সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ

সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ

 

সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ

 

সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। পৃথিবীর খুব বেশি দেশ মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে জন্মলাভের গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র ও তরুণসহ আপামর জনগণের অংশগ্রণের মাধ্যমে এ যুদ্ধ সাফল্য লাভ করে। যদিও প্রাথমিকভাবে পূর্ব প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক তৎপরতা ছাড়াই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ প্রতিরোধ করে ।

প্রাথমিক এই ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং ক্ষুদ্র খন্ড প্রতিরোধই ক্রমান্বয়ে একটি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের আকার ও রূপ নেয়। কোথাও এ প্রতিরোধ হয়েছে ছাত্র, তরুণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কৃষক ও শ্রমিকের মাধ্যমে। বিদ্রোহী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এতে যোগ দিয়ে প্রতিরোধকে শক্তিশালী করেন। আবার কোথাও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরোধে জনতা অংশ নেয়। তবে সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরোধ পরবর্তীকালে পরিকল্পিত যুদ্ধের ভিত রচনা করে ।

গণপ্রতিরোধের পরিপ্রেক্ষিত বা প্রস্তুতি

স্বায়ত্তশাসন দাবি একদফা দাবি স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তর:

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক শোষণের ফলে বঞ্চিত বাঙালি জাতির প্রত্যেক শ্রেণীর লোকই তাদের প্রতি বিক্ষুদ্ধ ছিল। ১৯৫৪ ও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিমা শোষকদের বিরুদ্ধে গণ রায় দিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় বাঙালির রায়কে নস্যাৎ করা হয়।

অন্যদিকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সত্ত্বেও তাকে সরকার গঠন করতে দেয়া হয়নি। ষাটের দশকে বিশেষ করে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণার পর থেকে যে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সূচনা হয় তা ১৯৭১ সালে এসে ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণতি লাভ করে।

আওয়ামী লীগ ও রাজনীতিকরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও জনগণের বড় অংশ বিশেষ করে ছাত্র ও তরুণ সমাজ ছিল জঙ্গী এবং সশস্ত্র প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতার পক্ষপাতি। মূলত ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নিউক্লিয়াস ষাটের দশকের আন্দোলনে ব্যাপক গতি সঞ্চার করে। এরাই ‘জয়বাংলা শে-গোনা, ১৯৭০ সালে জাতীয় পতাকা তৈরি করে বাঙালিদের একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদা প্রদানের প্রস্তুতি নেয়।

বস্তুত স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে সুনির্দিষ্ট ধারায় প্রবাহিত করার প্রয়োজনে নিউক্লিয়াস জন্ম। ক্রমান্বয়ে এটি বিকশিত হয় এবং চূড়ান্তপর্বে মুক্তিযুদ্ধকালে ‘বি এল এফ’ নাম নিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা, অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা:

রাজনীতিবিদরা আশান্বিত ছিলেন নির্বাচনের রায় মেনে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এবং তাদের মতে, কোনরূপ বিশৃংখলা সৃষ্টি শাসক গোষ্ঠীকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার একটি অজুহাত সৃষ্টি করবে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তাদের এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল।

বাঙালি এই প্রথম স্বশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে এমনি স্বপ্নে জাতি উদ্বেলিত থাকলেও ১ মার্চ আকস্মিক প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। আওয়ামী লীগ তাৎক্ষণিক এর প্রতিবাদ জানায় এবং ঐদিন থেকেই শুরু হয় জনগণের প্রতিরোধের প্রস্তুতি। ঢাকার রাজপথ মিছিলে-শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ কয়েক শ’ খন্ড মিছিল সহকারে রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।

রাজপথে, গলিতে মিছিলকারী এসব মানুষের হাতে ছিল বাঁশের লাঠি, গজারি গাছের ডাল, কাঠের টুকরো ও লোহার রড। অধিবেশন স্থগিত করা সংক্রান্ত ঘোষণার সঙ্গে সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, কলকারখানা, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিনেমা হল ও সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গোটা শহর স্বত:স্ফূর্ত মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়।

এসময় ঢাকা স্টেডিয়ামে বিসিসিপি ও আন্তর্জাতিক একাদশের মধ্যে অনুষ্ঠানরত ক্রিকেট ম্যাচ ভণ্ডুল হয়ে যায়। দর্শকরা স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলগুলো আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবের কাছে থেকে নির্দেশ লাভের আশায় মতিঝিলস্থ হোটেল পূর্বাণীর দিকে অগ্রসর হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠক চলছিল।

এই বৈঠকে পরের দিন ঢাকা শহরে এবং ৩রা মার্চ সারা দেশে হরতাল ও ৭ মার্চ রেসকোর্সে জনসভার ঘোষণা দেয়া হয়। শেখ মুজিব উপস্থিত জনতা ও দেশবাসীকে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা গণতান্ত্রিক দল এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবো। পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে লোক যোগ দেয় এবং সেটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

ছাত্রলীগ পরের দিন কর্মসূচি ঘোষণা দেয়। জনতার বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সত্ত্বেও অগণতান্ত্রিকভাবে ১ মার্চ রাতেই লে. জেনারেল ইয়াকুব খানকে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। পরের দিন ২ মার্চ আওয়ামী লীগের আহ্বানে ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। দল, মত, পেশা ভুলে গিয়ে শেখ মুজিবের ডাকে সমগ্র ঢাকা এক ও অভিন্ন হয়ে গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে।

সরকারের ঘোষিত কারফিউ ভঙ্গ করে গভীর রাত পর্যন্ত মিছিল, বিক্ষোভ চলে। পুলিশের গুলিতে অনেকে বুলেট বিদ্ধ হয়। খন্ড খন্ড সংঘর্ষ হয় বিভিন্ন জায়গায়। শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে ২ টা পর্যন্ত হরতাল পালনের আহ্বান জানান। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সভা শেষে একটি নতুন পতাকা উত্তোলন করে এবং সেই পতাকার মর্যাদা রক্ষার শপথ নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।

এটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে কোন জায়গায় প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন। ৬ মার্চ একটানা সর্বাত্বক হরতাল ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রংপুর সহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ আন্দোলন চলে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলার বিক্ষুদ্ধ নারী সমাজ বাঁশের লাঠি, লোহার রড ও কালো পতাকা নিয়ে সমাবেশ ও মিছিল বের করে।

সাত মার্চে শেখ মুজিবের ঘোষণা ও সশস্ত্র প্রস্তুতির নির্দেশ:

৭ মার্চ রেসকোর্সে ময়দানে দশ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় বাঙালির প্রতি পাকিস্তানি শাসক ও পাকবাহিনীর অত্যাচার, বৈষম্য তুলে ধরেন, নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি ও ১ মার্চ থেকে পাকবাহিনীর নিরীহ বাঙালির ওপর গুলিবর্ষণ পরিস্থিতি তুলে ধরে ক্ষমতা হস্তান্তর নতুবা স্বাধীনতা ডাক দেন।

তিনি তাঁর বক্তৃতার শেষ অংশে বলেন, “প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থেকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।”

সাত মার্চ পরবর্তী পরিস্থিতি এবং স্বাধীনতার প্রস্তুতি শুরু:

শেখ মুজিবের ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ঘোষণার প্রেক্ষিতে সর্বাত্মক হরতাল পালনের পাশাপাশি সর্বত্র কাল পতাকা উত্তোলন, মিছিল, সমাবেশ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেয়।

৭ মার্চ থেকেই আওয়ামী লীগের নির্দেশে দেশ চলতে থাকে। ঢাকা সফর শেষে করাচিতে গণঐক্য আন্দোলনের নেতা এয়ার মার্শাল (অবঃ) আসগর খান বলেন, “শেখ মুজিব কার্যত ঢাকার সরকার, সেখানে সব সরকারি কর্মচারী ও সচিবরা তাঁর নির্দেশ পালন করছে। ঢাকায় কেবল সামরিক সদর দপ্তরে পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে।” ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করে।

২০ মার্চ কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) কুচকাওয়াজে ৩০০ ছাত্র-ছাত্রী রাইফেলের কলাকৌশল প্রদর্শন করে। ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবসের’ বদলে বাংলাদেশ দিবস পালিত করে। প্রেসিডেন্ট ভবন ও সেনা সদর ছাড়া কোথাও পাকিস্তানি পতাকা ওড়েনি, ওড়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা।

২৪ মার্চ এক বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানি বাহিনীকে সম্ভাব্য প্রতিরোধ করতে সশস্ত্র গণবিপ্লবকে আরো জোরদার করার আহ্বান জানান । অন্যদিকে ঢাকার বাইরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতায় ঘোষিত ঘরে ঘরে দূর্গ গড়া ও সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বানে সারা দিয়ে বিভিন্ন জেলা, থানা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রস্তুতি চলতে থাকে। গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ, শুরু হয় সামরিক প্রশিক্ষণ।

সংগ্রাম পরিষদ, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ (২৫ মার্চ পর্যন্ত)

ঢাকা বিভাগ: ঢাকার বাইরে জয়দেবপুরে প্রথম সশস্ত্র গণপ্রতিরোধের সূচনা হয়। ৭ মার্চের পর এখানে মো. হাবিবুল্লাহ, আ.ক.ম. মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে জনতার সশস্ত্র প্রতিরোধ শুধু গাজীপুরে নয় সারা দেশের সার্বিক স্বাধীনতার সংগ্রামে তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫ মার্চ পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের আগেই জয়দেবপুরবাসী গর্জে ওঠে।

ঐদিন বিগ্রেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল ঢাকা থেকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের অস্ত্র জমা নেওয়ার জন্য এলে পথে হাজার হাজার লোক দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড দেয়। জয়দেবপুর রেলক্রসিং-এর কাছে লাঠি, তীর, বন্দুক ছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগত কয়েকটি বন্দুক নিয়ে উপস্থিত হয়।

সেদিন জনতার অনুরোধে ৫ জন বাঙালী সৈনিক পাঞ্জাবি সৈনিকদের ওপর প্রথম গুলি ছুঁড়ে। পাল্টা গুলিতে নিহত হয় জয়দেবপুর বাজারে মনুমিয়া নামের এক দর্জি ও নিয়ামত নামে এক কিশোর আহত হয়। কানু মিয়া নামে আর একজন নিহত হয়। মারমুখী জনতার প্রতিরোধ মোকাবেলা করে সে যাত্রা পাক সেনারা ঢাকা ফিরে যায়। কিন্তু জয়দেবপুরের প্রতিরোধের শিক্ষা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন জায়গায় শ্লোগান ওঠে ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ এই ঘটনার পর জয়দেবপুরে অবস্থিত বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের সাথে আওয়ামী লীগের নেতাদের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে তাই মেজর শফিউল্লাহর নেতৃত্বে বাঙালি সৈনিকরা জয়দেবপুর থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

১৯ মার্চের ঘটনার পর ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে জয়দেবপুর বনে গোপনে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সে যাত্রা ২০/২৫ জন ছাত্র এতে অংশ নেয়।

 

চট্টগ্রাম বিভাগ: চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রামে ৭ মার্চের বক্তৃতার পর বেশ প্রস্তুতি চলে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, কাকলী, পান্নাপাড়া, সিটি কলেজ, এমইএস কলেজ, হালিশহর, জামাল লেন রোড, আগ্রাবাদ কলোনীতে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আন্দরকিল্লার বন্দুকের দোকান, চট্টগ্রাম কলেজের ইউওটিটি ভবন, রাইফেল ক্লাবের অস্ত্র লুট করে সংগ্রহ করা হয়। এম. আর. সিদ্দিকী, জহুর আহম্মদ চৌধুরীকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে জেলা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়।

এছাড়া গঠিত হয় আবু মোহাম্মদ হাশেমের সভাপতিত্বে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এভাবে ২৫ মার্চের আগেই সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ও ছাত্রদের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ফেণীতে খাজা আহমেদের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সীমিত আকারে প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

রাজশাহী বিভাগ: রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী ও রংপুরে প্রথম থেকেই প্রস্তুতি জোরদার ছিল। রংপুরে ৩ মার্চ দরদী সিনেমা হলের সামনে উর্দুতে লেখা একটি সাইনবোর্ড নামাতে গেলে শম্ভু সমাদার নামে এক ব্যক্তি জনৈক বিহারির গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ মকবুল ১ মাস পর মারা যায়। তাঁরা রংপুরে প্রতিরোধের প্রথম শহীদ। ২৫ মার্চ কয়েকটি হেলিকপ্টারে করে রংপুরে বিপুল সংখ্যক পাক সৈনিক আসে।

ঔ রাতেই পাকবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয়। নাটোরে ১৪ মার্চ জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলে দেশের নতুন পতাকা তোলা হয়। ২৫ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। নিচা বাজার চাখানার দোতলায় কন্ট্রোল রুম প্রতিষ্ঠা করা হয়।

গণপ্রতিরোধের প্রকৃতি ও বিস্তার

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কিংবা এর অব্যবহিত পর বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা, নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ চালালে শুরু হয় সর্বাত্মক প্রতিরোধ। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন মাত্রা যতো বেড়ে যায়, প্রতিরোধ উত্তাপও ততো বাড়তে থাকে। প্রাথমিকভাবে বাঙালি লাঠিসোটা, স্থানীয় অস্ত্র এবং পাকবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধারকৃত থানা লুট ও ব্যক্তিগত অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ রচনা করে।

২৮ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমস-এ সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গ লিখেছেন, লাঠি-বর্শা ও সহস্তে নির্মিত রাইফেল নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের লোকেরা বিমান, ট্যাংক ও ভারি কামানে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধ নানা জায়গায় নানারূপে হয় এবং এর নেতৃত্বে ছিল নানা শ্রেণীর ব্যক্তি। প্রতিরোধের এই পর্ব চলে মে মাস পর্যন্ত।

ঢাকা বিভাগ: ঢাকা বিভাগের ঢাকা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান লক্ষবস্তু। এখানে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে ও সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে পাকবাহিনী নিরস্ত্র জনতা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর হেডকোয়ার্টারে বাঙালিদের হত্যা করে। এসব জায়গায় পাকবাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ফার্মগেটের কাছে ২৫ মার্চ পাকবাহিনী প্রতিরোধকারী বাঙালি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ট্যাংক, মর্টার ব্যবহার করে।

২৯ মার্চ তেজগাঁ রেল স্টেশনের কাছে সামনাসামনি লড়াইয়ে ১২৬ জন পাক সেনা হতাহত হয় এবং তাদের তিনটি গাড়ি ধ্বংস হয়। ৩১ মার্চ আসাদ গেটের কাছে প্রতিরোধ যুদ্ধে ৫ জন পাক সেনা নিহত হয়। ঢাকার এসব প্রতিরোধ ক্রমান্বয়ে বিভাগের অন্যত্র ছড়িয়ে গড়ে। জয়দেবপুরে ১৯ মার্চ থেকে যে প্রতিরোধের সূচনা হয় তা ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানকার দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা এতে অংশ নেন।

২৬ মার্চের মধ্যেই এখানে অবস্থানরত পাঞ্জাবি সৈনিকদের বন্দি করা হয়। ২৯ মার্চ পাকবাহিনী বিমান থেকে বোমা মেরে জয়দেবপুরের দিকে অগ্রসর হয়। জনতার প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায় এবং ঐদিন পাকবাহিনী জয়দেবপুর দখল করে নেয়।

চট্টগ্রাম বিভাগ: ২৬-২৯ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। বেতারকেন্দ্র স্থাপন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ পর্ব এসময় সম্পন্ন হয়। মার্চের প্রথম থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। ২৭ মার্চ বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসকে কেন্দ্র করে জনতা, শ্রমিকদের সঙ্গে পাক হানাদারদের সংঘর্ষ হয়। এরপর ইপিআর ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সহ বাঙালি পুলিশের সঙ্গে বহু সংঘর্ষ হয়।

তবে অস্ত্র, যানবাহন ও নেতৃত্বের অভাবে ২৯ মার্চের পর প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। এপ্রিলের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম শহর পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। যদিও দখলকালেও তারা মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এপ্রিলের প্রথম থেকেই মৌলভী সৈয়দ আহম্মেদের নেতৃত্ব পাহাড়তলী, সরাইপাড়া, ট্যাংক রোডসহ বিভিন্ন স্থানে চালানো হয় বিক্ষিপ্ত গেরিলা অপারেশন।

শহর সংলগ্ন গ্রামগুলো গেরিলাদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। মে মাসের মাঝামাঝি শহরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা চলে আসেন এবং বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধে অংশ নেন ।

রাজশাহী বিভাগ: ২৫ মার্চ থেকেই রাজশাহী শহরে পাকবাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। ৭ মার্চের বক্তৃতার পূর্ব থেকে ছাত্রলীগ ও সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় প্রশিক্ষণ নেয়। রাজশাহী কলেজ ল্যাবরেটরী লুট করে বোমা তৈরির রসদ সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া পুলিশ লাইনের পালিয়ে আসা সদস্যরা কিছু অস্ত্র নিয়ে আসে। ২৮ মার্চ পুলিশ-জনতার সম্মিলিত বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যদিও পিছু হটতে বাধ্য হয়।

৩ এপ্রিল পুনরায় মুক্তিবাহিনী রাজশাহী মুক্ত করে এবং ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। নাটোরে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ছিল শক্তিশালী। ২৭ মার্চ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পুলিশ, আনসার সহ সর্বস্তরের জনগণের এক সমাবেশ মতিন পার্কে অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাকবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

খুলনা বিভাগ: খুলনা বিভাগের যশোরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী ছিল। ২৬ মার্চ পাকবাহিনী যশোরে প্রবেশ করলেও প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। মুক্তিবাহিনীর সব দল সম্মিলিতভাবে ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাস ঘেরাও করে। এছাড়া একটি দল যাদবপুরে হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। সেচ্ছাসেবকরা রাতারাতি জেলার রেললাইন উপড়ে ফেলে।

১ এপ্রিল স্বেচ্ছাসেবকরা এশিয়ান হাইওয়ে বরাবর সবকটি পুল ও রাস্তার ক্ষতিসাধন করে। কিন্তু ৪ এপ্রিল পাকবাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং ৬ এপ্রিলের মধ্যে শহর তাদের দখলে চলে যায়। যদিও শহরতলীর বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে ৭ এপ্রিল বেনাপোল সড়ক, ১৪ এপ্রিল কাগজপুকুরিয়ায় ইপিআর ও জনতার সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে পাকবাহিনীর সংঘর্ষ হয়।

কুষ্টিয়ায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর প্রথম সংঘর্ষ হয় ২৭ এপ্রিল। ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত হয়। এরপর ১৬ এপ্রিল পাকবাহিনী কুষ্টিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মে মাসে কয়েকটি যুদ্ধ হয় পাকবাহিনীর সঙ্গে। ২৬ মার্চের মধ্যে চুয়াডাঙ্গায় মুজাহিদ, পুলিশ ও বাঙালি সৈন্য ও তরুণ যুবকদের নিয়ে মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে। ২৭ মার্চ রেল লাইন তুলে ফেলা হয়।

পাশাপাশি ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সড়ক ও মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কপথে অবরোধ সৃষ্টি করে। এই বাহিনীও কুষ্টিয়ার বাহিনীসহ মোট ৭০০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ৪০০ মুজাহিদ ৩০ মার্চ কুষ্টিয়া আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ২০০ জন পাক সেনা নিহত হয়। ৩১ মার্চ দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনে কুষ্টিয়া প্রথম শত্রুমুক্ত এলাকায় পরিণত হয়।

৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গার ওপর পাকবাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়। যদিও ১৫ এপ্রিলের আগে তারা চুয়াডাঙ্গা দখল করতে পারে নি। ১৬ এপ্রিল পাকবাহিনী চুয়াডাঙ্গা প্রবেশ করে।

সারসংক্ষেপ

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার বাঙালিরা শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ এবং পরবর্তী নির্দেশানুযায়ী হাতের কাছে যা ছিল তা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবেলা করে। এসময় অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বাঙালি ইপিআর, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং ছাত্র-জনতা। সাধারণ মানুষ তাদের রসদ যুগিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, পথ দেখিয়ে সাহায্য করে, কেউ কেউ সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়।

এভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিরোধ যুদ্ধ এগিয়ে যায়। প্রতিরোধের এই লড়াই চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত। প্রথম দিকে তা কোথাও ছিল অপরিকল্পিত, কোথাও পরিকল্পিত। মে মাসে পরিকল্পিত ও সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ শুরু হয়। পর্যুদস্ত হতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী। সংগ্রামী বাঙালি জাতির জয় হয়।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ”, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, বাংলাদেশের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন, ঢাকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৮৬।

২। মাহমুদ হাসান, দিনপঞ্জি : একাত্তর, ঢাকা, পাইওনিয়ার, ১৯৯১।

৩। আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন, মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, ১ম খন্ড, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৩।

৪। আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন, মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, ২য় খন্ড, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৯।

৫। আতিউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৭।

 

সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের বক্তৃতার পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি সংক্ষেপে লিখুন।

২। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের সশস্ত্র প্রতিরোধ লিখুন।

৩। ২৬ মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগের যুদ্ধ সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা দিন ।

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র গণপ্রতিরোধের পরিপ্রেক্ষিত ও প্রস্তুতি পর্যালোচনা করুন ।

২। মুক্তিযুদ্ধকালে ৪টি প্রশাসনিক বিভাগের গণপ্রতিরোধের প্রকৃতি ও বিস্তার বর্ণনা করুন ।

Leave a Comment