নিয়মিত, অনিয়মিত বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনী

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় নিয়মিত, অনিয়মিত বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনী

Table of Contents

নিয়মিত, অনিয়মিত বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনী

 

নিয়মিত, অনিয়মিত বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনী

 

নিয়মিত, অনিয়মিত বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনী

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি সেনাবাহিনী, প্রাক্তন ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত হামলার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন, প্রাক্তন ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কোথাও কোথাও ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিকদের সহায়তায় বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

যদিও ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের আগে পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে স্বতস্ফূর্তভাবে এবং অনেকটা অপরিকল্পিত। কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগের পর তিনি নিয়মিত বাহিনীর সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেন এবং ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলেন সেক্টর, ফোর্স বাহিনী, নিয়মিত সেনা, বিমান, নৌবাহিনী।

পাশাপাশি স্থানীয় ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অনিয়মিত বাহিনী, বেসামরিক বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবকসহ (গণবাহিনী) সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল মুক্তিবাহিনী। এভাবে নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর সম্মিলিতভাবে যুদ্ধে সাফল্যের ফলে বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয় এবং স্বাধীনতা লাভ করে ।

নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর পরিচয়

মুক্তিবাহিনী সরকারি পর্যায়ে দু’ভাগে বিভক্ত ছিল- ১. নিয়মিত বাহিনী ও ২. অনিয়মিত বাহিনী।

নিয়মিত বাহিনী:

পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলোর সমন্বয়ে বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়। সৈন্যবলের ঘাটতি পূরণের জন্য আধা-সামরিক বাহিনী (যেমন পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ) বা যুবকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৮টি ব্যাটালিয়ন গঠিত হয়। এগুলো হচ্ছে এক, দুই, তিন, চার, আট, নয়, দশ, এগার নং ব্যাটালিয়ন। এছাড়া সেক্টর ট্রুপস গড়ে তোলা হয় ।

সেক্টর ট্রুপসের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের সেক্টর ট্রুপসে নেয়া হয়। নিয়মিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়ন নিয়ে ৩টি ব্রিগেড গঠন করা হয়। এই ব্রিগেডগুলো কে ফোর্স, এস ফোর্স ও জেড ফোর্স নামে পরিচিত ছিল। সরকারি পর্যায়ে এদের নামকরণ করা হয় এম.এফ. (মুক্তিফৌজ)।

নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা মাসিক বেতনভাতা ও সেনাবাহিনীর আইন-শৃংখলার আওতাধীন ছিল। নিয়মিত বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮,৬০০ জন। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনী, বিমান ও নৌবাহিনীও গড়ে তোলে।

অনিয়মিত বাহিনী:

যুবক, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও সকল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে অনিয়মিত বাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনীর সরকারি নামকরণ ছিল গণবাহিনী বা এফ.এফ. (ফ্রিডম ফাইটার বা মুক্তিযোদ্ধা)। এই বাহিনীর সদস্যদের দু’সপ্তাহের প্রশিক্ষনের পর একজন কমান্ডারের অধীনে তাদের নিজ নিজ এলাকায় গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো।

এই বাহিনীর জন্য কোন সামরিক আইন কার্যকর ছিল না। গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের কোন বেতন ভাতা দেয়া হতো না । অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লক্ষ ১২ হাজার। উপর্যুক্ত বাহিনীর বাইরে আরো কয়েকটি অনিয়মিত বাহিনী ছিল। মূলত স্থানীয় ভিত্তিতে ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে এইসব গেরিলা বাহিনী গঠিত ছিল।

রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শেখ ফজলুল হক মণির নিয়ন্ত্রণাধীনে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যদের সকলে ছাত্রলীগের সদস্য। মুজিব বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৬,০০০। এছাড়া ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব দলীয় বাহিনী ছিল।

নিয়মিত বাহিনীর গঠন ও রণনীতি

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর পর যুদ্ধকে পরিকল্পিত ও সংগঠিত করার জন্য কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি করে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। চীফ-অফ স্টাফ হিসেবে কর্নেল আবদুর রব ও ডেপুটি চীফ হিসেবে স্কোয়াড্রন লিডার এ.কে. খন্দকারকে নিযুক্ত করা হয়।

মুজিবনগর সরকারের এই সামরিক বিভাগের অধীনে এপ্রিল মাসেই বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতিটির জন্য একজন নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সদস্য নিযুক্ত করা হয়। এসব সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে দেয়া হয় অনিয়মিত গণবাহিনী বা গেরিলা বাহিনী। প্রত্যেকটা সেক্টরকে আবার কয়েকটি সাব সেক্টরে ভাগ করা হয়। এছাড়া গঠিত হয় তিনটি ফোর্স যা জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স নামে পরিচিত।

মেজর জিয়ার (লে. কর্নেল পদোন্নতিপ্রাপ্ত) নেতৃত্বে জুনের প্রথম দিকে প্রথম, তৃতীয় ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে গঠিত হয় জেড ফোর্স। লে. কর্নেল শফিউল্লাহর অধিনায়কত্বে মে মাসেই ২য় ইস্ট বেঙ্গল ও ৩ নম্বর সেক্টর নিয়ে গঠিত হয় এস ফোর্স।

মে মাসে ৪র্থ, ৯ম ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে গঠিত হয় কে ফোর্স যার অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল খালেদ মোশাররফ। এসব নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধকালে নিয়মিত বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী গড়ে তোলা হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী:

১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার জলঢাকায় বাংলাদেশ সরকার এক আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৬১ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে দ্বিতীয় লেফটেনেন্ট পদে কমিশন দেয়। এভাবে শুরু হয় সেনাবাহিনীর যাত্রা। এসব অফিসাররা পরবর্তীকালে বিভিন্ন সেক্টরে যোগ দেওয়ায় যুদ্ধে গতি সঞ্চার হয়।

বিমান বাহিনী:

১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকারের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠিত হয়। ১৮ জন পাইলট ও ৫০ জন বৈমানিক নিয়ে এ বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। বিমান বাহিনীর অনেক সদস্য স্থল যুদ্ধেও সাফল্যের পরিচয় দেন।

৩ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী যে সকল আক্রমণ রচনা করেছিল তার প্রথম আক্রমণের কৃতিত্ব বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর। ঢাকা পতনের আগে পর্যন্ত বিমান বাহিনী প্রায় ১২ বার পাকিস্তানি লক্ষবস্তুর ওপর আক্রমণ চালায় ।

নৌবাহিনী:

মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত বাহিনী হিসাবে নৌবাহিনীও গড়ে তোলা হয়। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে এ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। ৯ নভেম্বর পাকবাহিনীর কাছ থেকে ৬টি দখলকৃত নৌযান নিয়ে প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ নৌবহরের উদ্বোধন করা হয়। যুদ্ধের শেষদিকে নৌবাহিনী গঠিত হলেও নৌ-পথে যুদ্ধ পরিচালনার কৃতিত্ব মূলত নৌ-কমান্ডো গেরিলাদের।

অনিয়মিত বাহিনী

রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক বাহিনী মুজিব বাহিনী

বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর কর্তৃত্ব ছাড়াই মুজিব বাহিনী বা বিএলএফ গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বাছাই করা তরুণ ও শিক্ষিত কর্মীদের নিয়ে এ বাহিনী গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করা ছাড়াও যুদ্ধের নেতৃত্ব যাতে কোন উগ্রপন্থী বা চরমপন্থী দলের হাতে চলে না যায়, সেটাও মুজিব বাহিনীর অন্যতম লক্ষ ছিল। ভারতীয় জেনারেল উবানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেরাদুনে এদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

মোট চারটি সেক্টরে মুজিব বাহিনী বিভক্ত ছিল। উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টর গঠিত ছিল বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, বগুড়া নিয়ে। এর প্রধান ছিলেন সিরাজুল আলম খান। দক্ষিণাঞ্চলীয় সেক্টর গঠিত ছিল বৃহত্তর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী নিয়ে। এর প্রধান ছিলেন তোফায়েল আহমদ। পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের প্রধান ছিলেন শেখ মণি।

বৃহত্তম চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, ঢাকার অংশবিশেষ নিয়ে এই সেক্টর গঠিত ছিল। কেন্দ্রীয় সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল বৃহত্তর ময়মনসিং, টাঙ্গাইল ও ঢাকা জেলার অংশ। এর প্রধান ছিলেন আবদুর রাজ্জাক ।

আঞ্চলিক বাহিনী

কাদেরিয়া বাহিনী:

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অধিকৃত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যে বাহিনী এক অনন্য বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল, সে বাহিনীর নাম কাদেরিয়া বাহিনী। এর অধিনায়ক কাদের সিদ্দিকীর নামানুসারে এই বাহিনীর নামকরণ করা হয়। সমগ্র টাঙ্গাইল, ঢাকা, ময়মনসিংহ, পাবনা জেলার কিয়দংশসহ মোট ১৫০০ বর্গমাইল এলাকা কাদেরিয়া বাহিনীর আওতাধীন ছিল।

কাদেরিয়া বাহিনীতে ১৬,০০০ যোদ্ধা এবং ৭২,০০০ স্বেচ্ছাসেবক ছিল। কাদের সিদ্দিকী ৩০ মাইল এলাকা নিয়ে একটি মুক্তাঞ্চলও গড়ে তোলেন যার সদর দপ্তর ছিল ভুয়াপুর। কাদেরিয়া বাহিনী নিয়মিত বাহিনীর মত গড়ে তোলা হয় এবং এই বাহিনীর সদর দপ্তরকে প্রধানত ৫টি দপ্তরে বিভক্ত করা হয়- ১. অস্ত্রাগার, ২. বেসামরিক বিভাগ, ৩. বেতার ও টেলিফোন, ৪. হাসপাতাল, ৫. জেলখানা। বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ছিলেন আনোয়ার আলম শহীদ ।

 

বাতেন বাহিনী:

টাঙ্গাইলের খন্দকার বাতেন মুক্তিযুদ্ধকালে দক্ষিণ টাঙ্গাইল, ঢাকার কিছু এলাকা, গাজীপুর জেলার কিছু এলাকা, মানিকগঞ্জ জেলার উত্তরাঞ্চল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার কিছু এলাকা নিয়ে বাতেন বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। এ বাহিনীর তিনটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল। সামরিক বিভাগ ছাড়াও ছিল বেসামরিক বিভাগ ।

আফসার ব্যাটালিয়ন:

ময়মনসিংহ জেলার ভালুকার আফসার উদ্দিন ছিলেন আফসার ব্যাটালিয়নের প্রতিষ্ঠাতা। ৪,৫০০ জন যোদ্ধা নিয়ে এ বাহিনী গঠিত ছিল। এই বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণাঞ্চল (ভালুকা, গফরগাঁও, ত্রিশাল, কোতোয়ালী, টাঙ্গাইল জেলার কিয়দংশ), ঢাকা ও গাজীপুর জেলার অংশবিশেষ। মূলত পাকবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ছিল এই বাহিনীর অস্ত্র সংগ্রহের উৎস।

হেমায়েত বাহিনী:

সৈনিক হেমায়েত উদ্দিন গোপালগঞ্জ, বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর এলাকায় গড়ে তোলেন হেমায়েত বাহিনী। এ বাহিনীর যোদ্ধা সংখ্যা ছিল ৫,০৫৪ জন। নিয়মিত বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ৩৪০ জন, বাকিরা ছিলেন গেরিলা। এ বাহিনীতে বেশ কয়েকজন মহিলা যোদ্ধাও ছিলেন।

আকবর বাহিনী:

ঝিনাইদহের গাড়াগঞ্জ থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে আকবর বাহিনী যুদ্ধ করে। এর প্রতিষ্ঠাতা আকবর হোসেন মিয়া। এই বাহিনী শ্রীপুর বাহিনী নামেও পরিচিত। এই বাহিনীর অস্ত্র সংগৃহীত হয় পরাজিত পাকিস্তানি হানাদারদের পরাস্ত করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও ভারতীয় পত্র- পত্রিকায় এই বাহিনীর যুদ্ধ জয়ের খবর অনেকবার প্রচারিত হয়।

লতিফ মির্জা বাহিনী:

সিরাজগঞ্জ জেলার কামারগঞ্জ থানাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধে পলাশ ডাঙ্গা যুব শিবির বা লতিফ মির্জা বাহিনী গড়ে ওঠে। এর পরিচালক ছিলেন আবদুল লতিফ মির্জা। ৭টি রাইফেল ও ১৫ জন যোদ্ধা নিয়ে এ বাহিনীর যাত্রা শুরু এবং এক পর্যায়ে অস্ত্র সংখ্যা ১০ হাজার এবং যোদ্ধা সংখ্যা ৮,০০০ এ উন্নীত হয়।

মূলত বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এ বাহিনী যুদ্ধ করে। চলনবিল এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল এই বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি।

হালিম বাহিনী:

মানিকগঞ্জে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী গড়ে তুলেন হালিম বাহিনী। ছত্রিশটি রাইফেল সম্বল করে হরিরামপুরে পদ্মার তীরে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। মানিকগঞ্জ, ঢাকার নবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ছিল তাঁর যুদ্ধ ক্ষেত্র ।

নিয়মিত বাহিনীর কার্যক্রম ও সাফল্য

মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত বাহিনী মূলত সেক্টর ও ব্রিগেডসমূহের আওতায় যুদ্ধ করে। তাদের সঙ্গে অংশ নেন বিপুল সংখ্যক গেরিলা। যদিও যুদ্ধের মূল নেতৃত্বে ছিলেন নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা। ১ নম্বর সেক্টরে ২৪ মে মুক্তিবাহিনী চাঁদগাজিতে ক্যাপ্টেন অলি আহাদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে আক্রমণ করে তা দখল করে নেয়। ৬ জুন চাঁদগাজি উদ্ধারের চেষ্টা করলেও পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়।

তাদের ৭৫ জন সৈন্য নিহত হয়। একই মাসে চাঁদগাজি দখলের পাকিস্তানি উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং এবার ৪৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। যদিও এ মাসের শেষে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনী চাঁদগাজী দখল করে নেয়। ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন শামসুল হুদার নেতৃত্বে যথাক্রমে হিয়াকু- রামগড় এবং দেবীপুর বিওপিতে আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী বহু সাফল্য লাভ করে।

অক্টোবরে মুক্তিবাহিনী ছাগলনাইয়া, বেলোনিয়া, বল্লমপুর আক্রমণ করে বহু পাকিস্তানি সৈন্যকে হতাহত করে। ২ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে মুন্সিহাট, ছাগলনাইয়া, বেলুনিয়া যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী সাফল্য লাভ করে। ৮ অক্টোবর মুক্তিবাহিনী শালদা নদী যুদ্ধে জয়লাভ করে। এ মাসে কসবা যুদ্ধেও সাফল্য বয়ে আসে। লে. আজিমের নেতৃত্বে শালদা নদীর যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয়ী হয়।

যদিও নেতৃত্বদানকারী লে. আজিজ শহীদ হন। ৩ নম্বর সেক্টরের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হচ্ছে রায়পুর, মাধবপুর, কাপাশিয়া, মনোহরদী, কুলিয়ারচর, তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ । এসব যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধারা সাফল্য লাভ করে। চার নম্বর সেক্টরের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ আগস্ট মাসের শাহবাজপুর রেলওয়ে ষ্টেশন যুদ্ধ। পরের মাসে বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, জাকিগঞ্জে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী সাফল্য লাভ করে।

অক্টোবর মাসে প্রথম ও অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই সেক্টরে যোগ দিলে এ বাহিনীর শক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। নভেম্বরে আটগ্রাম- জাকিগঞ্জের প্রচন্ড যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয়ী হন। ৫ম সেক্টরে বড়ছড়া, বালাট, ভোলাগঞ্জে জুলাই- আগস্ট মাসে অসংখ্য যুদ্ধ হয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ সেক্টরের ২০০ বর্গমাইল এলাকা মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। অক্টোবর মাসে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল এই সেক্টরে যোগ দেয়ার পর মুক্তিবাহিনীর দ্রুত সাফল্য আসতে থাকে।

অনিয়মিত বাহিনীর কার্যক্রম ও সাফল্য

মুজিব বাহিনী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের গেরিলা

মুজিব বাহিনীর প্রায় ছয় হাজার যোদ্ধা বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে। যদিও ট্রেনিং শেষে যুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায় তারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় তাদের যুদ্ধ বিবরণ তেমন পাওয়া যায় না। এছাড়া মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশের অভ্যন্তরে সেক্টর ও আঞ্চলিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে মুজিব বাহিনীর সঙ্গে এসব বাহিনীর বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষও হয়।

এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উত্তরবঙ্গের কোন কোন জেলায়, চট্টগ্রামে মুজিব বাহিনীর কিছু কিছু কার্যক্রম ও সাফল্য ছিল। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ন্যাপ (মোজাফফর), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মণি সিংহ) প্রভৃতির যৌথ উদ্যোগে সীমান্ত এলাকাগুলোতে যুব শিবির ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এসব শিবিরের কয়েক হাজার গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেয়।

ছাত্র ইউনিয়ন সমমনাদের নিয়ে এসব গেরিলা দল গঠন করে যারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে। ১১ নভেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা রণাঙ্গনে এদের একটি গেরিলা দলের ৭৮ জন দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশকালে পাকবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৯ জন সদস্য শহীদ হন।

আঞ্চলিক বাহিনী

কাদেরিয়া বাহিনী:

কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে পাকবাহিনীর প্রথম সংঘর্ষ হয় ২২ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে। ১৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য এখানে নিহত হয়। তবে কাদেরিয়া বাহিনীর বড় যুদ্ধ মাটিকাটার জাহাজমারা যুদ্ধ। জাহাজে প্রায় ২১ কোটি টাকার অস্ত্র ছিল এবং যুদ্ধে জয়লাভের ফলে প্রায় সব অস্ত্র কাদেরিয়া বহিনীর দখলে আসে। ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর কাদেরিয়া বাহিনী টাঙ্গাইল শত্রুমুক্ত করে ঢাকা অভিমুখে রওয়া হয়।

এসময় কাদেরিয়া বাহিনী জামালপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল থেকে পালিয়ে আসা তিন হাজার পাক সৈন্যকে গ্রেফতার করে। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণকালে কাদেরিয়া বাহিনীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ বাহিনীর ৬ হাজার যোদ্ধা উক্ত অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন ।

বাতেন বাহিনী:

১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম থেকে বাতেন বাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর আক্রমণ চালায়। এ মাসে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানা, ঘিওর ও দৌলতপুর থানা আক্রমণ করে। এ দু’টি থানা দখল করে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। এ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হলো মির্জাপুর থানার ধল্লা ব্রিজ অভিযান, সাটুরিয়া থানা, নাগরপুর থানা দখল অভিযান।

এসব অভিযানে থানা ও শত্রু বাহিনীর প্রচুর অস্ত্র মুক্তিবাহিনীর হস্তগত হয়। যদিও যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সহযোদ্ধাদের মিস ফায়ারে বাতেন মারা যান।

আফসার ব্যাটালিয়ন:

মে মাসের প্রথম দিকে ভালুকা থানা দখল করে ১০টি রাইফেল সম্বল করে যে বাহিনী গঠিত হয় ক্রমান্বয়ে এ বাহিনী একটি সুসজ্জিত বাহিনীতে রূপ নেয়। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে বহু রাজাকারকে হত্যা করা ছাড়াও মল্লিকবাড়ি পাকসেনাদের ঘাঁটি দখল করে নেয়। কালিগঞ্জ ও ত্রিশাল এলাকা থেকে আসা পাক সেনাদেরও পরাজিত করে। এ যুদ্ধে ৭১ জন পাক সেনা ও রাজাকার নিহত হয়।

এ মাসে গফরগাঁও থানায়ও সফল অভিযান পরিচালিত হয়। ৬ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরে পাকবাহিনীর ট্রাকের ওপর আক্রমণ চালিয়ে পাকবাহিনীকে পরাজিত করে। এ মাসের ১৪ তারিখের মধ্যেই গফরগাঁও, ভালুকাসহ ময়মনসিংহের বড় অংশ তারা দখল করে। ১৮ ডিসেম্বর মেজর আফসার তাঁর বাহিনীসহ ঢাকা পৌঁছান।

হেমায়েত বাহিনী :

মে মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে হেমায়েত বাহিনী গঠিত হয়। জুন মাসের মধ্যেই কোটালিপাড়া, টুঙ্গিপাড়া, কালকিনি, টেকেরহাটে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালানো হয়। সেপ্টেম্বরে ১৪ ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধের পর কোটালিপাড়া থানা হেমায়েত বাহিনী দখল করে নেয়। ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। হেমায়েত বাহিনী বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর জেলার অনেক এলাকা মুক্ত করে।

আকবর বাহিনী:

মে মাসেই আকবর বাহিনীর পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর আক্রমণ শুরু হয়। তবে আগষ্ট মাস থেকে বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়। এ মাসে শৈলকুপা থানা দখল ছাড়াও আলফাপুরের যুদ্ধে আকবর বাহিনী প্রচুর অস্ত্র লাভ করে। এ যুদ্ধে ৫৫ জন পাক সেনা নিহত হয়। এ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অভিযান হচ্ছে ইছাখাদা রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ, মাশানিয়ার যুদ্ধ, বরইপাড়া যুদ্ধ, বিনোদপুর রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ, নাকোলের যুদ্ধ।

৪ ডিসেম্বর মাগুরা বিজয় এ বাহিনীর অপর সাফল্য বয়ে আনে। ঐ দিন ২৫০ জন পাক সেনাকে নিহত করে আকবর বাহিনী মাগুরা জয় করে। এরপর আকবর বাহিনী ফরিদপুরের দিকে অগ্রসর হয়। মিত্রবাহিনী, আকবর বাহিনী ও অন্যান্য স্বাধীনতাকামী বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফরিদপুর মুক্ত হয়।

লতিফ মির্জা বাহিনী:

লতিফ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হচ্ছে কাশিনাথপুরের ডাব বাগানের যুদ্ধ, ঘাটনা যুদ্ধ, ফরিদপুর থানা যুদ্ধ, সাঁথিয়া যুদ্ধ। নাটোরের গুরুদাসপুর থানা আক্রমণ করে এ বাহিনী প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করে। পাক সেনাদের শক্ত ঘাঁটি ব্রাহ্মগাছায়ও মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে সাফল্য লাভ করে। আকবর বাহিনী সর্বশেষ যুদ্ধ করে উল্লাপাড়ায়। এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ১৪ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

সারসংক্ষেপ

পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকসহ জনতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত সৈন্য, ইপিআর সৈন্য, পুলিশ, আনসার সহ সামরিক, আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরাও এতে যোগ দেন। এভাবে বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত মুক্তিবাহিনীর হাতে বহুগুণ বেশি অস্ত্র নিয়েও পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়।

স্বল্প সংখ্যক নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে যোগদানকারী অনিয়মিত গেরিলা বাহিনী, আঞ্চলিক বাহিনী ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক বাহিনীরও ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বিপুল সংখ্যক অনিয়মিত বাহিনী কখনো নিয়মিত বাহিনীর নেতৃত্বে, কখনো স্বতন্ত্রভাবে যুদ্ধ করেছে। তবে যে সেখানেই যুদ্ধ করুন না কেন নির্বিশেষে সকল বাহিনীর লক্ষ ছিল এক ও অভিন্ন আর তা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, নবম ও দশম খন্ড, ঢাকা, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮৪।

২। শামসুল হুদা চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর, ঢাকা, বিজয় প্রকাশনী, ১৯৮৫।

৩। মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি, একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৮৩ ।

৪। স্মৃতি (সংকলন), ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ঢাকা, উৎসের সন্ধানে, ১৯৯১ ।

 

নিয়মিত, অনিয়মিত বিভিন্ন সশস্ত্রবাহিনী

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:

১। ৫টি আঞ্চলিক বাহিনীর পরিচয় দিন।

২। মুক্তিযুদ্ধকালে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী কখন ও কিভাগে গড়ে উঠেছিল সংক্ষেপে লিখুন।

৩। কাদেরিয়া বাহিনী ও বাতেন বাহিনীর গঠন সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।

৪। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে যেসব গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠেছিল তাদের গঠন সম্পর্কে বর্ণনা দিন ।

৫। হেমায়েত ও আকবর বাহিনীর যুদ্ধে কার্যক্রম ও সাফল্য সংক্ষেপে লিখুন।

রচনামূলক প্রশ্ন:

১। নিয়মিত বাহিনীর পরিচয়, গঠন, কার্যক্রম ও সাফল্যের বিবরণ দিন।

২। অনিয়মিত বাহিনীর পরিচয়, গঠন, কার্যক্রম ও সাফল্যের বিবরণ দিন।

Leave a Comment