আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃবিচ্ছিন্নতার জন্য যেসব ঘটনা দায়ী । যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
বিচ্ছিন্নতার জন্য যেসব ঘটনা দায়ী

বিচ্ছিন্নতার জন্য যেসব ঘটনা দায়ী।
পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানরা ছিল ভাগ্য ও অভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের বন্ধনে বাঁধা। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার দিকে তাকিয়ে পাকিস্তানকে একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করতেন।
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ই আগস্ট দেশ ভাগের সময় পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসরত অধিকাংশ হিন্দু ভারতে চলে যায়। এটা পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ঘট নি। ধনী ও ক্ষমতাবান হিন্দুরা এখানে থেকে যায়। মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু ভূস্বামী ও ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুগত।
হিন্দুদের মধ্যে শিক্ষার হার বেশি হওয়ায় স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন হিন্দু। এসব শিক্ষক ছাত্রদের শৈশবকালে তাদের চিন্তাধারা গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। পশ্চিম পাকিস্তানিদেরকে সাম্রাজ্যবাদী, উৎপীড়ক ও শোষক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এভাবে রোপণ করা হতো। অসন্তোষের বীজ।
ধর্ম ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আর কোনো বিষয়ে মিল ছিল। না । ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল একটি বাধ্য। এতে উভয় প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়। ভাষা ছিল আলাদা। রীতিনীতি এবং আচার-আচরণও আলাদা খাদ্যাভ্যাস ছিল ভিন্ন। পোশাক-পরিচ্ছদও এক রকম ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের সংস্কৃতির সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতির সংঘাত হতো। প্রত্যেকে বিশ্বাস করতো তাদের নিজেদের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সামাজিক প্রথা ও নিয়ম- কানুনে।
পশ্চিম পাকিস্তান ছিল ভূস্বামীদের দুর্গ। যারা পরিচিত ছিলেন খান, চৌধুরী,মীর ও ওয়াধেরা হিসেবে। তারা ছিলেন খুব ক্ষমতাবান এবং মহাজন। কৃষকরা ছিল তাদের প্রতি পুরোপুরি অনুগত। পক্ষান্তরে, পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে।
সাধারণ মানুষের ওপর বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও আইনজীবীদের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য সময়ের ব্যবধানে দুটি অংশের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। সবচেয়ে বিস্ফোরিত বিষয় ছিল ভাষা। বাঙালিরা উর্দু ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। ১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশে কায়েদে আযম উর্দুকে জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু বাঙালিরা ধারণা করে যে, তাদের ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
পূর্ব পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি জানায়। তারা ভাষার মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ইচ্ছা প্রকাশ করে। বাঙালিরা দেখতে পায় যে, রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হলে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় আরো পিছিয়ে পড়বে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ইতোমধ্যেই সশস্ত্র বাহিনী ও সিভিল সার্ভিসে এগিয়ে গিয়েছিল। এ কারণে বাঙালিরা তাদের দাবির প্রশ্নে অনড় ভূমিকা পালন করে।
তারা রাষ্ট্র ভাষা প্রশ্নে আন্দোলনে নামে। এভাবে কেন্দ্রের সাথে তাদের সংঘাত বেধে যায়। বাঙালিদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৫৪ সালে বাংলাকে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তখন এ ইস্যু নিষ্পত্তি হয়, কিন্তু থেকে যায় ক্ষত। এভাবে বইতে শুরু করে ঘটনার স্রোত
অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে যে, যদি জনসংখ্যানুপাতে কেন্দ্রীয় সরকারে বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্ব মেনে নেওয়া হয় তাহলে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়বে। তারা বাঙালি রাজনীতির ওপর হিন্দু প্রভাবে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। জনসংখ্যার ২০ শতাংশ যেখানে শিক্ষিত হিন্দু এবং সমাজজীবনের সকল স্তরে যেখানে তাদের প্রভাব সেখানে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে। তাদের রুখবে কে?
বাঙালিরা সরকার গঠন করলে সেখানে হিন্দু স্বার্থকেই প্রাধ্যান্য দেওয়া হবে। এ কারণে হিন্দু প্রভাব খর্ব করার জন্য প্যারিটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। প্যারিটি ব্যবস্থার আওতায় উভয় অংশের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। হিন্দু-প্রভাবিত বাঙালিদের নিষ্পেষণ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্বার্থ রক্ষায় এ ব্যবস্থা চালু করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানি গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী এবং বাঙালি খাজা নাজিমুদ্দীনকে বরখাস্ত করায় দেখা দেয় ব্যাপক গোলযোগ। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নেতৃত্ব আন্দোলন কে করেন। অধিকাংশ দল তাদের অসন্তোষ প্রকাশে একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠন করে। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনসহ ২০ দফা তৈরি করা হয়। কেবল প্রতিরক্ষা, অর্থ পররাষ্ট্র নীতি কেন্দ্রের হাতে রাখার কথা বলা হয়।
১৯৫৮ সালের অক্টোবরে ইচ্ছান্দার মির্জা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার- ইন-চিফ জেনারেল আইয়ুব খানকে সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। আইয়ুব খান নির্ধারণ করেন তার অগ্রাধিকার। তিনি মূল্যাবোধ ও আদর্শ সংরক্ষণের চেষ্টা করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে একটি জাতীয় পুনর্গঠন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেন ।
পাকিস্তানে যেসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল সেগুলো দূর করাই। ছিল তার প্রথম ও প্রধান কাজ। এ লক্ষ্য পূরণে চোরাচালান, মজুদদারী ও দুর্নীতি উচ্ছেদকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা ছিল তার দ্বিতীয় কাজ। শিল্পায়নে জেনারেল আইয়ুব খানের নিরলস প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়।
১৯৬৫ সালে যুদ্ধের পর জুলফিকার আলি ভুট্টো জাতীয় পরিষদে এক বিবৃতি দেন, যার ফলে হইচই পড়ে যায়। তিনি বলেন যে, ‘চীন পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা করেছে। এটা কোনো সাধারণ বিবৃতি নয়, এর ফল সুদূরপ্রসারী। বাঙালিদের চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন হলো। তাদের কাছে মনে হলো যে, যদি সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় পুরোটাই পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করে তাহলে সংযুক্ত পাকিস্তানের সাথে বসবাস করা তাদের কাছে অর্থহীন।
দ্রুত জোরদার হয়ে ওঠে তাদের এ মনোভাব। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের উদাসীনতায় পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। তারা বুঝতে পারেন নি পানি কোন দিকে যাচ্ছে। বাঙালিরা আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় সচেতন হয়ে ওঠে এবং তারা বুঝতে পারে যে, তাদেরকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ক্ষোভ অমূলক ছিল না।
ফলে ধূমায়িত হয়ে ওঠে অসন্তোষ। শেখ মুজিব তার লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা চালান। ১৯৬৬ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটিত হয়। শেখ মুজিব বেসামরিক আমলা ও সশস্ত্র বাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের যোগসাজশে পূর্ব পাকিস্তানে একটি অভ্যুত্থান ঘটাতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ভারতের আগরতলায় তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ জন্য এটাকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ (Agartala Conspiracy) বলা হয়। মুজিব এবং অন্যান্য খড়যন্ত্রকারীদের গ্রেফতার করা হয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মোটেও কোনো কল্প-কাহিনি ছিল না অথবা শেখ মুজিবকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোরও কোনো অভিপ্রায় ছিল না। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই ভারতীয় গোয়েন্দারা পূর্ব পাকিস্তানে তৎপরতা শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুরা তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করত।
এর সত্যতা মেলে অশোক রায়নার ইনসাইড ‘র’ (দ্য স্টোরি অব ইন্ডিয়ান’স সিক্রেট সার্ভিস, বিকাশ পাবলিশিং হাউজ, নিউ দিল্লি, ১৯৮১) নামক বইয়ে, যেখানে তিনি মুজিবের এবং ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো অপারেশন (আইআইবিও)-এর মধ্যে যেসব বৈঠক হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন ।
মি. রায়না বলেছেন যে, এম কে শংকর নায়ার মুজিবপন্থী গ্রুপের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। শংকর নায়ার পরে ‘র’-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড নিযুক্ত হয়েছিলেন। মুজিবপন্থী গ্রুপ ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এর অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ব্যর্থ চেষ্টা চালালে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের কাছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা ধরা পড়ে।
প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান গোল টেবিল বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে মুজিব ও ভুট্টোসহ সকল প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৯৬৯ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ও ১০ই মার্চ গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই এ বৈঠকের প্রতি জুলফিকার আলী ভুট্টো অনমনীয়তা দেখিয়ে আসছিলেন। তিনি শুধু বৈঠকে যোগদান থেকেই বিরত থাকেন নি, এ বৈঠকে অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্যও দিয়েছিলেন।
একইভাবে মুজিব ছিলেন তার ৬ দফার প্রশ্নে আপসহীন। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি কারো কথা শোনেন নি। জেনারেল আইয়ুব খান ৬ দফা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যে, ‘৬ দফার অর্থ হচ্ছে ফেডারেল ব্যবস্থার স্থলে কনফেডারেশন। ফলে পাকিস্তান ভেঙে যাবে। গোল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ হয়। মুজিবের দৃঢ় আচরণ, জুলফিকার আলী ভুট্টোর উদাসীনভাব ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অসহযোগিতাই হচ্ছে এ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ।
এ সময় জনগণ বিরোধিতা করতে থাকে সামরিক শাসনের। অসুস্থতার কারণে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানকে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয় এবং কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি গোল টেবিল বৈঠকের (আরটিসি) প্রস্তাব মেনে না নিতে মুজিব ও অন্যান্যদের উৎসাহিত করেন। মুজিবকে তিনি আশ্বাস দেন যে, সামরিক আইন জারি করা হবে না এবং সেনাবাহিনী জেনারেল আইয়ূব খানের
বিরুদ্ধে বিক্ষোভে বাধা দেবে না। তিনি তার কথা রক্ষা করেছিলেন জেনারেল আইয়ুব খানের স্থলাভিষিক্ত না হওয়া পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেন নি। ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ জেনারেল আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং
সংবিধান স্থগিত করে ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইয়াহিয় খান সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। ইয়াহিয়া, মুজিব ও ভুট্টে তিনজনই ছিলেন জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর।
এ দিকে মুজিব ছিলেন একজন দক্ষ রাজনীতিক ও বাগ্মী, তিনি জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারতেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন আধুনিক, তবে উদ্ধৃত। শালীন অথচ নিষ্ঠুর। জুলফিকার আলী ভুট্টো দরিদ্র লোকের ভাষায় কথা বলতে পারতেন। এ তিন ব্যক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে এক তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। প্রত্যেকেই ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং একে অপরকে হটাতে তৎপর।
ইয়াহিয়া খান নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেলেন। তিনি তার অনুগত জেনারেল, রাজনীতিক ও ব্যুরোক্রেটিক এলিটদের সাথে বৈঠক করেন এবং এমন সিদ্ধান্ত নেন যার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া হয়।
১৯৬৯ সালের ২৮শে নভেম্বর তিনি এক ইউনিট ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন এবং এক ব্যক্তির এক ভোট’ নীতি গ্রহণ করেন। আমরা এতো বছর ধরে যা রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম ইয়াহিয়া খান কলমের এক খোচায় তা বরবাদ করে দেন।
প্যারিটির মূলনীতিতে একটি ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটাকে সংবিধানের একটি অংশে পরিণত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যথাযথ সম্মতিতেই তা করা হয়।
ইয়াহিয়া খান কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতেও বাঙালিদের সমান প্রতিনিধিত্ব মঞ্জুর করেন। বাঙালিরা সন্তুষ্ট হয় নি। তারা তাদের জনসংখ্যার ভিত্তিতে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে সমান প্রতিনিধিত্ব দাবি করে। ইয়াহিয়া খান যতোই বাঙালিদের দিতেন তারা ততোই আরো চাইতো। ইয়াহিয়া খান স্বায়ত্তশাসন ছাড়া সব দাবি মেনে নেন । এটাকে মুজিব নির্বাচনে কাজে লাগালেন।
১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করার অনুমতি দেন। ১৯৭০ সালের শেষ নাগাদ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ৩০ মার্চ তিনি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) ঘোষণা করেন।
বিশাল নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হয়। মুজিব ও ভুট্টো দুজনে জনগণের মন জয় করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান। মুজিব হয়ে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানের নেতা এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো হন পশ্চিম পাকিস্তানের। মুজিবের শক্তি এবং ৬ দফার প্রতি তার জেদ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।
তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের প্রতি বিষোদগার এবং তাদের সমালোচনা করে ব্যাপক নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় সমস্যার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানকে দায়ী করেন তিনি।
ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় বন্যা। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোনে জনগণের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। গ্রামগুলো বিধ্বস্ত হয়। ফলে গৃহহীন হয়ে পড়ে লোকজন। ফলে বহু প্রাণহানি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানের হেলিকপ্টার ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। তিনি ত্রাণ তৎপরতা চালাতে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও জনশক্তি সরবরাহে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের কাছে আকুল আবেদন জানান।
দাঙ্গা, বিদ্রোহ অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে সহায়তা দান সেনাবাহিনীর একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। মুজিবের আহ্বান এবং আহসানের অনুরোধ সত্ত্বেও জেনারেল ইয়াকুব ত্রাণ তৎপরতায় সৈন্যদের অংশগ্রহণ করতে দেন নি।
যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো পরিস্থিতিতেই একজন সামরিক কমান্ডার প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে প্রয়োজনীয় সহায়তা দানে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। জেনারেল ইয়াকুব যে মুহূর্তে ছিলেন নিশ্চল এবং ইয়াহিয়া খান নিয়েছিলেন দীর্ঘসূত্রিতার আশ্রয়, ঠিক তখন ইসলামাবাদের অনুমতি ছাড়াই মার্কিন ও ব্রিটিশ ত্রাণ দল ত্রাণ তৎপরতা চালাতে পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছে যায়।
সহায়তা দানে সরকারের অক্ষমতায় বাঙালিরা ক্ষুব্ধ ও মুজিব ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘বৃটিশ সেনাদের আনা হয়েছে আমাদের কবর দিতে।’ দুর্গত মানবতার দুর্দশা লাঘবে ইয়াকুবের উদাসীনতা ও তার ব্যর্থতা উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আরো অনেক বাড়িয়ে তোলে।
আমি সাহেবজাদা জেনারেল ইয়াকুবকে চিনি ১৯৪৯ সাল থেকে। কোয়েটায় একসাথে স্টাফ কোর্স করেছি আমরা। তিনি চাপা স্বভাবের লোক ছিলেন। ক্লাশে ও মডেল ডিসকাশনে বরাবরই নীরব থাকতেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং যুদ্ধবন্দি হন। তার সাথে যারা বন্দি হন। তাদের সবাই শিবির থেকে পালিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি পালানোর কোনো চেষ্টা করেন নি স্টাফ কোর্সের সময়কালে তিনি দ্বি-জাতি তত্ত্বের ঘোর বিরোধিতা করতেন।
জয় করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান। মুজিব হয়ে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানের নেতা এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো হন পশ্চিম পাকিস্তানের। মুজিবের শক্তি এবং ৬ দফার প্রতি তার জেদ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের প্রতি বিষোদগার এবং তাদের সমালোচনা করে ব্যাপক নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় সমস্যার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানকে দায়ী করেন তিনি।
দ্বি-জাতি তত্ত্বকে তিনি একটি রাজনৈতিক ভ্রান্তি হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন একটি সাঁজোয়া ডিভিশনের কমান্ডার। তবে তার কমান্ডের এ সাজোয়া ডিভিশন কোনো লড়াইয়ে অংশ নেয় নি। এসব ঘটনা সত্ত্বেও তিনি তর তর করে ওপরে উঠেছেন। কথা-বার্তা ও ইংরেজিতে বাকপটু হওয়ায় তিনি পদোন্নতি পেতেন।
১৯৬৯ সালে জেনারেল ইয়াকুবকে ইন্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার নিযুক্ত করা হলো। তিনি যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী তার কমান্ডের আওতাধীন সৈন্যদের সংগঠিত ও পুনর্গঠিত করেন। আর্মি ওয়ার প্ল্যানের মূলকথা ছিল, ‘পূর্ব রণাঙ্গনের যুদ্ধ করা হবে পশ্চিম রণাঙ্গনে’।
তিনি ছিলেন নিরাপত্তা পরিকল্পনার লেখক, যার লক্ষ্য ছিল বাঙালিদের উত্থানকে দমন করা। সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তিনি মুজিবের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং নুরুল আমিন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথেও যোগাযোগ রাখতেন।
ইতোমধ্যে রাজনীতির আকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেখা দেয়। দুটি পার্টি আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) নির্বাচনি ফ্রন্টে প্রভাব বিস্তার করে। এ দুটি দলের প্রতিটিই নিজ নিজ এলাকায় কেন্দ্রীভূত ছিল। অন্যান্য প্রদেশে এদের কোনো প্রভাব ছিল না।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুজিবের প্রতি জেনারেল ইয়াকুব খানের ঝুঁকে পড়াটা ছিল সন্দেহজনক। তিনি নেলসনের চোখ আওয়ামী লীগের চাপের দিকে ফিরিয়ে নেন। তিনি পরাজিত হন তার ইচ্ছাশক্তির ঘাটতির কারণে এবং মুজিবের কৌশলের কাছে।
নির্বাচনে মুজিব বিস্ময়কর বিজয় লাভ করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়ী হন। অন্যদিকে, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপল্স পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসন লাভ করে।
ফজলুল কাদের চৌধুরী, মৌলভী ফরিদ আহমেদ এবং আরো কয়েকজন পাকিস্তানপন্থী নেতা আমাকে জানিয়েছিলেন যে, সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুব খান সততা ও নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করলে এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতারণা করার সুযোগ না দিলে অন্যান্য দল শহরগুলোতে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৬৫টি আসন পেত। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা জরিপ চালিয়েছিল।
কিন্তু নির্বাচনি ফলাফলের সাথে জরিপ রিপোর্টের বিশাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, কোনো দলই নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম হবে না। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ইয়াহিয়া খান সরকারকে গডফাদারের ভূমিকা পালনে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।
নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি বিপজ্জনক আকার ধারণ করে। উভয় অংশে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও মুজিবের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই তীব্রতর হয়। জটিল পরিস্থিতি আরো জটিলতর হয়ে ওঠে। উভয় অংশের নেতৃবৃন্দ এগোতে থাকেন সংঘাতে পথে। উবে যায় আপোস করার ইচ্ছা এবং রাজনৈতিক নীতিবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার মানসিকতা।
বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসারই ইচ্ছে জুলফিকার আলী ভুট্টোর ছিল না। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক সংবিধান তৈরির প্রস্তাব দেন। তিনি এমন এক নেতার মতো আচরণ করতে থাকেন যেন তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে মুজিব নির্বাচনে বিজয়ের পর আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
তিনি ৬ দফা প্রশ্নে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেন । জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবের বিজয় মেনে নিতে ব্যর্থ হন। তিনি ঘোষণা করেন যে, পাঞ্জাব ও সিন্ধু হচ্ছে পাকিস্তানের ক্ষমতার দুর্গ । সুতরাং সংবিধান প্রণয়ন এবং কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে তার দলের সহযোগিতা একান্ত অপরিহার্য।
এভাবে বিপরীত দিকে চলতে থাকে জাতির ভাগ্যের চাকা। জেনারেল ইয়াহিয়া খান মুজিবকে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ঘোষণা করে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। মুজিব ফাঁকা বুলিতে বিমোহিত হন নি। ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল থাকতে চাইলেন, কিন্তু মুজিব ইয়াহিয়া খানকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না।
মুজিবের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাহুতে আশ্রয় নেন। তিনি ও তার অনুচরেরা হাঁস শিকারের নামে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নিজ জেলা লারকানায় যান। সেখানেই নীলনকশা ‘লারকানা ষড়যন্ত্র’ প্রণয়ন করা হয় ।
এর মধ্যে ভারত মুজিবকে সহায়তা দিয়েই থেমে থাকে নি, পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যও সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটায়। এটা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য মুজিবের প্রতি একটি স্পষ্ট সংকেত।
১৯৭১ সালের ৩০শে জানুয়ারি একটি ভারতীয় বিমান ছিনতাই করে লাহোরে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পুরো ঘটনা না জেনে দুজন কাশ্মিরী ছিনতাইকারীকে স্বাগত জানাই। কাশ্মিরী ছিনতাইকারীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়।
এভাবে পাকিস্তান একটি ফাঁদে পা দেয়। ভারত বিমান ছিনতাই ঘটনার অজুহাতে তার ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করে।
ক্রমে আবেগ প্রশমিত হয়ে আসে এবং একটি তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্তে দেখা যায় যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ভারত পরিকল্পিতভাবে এ বিমান ছিনতাই নাটকের অবতারণা করে।
১৯৭১ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো ইয়াহিয়ার সাথে দেখা করেন। পরদিন পিপিপি কর্মীরা লাহোরে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালায় এবং দলের পতাকায় অগ্নিসংযোগ করে। এরপর ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন যে, ৩রা মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে।
জুলফিকার আলী ভুট্টো এ ঘোষণা গ্রহণ করতে পারেন নি। তিনি বলেন, ‘আর্মিরা কেবল। একটি দলের তৈরি করা সংবিধান অনুমোদন করতে এবং লজ্জা ফিরিয়ে আনতে ওখানে যেতে পারে না।’ ১৫ই ফেব্রুয়ারি তিনি লাহোরে তার দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বলেন যে, সরকার মুজিবকে সমর্থন দিলে তিনি প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু করবেন। তিনি আরো বলেন, ‘হয় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন হতে দিতে হবে নয়তো মুজিবকে গ্রেফতার করে বিচার করতে হবে।’
১৯৭১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ইসলামাবাদে প্রাদেশিক গভর্নরদের সাথে এক বৈঠকে বসেন। ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার ও সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুবও এ বৈঠকে যোগ দেন। এ বৈঠকেই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।
মুজিব ৬ দফা প্রশ্নে তার অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হলে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেনারেল ইয়াকুবকে তার বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। বৈঠকের পর জেনারেল ইয়াকুব জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে জেনারেল হামিদের সাথে অতিরিক্ত ব্রিগেড সরবরাহের প্রস্তাব দেন। তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন যে, যে-কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় পূর্ব পাকিস্তানেই পর্যাপ্ত সৈন্য রয়েছে।
যখন তিনি ঢাকা পৌছালেন তখন নিজের মনোভাব পরিবর্তন করেন তিনি। এবং প্রতিশ্রুত ব্রিগেড পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। যখন ব্রিগেডের দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য ঢাকা এসে পৌঁছালো, তিনি আবার টেলিফোন করেন জেনারেল হামিদের কাছে এবং তাকে জানান যে, সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করায় মুজিব বিরক্ত হয়েছেন এবং তিনি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য প্রেরণ বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেনারেল হামিদ ছিলেন একবারে শান্ত ও ঠাণ্ডা মেজাজের লোক। কিন্তু তিনি মেজাজ হারালেন ও জেনারেল ইয়াকুবকে বললেন শক্ত হতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃতীয় ব্যাটালিয়নকে ঢাকা পাঠানো হলো । আওয়ামী লীগ এসব ঘটনায় এতো আতঙ্কিত হয়ে পড়লো যে, তারা ৬ দফা প্রশ্নে নমনীয় হতে সম্মত হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গভর্নর আহসান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের সিদ্ধান্ত মুজিবকে অবহিত করেন।
২৮শে ফেব্রুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো বরাবরের মতো হুমকি দেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হলে তিনি আন্দোলন শুরু করবেন। তিনি সতর্ক করে দেন যে, তার দলের কোনো সদস্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিলে তাকে হত্যা করা হবে। তিনি আরো বলেন, “হয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বিলম্বিত করতে হবে, নয়তো সংবিধান প্রণয়নে ১২০ দিনের সময়সীমা প্রত্যাহার করতে হবে।
এটা ছিল একটা ফাঁকা হুমকি। কারণ, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ যে-কোনো সময় সংবিধান প্রণয়ন করে নিতে পারত। ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। অধিবেশন স্থগিতের কারণ হিসেবে পিপিপি’র জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বর্জন এবং ভারতের সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।
১১, ১৯ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে ইয়াহিয়ার রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার চক্রান্তের একটি অংশ।
এ সময় বেসামরিক মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত করা হলো। অ্যাডমিরাল আহসানকে অপসারণ করা হলো গভর্নরের পদ থেকে। সাহেবজাদা জেনারেল ইয়াকুব পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যেসব জেনারেল গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই সৈন্যদের কমান্ড থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন একমাত্র জেনারেল ইয়াকুব।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে মুজিব ২রা মার্চ সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন। তৎক্ষণাৎ আওয়ামী লীগ কর্মীরা ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর করে এবং বহু দোকানপাট লুট করে। এ বিশৃঙ্খলার সময় সশস্ত্র ভারতীয়রা পূর্ব পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ করে।
অবাঙালিদের ওপর হামলা এবং তাদের হত্যা করা হয়। সেনা ইউনিটও আক্রান্ত হয়। ইয়াহিয়া খান নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন । তিনি ১০ই মার্চ গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন নি যে, আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে।
৪ঠা মার্চ ১৯৭১ মুজিব অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। আওয়ামী লীগ আবার উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সেনা কমান্ডার জেনারেল ইয়াকুব ছিলেন পুরোপুরি নীরব, ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার জন্যই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এ জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খান সমানভাবে দায়ী ছিলেন। তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রকৃত বাধা হয়ে দাঁড়ান ।
ইয়াকুবের নিষ্ক্রিয়তায় বাঙালিরা হত্যাকাণ্ড এবং অন্যান্য জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়। জেনারেল ইয়াকুব অঙ্কুরেই এ বিদ্রোহ নির্মূল করতে পারতেন। তখনো বিদ্রোহ ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে। বাঙালি সৈন্যরা তখনো বিদ্রোহ করেন। নি।
এ বিদ্রোহ ছিল খুবই সাধারণ মানুষের। শক্তি ও কৌশলের বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয় ঘটিয়ে জেনারেল ইয়াকুব নিরস্ত্র জনতার আন্দোলন পুরোপুরি নৈরাজ্যের দিকে এগিয়ে যাবার আগেই থামিয়ে দিতে পারতেন। সে ক্ষেত্রে মুজিব নমনীয় হতে বাধ্য হতেন।
মুজিব মার্চের শুরুতে সামরিক আইনকে অগ্রাহ্য করে একটি সমান্তরাল সরকার গঠনে তার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এক পক্ষকালের মধ্যে মুজিবের আওয়ামী লীগ এমন নৃশংস ঘটনা ঘটায় যা বর্ণনার অতীত। বগুড়ায় ১৫ হাজার লোককে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়।
চট্টগ্রামে হাজার হাজার নর-নারীকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় এবং ধর্ষণ করা হয়। সিরাজগঞ্জে একদল নারী ও শিশুকে একটি ঘরে তালা দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। এসব হামলার লক্ষবস্তু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি ও বিহারীরা।
পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এ কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদেরও হত্যা করা হয়, ধর্ষণ করা হয় তাদের স্ত্রীদের এবং উলঙ্গ হয়ে বাঙালি অফিসারদের খাদ্য পরিবেশনে বাধ্য করা হয়। অথচ দোষ দেওয়া হচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ ছিল একটি অপপ্রচার। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ণ করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এ অপপ্রচার চালানো হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব অ্যাডমিরাল এসএম আহসানের স্থলাভিষিক্ত হন ১৯৭১ সালের ১ মার্চ। চার দিনের মাথায় জেনারেল ইয়াকুব গভর্নর ও ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার পদে ইস্তফা দেন এবং বলেন যে, ‘তিনি তার পাকিস্তানি ভাইদের হত্যা করতে পারবেন না।
ইয়াকুবের এ উক্তিতে বাঙালিরা উল্লসিত হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানিরা হয় ভীত। জেনারেল ইয়াকুব বাঙালিদের ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠতে দেখেছেন। কিন্তু তিনি কিছুই করেন নি। তার সিদ্ধান্তহীনতায় আওয়ামী লীগের সাহস আরো বেড়ে যায়। তারা নৈরাজ্যের পথে ধাবিত হতে থাকে। ইয়াকুবের সমালোচনা শুধু আমিই নই, অন্যান্যরাও করেছেন। তার আচরণ জেনারেল শের আলীর
বইয়ে ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি জানি নীতিগতভাবে জেনারেল ইয়াকুব সামরিক অভিযানে অসম্মত ছিলেন না। সত্যি এক পর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান আমাকে এ ব্যাপারে তার সাথে আলোচনা করার নির্দেশ দেন।
জেনারেল শের আলী আরো লিখেছেন, ‘এটা বলতে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ডার সংকটের সময় তার সৈন্যদের পাশে না দাঁড়িয়ে তিনি তাদের ত্যাগ করেন এবং পদত্যাগ করে চলে আসেন।’ তিনি আরো লিখেছেন, “পদত্যাগের কারণ দেখানো হয়েছে বিবেকের তাড়না।
তিনি বলেছেন, তিনি তার পাকিস্তানি ভাইদের হত্যা করার নির্দেশ পালন করতে পারেন নি। এখানে এ বিষয়টি বিচার করতে হবে যে, তিনি শুরু থেকেই নীতিগতভাবে সৈন্য ব্যবহারের বিপক্ষে ছিলেন, নাকি কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে চলে আসতেন। বিবেকের তাড়নার অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতো যদি তিনি আরো আগে পদত্যাগ করে চলে আসতেন ।
পদত্যাগ করার পর করাচি যান জেনারেল ইয়াকুব। সেখানে তাকে স্টেশন হেডকোয়ার্টার্সে যুক্ত করা হয়। মেজর জেনারেল পদে পদাবনতি ঘটিয়ে তাকে পাঠানো হয় পেনশনে। তার অপরাধের গুরুত্ব অনুধাবন করে ইয়াহিয়া খান তাকে কোর্ট মার্শাল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টিতে রাজনেতিক রঙ চড়ানো হতে পারে বলে তাকে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়।
জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে জেনারেল ইয়াকুব দেখতে পেয়েছিলেন তার অভিভাবকের প্রতিচ্ছবি। জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতায় এসে ইয়াকুবের লেফটেন্যান্ট জেনারেল র্যাঙ্কই কেবল ফিরিয়ে দেন নি, তাকে তিনি প্রথমে ফ্রান্স ও পরে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতও নিয়োগ করেছিলেন।
সক্রিয় সার্ভিসে থাকাকালে জাতীয় অঙ্গীকার পালনে অসৈনিকসুলভ আচরণ করায় জেনারেল ইয়াকুব তলিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে কলমের এক খোঁচায় সেখান থেকে উদ্ধার করেন। নিয়তি যদি কখনো কারো ওপর সদয় হয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে যে, জেনারেল ইয়াকুব হচ্ছেন ভাগ্যের সেই বরপুত্রদের একজন ।
জেনারেল ইয়াকুব পদত্যাগ করার কারণ হিসেবে তার বিবেকের কথা বলেছেন। যখন হাজার হাজার মানুষ মারা গেল বন্যায়, চারদিকে ছিল। আহাজারি। যখন বিহারি, পশ্চিম পাকিস্তানি ও ইপিআরে কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছিল তখন তিনি ছিলেন নীরব দর্শক।
অফিসারদের স্ত্রীদের সম্মান যখন ভুলুণ্ঠিত হচ্ছিল তখন তার বিবেক ছিল মৃত। টিক্কা তিন ডিভিশন সৈন্যের সাহায্যে বেলুচিস্তানে তথাকথিত বিদ্রোহ দমন করেন, জেনারেল ইয়াকুব খান এ ঘটনার সামান্যতম প্রতিবাদও করেন নি তখন। পূর্ব পাকিস্তানে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডারের পদ থেকে তিনি যে বিবেকের
তাড়নায় পদত্যাগ করেছেন একইভাবে বিবেকের তাড়নায় বেলুচিস্তানের ঘটনার প্রতিবাদেও তার রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তার চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আসে। বিপদমুক্ত দূরত্ব বজায় রেখে চলতে শুরু করেন। তার ত্রাণকর্তা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যখন ফাঁসিতে ঝুলানো হয় তখনো তিনি মুখ খোলেন নি।
উপরন্ত, তিনি জিয়াউল হকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। জিয়াউলের মৃত্যুর পর তিনি পিপিপি সরকারে যোগ দেন এবং বেনজীরকে অপসারণ করা হলে তিনি নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী হন। তার মতো এমন অসৎ চরিত্রের লোক আর কখনো এতো ওপরে উঠতে পারেন নি। একজন জেনারেল বিবেকের দোহাই দিয়ে তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। সময়ের পরিবর্তনে বিবেকও পরিবর্তিত হয় যেমনটি ঘটেছে এই জেনারেল ইয়াকুবের ক্ষেত্রে।
সশস্ত্র বাহিনীর ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। আওয়ামী লীগ তাদের পরিকল্পনা কার্যকর করা শুরু করে যা ছিল নিম্নরূপ :
- সশস্ত্র বাহিনীর কাছে সব ধরনের সমর্থন প্রত্যাখ্যান করা;
- সব ধরনের সেনা চলাচল ব্যাহত করা;
- সব ক্যান্টনমেন্টে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত করা;
- সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত সব বেসামরিক কর্মচারীদের কাজ বন্ধ করা; মুজিব ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তান শেষ হয়ে গেছে। আপসের আর কোনো আশা নেই । আমি তাদের ভেঙে দেবো এবং বাধ্য করবো নতজানু হতে।’ এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। মুজিব কার্যত শাসক হয়ে যান এবং তার বাসভবন প্রেসিডেন্সিতে পরিণত হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ অমান্য করা হয়।
জেনারেল টিক্কা খান ইয়াকুবের স্থলাভিষিক্ত হন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। টিক্কা বিমানযোগে ঢাকা পৌছান এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার, সামরিক আইন প্রশাসক ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাকে স্বাগত জানানো হয় নি। বিমান বন্দরে তাকে জুতার মালা উপহার দেওয়া হয়।
প্রধান বিচারপতি গভর্নর হিসেবে তাকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানান। টিক্কা ছিলেন সোজা-সাপ্টা, কঠোর পরিশ্রমী ও বিনীত স্বভাবের লোক। তবে ইয়াকুবের মতো তিনি মার্জিত ছিলেন না । বস্তুত, অন্যান্যদের আত্মবিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ করার কোনো গুণ তার ছিল না। তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞার অভাব ছিল। তা সত্ত্বেও তাকে ঘিরে বীরত্বের সৌধ গড়ে ওঠে ।
ইস্টার্ন কমান্ডের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর জেনারেল টিক্কা শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেন। যদিও মুজিব ইয়াকুবের সাথে দেখা করেছিলেন কিন্তু টিক্কার সাথে দেখা করতে অস্বীকার করেন। জেনারেল টিক্কা তার অধীনস্থ সেনাদের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশকে নিরস্ত্র এবং চট্টগ্রাম নৌঘাঁটি ও লালমনিরহাট ও ঈশ্বরদীসহ সকল বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার নির্দেশ দেন।
টিক্কাকে সশস্ত্র বাঙালিদের নিরস্ত্র করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল । তিনি সেই নির্দেশ পালনও করেছিলেন। কিন্তু এ নির্দেশ পালন করতে গিয়ে তিনি ক্যান্টনমেন্টের নিরাপত্তার কথা ভুলে যান। এটাই ছিল পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুতর ভুল । এ ভুলের পরিণামে আমরা শুধু প্রাথমিক উদ্যোগেই হেরে যাই নি; কয়েকটি গ্যারিসন শহর ছাড়া গোটা প্রদেশ আমাদের একেবারে হাতছাড়া হয়ে যায়।
জেনারেল টিক্কার আরেকটি ভুল পদক্ষেপ ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে সব বিদেশি সাংবাদিক, প্রতিনিধি ও টিভি ক্রুদের অত্যন্ত অপমানজনকভাবে বের করে দেওয়া। এদের কাউকে কাউকে লাঞ্ছিত করা হয়, তাদের লাগেজ পরীক্ষা করা হয় এবং ক্যামেরা থেকে ফিল্ম খুলে নেওয়া হয়। এসব সাংবাদিক পরে ভারতে চলে যায়। এ জন্য বিদেশি সংবাদ মাধ্যম আমাদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে।
তারা পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনায় রঙ চড়াতে থাকে। ভারতীয় এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীরাই ছিল বিদেশি সাংবাদিকদের খবরের উৎস। বিদেশি সাংবাদিকরা অতিরঞ্জিত ও বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করায় পাকিস্তান ও পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরাট ক্ষতি হয়। আমাদের সরকার এ নিয়ে মাথা ঘামায় নি। ফলে আমাদের নিজেদের লোকজন বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট বিশ্বাস করতে শুরু করে।
১৪ই মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো দুজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের একটি প্রস্তাব দেন, তিনি নিজে হবেন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং মুজিব হবেন পূর্ব পাকিস্তানের। তিনি ‘ওধার তুম ইধার হাম’ বলতে দুটি পাকিস্তানকেই বুঝিয়েছেন।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে যান ১৫ই মার্চ । জুলফিকার আলী ভুট্টোও সেখানে যান। তিনজনের মধ্যে আলোচনা চলছিল, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না। কারণ, আওয়ামী লীগ এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যেখান থেকে তার ফেরার পথ ছিল না। মুজিব জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরামর্শ অনুযায়ী ২২শে মার্চ দুটি প্রদেশের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান।
২৩শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে পালন করা হয় ‘প্রতিরোধ দিবস’। মুজিবের বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশন ও সোভিয়েত কনস্যুলেটেও বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। মুজিব কর্নেল ওসমানীকে সার্বিক অপারেশনের কমান্ডার নিযুক্ত করেন।
মেজর জেনারেল (অব) মাজেদের তত্ত্বাবধানে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের তালিকাভুক্ত করা হয়। ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আসতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ ও পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহীরা পুরোপুরি অস্ত্রসজ্জিত হয়। হাজার হাজার ভারতীয় সৈন্য সাদা পোশাকে অনুপ্রবেশ করে। ভারতের সক্রিয় সহযোগিতায় সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।
২৫শে মার্চ সামরিক অভিযান চালানোর জন্য জেনারেল টিক্কা খানের হাতে ছিল শুধু মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার নেতৃত্বাধীন ১৪তম পদাতিক ডিভিশন। এ ডিভিশনের ৪টি ব্রিগেড পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট ও ক্যাম্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানে একটি ডিভিশন গঠিত হতো ১২টি পদাতিক ব্যাটালিয়ন ও একটি মিশ্র কমান্ডো ব্যাটালিয়ন নিয়ে। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানে ৭টি পদাতিক ব্যাটালিয়ন ও একটি মিশ্র কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে। এসব ব্যাটালিয়নের অফিসাররা ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের।
টিক্কা খানের কাছে একটি পদাতিক ডিভিশন ছাড়া আরো ছিল একটি হালকা ট্যাংক রেজিমেন্ট, ৫টি ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট, ১ রেজিমেন্ট হালকা বিমান-বিধ্বংসী আর্টিলারি এবং দুটি মর্টার ব্যাটারি। এসব ইউনিটে সেনা ছিল। মিশ্র।
ইপিআরের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার। এর প্রায় সব সদস্যই ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানি। তবে সেখানে কিছু কিছু পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারও কর্মরত ছিলেন। নৌ ও বিমান বাহিনীও ছিল। এদেরকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থল বাহিনীর। সহায়তায় ব্যবহার করা যেত।
এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, তখনো বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করে নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেনারেল টিক্কার পর্যাপ্ত শক্তি ছিল । প্রয়োজন ছিল যথার্থ পরিকল্পনা, বুদ্ধিমত্তার সাথে অভিযান পরিকল্পনা ও ধৈর্যের। কারণ, টিক্কা কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনী নয়, একটি বিদ্রোহী সশস্ত্র বেসামরিক শক্তিকে মোকাবিলা করছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে ও ২৬শে মার্চের মধ্যরাতে জেনারেল টিক্কা আঘাত হানেন। একটি শান্তিপূর্ণ রাত পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে, চারদিকে আর্তনাদ ও অগ্নিসংযোগ। জেনারেল টিক্কা তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যেন তিনি
তার নিজের বিপথগামী লোকের সাথে নয়, একটি শত্রুর সাথে লড়াই করছেন। ২৫শে মার্চের সেই সামরিক অভিযানের হিংস্রতা ও নৃশংসতা বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে যায়।
সশস্ত্র বাঙালি ইউনিট ও ব্যক্তিবর্গকে নিরস্ত্র এবং বাঙালি নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করার জন্য টিক্কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি এ দায়িত্ব পালন করার পরিবর্তে বেসামরিক লোকজনকে হত্যা এবং পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করেন। তিনি তার সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমি মাটি চাই, মানুষ নয়।’ মেজর জেনারেল রাও ফরমান ও ব্রিগেডিয়ার (পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) জাহানজেব আরবার ঢাকায় তার এ নির্দেশ পালন করেন।
মেজর জেনারেল রাও ফরমান তার টেবিল ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামল মাটি লাল করে দেওয়া হবে।’ বাঙালির রক্ত দিয়ে মাটি লাল করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বাঙালিরা গভর্নর হাউস অবরোধ করার পর তারা ফরমানের এ ডায়েরি খুঁজে পায়।
বাংলাদেশ সফরকালে মুজিব জুলফিকার আলী ভুট্টোকে এ ডায়েরি দেখিয়েছিলেন। আমার সাথে সাক্ষাৎকালে জুলফিকার আলী ভুট্টো এ ডায়েরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাকে আমি জানিয়েছিলাম যে, ভারতে থাকাকালে আমি এ বিষয়টি শুনেছি। তবে আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। কারণ, পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক বিষয়ে আমার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না।
জেনারেল টিক্কা তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন থেকে সরে যাওয়া প্রায় সকল বাঙালি সশস্ত্র ব্যক্তি ও ইউনিট তাদের অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজ- সরঞ্জাম ও পরিবহন নিয়ে পালিয়ে যায় এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে। তাদের সাথে শিগগির ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা ও ভারতীয়রা যোগ দেয়। মুজিব ছাড়া সকল নেতৃবৃন্দ পালিয়ে যায় এবং কলকাতায় ‘প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার’ গঠন করে।
১৯৭১ সালে ২৫শে ও ২৬শে মার্চের মাঝরাতে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের আগে তিনি টিক্কাকে বলেছিলেন, ‘তাদেরকে খুঁজে বের করো।’ টিক্কার নিষ্ঠুরতা দেখার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় থেকে গেলেন।
জুলফিকার আলী ভুট্টো দেখতে পেলেন ঢাকা জ্বলছে। তিনি জনগণের আর্তচিৎকার, ট্যাংকের ঘড় ঘড় শব্দ, রকেট ও গোলাগুলির বিস্ফোরণ এবং মেশিনগানের ঠা-ঠা-ঠা আওয়াজ শুনতে পেলেন। সকালে জুলফিকার আলী ভুট্টো, টিক্কা, ফরমান ও আরবাবকে পিঠ চাপড়িয়ে অভিনন্দন জানান। তিনি তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশ্বাস দেন।
জুলফিকার আলী ভুট্টো তার কথা রেখেছিলেন। টিক্কা খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছিলেন। রাও ফরমান ফৌজি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং ব্রিগেডিয়ার আরবাব প্রথমে মেজর জেনারেল ও পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন। ২৬শে মার্চ করাচি পৌঁছে জুলফিকার আলী ভুট্টো তৃপ্তির সাথে ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহর রহমতে পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে।’
রক্তপাত ছাড়াই টিক্কা তার মিশন সম্পন্ন করতে পারতেন । রাজনীতিবিদদের হেফাজতে নেওয়া অথবা বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের তাদের বাড়িঘর ও মেস থেকে গ্রেফতার করা কঠিন ছিল না। ইউনিটের অস্ত্রাগারগুলো সময়মতো অবরোধ ও দখল করে নিলে, রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড ও সেতুগুলোতে প্রহরা বসালে এবং ট্রাক, বাস ও ফেরিগুলো বন্ধ রাখলে সশস্ত্র ব্যক্তিদের অধিকাংশ ও রাজনীতিবিদদের গ্রেফতার করা যেত। টিক্কা এ ধরনের ব্যবস্থা নিলে যেসব সশস্ত্র ব্যক্তি পালিয়ে যায়, তাদেরকে ভারী অস্ত্র ও পরিবহন ছাড়াই পালাতে হতো; সে ক্ষেত্রে তাদের সংগঠিত হতে যথেষ্ট সময় লাগতো ।

একইভাবে, বিদ্রোহীদের তথাকথিত শক্ত ঘাঁটিতে জেনারেল টিক্কার ক্ষিপ্র ও তীব্র হামলা চালানোর প্রয়োজন ছিল না। এগুলো খুব সহজেই অবরোধ করা যেত এবং এগুলোতে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ এবং বাইরে থেকে সকল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া যেত।
বিদ্রোহীদের সহায়তা দানে বাইরে থেকে হামলার আশংকা এবং ভেতর থেকে হামলা চালানোর অবস্থা বিদ্রোহীদের ছিল না। তাদের আত্মসমর্পণ করতে হতো অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই। ফলে রক্তপাত এড়ানো যেত। এতে এত লোক মারা যেত না। যুদ্ধের মোড়ও অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যেত ।
