প্রাক্তন গণ-পরিষদ বাতিল [ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল ]

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –প্রাক্তন গণ-পরিষদ বাতিল। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

প্রাক্তন গণ-পরিষদ বাতিল

 

প্রাক্তন গণ-পরিষদ বাতিল

 

বন্ধুগণ! এর পরই মুসলিম লীগ অধ্যুসিত আট বৎসর কাল দীর্ঘস্থায়ী প্রাক্তন গণপরিষদ যার সদস্যরা আট বৎসরের মধ্যে জনগণকে একটি গঠণতন্ত্র রচনা করে দিতে পারে নি, যার সদস্যরা শুধু ক্ষমতা দ্বন্দে ও আত্ম কলহে লিপ্ত ছিল, যাদের আমলে স্বজনপ্রীতি, দূর্ণিতী [দুর্নীতি] সমাজের প্রতিস্তরে ঢুকে পড়েছিল, যাদের বন্ধা গীতির [বন্ধ্যা নীতির| ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছিল।

যাদের জন্য পাকিস্তান থেকে গণতন্ত্র উৎখাত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল এবং যে-জন্য দেশের আপামর জনসাধারণ গণপরিষদের সদস্যদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল ও যে কারণে গণ পরিষদ বাতিলের দাবী পূর্ববাংলার তথা পাকিস্তানের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামীর কাম্য হয়ে উঠেছিল সেই গণপরিষদ পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হঠাৎ একদিন বাতিল বলে ঘোষণা করলেন।

অগণতান্ত্রিক পন্থায় গণপরিষদকে বাতিল করা হলেও যেহেতু উহা জনগণের কাম্য ছিল কাজেই গভর্ণর জেনারেলের এই ঘোষণাকে অনেকেই অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিন্তু পূর্ববাঙ্গলায় ৯২-ক ধারার শাসন চলতে থাকায় ও গণপরিষদ বাতিল করার ফলে দেশ এক শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো।

প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা এইরূপ একটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অশ্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করতে লাগলো। এই সময় পাকিস্তানের সামনে দুটিমাত্র পথ খোলা ছিল- একটি মিলিটারী শাসন ও অপরটি গণতন্ত্রের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। এমনি সময় আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা জনাব সোহরাওয়াদী রোগমুক্তির পর দেশে ফিরে এলেন।

 

তিনি পাকিস্তানের রাজধানী করাচীতে আগমণের সঙ্গে সঙ্গেই গভর্ণর জেনারেল দেশের শাসনকার্যে তার সক্রিয় সহায়তা দাবী করলেন। জনাব সোহরাওয়াদী যখন দেখলেন যে, দেশ এক শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছে, পূর্ববাংলায় ৯২ক ধারা চালু হওয়ার জন্য রাজনৈতিক কর্ম তৎপরতা প্রায় বন্ধ, শত শত দেশ প্রেমিক ও রাজনৈতিক কর্মী কারাগারে কালাতিপাত করছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতি দেশে প্রত্যাবর্তন করবার অধিকার থেকে বঞ্চিত, গণপরিষদ বাতিলের ফলে গবর্ণর জেনারেলের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে দেশের শাসনকার্য পরিচালিত হচ্ছে, দেশের জনসাধারণের মধ্যে হতাশার ভাব পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান, তখন তিনি দেশকে গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের ব্যাক্তিগত মান সম্ভ্রমের দিকে না তাকিয়ে গবর্ণর জেনারেলের সঙ্গে সহযোগীতা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

তিনি আরও ভাবলেন, দেশে যদি একবার মিলিটারী শাসন কায়েম হয়, তা হলে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অনেক পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু এই সময় গভর্ণর জেনারেল কর্তৃক নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মিঃ মোহাম্মদ আলী শঙ্কিত হয়ে উঠলেন যে হয়ত বা তার প্রধান মন্ত্রীত্বের গদি হারাতে হতে পারে এবং তদস্থলে জনাব সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হতে পারেন। কাজেই তিনি তৎপর হয়ে উঠলেন এবং তিনি জনাব হককে করাচী ডেকে পাঠালেন।

জনাব হক মিঃ মোহাম্মদ আলীর ডাকে করাচী হাজির হয়ে মিঃ আলীর সাথে গোপন পরামর্শে লিপ্ত হলেন। যে মুহূর্তে জনাব সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের দাবীর স্বীকৃতির ভিত্তিতে গবর্ণর জেনারেলের সঙ্গে শাসন কার্যে সহযোগীতার কথা পরামর্শ করছিলেন সেই মুহূর্তে জনাব হক গবর্ণর জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মিঃ মোহাম্মদ আলীর প্রতি যে তার পূর্ণ আস্থা আছে একথা তাঁকে জানালেন।

ফলে পূর্ববাংলার দাবী দাওয়া আদায় করে গবর্ণর জেনারেলের সঙ্গে শাসনকার্যে সহযোগীতা করার যে পরিবেশ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জনাব সোহরাওয়াদ্দী সৃষ্টি করেছিলেন জনাব হকের বিভেদমূলক আচরণের ফলে তা নষ্ট হয়ে গেল। তবুও শুধু গণতন্ত্রের খাতিরে ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরশনকল্পে জনাব সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় যোগদান করলেন।

 

প্রাক্তন গণ-পরিষদ বাতিল

 

কিন্তু আভ্যন্তরীণ অবস্থা না জানা থাকার ফলে এবং হক সমর্থক পূর্ব বাংলার দৈনিকটির মিথ্যা প্রচারণায় কিছু কিছু লোক জনাব সোহরাওয়ার্দীর এই কার্য্যকে ভূল পদক্ষেপ বলে মনে করলেন। জনাব হকের বিভেদ মূলক আচরণের পুরস্কার স্বরূপ মিঃ মোহাম্মদ আলী জনাব হককে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া সত্ত্বেও তার প্রতিনিধিরূপে মিঃ আবু হোসেন সরকারকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করলেন। জনাব সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় যোগদান করার ফলে তারই প্রচেষ্টায় জনাব ভাসানীকে দেশে ফিরে আসতে দেওয়ার অনুমতি দিতে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হ’ল। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বন্দীরাও মুক্ত হতে লাগলো এবং দেশের হতাশাগ্রস্থ জনতার মধ্যে আবার আশার সঞ্চার হলো।

Leave a Comment