ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলন

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলন

ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলন

 

ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলন

 

ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলন

১৭৫৭ খ্রি. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বাংলার নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলার অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব পড়তে থাকে। প্রতিটি ক্ষেত্রে কোম্পানি হস্তক্ষেপ করে বা নতুন নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। ফলে অনেকক্ষেত্রেই এদেশের বিভিন্ন শ্রেণীর অধিবাসীরা এতোদিন ধরে যেসব অধিকার বা সুযোগ পেয়ে আসছিল, তাতে আঘাত আসে। এসবের বিরুদ্ধেই তারা গড়ে তোলে বিভিন্ন আন্দোলন বা বিদ্রোহ।

ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ ছিল বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ খ্রি.- এই দীর্ঘ সময় ধরে চলে ফকির- সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ। এই ফকির-সন্ন্যাসীরা ছিলেন বাংলারই অধিবাসী। ফকিরেরা ছিলেন সুফি সম্প্রদায়ের মাদারিয়া শ্রেণীভুক্ত। আর সন্ন্যাসীরা ছিলেন বৈদান্তিক হিন্দু যোগী।

এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা মুঘল সাম্রাজ্যের সৈন্যদল থেকে বাদ পড়া সদস্য, আবার অনেকে ছিলেন ভূমিহীন কৃষক। তবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, এই ফকির-সন্ন্যাসীরা ছিলেন এদেশেরই স্থায়ী অধিবাসী। ধর্মীয় দিক থেকে ফকির-সন্ন্যাসীদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ ফকির-সন্ন্যাসীদের মধ্যে মিলনের সাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করে এবং তারা একই পতাকাতলে সমবেত হন।

বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল এবং এটি ছিল সে সময়কার বাংলায় কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ও প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, কোম্পানি কর্তৃক লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টি ফকির- সন্ন্যাসীদেরকে বিদ্রোহী করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে বাংলায় কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত ফকির ও সন্ন্যাসীদের কার্যকলাপ ছিল মুক্ত ও স্বাধীন।

তবে কোম্পানি শাসনের শুরু থেকেই তাদের স্বাধীন গতিবিধি বাধা পায়। তারা বাধা পেতে থাকে বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে। ধর্মস্থান বা তীর্থস্থান পর্যটন ভারতবর্ষের একটি অতি প্রাচীন সামাজিক ও আত্মিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ফকিরেরা যেমন বাংলার বিভিন্ন দরগা বা মাজার জিয়ারত করতেন, তেমনি সন্ন্যাসীরাও পূণ্যকর্ম করার অভিলাষে বাংলার বিভিন্ন তীর্থস্থানগুলোতে ঘুরে বেড়াতেন।

কোম্পানির স্থানীয় প্রশাসন প্রথমে ফকির-সন্ন্যাসীদের তীর্থযাত্রায় বাধা দেয় এবং পরে আইন করে এই নিষেধাজ্ঞাকে দৃঢ় করা হয়। সামাজিক ও আত্মিক অধিকার হরণের পাশাপাশি ফকির-সন্ন্যাসীদের অর্থনৈতিক অধিকার হরণের অভিযোগও এর সাথে সংযোজিত হয়। কোম্পানি শাসনপ্রসূত অর্থনৈতিক দূরবস্থার কারণে ফকির-সন্ন্যাসীরা বঞ্চিত হন তাদের চিরাচরিত ভিক্ষা সংগ্রহের অধিকার হতে।

নিম্নশ্রেণীর রায়তদের অবলুপ্তির ফলে ফকির-সন্ন্যাসীদের দাবী অগ্রাহ্য হয় এবং তারা জমিদারদের বাড়ি, কাছারি ও কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করেন। ফকির-সন্ন্যাসীদের প্রাথমিক প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত হয়। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ খ্রি. পর্যন্ত চলতে থাকা তাদের এই সশস্ত্র আন্দোলন ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ ও পূর্ণিয়া জেলায় সম্প্রসারিত হয়েছিল।

ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল কোম্পানির কুঠি, জমিদারদের কাছারি ও নায়েব-গোমস্তাদের বাড়ি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় দেশীয় সহযোগীদেরকেও ফকির-সন্ন্যাসীরা শত্রু হিসেবে মনে করেন এবং তাদের ওপর আক্রমণাত্মক তৎপরতা পরিচালনা করেন।

এছাড়া কোম্পানির রপ্তানি বাণিজ্যের সহযোগী দেশীয় বেনিয়াদের নৌকা আক্রমণ, সৈন্যবাহিনীর রসদ পরিবহন বন্ধ করা এবং যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি করা- এগুলোও ছিল কোম্পানির বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসীদের গৃহীত ব্যবস্থা।ফকির-সন্ন্যাসীরা অস্ত্র হিসেবে বর্ণা, তরবারি ও গাদা বন্দুক ব্যবহার করতেন। মূলত নেতৃস্থানীয়রা ব্যবহার করতেন ঘোড়া। ফকিরদের নেতা ছিলেন মজনু শাহ।

পরবর্তী সময়ে তার উত্তরাধিকারীরা ছিলেন মুসা শাহ, পরাগল শাহ, চেরাগ আলী শাহ, সোবাহান শাহ, মাদার বক্স, জরি শাহ, করিম শাহ প্রমুখ। সন্ন্যাসীদের নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক। ১৭৬৩ খ্রি. সর্বপ্রথম বাকেরগঞ্জে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কুঠি ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং সন্ন্যাসীরা সেখানকার ফ্যাক্টরি প্রধান কেলিকে ঘেরাও করে রাখেন।

ঐ বছরই ফকিরেরা ঢাকা ফ্যাক্টরি আক্রমণ করেন; আক্রমণের তীব্রতা দেখে এই ফ্যাক্টরির প্রধান লেস্টার কর্মস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যান। পরে অবশ্য ক্যাপ্টেন গ্রান্ট ফ্যাক্টরিটি পুনরুদ্ধার করেন। সন্ন্যাসীরা ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দেই রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়ায় কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করেন। ১৭৬৯ খ্রি. উত্তরবঙ্গে ফকির- সন্ন্যাসীদের তৎপরতা প্রতিহত করার জন্য ক্যাপ্টেন ডি. ম্যাকেনজিকে একদল সৈন্যসহ রংপুরে পাঠানো হয়।

১৭৭০ খ্রি. বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের (যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হিসেবে পরিচিত) সময় ও মন্বন্তর পরবর্তী সময়ে ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। এ সময় দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়ায় এই আন্দোলনের তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়। ১৭৭২ খ্রি. রাজশাহী জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের তৎপরতার প্রচন্ডতা দেখা যায়। ঐ বছরই রংপুরে সন্ন্যাসীদের হাতে নিহত হন রংপুরের সুপারভাইজার পালিং।

১৭৭৬ খ্রি. আবার উত্তরবঙ্গের বগুড়া, রাজশাহী ও দিনাজপুরে ফকির-সন্ন্যাসীদের তৎপরতা লক্ষ করা যায়। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দের দিকে ময়মনসিংহের আলাপসিংহ পরগণায় এদের তৎপরতা তীব্র আকার ধারণ করে। ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে মজনু শাহ মহাস্থানগড়ের দিকে অগ্রসর হন। ১৭৮৬ খ্রি. মজনু শাহের সাথে কোম্পানির সৈন্যদলের পরপর দু’টি সংঘর্ষ ঘটে। এ সময়ের সংঘর্ষে মজনু শাহ তাঁর বহুসংখ্যক অনুসারীকে হারান।

১৭৮৭ খ্রি. মজনু শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য উত্তরসূরীরা পুরো আঠারো শতক পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। তবে আস্তে আস্তে এর গতি স্তিমিত হয়ে পড়ে। কোম্পানির উন্নততর রণকৌশল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তির কাছে ফকির-সন্ন্যাসীদের পরাজয় ছিল অনিবার্য।

অন্যদিকে যথোপযুক্ত ও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি ও সুদৃঢ় নেতৃত্বের অভাব শেষ পর্যন্ত ফকির- সন্ন্যাসীদের পরাজয় এবং বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

 

ফরায়েজি আন্দোলন

আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি সুসংহত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হন ফরায়েজি নেতৃবৃন্দ। ফরায়েজি আন্দোলন ছিল মূলত ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, কিন্তু এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের চরিত্র লাভ করে । ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন হাজী শরীয়তউল্লাহ। তিনি ১৭৮১ খ্রি. বর্তমান বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুর জেলার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

কলিকাতা ও হুগলীতে প্রাথমিক পড়াশোনার পর তিনি আঠারো বছর বয়সে মক্কায় যান। সেখানে থাকাকালে তিনি ওয়াহাবি আদর্শ ও আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রায় কুড়ি বছর সেখানে অবস্থানের পর তিনি দেশে ফিরে ধর্ম সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। আদর্শগত দিক দিয়ে ফরায়েজি ও ওয়াহাবিদের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য দেখা যায় না। বরং বলা যায়, ওয়াহাবি আন্দোলনেরই আরেকটি ধারা ফরায়েজি আন্দোলন।

হাজী শরীয়তউল্লাহ বিশ্বাস করতেন, বিদেশী বিধর্মীদের রাজত্বে ইসলামি জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে না। এটি সম্ভব কেবলমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রে। ভারতবর্ষ যেহেতু বিদেশী বিধর্মী ইংরেজ জাতির শাসনাধীন, সে কারণে এই দেশটি ‘দারুল হারব’। শত্রু শাসিত দেশে যেসব মুসলমান বসবাস করে তাদের পক্ষে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় রীতিনীতি ও অনুশাসনসমূহ যথার্থভাবে পালন করা সম্ভব নয়।

এ কারণে তিনি স্বদেশের মুসলমানদের জুম’আ ও ঈদের নামাজ না পড়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি পীর পূজা, পীরের দরগায় ওরস, মানত ও মহররম পালনের ঘোর বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, এগুলো ইসলামের মূল বিধানের পরিপন্থী। ফরায়েজ আরবি শব্দ, এর অর্থ অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ।

পবিত্র কুরআনে যে পাঁচটি অবশ্য পালনীয় (ফরজ) মৌলনীতির কথা বলা হয়েছে তা যথার্থভাবে পালনের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এই পাঁচটি ফরজ হলো— ঈমান বা আল্লাহ্র একাত্ম ও রিসালাত, নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত।
হাজী শরীয়তউল্লাহ ইসলামি সাম্যবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে ঘোষণা করেন, সকল মুসলমান ভাই ভাই, অতএব মুসলিম সমাজে অসাম্য ও বর্ণ বা শ্রেণীভেদের কোন স্থান নেই।

এই মতাদর্শের ভিত্তিতে তিনি মুসলমান সমাজে বিদ্যমান উচ্চ ও নি শ্রেণী অর্থাৎ আশরাফ ও আতরাফ-এর শ্রেণী বৈষম্য দূর করার চেষ্টা চালান। তাই স্বাভাবিকভাবেই শোষিত আতরাফ মুসলমান পেশাজীবীর লোকেরা শরীয়তউল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হন। দরিদ্র মুসলমান কৃষক, রায়ত, তাঁতি, জোলা সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁর সাথে যোগ দেয়ায় ফরায়েজিদের সংখ্যা বেড়ে যায়।

অত্যাচারী নীলকর ও জমিদারদের উৎপীড়ন থেকে মুক্তি লাভের আশায় এই আতরাফেরা হাজী শরীয়তউল্লাহর মধ্যে তাদের নেতাকে খুঁজে পেল। তাঁর মতবাদ পূর্ব বাংলায় ব্যাপক সাড়া জাগায়। তিনি জমিদার ও নীলকর সাহেবদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। অপরদিকে নির্যাতিত মুসলমানেরা একজন সুশিক্ষিত ধর্মনেতার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে দেখে স্থানীয় জমিদারগণ সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।

মুসলমান রায়তদের ওপর জমিদারদের অত্যাচারের মাত্রা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ফরায়েজিদের প্রতিরোধ আন্দোলনও জোরদার হতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শোষক শ্রেণীর প্রবল আক্রমণের মুখে ফরায়েজি আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৮৪০ খ্রি. হাজী শরীয়তউল্লাহ মারা যান ।

আঠারো শতকের শেষ দিকে যেসব আন্দোলন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিপুলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল, ফরায়েজি আন্দোলন তন্মধ্যে অন্যতম। এটি ছিল মূলত ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, কিন্তু ঐতিহাসিক ঘটনাচক্রে ফরায়েজি আন্দোলন একটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়।

নীলকর ও জমিদারদের অত্যাচারে মুসলমান শোষিত সম্প্রদায় যখন জর্জরিত, তখন এই সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হাজী শরীয়তউল্লাহ এগিয়ে আসেন । হাজী শরীয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুহাম্মদ মহসিন উদ্দিন আহমদ ওরফে দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৮১৯ খ্রি. দুদু মিয়ার জন্ম। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি পিতার কাছে কুরআন ও হাদিস শাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করেন।

অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই তিনি হজ্জ্ব করতে মক্কা যান এবং সেখানে ওয়াহাবি ভাবধারার সংস্পর্শে আসেন। দেশে ফিরে তিনি পিতার মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। তবে তাঁর সাংগঠনিক শক্তি ছিল অসাধারণ। এই কারণে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই মুসলিম সমাজে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। দুদু মিয়ার নেতৃত্বেই ফরায়েজি আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের চরিত্র লাভ করে।

পিতার মত তিনি কেবল ধর্মীয় সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেননি, বরং তিনি সমাজের নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিসমূহ নির্মূল করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, সমাজের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং পরিত্রদেরকে শোষণ ও নির্যাতনের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে। তবে কেবল মুক্তির বাণী প্রচারের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা যায় না, তা করতে হলে আন্দোলন এমনকি প্রতিরোধ সংগ্রামের পথে অগ্রসর হতে হবে।

দুদু মিয়া মনে করতেন, বিশ্বের মালিক ও প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ্। সুতরাং ভূসম্পত্তিসহ সকল প্রকার পার্থিব সম্পত্তি ও সম্পদের মালিকও আল্লাহ্। তাই কর বা খাজনা যদি দিতে হয়, তবে তা আল্লাহ্র পথে দিতে হবে, কোন ব্যক্তিকে নয়। সে সময়কার জমিদারেরা রায়তদের ওপর যে সমস্ত খাজনা ও কর আরোপ করেছিল, দুদু মিয়া সেগুলোকে বেআইনি ও নীতি-বিরুদ্ধ বলে ঘোষণা দেন।

নিপীড়িত রায়ত ও চাষীদেরকে জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য দুদু মিয়া বাংলার পুরনো ঐতিহ্যবাহী সংগঠন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি সাম্য ও ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে সব ধরনের ঝগড়া-বিবাদ ও মামলা-মোকাদ্দমা সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করেন। একজন সুদক্ষ সংগঠক হিসেবেও দুদু মিয়া কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

ফরায়েজি আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন তিনি। দুদু মিয়া ফরায়েজি সমাজ ব্যবস্থায় সুবিন্যস্ত একটি খিলাফত পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেন । পূর্ববঙ্গকে তিনি কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি অঞ্চলে তাঁর প্রতিনিধি স্বরূপ একজন খলিফা নিযুক্ত করেন।

আঞ্চলিক প্রতিনিধিরা নিজ এলাকার ফরায়েজি মতাবলম্বীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা, তাদের ওপর যেকোন প্রকার অত্যাচার প্রতিহত করা ছাড়াও আন্দোলন পরিচালনার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে তহবিল গঠন করতেন। দুদু মিঞা ইংরেজ প্রশাসনের সাহায্যপুষ্ট জমিদার, জোতদার ও নীলকরদের নিযুক্ত ভাড়াটিয়া লাঠিয়ালদের মোকাবিলায় ফরায়েজি লাঠিয়াল বাহিনীও প্রবর্তন করেন।

প্রত্যেক ফরায়েজি গ্রাম থেকে বলিষ্ঠ জোয়ানদের বাছাই করে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এই লাঠিয়াল বাহিনীর সাহায্যে দুদু মিয়া ১৮৪০ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফরিদপুরের রায়ত ও চাষীদেরকে স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের হয়রানি থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮৫৭ খ্রি. সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সরকার দুদু মিয়াকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে আটক করে। ১৮৬২ খ্রি. (মতান্তরে ১৮৬০ খ্রি.) তিনি মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর পর এই আন্দোলন অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের সাথে বিলীন হয়ে যায়। বাংলার সামাজিক- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুদু মিয়া যে অবদান রেখেছেন তার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রধান নেতা হয়েও তিনি নির্যাতিতদের দুর্দশা দূর করতে এগিয়ে আসেন। আর এর জন্য তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের পথ গ্রহণ করেছিলেন।

সারসংক্ষেপ

বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তাদের সহযোগী নীলকরদের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলন এ অঞ্চলে বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ আন্দোলন। এছাড়া আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া হাজী শরীয়তউল্লাহ ও পরবর্তী সময়ে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলন মূলত একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এটি প্রতিরোধ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের চরিত্র লাভ করে।

সহায়ক গ্ৰন্থপঞ্জী :

১। সিরাজুল ইসলাম (সম্পাদক), বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, প্রথম খন্ড, ঢাকা, ১৯৯৩।

২। সুপ্রকাশ রায়, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, কলিকাতা, ১৯৯০।

৩। আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭ খ্রি.), ঢাকা, ১৯৯২।

৪। সৈয়দ মকসুদ আলী, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় উপমহাদেশ, ঢাকা, ১৯৯২।

৫। ড. মুহম্মদ আবদুর রহিম ও অন্যান্য, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঢাকা, ১৯৮৭।

 

ফকির-সন্ন্যাসী ও ফরায়েজি আন্দোলন

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলনের কারণ কি ছিল?

২। ফকিরদের আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

৩। ফরায়েজি আন্দোলনের উদ্দেশ্য কি ছিল?

৪। দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনকে সংগঠিত করতে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ?

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের বর্ণনা দিন।

২। ফরায়েজি আন্দোলনের বর্ণনা দিন।

Leave a Comment