উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে অসম্মতি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে অসম্মতি – অবরুদ্ধ ঢাকায় আজ বৃটিশ ও কানাডীয় বিমান অবতরণের অনুমতি। দেয় নি পাকিস্তান সরকার, ফলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় সম্ভাব্য জিম্মি হিসেবে আটকে পড়েছে ৫০০ বিদেশী। উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে পাকিস্তানের এই অসম্মতি ব্যক্ত হয়েছে যখন পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণের চূড়ান্ত অভিযান হিসেবে ঢাকার দিকে এগিয়ে চলেছে ভারতীয় বাহিনী।

 

উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে অসম্মতি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে অসম্মতি

বিমানযোগে উদ্ধারকর্ম চালানোর জন্য জাতিসংঘ আনীত চারটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান রয়েছে কলকাতায় এবং কানাডীয় বিমান বাহিনীভুক্ত এর একটি বিমান যখন ঢাকার ৩০ মিনিট দূরবর্তী আকাশসীমায় পৌঁছে অবতরণের অনুমতি প্রার্থনা করে তখন কনট্রোল টাওয়ার থেকে বিমানটিকে ফিরে যেতে বলা হয়। পাইলটের বক্তব্য অনুসারে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বলা হয়: ‘জাতিসংঘ পরিচালিত কি অপরিচালিত আমরা তার থোরাই পরোয়া করি।

ভারতের মাটি থেকে কোনো বিমানকে এখানে আসতে দেওয়া হবে না।’ কলকাতায় ফিরে আসে এই প্লেন। এখানকার একজন বিদেশী কূটনীতিকের কাছ থেকে জানা যায় এর অল্পকাল পরে কলকাতায় খবর এসে পৌঁছয় যাতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে পাকিস্তানিরা তাদের অবস্থান কিছুটা নমনীয় করেছে।

আরেকটি পরিবহন বিমান, বৃটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর হারকিউলিস, ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। … অপর তিনটি বিমান এগিয়ে রানওয়ের প্রান্তে গিয়ে ওড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ পর বৃটিশ বিমানটি ফিরে এসে অবতরণ করে এবং অন্য বিমানগুলোও হ্যাঙ্গারে ফিরে যায়। জানা যায় বৃটিশ বিমান থেকে ঢাকার কনট্রোল টাওয়ারে বার্তা পাঠালে এর আগে কানাডীয় বিমানের ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল সেই একই জবাব মেলে।

ভারত বারবারই বলেছে যে, ১২৫ জন আমেরিকান ও অপরাপর দেশের ৪০০ বিদেশী নাগরিককে উদ্ধারকারী সবল বিমানকে অবশ্যই যেতে-আসতে কলকাতায় অবতরণ করতে হবে। ভারতীয়দের মতে কেবল এভাবেই তারা বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। তবে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে আসল কারণ হলো ভারত এটা নিশ্চিত করতে চায় যে কোনো পাকিস্তানি অফিসার যেনো বিমানে পালাতে না পারে।

 

উদ্ধারকারী বিমান অবতরণে অসম্মতি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

ভারতীয় শর্ত গৃহীত

জাতিসংঘ কিংবা পাকিস্তান কেউই ভারতের এই শর্ত পছন্দ করে নি। তা সত্ত্বেও, গতরাতের কূটনীতিক সূত্রের খবরে প্রকাশ, উভয়েই এটা মেনে নেয় এবং বিমানযোগে উদ্ধারকর্মের প্রস্তুতি শুরু হয়। কূটনীতিক সূত্রে প্রকাশ, পাকিস্তান এখন অভিযোগ করছে যে, উদ্ধার কাজে জন্য সম্মত আকাশযুদ্ধ-বিরতি, যার আওতায় বিমানবিধ্বংসী কামানগুলো গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখবে, সেই সুযোগ নিয়ে ভারত হেলিকপ্টার ও প্লেনে করে ঢাকার আশপাশে ছত্রী ও পদাতিক সৈনিকদের নামিয়ে দিয়ে শক্তি বৃদ্ধি করছে। আজ নিয়ে তিনবার বিমানযোগে উদ্ধার প্রচেষ্টা বানচাল হলো।

প্রথমবারটি ঘটেছিলো গত বুধবারে যখন একটি কানাডীয় প্লেন ঢাকায় নেমে ভারতীয় বিমান হামলার কবলে পড়ে। অথচ তখন আকাশ-যুদ্ধে বিরতি বজায় থাকার কথা ছিল। ভারতীয়রা পরে জানায় এটা ভুলক্রমে ঘটেছে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। দ্বিতীয়টি ঘটে পরের দিন থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে উড়ে আসার সময় বঙ্গোপসাগরের ওপর এই একই পরিবহন বিমানের ক্ষেত্রে। জাহাজ থেকে নিক্ষিপ্ত বিমানবিধ্বংসী কামানের গোলায় বিমানে ফুটো হয়ে যায়। পাইলট আবার ব্যাংকক ফিরে যেতে সমর্থ হন।

 

বাংলাদেশের পক্ষে র‍্যালি

পাকিস্তানি সৈন্যদের বিতাড়িত করে ভারতীয় বাহিনী প্রতিষ্ঠিত এক মুক্তাঞ্চলে বিদ্রোহী বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা আজ প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আবির্ভূত হন। বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ চারটি বাস-বোঝাই ১২৮ জন বিদেশী সংবাদদাতাসহকারে ভারতীয় সৈন্য ও মুক্তিবাহিনীর প্রহরায় মোটরগাড়িবহর নিয়ে যশোর উপস্থিত হন।

যশোরের পথে রাস্তার একস্থানে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে ডান হাত বুকের ওপর রেখে জনাব নজরুল ইসলাম বললেন, ‘আমি আজ সবচেয়ে সুখী মানুষ। আমি চলেছি আমার মুক্ত মাতৃভূমির উদ্দেশ্যে।’ গত মঙ্গলবার ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা অধিকৃত যশোর শহরে জনতার উদ্দেশে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কেউ সম্পর্ক বিনষ্টের চেষ্টা করলে সেটা আমরা সহ্য করবো না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবসান ঘটলো, আর স্থান হবে না ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের।’ উপস্থিত জনতা ছিল সংযত, অল্পোৎসাহী; যে স্পন্দিত জনতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে সমবেত হতো তার অনুজ্জ্বল সংস্করণ এই জনতা। পূর্ব পাকিস্তানের এই নেতা মার্চ মাস থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী, যখন থেকে বাঙালির স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন দমাতে পাকিস্তানি সেনাভিযান শুরু হয়েছে।

পাকিস্তানিদের কবল থেকে যশোর মুক্ত হয়েছে মাত্র চারদিন, ইতিমধ্যেই মানুষ প্রায় প্রতিটি ভবনের দেয়ালে মুজিবের পোস্টার সেঁটে দিয়েছে। দেদার বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশের পতাকা। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নারী ও শিশুসহ প্রায় ১২০০ অবাঙালিকে আটক করে রাখা হয়েছে তাদের নিরাপত্তার কারণে। সেনাবাহিনীর পক্ষ-নেয়া এই অবাঙালিদের বেশিরভাগই বিহারি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া মাত্র (ভারতীয়) সৈন্যদের থাকার আর প্রয়োজন হবে না।’

Leave a Comment