বেগমদের প্রভাব ও নাবালক বাদশাহ আকবর

বেগমদের প্রভাব – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “নাবালক বাদশাহ” বিভাগের একটি পাঠ। আকবর বৈরাম খাঁর হাত থেকে সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে করায়ত্ত করতে পারেননি। বস্তুত মাহম আনকা তাঁর কন্যা ও আত্মীয়-স্বজনের বলে বলীয়ান হয়ে বৈরাম খাঁকে জব্দ করতে সক্ষম হন। তিনি কি কখনো চান আকবর তাঁর প্রভাবের আওতার বাইরে চলে যান? পীর মুহম্মদ শিরওয়ানী ষড়যন্ত্র সফল করে তোলার জন্য তাঁর প্রভু বৈরাম খাঁর সঙ্গে বিশ্বসঘাতকতা করেছিলেন।

বেগমদের প্রভাব ও নাবালক বাদশাহ আকবর

 

তর্দিবেগের সর্বনাশ করার পিছনেও তাঁরই হাত ছিল। তিনি মাহম আনকার অত্যন্ত কৃপাপাত্রদের একজন ছিলেন। সে-সময় বৈরাম খাঁর চক্ষু নিবদ্ধ ছিল মালওয়ার উপর। সেখানে পাঠান শাসন বলবৎ ছিল। প্রথমে ইসলামশাহ শূরের পক্ষে শাজাত খাঁর (সহজাওয়ল খাঁ) শূর মাণ্ডুতে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন, পরে নিজেই স্বাধীন শাসক হন। ৯৬৩ হিজরীতে (১৫৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বাজবাহাদুর মালওয়ার গদিতে বসেন, যে-বছর আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।

বাজবাহাদুর (সুলতান বায়জিদ) একে অযোগ্য, তার উপর নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ও বহু আমির-ওমরাহকে হত্যা করে নিজের আসন মজবুত করেন। প্রতিবেশী গোও রাজাদের দিকে হাত বাড়াতে চেয়েছিলেন তিনি এবং মারাত্মকভাবে পরাজিত হন। তিনি সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন। তিনি আদলীর (আদিলশাহ শূরের) নিকট থেকে সঙ্গীত-শিক্ষা লাভ করেছিলেন, সে কথা আগে বলেছি ।

মদিরা, মদিরেক্ষণা ও ছিল তাঁর জীবনের ধ্যান। তাঁর দরবারে নৃত্যগীত-পটীয়সী রূপমতী গণিকা ছিল, তার প্রেমে পাগল ছিলেন তিনি। কত কবি সেই প্রেম নিয়ে কবিতা লিখেছেন । ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে মাহম আনকার (আনগা) পুত্রে আদহম খানের সঙ্গীতই নেতৃত্বে মালওয়া আক্রমণের আয়োজন হয়। পীর মুহম্মদ শিরওয়ানী নাম-মাত্র সহ- সেনাপতি হন। নইলে প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা।

অপরিণত-বুদ্ধি তরুণ আদহম খানকে তাঁর মাতার আগ্রহেই প্রধান সেনাপতি করা হয়। সারঙ্গপুরের কাছে ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে বাজবাহাদুর পরাজিত হন। মালওয়ার কোষাগার শাহী সেনার হস্তগত হয়। বাজবাহাদুর তাঁর অমাত্যদের বলে রেখেছিলেন, যদি যুদ্ধে পরাজয় হয়, তাহলে শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করার জন্য বেগমদের যেন হত্যা করে ফেলা হয়।

জগদ্বিখ্যাত সুন্দরী রূপমতীর উপর তরোয়াল চালানো হয়েছিল, কিন্তু সে মরেনি। আদহম লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন, খুব সামান্যই হাতির পিঠে তুলে দিয়ে আকবরের কাছে পাঠিয়ে দেন। পীর মুহম্মদ ও আদহম খাঁ মালওয়ায় ভীষণ নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

মালওয়ার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো ভেদ রাখা হয়নি। মালওয়ার আগের শাসনকর্তারাও মুসলমান ছিলেন। বিদ্বান শেখ ও সম্মানার্হ সৈয়দদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। সেই সংবাদ আকবরের কাছে এসে পৌঁছায়। তিনি জানতেন, মাহম তাঁর পুত্রের জন্য সব কিছু করার চেষ্টা করবেন, সেজন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই তিনি একদিন (২৭শে এপ্রিল, ১৫৬১) অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে আগরা থেকে রওনা দিলেন।

খবর পেয়েই মাহম পুত্রের নিকট দূত প্রেরণ করলেন, কিন্তু আকবর দূতের পূর্বেই মালওয়া পৌছে গেলেন। আদহম খাঁ হতভম্ব হয়ে পড়লেন । তিনি আত্মসমর্পণ করে ছুটি প্রার্থনা করলেন। আকবর জানতে পারেন, তিনি নিজের জন্য বাজবাহাদুরের অন্তঃপুরের দুই সুন্দরীকে লুকিয়ে রেখেছেন। মাহম উদ্বিগ্ন হলেন। ভাবলেন, যদি এই দু’জন আকবরের সামনে হাজির হয়, তাহলে অনর্থ কাণ্ড ঘটবে, সেজন্য তাদের বিষপ্রয়োগে হত্যা করানো হল ।

এই সময় আকবর তড়িৎ গতিতে আদহমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বপ্রথম তাঁর রাজনৈতিক সাহসের পরিচয় দেন। মালওয়ার কাজকর্মের বন্দোবস্ত করে আটত্রিশ দিন পর (৪ঠা জুন, ১৫৬১) তিনি আগরায় প্রত্যাবর্তন করেন। প্রত্যাবর্তনের সময় পথে নরওয়রের নিকটস্থ জঙ্গলে তিনি মৃগয়া করেন এবং পাঁচটি শাবক-সহ একটি বাঘিনীকে তরোয়ালের এক কোপে হত্যা করেন। এই সময় আগরায় আরও একটি বিপদের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। হেমুর হাতি হাওয়াই অত্যন্ত মত্ত ও বিপজ্জনক ছিল ।

একদিন আকবর সেই হাতিতে চড়বেন বলে জিদ ধরলেন। দু’-তিন পেয়ালা চড়িয়ে হাওয়াইয়ের পিঠে চড়ে বসলেন তিনি। তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না। অন্য হাতি রনবাঘাকে আনিয়ে তার সঙ্গে লড়িয়ে দিলেন। হাওয়াইয়ের প্রহার সহ্য করতে না পেরে রনবাঘা প্রাণ নিয়ে দৌড়তে থাকে। কিন্তু হাওয়াই তাকে ছেড়ে দিয়ে রাজি নয় । আকবর হাওয়াইয়ের কাঁধে বসে ছিলেন। রনবাঘার পিছনে পিছনে হাওয়াই যমুনার খাড়া তীর থেকে নিচের দিকে দৌড়য়। নৌকো-সাঁকো পাহাড়ের ভারে কি টিকে 

থাকতে পারে? সাকো ডুবে যায়। এপারেই আগে আগে রনবাঘা দৌড়ে চলেছে, পিছনে পিছনে হাওয়াই। লোকে রুদ্ধশ্বাসে সেই প্রাণঘাতী মজা দেখছিল। আকবর নিজের সংযম বজায় রেখে হাওয়াইকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন, এবং শেষে সফল হন । ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দেও আকবরের জীবনে একটি ঘটনা ঘটে। সাকিত পরগণার (‘এটা’ জেলা) আটখানা গ্রামের লোক অত্যন্ত অবাধ্য ছিল। 

আকবর নিজে তাদের দমন করতে মনস্থ করেন। একদিন শিকার-যাত্রার অজুহাতে দেড়-দুই শত সওয়ার ও অনেক হাতি নিয়ে যাত্রা করেন। বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল চার হাজার, কিন্তু আকবর সেই সংখ্যাকে আমলই দিলেন না। তিনি লক্ষ্য করেন, শাহী সওয়ার আগুপিছু করছে।

তাহলে কি ঘটল? নিজের হাতি দলশঙ্করে চড়ে তিনি একা ব্যাপারটা যাচাই করতে একটি গৃহের দিকে অগ্রসর হন। মাটিতে শস্যদানা ছড়িয়ে ছিল, তার উপর পা পড়তেই হাতি টাল খেলে গেল। শত্রুরা শরবর্ষণ করছিল। পাঁচটি তীর তার ঢালে এসে লাগে। আকবর বেপরোয়া হয়ে কোনোরকমে হাতিকে সেখান থেকে বের করতে সক্ষম হন এবং গৃহের প্রাচীর ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেন। ঘরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। তাতে এক হাজার বিদ্রোহী পুড়ে মরে ।

এর এক বছর পূর্বে ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধের কথা। আকবরের বয়স তখন উনিশ বছর। তিনি প্রজাদের সুখ-দুঃখ জানার চেষ্টা করতেন। সাধু-ফকিরদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করারও খুব শখ ছিল। কখনো কখনো সাজ বদল করে বেরিয়েও পড়তেন।

একদিন রাত্রে তিনি সাজ বদল করে আগরায় যমুনার পারে একটা বড় জনসমাবেশে যাচ্ছিলেন । জনৈক তাঁকে চিনতে পারে ও অন্যদের জানায়। বদমায়েশরা জেনে ফেললে আশঙ্কার কথা। তিনি এক মিনিট দেরি না করে তাঁদের নিকটে গিয়ে চোখের তারা এমনভাবে ঘোরালেন যে তারা বলল—“না, ওঁর চোখ দু’টো বাদশাহের মতো নয়।”

খানেজমান আলী কুল্লি খাঁকে জৌনপুরের সুবেদার করা হয়েছিল। বাবর, হুমায়ূন তাঁদের তুরানী ভ্রাতাদের অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন, তাঁদের উঁচু উঁচু পদে নিয়োগ করতেন। কিন্তু সুযোগ পেলেই ধোঁকা দিতে তাঁরা কখনও পিছু.-পা হতেন না। খানেজমান ও তাঁর ভ্রাতার মাথায় স্বাধীন হওয়ার বাসনা চেপে বসল । সে কথা গোপন সূত্রে জানতে পারেন আকবর। ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে তিনি শিকারের অজুহাতে রওনা হন। খানেজমান ও তাঁর ভ্রাতা সে কথা জানতে পেরে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন এবং গঙ্গার তীরে কড়ায় (ইলাহবাদ জেলা) এসে তাঁকে নজরানা দেন। আকবর তা গ্রহণ করে আগস্ট শেষ হওয়ার আগেই আগরায় ফিরে আসেন।

ওই বছরেই নভেম্বর মাসে শামশুদ্দীন মুহম্মদ খান আতগা কাবুল থেকে আসেন। ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে আকবর আতগাকে রাজনীতিক, অর্থ ও সামরিক বিভাগের মন্ত্রী করেন। মাহম আতগা মনে করতেন তিনিই প্রধানমন্ত্রী, আতগাকে কেন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হল ।

 

আতগার এ-হেন উন্নতি মুনায়ম খারও ভালো লাগেনি, কিন্তু দ্রুত কিছু করে ওঠা কঠিন। এই সময় বিনা যুদ্ধবিগ্রহে চুনার (জেলা মির্জাপুর) দুর্গও আকবরের হাতে চলে আসে। আদহম খাঁ তখনও মালওয়ায় ছিলেন। আকবর তাকে সেখান থেকে সরিয়ে এনে মালাওয়ার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিলেন পীর মুহম্মদের হাতে।

বিজয়গড়ে সফল আক্রমণ পরিচালনা করেন। তিনি বুরহানপুরের লোকজনকে হয় তরোয়ালে মৃত্যুমুখে পাঠিয়ে দেন, না হয় বন্দী করে দাস করেন, নর্মদার দক্ষিণে বহু শহর ও গ্রাম জনশূন্য করে দেন। আদেশ ছিল না, তবুও তিনি বাজবাহাদুরের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং নর্মদা অতিক্রম করার সময় উটের সঙ্গে ঘোড়ার ধাক্কা লাগে এবং পীর মুহম্মদ পড়ে গিয়ে, বদায়ূনীর শব্দবন্ধে, “জলের সাহায্যে আগুনে (নরকে) পৌঁছে যান।” তাতে বাজবাহাদুর সুযোগ পেয়ে যান, তিনি ফিরে এসে পুনরায় মাণ্ডুর গদিতে বসে পড়েন।

(১) হিন্দু রাজকুমারী বিবাহ—একদিন রাত্রে আকবর শিকারের উদ্দেশ্যে আগরার নিকটে কোনো গ্রাম দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে কয়েকজন গায়ক আজমেরের খাজার গুণকীর্তন করে গান গাইছিল। সেই গান শুনে তাঁর মনে খাজার প্রতি ভক্তিভাব জাগে এবং ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কয়েকজন লোক সঙ্গে নিয়ে তিনি আজমেরের দিকে যাত্রা করেন। আগরা ও আজমেরের মধ্যপথে দেবসায় আমেরের (পরে জয়পুর) রাজা বিহারীমলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বিহারীমল তার জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহের প্রস্তাব দেন।

আজমেরে কিছুদিন অবস্থান করে প্রত্যাবর্তনের পথে সাঁভরে আকবর রাজকুমারীকে বিবাহ করেন। বিহারীমলের জ্যেষ্ঠপুত্র ভগবানদাসের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না, তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মানসিংহকে দত্তক নিয়েছিলেন।

বিবাহ সম্পর্কের ফলে রাজা ভগবানদাস ও কুমার মানসিংহ আকবরের কুটুম্ব হয়ে গেলেন । পরবর্তীকালে এই কছওয়াহা রাজকুমারীর নাম হয় ‘মরিয়ম জমানী’, যার গর্ভে জাহাঙ্গিরের জন্ম হয়। আকবরের নিজের মাতা হামিদা বানুকে বলা হতো ‘মরিয়ম মাকানী’ (প্রসাদের মরিয়ম)। কছওয়াহা রানীর কবর সিকান্দারায় আকবরের কবরের নিকটেই অবস্থিত, এ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে পরে তিনি আর হিন্দু ছিলেন না ।

এতদিন সাম্রাজ্যের স্তম্ভ বলে গণ্য করা হতো তুরানীকে, এবার থেকে রাজপুতও আর এক স্তম্ভ হল এবং তা তুরানীদের থেকে অধিকতর দৃঢ় প্রমাণিত হয়। চিতাবাঘ দিয়ে হরিণ শিকার আকবরের খুব পছন্দ ছিল। সিকান্দার শূরের বিরুদ্ধে জয়লাভের সময় কয়েকটা পোষা চিতাবাঘ তাঁর হাতে আসে।

আকবর যখন জানতে পারেন ওদের দিয়ে হরিণ শিকার করা যায়, তখন তাঁর এমন শখ বেড়ে যায় যে পোষা চিতাবাঘের সংখ্যা হাজারখানেকে দাঁড়ায়। সাঁভর থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় চিতাবাঘের দেখাশোনায় নিযুক্ত একজন শিকারী এক জোড়া জুতো চুরি করে। আকবর দণ্ডস্বরূপ তার পা কেটে ফেলার হুকুম দেন। পরবর্তী জীবনে তিনি কখনো এরূপ নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করতে পারতেন না, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ।

মালওয়া হাত থেকে চলে গিয়েছিল। ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুনরায় সেদিকে মনোযোগ দিলেন। আব্দুল্লা খাঁ উজবেককে প্রেরণ করলেন। তিনি বাজবাহাদুরকে বিতাড়িত করে পুনরায় মালওয়ায় মোগল পতাকা উড্ডীন করেন। বাজবাহাদুর বহু বছর বিভিন্ন রাজদরবারে ঘুরে বেড়ান।

অবশেষে পঞ্চদশ রাজ্য-বর্ষোৎসবে (১৫৭১ খ্রিঃ) তিনি আকবরের শরণাপন্ন হন। আকবর তাঁকে একহাজারী মনসবের সঙ্গে জায়গির দান করেন, পরে দোহাজারী করে দেন। উজ্জয়নে এখনও একটি সমাধি আছে, সেটাকে রূপমতা ও রাজবাহাদুরের কবর বলা হয়ে থাকে।

যুদ্ধবন্দাদের দাস করে বিক্রি করে দেওয়া প্রথা ছিল। আকবর ওই বছরে কঠোর নির্দেশ জারি করেন যাতে তা না করা হয়। ওই বছরেই এক ভীষণ যুদ্ধে মেড়তা (রাজপুতানা) দুর্গও বিজিত হয় । (২) আদহম খাঁর নিধন—১৫৬২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই মে দ্বিপ্রহরে আকবর প্রাসাদে

বিশ্রাম করছিলেন। শামশুদ্দীন মুহম্মদ আগাকে মন্ত্রী করার জন্য মাহম আনগা খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার অযোগ্য পুত্র আদহম খাঁ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। আনগার আত্মীয় ও হিতাকাঙক্ষীরা আশংকার মধ্যে ছিলেন যে কর্তৃত্ব তাঁর হাতে থাকবে না, সেজন্য কিছু করা দরকার।

মুনায়ম খা ও অমাত্যদের সঙ্গে শামশুদ্দীন দরবারে বসে কাজ করছিলেন। এমন সময় আদহম খা সেখানে এসে ধমক দিতে লাগলেন । শামশুদ্দীন সম্মান দেখানোর জন্য উঠে দাড়ালেন, কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য না করে কাটারি টেনে নিলেন। তাঁর ইশারায় তাঁর দু’জন সঙ্গী আতগার উপর হামলা করল এবং আতগা উঠোনে পড়ে গেলেন। শোরগোল আকবরের কামরাতে এসে পৌছল । আদহম খাঁ চেয়েছিলেন, সেই সময় আকবরকেও খতম করে দেবেন, কিন্তু শাহী নওকরেরা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

আকবর ব্যাপারটা জানতে পেরে তরোয়াল হাতে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। আদহম খানের উপর চোখ পড়তেই জিজ্ঞাসা করেন—“আতগাকে তুমি মারলে কেন?” আদহম খাঁ বাহানা করতে করতে আকবরের হাত ধরতে গেলেন। আকবর হাত টেনে নিতে চাইলেন তো আদহম বাদশাহের তরোয়াল ধরার চেষ্টা করতে লাগলেন। আকবর জোরে এক ঘুষি মারতেই আদহম বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। আকবর লোকজনকে হুকুম দিলেন—ওকে বেঁধে নিচে ফেলে দাও। তারা হুকুম মান্য করল, তবে দায়সারা গোছের, আন্তরিকভাবে নয়।

আদহম মরেননি। আকবর পুনরায় হুকুম করলেন। লোকেরা তাঁকে ধরে এনে আবার নিচে ছুঁড়ে দিলো। আদহমের ঘাড় ভেঙে গিয়েছিল, মাথার খুলি ফেটে রক্তাক্ত হয়েছিল। আদহমের কাজকর্মে যাঁদের সমর্থন ছিল, সেই মুনায়ম খাঁ ও তাঁর বন্ধু সাহাবুদ্দীন এবং অন্যান্য আমির প্রাণ বাঁচাবার জন্য ছুটে পালান ।

আকবর অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন। মাহম আনগা অসুস্থ হয়ে খাটিয়ায় শুয়ে ছিলেন। আকবর সংক্ষেপে সমস্ত ব্যাপারটা জানালেন, কিন্তু স্পষ্টভাবে বললেন না যে আদহমের মৃত্যু হয়েছে। আনগা কেবল জবাব দিলেন—’হুজুর ভালোই করেছেন।” মাহম আনগা এতই আঘাত পেয়েছিলেন যে চল্লিশ দিন পর তিনিও পুত্রের অনুগমন করেন। আকবর কুতুবমীনারের নিকটে মাতা ও পুত্রের জন্য এক সুন্দর সমাধি-সৌধ বানিয়ে দেন । আদহম খাঁ ও তাঁর মাতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আকবর সম্পূর্ণ স্বাধীন হন।

পলায়নকারী আদহমের সঙ্গীসাথীরা ধরা পড়লেন, কিন্তু আকবর তাঁদের প্রতি অত্যন্ত উদারতার পরিচয় দেন। মুনায়ম খাঁকে মন্ত্রী করা হয় ও খানখানা পদবি দেওয়া হয়। আতকার লোকজন আনগার বংশের লোকদের উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু আকবর তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিবৃত্ত করেন।

গণ্ডগোলের মধ্যে অর্থ ও ভূমি- রাজস্বের ব্যবস্থা খুব বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। চারদিকে ঘুষের বাজার গরম হয়ে ওঠে। আকবর শূর বাদশাহদের একজন উপযুক্ত হিজড়েকে ‘এতমাদ (বিশ্বাস) খা’ পদবি দিয়ে তার উপর এ কাজের ভার দেন, এবং সে খুব সাফল্যের সঙ্গে সমস্ত ঠিক করে

দেয় । এই বছরে (১৫৬২ খ্রিঃ) গওয়ালেরী তানসেন আকবরের দরবারে আসেন। সে- সময় তাঁর সঙ্গীতের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। আকবর চেয়েছিলেন বলে বঘেলা রাজা রামচন্দ্র তানসেনকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । সব রকমে স্বাধীন হয়ে আকবর কিন্তু গতানুগতিক জীবনযাপন করতে চাননি ।

১৫৬২ খ্রিস্টব্দের অক্টোবর কিংবা নভেম্বরে তিনি তাঁর মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে বলেছেন— “আমার বিংশতিতম বর্ষ পূর্ণ হওয়ার সময় আমি অন্তরে এক দারুণ তিক্ততা ।। মৃত্যুর আধ্যাত্মিক সম্বলের অভাবের জন্য আমার প্রাণ অত্যন্ত কাতর হয়ে করি অনুভব পড়েছিল।”

১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে আকবরের সৎ-মাতা মাহ চুচক বেগম (মিজা মুহম্মদ হাকিমের মাতা) মুনায়ম খাঁর পুত্র আকবরের সুবেদার গনী খাঁকে কাবুল থেকে বিতাড়িত করেন। মুনায়ম খাঁ সেনা নিয়ে যান, বেগম তাঁকেও পরাজিত করেন। ৯৭০ হিজরীর শেষে (আগস্ট, ১৫৬৩) মুনায়ম খাঁ দরবারে ফিরে এলে আকবর তাঁকে স্বাগত জানান।

ইতিমধ্যে শাহ আবুল ম-আলী মক্কা থেকে কাবুলে প্রত্যাবর্তন করে বেগমের কন্যাকে বিবাহ করেন। বেগম আশা করেছিলেন শাহ তাঁকে সাহায্য করবেন, কিন্তু আবুল ম- আলী স্বয়ং কাবুলের বাদশাহ হতে চেয়েছিলেন। তিনি ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে বেগমকে হত্যা করেন, তাতে মির্জা সুলেমান বদশায় এসে ম-আলীর ভবলীলা সাঙ্গ করে দেন। কিছু সময় কাবুল সুলেমানের হাতে ছিল ।

১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে আকবর মথুরার নিকটে মৃগয়া করতে গিয়ে সাতটি বাঘের মধ্যে পাঁচটি নিজে শিকার করেন। সেখানেই তিনি খবর পান, মথুরার হিন্দু যাত্রীদের উপর কর ধার্য করা হয়। আকবর বললেন, নিজের প্রভুর পুজোর জন্য সমবেত হওয়া লোকজনের উপর কর ধার্য করা ঈশ্বরের বিরুদ্ধতা করা। তিনি তখনই সমগ্র দেশে তীর্থকর বন্ধ করার হুকুম জারি করেন। এই কর থেকে সরকারের দশ লক্ষ টাকা বাৎসরিক আয় হতো। এই সময় আকবর প্রতিদিন ছত্রিশ মাইল পায়ে হেঁটে মথুরা থেকে আগরায় পৌঁছান। কয়েকজন তাঁর অনুকরণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু মাত্র তিন জনই তাতে সমর্থ হন ।

(৩) প্রাণঘাতী আক্রমণ— ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের গোড়ায় আক-বর দিল্লী যান। ১১ই জুলাই নিজামুদ্দীন আওলিয়ার সমাধি জিয়ারৎ করে প্রত্যাবর্তনের সময় মাহম আনগার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় মাদ্রাসার ছাদ থেকে ফওলাদ নামক জনৈক ক্রীতদাস তাঁর উপর তীর নিক্ষেপ করে।

কাঁধের অনেক গভীরে তীর প্রবেশ করেছিল, দ্রুত তা বের করে নেওয়া হয় এবং হাবশীকেও ধরে ফেলা হয়। জানা যায়, ফওলাদ হল শাহ আবুল ম-আলীর বন্ধু মিজা শরফুদ্দীন হুসেনের ক্রীতদাস। দিল্লীর কয়েকটি অভিজাত পরিবারের কিছু সুন্দরীকে আক-বর তাঁর অন্তঃপুরে পুরেছিলেন। মধ্য-এশিয়ায় যে সুন্দরীর উপর বাদশাহের নজর পড়ে, পতি তাকে দিয়ে বাদশাহের হাতে সমর্পণ করে দেয়। আক-বর একজন শেখকে তার যুবতী স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করেছিলেন ।

মর্যাদার প্রশ্ন ছিল, সেজন্য ফওলাদ বাদশাহকে তালাক তীর মারে। লোকে ফওলাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সমস্ত ব্যাপারটা জানতে চায় । আক-বর তাদের থামিয়ে বলেন— না জানি কত লোকের উপর ও মিথ্যা অভিযোগ জানাবে। ফওলাদের মৃত্যুদণ্ড হয়। আহত আক-বর ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে প্রাসাদে ফিরে আসেন এবং দশ দিন পরে ক্ষত আরোগ্য হলে আগরায় ফেরেন। একুশ বছর বয়সে এরূপ প্রাণঘাতী আক্রমণের পরেও নিজের বিবেকবোধ না হারানোর ঘটনা নির্দেশ করে, আক-বর অসামান্য পুরুষ ছিলেন।

(৪) জিজিয়া রদ—কছওয়াহা রাজকুমারীর সঙ্গে বিবাহ এবং রাজপুতদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আক-বরের উপর তো প্রভাব বিস্তার করেছিলই, সেই সঙ্গে বীরবলও তখন এসে গেছেন দরবারে। আগের বছর আক-বর তীর্থকর তুলে দিয়েছিলেন, এবার তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেন।

কেবল হিন্দুদের উপর জিজিয়া নামে যে-কর প্রযোজ্য ছিল, সারা রাজ্যে তিনি তা বন্ধ করে দিলেন। অ-মুসলিমদের উপর এই কর সর্বপ্রথম ধার্য করেন দ্বিতীয় খলীফা উমর। তাদের আর্থিক অবস্থা-ভেদে বাৎসরিক আটচল্লিশ, চব্বিশ অথবা বারো দিরহাম কর দিতে হতো। জিজিয়া কেবল সাবালক পুরুষদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, তাতে রাজ্যের মোটা রকমের আয় হতো, কিন্তু

১. জিয়াহ্—আরবি শব্দ। অর্থ—ব্যক্তির উপর এক প্রকার কর। মধ্যযুগে ইসলামিক রাষ্ট্রে এই কর অমুসলমানকে দিতে হতো, এর দ্বারা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে তারা অব্যাহতি পেত । মুসলমানকে দিতে হতো না, সেজন্য তারা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে রেহাইও পেত না ।

দিরহাম—দাম দিরহামের অপভ্রংশ। মূলতঃ শব্দটি গ্রীক মুদ্রা দ্রাখমা ছিল । দ্রাখমা ও দিরহাম হতো রৌপ্যমুদ্রা, সেখানে দাম তাম্রমুদ্রা, এক টাকা সমান চলিশ দাম ছিল। এক দামে ৩১৫ থেকে ৩২৫ গ্রামে পর্যন্ত তামা থাকত । আক-বরের আমলে জিজিয়া বাবদ কত দিরহাম করে নেওয়া হতো, তা জানা যায় না। মুহম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু বিজয়ের সময় হিন্দুদের উপর জিজিয়া বলবৎ করেছিলেন। ফিরোজশাহ তুগলক (১৩৫১- ৮৮ খ্রিঃ) ৪০, ৪২ ও ৯০ তঙ্কা জিজিয়া ধার্য করেন ।

ব্রাহ্মণদের জিজিয়া দিতে হতো না, তিনি তাদের উপরেও ১০ তঙ্কা ৫০ জীতল কর বসান। দিরহাম সে সময় রৌপ্য ও দীনার স্বর্ণ মুদ্রা ছিল । দিরহামে ৪৮ গ্রেন রূপো থাকত, টাকায় থাকত প্রায় ১৮০ গ্রেন। ২৫ জীতলে এক দাম ধরা হতো, অবশ্য জীতলের কোনো মুদ্রা ছিল না, কেবল হিসেবে সুবিধার্থেই তার চল ছিল। রূপোর জীতলকে বলা হতো কানী, তার ওজন ছিল পৌনে তিন গ্রেন। এক তঙ্কা সমান ছিল ৬৪ কানী, যেরূপ টাকায় ৬৪ তামার পয়সা। জানা যায়, আক-বরের আমলে রূপোর তঙ্কার বদলে রূপোর টাকায় জিজিয়া আদায় করা হতো, কেননা শেরশাহ প্রায় এখনকার ওজনেরই রৌপ্যমুদ্রা চালু করেন। —রাঃ সাঃ।

আক-বর তা ভ্রূক্ষেপ করেননি। তিনি ভেবে দেখেন, এই কর তুলে দেওয়ার ফলে তিনি তাঁর বহুসংখ্যক হিন্দু প্রজার হৃদয় জয় করতে পারবেন। ঔরঙ্গজেব এক শত পঞ্চান্ন বছর পর রাজা যশওয়ন্ত সিংহের মৃত্যুর পর ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের উপর পুনরায় জিজিয়া ধার্য করেন।

লোকে জানত, আবুল ফজলের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েই আক-বর এরকম উদার হয়েছিলেন, কিন্তু দরবারে আবুল ফজলের আগমনের দশ বছর পূর্বেই আক-বর তীর্থকর ও জিজিয়া বন্ধ করে দেন। বাইশ বছর বয়সেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে শাসনব্যবস্থায় হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ দূর করতে হবে।

 

আক-বরের মাতার সৎ-ভ্রাতা আক-বরের দরবারে একজন উচ্চপদস্থ আমির ছিলেন। তাঁর পুত্র খাজা মুঅজ্জম শৈশব থেকেই অত্যন্ত উদ্ধত ও নিষ্ঠুর স্বভাবের ছিল। সে কয়েকজন নিরপরাধকে হত্যা করে নিজের হাত রক্তাক্ত করেছিল। ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে হারেমের এক প্রভাবশালিনী মহিলা আক-বরকে জানান যে তার কন্যা খাজার স্ত্রী, তাকে সে গ্রামে নিয়ে গেছে হত্যা করতে। আক-বর কুড়ি জন লোক সঙ্গে নিয়ে শিকারে যাওয়ার অজুহাতে যমুনার তীরে গিয়ে পৌঁছান, কিন্তু ততক্ষণে খাজা তার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছিল।

যে খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিল, রক্ত-ঝরা কাটারিতে তাকেও আক্রমণ করা হয়। খাজাকে ধরে ফেলা হয়। চাকর-বাকরসহ খাজাকে যমুনার জলে ডুবিয়ে দেওয়ার হুকুম দেন আক-বর । কিন্তু সে মরেনি। তারপর গওয়ালিয়েরের দুর্গে তাকে কয়েদ করে রাখা হয়।

সেখানেই সে পাগল হয়ে মারা যায়। আক-বর তাঁর দুগ্ধ-মাতার সঙ্গে সম্পর্কের কথাও চিন্তাভাবনার মধ্যে রাখেননি, অত্যাচারী আদহমকে কঠোর দণ্ড দিয়েছিলেন। নিজের মামাতো ভাইকেও রেহাই দেননি। অন্তঃপুরের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে বাইশ বছর বয়স পূর্ণ হতে হতে আক-বর ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

Leave a Comment