ় আক্রমণের জন্য ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যুক্ত কমান্ড গঠন করে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়। লে.জে. জগজিৎ সিং অরোরার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশের রণাঙ্গনকে ৪টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।
দক্ষিণ সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল খুলনা বিভাগ ও ফরিদপুর জেলা, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ৮ ও ৯নং সেক্টরকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উত্তর সেক্টরের আওতায় ছিল বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগের সব জেলা, মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ৬ ও ৭নং সেক্টরের মুক্তিবাহিনীকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মধ্য সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল ঢাকা বিভাগের জেলাসমূহ (ফরিদপুর বাদে), ১১নং সেক্টর, জেড ফোর্স এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এবং পূর্ব সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাসমূহ, এর অন্তর্ভুক্ত ছিল মিত্রবাহিনী ও ১,২,৩,৪ ও ৫ নং সেক্টর, এফ ও কে ফোর্স এবং জেড ফোর্সের অংশবিশেষ। স্থল বাহিনী ছাড়াও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল ভারতীয় বিমান, নৌ ও যুদ্ধজাহাজ। যুক্ত কমান্ড গঠনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধ ক্ষিপ্রতা লাভ করে। যুক্ত কমান্ড গঠনের ১ দিন পর ২৩ নভেম্বরেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের সফল কূটনৈতিক উদ্যোগ:
বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবগত করতে বিভিন্ন মিশন প্রেরণ করে। ১৮ এপ্রিল কলকাতাস্থ পাকিস্তান হাই কমিশনে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ভারতের বাইরে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় শহরের রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও মিছিল করে। ১ আগস্ট লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারের জনসভায় প্রায় চল্লিশ হাজার লোক সমবেত হয়।
আগস্টের শেষদিকে ব্রিটেনে বাংলাদেশ দূতাবাস স্থাপিত হয়। এরপর ভারত ছাড়া ৪টি মিশনসহ ১১টি প্রতিনিধিত্বকারী দপ্তর বাইরে স্থাপিত হয়। অক্টোবর মাসে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্ব ১৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল জাতিসংঘে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সমর্থনসূচক বিবৃতি আদায়ে সক্ষম হন।
জাতিসংঘের ৪৭টি সদস্য দেশ বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখার ফলে ৮ নভেম্বর মার্কিন সরকার পাকিস্তানের প্রতি অর্থ নিষেধাজ্ঞা বিল পাশ করে। এরপর জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে অনেক দেশ সমর্থন দেয়। অন্যদিকে ভারত সরকার মে মাস থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি প্রেরণ করে।
মে মাসে বিশ্বশান্তি পরিষদ, সোশালিস্ট ইন্টারন্যাশনালে প্রতিনিধি প্রেরণ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে ভারতের সংসদ সদসদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়। বিদেশী মন্ত্রী শরণ সিং এ মাসে মস্কো, বন, প্যারিস, ওয়াশিংটন এবং লন্ডন যান। জুন মাসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়, ফখরুদ্দিন, শাহনাওয়াজ ব্যাংকক ও আরব বিশ্ব সফর করেন।
এসব সফরের সাফল্য জুন-জুলাই মাসে বিশ্ব ব্যাংক, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, যুক্তরাজ্য পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধ রাখতে রাজি হয়। পরের মাসেই ইয়াহিয়া খান কর্তৃক মুজিবের ফাঁসির ঘোষণার প্রতিবাদে ভারত বিশ্ব জনমত গড়ে তোলে। ভারতীয় পার্লামেন্টের ৫০০ সদস্য মুজিবের প্রাণ রক্ষার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবকে আবেদন জানান।
ভারতের সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান:
পাকিস্তানি বিমান বাহিনী অতর্কিতে ৩ ডিসেম্বর বিভিন্ন ভারতীয় বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালালে শুরু হয় সৰ্ব্বক যুদ্ধ। যুক্ত কমান্ড সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ সীমান্তে আক্রমণ শুরু করে। পাশাপাশি চালানো হলো বিমান হামলা। ঐদিনই পাকবাহিনীর ৩টি মিরেজ, ২টি এফ-১০৪ স্টাফ ফাইটার সহ ৩৩টি পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত হলো। পূর্ব সীমান্তে কামালপুর ঘাঁটির পতন ছাড়াও চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের ওপর মিত্রবাহিনীর নৌ-বহর প্রচন্ড আক্রমণ চালায়।
এই যুদ্ধের প্রথম থেকে যুক্তবাহিনীর লক্ষ ছিল ঢাকা দখল করে পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করা। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও দর্শনা, ঠাকুরগাঁও, কামালপুর, কুলাউড়া, গাজীপুর ও চৌদ্দগ্রামের পতন ঘটে। পাকবাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে বিভিন্ন অবস্থান থেকে সেনানিবাস ও পাকঘাঁটিগুলোতে আশ্রয় নেয়। ৫-৬ ডিসেম্বর ফেনী, কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া যুক্তবাহিনীর দখলে আসে।
কুমিল্লা ও ফেনীতে ৭০০ পাক সেনা নিহত হয়। ৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী লালমনিরহাট মুক্ত করে। ভারতীয় নৌবাহিনী খুলনা, চালনা, মঙ্গলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে মারাত্মক আক্রমণ চালায়। ঐদিন ভারত সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এরফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। পরের দিন যশোর বিমান বন্দরের পতনের পর পর যুক্তবাহিনী শহরে প্রবেশ করে।
বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পন (১৬ ডিসেম্বর)
ন’মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে ১৬ ডিসেম্বর নতুন প্রভাত এলো। নিয়াজির নির্দেশে ভোর পাঁচটা থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। যৌথ বাহিনীর বিভাগীয় কমান্ডার জেনারেল নাগরা অগ্রবর্তী দলের প্রতিনিধি হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এই বৈঠকে আত্মসমর্পন ৬ ঘন্টা পিছিয়ে দেয়া হয়।
বেলা ১টা নাগাদ ঢাকা এসে পৌঁছেন যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল অরোরা ও চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার কমোডোর এ.কে. খন্দকার। বেতারে আত্মসমর্পনের খবর প্রচারিত হওয়ায় অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর হাজার হাজার লোক ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে হাজির হলো রেসকোর্স ময়দানে।
পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল হাজির করা হলো বিজয়ীকে গার্ড অব অনার দেয়ার জন্য। ঐদিন পৌনে ৫টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
এরপর আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য জেনারেল নিয়াজি তার কোমরের বেল্ট থেকে সুদৃশ্য রিভলবার ও ইউনিফর্মের কাঁধ থেকে লে. জেনারেল ব্যাজ খুলে লে. জেনারেল অরোরার হাতে দেন। পরাজিত পাকবাহিনীর সকল সদস্য ব্যাজ খুলে তাকে অনুসরণ করে। শুরু হলো নতুন দেশের যাত্রা। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মোট ৯১,৬৩৪ জন আত্মসমর্পণ করে।
এদের মধ্যে ৭৪,৮৫৬ জন সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য ও তাদের পোষ্য এবং ১৬,৫৪৫ জন বেসামরিক সদস্য ও তাদের পোষ্য ।
আত্মসমর্পনের দলিল
“পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় এবং বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানের সকল সশস্ত্রবাহিনীর আত্মসমর্পনে স্বীকৃত হচ্ছেন। এই আত্মসমর্পন পাকিস্তানের সকল সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী এবং আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্রবাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এসব বাহিনীর সকলেই- যারা যেখানে আছে, সেখানকার নিকটস্থ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন ও সকল অস্ত্র সমর্পন করবে।”
পাকবাহিনীর পরাজয় ও বাঙালির জয়ের কারণ
পাকবাহিনীর পরাজয়ের বেশ কিছু কারণ ছিল—
ভৌগোলিক কারণ:
পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের দূরত্ব ১৬০০ কিলোমিটার। তিনদিকে শত্রুভাবাপন্ন ভারতীয় রাষ্ট্রসীমা দ্বারা পাকিস্তান পরিবেষ্টিত। পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর যেখানে সহজেই ভারতীয় নৌবাহিনী প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে বার্মার দিকে একটি ছোট্ট মুখ খোলা আছে। এই অগ্রমুখ বরাবর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। গভীর জঙ্গলে ঘেরা এই পার্বত্য এলাকাটিতে রাজত্ব করে বন্যপশু এবং মিজোরা।
এই অঞ্চলে কোন সামরিক অপারেশন সম্ভব নয়। উপরন্তু রয়েছে বিপুল জলপথ। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দরবন। মে-সেপ্টেম্বর সাধারণ বর্ষাকাল। মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত সৈন্য ও সমর সরঞ্জাম চলাচল প্রায় অসম্ভব। ফলে এসময় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের নৈতিক মনোবল ও কায়িক শক্তির ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।
অন্যদিকে ভারত এ সময় বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের চারদিকে নতুন আট ডিভিশনের এক সেনা সমাবেশ ঘটায়। ভারতীয় বাহিনীর নিজ ভূখন্ড থেকে অভিযান করে আবার ফিরে যাওয়ার সুবিধা ছিল। এ অবস্থায় ভারত ও পাকিস্তান উভয় পক্ষ মধ্য নভেম্বর শীত মৌসুমকে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য বেছে নেয়।
বস্তুতপক্ষে, ১৩ নভেম্বর পশ্চিম বাংলার বায়রা এলাকা থেকে ট্যাঙ্ক সহ ভারতীয় সৈন্য পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত অতিক্রম করে। অন্যদিকে ১৯, ২১ নভেম্বর পাকবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ব্যর্থ হয়। কার্যত এ সময় সীমান্তবর্তী সকল অভিযানে পাকিস্তান ব্যাপক ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সব দিক দিয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত এই ধরনের ভৌগোলিক অবস্থায় পরাজিত সৈন্যদের পালিয়ে যাওয়াও অসম্ভব ছিল।
ভারতীয় সৈন্যদের বিপুল সংখ্যা ও উন্নত রণকৌশল:
নভেম্বরে পাকিস্তান তার সশস্ত্রবাহিনীর সশস্ত্র শক্তি বিমান, নৌ, পদাতিক শক্তিমত্তা নিয়োগ করে পশ্চিম পাকিস্তান ফ্রন্টে। পাকবাহিনীর পূর্ব রণাঙ্গনে ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্যের বিপরীতে ভারত নিয়োজিত করে ১ লক্ষ ৯৫ হাজার সৈন্য। এছাড়া ছিল ১ লক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও এর চেয়েও বেশি স্বেচ্ছাসেবক। ভারতীয় ৮ ডিভিশন, তিন ব্রিগেডের বিপরীতে পাকিস্তানের ছিল তিন ডিভিশন ও ১টি ব্রিগেড।
বিমান শক্তিতে দেখা যায় ভারতীয় দশ স্কোয়াড্রনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গে ছিল এক স্কোয়াড্রন। ভারত পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের জন্য একটি শক্তিশালী বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ টাস্কফোর্স সৃষ্টি করে। অথচ আগস্ট মাস থেকে নৌ-কমান্ডোদের অভিযানের জবাব দেয়ার মতো পাকিস্তানের কার্যত কোন নৌশক্তিই ছিল না। শক্তিশালী ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে তাই বেশিক্ষণ পাকিস্তান টিকে থাকতে পারেনি। মাত্র তের দিনের মধ্যেই পর্যুদস্ত পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
মনস্তাত্ত্বিক কারণ:
হানাদার বাহিনী দীর্ঘদিন যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় এবং পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকায় নৈতিক মনোবল হারিয়ে ফেলে। মুক্তিবাহিনীর কোন বন্দি শিবির না থাকায় ধৃত পাকিস্তানি সৈন্যদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নানা লোমহর্ষক কাহিনী সৈন্যদের শিবিরে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরকম অনেক নজির আছে যেখানে আত্মসমর্পনের প্রাক্কালে পাক সৈন্যরা চিৎকার করে বলেছে, “আত্মসমর্পণ করব, তবে মুক্তিবাহিনীর কাছে নয় ভারতীয় বাহিনীর কাছে।”
সিদ্দিক সালিক সৈনিকদের দুর্বল মনোবল সম্পর্কে বলেন, তাদের প্রশিক্ষণের সময়, সমর উপকরণ ও নৈতিক মনোবল নিম্নস্তরের। তারা দীর্ঘ আট মাস যাবৎ নিয়োজিত। কিন্তু পরিস্থিতির কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছে না। কয়েক মাস ধরে তারা বিশ্রাম পায়নি। তাদের অনেকেরই বুট আছে, কিন্তু মোজা বা শোয়ার চৌকি নেই। সবচেয়ে খারাপটি হলো, অপারেশনে যাবার ব্যাপারে তাদের অনেকেরই মনের দিক থেকে সায় ছিল না।
অর্থ সংকট:
সামরিক উপকরণ ও অর্থ সংকট পাকবাহিনীর পরাজয়কে ত্বরান্বিত করে। পাকিস্তানে অস্ত্র বিক্রির ওপর মার্কিন কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা, যুক্তরাজ্য ও পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স ও কানাডার অর্থ সাহায্য বন্ধের ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ থাকে। বিশ্ব ব্যাংকের জুন মাস থেকে অনুদান স্থগিত, যুদ্ধের কারণে রপ্তানি হ্রাস- সব মিলিয়ে নগদ অর্থে বৈদেশিক মুদ্রায় অস্ত্র কেনার পথ বন্ধ থাকে।
এরপর পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি আরব দেশের গোপন সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হলেও তা ছিল অপ্রতুল। ডিসেম্বরে চূড়ান্ত যুদ্ধে এসব উৎস থেকে যে বিমান সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল তা পশ্চিম রণাঙ্গনে নিয়োজিত করায় পূর্ব রণাঙ্গনে যৌথবাহিনী সহজে জয় লাভ করে ।
পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক গণহত্যা ও নারী নির্যাতন:
২৫ মার্চ ‘৭১ মধ্যরাত থেকে সেনা, রাইফেলস, পুলিশ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ ব্যাপক গণহত্যার সূচনা ঘটায়। এই হত্যাকান্ড পরবর্তী দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ রূপলাভ করে। এই পর্যায়ে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত রূপরেখা অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধের সূচনা হয়।
পাশাপাশি উল্লেখিত বাহিনীগুলোর বাঙালি সদস্যরাও প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। এর সঙ্গে শুরু হয় ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। ফলে সম্মিলিতভাবে বাঙালির প্রতিরোধের সূচনা ঘটে। গণহত্যার এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ফলেই বাঙালি জাতির একাংশ এর আগে পর্যন্ত স্বাধীনতার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত থাকলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বাহিনী গঠনের মাধ্যমে সংগঠিত রূপ লাভ করে। এরপরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা যত বাড়তে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ স্পৃহাও বহুগুণ বেড়ে যায়। যার চূড়ান্তরূপ লাভ করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন।
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন ও এর যুদ্ধ পরিচালনা:
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বাংলাদেশের সরকার গঠন করা হয়। উক্ত সরকার গঠনের পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী সরকারিভাবে এই ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, উপযোগিতা এবং ভবিষ্যত রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। এই সরকার ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলা ইউনিয়নের ভবেরপাড়া গ্রামের আমবাগানে শপথ গ্রহণ করে। অতপর এই স্থানের নামকরণ
সারসংক্ষেপ
ইয়াহিয়া ও নিয়াজির একজন পাকিস্তানি জীবিত থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হুংকার সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের মাধ্যমে হুংকার থেমে যায়। ঐদিন ভারত একতরফা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণার ঘন্টাখানেক পরই নিয়াজি যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন। আত্মসমর্পনের মাধ্যমে স্বীকার করে নেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বাঙালি জাতিকে, যে জাতিকে নির্মূল করার জন্য পাকিস্তানি জেনারেল ও তার সহযোগীরা গণহত্যা চালিয়েছে নমাস।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, চতুর্দশ খন্ড, ঢাকা: তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়,
১৯৮২।
২। অভীক সরকার, বাংলা নামে দেশ, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯২, ৩য় সংস্করণ।
৩। মাসুদুল হক, বাঙালি হত্যা এবং পাকিস্তানের ভাঙ্গন, ঢাকা, সূচয়নী পাবলিশার্স, ১৯৯৭।
৪। সিদ্দিক সালিক (ভাষান্তরঃ মাসুদুল হক), নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিল, ঢাকা, নভেল পাবলিশার্স, ১৯৮৮।
৫। রাও ফরমান আলী খান (শাহ আহমেদ রেজা অনুদিত), বাংলাদেশের জন্ম, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৬। ৬। মাহমুদ হাসান, দিনপঞ্জি: একাত্তর, ঢাকা, পাইওনিয়ার, ১৯৯১ ।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
১। বাংলাদেশ ও ভারতের সফল কূটনৈতিক উদ্যোগ কিভাবে পাকিস্তান সরকারের পরাজয়ে ভূমিকা রাখে লিখুন।
২। ৩-১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধে বিপর্যয় সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখুন।
৩। আত্মসমর্পনের দলিলের বিষয়বস্তু লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্ন
১। কি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পনে বাধ্য হয়? পাকবাহিনীর পরাজয় ও বাঙালির বিজয় আপনি কিভাবে চিহ্নিত করবেন?
