বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১

পৃথিবীর দু’টি দেশে স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্যটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল এদেশের মুক্তিসংগ্রামের মাইলফলক ও প্রেরণার উৎস।

বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলেও এর বিষয়বস্তু ও নির্দেশনা ছিল একই এবং এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব স্বীকৃত হয়েছে। এসব ঘোষণার ফলে বাঙালিদের পক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব হয় এবং তার ইন্সিত বিজয় অর্জন সহজ হয়।

স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের এক দশকের মাথায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সামরিক সরকারের হাতে চলে যায়। সামরিক সরকার দেশ পরিচালনার নামে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শোষণ ও নির্যাতন শুরু করলে ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার হতে থাকে। ১৯৬৯ সালে স্বায়ত্তশাসনের প্রবল দাবির মুখে জেনারেল আইয়ুব খান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন।

ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে নির্বাচন ঘোষণা করেন এবং জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে না দিয়ে গড়িমসি শুরু করেন।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা থাকলেও পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতা লিপ্তাসার কারণে ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন এবং তাঁর এরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত ঘোষণা বাঙালি জাতিকে স্বায়ত্তশাসনের দাবির পরিবর্তে স্বাধীনতার দাবির দিকে ধাবিত করে।

১ মার্চ কয়েকজন ছাত্র নেতার উদ্যোগে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় এবং ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন এবং ছাত্রনেতারা বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করে। স্বাধীনতা আন্দোলনের লক্ষে কতগুলো পরিকল্পনাও ঘোষণা করে।

৩ মার্চের পর পুলিশী নির্যাতন ও ছাত্র-জনতা হত্যা এবং সরকারের গভীর ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যোন) এক জনসভার আহ্বান করা হয়। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ছিল ঐ দিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন। অপরদিকে পাকিস্তান সরকারও ঐদিনটির প্রতি কড়া নজর রাখে এবং স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারিত হলে কড়া এ্যাকশন নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।

বঙ্গবন্ধু যথাসময়ে জনসভায় উপস্থিত হন এবং বাঙালি জাতির পরবর্তী দিকনির্দেশনা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি পরোক্ষ ঘোষণা প্রদান করেন। তাঁর এ ঘোষণা বাঙালি জাতি তথা স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। জনসভায় তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল চারটি-

(১) চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার,

(২) সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া,

(৩) গণহত্যার তদন্ত করা ও

(৪) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

উপরোক্ত দাবিগুলোর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের উদ্দেশে কতগুলো নির্দেশ জারি করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস, কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন এবং সরকারকে কর বা খাজনা দিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রচার মাধ্যমগুলোতে আওয়ামী লীগের সংবাদ প্রচার না করা হলে সেগুলো বন্ধ করতে নির্দেশ জারি করেন। তিনি জনগণের স্বার্থের প্রতিকূলে ব্যবহৃত বন্দর ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেন।

সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ২৮ মার্চের মধ্যে বেতন তুলে আনতে নির্দেশ দেন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরোক্ষ ঘোষণা দেন। তাঁর কণ্ঠে “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম ।

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এর সাথে বঙ্গবন্ধু মুক্তিসংগ্রামের জন্য সকলকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের আহ্বান জানান । বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে অনুধাবন করা যায় যে, তিনি স্পষ্টভাবে ঐদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিন বিকেলে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও বাঙালি সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলে তিনি সকলকে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন এর মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিবিদগণের মতে, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূনর্বার ঘোষণা দেয়ার প্রয়োজন ছিল না।

কারণ এতে তিনি স্পষ্টভাবে স্বাধীনতার সবুজ সংকেত দিয়েছেন। এ ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শুরু হয়ে যায়। অপরদিকে সরকারও পরিস্থিতি শক্ত হাতে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে ।

‘৭১-এর মার্চের এ উত্তাল ও উত্তেজনা মুহূর্তে ইয়াহিয়া খান অগত্যা বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষে আলোচনার প্রস্তাব দেন এবং ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এক ব্যর্থ আলোচনা চালিয়ে যান। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও রসদ আমদানি করতে থাকেন। ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ রাতে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান ও পাকবাহিনীকে নিরস্ত্র, নিরীহ বাঙালিদের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যান।

ফলে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক গণহত্যা চালানো হয়। ঐদিন রাত দেড়টায় বঙ্গবন্ধুকে বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ২৫ মার্চ দিনের বেলা বঙ্গবন্ধু ঘটনা উপলব্ধি করে যে কোন জরুরি ঘোষণা প্রচারের লক্ষে বুয়েট থেকে কয়েকজন প্রকৌশলী নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নং বাসভবনে একটি ট্রান্সমিটার স্থাপন করেন বলে কোন কোন সূত্রে উল্লেখ আছে।

বন্দি হওয়ার পূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইংরেজি ভাষায় ঘোষণা করেন এবং এ ঘোষণা অনুযায়ী ওয়ারলেসযোগে চট্টগ্রাম প্রেরণ করেন। শোনা যায়, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রেরণকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুর আহমদ চৌধুরীর নিকট পৌঁছে। ঐদিন বিবিসি-র প্রভাতি অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি প্রচারিত হয়।

এদিকে দেশের সকল রেডিও স্টেশন ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল হান্নান সহ কতিপয় নেতার উদ্যোগ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে যন্ত্রপাতি স্থানান্তরিত করে চট্টগ্রামে কালুরঘাট প্রেরণ কেন্দ্রটিকে বেতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন এবং এর নাম দেন “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র” ।

কারো কারো মতে এ কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ বেলা ২-১০টায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেন এবং একই কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ মেজর (পরে রাষ্ট্রপতি) জিয়াউর রহমান প্রথম নিজ নামে এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এরপর ৩০ মার্চ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বহুবার ঘোষণাটি প্রচার করেন।

১০ এপ্রিল মুজিব নগরে অস্থায়ী সরকার গঠিত হলে এ সরকারের পক্ষ থেকে সাংবিধানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হয়। তবে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা হিসেবে ধরে নিয়ে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।

স্বাধীনতা ঘোষণার দলিলপত্র

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত দলিলপত্র ও তথ্য সংকলিত আছে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র” শীর্ষক ১৫ খন্ডে রচিত গ্রন্থে। এ গ্রন্থের ৩য় খন্ডের ১ম পৃষ্ঠায় ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা বাণীটি সন্নিবেশিত রয়েছে। মূল ঘোষণাটি ছিল ইংরেজিতে। এর বাংলা অর্থ নিম্নরূপ-

“এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”

দলিলপত্রে আরো বলা হয়, ২৫ মার্চ মধ্যরাত ও ২৬ মার্চ ইপিআর ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে এই বাণীটিই দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে।

২৬ মার্চ, এম. এ. হান্নান-এর ঘোষণা:

মো: আবদুল হান্নান ২৬ মার্চ দুপুরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যে ঘোষণা দেন তা ছিল নিম্নরূপ-

“আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ও তাঁর নামে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আপনারা যারা এ গোপন রেডিও হতে আমার এই ঘোষণা শুনছেন তারা অন্যদের নিকট এই বাণী প্রচার করবেন। আর যার নিকট যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোবাকেলা করুন এবং দেশকে মুক্ত করুন।”

২৭ মার্চ, মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা:

২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা যে ঘোষণাটি প্রচার করেন তা ঐদিন ভারতের ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব

১৯৭১ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার ঘোষণা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে দারূণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হলেও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ তারিখের ঘোষণার পরপরই দেশে বাঙালি ও সরকার উভয় পক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঐদিন থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। ৭ মার্চ বিকালবেলা ছাত্র-ছাত্রীরা রাইফেল নিয়ে ঢাকা রাজপথে মার্চ শুরু করে।

৮ মার্চ দেশে প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায় এবং ২৫ মার্চ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউ.ও.টি.সি-র ক্যাডেটরা এ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে (ঢাকায়)। একইভাবে বাঙালি সৈন্যদের মধ্যেও আলোড়ন শুরু হয়ে যায়। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক ‘গ্রীণ সিগন্যাল’ বলে মনে হলো”।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার পর থেকে পূর্ববাংলায় অসহযোগ ও প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়ে যায় । অপরদিকে পাকিস্তান সরকার ৭ মার্চ তারিখেই জেনারেল টিক্কা খানের মতো নরপিশাচকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। শুরু হয় বাঙালির ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছিল।

২৫ মার্চ দিবাগত রাতের পর দেশের প্রচার মাধ্যমগুলো পাকসেনাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তবুও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিলেট, শেরপুর, বরিশাল, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তোলা হয়েছিল।

তাঁর ঘোষণা পেয়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কালুরঘাট বেতার ট্রান্সমিটার কেন্দ্রকে নিরাপদ মনে করে “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং নিয়মিত স্বাধীনতার পক্ষে অনুষ্ঠান ও বুলেটিন প্রচার করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

২৬ মার্চ দুপুর বেলা চট্টগ্রাম থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ. হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পুনঃপ্রচার করেন এবং ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর থেকে মুক্তিযুদ্ধ একটি প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করে।

এই প্রতিটি ঘোষণাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মুজিবনগর ঘোষণাটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, একটি সরকার এ ঘোষণা দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ এ সরকারের কর্তৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটসহ শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। একই তারিখ থেকে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আইন বলবৎকরণ আদেশ জারি করেন।

নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানের এই ঘোষণাটি পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘোষণাকে তাঁর নির্দেশ হিসেবে গণ্য করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হয়।

সারসংক্ষেপ

১৯৭১ সালে প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে হান্নান, মেজর জিয়া ও স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ঘোষণার মূল ভিত্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার এবং স্বাধীনতার পর সংবিধানে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার মাধ্যমেই এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেছে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, ৩য় খন্ড, ঢাকা, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়, ১৯৮২।

২। আনোয়ারুল ইসলাম, স্বাধীনতার ঘোষণা ও বঙ্গবন্ধু, ময়মনসিংহ, রওশন আরা চৌধুরী, ১৯৯২।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭১

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট রচনায় ৭-২৫ মার্চের ঘটনাবলীর গুরুত্ব নির্ণয় করুন ।

২। বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চ এবং পরবর্তীতে মোহাম্মদ হান্নান ও মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সম্পর্কে বর্ণনা দিন ।

৩। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতা ঘোষণার গুরুত্ব মূল্যায়ন করুন।

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বিভিন্ন দলিলগুলো পর্যালোচনা করুন। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতিক্রিয়া
ও গুরুত্ব মূল্যায়ন করুন ।

Leave a Comment