আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বৈদেশিক নীতি । যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
বৈদেশিক নীতি

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঘোষণা করেছিলেন, “সকলের প্রতি বন্ধুত্ব সুলভ মনোভাব এবং কারো প্রতি বৈরীমনোভাব নয়”- এই মৌলিক আদর্শ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে উদ্বুদ্ধ করবে। এই আদর্শ অনুসরণ করেই তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব সমাজে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
তাঁর বিস্ময়কর সাফল্য বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। কিন্তু আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিরামহীনভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার চালিয়ে দেশের জনসাধারণের মনে দলের বৈদেশিক নীতি সম্বন্ধে অহেতুক ভীতি ও সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
আমি দেশবাসীকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারই স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে বিদেশী সেনাবাহিনী প্রত্যাহার নিশ্চিত করেছিলেন।
আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন বছরের শাসনকালেই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা হয়েছিল। জাতিসংঘের সদস্যপদসহ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, কমনওয়েলথ ও ইসলামী সম্মেলনের সদস্য পদ এই সময়েই অঙ্কিত হয়েছিল । এটি ঐতিহাসিক সত্য যে, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তি সংগ্রামের চেতনার ধারক ও বাহক।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যা করার পর থেকেই লক্ষ্যহীন ও দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার ফলে বিশ্বসমাজে বাংলাদেশের মর্যাদা নেই, ভাবমূর্তি মলিন। এদেশের জীবনমরণ সমস্য গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্নে বিএনপি সরকারের উদ্যোগহীন দেউলিয়া নীতির ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল এক গভীর সংকটের সম্মুখীন।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর প্রথম ভারত সফর শেষে এক যৌথ ইস্তাহারে স্বাক্ষর নে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছেন। এই যৌথ ইস্তাহারের ১১নং অনুচ্ছেদ দেশের জন্য এক মারাত্মক সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ফারাক্কা সমস্যা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতের সঙ্গে সমতা ও প্রতিবেশীসুলভ সৌহার্দের ভিত্তিতে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এই প্রশ্নে বিএনপি সরকারের স্থবির ও উদ্যোগহীন নীতি পরিহার করে গতিশীল ও সক্রিয় নীতি গ্রহণ করা হবে। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে জাতির জনক প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও মর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনায় মাধ্যমেই একটা ন্যায় সঙ্গত ফর্মুলা অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। ঐ সময়ে তিনি ভারতের নিকট থেকে ৪৪ হাজার কিউসেক পানি এনেছিলেন।
আওয়ামী লীগ আমালিক সহযোগিতাকে অর্থবহ করার জন্য সার্ক-এর কর্মসূচীকে প্রাণবন্ত ও বাস্তবসম্মত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সাপটা (SAPTA) চুক্তিকে আমরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও প্রবাহের সঙ্গে তাল রেখে সম্প্রসারিত করার নীতি গ্রহণ করবো।
এই প্রসঙ্গে আবার আমি উল্লেখ করতে চাই, বিশ্বরাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি নবায়নের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। ১৯৭২ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করার জন্য সমতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি অবশ্যই অত্যন্ত জরুরী ছিল। কিন্তু ২৫ বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতির পরিবর্তন বাস্তব সম্মতভাবে স্বীকার করেই আমরা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংবিধানে ২৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আদর্শ, যথা- জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এ সকল মৌলিক নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে একটা গতিশীল ও বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই হবে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য।
