রাজনৈতিক উদ্যোগ : গৃহীত পদক্ষেপ ও অর্জিত সাফল্য

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় – রাজনৈতিক উদ্যোগ : গৃহীত পদক্ষেপ ও অর্জিত সাফল্য। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

Table of Contents

রাজনৈতিক উদ্যোগ : গৃহীত পদক্ষেপ ও অর্জিত সাফল্য

 

রাজনৈতিক উদ্যোগ : গৃহীত পদক্ষেপ ও অর্জিত সাফল্য

 

১।ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা :

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশবাসীর গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠা হয় এবং ঐ একই বছরের ১২ জুনের নির্বাচনে জনগণ অবাধে নিজেদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করে।

১৯৯৬-এর নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগের শাসনামলে জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচনসহ সকল পর্যায়ে জনগণ নির্ভয়ে ও অবাধে তাদের পছন্দ মতো প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে।

২।স্বাধীনতার আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা :

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতার আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামাজিক-সমতা, ন্যায় বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার নীতির ভিত্তিতে জাতীয় পুনর্গঠনের সংগ্রামে ব্রতী হয়।

৩।রাষ্ট্রপতি নির্বাচন :

বিএনপির মতো কোনো দলীয় রাষ্ট্রপতি না করে নির্দলীয় ব্যক্তিত্ব সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সর্বপ্রথম এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আওয়ামী লীগ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল।

৪।সংসদীয় কার্যক্রম :

গণতন্ত্র লাভ করছিল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। নিশ্চিত করা হয়েছিল সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সংসদকে সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে মন্ত্রীর বদলে সংসদ সদস্যদের চেয়ারম্যান করা, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু এবং সংসদ চলাকালে পুরো সংসদীয় কার্যক্রম বেতারে সম্প্রচার করা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংসদে যেসব আইন পাস করা হয়, তাতে স্বৈরতান্ত্রিক অধ্যাদেশের কোনো স্থান ছিল না।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং কথা বলার জন্য সংসদে সরকারি দলের চেয়ে বেশি সময় পাওয়া সত্ত্বেও বিএনপি, জাতীয় পার্টি দীর্ঘ দুই বছর সংসদ বর্জন করে। বস্তুত সংসদীয় ব্যবস্থাতে অকার্যকর প্রমাণিত করাই ছিল তাদের ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য। কিন্তু তাদের এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সাফল্যের সঙ্গে তার মেয়াদ পূর্ণ করে।

নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনায় জাতীয় ঐকমত্য ও সমঝোতার নীতি অনুসরণের চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ অন্যান্য দল থেকে মন্ত্রী নিয়োগ করে। বিরোধী দলের অসহযোগিতা ও সরকার উৎখাতের চেষ্টা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এই নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

৫। আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা :

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতাসীন হবার অল্পদিনের মধ্যেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে আওয়ামী লীগ জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করে। এর ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যা বিচারের বাধা অপসারিত হয়। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে; ঐ রায়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জেল হত্যাসহ অন্যান্য হত্যার বিচার-প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

৬। ইতিহাস-বিকৃতি রোধ :

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এভাবে গ্রহণ করা হয় ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াসের ধারা অবসানের পদক্ষেপ।

৭। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা :

আওয়ামী লীগ সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিল। এই প্রথম কার্যকর করা হয় সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ। বিচার বিভাগের জন্য বাজেট বরাদ্দের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্বাধীনভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করাসহ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়।

বিচার ত্বরান্বিত ও ন্যায় বিচার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই গঠন করা হয়েছিল একটি স্থায়ী আইন কমিশন। আইনের যুগোপযোগী সংশোধন ও প্রয়োজনীয় নতুন নতুন আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গঠিত কমিশনের সুপারিশও কার্যকর করেছে। এছাড়া গরিব ও দুস্থ বিচার প্রার্থীদের সহায়তার জন্য জেলা জজের নেতৃত্বে আইন সহায়তা কমিটি গঠন, স্বতন্ত্র মেট্রোপলিটন সেশন আদালত স্থাপন এবং গ্রামীণ আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

৮। স্থানীয় সরকার :

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জনগণের ক্ষমতায়ন ও তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৪-স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। মধ্যে।

ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছিল। সংসদে পাস করা হয়েছিল গ্রাম পরিষদ, উপজেলা ও জেলা পরিষদসমূহের কাঠামো, ক্ষমতা ও নির্বাচন পদ্ধতি সংবলিত ভিন্ন ভিন্ন আইন।

৯।সংবাদপত্র, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা :

বাক-ব্যক্তি ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যমসমূহ ভোগ করেছে পূর্ণ স্বাধীনতা। নিশ্চিত করা হয়েছিল অবাধ তথ্য প্রবাহ। সংবাদপত্রে সরকারি মালিকানা লোপ করা হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানায় টেরিস্ট্রিয়াল ও একাধিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল চালু এবং বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন প্রদানের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল আইন।

১০।প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি :

দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি সৎ, দক্ষ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়পরায়ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছিল প্রশাসন সংস্কার কমিশন। এই লক্ষ্যে গঠিত কমিশনের অনেক সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছিল। বিএনপি আমলের ভেঙে পড়া প্রশাসনের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

প্রজাতন্ত্রের কর্মবৃত্তে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে আওয়ামী লীগ তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘বেতন কমিশন’ গঠন ও তার সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে, তাদের বেতন-ভাতাও বৃদ্ধি করা হয়। পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জটিলতার নিরসন করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রশাসনের ঊর্ধ্বর্তন যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। অন্যান্য স্তরের কর্মচারীদেরও যথাযোগ্য পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল।

১১।গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি :

অতীতের সরকারগুলো, বিশেষত, বিএনপি ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানে কেবল ব্যর্থই হয়নি। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নটি উত্থাপন করতেই ভুলে গিয়েছিল। অথচ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ৬ মাসের মধ্যে, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের ত্রিশ বছর মেয়াদি চুক্তি সম্পাদন করতে সক্ষম হয়।

গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা। আদায়ের ফলে একদিকে যেমন উত্তরবঙ্গের মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধ করা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে লবণাক্ততা দূর হয়েছে এবং জি-কে প্রজেক্টভুক্ত এলাকায় বন্ধ হয়ে- যাওয়া সেচ প্রকল্পগুলো পর্যাপ্ত পানি পেয়ে শস্য শ্যামলা হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের ইতিহাসে এই প্রথম গ্রহণ করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পানিনীতি।

 

১২।পার্বত্য চট্টগ্রামে শাস্তি প্রতিষ্ঠা :

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন আওয়ামী লীগ সরকারের এক ঐতিহাসিক সাফল্য। দেশের এক-দশমাংশ জুড়ে দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধাবস্থার অবসান ও ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি বন্ধ হয়, সংরক্ষিত হয় পাহাড়ি ও বাঙালিদের ন্যায্য স্বার্থ। ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী ৬৫ হাজার উপজাতীয় শরণার্থী দেশে ফিরে আসে।

উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগত সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সারা বিশ্বে স্থাপন করেছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বিএনপি-জামাত জোট এই চুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে দেশের এক-দশমাংশ ভারতের দখলে চলে যাবে বলে অপপ্রচার চালায় এবং সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নে সক্ষম হয়।

১৩।অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল :

অর্পিত সম্পত্তি আইন (শত্রু সম্পত্তি) বাতিল করা হয়েছে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানি শাসকদের প্রবর্তিত দেশবাসীকে বিভক্তকারী মানবাধিকার-বিরোধী এই বৈষম্যমূলক আইন রহিত করে আওয়ামী লীগ তার অঙ্গীকার পূরণ করেছিল।

 ১৪।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস :

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল বলেই ভাষা শহীদদের আত্মদানে ভাস্বর মহান একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের’ স্বীকৃতি লাভ করেছে। ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে উত্থাপিত বাংলাদেশের এই প্রস্তাব ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে।

২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রায় ৪ হাজার ভাষাভাষী কোটি কোটি মানুষ যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দিবসটি পালন করে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের একান্ত উদ্যোগে ২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বে বাঙালি জাতিকে নতুন গৌরবে অভিষিক্ত করেছে। এই উদ্যোগে কানাডার প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায় দিশারীর ভূমিকা পালন করে বাঙালি জাতির কৃতজ্ঞভাজন হয়েছেন।

১৫।শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও দুর্যোগ মোকাবিলা :

১৯৯৭ সালের উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯৮ সালের শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী বন্যা এবং ২০০০ সালে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১১টি জেলায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য দেশবাসী ও বিশ্ব-সম্প্রদায়ের বিপুল প্রশংসা অর্জন করেছে।

১৯৯৮ সালে দেশের ৫৩টি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিধ্বংসী বন্যায় কৃষিখাতে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকাসহ শিল্প ও অবকাঠামোগত খাতে মোট ১০,২২৮ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়। ২৬ লক্ষ ঘরবাড়ি, ২৪ হাজার কিলোমিটার রাস্তা, ১৭৬৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ৩৭ হাজারেরও বেশি কালভার্ট ও সেতুসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা প্রভৃতি অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়। দুই কোটি মানুষ না খেয়ে মারা যাবে বলে বিরোধী দল প্রচার করেছিল।

কিন্তু সরকার ১৯৯৮ সালের জুলাই মাস থেকে ৯ মাসব্যাপী ৪২ লক্ষ ৫০ হাজার ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে ২ কোটি ১০ লক্ষ মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্য সাহায্য দেয়। ফলে একজন মানুষও খাদ্যের অভাবে মারা যায়নি। বিরোধী দলের প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ আদায় স্থগিত রেখে কৃষক ভাইদের বর্ধিত হারে নতুন করে ৩,২৭০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। সততা, দক্ষতা ও সুপরিকল্পিতভাবে বন্যা মোকাবিলা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

এর ফলে এই প্রলয়ঙ্করী বন্যার পরও খাদ্যশস্যের বাম্পার ফলন ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির উচ্চহার অর্জিত হয়। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে এবং ২০০০ সালের বন্যার পরও এ ধারা অব্যাহত থাকে। এতে দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল দক্ষতাই নয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যও প্রমাণিত হয়।

১৬।নারীর ক্ষমতায়ন :

নারীর অধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নে আওয়ামী লীগের সাফল্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকার ১৯৯৭ সালের ৮ মার্চ নারী উন্নয়ন নীতিমালা ঘোষণা করে। নারীর ক্ষমতায়নে গ্রহণ করা হয় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। এই প্রথম ব্যক্তির পরিচয়ের ক্ষেত্রে পিতার নামের পাশাপাশি মায়ের নামের উল্লেখ থাকাকে বাধ্যতামূলক করা হয়।

ব্যবস্থা করা হয় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের। এই ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রায় ৪৫ হাজার মহিলা অংশগ্রহণ করেন এবং এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার মহিলা চেয়ারম্যান ও সদস্যপদে সরাসরি নির্বাচিত হন। সরকারি উচ্চপদে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যোগ্য মহিলাদের পদোন্নতি ও নিয়োগ দান করা হয়।

দেশের ইতিহাসে এই প্রথম হাইকোর্টের বিচারপতি, সচিব, জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উচ্চপদে মহিলারা নিয়োগ লাভ করেন। এ ছাড়া সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে মেয়েদের নিয়োগ, নারী শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, বয়োবৃদ্ধ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দু’লক্ষ মহিলাকে মাসিক ভাতা প্রদান, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে কঠোরতর আইন প্রণয়ন ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।

সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের মেয়াদ বৃদ্ধির সংবিধান সংশোধনী বিল আওয়ামী লীগ উত্থাপন করে। কিন্তু বিরোধী দল বিএনপির সংসদ বর্জন ও অসহযোগিতার জন্য এই বিল পাস করা সম্ভব হয়নি।

১৭।প্রতিরক্ষা :

অতীতের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী ও একনায়করা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করা, অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল এবং দেশবাসীকে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকার তার শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী ও শক্তিশালী আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ও আনসারদের সুযোগ- সুবিধাও বৃদ্ধি করা হয়।

বিডিআর-কে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে উপযোগী করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিডিআর-এর সাংগঠনিক কাঠামো সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে ২২ হাজার জনবল বৃদ্ধির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ৫৩৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় মোতায়েনের জন্য মোট ৬ ধাপে একটি সীমান্ত সদরসহ ৪টি সেক্টর, ২০ রাইফেল ব্যাটালিয়ান ও একটি রিভারাইন ব্যাটালিয়ান প্রতিষ্ঠা করার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।

বিডিআর সদস্যরা কর্তব্যরত অবস্থায় আহত বা নিহত হলে তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা দ্বিগুণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ রাইফেলস পদকের মূল্যমান ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায় এবং প্রেসিডেন্ট রাইফেলস পদকের মূল্যমান ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং প্রশংসনীয় ভূমিকা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।

১৮।পররাষ্ট্র নীতি :

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার ও কর্মসূচি কেবল সফলই হয়নি, দেশকে বিশ্বসভায় অধিষ্ঠিত করেছে এক গৌরবের আসনে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন, দেশের অভ্যন্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ফলে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী চাকমা উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা।

দুটি দেশের মধ্যে সরাসরি বাস সার্ভিস ও ট্রেন যোগাযোগ চালুসহ অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে অর্জিত অগ্রগতি আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র নীতির সাফল্যেরই পরিচায়ক। সার্কভুক্ত অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ বহুমুখী সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক। ডি-৮, বিমসটেক প্রভৃতি আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ পালন করেছে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা।

 

রাজনৈতিক উদ্যোগ : গৃহীত পদক্ষেপ ও অর্জিত সাফল্য

 

এ ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা বাংলাদেশকে নতুন করে মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অতীতের আপাত বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে নতুন এক সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ফাও-এর সেরেস পদক লাভ এবং ২০০০ সালের এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি অর্জন, সর্বোপরি, মেয়াদাস্তে সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও ইতালিতে অনুষ্ঠিত ডি-৮ সম্মেলনের একটি অধিবেশনে স্বল্পোন্নত বিশ্বের এশীয় অঞ্চলের মুখপাত্র হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারপ্রধানের মর্যাদায় অংশগ্রহণ প্রভৃতির ভেতর দিয়ে বিশ্বসভায় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের এক নতুন ইমেজ- আত্মমর্যাদাশীল জাতির অমিত সম্ভাবনার নতুন পরিচয় ।

Leave a Comment