আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বহির্বিশ্বে তৎপরতা
বহির্বিশ্বে তৎপরতা

বহির্বিশ্বে তৎপরতা
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। কারণ বহির্বিশ্বে তৎপরতার মধ্যদিয়ে মুজিবনগর সরকার বাঙালির প্রতি পাক শাসকদের অন্যায়- অবিচার, শোষণ নিপীড়ন, হত্যা ও ধ্বংস এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের মিশন স্থাপন
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও স্টকহোম সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সরকারের মিশন স্থাপন এবং ঐসব স্থানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নিয়োগ করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচারণা ও সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা।
ভারতে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন:
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই মুজিবনগর সরকার দিল্লি ও কলকাতায় বাংলাদেশের দু’টি মিশন স্থাপন করে। নয়াদিল্লিতে মিশন প্রধান ছিলেন হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী এবং কলকাতায় বাংলাদেশ মিশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন জনাব হোসেন আলী।
১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণের পর ১৮ এপ্রিল কলকাতাস্থ পাকিস্তান মিশনের সহকারী কমিশনার জনাব হোসেন আলী ১০ জন সহকর্মী সহ বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তান মিশন ভবন হতে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। বিদেশে কলকাতাতেই প্রথম বাংলাদেশ মিশন স্থাপিত হয়।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন:
মুজিবনগর সরকার চট্টগ্রামের এম.এন.এ. মুস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকীকে উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেন। ৫ আগস্ট ওয়াশিংটন পৌঁছে আগস্টের শেষ দিকে তিনি ১২২৩, কানেটিকাট এভেন্যুতে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করেন।
আমেরিকার বাঙালি ও অন্যান্য বন্ধু সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করা, সংবাদ সম্মেলন, টিভি প্রোগ্রাম ও র্যালি ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ, প্রচার ও জনমত গঠন এবং বিশেষ করে কংগ্রেসে উত্থাপিত প্রস্তাব বা সংশোধনীর ওপর তদ্বির করা ছিল এ মিশনের প্রধান কাজ। উল্লেখ্য, মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত।
১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বৈদেশিক সাহায্য আইনের সংশোধনী পাশ হয়। এই সংশোধনী অনুযায়ী পাকিস্তানে সবধরনের মার্কিন সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। সংশোধনী পাশে ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ ইনফর্মেশন সেন্টার (ওয়াশিংটন প্রবাসী বাঙালি ও তাদের সমর্থকদের সমন্বয়ে গঠিত) ও বাংলাদেশ মিশন অক্লান্ত পরিশ্রম করে।
নিউইয়র্ক ও জাতিসংঘে মিশন স্থাপন:
নিউইয়র্কে নিয়োজিত পাকিস্তানি ভাইস কন্সাল এ.এইচ. মাহমুদ আলী ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এর বেশ কিছুদিন পর মুজিবনগর সরকার নিউইয়র্কে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করে এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও নিউইয়র্ক দূতাবাসের প্রধান হিসেবে ঘোষণা করে। মাহমুদ আলী বিচারপতি চৌধুরীর প্রতিনিধি দলের সদস্য পদে অন্তর্ভুক্ত হন।
লন্ডনে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন:
২৭ আগস্ট বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনস্থ বেজওয়াটার এলাকায় নটিংহিল গেটের নিকট ২৪ নম্বর পেমব্রিজ গার্ডেন্সে প্রায় ৩০০ বাঙালি এবং বহু বিদেশী সাংবাদিকের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ মিশন উদ্বোধন করেন। তবে মিশন স্থাপন করা হয়েছিল আরও আগে। ভারতের বাইরে লন্ডনেই প্রথম বাংলাদেশ মিশন স্থাপিত হয়।
বিচারপতি চৌধুরী এ মিশনেরও প্রধান নিযুক্ত হন। এ মিশনের কর্মকর্তাবৃন্দ কূটনৈতিক কার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে পূর্ব লন্ডনের ১১ নম্বর গোরিং স্ট্রীটে ৩ মে একটি অফিস নেয়া হয় যেখান থেকে বেসরকারি কর্মীরা সাংগঠনিক ও প্রচার কার্য চালানোর দায়িত্ব পালন করতেন। ১১ আগস্টে পাকিস্তানের সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু হবে বলে ১০ আগস্ট ইয়াহিয়া খানের মুখপাত্র সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান।
এ অবস্থায় শেখ মুজিবের পক্ষ সমর্থন করার জন্য বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে বিচারপতি আৰু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনের বিখ্যাত সলিসিটরদের প্রতিষ্ঠান বার্নার্ড শেরিডান এ্যান্ড কোম্পানীকে নিয়োগ করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী সন ম্যাকব্রাইডকে ইসলামাবাদে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু কোন বিদেশী আইনজীবিকে শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ অথবা তাঁর পক্ষ সমর্থন করতে দেয়া হবে না বলে ইয়াহিয়া খানের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়। ৩০ অক্টোবর লন্ডনের হেনরী থর্নটন স্কুলে বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মেলন উদ্বোধন করেন এবং বিকাল বেলার আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
সম্মেলনে ছাত্ররা ঘোষণা করে যে, পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া আর কোন সমাধান তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। নভেম্বর মাসের শেষদিকে বিচারপতি চৌধুরী লন্ডন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাখ্যা করার জন্য হার্ভার্ড, নিউইয়র্ক সিটি, কলম্বিয়া,
হোফস্ট্রা ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) ও হার্ভার্ড স্কুল অব ল সফর করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
সুইডেনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নিয়োগ:
বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত আব্দুর রাজ্জাককে সুইডেনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নিয়োগ করে তা অনুমোদনের জন্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মুজিবনগর সরকারকে পত্রযোগে অনুরোধ করেন এবং এটা কার্যকর হয়।
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। মুজিবনগর সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বহির্বিশ্বে বিশেষ দূত নিয়োগ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বহির্বিশ্বে সমর্থন ও জনমত আদায়ের চেষ্টা করেন।
এছাড়াও বাংলাদেশের নাগরিক এবং সহানুভূতিশীল ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইডেন, জাপান ও অন্যান্য কতিপয় শক্তিশালী দেশের সমর্থন লাভে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালানো। এ ধরনের তৎপরতার ফলে ঐসব দেশে মুক্তিযুদ্ধের অনুকূল সংবাদ শিরোনাম প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগদানের জন্য জেনেভায় আসেন।
এরপর হতে দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরে আসেন নি। মুজিবনগর সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তাঁর মূল দায়িত্বই ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বহির্বিশ্বে তৎপরতা চালানো। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর শারীরিক সুস্থতা ও প্রাণহানির আশংকায় বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
বিচারপতি চৌধুরীর তৎপরতায় ১৪ মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব পাশ হয় যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রিটেনের যে প্রভাব রয়েছে তা প্রয়োগ করে পাকিস্তানকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য করা ব্রিটিশ সরকারের কর্তব্য।
পাকিস্তানের অত্যাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করার উদ্দেশে ১ আগস্ট লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে এক বিরাট জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জনসমাবেশে বৃটেনের বিভিন্ন এলাকা হতে ২০ হাজারেরও বেশি বাঙালি যোগ দেন। এ সভায় বক্তৃতাকালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি আবু সাঈদ চৌধুরী মুজিবনগর সরকারের তিনটি নির্দেশের কথা ঘোষণা করেন, যথা-
১. শীঘ্রই লন্ডনে একটি হাইকমিশন স্থাপন করা হবে বলে মুজিবনগর সরকার জানিয়েছেন।
২. পাকিস্তানের বিমানে ভ্রমণ না করার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদেরকে মুজিবনগর সরকার অনুরোধ করেছেন।
৩. পাকিস্তান অথবা বিদেশে কর্মরত বাঙালি সরকারি কর্মচারিদেরকে অবিলম্বে পদত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহবান জানিয়েছেন।
মুজিবনগর সরকারের তিনটি নির্দেশ ঘোষণা করার পরপরই অপ্রত্যাশিতভাবে লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনে নিয়োজিত দ্বিতীয় সেক্রেটারি মহিউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের চাকরি হতে ইস্তফা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এরপর একে একে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত বাঙালি কূটনীতিকগণ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আনুগত্য পরিবর্তন করতে থাকেন।
১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারে প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন ওয়াশিংটনে পাকিস্তানি দূতাবাসের ইকনমিক কাউন্সিলর এ.এম.এ. মুহিত। ৪ আগস্ট ওয়াশিংটনে অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাস ও নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ দপ্তরে পাকিস্তানি মিশনের মোট ১৫ জন বাঙালি কূটনীতিক একযোগে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
৫ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের ডিরেক্টর অব অডিট ও একাউন্টস জনাব লুৎফুল মতিন। বঙ্গবন্ধুর বিচারের প্রতিবাদে ১১ আগস্ট লন্ডনের হাইড পার্কে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভায় পাকিস্তান হাইকমিশনের কয়েকজন অফিসার বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
ম্যানিলায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত খুররম খান পন্নী এবং নাইজেরিয়ায় নিয়োজিত কূটনীতিক মহীউদ্দিন আহমদ জায়গীরদার ১৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেন। ৪ অক্টোবর নয়াদিল্লিস্থ পাকিস্তানি দূতাবাসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী প্রকাশ্যে বাংলাদেশ আন্দোলনে যোগদান করেন। ফলে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দিল্লিতে ‘চিফ অফ মিশন’ পদে নিয়োগ করেন।
৮ অক্টোবর লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের *পলিটিক্যাল কাউন্সিলর রেজাউল করিম বাংলাদেশের পক্ষে যোগদান করেন। আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানি দূতাবাসে নিয়োজিত বাঙালি রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোমিন ১১ অক্টোবর পদত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ৩ নভেম্বর সুইজারল্যান্ডের পাকিস্তানি দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি ওয়ালিউর রহমান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেন ।
১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নরওয়ের রাজধানী অসলো পৌঁছান। অসলো শহরে ৬ দিন অবস্থানকালে তিনি নরওয়ের প্রধান বিচারপতি, অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডীন, অসলোর মেয়র এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং স্থানীয় টিভিতে সাক্ষাৎকার প্রদানের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের কারণ, বিদ্যমান পরিস্থিতি ও সংগ্রামের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন ।
এছাড়া বাংলাদেশে গণহত্যা সংগঠনের অপরাধে পাকিস্তানের বিচার অনুষ্ঠানের উদ্দেশে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল গঠনে উদ্যোগী হন। অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডীন প্রস্তাবিত ট্রাইবুনালের সদস্য পদ গ্রহণ করতে রাজী হন। কিন্তু ট্রাইবুনাল গঠনের পূর্বেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।
৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি চৌধুরী সুইডেন গমন করেন। সুইডেন পৌঁছে তিনি সেখানকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, লিবারেল পার্লামেন্টারী পার্টির চিফ হুইপ প্রমুখের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকার প্রদান ও সাংবাদিক সম্মেলন করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বিচারপতি চৌধুরীর অনুরোধে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গুনার মীরডাল স্থানীয় বাংলাদেশ এ্যাকশন কমিটির চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন।
১৪ সেপ্টেম্বর বিচারপতি চৌধুরী ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে পৌঁছেন এবং পার্লামেন্ট ভবনে গিয়ে সেখানকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য, পার্লামেন্টের স্পীকার এবং বৈদেশিক কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতিসংঘের আসন্ন অধিবেশনে যোগদানের জন্য মনোনীত ডেনিশ প্রতিনিধি দলের নেতাদের সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেন। জাতিসংঘের অধিবেশনকালে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে ডেনিশ প্রতিনিধিদলের নেতা সহায়তা করবেন বলে বিচারপতি চৌধুরীকে আশ্বাস দেন।
বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি প্রেরণ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন লাভের চেষ্টা
মে মাসের প্রথম দিকে শেখ মুজিবের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক রেহমান সোবহান সরকারের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রতিনিধি।
দ্বিতীয় দফায় তিনি সেপ্টেম্বর হতে নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন এবং বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক সভায় তদ্বির, বাংলাদেশের জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলে যোগদান, বাঙালি ও মার্কিন শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ, মার্কিন কংগ্রেসে তদ্বির করা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন। এইড কন্সসিয়াম- এর সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি পাকিস্তানকে বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করার যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এসব তৎপরতার ফলে জুন মাসে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে দাতাগোষ্ঠী পাকিস্তানকে নতুন সাহায্যদানে বিরত থাকে এবং ঋণ রেয়াতি দিতেও আপত্তি জানায়। ২ অক্টোবর ওয়াশিংটনে দাতাগোষ্ঠীর সভা বসে। এবারও পাকিস্তানকে সাহায্য প্রদান স্থগিত করা হয়।
জাতিসংঘে নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল ও মার্কিন জনসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানানো এবং বাঙালি গোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য মুজিবনগর সরকার ২৪ মে বিচারপতি চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করে। জনাব চৌধুরী ছিলেন মুজিবনগর সরকারের দ্বিতীয় প্রতিনিধি- যিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান।
কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি নরওয়ে, সুইডেন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, সিরিয়া, সৌদি আরব, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘে অবস্থিত আর্ন্তর্জাতিক প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট ড. যোগেন্দ্র কুমার ব্যানার্জীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এসব কর্মকান্ডের ফলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশ পরিষ্কার ধারণা লাভ করে ।
১৯৭১ সালের ১৯ আগস্ট কানাডার টরেন্টোতে বাংলাদেশ সংকট নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বৃটেন, কানাডা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের জনপ্রতিনিধি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
উক্ত সম্মেলনে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি সাংসদ মুস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী ও এ.এম. আব্দুল মুহিতের প্রচেষ্টায় টরেন্টো ডিক্লারেশন অব কনসার্ন নামে যে ঘোষণা দেয়া হয় সেখানে পাকিস্তানে সব ধরনের সাহায্য বন্ধ রাখা এবং সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দাবি করে শেখ মুজিবের মুক্তি ও জীবনের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের অক্টোবরে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। এ দলে ছিলেন রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদ। ১৬ অক্টোবর হতে ২০ অক্টোবর তারা ওয়াশিংটনে সিনেটর কেনেডি, পার্সী ও কংগ্রেসম্যান গালাকার সহ জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৪৭টি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে এসব বক্তব্যে গণহত্যা বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তেমন কোন মুখ্য বিষয় বলে বিবেচিত হয়নি বরং রাজনৈতিক সমাধানের আবেদনই ছিল মুখ্য।
তবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত সহৃদয়তার সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিচারপতি চৌধুরী ও তার সহকর্মীদের বক্তব্য শোনেন এবং তাঁদের সরকারকে তা জানাবেন বলে আশ্বাস দেন। ২৬ জুলাই হাউস অব কমন্সের হারকোর্ট রুমে স্বাধীন বাংলাদেশের ৮টি ডাকটিকিট প্রকাশ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সদ্য প্রকাশিত ডাক টিকিটসমূহ প্রদর্শন করেন। দশ পয়সার টিকিটে বাংলাদেশের মানচিত্র এবং পাঁচ পয়সার টিকিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি ব্যবহৃত হয়। বিদেশে চিঠিপত্র পাঠাতে ভারত সরকার এই ডাক টিকিটসমূহ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা পায়।
বিচারপতি চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রেরিত বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ১ অক্টোবর জাতিসংঘ ভবনের বিপরীত দিকে অবস্থিত চার্চ সেন্টারের একটি বড় হলঘরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উদ্দেশ্য ও আদর্শ ব্যাখ্যা করেন। এসময় বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি তিনটি পূর্বশর্ত উল্লেখ করেন। যথা-
১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান।
২. অবিলম্বে এবং বিনাশর্তে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দান।
৩. ইয়াহিয়া খানের হানাদার বাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে অবিলম্বে অপসারণ।
উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনটি সাফল্যমন্ডিত হয়েছিল।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘে প্রেরিত বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে নভেম্বর মাসে নিউইয়র্ক হতে ওয়াশিংটন সফরে যান এবং সেখানে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ও সিনেটর স্যাক্সবী সহ কয়েকজন সিনেটর এবং কংগ্রেসম্যান গালাকারের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত এম.আর. সিদ্দিকী প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সম্মানার্থে একটি সান্ধ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। তবে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দু’একটি ছাড়া অন্য সব দূতাবাসের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিবাহিনীর জয়যাত্রা যখন অব্যাহত তখনই নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহবান করা হয়।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও অপর সদস্যগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে কাউন্সিল সদস্যদেরকে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন না দিতে অনুরোধ করেন। পরিষদে আলোচনা শুরু হলে মুজিবনগর সরকারের বক্তব্য পেশ করার জন্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পরিষদের সভাপতির নিকট একটি আবেদন পত্র পেশ করেন।
কিন্তু জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি দেয়ার পূর্বে কোন একটি সরকারের প্রতিনিধিকে কাউন্সিল অধিবেশনে বক্তব্য পেশ করতে দেয়া উচিত হবে না- এই বলে চীন পর পর দুর্বার ভেটো প্রয়োগ করে প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়।
বহির্বিশ্বে তৎপরতার ফলাফল
বহির্বিশ্বে তৎপরতার ফলাফল ছিল খুবই সুদুরপ্রসারী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেন- তা বহির্বিশ্বে প্রচার করা এবং এর প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি ও সম্ভব হলে স্বীকৃতি আদায় করা ছিল বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতার প্রধান লক্ষ । বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালিদের প্রতি যে সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের বিভিন্নমুখী তৎপরতার ফল।
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ব্রিটেনে কূটনৈতিক তৎপরতা ও সেখানে প্রবাসী বাঙালিদেরকে সংঘবদ্ধ করে আন্দোলন ও জনমত গঠনে বিশেষ সফলতা এসেছিল। শুধু তাই নয় বহির্বিশ্বে তৎপরতার ফলে বিদেশে প্রশিক্ষণরত সিভিল সার্ভেন্টদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ০৭ (সাত) জন এবং যুক্তরাজ্যে ০২ (দুই) জন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছিলেন।
তাছাড়া ইরাক, ফিলিপাইন ও আর্জেন্টিনার পাক রাষ্ট্রদূতগণ এবং কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, কাঠমন্ডু ও হংকং প্রভৃতি স্থানে নিযুক্ত পাকিস্তান দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিকগণ মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের প্রতি সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। ফলে অতি স্বল্প সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পাকবাহিনীর গণহত্যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
শুধু তাই নয় বহির্বিশ্বে তৎপরতার ফলে এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, বাংলাদেশ সমস্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা শরণার্থী সমস্যা নয় বরং এটা ছিল শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম। চীনের বাধার কারণে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি জাতিসংঘে বক্তৃতা করতে না পারলেও এই প্রচেষ্টার মধ্যদিয়ে বিশ্ববাসি বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পেরেছিল।
রাষ্ট্রীয়ভাবে আমেরিকা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও আমেরিকার জনগণ ও প্রচার মাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। এমনকি জনমতের চাপে আমেরিকা, বিশ্বব্যাংক ও ব্রিটেন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। শুধু তাই নয়, মুসলিম রাষ্ট্র হয়েও ইন্দোনেশিয়া সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন করেনি।
এমনকি ৪ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক শাসনের বিধিনিষেধ ভংগ করে অসংখ্য ছাত্র বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেছিল এবং ইন্দোনেশিয়ান টেলিভিশন আগস্টে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি খন্দকার মোশতাকের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছিল। সেপ্টেম্বর মাসে শেখ মুজিবের বিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে জনমত গড়ে উঠেছিল সে জনমতের চাপে পাক শাসকবর্গ শেখ মুজিবের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘ মহাসচিব শেখ মুজিবের প্রাণরক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন। সর্বোপরি বাংলাদেশ ও বাঙালির সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী যে আলোড়ন ও আবেদন সৃষ্টি করেছিল তা ছিল বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতারই ফল।
সারসংক্ষেপ
বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়। কারণ এ ধরনের তৎপরতার ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকবাহিনীর ধর্ষণ, নির্যাতন ও গণহত্যা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির প্রতি বিশ্বব্যাপী যে সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতারই ফল।
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন, কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রতিনিধি প্রেরণ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন লাভের চেষ্টা, বিদেশে তহবিল সংগ্রহ ইত্যাদি ছিল বহির্বিশ্বে তৎপরতার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এসব তৎপরতার ক্ষেত্রে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কারণ একই সঙ্গে তিনি ছিলেন জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি এবং নিউইয়র্ক ও লন্ডন দূতাবাসের প্রধান।
তাছাড়া বহির্বিশ্বে তিনিই ছিলেন মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত। বহির্বিশ্বে তৎপরতার ফলে এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, বাংলাদেশ সমস্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা শরণার্থী সমস্যা নয়, বরং এটা ছিল শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম। চীনের বাধার কারণে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি জাতিসংঘে বক্তৃতা করতে না পারলেও এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসি বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পেরেছিল।
এমনকি সেপ্টেম্বর মাসে শেখ মুজিবের বিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে জনমত গড়ে উঠেছিল সে জনমতের চাপে পাক শাসকবর্গ শেখ মুজিবের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সর্বোপরি বাংলাদেশ ও বাঙালির সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী যে আলোড়ন ও আবেদন সৃষ্টি করেছিল তা ছিল বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতারই ফল।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। প্রফেসর সালাহ্উদ্দিন আহমদ, মোনায়েম সরকার ও ড. নূরুল ইসলাম মঞ্জুর সম্পাদিত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৭১), ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭।
২। আবু সাঈদ চৌধুরী, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি।
৩। তাজুল মোহাম্মদ, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রবাসী বাঙালি সমাজ।
৪। মঈদুল হাসান, মূলধারা ‘৭১।
৫। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম: দলিলপত্র, ৪র্থ ও ত্রয়োদশ খন্ড, ঢাকা, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮২।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। মুক্তি যুদ্ধচলাকালীন বাংলাদেশ সরকার বহির্বিশ্বে কোন কোন স্থানে মিশন স্থাপন করেছিল?
২। মুক্তি যুদ্ধচলাকালীন বিদেশ হতে বিভিন্ন মাধ্যমে যে অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।
৩। বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতার ফলাফল আলোচনা করুন ।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের তৎপরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।
২। মুক্তি যুদ্ধচলাকালীন মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার বিবরণ দিন।
৩। মুক্তি যুদ্ধচলাকালীন মুজিবনগর সরকার বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি প্রেরণ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন লাভের যে চেষ্টা চালিয়েছিলেন তা আলোচনা করুন ।
