আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে সভানেত্রীর ভাষণ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে
সভানেত্রীর ভাষণ

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর,
ডেলিগেট, কর্মী ভাই ও বোনেরা /
আপনারা আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও সংগ্রামী অভিবাদন গ্রহণ করুন। ১৯৮১ সালের বিগত কাউন্সিলে আপনারা আমাকে যখন দলের সভানেত্রী নির্বাচন করেন, তখন স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের উপর সরকারী বিধি-নিষেধ নিয়ে আমি প্রবাসে অবস্থান করছিলাম।
প্রবাস জীবনে মা-বাবা-ভাইদের হারিয়ে যে শোক ও শূন্যতা আমার হৃদয় জুড়ে বসেছিল, আপনাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রাম, ঘাতকদের প্রতি জনসাধারণের সীমাহীন ঘৃণা ও নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনের খবর খানিকটা হলেও সে শূন্যতা পূরণ করতো।
আমি ব্যাকুল হয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি, সভা- সমাবেশে আপনাদের সংগ্রামী তৎপরতার কথা তুলে ধরেছি, প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্র ও হত্যাকারীদের মুখোশ উন্মোচনের প্রচেষ্টা চালিয়েছি।
কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যে ভাবিনি যে এই সংগঠন পরিচালনার গুরুদায়িত্ব আমাকে বহন করতে হবে। প্রবাস জীবনের দুঃসহ দিনগুলিতে আমি আমার স্বজনদের হারিয়ে আমার প্রিয় স্বদেশবাসীর কাছ থেকে যখন বিচ্ছিন্ন, তখনই আমার উপর অর্পিত এই মহান দায়িত্বভার আমাকে গ্রহণ করতে হয়েছে। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে। আওয়ামী লীগকে বাংলার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করেছিল খুনীরা। কিন্তু তাদের সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি।
আওয়ামী লীগ তার বিগত দিনের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই আপনাদের সুদীর্ঘ ত্যাগ, তিতিক্ষা ও কর্মপ্রয়াসকে সম্বল করে বাংগালী জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীকরূপে আপন অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে। ‘৭৫ পরবর্তীকালে ফ্যাসীবাদী।
চক্রের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের সূচনায় জাতীয় জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। রাজনীতিতে হতাশা, বিভ্রান্তি, দোদুল্যমানতা ও দলীয় সংকটের আবর্তে দেশ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে, তখন জাতির জনকের কন্যা হিসেবে আমি আপনাদের অর্পিত দায়িত্বভার গ্রহণ করেই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছি।
এদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও আওয়ামী লীগের সংগে আমি শৈশব কাল থেকেই জড়িত। যে পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে আমার জীবন বেড়ে উঠেছে, সেখানে আমার আজন্ম সম্পর্ক রাজনীতির সাথে। আমি দেখেছি আমার বাবা ও তাঁর সহকর্মীদের দুঃসহ নির্যাতিত জীবন। বাবা তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কারাগারের অন্তরালে। যতদিন বাইরে থাকতেন, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি তাঁকে।
বাবার বর্তমানে মাকে যেমন তার সহকর্মীর মতো দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, বাবার অবর্তমানে তেমনি দেখেছি নেপথ্য থেকে তাঁকে সংগঠনের হাল ধরতে, রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে। আমাদের স্নেহবঞ্চিত পারিবারিক জীবনে আমরা বড় হয়েছি। আমার অজান্তে আমাদের পারিবারিক পরিবেশের মধ্য থেকেই আমার হয়তো রাজনীতির হাতে খড়ি।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে দেশবাসী যখন সোচ্চার, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে সরাসরি রাজনীতির সংগে আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম। চারিদিকে অশান্ত অস্থিরতা। ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষ পথে নেমে এসেছে।
অন্যায়ের প্রতিবাদে ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামে মিছিলে, মিটিংয়ে আমিও শরীক হয়েছি। ষাটের দশকের সেই সংগ্রামমুখর রক্ত ঝরা দিনগুলোতে কোন সচেতন বাংগালী রাজনীতির মূল স্রোতধারা থেকে দূরে থাকতে পারেনি। তাই সংগ্রামের পথ থেকে আমার পক্ষেও বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব হয়নি।
পঁচাত্তরের সেই কালো রাতে আমি বিদেশে ছিলাম। ছোট বোন রেহানাও ছিল আমার সাথে। ঘটনাচক্রে যদি সেদিন দেশের বাইরে না থাকতাম, তবে আর আপনাদের সাথে দেখা হতো না। এভাবে কথা বলার সুযোগও আমা জীবনে আসতো না।
যে পৈশাচিকতা নিয়ে প্রতিবিপ্লবী চক্র বঙ্গবন্ধুর প্রায় অরক্ষিত বাসভবনে সেদিন হামলা চালিয়েছিল, তার নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি ফুলের মতো নিষ্পাপ আমার দশ বছর বয়সী ছোট ভাই রাসেল, কামাল, জামাল ও তাদের স্ত্রী এবং আমার স্নেহময়ী মা।
ঘৃণ্য সেই দস্যুদের বুলেট বিদীর্ণ করেছে আমার চাচা শেষ। নাসেরের বুক। সেদিন সে বাড়ীতে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কেউ ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ষড়যন্ত্রের নীল নকশা অনুযায়ী হত্যা করা হয়েছে কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনিকে এবং তাঁদের পরিবারের নারী ও শিশুদের। নির্বাচিত সরকারের প্রধানকে বাচাতে এসে জীবন দিয়েছেন কর্ণেল জামিল ।
সমব্যথী ভাই ও বোনেরা /
প্রবাস জীবনে আমি যেখানেই গিয়েছি, দেখেছি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের প্রতি সারা বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় শান্তিকামী মানুষের কী ঘৃণা উপচে পড়ছে। যে দেশেই গিয়েছি, শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সাথে উচ্চারিত হতে শুনেছি বঙ্গবন্ধুর নাম।
আর এই বিশ্ব প্রতিক্রিয়ায় শংকিত ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের আধিপত্য নিরংকুশ করার লক্ষ্যে পঁচাত্তরের ৩রা নভেম্বর কারাগারে জাতীয় নেতাদের হত্যা করেছে, নিজেরা ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত থেকে পত্তন করেছে মার্শাল ম্যানদের রাজত্ব।
এমনি অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে ১৯৮১ সালের ১৭ই মে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু প্রেমিক বাংগালী জাতি আমাকে সুগভীর আত্মীয়তায় একাত্ম করে নিয়েছে। স্বদেশে ফেরার সেই বর্ষণমুখর দিনে লক্ষ-কোটি বাংগালীর যে অকৃত্রিম ভালবাসার উষ্ণতা আমি লাভ করেছি, তা-ই আমার চলার পথের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে গত ৫ বছর দলীয় কর্মকাণ্ডে আপনাদের সাথে অংশ গ্রহণ করেছি।
আন্দোলনে, সংগ্রামে ও দলীয় কার্যক্রমে আমি সারা বাংলায় দেখতে পেয়েছি বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ ও বাংলার জনগণ এক প্রাণ এক আত্মা ।
আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের গৌরবময় অতীত ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের সামঞ্জস্য বিধান করে জাতীয় মুক্তির সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে আজো আমরা দলকে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকতে পেরেছি।
আমার সহযাত্রী ভাই-বোনেরা/
গত ১১ বছর ধরে আমাদের জাতীয় জীবনে চরম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয় চলছে। সমগ্র জাতি হতাশায় নিমজ্জিত। জাতীয় জীবনের এমনি এক গভীর সংকটপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল অধিবেশন ‘৮৭-তে আজ আমরা সমবেত হয়েছি। ১৯৮১ সালের পর প্রায় ৫ বছর অতিক্রম করে আমাদের এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
দেশে পর্যায়ক্রমিক সামরিক শাসনের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যথাসময়ে আমরা কাউন্সিল অনুষ্ঠান করতে পারিনি। আজো আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বা স্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তবুও এই অবস্থার মধ্য দিয়েই আমাদের দলীয় কাউন্সিল সমাপ্ত করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জনগণের জীবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান। গত তিন যুগের অধিক সময় ধরে বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজজীবনের প্রতি ক্ষেত্রে জনগণের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক হচ্ছে অবিচ্ছেদ্য।
জাতীয় জীবনের সকল ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এদেশের জনগণের একক রাজনৈতিক সংগঠন এবং আওয়ামী লীগের কোন বিকল্প নেই।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংগালী জাতি এক ও অভিন্ন সত্তা। বাংগালী জাতির রাজনৈতিক আদর্শ, তার ভাষা, কৃষ্টি ও আত্মপরিচয়ের বিজয়, স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির পথ নির্ণয়-সকল ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একক ভূমিকা সমগ্র জাতির কাছেই স্পষ্ট প্রতীয়মান।
যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য যেমন আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি, তেমনি ক্ষমতার সাথে ও ক্ষমতার বাইরে বিগত ৩৮ বছরে আওয়ামী লীগের ভূমিকা হচ্ছে বাংগালী জাতির মুক্তি সংগ্রামে বিশ্বস্ততার সাথে নেতৃত্ব দান।
আজো এই কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের অংগীকার হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে স্বৈরতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আজ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতি এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে।
এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল জাতীয় জীবনে পালন করবে ঐতিহাসিক ভূমিকা। আপনাদের অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের সকলের প্রিয় প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ হবে আরো শক্তিশালী ও আপন ঐতিহ্য রক্ষায় একনিষ্ঠ।
আমার সংগ্রামী সহযাত্রীরা/
আপনারা জানেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট আপনাদের প্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়েই জনগণের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে এদেশে সূচনা করা হয়েছে সামরিক শাসনের ধারা।
বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে আপনাদের অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিরিশ লাখ মানুষের আত্মদান, কোটি কোটি দেশবাসীর অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা, আড়াই লাখ মা-বোনের লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের ফলে খুব দীর্ঘ সময় আমরা সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধরে রাখতে পারিনি।
আপনারা জানেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সরকার তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে দেশবাসীর কল্যাণে। স্বাধীনতা উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবস্থা সবই আপনাদের জানা আছে। সারা দেশের রাস্তা-ঘাট, সেতু-বন্দর, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, কল-কারখানা, বাড়ী-ঘর, পাক সেনা ও রাজাকারদের তাণ্ডবলীলায় ধ্বংস হয়েছে। ব্যাংকে গচ্ছিত সকল নগদ টাকা জ্বালিয়ে দিয়ে হানাদার বাহিনী স্বর্ণ-রৌপ্য পাচার করেছে পাকিস্তানে।
তিরিশ লাখ টন খাদ্য, বেসামরিক বিমান বহর, জলযান ধ্বংস করেছে পাক সেনারা। শূন্য কোষাগার নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেশ গঠনের কাজে হাত দিতে হয়েছিল। গড়ে তুলতে হয়েছিল রাস্তা-ঘাট, নির্মাণ করতে হয়েছিল শত শত রেল- সড়ক পথ ও সেতু।
জাহাজ ও ফেরী চলাচলের উপযোগী করতে হয়েছিল ফেরীঘাট ও বন্দর সমূহ। স্কুল-কলেজ, সরকারী ও বেসরকারী ভবন সমূহ নির্মাণের সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ ঘরবাড়ী মেরামতে তিনি ব্যয় করেছেন কোটি কোটি টাকা।
তার উপর ছিল এক কোটি ছিন্নমূল শরণার্থীর পুনর্বাসন সমস্যা, খাদ্য সংকট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত কল-কারখানা চালু করে অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখা, প্রতিটি শহীদ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দান ও পুনর্বাসন করা। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় নয় লক্ষ বাসগৃহ নির্মাণ করেন এবং সমস্ত ভস্মীভূত বাড়ীঘর পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রাথমিক পুনর্বাসন ব্যবস্থায় ব্যয় হয় পঁচিশ কোটি তেষট্টি লক্ষ তিরিশ হাজার টাকা।
ভারতীয় মিত্র বাহিনীকে ফেরৎ দান ও পাকিস্তানে আটক তিন লক্ষ সেনাবাহিনীর সদস্য ও বাংগালীকে দেশে ফেরৎ আনার দুরূহ কাজটিও স্বল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে সম্পন্ন করতে হয়েছে। আজকের ক্ষমতাসীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতিও সেই সুবাদে দেশে ফেরার সুযোগ পান।
বাস্তুহারাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য উনিশ কোটি আট লক্ষ বাহাত্তর হাজার পাচশত টাকা প্রদান করা হয়। তাদের খাদ্য সরবরাহের জন্য আনুষাঙ্গিক ব্যয় হয় বিশ লক্ষ আটাত্তর হাজার টাকা।
বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণ করা হয় চিকিৎসার জন্য। ঢাকা শহরে বস্তিবাসী সর্বহারাদের জন্য নয় হাজার একর জমির প্লট বন্টনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য আমদানীকৃত মোট খাদ্যশস্যের। পয়তাল্লিশ জনকে রেশনে খাদ্য দেওয়া হয়।
বাহাত্তর সালের এক মাসেই খাদ্য সরবরাহের পরিমাণ ছিল তিন লাখ পরিমাণ ছিল সাতাশ লাখ টন। খাদ্য বণ্টন করা হয়েছে তেইশ লাখ দশ হাজার সাতশত একুশ টন। শতকরা টন। দশ লক্ষ পাকিস্তানীর মধ্যে সাত লক্ষ পাকিস্তানীকে ফেরৎ পাঠানো হয় এবং বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাঙালীদের ন্যায্য পাওনা দশ হাজার কোটি টাকা দাবী করেন। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে যানবাহনের সংস্কার করা।
হয় শতকরা পঞ্চান্নটি। ঘাটতি পূরণের জন্য আমদানী করা হয় সাতশত পঁচাত্তরটি। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে লাঞ্ছিতা ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন। এই বোর্ডের অধীনে ঢাকা শহরেই ৫৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৩৫টা কেন্দ্র খোলা হয়।
জাতির জনক বাংলার কৃষকের পঁচিশ বিঘা জমির খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করেছিলেন। পাকিস্তান আমলের বকেয়া খাজনা মওকুফ, ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ, স্বল্পমূল্যে সার ও পাওয়ার পাশ সরবরাহ, বিনামূল্যে কীটনাশক ঔষধ বিতরণ, কয়েক লক্ষ কৃষি ঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করেছিলেন। তামাদী ঋণের পরিমাণ ছিল পনের কোটি টাকা, সমবায় ঋণের পরিমাণ তিন কোটি টাকা।
এর পরও রাসায়নিক সার বন্টনের পরিমাণ ছিল এক লক্ষ নব্বই হাজার টন। কৃষকদের জন্য উন্নতমানের বীজ বণ্টন করা হয় তিপান্ন হাজার দুইশত ঊনসত্তর মণ। গভীর অগভীর নলকূপ বসানোর পরিকল্পনাসহ কৃষি উন্নয়নের বাজেটে বরাদ্দ করা হয় একশত তিন কোটি টাকা।
ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা হয়, শিক্ষা খাতে ব্যয় হয় ছাব্বিশ কোটি তিন লক্ষ ঊননব্বই হাজার টাকা। ৭২-৭৩ সালে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল আটচল্লিশ কোটি চুরাশি লক্ষ তিরানব্বই হাজার টাকা।
প্রতি গ্রামে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও কয়েক হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে শিক্ষকদের সরকারী চাকুরীর মর্যাদা দান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কালাকানুন বাতিল ও স্বায়ত্তশাসন প্রদান, সহজলভ্য গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৃত্তিমূলক ও কারিগরী উচ্চ শিক্ষায় উন্নীত করার জন্য ডক্টর কুদরতে খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে।
সকল নাগরিকের সুচিকিৎসার জন্য প্রতি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ ও অস্থায়ী স্বাস্থ্য কর্মীদের স্থায়ী চাকুরীর মর্যাদা দান করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার জনস্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য উন্নয়ন খাতে প্রায় এগার কোটি পঁচানব্বই লক্ষ সাতষট্টি হাজার টাকা ব্যয় করেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দুইশত চুয়াত্তরটি সড়ক সেতু নির্মাণ ও সংস্কার ছাড়াও সুদীর্ঘ রেলপথ সংস্কার, তিনশতটি রেল সেতুর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করতে হয়।
বিমান বন্দর সংস্কার ও নতুন বিমান বন্দর নির্মাণ কাজে হাত দেওয়া ছাড়াও ছয়টি বিমান আমদানী করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তেইশটি জলযান সংগ্রহ করে ট্রলারসহ আরও একশত দশটি জলযান সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হয়।
দেশের তাঁত শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রায় এগার কোটি টাকা সরকারী ঋণ বরাদ্দ করা হয়। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলায় পাট রফতানী বাণিজ্য জাতীয়করণ করেন এবং ধান-চাউলের মূল্য নির্ধারণ ও খাদ্যশস্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন।
লবণ চাষীদের অনুপ্রাণিত করার জন্য লবণ কর মওকুফ করা হয়। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক বেতন ও পুনর্বাসন করা ছাড়াও তাদের কল্যাণে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন করা হয়। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলা ভাষার প্রচলন সূচিত হয়। তাঁর সরকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মদ, জুয়া, হাউজী, রেস খেলা বন্ধ প্রভৃতি কার্যক্রম অত্যন্ত সাফল্যের সাথেই গ্রহণ করেছিলেন।
এই স্বল্প সময়ের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী। বিভিন্ন সেনানিবাস সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়, স্থাপিত হয় কুমিল্লায় দেশের প্রথম সামরিক একাডেমী। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই সেনাবাহিনীতে ছিল না কোন হানাহানি, কোন প্রকার বিশৃঙ্খল অবস্থা। জনগণের সাথে ছিল সেনাবাহিনীর মর্যাদাপূর্ণ
অবস্থান ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বশান্তির প্রতি অবিচল, দুনিয়ার নিপীড়িত মুক্তিকামী জাতি সমূহের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতি সোচ্চার ও বর্ণ বৈষম্যবাদ বিরোধী সকল জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি।
ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা সুনিশ্চিত করেন ও ফারাক্কা চুক্তির মাধ্যমে চৌচল্লিশ হাজার কিউসেক পানির ব্যবস্থা করেন। ভারতীয় মিত্র বাহিনীকে ফেরৎ দান করে বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ সহ সমগ্র বিশ্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছিল গৌরবময় ও সম্মানজনক অবস্থান। শুধু
তাই নয় জাতিসংঘে জাতির জনক সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করে বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদান করেন। প্যালেষ্টাইনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন তিনি।
ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেছিল বাংলাদেশ তাঁর নেতৃত্বে। বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মহান অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বশান্তি পরিষদ তাঁকে প্রদান করেছিল শান্তির প্রতীক “জুলিওকুরী” পদক।
সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা/
আপনাদের সবই জানা আছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবলমাত্র নয় মাসের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়নি। এই স্বাধীনতার জন্য জাতিকে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সুদীর্ঘ চব্বিশ বছরের সংগ্রামের পটভূমি তৈরী করতে হয়েছিল। বৃটিশ শাসকদের সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের ফল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়া পাকিস্তানের শাসকরা তাদের কায়েমী স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রথমেই আঘাত করেছিল বাংগালীর ভাষার উপর।
বায়ান্নর একুশের মহান শহীদরা বাংগালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দীর্ঘ সময় ধরে সেই জাতীয় চেতনায় ধাপে ধাপে দেশ ও জাতিকে সাফল্যের সাথে এগিয়ে এনেছেন জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে। দোদুল্যমানতা আর আপোষকামিতার হাত থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করে তিনি বাংগালী জাতির মুক্তির প্রশ্নে সংগ্রামী প্রতিষ্ঠানরূপে তাকে গড়ে তুলেছেন।
একদিকে জাতিকে তার আত্ম পরিচয় ও জাতীয় ঐতিহ্য মূল্যবোধে সচেতন করে তোলা, অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বাংগালী স্বার্থের প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার সাথে একাত্ম করার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধিকারের দাবীতে জাতীয়তাবাদী চেতনায় সমগ্র জাতির সংগ্রাম ধারায় নূতন গতি সঞ্চার করেছেন।
হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন, শত সংগ্রামে অগণিত মানুষের মহান আত্মদান, অপরিসীম কষ্ট ও লাঞ্চনা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। ছয় দফা আন্দোলনই ছিল যথার্থভাবে বাংগালীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সর্বাত্মক সংগ্রাম।
এই সংগ্রামের মাঝেই বাংগালী জাতি ও বঙ্গবন্ধু একাত্ম হয়ে উঠেছেন আমাদের জাতীয় জীবনে। বাংগালীর মুক্তি সনদ ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণার সাথে সাথে একশ্রেণীর পাকিস্তানী দালালেরা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করতে শুরু করলেন।
ছয় দফাকে ‘সি আই এর দলিল’ বলে গালাগাল দিয়ে বাংগালী স্বার্থের পরিপন্থী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন জনবিচ্ছিন্ন কিছু বাংগালী রাজনীতিবিদ। পশ্চিমা শাসকদের দোসর আপোষকামী ও সুবিধাবাদী ব্যক্তিরা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে বাংগালীর মুক্তি সংগ্রামকে বানচাল করতে চেয়েছে। পাকিস্তানী শাসকরাও সেদিন বুঝতে পেরেছিল বাংগালী জাতীয়তাবাদের দুর্জয় চেতনাকে ধ্বংস করতে হলে শেখ মুজিবকে ফাঁসীর রশিতে নিঃশেষ করতে হবে।
তাই তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু সেদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আপোষের পথ বেছে নেননি তিনি। বাংগালীর স্বার্থে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করেছেন বলেই ঊনসত্তুরের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফাঁসীর কাষ্ঠ থেকে ছিনিয়ে এনেছে তাদের প্রিয় নেতাকে। বাংলার মানুষের সেই দুর্বার গণসংগ্রামে পতন ঘটেছে স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর।
কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় সামরিক শাসনের ধারা অব্যাহত থেকে গেলে ইয়াহিয়ার আবির্ভাবে। গণ-আন্দোলনের মুখে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া সত্তুর সালে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সত্তুরের নির্বাচনে সারা পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বাংগালী স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেদিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে আপোষ করেননি।
ইয়াহিয়া খানের দেয়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রলোভন বঙ্গবন্ধুকে প্ররোচিত করতে পারেনি। ক্ষমতার হাতছানি প্রত্যাখান করে বাংলার স্বাধীনতার প্রতি তাঁর অবিচল ভূমিকা জাতীয় ঐকাকে আরো ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় সমুন্নত রেখেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরও পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা সেদিন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিতে চায়নি। ষড়যন্ত্রের পথ ধরেই সেনা শাসক ইয়াহিয়া একাত্তুরের পহেলা মার্চ তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ৩রা মার্চ থেকে
সমগ্র বাংগালী জাতি পাকিস্তানী শাসনযন্ত্রকে অচল করে দিয়ে সর্বাত্মক অসহযোগিতার পথে নেমে আসে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলার জনগণকে একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি গেরিলা যুদ্ধের জন্য বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন জাতিকে।
১৯৭১ এর মার্চ মাসে বাংলাদেশ ছিল কার্যতঃ স্বাধীন। একদিকে একের পর এক ইয়াহিয়ার পাকিস্তানে সামরিক শাসন বিধি জারী হয়েছে বস্তুতঃ বাংলাদেশে ছিলনা। যার কার্যকারীতা। অপরদিকে ধানমন্ডির ৩২নং সড়কের বাড়ী থেকে ঘোষিত হয়েছে বাংগালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ, যাতে বাংলার সর্বস্তরের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে, যেই নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে বাংলার রাষ্ট্রযন্ত্র।
২৫শে মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানী হানাদার নরপশুরা জনগণের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তারা নির্বিচারে চালালো গণহত্যা। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সমগ্র দেশব্যাপী চললো নির্বিচারে আক্রমণ।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জাতির পিতা ঘোষণা করলেন, “পুলিশ হোক, সৈন্য বাহিনী হোক, আওয়ামী লীগ হোক, ছাত্র হোক, যে যেখানে আছে পশ্চিমাদের বাংলা থেকে খতম না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাও। বাংলাদেশ স্বাধীন – ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করলো।
ফাঁসির আদেশ দিলো পাকিস্তানের কারাগারে বন্ধী রেখে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাংলার জনগণ স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াই করেছে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতা।
সমবেত ভাই ও বোনেরা/
স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত গণপরিষদের মাধ্যমে স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই জাতির জন্য একটি সর্বাধুনিক গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। সেই সংবিধানের ভিত্তিতে ১৯৭৩ সালে সার্বভৌম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রেখে ৭২-এর সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সকল প্রগতিশীল পদক্ষেপ, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তনকে চরমভাবে বাঁধা দেওয়া শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর থেকেই। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও এক শ্রেণীর উগ্র হঠকারী চক্র দেশী-বিদেশী শত্রুদের মদদপুষ্ট হয়ে দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম গড়ে তোলে।
এরা ৫ জন সংসদ সদস্য সহ আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতা কর্মীকে হত্যা করে। তদুপরি গুপ্ত হত্যা, সার কারখানায় বিস্ফোরণ, পাটের গুদামে আগুন, থানা ও ফাঁড়ি লুট প্রভৃতি কার্যক্রম বিপ্লবের নামে সারা দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছিল।
উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শস্যহানি, বন্যা, বিশ্ব বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চক্রান্তে নগদ অর্থে কেনা খাদ্যের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে ‘৭৪-এ দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।
বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সেদিন পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।এমনি অবস্থায় সকল দুর্যোগ ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশে স্বাবলম্বী অর্থনীতি গড়ে তুলে একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
বহুমুখী গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুসম বণ্টন ব্যবস্থা, শিল্প কারখানায় শ্রমিক শ্রেণীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ, দুর্নীতিমুক্ত গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন, দ্রুততর ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা, সহজলভ্য গণমুখী বিজ্ঞান ভিত্তিক কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বিনা খরচে সুচিকিৎসার সুযোগ ও শোষিতের গণতন্ত্র তথা সকল শ্রেণীর ও পেশার জনগণের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল দ্বিতীয়।
বিপ্লবের মূল লক্ষ্য। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন জাতীয় ঐক্যের। সে ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দল সমূহ, সাংবাদিক, সশস্ত্র বাহিনী, সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, আইনজীবী, ডাক্তার সহ সর্বস্তরের পেশাজীবী জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশ গড়ার কাজে একই রাজনৈতিক মঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন।
ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা যখন শুরু হলো তখনই সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় এজেন্টরা জাতির জনককে হত্যা করে এদেশে সূচিত করেছে সামরিক শাসনের ধারা। জনগণ নয়, ব্যালট নয়, অস্ত্র ও বুপেটর হয়ে উঠলো ক্ষমতার উৎস। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। এক উচ্চাভিলাসী সামরিক চাক একের পর এক হত্যা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল করে চলছে।
এরা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করে অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করার উদ্দেশ্যে সরকারী অর্থ ব্যয়, প্রশাসনযন্ত্র এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে তৈরী করেছে নিজেদের ক্ষমতার ভিত। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে দেশের দুশ্চরিত্র, দলছুট ও সামাজিক অপরাধীদের সমন্বয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে তথাকথিত নির্বাচনের নামে এই শক্তি ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চায়।
‘৭২-এর গণতান্ত্রিক সংবিধানকে বুটের তলায় চাপা দিয়ে উর্দিপরা ব্যক্তিরা যখন-তখন কলমের খোঁচায় সংবিধান পরিবর্তন করেছে। এভাবে গত ১১ বছর কখনও প্রকাশ্যে, কখনও অপ্রকাশ্যে কখনো প্রত্যক্ষ কখনো পরোক্ষ সামরিক শাসন চালু রয়েছে বাংলাদেশে। ১৯৭৫ এর পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তাদের কেউ এসেছেন বেসামরিক লেবাসে বন্দুকের নলে চেপে বসে, আর কেউ এসেছেন সরাসরি উর্দি পরে বন্দুক হাতে নিয়ে।
গত এগার বছরের সামরিক শাসনের প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে স্বৈরাচারী শাসন পদ্ধতির একচ্ছত্র আধিপত্য। এই সামরিক স্বৈরশাসন দেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও জনগণের মৌলিক অধিকারের সকল নীতিমালা ধ্বংস করে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠির হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। তাদের হাতে গণতন্ত্র লাভ করেছে আইয়ুবী রূপ। পরিবর্তন হয়েছে মহান স্বাধীনতার সুফল রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সমূহ।
জাতীয়করণ বানচালের অশুভ সূচনা, ক্ষমতার স্বার্থে সেনাবাহিনীর মধ্যে হানাহানি, সশস্ত্র বাহিনীকে জনতার প্রতিপক্ষরূপে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা, প্রশাসনের অভ্যন্তরে দুর্নীতির প্রবেশ, রাজনৈতিক দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি ও চরিত্র হননের প্রক্রিয়া, সামাজিক অপরাধীদের প্রশ্রয় দান
জাতির জনকের হত্যাকারী ও জেলখানায় নিহত চার জাতীয় নেতার খুনীদের পুনর্বাসন এবং দূতাবাসে চাকুরী প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কার প্রদান, ব্যাংক ঋণের টাকা লুটপাট, ক্ষমতাসীনদের কালোবাজারী ও চোরাচালানে অংশ গ্রহণ, স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন, সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণীর সৃষ্টি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সূচনা প্রভৃতি অপকর্ম অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সম্পন্ন করেছে এই সামরিক চক্র।
রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বদলে স্বৈরতন্ত্রের ধারা, অর্থনীতিতে অব্যবস্থা ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য, সামাজিক ক্ষেত্রে অনাচার, ‘৭৫-এর তুলনায় দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার নিম্নমাণ সৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে বিদেশী ভাবধারার আমদানী এবং অবক্ষয়ের ধারা হচ্ছে এই সামরিক শাসন আমলের শ্রেষ্ঠতম অবদান।
১৯৭৫ এর পরে ক্ষমতাসীন জেনারেল সাহেব ঘোষণা করলেন, তিনি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি ডিফিকাল্ট করে দেবেন। বস্তুতঃ রাজনীতিকদের চরিত্র হননের প্রক্রিয়ায় জেনারেল সাহেবরা বাংলাদেশে সেই খেলাই খেলছেন। একটি হত্যাকাণ্ড ডেকে আনে আরো হত্যা ও অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা। জনবিচ্ছিন্ন একটি ক্ষুদ্র উচ্চাভিলাষী গোষ্ঠি নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে রাজনীতিকেও কলুষিত করে চলেছে।
এই শাসকরা নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে সামরিক বাহিনীতে চালায় নির্বিচার হত্যা আর তাতে জীবন দিতে হয়। হাজার হাজার নিরপরাধ অফিসার, জোয়ান ও দেশবাসীকে। ১৫ই আগষ্টের পর এই উচ্চাভিলাষী ক্ষুদ্র সামরিক চক্রের ক্ষমতার লড়াইয়ে এ দেশে সংঘটিত হয়েছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের পালা।
অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখলকারী জনবিচ্ছিন্ন, গণবিরোধী শাসকচক্র তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরের অসৎ ও ভাড়া খাটা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একের পর এক সরকারী ফ্রন্ট, দল, পার্টি গঠন করে চলেছে।
বৈদেশিক সাহায্য, ঋণ ও দরিদ্র জনগণের খাজনা ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা সরকারী কোষাগার থেকে ব্যয় করা হয়েছে এইসব দল গঠনের কাজে। হত্যা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এক জেনারেলের হাত থেকে ক্ষমতার পালা বদল হচ্ছে অন্য জেনারেলের হাতে। আর পূর্বতন দলের দুর্নীতি পরায়ণ নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার ঘরছায়ায় আবার গড়ে তুলেছে ক্ষমতাসীন নূতন দল।
‘৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসকদের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য সর্বস্তরের দুর্নীতি পরায়ন ও সুবিধাভোগী। কতিপয় ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয় জাগদল। সামরিক শাসনের তল্পিবাহক একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি করা হয় বিভিন্ন সামাজিক অপরাধী, স্বাধীনতা বিরোধী, খুনী ও ভাড়াটিয়া রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে।
জেনারেল সাহেবদের উন্ন থেকে রাজনীতিতে অবতরণের জন্য সরকারী অর্থ ব্যয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে সেনা ছাউনীতে বসে ১৯ দফা বাস্তবায়ন কমিটি তারপর জাগদল থেকে ফ্রন্ট এবং তা থেকে জাতীয়তাবাদী পার্টি তৈরী করা হয়।
একই কায়দায় নুতন জেনারেল সাহেব ক্ষমতায় এসে সরকারী অর্থ, গোয়েন্দা সংস্থা, সেনানিবাস ব্যবহার করে গড়ে তোলে পূর্বসুরী ১৯ দফার চেয়ে এক দফা কমিয়ে ১৮ দফা নামে পরিষদ, জনদল, ফ্রন্ট এবং সর্বশেষে জাতীয়তাবাদী পার্টির ধাঁচে জাতীয় পার্টি।
সংগ্রামী সাথীরা/
আপনারা জানেন, পর্যায়ক্রমিক সামরিক শাসনের ধারায় ‘৮২ সালের ২৪শে মার্চ দেশে নূতন পর্যায়ে সামরিক শাসন জারী হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন জেনারেল এরশাদ। যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী বাঙ্গালী সৈনিকদের বিচারের জন্য গঠিত ইয়াহিয়ার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসাবে কর্মরত ছিলেন।
পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করা এই পরাজিত সৈনিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলেন। চারিত্রিকভাবে এই সামরিক শাসন ও পুরানো ধারার সাথে এক ও অভিন্ন। গত চার বছরের স্বৈর শাসনের ফলে দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, কর্মচারী, ব্যবসায়ী সহ সর্বস্তরের ও শ্রেণীর জনগণের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘটেছে চরম অবনতি। সামাজিক অনাচার, খুন-রাহাজানি, শিশু-কিশোর হত্যা, নারী নির্যাতন, বোমাবাজী, লুটপাট অতীতের সকল রেকর্ড ভংগ করেছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, ভ্রান্ত শিক্ষানীতির প্রবর্তন, শিক্ষক সমাজের প্রতি বৈষম্যমূলক বিধি ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
সার, কীটনাশক, পাওয়ার পাম্প সহ কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, বিরাষ্ট্রীয়করণের ফলে শ্রমিক ছাঁটাই, ব্যাংক কর্মচারীসহ সরকারী কর্মচারীদের চাকুরীচ্যুতি, ন্যায়সংগত মজুরী ও বেতনের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের শ্রমিক কর্মচারী ও মধ্যবিত্তের জীবনে উঠেছে নাভিঃশ্বাস। সরকার বিভিন্ন খাতে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে অনুৎপাদনশীল খাত সহ সামরিক চক্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের কাজে। কৃষি ঋণ ও সুদ আদায়ের নামে কৃষকদের উপর চলেছে নির্যাতন।
আজ ও দেশে এক কোটি বিশ লাখ বেকার মানবেতর জীবনযাপন করছে। আজ দেশীয় শিল্পের বিকাশ বন্ধ করে পুঁজির নামে দেশী-বিদেশী লুটেরা গ্রাস করেছে আমদানী-রপ্তানী ব্যবসা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ঋণ, মৎস্য শিল্প তথা অর্থনীতির সকল শাখা।
বর্তমান সামরিক জান্তা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সংবিধান স্থগিত ঘোষণাই করেনি সংবিধান। বিরোধী পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে অবলীলায়। বিকেন্দ্রীকরণের নামে সুপ্রীম কোর্টের অবকাঠামো পরিবর্তন, এখতিয়ার ও ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।
সামরিক শাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ-এর নামে গ্রাম পর্যায়ে দুর্নীতির প্রসার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছে নির্দ্বিধায়। বিভিন্ন সেক্টর কর্পোরেশন, ব্যাংক, সরকারী সংস্থা, সচিবালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সামরিক ব্যক্তিদের উচ্চ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে সৃষ্টি করেছে প্রশাসনিক জটিলতা।
বেসামরিক প্রশাসনকে সামরিকিকরণ করেছে। এইভাবে গত ১১ বছরের সামরিক শাসনের ফলে দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ জনসংখ্যা বসবাস করছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। সামরিক শাসকরা ক্ষমতা দখল করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বার্ষিক উন্নয়নের হার ৭ শতাংশ করার।
কিন্তু বর্তমানে সেখানে উন্নয়নের হার নিম্নগতি লাভ করে। ৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে । বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বৈদেশিক সাহায্য এসেছিল দুইশত বিশ্ব কোটি ডলার। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন, পুনর্গঠনেই ব্যয় হয়েছিল তার অধিক অংশ, সরকারী কর্তৃত্বাধীনে এই সময়কালে বাৎসরিক বৈদেশিক সাহায্য ব্যয় হয়েছিল চল্লিশ কোটি ডলার।
তবুও ১৯৭২-৭৩ সাল থেকে ৭৫-৭৬ সাল পর্যন্ত সময়ে জাতীয় আয় বৃদ্ধির গড়পড়তা হার ছিল শতকরা ০.৯ ভাগ। আর গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বৈদেশিক সাহায্য এসেছে ছয়শত কোটি ডলার।
১৯৮১-৮২ সাল থেকে ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে গড়পড়তায় ১২০ কোটি ডলার সাহায্য এসেছে। সরকারী হিসেবেই টাকার অংকে এই সাহায্যের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকারও অধিক। অথচ বাৎসরিক আয় বৃদ্ধির গড়পড়তা হার শতকরা ০.৪ ভাগেরও কম।
১৯৮০-৮৬ সাল সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হার হচ্ছে গড়ে ১৩৪ কোটি ডলার। যার ৮২ কোটি ডলার এসেছে রপ্তানী আয় থেকে, আর ৫২ কোটি ডলার এসেছে বিদেশে কর্মরত বাংগালীদের উপার্জিত অর্থ থেকে। অথচ তারপরও জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার কমে গেছে।
সামরিক শাসকদের ক্ষমতা দখলের পর স্বনির্ভর অর্থনীতির শ্লোগান তুললেও পঁচাত্তর সালের পূর্ব পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের উপর আমাদের নির্ভরশীলতা ছিল শতকরা ২৫ ভাগ আর বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে শতকরা ৮৫ ভাগ। বস্তুতঃ এই জেনারেল সাহেবেরা স্বনির্ভরতার শ্লোগান তুলে প্রকারান্তরে সাম্রাজ্যবাদ ও আন্তর্জাতিক পুঁজির হাতে দেশকে বন্ধক দিচ্ছে। ‘৭৫ এর তুলনায় আজ বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েছে চারশত ভাগ ।
বন্ধুগণ/
দ্বিতীয় পাঁচসালা পরিকল্পনায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল তার ৪০ ভাগই পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার সাথে বাংলাদেশের টাকার মূল্যমান অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে প্রতিশ্রুত ঋণও পাওয়া যায়নি। ১৯৭৪-৭৫ সালে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল সাতশত আটাত্তর কোটি টাকা।
১৯৮৫-৮৬ সালে বাণিজ্য ঘাটতিও দাঁড়িয়েছে চার হাজার ছয়শত ঊনত্রিশ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ডলারের দাম ৭৪-৭৫ সালে ছিল ১ ডলার সমান ৮.৮৮ টাকা, ১৯৮৫-৮৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৩.৫০ টাকারও বেশী। কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ ও সারের উপর ভর্তুকী প্রত্যাহার করা হয়।
তাতে একদিকে যেমন কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় অপরদিকে অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায় কৃষকের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের মূল্য। সরকারী দলের টাউট ফড়িয়াদের উদর পূর্ণ হয় কৃষিঋণের টাকায় অথচ কৃষিঋণ ও সুদের নামে বাংলার দরিদ্র কৃষকের হারাতে হচ্ছে ভিটেমাটি ও হালের বলদ। বাংলার সোনালী আঁশ পাট আজ কৃষকের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে।
সরকারী উদ্যোগ গ্রহণের অভাব ও সরকারী নীতির ব্যর্থতায় বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য পাট তার আন্তর্জাতিক রাজার হারিয়েছে। সরকারী ক্রয় কেন্দ্রগুলোতে অর্থ সরবরাহ নেই, যতটুকু আছে তাও টাউটদের পকেটে চলে যাচ্ছে। বাংলার কৃষক পাটের উৎপাদন খরচটুকুও পাচ্ছে না।
‘৭৫ এর তুলনায় দেশে ভূমিহীনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। এই সংখ্যা ‘৭৫-এ ছিল ৩৫ ভাগ, এখন ৬৮/৭০। ৭৫-এ পরিবারপিছু জমির পরিমাণ ছিল ৩.৫ একর। ৮২-তে তা দাঁড়িয়েছে ২.২ একর। আর বর্তমানে নেমে এসেছে ১.৫ একর। কৃষি ঋণের জন্য যেখানে কৃষককে ভিটেমাটি হারাতে হয় গ্রেফতারী পরোয়ানার অত্যাচারে, সেখানে ধনীদের হাতে চারশত কোটি টাকার অধিক অনাদায়ী ঋণ মওকুফ করে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। এই ঋণভোগীদের অনেকেই এই সরকারের মন্ত্রী।
এই সরকার সরকারী ব্যয় কমানোর কথা বললেও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের নামে জনকল্যাণের পরিবর্তে স্বার্থান্বেষী চক্রের ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে ২ ভাগ বাড়িয়ে দিয়েছে সরকারী ব্যয়। গত পাঁচ বছরে সরকারী রাজস্ব বাবদ আয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ৮শত ৫০ কোটি টাকা।
প্রতি বছর গড়ে তিন হাজার একশত সতের কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ১৯৭২-৭৩ সালে রাজস্ব আয় ছিল দুইশত কোটি টাকা। ৭৫-৭৬ সালে ছিল ১ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে রাজস্ব আয় বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধি করাও সম্ভব হয়নি এই সামরিক সরকারের পক্ষে।
অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, সামরিক শাসকদের দল গঠন, বিলাস বহুল ভ্রমণ, ক্ষমতাসীন দুর্নীতিপরায়ন মন্ত্রীবর্গের বিদেশে সম্পদ পাচার ও বিলাসী জীবনযাপনেই ব্যয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সামরিক শাসকদের শাসনামলে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের হার ২ দশমিক ৮ ভাগ থেকে কমে এক ভাগে দাঁড়িয়েছে।
অথচ জনগণের ক্ষুধা ও দারিদ্রকে ব্যবহার করে এবং উন্নয়ন ও প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশী ঋণ তারা আত্মসাৎ করছে। শিল্প বিকাশের নামে দল গঠনের জন্য কতিপয় ব্যক্তিকে সহজশর্তে দেদার ঋণ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান সামরিক শাসনের প্রথমদিকে তদন্ত কমিটি গঠন করে বলা হয়েছিল গত ১১ বছরে
বি এস বি বি এস আর এস যে ১২৪৮টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে তার মাত্র ৩৬ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি মাত্র ১১ জন শিল্পপতিকে ৩৯৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে। যার মধ্যে ২০৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা তখনই তামাদি হয়ে গেছে।
যেখানে ১৯৭২ থেকে ৮২ পর্যন্ত বি এস বি বি এস আর এস সরকারী খাতকে ঋণ দিয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা আর শিল্পপতিদের দিয়েছে ৩১১ কোটি টাকা। বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে সামরিক শাসকেরা নামমাত্র মূল্যে দেশের লাভজনক যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় ফিরিয়ে দিয়েছে তাতে মেধার হাজার হাজার কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে তেমনি অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান।
বন্ধ হয়ে গেছে। অপরদিকে এইসব প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছে। এ পর্যন্ত ৪১৭টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিক্রী হলেও মূলতঃ জাতি তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থ মন্ত্রীর মতেই শিল্পখাতে সরকারী মালিকানার পরিমাণ ১৯৭২ সালের শতকরা ৮৫ ভাগের তুলনায় ১৯৮৬ সালে শতকরা ৪৫ ভাগে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬শ’ শিল্প বা অন্যান্য ইউনিটে বিজাতীয়করণ করে বিক্রী করা হয়েছে।
১৯৭২ সালে দেশের মোট শিল্প উৎপাদনের শতকরা ৯০ ভাগ সরকারী খাতে ছিল। আর বর্তমানে মাত্র ১৬০টি শিল্প ইউনিট সরকারী মালিকানায় রয়েছে। মাত্র ২০ ভাগ শ্রম শক্তি সরকারী খাতে নিয়োজিত আজ। তবুও বিক্রি করা শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলিতে যেমনি লেগে আছে শ্রমিক অসন্তোষ, তেমনি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক।
সরকারী নীতি ও অব্যবস্থার কারণে দেশে নূতন ভাবে প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিও ধ্বংস হতে চলেছে। ৮০ ভাগ রি-রোলিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। বস্ত্র কলগুলিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, রপ্তানীযোগ্য পোষাক শিল্প, স্বয়ংক্রিয় চালকল, ময়দাকল ইত্যাদির অধিকাংশ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। আখ, তামাক, চা শিল্পেও মন্দাভাব বিরাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সবদিক থেকেই জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। ১৯৮০-৮১ সালে দ্রব্যমূল্যের সূচক ছিল ৬২৮। ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫-এ।
এমনি ভাবে সাড়ে চার বছরে সামরিক শাসনামলে শিক্ষার হারও কমেছে ২৫ ভাগ। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সামরিক শাসনামলেই ভঙ্গ করেছে অতীতের সকল রেকর্ড।
আমার সংগ্রামী বন্ধুরা/
আপনারা জানেন, এই সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে গত চার বছর ধরে আমরা পাঁচ দফার ভিত্তিতে লড়াই করেছি। আমাদের আন্দোলনের সাথে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, পেশাজীবী, আইনজীবী, শিক্ষকসহ সর্বস্তরের জনগণের সংগ্রামে একটি ঐক্যবদ্ধ জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে।
১৫ দলীয় ঐক্য-জোটের আহ্বানে জনগণ ধর্মঘট, হরতাল, বিক্ষোভ, সমাবেশের মধ্য দিয়ে একাধিকবার ঘোষণা করেছে গণরায়। কিন্তু এই স্বৈরসরকার জনমতের তোয়াক্কা না করে বেছে নিয়েছে হত্যা, নির্যাতন ও গ্রেফতারের পথ। স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে আত্মাহুতি দিয়েছেন সেলিম-দেলওয়ার, জননেতা ময়েজ উদ্দিন ও রবিউল আউয়াল কিরণ।
এমনিভাবে গত চার বছরে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন তিতাস, বসুনিয়া, শাজাহান সিরাজ, আসলাম, শ্রমিক নেতা তাজুল, আওয়ামী লীগ কর্মী রমীজ, স্বপন, সোহরাব, মোজাম্মেল, দিপালী সাহা সহ দেশমাতৃকার অগণিত বীর সন্তান ।
পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নারী, পুরুষ নির্বিশেষে হাজার হাজার ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, সাংবাদিক ও জনতা। গ্রেফতার, হুলিয়া, মিথ্যা মামলা, হয়রানী সহ্য করতে হয়েছে জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক, কর্মচারী, ছাত্র, শিক্ষক ও পেশাজীবী জনগণকে।
আজ কারাগারে ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে প্রহর গুনছে ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন, বিশ্বজিত নন্দী। নির্যাতন ভোগ করছেন বহু রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। সামরিক আইনে ক্ষমতাসীন এই সরকার শুধু ক্ষমতাই টিকিয়ে রাখেনি সামরিক শাসনের কড়াকড়ি আরোপ করে।
আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে কোটি কোটি টাকা অপচয় করে তথাকথিত গণভোট ও উপজেলা নির্বাচনের প্রহসন করেছে। যা সমগ্র বিশ্বে কুড়িয়েছে নিন্দা ও ধিক্কার। এই সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনিদের দেশে-বিদেশে পুনর্বাসিত করছে, জাতির জনকের হত্যার প্রতিবাদকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে দিচ্ছে না।
একটি অবাধ নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই স্বৈর শাসনের অবসান ঘটাতে গত চার বছরের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। জনগণের আন্দোলনের ফলে বারবার এই সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেও সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় বিরোধী দলসমূহের উপর দোষ চাপিয়ে তারিখ স্থগিত ঘোষণা করে নির্বাচন হতে দেয়নি।
তারপর সামরিক সরকার একতরফাভাবে গণভোট ষ্টাইলে একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। অপর দিকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টায় কেউ কেউ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে করে তুলেছিল সংকটাপন্ন।
এমনি একটি সংঘাতময় পরিস্থিতিকে এড়ানোর জন্য গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে আওয়ামী লীগ তথা পনর দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই নির্বাচনকে আমরা সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ৫ দফার পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেট আদায়ের উদ্দেশ্যে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করেছি।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি প্রক্রিয়ারূপে চলমান গণ-আন্দোলনকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জনাই ছিল এই নির্বাচনী সংগ্রাম। গত চার বছরের গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে সামরিক স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের যে তীব্র অনাস্থা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে তাকে এই নির্বাচনী জোয়ারের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সাফল্যে আমরা আরো এগিয়ে নিতে চেয়েছি।
বাংলাদেশের বুক থেকে সামরিক শাসনের চির অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনী সাফল্যকে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্যই ছিল আমাদের এই প্রচেষ্টা।
সামী বন্ধুরা /
আপনারা জানেন, বিগত ৭ই মে’র নির্বাচনে এই সরকার সকল প্রকার রীতিনীতি, আইনকানুন বরখেলাপ করে, সেনাবাহিনীর বিধিবিধান ও শৃঙ্খলা লংঘন করে ব্যাপক সন্ত্রাস, ভোট ডাকাতি ও মিডিয়া ক্যু’র মাধ্যমে জনগণের বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়েছে।
গত সংসদ নির্বাচনে জনগণ আমাদের ভোট দেন। দীর্ঘ এগার বছরের মার্শাল’ ম্যানদের অত্যাচারের হাত থেকে জনগণ মুক্তি চায়। কিন্তু জনগণের সে ইচ্ছাকে বন্দুকের নলের সাহায্যে বুটের তলায় চাপা দেওয়া হয়।
সন্ত্রাস আর ভোট ডাকাতি করেও যখন নির্বাচনের ফলাফল গণপ্রতিরোধের মুখে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছানুসারে করতে পারে নাই তখন হঠাৎ করে ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রেখে “মিডিয়া ক্যু’র” মধ্যদিয়ে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়।
আমাদের বহু জয়ী প্রার্থী স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি এরশাদের ইচ্ছা পূরণের শিকার হয়ে পরাজিত বলে ঘোষিত হয়। আমাদের জোর করে সংসদে বিরোধী দলে ঠেলে দেওয়া হয়। ‘৭০ এর নির্বাচনে পাকিস্তানী সামরিক শাসক ইয়াহিয়া নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি, কিন্তু তারা বাঙ্গালীদের ক্ষমতা গ্রহণ করতে দেয়নি। আর তাদের প্রেতাত্মা এরশাদ চক্র নির্বাচনের ফলাফলকে বানচাল করে জনগণের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখলো।
কিন্তু শত চেষ্টা করেও তারা যখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি তখন তাদের পূর্বসূরী জেনারেলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে, প্রলোভন ও উৎকোচের মাধ্যমে স্বতন্ত্র সদস্য ও কিছু সুবিধাকামী বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদেরকে দলে ভিড়িয়েছে।
যে কায়দার অবৈধ সামরিক শাসনের কুকীর্তিকে হালাল করার উদ্দেশ্যে পঞ্চম সংশোধনী পাশ করা হয়েছিল সেই একই কায়দায় একই উদ্দেশ্যে ৭ম সংশোধনীও পাশ। করা হলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করা হবে না, অবৈধ সামরিক ক্ষমতাবলে কৃত সকল কর্মই সাংবিধানিক মর্যাদা পাবে এই ছিল মূলতঃ পঞ্চম সংশোধনীর সারমর্ম।
গণতন্ত্রের নামে ৫ম সংশোধনী ছিল গণতন্ত্রকে কলংকিত ও সংকুচিত করারই নামান্তর। বহুদলীয় রাজনীতির জন্য ৫ম সংশোধনী করার প্রয়োজন ছিল না। চতুর্থ সংশোধনীর পূর্বের ৭২-এর সংবিধান চালু করলেই তা অব্যাহত থাকতে পারত।
মূলতঃ ৫ম ও ৭ম সংশোধনী হচ্ছে সংবিধানকে সামরিকীকরণ করা। নির্বাচন বিরোধীদের পরোক্ষ সাহায্য আর নির্বাচিত স্বতন্ত্র ও কতিপয় বিরোধী সদস্যের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ৭ম সংশোধনীর নামে সামরিক শাসন উঠিয়ে দেয়ার তথাকথিত বুলি আউড়িয়ে মার্শাল ম্যানদের ক্ষমতা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৭৫ সালে সার্বভৌম সংসদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ৪র্থ সংশোধনীর ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী
ঘোষণা করেন। বাংলার মানুষের ম্যাটে নেয়ার মধ্য দিয়েই জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধুর অঙ্গীকার ছিল চার জাতীয় মৌল নীতির ভিত্তিতে স্বাধীনতার স্বাদ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে দুঃখী মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাবেন। ৪র্থ সংশোধনী ছিল সেই লক্ষ্যে প্রণীত কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য শাসনতন্ত্রের আইনগত বিধানের পদ্ধতির পরিবর্তন।
৪র্থ সংশোধনী কোন প্রকার একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, কোন অবৈধতাকে বৈধকরণ বিল নয়। দেশের সর্বশ্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে একটা যুগান্তকারী কর্মসূচী প্রণয়নের পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যই ৪র্থ সংশোধনীর প্রয়োজন ছিল। প্রকৃত সংবিধান বহির্ভূত কোন অবৈধ কার্যক্রমকে বৈধ করার জন্য সংশোধনী আনা হয়নি। জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যেই ৪র্থ সংশোধনী ছিল প্রয়োজনীয়।
জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের ৫ম ও ৭ম সংশোধনী হচ্ছে সামরিক ক্ষমতার বলে কৃত অবৈধ কার্যক্রমকে বৈধ করার প্রচেষ্টা। এরা বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করে, সংবিধানকে স্থগিত রেখে অর্ডিন্যান্স জারীর মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
ক্ষমতাসীনদের সকল গণবিরোধী, মৌলিক অধিকার হরণকারী অবৈধ কার্যক্রমকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। ‘৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট ক্ষমতা দখল করে মোস্তাক সামরিক শাসন জারী করে।
৭ই নভেম্বর ‘৭৫-এ ক্ষমতা দখল করে সকল সুবিধা ভোগ করেই জেনারেল জিয়া ‘৭৯ এর ৬ই এপ্রিল যে ৫ম সংশোধনী পাশ করেন তার সময়সীমা ছিল ‘৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট থেকে ৯ই এপ্রিল ‘৭৯ পর্যন্ত। মোস্তাক-জিয়ার সকল অবৈধ কার্যক্রমই বৈধ ঘোষণা হয় ৫ম সংশোধনীতে।
৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত চার জাতীয় মূলনীতি, স্বাধীনতার মূল্যবোধ, জাতীয়করণ প্রভৃতি মীমাংসিত বিষয়ের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার পরিবর্তে খুনি ও স্বাধীনতার শত্রুদের পুনর্বাসন সকল বিষয়কেই অন্তর্ভুক্ত করা হয় ৫ম সংশোধনীতে।
একইভাবে ৭ম সংশোধনীও ৮২’র ২৪শে মার্চ থেকে ৮৬’র ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত সকল অবৈধ কার্যক্রমকে বৈধ করে। জিয়া সাহেবের ৫ম সংশোধনী ছিল চার বছরের সামরিক ক্ষমতাবলে কৃত অবৈধ কার্যকালের সময়, একইভাবে এরশাদ সাহেবের ৭ম সংশোধনীর অবৈধ কার্যক্রমের মেয়াদকালও হচ্ছে চার বছর।
১৯৭২ সালের সার্বভৌম সংসদে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান যেদিন গৃহীত হয়, সেইদিনই সংসদ নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেছিলেন, বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়োজনে যদি কখনো দরকার হয়, তবে এই সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে।
সেই অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৭৫-এ ৪র্থ সংশোধনী গৃহীত হয়েছে। কিন্তু অবৈধ কার্যক্রমকে বৈধ করার কোন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক সংবিধানে ছিল না। অথচ অবৈধ ক্ষমতাবলেই সেনা শাসকরা জনগণের ক্ষমতা সেনা ছাউনিতে বন্দী করে রেখেছে।
পরাজিত সৈনিকদের হাতে আমার স্বাধীনতা বন্দী আজ। জনগণের গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার হরণ করে গণতন্ত্রের একটা মিথ্যা লেবাস পরেছে এই বর্ণচোরা সামরিক উচ্চাভিলাষী কতিপয় ব্যক্তি। জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত এই দুষ্ট চক্রকে সরাতে হবে। ঘটাতে হবে স্বৈরাচারী শাসন পদ্ধতির চির অবসান ।
আমার সহযাত্রী সতীর্থ বন্ধুরা /
আমরা সুদীর্ঘকালের সংগ্রাম শেষে রক্ত দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, জীবন দিয়ে হলেও আমাদেরকে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ভিত্তিতে শোষণহীন সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে কোন মূল্যে গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে বদ্ধ পরিকর।
নির্বাচিত সার্বভৌম জাতীয় সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশরূপে আমরা গড়ে তুলতে চাই। মঞ্জু। স্বাধীনতার সুফল শাসনতন্ত্রে সন্নিবেশিত চার রাষ্ট্রীয় মৌল আদর্শ আওয়ামী লীগ যে কোন মূল্যে রক্ষা করবেই।
জনগণের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা বিধান করতে না পারলে স্বাধীনতার স্বাদ জনগণের ঘরে পৌঁছে দেয়া যাবে না। দ্রব্যমূল্যের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সাধারণ মানুষের আয়ের সাথে সামস্য
রেখে। জাতির জনকের হত্যার বিচার ও জাতীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের মাধ্যমে আমরা দেশ থেকে হত্যার রাজনীতির অবসান ঘটাতে চাই, দেশে আমরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে চাই।
সেই লক্ষ্যে কৃষিক্ষেত্রে যুক্তিসংগত ভূমি সংস্কার ও কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের সাথে সাথে দেশের কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের অবস্থার উন্নয়ন, বহুমুখী গ্রাম সমবায়ের ভিত্তিতে ক্ষেত-খামারে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে চাই।
কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস, খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থকরী ফসল পাট, চা, আখ, তামাকসহ উৎপাদিত ফসলের সুসম কটন আমাদের লক্ষ্য। পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে বাংলার কৃষকদের জন্য উদার ও সহজ পদ্ধতিতে কৃষি ঋণদান ও সুদের বোঝা থেকে কৃষকদের আমরা রক্ষা করতে চাই।
বাংলার পল্লী অঞ্চল পর্যন্ত আমরা ব্যাপক শিল্পায়ন প্রসারিত করতে চাই। কুটির শিল্পের প্রসার ও দেশীয় পণ্যের উন্নতি বিধানের সাথে সাথে দেশব্যাপী শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার আমাদের লক্ষ্য।
দেশীয় শিল্প উৎপাদনের মানোন্নয়নের সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণীর জীবন যাত্রার উন্নতি বিধানের লক্ষ্যে আমরা মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে শ্রমের মূল্য প্রদান করতে চাই। শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বৃহৎ ও ভারী শিল্পের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গ্রহণ করতে চাই কার্যকর বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। শ্রমিক শ্রেণীর ন্যায্য দাবী ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার সংরক্ষণ করতে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সমগ্র দেশের জনসাধারণকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার উদ্দেশ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরী ও উচ্চশিক্ষার প্রসার ও গণশিক্ষার জন্য আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাই। নারী শিক্ষার বিশেষ সুযোগ প্রদানের সাথে সাথে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি ও উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নও আমাদের লক্ষ্য।
ডঃ কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়ন করে আমরা গড়ে তুলতে চাই একটি সার্বজনীন গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ।
সমাজের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতি দূর করতে হবে। প্রশাসনকে গড়ে তুলতে হবে দুর্নীতি মুক্ত করে। আমরা প্রশাসনকে জনকল্যাণের লক্ষ্যেই নিয়োজিত রাখতে চাই। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সরকারী কর্মচারী, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সত্যিকার উন্নয়ন আমরা নিশ্চিত করতে চাই।দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি কর্মক্ষম ও সমাজ জীবনে কার্যকর জনশক্তি গড়ে তুলতে চাই আমরা।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ও সুচিকিৎসার মাধ্যমে সমগ্র দেশবাসীর সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা বিধান করতে চাই। আমরা চাই বাংলার গরীব দুঃখী মানুষের চিকিৎসার লক্ষ্যে প্রত্যেক থানায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং দেশের চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের উন্নয়ন সাধন করতে।
অর্থনৈতিকভাবে দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। নারী-পুরুষের সম্পদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমাজ জীবনে নারীর মর্যাদা রক্ষা আমাদের লক্ষ্য।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আমরা সামাজিক অনাচার, নারী নির্যাতন, খুন, রাহাজানির অবসান ঘটাতে চাই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় বিচার সুনিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
আমরা স্থায়ীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সাধন করতে চাই। উপজাতি সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানই আমরা যুক্তিসংগত বলেই মনে করি। এই বাংলার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ সকল সংখ্যালঘু নাগরিকের পূর্ণ নাগরিক অধিকারে আওয়ামী লীগ বিশ্বাসী। সকল শ্রেণী ও পেশার জনগণের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত দাবী দাওয়ার প্রতি রয়েছে আমাদের পূর্ণ সহানুভূতি ও সমর্থন ।
বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ রক্ষায়, সংস্কৃতির বিকাশে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায়, সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ, বেতার ও টেলিভিশনকে গণমুখী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা, প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ সাধনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।
প্রতিবেশী দেশসমূহের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কন্নোয়ন ও বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা স্বাধীন জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী। সাথে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানই আমাদের লক্ষ্য।
আওয়ামী লীগ যে কোন মূল্যে আমাদের জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত না করে সংবিধানে লিপিবদ্ধ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যে পবিত্র দায়িত্ব সেনাবাহিনীর উপর অর্পিত তা রক্ষা করা এবং সেনাবাহিনীকে জনগণের প্রতিপক্ষ দাঁড় না করিয়ে জনগণের আস্থাভাজন সুশৃংখল প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড় করানো এবং তার সত্যিকার উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য।
আপনারা জানেন, আওয়ামী লীগ এ দেশের জনগণেরই সংগঠন। প্রাসাদের অভ্যন্তরে বা সেনা ছাউনিতে এই দলের জন্ম হয়নি। কোন সামরিক শাসকদের পকেট থেকেও বের হয়ে আসেনি। বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিকাশ ঘটেছে দীর্ঘ তিন যুগ ধরে।
কোন ষড়যন্ত্র আমাকে ক্ষমতায় বসিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন দলে পরিণত করবে আমরা তা বিশ্বাস করি না। একমাত্র ব্যাগট ও জনগণের ইচ্ছা ভিন্ন অন্য কিছুই ক্ষমতা দখলের উপায় হিসাবে আমরা বিবেচনা করি না। আজ এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগকে আমরা সংগঠিত করতে চাই।
সমবেত সহযাত্রী, সহকর্মী ভাই-বোনেরা/
মার্শালম্যানদের হাত থেকে এই দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের স্বাধীনতা আমাদের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার আজ সামরিক ছাউনীর তাবুতে বন্দী হয়ে আছে। সেই হারানো অধিকার উদ্ধার করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য ও লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই এদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমি স্বৈরশাসক চক্রের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমি জানি জনতার জয় অবশ্যম্ভাবী। বিজয় সুনিশ্চিত।
সংগ্রামী কাউন্সিলর, ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা /
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, একটি ঐতিহাসিক ভূমিকায়ও মণ্ডিত। একদিকে জাতীয় রাজনীতিতে বিগত প্রায় একযুগের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি অপরদিকে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বিগত দিনের নানা জটিলতা ডিঙ্গিয়ে আজকের এই কাউন্সিল আমাদের দলীয় ও জাতীয় জীবনে নূতন দিগন্ত উন্মোচনের অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসাবে আমি এই প্রথম আপনাদের সাথে দলীয় কাউন্সিলে সমবেত হয়েছি। গত পাঁচ বছরের সমস্যাসংকুল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের আভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করার পর আমি আজ এই কাউন্সিলে আপনাদের সাথে অংশ গ্রহণ করতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি।
সারা বাংলায় আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আমাদের সংগঠন যেমনি শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি আপনাদের সুগভীর আত্মীয়তা আমাকেও পিতৃ-মাতৃ-ভাই-স্বজনহীন এই স্বদেশে শুধু বেঁচে থাকার শক্তিই দেয়নি সংগ্রামের সাথে একাত্ম হওয়ার সাহসও দিয়েছে। আমি সব হারিয়ে আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি।
বঙ্গবন্ধু যেমনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শত্রুর সাথে আপোষ করেননি, শত নির্যাতনের পরও চক্রান্তের হাত থেকে আওয়ামী লীগকে, জাতিকে রক্ষা করেছেন, আমিও আপনাদের সাহায্য ও সহযোগিতায় সেই আদর্শকেই চিরঞ্জীব রাখতে চেয়েছি। এই বাংলায় বঙ্গবন্ধুর পথ ধরে জনগণের মুক্তি সংগ্রামে আমিও এগিয়ে এসেছি, এগিয়ে যাবো। আপনাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় একটি শক্তিশালী সুশৃঙ্খল সংগঠন আমি আজ কামনা করি। বন্ধুগণ, মাটি আর মানুষের সাথে রাজনীতিকে একাত্ম করতে হবে।
সমাজের গভীর থেকে গভীরতর স্তরে পৌঁছুতে হবে। জনগণের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে সততা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। আত্ম সমালোচনা ও নিজের কাজের হিসেব দিতে হবে নিজেকেই। মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করতে হলে মিথ্যাচারের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সেবক হতে হয়।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে, তাঁর প্রত্যাশার সোনার কর্মীরূপে গড়ে উঠা প্রয়োজন। উপদলীয় চেতনা, পদমর্যাদার আভিজাত্য পরিহার না করলে কোন দলই সুষ্ঠু বিকাশ লাভ করতে পারেনা। দলীয় কাজকর্ম যেমন করতে হয় ঠিক তেমনি মেনে চলতে হয় দলের শৃঙ্খলা। জনগণের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন প্রতি গ্রামে-শহরে-মহল্লায় একদল আদর্শ কর্মী বাহিনীর।

সম্মানিত কাউন্সিলর, ডেলিগেট ভাই-বোনেরা/
যে গুরুদায়িত্ব আপনারা আমার উপর অর্পণ করেছিলেন, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসাবে আমি আমার সীমিত শক্তি সামর্থ দিয়ে গত পাঁচ বছর তা পালন করতে সচেষ্ট থেকেছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। দেশ ও জাতির সেবা করার শিক্ষাই আমার জীবন আমাকে শিখিয়েছে।
আপনাদের অর্পিত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি নিজেকে নিয়োজিত করেছি। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দলকে শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।
আওয়ামী লীগের মত এত বিশাল সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আপনাদের সর্বাত্মক ও সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছি বলেই গত পাঁচ বছর দলকে আমি পরিচালনা করতে পেরেছি। আজ নির্দ্বিধায় বলতে পারি দলকে সু-সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ও আন্দোলন এগিয়ে নিতে যতটুকু সফলতা আমি অর্জন করেছি সেটা আপনাদেরই সাহায্য সহযোগিতার ফসল।
এ কাজে যদি কোন ব্যর্থতা থেকে থাকে, সেটুকু আমার অক্ষমতার কারণেই হয়েছে। আপনারা এই সংগঠনের সাথে দীর্ঘ দিন থেকেই জড়িত আছেন। আপনাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসাবে আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে এই দলকে গড়ে তুলেছেন।
আপনারা এবং আপনাদের পরিবারবর্গ বহু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আপনাদের আত্মত্যাগের ফসলই হচ্ছে বাংলার স্বাধীনতা ও বাংলার জনগণের এই সুবিশাল সুসংহত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আমি আপনাদের অপরিসীম শ্রমে গড়া এই আওয়ামী লীগের দায়িত্ব পালন করতে এসে কর্মক্ষেত্রে যদি কোন ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত রেখে যাই তবে তাও আপনারা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন।
আমি আমার বাবা, মা, ভাই, স্বজন সব হারিয়ে এই আওয়ামী লীগকেই আমার পরিবার হিসাবে পেয়েছি। জাতির জনকের কন্যা হিসাবে আমার প্রতি আপনাদের সম্মান, স্নেহ, ভালবাসাই আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ।
আপনাদের এই গভীর স্নেহ-ভালবাসাই আমাকে সব হারানোর বেদনা সহ্য করার শক্তি যুগিয়েছে। কর্ম ক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকায় এগিয়ে যাবার প্রেরণা দিয়েছে। দলীয় নেতৃত্বের পদমর্যাদা বা বড় কোন অবস্থান আমার কাম্য নয়। আপনাদের স্নেহ-ভালবাসাই আমার বড় পাওয়া।
আমার সংগ্রামী সাথীরা/
যেখানে যে অবস্থার মধ্যেই আমি থাকি না কেন, আমার বাবা যে জাতির জন্য সংগ্রাম করেছেন, সারা জীবন ফাসীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন, আমি জীবন দিয়ে হলেও তাদের সেবা করে যাব। আমি সব হারিয়ে আপনাদের স্নেহের ছায়ায় ফিরে এসেছি।
বঙ্গবন্ধু যে ভাবে এ দেশের মানুষের সেবা করেছেন, সেভাবে বাংলার দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমিও যেখানে যেভাবে থাকি বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসাবে তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আপনাদের সাথে এগিয়ে যাব, এই আমার অঙ্গিকার।
আপনাদের সকলের সর্বাঙ্গিন মঙ্গল হোক। আওয়ামী লীগ আপনাদের গৌরবময় সেবায় আরো সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে উঠুক, এই প্রত্যাশায় আপনাদেরকে পুনর্বার সালাম ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
শেখ হাসিনা
