আজকে আমদের আলোচনার বিষয় সাংস্কৃতিক নিবর্তন ও প্রতিক্রিয়া
সাংস্কৃতিক নিবর্তন ও প্রতিক্রিয়া

সাংস্কৃতিক নিবর্তন ও প্রতিক্রিয়া
১৯৪৭ সালে বৃটিশ-ভারত বিভক্তির মাধ্যমে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ববাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এ দু’অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। পূর্ববাংলার অধিবাসীরা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট লোকসংখ্যার প্রায় শতকরা ৫৫ শতাংশ এবং এদের ভাষা ছিল বাংলা এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল হাজার বছরের পুরনো।
অপরদিকে পাকিস্তানের বাকি ৫৫ শতাংশ লোকের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল বিভিন্ন ধরনের এবং এদের মাত্র ৭.২% শতাংশ লোকের ভাষা ছিল উর্দু। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর ক্ষমতাসীন সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে মাত্র ৭ শতাংশের উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার এবং বাঙালির ওপর তা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হয়।
সাথে সাথে হাজার বছরের পুরনো বাঙালি জাতির সংস্কৃতি মুছে ফেলার মাধ্যমে বাঙালিদের পাকিস্তানিকরণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এই প্রক্রিয়াই বাঙালির ওপর সাংস্কৃতিক নিবর্তন নামে খ্যাত ।
সাংস্কৃতিক নিবর্তনের কারণ
পাকিস্তান সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষায় রূপদান এবং বর্ণমালা ও সংস্কৃতির সংস্কারের পেছনে কতগুলো ভিত্তিহীন যুক্তি উত্থাপন করেছিল। যথা—
ঐতিহাসিক কারণ:
বাংলা ভাষার ইসলামীরূপ তথা পাকিস্তানি রূপ দানের জন্য দোহাই দেয়া হলো ইতিহাসের। বলা হয়েছিল যে, অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা এবং সাহিত্যও পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন- মধ্যযুগে ইসলামী রূপ এবং ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজি ভাষার উৎকর্ষ হয়েছে। ঐতিহ্য অনুসারেই বর্তমানে বাংলা ভাষার পাকিস্তানি রূপ দেওয়া আবশ্যক।
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য গঠন:
১৯৪৭ সালে আরবি হরফে বাংলা লেখার যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে পাকিস্তানের ৯০ শতাংশ মানুষ আরবি বুঝে। তাই আরবি হরফে বাংলা চালু হলে মানুষ পরস্পরকে বুঝতে পারবে এবং এতে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে উঠবে।
বাংলা ভাষাকে পবিত্রকরণ:
১৯৪৯ সালে বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, বাংলা বর্ণমালায় কতিপয় সংস্কৃত বর্ণ রয়েছে সেগুলো হিন্দুরা ব্যবহার করে। তাই বাংলাকে সংস্কৃতমুক্ত তথা পবিত্র করার লক্ষে এ ভাষার বর্ণমালা সংস্করণের আবশ্যিকতা রয়েছে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রে সার্বজনীন সহজ ভাষার প্রবর্তন:
পূর্ববর্তী পদক্ষেপ ব্যর্থ হলে আইয়ুব খান সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে একটি সহজ ও সার্বজনীন ভাষা সৃষ্টির লক্ষে রোমান হরফে বাংলা ও উর্দু ভাষা প্রবর্তনের পদক্ষেপে নেয়।
বাংলার বা পাকিস্তানের সংস্কৃতিকে হিন্দুমুক্ত করণ:
সরকার ১৯৬০-এর দশকে রবীন্দ্র সঙ্গীত এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর পেছনে যুক্তি দেখানো হয় যে, এগুলো হিন্দু সংস্কৃতিরই অংশ। আর পাকিস্তান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রে এসব অনুষ্ঠান ও সঙ্গীত অনাকাঙ্ক্ষিত।
বাঙালি জাতীয়তাবাদকে স্তব্ধ করা:
এ বিষয়টি পাকিস্তান সরকারি মহলের মুখ দিয়ে উদ্ধৃত না হলেও সরকারের এক হীন ষড়যন্ত্র ছিল বাংলা ভাষা সংস্কার ও উর্দু চালুর মাধ্যমে গোটা বাঙালি জাতিকে মুখ করে রাখা এবং বাঙালির জাতীয়তাবাদকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মধ্যদিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় ও সুদীর্ঘ করা।
এসব কারণে ও উদ্দেশে পাকিস্তান সরকার ধাপে ধাপে বাঙালি জাতির ওপর সাংস্কৃতিক নির্যাতন চালাতে থাকে। অবশ্য বাঙালি জাতি সরকারের হীন ষড়যন্ত্রের নিকট কখনো মাথা নত করেনি। পূর্ববাংলায় সাংস্কৃতিক নিবর্তনের বিরুদ্ধে তারা প্রথম প্রতিবাদ এবং পরে জঙ্গী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ।
সাংস্কৃতিক নিবর্তনের প্রক্রিয়া
বাংলার পরিবর্তে উর্দু ভাষার প্রবর্তন:
পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রথম নির্যাতন শুরু হয় ভাষা পরিবর্তনের মাধ্যমে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন চূড়ান্ত হলে জনমনে প্রশ্ন উঠে নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কি হবে। ১৯৪৭ সালে যারা নতুন রাষ্ট্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো তাদের অধিকাংশের ভাষা ছিল উর্দু। অথচ এরা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭ শতাংশ। অপরদিকে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশের (পূর্ববাংলার) ভাষা ও সাহিত্য ছিল বাংলা।
তাই জনসংখ্যানুপাতে বাংলা হতে পারতো নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু শাসক মহল বাংলাকে হিন্দু ভাষা বলে আখ্যা দেয় এবং পাকিস্তান ইসলামি রাষ্ট্রের পবিত্রতা রক্ষার্থে উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির মতামত উপেক্ষা করে তাদের ওপরে এ ভাষা নির্বিচারে চাপিয়ে দেয়।
দেশ বিভাগের পরপরই পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিত্য ব্যবহার্য খাম, ডাকটিকিট, রেলগাড়ির টিকিট, বিভিন্ন ধরনের ফরম প্রভৃতিতে ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে প্রথমবারের মত উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ গৃহীত হয়। এর মধ্যদিয়েই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত শুরু হয়।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয় এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে আসেন।
২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ববাংলা সফরে আসেন এবং তিনিও পূর্বের ন্যায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন।
শাসক মহলের এরূপ বাংলা বিরোধী মনোভাবের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলা দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠলে সরকার পুলিশ বাহিনী দ্বারা কঠোর হস্তে আন্দোলন দমন করার জন্য ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন করার সময় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে শহীদ হন।
সরকার ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে পূর্ববাংলায় দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিরুদ্ধে শাসক মহলের অপচেষ্টা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে ।
ভাষাগত সংস্কারের মাধ্যমে নির্যাতন:
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি পশ্চিমা শাসকচক্র বাংলা বর্ণমালাকে সংস্কার এবং বিদেশি ভাষায় বাংলা ভাষার রূপান্তর করার ব্যর্থ চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৪৭ সালে। এ বছর আরবি হরফে বাংলা লেখার পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং বয়স্ক ছাত্রদের বিনামূল্যে আরবি হরফে লেখা বই পড়ানো শুরু হয়।
১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে বাংলা ভাষা সংস্কারের জন্য প্রাদেশিক সরকার একটি ভাষা-কমিটি গঠন করে। দেড় বছর পর ভাষা কমিটি বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঋ, ৯, ঐ, ঙ, ঞ, ম, য, ঢ়, ক্ষ, ৎ, ংঃ বর্ণ বাদ দিয়ে অ্যা বর্ণ যুক্ত করার পরামর্শ প্রদান করে। উল্লেখ্য, বর্ণগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো এসব বর্ণ সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। যেহেতু সংস্কৃত হিন্দুদের ভাষা, সেহেতু এসব বর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে পাকিনের জন্য একটিমাত্র ভাষা উদ্ভাবনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। তার পরিকল্পনা ছিল বাংলা ও উর্দুকে সমন্বিত করা ও সংশোধিত রোমান হরফে লেখা। এ উদ্দেশ্যে ১৯৫৯ সালে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের প্রস্তাব ছিল দু’টি :
(১) যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নক বা রোমান হরফের উদ্ভাবন ও বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের আর্থিক আনুকূল্য দেয়া।
(২) মুদ্রণযোগ্য আদর্শ বর্ণমালা নির্ণয় করা, বাংলা বর্ণমালার সংস্কার করা এবং বাংলা ও উর্দুর উপযোগী রোমান হরফের উদ্ভাবন করার জন্য ভাষাবিদদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করায়। সমসাময়িককালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা একাডেমীতে সদ্য পরিচালক পদে যোগ দিয়ে সৈয়দ আলী আহসান একটি সেমিনারের আয়োজন করেন। উক্ত সেমিনারে উর্দু ও বাংলার সাধারণ শব্দগুলো খুঁজে জনপ্রিয় করার জন্য আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়া বাংলা ভাষা উর্দু, ফারসি ও আরবি অভিধান এবং উর্দু ভাষার সংস্কৃত, পালি ও বাংলা শব্দের অভিধান তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়। আলী আহসানের উদ্যোগে ও সভাপতিত্বে একটি ভাষা সংস্কার কমিটিও গঠিত হয় এবং কমিটি বাংলা বর্ণমালা থেকে ঙণ, ঋ, ৯, ৎ, ঞ, ৪, ষ, ঈ, ী, ঊ, বর্জন করা সহ অনেক সুদৃঢ়প্রসারী প্রস্তাব দেয়।
শিক্ষা সংকোচন নীতি:
আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব এস.এম. শরীফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ১৯৬০ সালে কমিশন রিপোর্ট পেশ করে এবং রিপোর্টে পূর্ববাংলার রাজনীতিতে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণের তথ্য প্রদান করে। এর ভিত্তিতে আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে পূর্ববাংলায় শিক্ষা সংকোচন নীতি অনুসরণ করে।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, প্রতিটি স্কুলের ৬০ শতাংশ অর্থ সংগৃহীত হবে ছাত্র বেতন থেকে এবং ২০ শতাংশ অর্থ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সরকার একই নীতি অনুসরণ করে। স্নাতক পর্যায়ে পাস কোর্স ও অনার্স কোর্সের সময়গত পার্থক্য বিলোপ করা হয়। সরকারের এসব সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ পূর্ববাংলায় শিক্ষা বিস্তারকে স্থবির করে রাখা।
কিন্তু পূর্ববাংলার ছাত্ররা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে সরকার সমগ্র পূর্ববাংলায় ৭৪টি কলেজ, ১৪০০টি উচ্চ বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং ছাত্রদের গ্রেফতার করে জেলে নিক্ষেপ করে।
প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি:
আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালনের অপরাধে সরকার ১৯৬৬ সালে ইত্তেফাক সহ কতিপয় প্রগতিশীল পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে ইয়াহিয়া খানের চক্রান্তে বাংলা ভাষায় লিখিত কতগুলো পুস্তক বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং এগুলোর প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এছাড়া সরকার বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র, নাটক প্রভৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে বাঙালির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নগ্ন আঘাত হেনেছিল ।
রবীন্দ্র বিদ্বেষী তৎপরতা:
বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে রবীন্দ্র রচনাবলী, গান, নাটক প্রভৃতির অবদান অনস্বীকার্য। বাংলায় অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলার পেছনে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে। পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক সরকার তাই রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রতি রুষ্টভাব পোষণ করে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথকে বেতার ও টেলিভিশনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
যুদ্ধের পর গণমানুষের চাপে সীমিত আকারে প্রচার অনুমোদিত হয়। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়ে পুনরায় বিতর্ক ওঠে। এ বছর ২০ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের নেতা আবদুস সবুর খান তাঁর বক্তৃতায় রবীন্দ্র সঙ্গীতকে পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অশুভ প্রয়াস বলে আখ্যা দেয়। গণপরিষদের ২২ জন সদস্য তা সমর্থন করেন।
তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার কমিয়ে আনার ঘোষণা দেন এবং ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার ইঙ্গিত প্রদর্শন দেন। বস্তুতপক্ষে, রবীন্দ্র সঙ্গীত ও রবীন্দ্র রচনাবলীর ওপর সরকারের এরূপ নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যদিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে আঘাত করেছিল।
বাংলা উৎসব নিষিদ্ধকরণ:
১লা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির একটি অন্যতম অংশ। সম্রাট আকবর সর্বপ্রথম ১ বৈশাখ উৎসব চালু করেন এবং তখন থেকে পূর্ববাংলায় এ উৎসব প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু আইয়ুব খান ১৯৬৭ সালে ১ বৈশাখ পালনকে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বলে আখ্যা দেন। মূলত আইয়ুব খানের এরূপ ঘোষণা ছিল বাঙালি জাতির শত বছরের সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত।
সাংস্কৃতিক নিবর্তনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিক্রিয়া
পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হস্তক্ষেপ বাঙালি জাতি কখনো নীরবে সহ্য করেনি। ক্ষমতাসীন সরকার যখনই অবৈধ হস্তক্ষেপ করেছিল বাঙালি জাতি তখনই তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এক্ষেত্রে নিবর্ণিত কয়েকটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস:
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম-এর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র ও অধ্যাপকের উদ্যোগে পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এ সংগঠনটির (১৯৫৪ সাল পর্যন্ত) ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে করাচীতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলন এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার প্রধান কৃতিত্বের দাবিদার এ সংগঠনটি। এ সংগঠনের উদ্যোগে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৭ সালে গড়ে তোলা হয় “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” এবং ১৯৪৮ সালে এটি “সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” নামধারণ করে।
তমদ্দুন মজলিস থেকে প্রকাশিত ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ব্যাপক জনমত ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এ সংগঠনের উদ্যোগে কতিপয় গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সর্বোপরি বাংলা ভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালে পূর্ববাংলায় যে দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার পেছনে উৎসাহ জুগিয়েছিল এ তমদ্দুন মজলিস।
ক্রমে ধর্মভিত্তিক রক্ষণশীল মতাদর্শের কারণে সংগঠনটি দুর্বল হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের পর তমদ্দুন মজলিস তার পূর্বের গতি হারিয়ে নিছক ব্যক্তির সংগঠনে পরিণত হয়। তারপরও ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এ সংগঠনটির ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
সংস্কৃতি সংসদ:
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক “সংস্কৃতি সংসদ” প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে। এটা ছিল অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী ধারার সাংস্কৃতিক সংগঠন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে বিভিন্ন নাট্যানুষ্ঠানের মাধ্যমে এ সংগঠন পূর্ববাংলার ছাত্র-শিক্ষক-জনতার মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল।
পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ:
১৯৫২ সালের শেষের দিকে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ । মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ড ধর্মান্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারার বিরুদ্ধে এটাই ছিল ১৯৪৭- উত্তরকালে সবচেয়ে শক্তিশালী, সুসংগঠিত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ধারার সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৫৩ সালে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় একুশের প্রথম সংকলন প্রকাশিত হয়।
এ সংসদের সাথে সম্পৃক্ত কর্মী, সংগঠক ও বুদ্ধিজীবীরা বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের এ পর্বে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সম্মেলনসমূহ ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আর্থ- সামাজিক আন্দোলনে, বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল।
সংস্কৃতি পরিষদ ও প্রান্তিক:
দেশ বিভাগের পর চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীরা সংস্কৃতি পরিষদ ও প্রান্তিক নামে পরপর দু’টি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এ দু’টি মিলিত হয়ে ১৯৫১ সালের ১৬ই মার্চ চট্টগ্রামের হরিখোলার মাঠে পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। এ সম্মেলনে পূর্ববাংলার ও ভারতের বহু কবি, সাহিত্যিক অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলাকালে সংগঠন দু’টি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল।
কুমিল্লা প্রগতি মজলিস:
পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা প্রগতি মজলিস। এর প্রাণ-পুরুষ ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ। এ সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে কুমিল্লায় “পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন” অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা সম্মেলন এ দেশের সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।
এর মূল অবদান ছিল অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী পূর্ববাংলার প্রবাহমান ঐতিহ্যে আস্থা রেখে, বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে, অসাম্প্রদায়িক, মানবমুখী ও গণমুখী দৃষ্টি নিয়ে সাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগ করা- সম্মেলন এ মনোভাবকে পুষ্ট করেছে।
কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন:
বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখার দাবি নিয়ে ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। পাকিস্তান সরকারের আগ্রাসন থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা এবং পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গের সমন্বয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে এর ভূমিকা
পূর্ববাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষার ওপর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে যে প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে তার মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে। বস্তুতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়েই বাঙালি জাতি প্রথমবারের মত পাকিস্তানি শাসক মহলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং অস্ত্রধারণ করেছিল।
এ ধরনের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মধ্যদিয়ে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটায়। পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দমননীতি বরং ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তোলে। এ সময় একদিকে সরকারি দমননীতি অন্যদিকে বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটে। লেখক-সাহিত্যিকদের লেখনীর কারণে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ক্রমে বিকশিত হয়।
প্রগতিশীল মহলের চিন্তাকে বিভিন্ন লেখকরা জাগিয়ে রাখেন। দোকানপাট, শিশুদের নামকরণে বাংলা শব্দ ও বাক্যাংশের ব্যবহার শুরু হয়। সিনেমা হলের নাম বাংলাকরণ যেমন- বলাকা, মধুমিতা, হংস, জোনাকি, রাখা শুরু হয়। সে সময়ে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান হয়ে দাঁড়ায় *আবার তোরা মানুষ হ / অনুকরণ খোলস ভেদি কায়মনে বাঙালী হ/ আবার তোরা মানুষ হ’ ।’
এ জাতীয়তাবাদী চেতনা বাঙালি জাতিকে ১৯৬২ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছে। একইভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্র সমাজ ১৯৬৯ সালে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আরো প্রগাঢ় হয় এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরো বলিষ্ঠতা দান করে এবং একই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবশেষে নমাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি বিজয় লাভ করে। এই সকল আন্দোলনে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
সারসংক্ষেপ
পাকিস্তৃনি শাসক শ্ৰেণী চেয়েছিল বাঙালি জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার মাধ্যমে বাঙালিদের মূর্খ রেখে এ অঞ্চলে তাদের ঔপনিবেশিক শাসনকে পাকাপোক্ত করতে। তাই সূচনা থেকেই তারা বিভিন্ন হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিন্তু যখনই ক্ষমতাসীন দল এ ধরনের হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তখনই বাঙালি জাতি তাদের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
আর এর ফলে একদিকে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি তার স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, অপরদিকে এরই মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। অবশেষে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শেষপর্যন্ত বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। গোলাম মুরশিদ, রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮১।
২। নীলিমা ইব্রাহিম ও অন্যান্য (সম্পাদিত), মুক্তিসংগ্রাম, ১ম পর্ব, ঢাকা, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭২।
৩। সাঈদ-উর-রহমান, পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ঢাকা, ডানা প্রকাশনী, ১৯৮৩।
৪। রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। আইয়ুব খানের আমলে কিভাবে ভাষাগত সংস্কারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক নিবর্তন করা হয়?
২। আইয়ুবের আমলে রবীন্দ্র বিদ্বেষী তৎপরতা সম্পর্কে টীকা লিখুন।
৩। নিবর্তনের কারণে কিভাবে ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে?
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। আইয়ুব খানের আমলে পূর্ব পাকিস্তানে সাংস্কৃতিক নিবর্তনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিন। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থানে এর প্রভাবসহ এর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করুন।
