আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৯৫৬ সালের সংবিধান ও পূর্ববাংলায় এর প্রতিক্রিয়া
১৯৫৬ সালের সংবিধান ও পূর্ববাংলায় এর প্রতিক্রিয়া

১৯৫৬ সালের সংবিধান ও পূর্ববাংলায় এর প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর একটি গণপরিষদ গঠিত হয়। গণপরিষদের ওপর দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের। কিন্তু গোড়া থেকে পাকিস্তানে যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের এলিট শ্রেণীর যেকোন প্রকারে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার যে প্রবণতা লক্ষ করা যায় তাতে করে সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিতই হতে থাকে ।
বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে অবশেষে ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ থেকে গণপরিষদের প্রণীত সংবিধান কার্যকর হয়। এটি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান। যদিও এই সংবিধান ছিল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে সংবিধানটি পাকিস্তানিদের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হলেও পাকিস্তান এর কতটা ধারণ করতে পেরেছিল তাতে সন্দেহ আছে।
বিশেষকরে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলার মানুষদের হতাশ হবার অনেক কারণ ছিল। বৃহৎ আকারের সংবিধানটির সুক্ষ্ণ বিশ্লেষণে অনেক অসঙ্গতি ধরা পড়ে ।
সংবিধান রচনার প্রেক্ষাপট
পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশের পর হতে বিভিন্ন পর্যায় থেকে দ্রুত একটি সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে চাপ ছিল। বিশেষ করে পূর্ববাংলার পক্ষ থেকে সংবিধান প্রণয়নের জোরালো দাবি ওঠে। স্বাধীনতার পর ক্রমেই এটা স্পষ্ট হচ্ছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন এলিট শ্রেণী এমন একটি শাসন পদ্ধতির প্রবর্তন চাইছে যাতে পাকিস্তান কাঠামোর ভেতর পূর্ববাংলা কার্যত একটি উপনিবেশে পরিণত হয়।
পূর্ববাংলার সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি অনুধাবন করে প্রতিবাদে সোচ্চার হন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য সংখ্যা ছিল ৬৯ জন। এর ভেতর পূর্ববাংলার ৪৪ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ২৫ জন। পূর্ববাংলার ৪৪ জন সদস্যের ভেতর ৩১ জন মুসলিম সদস্য এবং ১৩ জন সাধারণ সদস্য।
পশ্চিম পাকিস্তানে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৯ জন এবং ৬ জন। যার ভেতর ২ জন শিখ সদস্য ছিলেন। তবে প্রকৃতপক্ষে পূর্ববাংলার ৪৪ জন গণপরিষদ সদস্যের ভেতর পশ্চিম পাকিস্তানের ৬ জন রাজনৈতিক নেতা এদেশীয়দের উদারতার সুযোগে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে পূর্ববাংলার সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন ৩৮ জন। পরবর্তী সময় সরকার গণপরিষদে আরো ১০ জন সদস্য বৃদ্ধি করেন ।
এই ১০ জনই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত হন। ফলে অবস্থা দাঁড়ায় পূর্ববাংলার সদস্য সংখ্যা ৪৪ জন (বাস্তবে ৩৮ জন) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ৩৫ জন (বাস্তবে ৪১ জন)। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর অনিহার মুখে গণপরিষদ বিশেষ কাজ করতে পারেনি।
১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তারা মোট ১৬ বার অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ২ বার অধিবেশনে মিলিত হতে পেরেছে। মোট কার্যদিবস ছিল মাত্র ১২১ দিন। উল্লেখিত ৮ বছরে ৫৬ ভাগ জনসংখ্যা অধ্যুষিত পূর্ববাংলায় গণপরিষদের কোন অধিবেশনে বসেনি।
১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান গণপরিষদ শাসনতন্ত্র মূলনীতি কমিটি গঠন করে। মূলনীতি কমিটিতে পূর্ববাংলার প্রতিনিধি ছিল খুবই নগন্য সংখ্যক।
পূর্বেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের একটি দিক নির্দেশনামূলক প্রস্তাব পাকিস্তান গণপরিষদে গৃহীত হয়। ১৯৪৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মূলনীতি কমিটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের নির্দেশনা দিয়ে তাদের রিপোর্ট পেশ করে। এতে নিকক্ষের সদস্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারণের কথা বলা হলেও উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হয়।
এতে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয়। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুলনীতি কমিটির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদের আওয়ামী লীগ অন্যান্য দলের সঙ্গে ঢাকায় একটি মহাসম্মেলন করে এবং সেখান থেকে ব্যাপক আলোচনার পর শাসনতন্ত্রের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। এখানে ৭৮টি ধারার মাধ্যমে বিকল্প একটি প্রস্তাব দেয়া হয়। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমুদ্দিন মূলনীতি কমিটির দ্বিতীয় রিপোর্ট পেশ করেন।
এতে ৪০০ সদস্যের ফেডারেল পার্লামেন্ট এবং ১২০ সদস্যের প্রাদেশিক পরিষদের কথা বলা হয়। এবারও ভাষার প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়ে যায়। ১৯৫৩ সালের অক্টোবর মাসে গণপরিষদ মূলনীতি কমিটি তৃতীয় রিপোর্ট পেশ করে। এতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করা হয় বলা হয়, উচ্চ পরিষদ গঠিত হবে। ৩০০ জন সদস্য নিয়ে যার ভেতর পূর্ববাংলার সদস্য হবেন ১৬৫ জন।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের ২৪ অক্টোবর গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল দেশে জরুরী অবস্থা জারি করেন। ১৯৫৪ সালের ভেতর পাকিস্তানের বিশেষ করে পূর্ববাংলার ইতিহাসের দু’টি অত্যন্ত উল্লেখ করার মত ঘটনা ঘটে। প্রথমত, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং দ্বিতীয়ত, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের ভরাডুবি।
এসবই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য অশনি সংকেত। ফলে ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটগোষ্ঠী দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অপতৎপরতা শুরু করে। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ১৯৫৫ সালের মার্চ মাসে অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্তক্ষমতাবলে পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেন।
অধ্যাদেশ অনুসারে পূর্ববাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তান দু’অংশ থেকে ৪০ জন করে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়। নির্বাচনের পদ্ধতি ছিল পরোক্ষ। ৮০ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হবার পর ১৯৫৫ সালের ৭ জুলাই মারীতে গণপরিষদের অধিবেশন বসে । পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ববাংলার রাজনৈতিক নেতারা মারীতে একটি ৫ দফা সমঝোতায় উপনীত হন। এই সমঝোতার ভিত্তিতেই ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণীত হয়।
১৯৫৬ সালের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য
১৯৫৬ সাল পাকিস্তানের জন্য যে সংবিধান প্রণীত এবং গৃহীত হয় তার মূল সুর বোঝানোর জন্য একটি প্রস্তাবনা লিখিতভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। এই সংবিধানে ৬টি তপসিল, ১৩টি অনুচ্ছেদ এবং ২৩৪টি ধারা ছিল। এর প্রধান যে বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করার মত তা’ হলো-
ইসলামী প্রজাতন্ত্র:
‘৫৬ সালের সংবিধান অনুসারে পাকিস্তানকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন প্রণয়ন নিষিদ্ধ হয় এবং রাষ্ট্রপতি মুসলমান হবেন- এ শর্ত যুক্ত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র:
পাকিস্তান হবে একটি যুক্তরাষ্ট্র এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের ভেতর ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া হয়। ক্ষমতার ক্ষেত্রে তিনটি ভাগ দেখা যায়- একটি কেন্দ্রীয় সরকারের, একটি প্রাদেশিক সরকারের এবং একটি ছিল যুগ্ম তালিকাভুক্ত।
সংসদীয় সরকার:
কেন্দ্রে এবং প্রদেশে সংসদীয় প্রকৃতির বা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতিকে নিয়মতান্ত্রিক প্রধানে পরিণত করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ তাদের কাজের জন্য আইন পরিষদের নিকট দায়ী ছিলেন।
এক কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা:
পাকিস্তানে গোড়া থেকেই যদিও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা নিয়ে আলোচনা চলছিল, শেষপর্যন্ত দেশে এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তিত হয়। ১০ জন মহিলা সদস্য সহ মোট ৩১০ সদস্যের পার্লামেন্ট গঠনের কথা বলা হয়। সংখ্যাসাম্য নীতির ভিত্তিতে এই আসন বন্টন করা হয়।
রাষ্ট্রভাষা:
বাংলা এবং উর্দু উভয় ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়।
প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন:
১৯৫৬ সালের সংবিধানে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানে পরিষ্কার ভাষায় প্রাদেশিক কার্যাবলী নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রদেশ পরিচালনার জন্য প্রাদেশিক মন্ত্রিপরিষদ, আইন পরিষদ প্রভৃতির বিষয়ে স্পষ্ট বিধান ছিল।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা:
বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে বিচার বিভাগকে সংবিধানের রক্ষকের দায়িত্বও দেয়া হয়। একটি সুপ্রিম কোর্ট এবং প্রদেশগুলির জন্য আলাদা হাইকোর্টের বিধান রাখা হয়।
মৌলিক অধিকার:
সংবিধানে নাগরিকদের জন্য মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। মৌলিক অধিকারসমূহ বিধিবদ্ধ করে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং এর জন্য আদালতের দ্বারস্থ হবার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়।
স্বাধীন নির্বাচন কমিশন:
পাকিস্তান যেহেতু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দ্বারা শাসিত হবে সেহেতু সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা রাখা হয় ।
সংবিধান সংশোধন:
১৯৫৬ সালের সংবিধানে সংশোধনের যে ব্যবস্থা রাখা হয় তাকে নমনীয় বলা যায়। সাধারণ সংশোধনীসমূহ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি নিয়ে সংবিধান সংশোধন করার ব্যবস্থা ছিল। তবে উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির সম্মতি নেবার প্রয়োজন ছিল ।
সংবিধানের কার্যকারিতা
১৯৫৬ সালে প্রণীত সংবিধান চালু ছিল মাত্র দু’বছর। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ‘৫৬ সালের সংবিধান এবং এই সঙ্গে পাকিস্তানের সাংবিধানিক শাসনের সমাপ্তি ঘটান। তবে যে দু’বছর সংবিধান কার্যকর ছিল সে সময়কালে এর কার্যকারিতা, উপযোগিতা প্রভৃতি নিয়ে পন্ডিতজনরা দ্বিধা বিভক্ত ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, ‘৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হবার মত যথেষ্ট উপযুক্ত ছিল না।
এতে অনেক অসঙ্গতি বিদ্যমান ছিল। আবার অন্য একদল মনে করতেন, এই সংবিধান কার্যকর হবার মত সময়ই পায়নি। প্রকৃত সত্যটি হয়ত এর মাঝামাঝি নিহিত । ‘৫৬ সালের সংবিধানের বিষয়ে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক মহল এবং সুশীল সমাজ বিশেষ খুশি ছিল না। তারা এর প্রতিবাদও জানিয়েছিলেন। তারপরও হয়ত একটি সমাধানে পৌঁছানো যেত বা বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল।
কিন্তু দু’বছর যেতে না যেতে সামরিক শাসন জারি হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দায়িত্ব কম নয়। প্রকৃতপক্ষে এই এলিট শ্রেণী সাংবিধানিক শাসন চায় নি । ‘৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর না হবার পেছনে প্রধান কারণই হল সংবিধানে ক্ষমতার যে বিভাজনের কথা বলা হয়েছিল তা মেনে না চলা।
কেন্দ্রীয় সরকার বার বার অযাচিতভাবে প্রাদেশিক সরকারের ওপর হস্তক্ষেপ তো করেছেই এমনকি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত অহেতুক কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছেন। অর্থাৎ কেউ সঠিকভাবে সংবিধান মেনে চলেন নি। রাজনৈতিক দলগুলো বা রাজনৈতিক নেতারা যদি ঐক্যবদ্ধ হতেন তবে হয়ত সংবিধান লংঘনের এমন ঢালাও প্রবণতা রোধ করা যেত। এর পরিবর্তে রাজনীতিবিদরা পরস্পর কোন্দলে লিপ্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছেন।
সংবিধান প্রণয়নের পর দু’বছরেও কোন নির্বাচন যেমন সম্ভব হয়নি তেমনি নির্বাচিত সরকারের বদলে অন্যরা দেশ চালিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান কার্যকর হওয়া খুবই দুরূহ। আইয়ুব খান সাংবিধানিক শাসন ব্যর্থ হবার জন্য বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের মাধ্যমে যে তদন্ত কমিটি করেছিলেন তাতে নির্বাচন না হওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কোন্দল এবং সরকারের কাজে অসাংবিধানিকভাবে অন্যদের হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তানের শুরু থেকেই আমলারা অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করত সরকারের বিভিন্ন কাজে । এই প্রবণতা ‘৫৬ সালের সংবিধান প্রণীত হবার পরও বিদ্যমান ছিল। বরং বলা চলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে এই প্রবণতা আরো বেশি মাত্রায় প্রসার লাভ করে ।
সব থেকে বড়কথা হলো পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মীর্জা দু’জনই আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন যাতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া স্থায়ী রূপ লাভ করতে না পারে। শাসনতন্ত্র লংঘন করে তারা কেন্দ্রীয় সরকার অদল-বদল করছিলেন, প্রাদেশিক সরকারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছিলেন।
কয়েকটি ঘটনা থেকে এ বিষয় আরো স্পষ্ট হবে কীভাবে নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকার মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দী সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এদিকে পূর্ববাংলার গভর্নর ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানকে পদচ্যুত করেন (মার্চ ১৯৫৮)।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন আবু হোসেন সরকার। কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান পরের মাসে পূর্ববাংলার গভর্নর ফজলুল হককে পদচ্যুত করেন। নতুন গভর্নরের দায়িত্ব নেয়ার ১ ঘন্টার মধ্যে আবু হোসেন পদচ্যুত হন। মুখ্যমন্ত্রী হন আতাউর রহমান। জুন মাসে আবার তাঁকে পদচ্যুত করে আবু হোসেনকে পুনরায় নিযুক্ত করা হয়।
মাত্র ৪ দিন পর আওয়ামী লীগ-ন্যাপ সমঝোতা হলে অনাস্থা ভোটে আবু হোসেন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হন। পরের মাসে আবার মুখ্যমন্ত্রী হন আতাউর রহমান। পরিষদের এই অধিবেশনেই ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী নিহত হন। সুতরাং এমন একটি পরিস্থিতিতে সংবিধান কার্যকর না হওয়াই স্বাভাবিক।
পূর্ববাংলায় এর প্রতিক্রিয়া
পাকিস্তানের শুরু থেকে একটি সংবিধান এবং সাংবিধানিক শাসনের জন্য পূর্ববাংলার মানুষ দাবি জানিয়ে আসলেও ‘৫৬ সালের সংবিধান তাদের আকাঙ্ক্ষার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। সুতরাং এ বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই নেতিবাচক ।
একথা ঠিক পূর্ববাংলার দীর্ঘ দিনের দাবী যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার, সংসদীয় ব্যবস্থা, প্রাদেশিক ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র ভাষার দাবী এই সংবিধানের মাধ্যমে পূরণ হয়েছিল।
কিন্তু ক্ষমতাসীন এলিট শ্রেণীর ষড়যন্ত্রের ভেতর এটি কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দেহ তো ছিলই একই সঙ্গে নতুন কিছু উপাদান যোগ হয়ে সংবিধান বিষয়ে পূর্ববাংলার প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক হয়ে পড়ে।
মারী সমঝোতার মাধ্যমে পূর্ববাংলার রাজনীতিবিদরা পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে একটা সমঝোতার মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন করলেও যখন দেখা গেল পূর্ববাংলার নাম বদলিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান করা হয়েছে, জনসংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়নি,
পূর্ববাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে এক এক ইউনিট হিসাবে বিবেচনা করে সংখ্যা সাম্যনীতি গ্রহণ করা হয়েছে তখন স্বভাবতই এ সংবিধান আর পূর্ববাংলার মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য থাকেনি। আওয়ামী লীগ সংবিধান পাশ করার দিন অধিবেশন বর্জন করে। শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনও চলছিল। কিন্তু শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভেতর মতের মিল না থাকাতে শাসনতন্ত্র আন্দোলন বিশেষ জোরদার হয়নি।
হবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে শাসনতান্ত্রিক সংকটের এই পর্বে অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। এ বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে তিনি ২০টি উল্লেখযোগ্য ভাষণও দিয়েছিলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ‘৫৬ সালের সংবিধান বিষয়ে পূর্ববাংলার মানুষের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ছিল নেতিবাচক।
সারসংক্ষেপ
অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে যে সংবিধান ১৯৫৬ সালে প্রণয়ন করা সম্ভব হল সেটি দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়নি। সংবিধানটি বিভিন্ন চক্রান্তের কারণে কার্যকর করা যায়নি। একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার আগেই সামরিক শাসন জারি করে সংবিধানকে অকার্যকর করা হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয় বাধাগ্রস্ত। শুরু হয় পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক শাসন ।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯২। ২। আবুল ফজল হক, বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা ও রাজনীতি, রংপুর, টাউন লাইব্রেরী, ১৯৯৬।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্র, সংসদীয় সরকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও মৌলিক অধিকার সম্পর্কে কি ধারা ছিল লিখুন।
২। ১৯৫৬ সালের সংবিধান সম্পর্কে পূর্ববাংলার রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া সংক্ষেপে লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। ১৯৫৬ সালে সংবিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
