আওয়ামী লীগ এর ইতিহাসে সামরিক আইনের আমল

আজকের আলোচনার বিযয় সামরিক আইনের আমল পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত। আওয়ামী লীগ এর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বারবার সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগ এর সেই পর্বগুলো নিয়ে আজকের আয়োজন।

 

আওয়ামী লীগ এর ইতিহাসে সামরিক আইনের আমল

 

সামরিক আইনের আমল পর্ব-১

 

আওয়ামী লীগ এর ইতিহাসে সামরিক আইনের আমল পর্ব-১

আওয়ামী লীগ জানতো যে, দরকষাকষি ও আপোসরফার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আদর্শিক ব্যবধান ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এর প্রয়াস ইতিবাচক ফল দেয়নি, কেননা আন্তঃজনসমাজ ব্যবধান হ্রাসে ঐকমত্যের জন্য যে যে সর্বজনীন ঐকমত্যের পরিবেশ দরকার তা তখনো পাকিস্তানে অনুপস্থিত ছিল।

কিন্তু সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াকে যে শিকেয় তোলা হবে তা স্পষ্টতই এ দল কল্পনা করতে পারেনি। তাই বিপর্যয় নেমে আসার আগে সোহরাওয়ার্দী তাঁর সকল আন্তরিকতায় তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সাথে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের নীতি-কৌশল কী হবে সে বিষয়ে আলোচনায় নিয়োজিত ছিলেন । তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, দলের ‘হৃত মর্যাদার’ পুনরুদ্ধার যাতে সংগঠনটি নির্বাচনের পর ফলদায়কভাবে কাজ করতে পারে। তাদের কাছে প্রতিশ্রুত নির্বাচন ছিল ক্ষমতার আরো কেন্দ্রায়নের বিরুদ্ধে গ্যারান্টিবিশেষ।

 

সামরিক আইনের আমল পর্ব-১

সে জন্য, সামরিক আইন জারির বিষয়টিকে তাৎক্ষণিকভাবে গোটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বানচালের পরিকল্পিত চেষ্টা বলেই ধরে নেওয়া হয় । দলের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সদস্য আতাউর রহমান খান এ জন্য শাসকগোষ্ঠীকে দোষারোপ করেন এবং এ অচলাবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেও আংশিকভাবে দায়ী করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত কৌশলগত নানা বিচার-বিবেচনা যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলিকে প্রভাবিত করেছে তার প্রমাণ পরবর্তীকালে পাওয়া যায়। অবশ্য, এই বহিঃহস্তক্ষেপের জন্য চূড়ান্ত দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তানের জাতীয় স্তরের কর্মকর্তাদের ওপর।

নির্বাচন স্থগিত ও রাজনৈতিক দলগুলিকে নিষিদ্ধ করায় কারও কারও আশু স্বার্থসিদ্ধি হয়তো হয়ে থাকবে। কিন্তু জাতীয় পুনর্গঠনের কাজে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানীকে অংশীদার হওয়া থেকে এভাবে বঞ্চিত করায় পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থ মোটেও লাভবান হয়নি। ১৯৬০-এর দশকে দলীয় পুনরুজ্জীবনের পর আওয়ামী লীগ এই পদ্ধতিগত দুর্বলতা খুবই দক্ষতার সাথে উদ্ঘাটিত করে। সামরিক আইন আমলের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলি আওয়ামী লীগকে এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তৈরি করে।

পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রকাশ্যে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তাতে কার্যত ঐ দলগুলি শহর-নগরবাসী শিক্ষিত সমাজের অসন্তোষ-ি ষ-বিক্ষোভের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের একটা অবকাশ পায় । রাজনৈতিক দলগুলিকে আসলে এদের মাধ্যমেই সংগঠিত হয়ে উঠতে হয় । কোনো সাফল্যে সন্দেহ নেই যারা সঠিকভাবে সে সময় দেওয়ালের লিখন পড়তে পেরেছিলেন তাঁরা সহজেই জনসমর্থন লাভ করেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এই পরবর্তীকালীন বিপুল অবদান রয়েছে এ দলের কয়েকজন দূরদর্শী নেতার । প্রদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানীদের সুস্পষ্টভাবে

ব্যক্ত অভিপ্রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে কার্যরহিত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে আদর্শিক ধ্যানধারণার একটা সুনির্দিষ্ট মেরুকরণ ঘটে। ১৯৬৪ সালে এ দল পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীকালে এর আচরণও প্রধানত এই রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে পূর্ব পাকিস্তানীদের একটা বিপুল অংশের প্রায় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়। সেই কারণেই সামরিক আইনের শাসনামলে ও তারপরে পূর্ব পাকিস্তানের জনঅসন্তোষ সম্পর্কে একটি ধারণা নেওয়া ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবনের পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অগ্রাধিকার ও কার্যধারা বুঝে ওঠার জন্য অপরিহার্য। 

সামরিক শাসন—যাকে তার উদ্গাতারা “বিপ্লব” বলে অভিহিত করেছিল—প্রথমাবস্থায় অনেকটাই ঘটনা ও সংঘাতহীন ছিল কারণ, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যেই শিকড় গেড়েছিল। রওনক জাহানের সুস্পষ্ট অভিমতে ক্যু ঘটবার বহুপূর্ব থেকেই তারা দেশের সিদ্ধান্ত প্রণয়নের কলকাঠিস্বরূপ বেসামরিক-সামরিক-আমলাতন্ত্র আঁতাতের এক নীরব অংশীদার হয়ে গিয়েছিল । সামরিক আইনের মেয়াদকালে (১৯৫৮-৬২) বিভিন্ন সামরিক আইনবিধি ও বুনিয়াদী গণতন্ত্র পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয় শাসনতন্ত্র কমিশন নামে এক বিশদ ব্যবস্থার পর্দার আড়ালে । এই কমিশন দৃশ্যত ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের বিষয়ে ঐকমত্য অন্বেষণ করছিল ।

প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে শাসকচক্রকে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করতে হয়। এটি করতে ব্যর্থ হলে ঐ শাসকগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক কার্যব্যবস্থার অভাবে তাদের ঠাঁইছাড়া সামাজিক শক্তিগুলি দ্বারাই বৈপ্লবিক পন্থায় উৎখাত হতে পারে।

বিশেষ করে, সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিপদ আরো বেশি কেননা “নিয়মবিধি ও নির্মিতির দিক থেকে তারা অবশিষ্ট জনসমাজ থেকে ভিন্ন ।”৫ পাকিস্তানে সামরিক কর্তারা অসামরিক আমলা, উদীয়মান উচ্চশ্রেণীর শিল্পপতি মহল ও গ্রামের অভিজাতবর্গের সাথে জোট বাঁধে। হান্টিংটনের মতে বন্দুক+সংখ্যা বনাম মস্তিষ্ক এই সমীকরণ প্রসূতব্যবস্থা স্থায়িত্বশীল সরকার স্থাপন করতে পারে । তাহলে গ্রামীণ অভিজাতদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পল্লীসমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠদের কার্যত সমর্থন লাভ করে স্থিতাবস্থার সম্ভাবনা ছিল।

তবে অন্যান্য সমীকরণও এই পরিস্থিতিতে কল্পনা করা যায়। যেমন, মস্তিষ্ক+বন্দুক বনাম সংখ্যা, অথবা মস্তিষ্ক+সংখ্যা বনাম বন্দুক। অবশ্য হান্টিংটনের মতে, এই সব সমীকরণ যথাক্রমে ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা ও বিপ্লবের জন্ম দেয়।

সামরিক শাসন টিকে থাকতে হলে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দরকার তা নির্ভর করবে জনসাধারণ সামরিক শাসনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছেন কিনা কিংবা ঐ শাসকগোষ্ঠীর নিয়মনীতি ও প্রতীকগুলি মেনে নিচ্ছেন কিনা তার ওপর। এটি হলে তবেই নেতৃত্বের এই নয়া ধাঁচ ও তার বৈধতা সিদ্ধ হবে। য়ানোভিজ (Janowitz) অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, “বস্তুনিষ্ঠ জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব করার লক্ষ্যে সামরিক বাহিনী গণরাজনৈতিক ভিত্তির আবশ্যকতা স্বীকার করে।

” পাকিস্তানে অবশ্য আইয়ুব খানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলি, যাকে লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটে “Continuismo” বা ‘নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখা’ বলা হয়েছে, সেগুলি ক্ষমতায় সেঁটে থাকারই কৌশলের ওপর বরং একটা আচ্ছাদন বা ঢাকনি বিশেষ। আইয়ুবের আমলের পাকিস্তানী ক্ষমতার কাঠামোতে সামরিক বাহিনীর সুগভীর শেকড় থেকে সেটি খুবই স্পষ্ট।” উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ১৯৬২ সালের পাকিস্তানী শাসনতন্ত্রে এই মর্মে লিপিবদ্ধ আছে (অনুচ্ছেদ ২৩৮) যে, এই শাসনতন্ত্রের সূচনা থেকে প্রথম ২০ বছরের মধ্যে পাকিস্তানে এমন কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকবেন না যাঁর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পদমর্যাদা লে. জেনারেল কিংবা সমতুল্য অন্যান্য বাহিনীর পদমর্যাদার নিচে।

সামরিক আইন শাসনামলে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, প্রেসিডেন্টের জন্য আস্থা ভোট সংগ্রহ করে, “জনগণের” জন্য শাসনতন্ত্র গড়ে তোলার চেষ্টা করে আর নিরন্তর জাতীয় ঐক্যের কথা বলে সামরিক শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও বৈধতাদানের চেষ্টা করে। পরে, শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলিকে আইনসিদ্ধ ও তারপরে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হয় (কনভেনশন মুসলিম লীগ) এ দলের মাধ্যমে কাজ করার জন্য ।

তবে স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই যে সব বড় সমস্যা পাকিস্তানীদের বিচলিত করে রেখে ছিল সেগুলি অমীমাংসিত থেকে যায়। পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী পছন্দ করুক বা নাই করুক একটি বহুজাতিগোষ্ঠী, বহুভাষী, “বহুঅর্থনীতি” সমন্বিত জনসমাজের প্রেক্ষাপটে যা করতে চেষ্টা করে তা হলো উল্লিখিত সমস্যাগুলিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক জনমত সংগঠন স্তিমিত করা এবং অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরে অসন্তোষ থামিয়ে রাখা। ক্ষোভ অবদমিত হওয়ার কারণেই বিরোধী জনসংগঠনকে উপযুক্ত গতিবেগ ও মুহূর্ত তৈরি না হওয়া পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর মোকাবেলায় অনেকটাই নিষ্ক্রিয় থাকতে হয় ।

১৯৬৮-৬৯ সালে যে বিস্ফোরণ এ শাসকগোষ্ঠীর সযত্নে গড়ে তোলা ব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে তোলে সেটি কোনো আকস্মিক অগ্ন্যুদ্‌গার ছিল না। কারণ শাসকচক্রের বিরোধী পক্ষও গড়ে ওঠে। এমনকি, সামরিক আইনের শাসনামলেও বেশ কয়েকবার হাতের মুঠোয় ক্ষমতা আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার পাশাপাশি একটি সমান্তরাল তার উপস্থিতি প্রকাশ পায়, এবং অবশেষে এর আঘাতেই শাসনব্যবস্থায় পাকাপাকি ফাটল ধরে যায়।

ছিল না, বরং তাদের জন্য অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ঐ শাসনের ভবিষ্যৎ বিন্যাস পূর্ব পাকিস্তানে জনসাধারণের জন্য সামরিক আইনের স্বল্পমেয়াদী পীড়ন তেমন ধর্তব্য বা রূপরেখার বিষয়টি। এটির অবয়ব তৈরি হচ্ছিল এমন এক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। যে শাসনতন্ত্র ব্যক্তিবিশেষের “রাজনৈতিক দর্শন”-এর ধারক হয়ে উঠবে ।

১৯৬২ সালের। ৮ জুন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বলেন, “আজ থেকে যে শাসনতন্ত্র বলবৎ হচ্ছে সেটি পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থায় প্রযোজ্য আমার রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন এবং সেটি সুষম প্রয়োগের দাবীদার।

বলাবাহুল্য, পূর্ব পাকিস্তান তাই সামরিক আইনের শাসনামল বা তারপরে যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টা করছিল তা হলো এই ‘দর্শন’, কেবল সামরিক আইনবিধিসমূহ নয়। তৎকালীন নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রথম সারির নেতা আবুল মনসুর আহমদ প্রসঙ্গত লিখেছেন যে, সামরিক আইনের দীর্ঘ প্রায় চার বছরের মেয়াদকালে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সামরিক আইনবিরোধী অভ্যুত্থানের বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না । তিনি অবশ্য পরবর্তীকালে দেওয়া এক ব্যাখ্যায় বলেছেন, নিষ্ক্রিয় রাজনীতিকদের এ যাবৎ নীরবতা ছিল ইচ্ছাকৃত। কিন্তু অনেকেই অবাক হন এই ভেবে যে, তিনি ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের ছাত্রবিক্ষোভ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিক্ষুব্ধ রাজনীতির লালনক্ষেত্র হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের ভাবমূর্তির পরিপ্রেক্ষিতে এই নীরবতা সম্পর্কে ফেল্ডম্যান মন্তব্য করেছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সামরিক আইন সম্বন্ধে যাই চিন্তা করে থাকুক না কেন, পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অধিকতর প্রতিরোধ এখানে দেখা যায়নি এবং সামরিক আইনের ভীরু বশংবদতা এখানেও কিছু কম দৃষ্ট হয়নি। 

শাসনতন্ত্র রচনার কাজ যখন চলছে সেই সময়ে সামরিক আইন শাসকগোষ্ঠী তাঁদের উদ্যম ও শক্তি দুটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনমত দানা বাঁধানোর কাজে নিয়োজিত করেন। এক, দেশ যেসব সমস্যায় পীড়িত তার মূল কারণ হলো রাজনীতিকরা, আর তাই তাদেরকে সমস্ত কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে হবে। দুই, পাকিস্তানের জন্য পাশ্চাত্যধারার গণতন্ত্র উপযোগী নয়, আর সে জন্য একটা দেশজ ব্যবস্থা দরকার (যা শাসকগোষ্ঠী দেবেন)। এ দুটি বিষয়ই পূর্ব পাকিস্তানকে সুগভীরভাবে প্রভাবিত করে।

এ প্রদেশের রাজনৈতিকীকরণের স্তর ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাদির সপক্ষে প্রদেশের জনসাধারণের অত্যন্ত সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেটিই স্বাভাবিক । প্রকৃতপক্ষে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানমূলক ব্যবস্থার সপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের চাপ ক্রমবর্ধিত হওয়ার কারণ ছিল ঐ প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও সারা দেশের ব্যবস্থাপনায় এর ক্ষীয়মাণ ভূমিকা। অবিভক্ত উপমহাদেশে মুসলিম রাজনীতির প্রকৃতি ও পাকিস্তানের গোড়ার দিকে সে দেশের শাসকবর্গের মনোভাব ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে পূর্বাঞ্চলের স্থান কী হবে সে বিষয়টি পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিকদের আশঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

সময় গড়াতে থাকার সাথে সাথে বৈষম্যের সুনির্দিষ্ট। প্রমাণগুলি স্তূপীকৃত হতে থাকে আর দেশের দুই অংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য । (বিশেষ করে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে) পূর্ব পাকিস্তানকে ক্রমেই বেশি করে শঙ্কিত করতে থাকে। সামরিক আইন আমলে এ বিষয়ে প্রচুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষিত ও চিন্তায়। সুচর্চিত পূর্ব পাকিস্তানীরা আসন্ন ব্যবস্থায় কোনো স্থায়ী প্রতিকার বেরিয়ে আসবে – সে রকম কিছুতে আদৌ আস্থাবান হতে পারেনি। ফলে, সামান্য মাত্র সুযোগ পেলেও তারা শাসকগোষ্ঠীর ধারাপদ্ধতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছে।

তাদের সুস্পষ্ট মতামত প্রকাশের স্বাভাবিক পথগুলি রুদ্ধ থাকায় অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কখনো কখনো, ও বাহ্যত অসংগঠিতভাবে। তবে শহর-নগরবাসীদের নানা শাখা থেকে আসা পূর্ব পাকিস্তানীদের এই সব মতামত প্রকৃত প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি সচেতন, সক্রিয় ও উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মতামতকেই বিপুলভাবে প্রতিনিধিত্ব করে এবং আবেগের দিক থেকে এরা একান্তভাবে গণমানুষের সাথে অর্থাৎ কৃষকশ্রেণীর সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত, কারণ, পল্লীনিবাসী কৃষককুলের মধ্য থেকেই এরা সাম্প্রতিককালে আবির্ভূত হয়েছিল।

বিরুদ্ধ মতের অভিব্যক্তি লাগাতার না ঘটলেও একটি মূলভাবগত ঐক্য গড়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান এই অভিমত স্বীকার করে নিতে পারেনি যে, কোনো আধুনিক সমাজব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাজনীতি ব্যতিরেকে টিকে থাকতে পারে। দেশের একটি অংশ যখন অন্য অংশের স্বার্থ বিকিয়ে নিজের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে তখন কেমন করে জাতীয় পর্যায়ে সংহতি সম্ভব এটা তাদের ধারণাতীত ছিল! এই অভিমত আসে নানা ধরনের সূত্র ও উৎস থেকে। এদের মধ্যে ছিল পেশাজীবী, বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ, অর্থনীতিবিদ, আমলা ও নিষ্ক্রিয় রাজনীতিকবৃন্দ।

পরিশেষে পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা প্রকাশ্যে বিদ্রোহে নামে। তাতে যে আবহ ও পরিবেশ তৈরি হয় তার অবকাশে রাজনীতিকরা প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন। এ সময়ে যেসব অভিমত প্রকাশিত হয় তা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতেইবা বলি কেন বরং পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তারই পর্যালোচনা রয়েছে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলিতে ।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিকসহ পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনীতিককে ‘এবডো’র আওতায়, ও ঘন ঘন কারারুদ্ধ করার মাধ্যমে দৃশ্যপটের বাইরে রাখা হয় । আবুল মনসুর আহমদ, মনোরঞ্জন ধর, খয়রাত হোসেন, কোরবান আলী, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আবুল মনসুর আহমদের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপে নিয়োজিত এক গুপ্ত সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার অভিযোগ করা হয়।

এ মামলায় তাঁর কৌঁসুলি এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী অত্যন্ত সঠিকভাবেই উল্লেখ করেন, যে সময়টিতে তাঁর মক্কেল নাশকতামূলক কার্যকলাপের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে সে সময় কখনো তিনি একজন প্রাদেশিক মন্ত্রী, কখনো কেন্দ্ৰীয় মন্ত্রী আবার—সময় বিশেষে কয়েকবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার অস্থায়ীভাবে পরিচালনা করেন। তাহলে সেই সময়ে ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ কী করছিল?—এ প্রশ্ন তুলেছিলেন সোহরাওয়ার্দী ।

তিনি আরো প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন এ কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তখন অবহিত করা হয়নি? আর সেই গুপ্ত সংগঠনই বা কেমন? আওয়ামী লীগের আরেকজন বিশিষ্ট নেতা তাজউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় সফর করে নাশকতামূলক কাজ করেছেন। আর এ কথিত কার্যকলাপ যে সময়ের

বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয় জনাব তাজউদ্দিন আহমদ বরাবরই সে সময়ে ঢাকায় থেকে আইন পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। ১২ অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি ও অন্যান্য বিষয়ের অভিযোগের অধিকাংশই আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

অনেক নিষ্ক্রিয় রাজনীতিক নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ সত্ত্বেও শাসনতন্ত্র কমিশন প্রণীত প্রশ্নমালার জবাব দেওয়ার সময় তাঁদের নিজ মতামত প্রকাশের অবাধ সুযোগ গ্রহণ করেন ।১৩ তাঁরা এ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগান এবং সংবাদ মাধ্যমের ওপর নিবর্তনমূলক বিধিবিধানের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও তাঁদের দেওয়া জবাবগুলি খবরের কাগজে প্রকাশিত হয় । এ বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার অভিমত আসে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রবীণ নেতা ও পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের কাছ থেকে ।

আতাউর রহমান স্পষ্টত বলেন যে, অভিযোগ করা হয় সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐ গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়নি কেননা আসলে তো এর কোনো প্রয়োগ-যাচাই আদৌ হয়নি। পাকিস্তানে গণতন্ত্রের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে তাঁর অবস্থানের সপক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কতিপয় ব্যক্তি “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যে অভিমত দিয়েছেন তা একান্তই ভাসাভাসা। আর তাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়নি।

পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার আগে কোনো সময়ে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে তাদের স্বকীয় কঠোর প্যাটার্নের শাসনব্যবস্থা সে জায়গায় বহাল করার আগে কখনো তাঁরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কোনো গলদ দেখাননি।” তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার সময় জনগণের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত না করে তড়িঘড়ি করে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি আইনসভার কাছে সে ক্ষমতা দেওয়া হয়। আর তারপর ক্ষমতা গ্রাসের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।

‘প্রাসাদ চক্রান্ত’ চলতে থাকে ও ‘অন্যান্য নোংরা খেলা’ শুরু হয়। মুসলিম লীগ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হওয়ার দু’মাসের মধ্যেই “সরকার ও আইন পরিষদকে বরখাস্ত করতে এবং বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মীকে জেলে পাঠাতে সক্ষম হয়।” আতাউর রহমান আমলাদেরকে “ব্রিটিশ রাজের রেখে যাওয়া ভারবোঝা” বলে নিন্দা জানান ও বলেন, ওরা কখনো গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়নি। 

আতাউর রহমান গণবিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ করেন আমলাদের বিরুদ্ধে। তাঁর মতে, কারণে “অনবরত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সন্দেহ-অবিশ্বাস চলতে থাকে… তাতে ধারাবাহিক নানা বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটতে থাকে।” তিনি নিশ্চিত, বহু পাকিস্তানীর ধারণা যে, আমলাতন্ত্রের মাঝে এক শক্তিশালীচক্র অস্তিত্বশীল ছিল যারা চায়নি গণতন্ত্র কাজ করুক। এ বিষয়ে তিনি লিয়াকত আলী খানের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করার পরপরই তাঁকে হত্যা করা হয়।

খাজা নাজিমুদ্দিন যখন একটি শাসনতন্ত্র বিল তৈরি। করেছিলেন সেই সময় তাঁকে অবমাননাকরভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় । বগুড়ার মোহাম্মদ আলী সরকার যাকে পুতুল সরকার বলে মনে করা হতো সেই তিনিও একটি খসড়া শাসনতন্ত্র তৈরি করলে তাকেও সরানো হয়। আমলাতন্ত্রের ধ্বজাধারী হিসেবে পরিচিত চৌধুরী মোহাম্মদ আলী একটি শাসনতন্ত্র প্রকাশ করলে তাঁকেও অচিরে পদচ্যুত করা হয়। এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী এর আগে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের কতিপয় বিধান।

চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি যখন তাঁর অঙ্গীকার অনুযায়ী নির্বাচনের জন্য তারিখ নির্ধারণ করে ভোটার লিস্ট তৈরির নির্দেশ দিলেন তখনই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় । আই. আই. চুন্দ্ৰীগড় দীর্ঘসূত্রতার কৌশল নিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তিনি আইনসভার আস্থা হারান।

তাঁকে আমলাতন্ত্র চাইলেও সরে যেতে হয়। সপ্তম ও শেষ প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূন এ ধরনের খেলায় মাতেননি । তিনিও নির্বাচনের জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। এ অনুসারে ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। আর ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের অধীনে প্রথম ও শেষ প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যা প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকার কোনো আশা নেই জেনে বেপরোয়া হয়ে সামরিক আইন জারি করেন এবং ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বাতিল করেন।

ভবিষ্যতের জন্য আতাউর রহমান খানের প্রস্তাবনা ছিল: পার্লামেন্টারি ধাঁচের সরকার হতে হবে । সরকারে থাকবে কেবিনেট পদ্ধতি, রাষ্ট্রকাঠামো হবে ফেডারেল পদ্ধতির। এ কাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ হবে ঐ ফেডারেশনের একেকটি ইউনিট । তিনি এককক্ষ ব্যবস্থাপক পরিষদের পক্ষপাতী। এ পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন সর্বজনীন ভোটাধিকার ও যুক্তনির্বাচন পদ্ধতিতে। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট হবেন খেতাবী পদধারী আর তিনি নির্বাচিত হবেন ফেডারেল ইউনিটসমূহ ও কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্যদের পরোক্ষ ভোটে।

শাসনতন্ত্র কমিশনের প্রশ্নমালায় ৪০নং প্রশ্নটি ছিল এরকম: নিরাপত্তা, শান্তি ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কমিশনের জন্য নির্ধারিত কর্তব্যমূলক শর্তাবলির সা থে১৫ সম্পর্কিত আর কোনো প্রস্তাব আপনার করার আছে কিনা? এর জবাবে আতাউর রহমান নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলি উল্লেখ করেন:

 

১. অনতিবিলম্বে সামরিক আইন তুলে নিতে হবে ও জননির্বাচিত একটি গণপরিষদ গঠন করতে হবে । এ গণপরিষদের কাজ হবে তিন মাসের মধ্যে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও ছয় মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান; 

২. এটি সম্ভব না হলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা;

৩. বর্তমান কমিশনের উচিত হবে জনমতের ভিত্তিতে এবং দেশের ভৌগোলিক,

ভাষাগত ও অর্থনৈতিক পটভূমির বিবেচনায় একটি শাসনতন্ত্র সুপারিশ করা; 

৪. অবাধে রাজনৈতিক দল গঠন করতে এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি অনুযায়ী ঐ দলগুলিকে কাজ করতে দিতে হবে; 

৫. পাকিস্তানের দুই শাখার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য অবিলম্বে দূর করতে হবে;

৬. সরকারি চাকরিতে সকল গ্রেডে অবিলম্বে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে ও এ জন্য প্রয়োজনে অ্যাড-হক নিয়োগ দিতে হবে;

৭. পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়ন উৎসাহিত করতে হবে;

৮. পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে উচ্চতর মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে যথাক্রমে বাংলা ও উর্দু শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে;

৯. পূর্ব পাকিস্তানে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক একাডেমী প্রতিষ্ঠা করতে হবে; 

১০. দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, সন্দেহ-সংশয়, অবিশ্বাস ও অবিচারবোধ দূর করার জন্য প্রয়াস চালাতে হবে। 

দেখা যায়, আতাউর রহমান খানের সুচিন্তিত অভিমত ছিল এই যে, পাকিস্তানে নিরাপত্তা, শান্তি ও শুভেচ্ছা নিশ্চিত করতে পূর্ব পাকিস্তানের দাবিগুলি মেটাতে হবে। এখানে আতাউর রহমান যা বলেছেন সেগুলি নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগেরই অভিমত ধরতে হবে, কেননা প্রশ্নমালার জবাবগুলি তৈরি করার সময় তিনি তাঁর দলীয় সহযোগীদের সাথে আলোচনা করে তাদের সম্মতি নিয়েছেন।

যেহেতু এ অভিমত আওয়ামী লীগ দলের এবং যেহেতু পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলির পুনরুজ্জীবনের পর পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয় সেহেতু এ অভিমত যে কোনো রাজনীতিকের ব্যক্তিগত অভিমতের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল । আর যেসব উল্লেখযোগ্য রাজনীতিক শাসনতন্ত্র কমিশনের ঐ প্রশ্নমালার জবাবদাতা ছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন নুরুল আমিন। তিনি প্রায় আতাউর রহমানের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেন ।

ঢাকার পাকিস্তান অবজার্ভারে প্রকাশিত একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৩টি সংগঠন প্রশ্নমালার জবাব দেয়। এগুলির মধ্যে ১২টিই ছিল বার অ্যাসোসিয়েশন। ত্রয়োদশ সংগঠনটি ছিল মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। সমিতিগুলির চারটি ছিল প্রাদেশিক স্তরের। অন্যগুলি জেলাস্তরের—যেমন, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রংপুর ও কুষ্টিয়ার । এদের সকলেই সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের অনুকূলে মত প্ৰকাশ করে ।

দশটি সংগঠন ইউনিটারি থেকে ফেডারেল পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার পক্ষপাতী। সাতটি সংগঠন ভোটদান ব্যবস্থার প্রশ্নে মত প্রকাশ করে । তারা সকলেই সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারের পক্ষে। এদের চারটি সংগঠন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী ব্যবস্থার অনুকূলে মত প্রকাশ করে। সাতটি সংগঠন সুনিশ্চয় করে জানায়, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র ব্যর্থতা বরণ করেনি । কেননা সাধারণ নির্বাচন না হওয়ায় এর ভালোমন্দের যাচাইও হয়নি।

শাসনতন্ত্র রক্ষা করা কর্তব্যের অংশ হওয়া সত্ত্বেও যাঁরা শাসনতন্ত্রের বিধিবিধান লঙ্ঘন করেছেন, সাতটি সংগঠনের পাঁচটি তাঁদের নিন্দাজ্ঞাপন করে। তারা রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে ন্যস্ত অতিরিক্ত ক্ষমতার সমালোচনা করে । তাদের বরাত দিয়ে আরো বলা হয়, তারা গোলাম মোহাম্মদের

নাম করে তাঁকে স্বৈরাচারী অভিহিত করে বলে, তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র চুরমার করেছেন । তারা আরো বলে, ইস্কান্দার মীর্যা গোলাম মোহাম্মদের চেয়েও একনায়কসুলভ। অভিযোগ করা হয়, এঁরা উভয়েই তাঁদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য হীন মতলবে দলীয় রাজনীতিতে নাক গলিয়েছেন । এসব জবাবদাতাদের মাত্র দুটি সংগঠনের মতে, রাজনৈতিক দলগুলির সপক্ষ ত্যাগ ও ক্ষমতার লড়াই সংসদীয় পদ্ধতি ভেঙে পড়ার জন্য দায়ী। 

ইস্ট পাকিস্তান লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের ৫ম বার্ষিক অধিবেশনে খান বাহাদুর নাজিরুদ্দিন আহমদ সভাপতির ভাষণে, সংসদীয় ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে—শাসনতন্ত্র কমিশনের এ ধারণার সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করলে সামরিক শাসকগোষ্ঠীর ‘তথাকথিত বৈধতা’র মুখোশ উন্মোচিত হয় । 

ইস্ট পাকিস্তান প্রভিন্সিয়াল ডেভলপমেন্ট অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ও আরেকজন আইনজীবী এস. এম. এ. মজিদ একই সুর ও মননে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বাড়তি উল্লেখে বলেন যে, গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য “আদর্শ নির্বাচকমণ্ডলীর অবর্তমানে” দেশকে অবশ্যই যা আছে তা নিয়েই এগুতে হবে।

শাসনতন্ত্র কমিশন পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন সাংবদিকেরও সাক্ষাৎকার নেয় একই প্রশ্নে। তাঁরা হলেন: পাকিস্তান অবজার্ভার, ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ ও পাসবান (উর্দু)-এর সম্পাদক। তাঁদের পাঁচ জনই বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়নি। বরং এ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সুযোগই পায়নি। তাঁরা উল্লেখ করেন, শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানে বারংবার সরকারের ব্যর্থতার কারণে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। এঁদের মধ্যে একজন সম্পাদকের মতে, কেন্দ্রের প্রভাব এ জন্য দায়ী।

আরেকজন গণপরিষদ (১৯৪৭) সদস্যদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার ষড়যন্ত্র, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য ও রাজনীতিকদের সপক্ষ ত্যাগের বিষয়গুলিকে দোষারোপ করেন। অন্যরা বলেন, আমলাতন্ত্রের একটি ক্ষমতাশালী অংশের সকল ক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের ফলে অগণতান্ত্রিক পন্থায় বিভিন্ন মন্ত্রিসভা বাতিল হয় ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নে বিলম্ব ঘটে, এবং অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।

এসব সম্পাদক ঘন ঘন অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান, সুস্পষ্ট কর্মসূচি আছে এরকম বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক দলগুলিতে সপক্ষ ত্যাগের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, শাসনতন্ত্রের অপব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে বিধিবিধান সন্নিবেশিত করে শাসনতন্ত্র রচনার প্রস্তাব করেন।

তাঁদের সবাই সংসদীয় সরকার পদ্ধতির অনুকূলে মত প্রকাশ করেন। এ ধরনের সরকার ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় থাকবে । আর প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয় ও মুদ্রা ব্যতিরেকে অন্য সকল বিষয় প্রদেশগুলির হাতে থাকবে। আর এভাবে কেন্দ্র ও প্রদেশগুলির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে সীমারেখাও স্থির করে দিতে হবে ।২২ এ বিষয়গুলি নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আরো অনেকে আরো বিশদ ও সুবিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন।

১৯৬১ সালের গ্রীষ্মে প্রেসিডেন্টের পূর্ব পাকিস্তান সফরের অল্পদিন পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রেহমান সোবহান “হাউ টু বিল্ড পাকিস্তান ইনটু এ ওয়েলনিট নেশন” শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানী জনগণের মাথাপিছু আয় ক্রমাগত কমে যাচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানীদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। এই বাস্তবতার নিরিখে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলেরই নিজ নিজ সম্পদের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত ।

অধ্যাপক সোবহান নিবন্ধটি ইসলামী একাডেমি আয়োজিত এক সেমিনারে পাঠ করেন। আসলে অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছিল ।২৪ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব এ বিষয় সম্পর্কে ইতোমধ্যে উল্লেখ করে একে “বল্গাহীন ও দায়িত্ববর্জিত কথাবার্তা” বলে বাতিল করেছিলেন। তবু ‘দুই অর্থনীতি’ নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকে। ঢাকার জার্নাল “নিউ ভ্যালুজ”-এর ১৯৬১ সালের গোড়ার দিকের কোনো এক সংখ্যায় অধ্যাপক রেহমান সোবহানের “দ্য মিনিং অব দ্য টু ইকনমিজ থিসিস” শীর্ষক একটি লেখা ছাপা হয় ।

ঐ একই নিবন্ধের বাংলা অনুবাদ ১৯৬২ সালে ঢাকায় সম্পাদিত এক সঙ্কলনে প্রকাশিত হয়। ২৫ দুই অর্থনীতিতত্ত্বকেন্দ্রিক আলোচনার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯৬২ সালের জুলাইয়ে “এশিয়ান সার্ভে”-তে মুদ্রিত অধ্যাপক রেহমান সোবহানের নিবন্ধে । তিনি এই নিবন্ধে পাকিস্তানী অর্থনীতির দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের মূল কারণগুলির বিশ্লেষণ করে রায় দেন:

 

সামরিক আইনের আমল পর্ব-১

 

একাডেমিক দিক থেকে দেখলে পাকিস্তানী অর্থব্যবস্থা একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়সমীক্ষার উপাদান হতে পারে কারণ, দুই অঞ্চলের মধ্যেকার উন্নয়নের ভিন্ন ভিন্ন হার অর্থনৈতিক সমতার ক্ষেত্রে সমস্যা রূপে বিরাজ করছিল। এ কথা অবশ্যই বলতে হয় যে মুক্তবাজারে ক্রিয়াশীল শক্তিগুলির এই অসমতাকে বাড়িয়ে তুলবার প্রবণতা আছে এবং আঞ্চলিক আয়ের ক্ষেত্রে কোন রকম সমতা আনবার জন্য সরকারি ব্যবস্থাগ্রহণ প্রয়োজন। এটি অবশ্যই সমস্যাটিকে যতটা অর্থনৈতিক ততটাই রাজনৈতিক পর্যায়েও উন্নীত করে বিভিন্ন জটিল সমস্যার প্রশ্ন তোলে যা বিশেষভাবে অনুধাবন করার প্রয়োজন আছে।

সামরিক আইনের শাসনামলে আতাউর রহমান খান পাকিস্তানের রাজনৈতিক দুর্দশা ও সমস্যার সবচেয়ে বিশদ বিবরণ দেন। আর অধ্যাপক রেহমান সোবহান সবচেয়ে প্রাঞ্জল ও স্পষ্ট বর্ণনায় অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি তুলে ধরেন। আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যার এই দ্বৈত সঙ্কট চলতে থাকার মধ্যেই আভাস পাওয়া যেতে থাকে রাজনৈতিক দলগুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতি কোন দিকে ধাবিত হবে।

 

সামরিক আইনের আমল পর্ব-২

 

আওয়ামী লীগ এর ইতিহাসে সামরিক আইনের আমল পর্ব-২

অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি অনেক পূর্ব পাকিস্তানী আমলারও মনোযোগ আকর্ষণ করে। ১৯৬১ সালের ফিন্যান্স কমিশনে পাঁচজন পূর্ব পাকিস্তানী সদস্য তাঁদের পাঁচ পশ্চিম পাকিস্তানী সহযোগীর সাথে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার পন্থা ও উপায়ের বিষয়ে একমত হতে পারেননি।

পূর্ব পাকিস্তানী পাঁচ সদস্যের তিনজন ছিলেন সিএসপি, একজন শিল্পোন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পঞ্চম জন অর্থনীতির অধ্যাপক। পূর্ব পাকিস্তানী সদস্যরা এক পৃথক রিপোর্ট তৈরি করে তাতে সুপারিশ করেন যে, যে শাসনতন্ত্র তৈরির কাজ চলছে তাতে কেবল দেশের দুই প্রদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য ন্যূনতম ২৫ বছর মেয়াদে। দূর করার লক্ষ্য সন্নিবেশিত থাকলেই চলবে না বরং উন্নয়নের বিভিন্ন সহায়সম্পদ বিলিবণ্টনের জন্য যে ফর্মুলা তাঁরা রিপোর্টে প্রস্তাব করেছেন সেটাও থাকতে হবে। 

 

সামরিক আইনের আমল পর্ব-২

পাকিস্তানের জাজ্বল্যমান আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্যের কারণ ও প্রতিকারের বিষয়গুলি অর্থনৈতিক পারিভাষ্যে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে আমলা-অর্থনীতিবিদদের উদ্যোগ নিয়ে মতপার্থক্য তথা মতভেদ থাকতেই পারে। একে “বাস্তবতামূলক মতানৈক্য” বলা যায়। 

কিংবা একটা স্থিতি-ভারসাম্য অবস্থায় আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখাও এর উদ্দেশ্য হতে পারে ।২৯ কিন্তু তবু নিরেট বাস্তবতা এই যে, বিরাজমান পরিস্থিতিতে নিহিত বিপদের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে তাঁরা তাঁদের উদ্বেগ ব্যক্ত করেন। শাসকগোষ্ঠী এ নিয়ে কার্যত আদৌ মাথা না ঘামালেও পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির একটা মজবুত বুনিয়াদ হিসেবে এই দ্বিঅর্থনীতিতত্ত্বের সবচেয়ে কুশলী প্রয়োগ করেছেন।

ইস্ট পাকিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও আরো কিছু ব্যবসায়ী সমিতির তৈরি এক রিপোর্টে দেশের দুই অংশের জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের প্রতি অঙুলি নির্দেশ করে বলা হয়, সরকারের ‘মর্জিমাফিক’ নীতির ফল এটি। ঐ রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানের চাহিদা পূরণের জন্য দ্বিতীয় পাঁচসালা পরিকল্পনার আওতায় জোরদার কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তাঁদের এ প্রস্তাবের কারণ, ঐ পাঁচসালা পরিকল্পনায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিক্ষা ও কারিগরি সুযোগ-সুবিধা খাতে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি। 

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সামরিক আইন শাসকগোষ্ঠী সবকিছুর ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যের অগ্রাধিকারের কথা এক নাগাড়ে জনসাধারণকে বলে যাচ্ছিল। এ বিষয়ে নানা সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামও অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব আয়োজনের নেপথ্যে ছিল সামরিক শাসকগোষ্ঠীর পোষকতা ও প্রেরণা। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে ঢাকায় “বৃহত্তর জাতীয় সংহতি” শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করা হয় (এ সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় এর আগে সেপ্টেম্বরে লাহোরে অনুরূপ এক সেমিনারের পর)।

এই সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম. এন. হুদা তাঁর ধারণা ব্যক্ত করে বলেন, এসব আলোচনা “দুটি ভিন্ন সমান্তরাল রেখায় এগিয়ে চলেছে আর তাই এ দুই রেখার কখনো এক বিন্দুতে মিলিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।” এর একটি হচ্ছে, ইসলাম—যা ঐকাবিধায়ক শক্তি বলে অভিহিত আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য যা কার্যত বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তি । তিনি তাঁর কথার উপসংহারে বলেন, কেবল বিভেদাত্মক বৈষম্য দূর করেই জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিধান করা যেতে পারে।

ঐ একই সেমিনারে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মিশ্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য অর্জনের ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা। তাঁর ধারণায় এ ধরনের সংহতি অর্জন ‘একান্তই অবাস্তব’ । তিনি প্রস্তাব করেন, পাকিস্তানকে তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়েই। করতে শিখতে হবে। তাঁর মতে, ঐক্য বিধায়ক উপাদানের বরং সন্ধান করতে হবে এর অভিন্ন জাতীয় উদ্দেশ্য ও সার্থকতার মাঝে অর্থাৎ এমন এক জাতি গড়তে হবে যে জনসমাজে। মানুষ মর্যাদাসহকারে বাস করতে সক্ষম হবে। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, বৈষম্যমূলক উন্নয়ন একটি জাতির ঐক্যবদ্ধ ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে ।

উপরোক্ত বিবরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সামরিক আইনের কঠোরতা সত্ত্বে সে সময় উপরোক্ত ধারণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ অথবা এ ব্যাপারে ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ- আলোচনা কিংবা উভয় প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান ছিল। তবে রেখাপাতযোগ্য ও আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: দৃশ্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা আওয়ামী লীগ যে অভিমতের ধারক (যা ব্যক্ত করেছেন আতাউর রহমান) তার সঙ্গে নুরুল আমিনের মতো বিশিষ্ট মুসলিম লীগারসহ বাকি প্রায় সকলের মতের একটা মিল রয়েছে।

স্পষ্টত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠতে লক্ষ্য করা যায়। সে দুটি হলো: এক, রাষ্ট্র ও সরকারের পদ্ধতি ও নির্মিতি (কাঠামো) আর দুই, কেন্দ্র ও ফেডারেশনের ইউনিটগুলির মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন। এসব নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিদগ্ধ জ্ঞানবেত্তা মহলে ক্রমবর্ধমান একটা বঞ্চনাবোধ লক্ষ্য করা যায়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি দল পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব কেমন করে পুরানো ইস্যুগুলির মোকাবেলা করেন এবং এ দলের পুনরুজ্জীবনের বাধ্যবাধকতাগুলি কী, এর আশু প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কী—নানা বাধা সত্ত্বেও জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজ সাফল্যের নেপথ্যে এসবের আংশিক ভূমিকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ।

তবে রাজনৈতিক দলগুলি তখনো বেআইনী থাকায় ব্যাপক পর্যায়ে রাজনৈতিক শক্তিসমাবেশ অসম্ভব ছিল। এ জন্য আওয়ামী লীগের বিজ্ঞ পরামর্শদাতা সোহরাওয়ার্দী এক রাজনৈতিক দলবিহীন গণআন্দোলনের কৌশল বের করেন যা রাজনৈতিক চেতনাকে আরো জোরদার না করতে পারলেও অন্তত সে চেতনাকে সঞ্জীবিত রাখার একমাত্র বাস্তবসম্মত পন্থা নিঃসন্দেহে ।

সোহরাওয়ার্দী সব সময় জাতীয় স্তরের রাজনীতিরই পক্ষপাতী ছিলেন। তাই তাঁর সে ধারণার সাথে সুসঙ্গতিক্রমে আঞ্চলিকতাবাদী রাজনীতির বদলে তিনি রাজনীতিবিদদের আগের দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান—উভয় অঞ্চলের রাজনীতিকদের সমর্থন আদায়ের ও অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে এক আন্দোলন শুরুর পরিকল্পনা করেছিলেন।

প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকদের সাথে আলোচনার পর ১৯৬২ সালের ২৪ জানুয়ারি৩২ পূর্ব পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দলের নিষ্ক্রিয় রাজনীতিকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি বলেন, প্রকাশ্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের। অবর্তমানে সৃষ্ট “শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি” কাটিয়ে উঠতে হলে অতীতের সকল ঝগড়া ও বিদ্বেষ ভুলে একযোগে, এক অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করতে হবে। সে লক্ষ হলো, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তিনি বুনিয়াদী গণতন্ত্রীদের নির্বাচনে অংশীদার হওয়ার

প্রস্তাব করেন। তবে তা এই শর্তে যে, এমনসব প্রার্থীকে সতর্কতার সাথে মনোনয়ন দিতে হবে যাঁরা তাঁদের আদর্শে ও উদ্দেশ্যে অবিচল থাকবেন। তিনি তাঁর এ বার্তা গোপনে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বলেন। কাজটি সময়সাপেক্ষ বলে সেটি অবিলম্বে শুরু করতে বলেন। তিনি জোর দিয়ে জানান যে, এ আন্দোলন অবশ্যই নির্দলীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে ।

সোহরাওয়ার্দী শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের কথা ভাবলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ বৈঠকের কয়েকদিনের মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী গ্রেপ্তার হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্রদের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো সামরিক আইনবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আর আন্দোলনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই, ছাত্ররা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী হোক না হোক, বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়।

১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে ১৯৫২ সালের পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনের ৩নং ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্পষ্টত এর উদ্দেশ্য ছিল, কোনো সম্মিলিত আন্দোলনের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ করা। সরকার সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর সহযোগীদের ১৯৫৮ সালের শেষার্ধে পাকিস্তানী সঙ্কটের জন্য দোষারোপ করেন । এই মর্মে দাবি করা হয় যে, “বিপ্লব” আরো “পতন” রোধ করেছে ও “আরো সুবিধাজনক” অবস্থায় উত্তরণ সম্ভব করেছে।

এ কথাও প্রকাশ করা হয় যে, সোহরাওয়ার্দী ও আরো কয়েকজনের “অপরাধমূলক অপকীর্তির” কথা সুপরিজ্ঞাত হলেও সেগুলি “ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে উপেক্ষা করা হয়েছিল।” কিন্তু পাকিস্তানের ভেতরে ও বাইরে পাকিস্তানবিরোধী মহলের সাথে সোহরাওয়ার্দীর প্রকাশ্য সংলাপ পাকিস্তানের “সংহতি ও নিরাপত্তার” জন্য এতই ক্ষতিকর যে, তাঁর কার্যকলাপকে যে কেউ রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজ বলে অভিহিত করতে পারে। সে জন্য সরকার সপক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে, “তাঁরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে আটক রাখার আদেশ দিতে বাধ্য হয়েছেন। 

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই “রাষ্ট্রদ্রোহমূলক” কাজগুলি কী তা কখনো সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি। আর এ ধরনের অস্পষ্ট অভিযোগের আসলে কোনো বৈধতা আছে কি নেই তা নির্ধারণের জন্য পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা কালক্ষেপণ করেনি (যেমন ১৯৬৮-৬৯ সালে ভিন্ন বর্গের ছাত্র নেতারাও আগরতলা মামলার সত্য-মিথ্যা যাচাই নিয়ে আদৌ মাথা ঘামায়নি) বরং তারা সোহরাওয়ার্দীর মুক্তির জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে ।

সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এই অভিযোগের সারবত্তার প্রমাণ দেওয়ার মতো অবস্থায় সামরিক আইন প্রশাসন থাকুক বা না থাকুক, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সোহরাওয়ার্দীর শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের পরিকল্পনা যে সামরিক শাসকগোষ্ঠীর করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তা হলো এ ধরনের যৌথ আন্দোলন শুরু করে সোহরাওয়ার্দী জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে তা তারা বুঝে গিয়েছিল । কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেদিন যা লক্ষ্য বিভেদ সৃষ্টিকারক প্রবণতার আরো দানাবাঁধা রুখতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। আর সে প্রবণতার অস্তিত্ব ছিল বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানীদের মাঝে। তবে তিনি যে পূর্ব ও পশ্চিম

পাকিস্তানে এককালে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে একটি অভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে একত্রিত ও সংগঠিত করতে পেরেছিলেন কেবল সেটিই ক্ষমতা আত্মসাৎকারীদের জন্য ভীতির কারণ হয়ে ওঠে । তাই বেশ স্পষ্টতই পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য কোনো সত্যিকারের হুমকি নয়, কায়েমী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতি হুমকির অনুমান কল্পনাই বরং সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তারের নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা অচিরেই তাঁর গ্রেপ্তারের জন্য প্রদত্ত কারণকে স্রেফ ধাপ্পা বলে অভিহিত করে। এরপর খোদ প্রেসিডেন্ট পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে যখন গ্রেপ্তারের সাফাই দিতে চেষ্টা করেন ছাত্ররা তখন তাদের একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে।

প্রেসিডেন্ট আইয়ূব সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক দলগুলির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে না। তিনি জানান, দেশ যদি কোনো রাজনৈতিক দল ছাড়াই চলতে পারে, তিনি খুশি হবেন আর জনগণ ভাগ্যবান হবে। তবু যদি রাজনৈতিক দল অপরিহার্য হয়ে ওঠে, ভবিষ্যৎ পার্লামেন্ট কর্তৃক অনুমোদিত আইনে তারা আত্মপ্রকাশ করবে। এমনকি তারপরেও পার্লামেন্টকে তাদের কতকগুলি “মৌল উপাদানের” বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তারের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তাঁকে এমন একজন অদেশপ্রেমিক রাজনীতিক বলে অভিহিত করেন যিনি পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানের দুশমনের আর্থিক সহায়তায় বিভেদমূলক কার্যকলাপ বাড়ানোর জন্য “দুর্বল নেতৃত্ব”কে কাজে লাগিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন (তবে ব্যাখ্যা করেননি) সোহরাওয়ার্দীর দুষ্কর্ম আরো বড় ইস্যুর অংশমাত্র। ৩৫ স্পষ্টতই তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে “ভারতীয় চক্রান্তে”র কথাই বলেছিলেন।

এক বেতার ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের অগ্রগতির পর্যালোচনাকালে আইয়ুব খান স্বীকার করেন যে, “পাকিস্তানের দুটি অংশের প্রতিটির আরো বেশি শক্তিবৃদ্ধির মাঝেই নিহিত রয়েছে পাকিস্তানের শক্তি আর এই দুই অংশের সুস্থ বিকাশ না হলে কোনো অংশই তথা সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান আর্থ-রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে না।” তিনি এও স্বীকার করেন যে, শ্রমিক বিনিময়, পণ্য চলাচল, দূরত্ব ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতাই বটে।

তবে তিনি বলেন, “যেহেতু একজাতি হওয়ার প্রত্যয় আমাদের আছে, তাই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিই বরং আমাদের আরো বেশি উদ্যোগী হতে প্রেরণা যোগাবে আর তাতে করে আমরা আরো প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবো। 

১৯৬২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে বিদায় ভাষণে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে অবশ্য এতটা নরমভাষী বলে মনে হয়নি। তিনি পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে কষ্ট ভোগ না করতে ও এতো অসুবিধার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের যে সুষ্ঠু ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে উত্তম ও প্রশাসন গড়ে তোলার মাধ্যমে তা হারাতে না চাইলে “দায়িত্বহীন কার্যকলাপ ও বল্গাহীন উক্তি” বন্ধ করতে বলেন।৩৭ স্পষ্টতই এ ছিল ঐ সব রাজনীতিকদের প্রতি হুঁশিয়ারি যাঁদেরকে তিনি মনে করেছিলেন যে তাঁরাই নিশ্চয় ছাত্রদের উস্কানি দিচ্ছেন।

ছাত্রনেতৃবৃন্দ সুষ্ঠু ভবিষ্যতে দেশের নেতা হবেন তাঁদেরও বিচারবুদ্ধি রয়েছে এবং তাঁরা যখন তাঁদের যাঁরা ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে মনে করবে তখন তারা বিক্ষুব্ধ হবেন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করবেন— আতাউর রহমানের এহেন বক্তব্যের সঙ্গে আইয়ুব একমত হতে পারেননি।

একই আলাপে আতাউর রহমান প্রেসিডেন্টকে বলেন, পাকিস্তানের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে যদি কোনো অপ্রতিনিধিত্বশীল কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা পূর্ব পাকিস্তানীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সে অবস্থায় অনিবার্যভাবেই পূর্ব পাকিস্তান উপনিবেশে পর্যবসিত হবে। পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলির বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে আতাউর রহমান ঐ রাজনীতিকদের দেওয়া যে আর্থ-রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখাঃ প্রেসিডেন্টকে দেন তা পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ৬-দফা ফর্মুলা থেকে আলাদা কিছু ছিল না।

ছাত্র বিক্ষোভের খবর সংবাদপত্রে ছাপতে দেওয়া হয়নি। তবে মজার ব্যাপার এই যে, যে সরকারি প্রেসনোটগুলি সম্ভবত ছাত্রদের ওপর কালিমা লেপন করার জন্য ঐ সময় বের করা হয় তাতে ছাত্র বিক্ষোভগুলির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ায় ছাত্র আন্দোলনের ব্যাপ্তি প্রকাশ হয়ে পড়ে।

এসব প্রেসনোট থেকে জানা যায়, ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে গোটা প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের অসংখ্য ছাত্র তাদের ক্লাসে যোগ না দিয়ে মিছিল বের করে, শ্লোগান দেয়, পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোঁড়ে বা তাদের নাজেহাল করে পুলিশবাহিনীর গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, দোকানপাট বন্ধ করতে বাধ্য করে, ঢাকাতে দৈনিক আজাদ পত্রিকা কার্যালয়ে ইটপাটকেল ছোঁড়া হয় ও ট্রেনেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। 

পিরোজপুরে মহকুমা আনসার অ্যাডজুট্যান্ট কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে কিছু রেকর্ডপত্র ধ্বংস করা হয়। এসব প্রেসনোটে আরো বিবরণ দেওয়া হয় যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করা হয়। আর গ্রেপ্তার করে ছাত্রদের বিচার করা হয় বিশেষ সামরিক আদালতে। প্রেসনোটের উল্লেখ অনুসারে, বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের সাথে অন্য লোকজনও যোগ দেয় । এ তথ্যও ফাঁস হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বক্তৃতা দেওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে গোলযোগ ঘটে।

এমনি করে, দমন-পীড়ন সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র অসন্তোষের খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এমনকি, লাহোর ও মুলতানের ছাত্ররাও এ ব্যাপারে তাদের সহানুভূতি জানায় । এছাড়া ইংল্যান্ডেও পাকিস্তানী ছাত্রদের বিক্ষোভের খবর জানা যায়।

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে শহীদ দিবস পালনকালেও আবার গণঅসন্তোষ দেখা দেয়। ঢাকার এক গ্রন্থাগার সিম্পোজিয়ামে গৃহীত এক প্রস্তাবে সরকারের প্রতি গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পরিপূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদানের আহ্বান জানানো হয়। 

এসব ছাত্র বিক্ষোভে শাসক মহলের প্রতিক্রিয়াটি ছিল ঐ শাসকগোষ্ঠীরই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সাংবাদিকদের জানান, পূর্ব পাকিস্তানের গোলযোগ ‘দুঃখজনক’ ঘটনা আর দেশের উভয় অংশেই ছাত্রদেরকে অপব্যবহার করছে রাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভে পেশাদার উস্কানিদাতারা। সরকারের ক্রমাগত প্রচারণায় ছাত্রনেতারা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন ‘ডাকসু’র সাধারণ সম্পাদক এনায়েতুর রহমান ১৯৬২ সালের ২৩ এপ্রিল এক বিবৃতিতে ছাত্রদেরকে রাজনীতিকদের ক্রীড়নক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পুরোধা বলে সরকারের কুখ্যাতি রটানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। 

ছাত্র বিক্ষোভ একান্তই স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ হয়তোবা থাকতে পারে। তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা সবসময়েই পূর্ব পাকিস্তানের সকল আন্দোলনের সম্মুখভাবে ছিলেন। আর একবার এ ধরনের ছাত্র জাগরণ দেখা দিলে তার শক্তিকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না। কালপরিক্রমার উল্লিখিত ক্রান্তিকালে শাসক মহল ও নিষ্ক্রিয় রাজনীতিবিদ—উভয় তরফই ছাত্রদের খুব বেশি ঘাঁটানোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। গ্রেপ্তার করা ছাত্রদেরকে শেষাবধি সাধারণ ক্ষমার অধীনে মুক্তি দেওয়া হয়।

আর রাজনীতিকেরা, বিশেষ করে, যাঁরা আওয়ামী লীগ করতেন তাঁরা ছাত্রদের অভিপ্রায় অনুযায়ী মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে শরিক হওয়া থেকে বিরত থাকেন । অন্যদের সাথে নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগ গোড়ায় অবশ্য এই নির্বাচনে অংশীদার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কারণ তাঁরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সাঁড়াশি আন্দোলনের কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা স্থির করেছিলেন, আইনসভার বাইরে ও ভেতরে উভয় ক্ষেত্রে তৎপর হলে তাদের উদ্দেশ্য সাধনে তা আরো বেশি ফলদায়ক হবে। কিন্তু ছাত্ররা যুক্তি দেয় যে, তাঁরা যে শাসনতন্ত্র গ্রহণ করেননি সে শাসনতন্ত্রেরই বিধিবিধানে নির্ধারিত নির্বাচনে অংশীদার হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ অবস্থায় যেহেতু একমাত্র ছাত্ররাই সক্রিয় ভূমিকায় ছিল সেহেতু নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগ তাদের সিদ্ধান্তই মেনে নেয়।

 

অবশ্য হাতেগোনা কিছু লোক যারা এই সংশোধিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তারা নির্বাচনে অংশ নেয় ও তাদের অনেকে নির্বাচিতও হয় । শাসকগোষ্ঠী নির্বাচন বয়কটের ব্যাপারে বিরোধী তরফের সিদ্ধান্তে বিচলিত হয়, কেননা তাদের কাছে এ কাজটি ছিল শাসনতন্ত্র না মেনে নেওয়ার এক সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি। তাই তারা যাতে তাদের সিদ্ধান্ত বদলায় সে জন্য রাজি করাতে দৌত্যগিরির আশ্রয় নেওয়া হয়।  খন্দকার মোশতাক আহমদও বলেছেন যে, সামরিক আইনের শাসনামলে ছাত্ররাই পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন । 

নির্বাচনের আগে হতাশা আর চেপে রাখতে না পেরে সাতজন নিষ্ক্রিয় রাজনীতিক এক যুক্তবিবৃতি তৈরি করে সেটি ১৯৬২ সালের ১৪ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এই বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতারা হলেন: নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, আবু হোসেন সরকার, হামিদুল হক চৌধুরী, সৈয়দ আজিজুল হক, মাহমুদ আলী ও পীর মোহসেন উদ্দিন।

তাঁরা উল্লেখ করেন, আসন্ন নির্বাচনে একটি নির্বাচনী এলাকায় ৫০০-র সামান্য কিছু বেশি ভোটার থাকবেন আর তারা বড় জোর পূর্ব পাকিস্তানে ৬,৫০,০০০ ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৫,০০,০০০ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাতে জনসাধারণের অভিমত কার্যত আদৌ প্রতিফলিত হবে না। সর্বোপরি, অনেক নেতৃস্থানীয় ও বিশিষ্ট জননেতা এবং ছাত্রকে এই সময়ে বন্দী রেখে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারটি হবে এক নিষ্ঠুর, অযৌক্তিক ও অন্যায় পদক্ষেপ। তাঁরা সকল রাজবন্দীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান এ কারণে যে, তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, তা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। 

অবশ্য নির্বাচন যথারীতি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মার্চের ঘোষণা অনুসারেই অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হন। এই নির্বাচকমণ্ডলী বলতে ১৯৫৯-৬০ সালে নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীদেরকে বোঝায়, যারা একজন পাকিস্তানী সমীক্ষকের মতে নির্বাচিত হয়েছিলেন “কঠোরভাবে বলবৎ অনেকগুলি বিধিবিধানের আওতায়।” ফলে তাঁদের সে নির্বাচন রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব ও রাজনৈতিক বিতর্কালোচনার বিচারে তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে।

নির্বাচনের মাস খানেক আগে অবশ্য প্রার্থীরা যাতে মোটামুটি ধরনের মিছিল-শোভাযাত্রা ও তাদের সপক্ষে কিছুটা নিচু লয়ে ও মাত্রায় সভাসমিতি করতে পারে সে বিষয় নিশ্চিত করার জন্য সামরিক আইনবিধির (সামরিক আইনবিধি নং ৫৩) সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় । তবে এই প্রার্থীদেরকে খোদ মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতি নিয়ে কোনো বিতর্ক তোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি, কিংবা তাদের রাজনৈতিক আলোচনায় কোনো আঞ্চলিক, ধর্মীয় বিশ্বাস, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা পুরানো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের বিষয় তোলারও অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

সংসদীয় সরকারের সাথে সম্পর্কিত রাজনীতিকদের এসবে অংশীদার হওয়াকে (১৯৫৯- ৬০-এর মৌলিক গণতন্ত্র নির্বাচন) নিরুৎসাহিত করার প্রয়াসে প্রার্থীদেরকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই-পরীক্ষা করে নেওয়া হয়েছিল। আর সেই সাথে প্রয়োজনে এবডো (Elected Bodies Disqualification Orders) প্রয়োগ করে “ব্যক্তিবিশেষকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থাও ছিল।… তবে এসব প্রয়াস সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রায় ২৮০০ ও পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রায় ৫০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত ছিলেন।”

১৯৬২ সালের নির্বাচনের নির্বাচনী এলাকাগুলির চূড়ান্ত তালিকা ১৯৬২ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত হয় । আর ঐ তারিখ পর্যন্ত নির্বাচিত প্রাথমিক মৌলিক গণতন্ত্রের সকল সদস্যকে নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় । পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য সংখ্যা ছিল সর্বাধিক ৫৭৬ ও ন্যূনতম ২৩৪ এবং প্রাদেশিক পরিষদের জন্য যথাক্রমে ২৯৮ ও ২৬৬। ৪৮ ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল ও ৬ মে যথাক্রমে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই নির্বাচন বলা চলে অনেকটা “গুমোট পরিবেশেই” অনুষ্ঠিত হয়।৫০ “স্বল্পমেয়াদী নোটিশে ভোট গ্রহণের আয়োজন করতে হবে”—এই বিবেচনায় “কোথাও কোনো বিরতি ছাড়াই ভোট গ্রহণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ”

স্পষ্টতই নির্বাচনী এলাকাগুলি সংখ্যার দিক থেকে ছিল ছোট আর যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলি ছিল তখনো নিষিদ্ধ সেহেতু রাজনৈতিক ইস্যুগুলি নিয়ে কোনো প্রচারণা অভিযান চলেনি। নির্বাচনের প্রার্থীরা কেবল মৌলিক গণতন্ত্রীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত সভায় মৌলিক গণতন্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারতেন। স্পষ্ট কারণেই “এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী অভিযান কোনো রকম উৎসাহ-উদ্দীপনা কিংবা আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি।

পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচনী সভাগুলিতে শাসনতন্ত্র ও সর্বজনীন ভোটাধিকার বাতিলের দাবির পাশাপাশি কিছু লোক আবার সংসদীয় ব্যবস্থা ও জাতীয় রাজনৈতিক দলসমূহ থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের এ ধরনের সভাগুলিতে অবশ্য “প্রায় ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় করে রাখা রাজনৈতিক দলগুলির সাথে সম্পর্কের কথা আলোচনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হতো। আলোচনা হতো রাজনৈতিক বিষয়াবলি যেমন, সর্বজনীন ভোটাধিকার নিয়ে ।

এগুলি প্রার্থী ও নির্বাচকদের মধ্যে আলোচনার নিয়মিত বিষয় হয়ে ওঠে। এ ছাড়া অর্থ কিংবা ভবিষ্যতের আনুকূল্যের অঙ্গীকারের বিনিময়ে ভোটের জন্য আনুষ্ঠানিক দরকষাকষিও হয়। পরিশেষে, পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় রাজনৈতিক আলোচনা কিছুটা কমমাত্রা ও পরিসরে হলেও তা সর্বদাই চলতো এবং বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ।”

১৯৬২ সালের নির্বাচন অল্প সময়ের নোটিশে অনুষ্ঠিত হলেও এই নির্বাচন হয় কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় । ফলে নির্বাচনী অভিযানের প্রচার-প্রচারণা ছিল নিম্ন লয় ও মাত্রায়। এ নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য ছিল অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক (যা সাধারণত ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ও তাতে ক্ষমতাসীন শাসক দলের অনুকূল অবস্থারই সূচক)। আর এ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থাটি আরোপিত অথবা স্বাভাবিক পরিস্থিতি—উভয়ই হতে পারে।

পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের যথাক্রমে ৭৫ ও ১৫০টি আসনের জন্য ২৯৩ ও ১০০৫ জন প্রার্থী ছিল। এতে আসনপ্রতি গড় প্রার্থীর হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩.৮৯ ও ৬.৭ জন। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের উভয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেই বিজয়ী প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সংখ্যালঘিষ্ঠ ভোটে পাস করে।

৪৭ জন এমএনএ (জাতীয় পরিষদ সদস্য) ও ১২৬ জন এমপিএ (প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) ৫০ শতাংশেরও কম ভোট পায়। পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আসনের জন্য যথাক্রমে ৩১৬ ও ৮৯০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ফলে সেখানে উল্লিখিত দুই পরিষদের আসনপ্রতি গড় প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪.২ ও ৫.৯ জন। এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ এমএনএ (৪৩) ও এমপিএ (৭৭) ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোটে জয়ী হয় । কাজেই প্রকৃত অবস্থার বিচারে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনের কাঠামোটি পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে দুর্বল ছিল।

দলওয়ারি হিসেবে মুসলিম লীগের লোকজন দৃষ্টত বেশি সংখ্যায় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত ৪৩ জন এমএনএ’র সঙ্গে “মুসলিম লীগের সম্পর্ক ছিল।”৫৪ আওয়ামী লীগ যারা করতেন তাঁদের কোনো কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি (এরা নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে) নির্বাচিত হন।

এঁরা হলেন: এমএনএ হিসেবে এএইচএম কামারুজ্জামান, মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন, বেগম রোকেয়া আনোয়ার ও মিজানুর রহমান চৌধুরী। আর আব্দুল মালেক উকিল ও অধ্যাপক ইউসুফ আলী এমপিএ হিসেবে নির্বাচিত হন। দুই পরিষদের নির্বাচিত এই আওয়ামী লীগ নেতাদের কারও বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় দলের ম্যান্ডেট লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং এঁদের প্রায় সকলেই পরের দিকের বছরগুলিতে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেন এবং বিরোধীদলীয় বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

আইয়ুব খানের শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্বাক্ষর হিসেবে ১৯৬২ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত ইতঃপূর্বে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ যে পরোক্ষ প্রতিরোধের মনোভাব প্রদর্শন করে তার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নয় ।

১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আর কিছু না হলেও অন্তত পরিষদে আলোচিত হয়েছিল । সেই শাসনতন্ত্র যদি আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়ে থাকে তাহলে ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রও তাদের কাছে উপাদেয় হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের কাছে যা যা অগ্রাধিকারমূলক বিবেচনার বিষয় সেই আলোকে ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের চেয়ে মূলত উন্নততর কিছুই ছিল না।৫৫ নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে যে হতাশা ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে তার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে আতাউর রহমান খানের পর্যবেক্ষণে।

তিনি বলেন, “ব্যক্তিবিশেষ এ শাসনতন্ত্র দিয়েছেন যাতে জনসাধারণের কাছ থেকে কোনো ম্যান্ডেট নেই।” এই শাসনতন্ত্রের আওতায় (১) সকল ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে কেন্দ্রীভূত; (২) এতে জনসাধারণকে ভোট প্রদান থেকে বঞ্চিত করে তাদের প্রতি পরিপূর্ণ অনাস্থা জ্ঞাপন করা হয়েছে; (৩) এতে এক ক্লীব ব্যবস্থাপক সভার ব্যবস্থাই করা হয়েছে। আতাউর রহমান এর কারণ নির্দেশ প্রসঙ্গে বলেছেন, “এ কথা দাবি করা যাবে যে শাসনতন্ত্রটি অত্যন্ত সাদাসিধে, সহজ-সরল।

যদি বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার বিলিবণ্টন করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা এতে থাকতো কেবল তাহলে মোকাবেলা, সংঘাত শুরু হতো, জটিলতা বেড়ে যেতো বহুগুণে । শাসনতন্ত্রে এ সবই সযত্নে এড়িয়ে গিয়ে শঠতার আশ্রয় নিয়ে তা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালানো হয়েছে। 

 

সামরিক আইনের আমল পর্ব-২

 

“সাধারণ মানুষ” সম্ভবত এর নিহিত তাৎপর্যটি বুঝতে পারেনি আর যদি বুঝেও থাকে, তা নিয়ে আশু প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে পূর্ব পাকিস্তানে নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনীতিকরা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সদস্যরা, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।

তাঁরা আইয়ুব খানের শাসনামলে গণতন্ত্রের বদ্ধদশার প্রতি জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন ও রাষ্ট্র কাঠামোতে আইয়ুব খানের ক্ষমতা আরো সংহত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর সাততাড়াতাড়ির নিরাময় ব্যবস্থাপত্রটি ঐ গোষ্ঠীর জন্য আশু উপশম দিলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের পথে এগিয়ে চলে ।

Leave a Comment