আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পটভূমি
১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পটভূমি

১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পটভূমি
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর শাসনব্যবস্থায় স্বৈরতান্ত্রিক এবং আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ১৯৫৮ সালে সরাসরি সেনা শাসন জারির পূর্ব পর্যন্ত যে শাসনামল তাকে বেসামরিক শাসন বলা গেলেও গণতান্ত্রিক শাসন বলা কঠিন।
তাছাড়া সেনা শাসন জারির বেশ আগে থেকে দেশের শাসন প্রক্রিয়ার ভেতর সেনাবাহিনীর পরোক্ষ ভূমিকা ও প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল। শুরু থেকেই পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব এবং চক্রান্তের রাজনীতি চলছিল। এমনি একটি পরিস্থিতিতে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল খুব অবাক হবার মত কোন ঘটনা নয়।
পটভূমি
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে স্নায়ুযুদ্ধ চলার সময়ে প্রায়ই সেনা শাসন জারি হতে দেখা যায়। কিন্তু সেনা শাসন হঠাৎ করেই আসত না। বরং এর পেছনে একটা পটভূমি বা প্রেক্ষাপট থাকত বা তৈরি করা হতো। পাকিস্তানও এ প্রক্রিয়ার বাইরে নয়। শুরু থেকে পাকিস্তানে আমলা, রাজনীতিবিদ, বিত্তবান, সেনা কর্মকর্তাদের ভেতর এক ধরনের অশুভ আতাত লক্ষ করা যায়।
এই এলিট গোষ্ঠীই শেষপর্যন্ত পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করে এরাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করেছে এবং শেষপর্যন্ত সেনা শাসনের সহায়ক হয়েছে। পাকিস্তানের সেনা শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার পেছনে যেসব ঘটনা চিহ্নিত করা যায় তা হলো:
যুক্তফ্রন্ট সরকার উৎখাত ও গণতন্ত্র বিকাশে বাধা:
১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের নিকট রীতিমত পর্যুদস্ত হয়। এ পরাজয় ক্ষমতাসীন এলিটদের জন্য ছিল দারুণ আঘাত। সুতরাং তারা নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে অস্থিতিশীল এবং উৎখাত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। শেষপর্যন্ত অগণতান্ত্রিকভাবে এবং মিথ্যা অভিযোগে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল বরখাস্ত করেন।
এক্ষেত্রে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ‘৯৪ক’ ধারাকে ব্যবহার করা হয়। বরখাস্ত করার সময় যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। আদমজি জুট মিলের দাঙ্গার জন্য যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দায়ী করা হয় এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের ঘোষণা দেয়া হয়।
কিন্তু এমনিভাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা কোনভাবেই গণতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক বিধি সম্মত নয়। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে এভাবে উৎখাতের কারণে পুরো পূর্ববাংলার রাজনৈতিক চরিত্রই বদলে যায়। বিভিন্ন অন্তর্দ্বন্দ এবং দারুণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উদ্ভব ঘটে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকে।
যুক্তফ্রন্টের অন্তর্দ্বন্দ্ব:
যুক্তফ্রন্ট ছিল একাধিক রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক জোট। নির্বাচনে জয়লাভের পর পর মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে ফ্রন্টের ভেতর অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই অন্তর্দ্বন্দ্বে শেরে বাংলা ফজলুল হকের ভূমিকাই বেশি দায়ী ছিল। শেষপর্যন্ত অন্তর্দ্বন্দ্বের একটা সুরাহা হলেও তা ছিল আপাত সমাধান।
পরবর্তীকালে এই দ্বন্দ্ব আবার দেখা দেয় এবং যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। প্রদেশে দারুণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয় যা প্রকারান্তে ষড়যন্ত্রকারীদের টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়।
১৯৫৬ সালের খাদ্যভাব ও সরকারের ব্যর্থতা:
১৯৫৬ সালে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে শেষপর্যন্ত দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। সরকারের এই ব্যর্থতা অনেকটা অদক্ষতার নামান্তর। তারা সঠিক সময়ে খাদ্য আমদানী করে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে দেশের মানুষ স্বভাবতই সরকারের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে।
দেশে অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব সময়ই অগণতান্ত্রিক শক্তি উৎসাহিত হয়। এমন কি ভুখা মিছিলে গুলি করে অনেক লোকও হত্যা করা হয়।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং আওয়ামী লীগ সরকার বরখাস্ত :
যুক্তফ্রন্ট সরকার বরখাস্ত, যুক্তফ্রন্টের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং কেন্দ্রীয় সরকারের চক্রান্তের এক পর্যায়ে নির্বাচনী জোট যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায় । ফ্রন্টের প্রধান শরীক দল আওয়ামী লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে নতুন করে প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। কিন্তু এতে করে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও শুরু হয় অন্তর্দ্বন্দ।
মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান এবং দলের মহাসচিব শেখ মুজিবুর রহমান পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ এরই সুযোগে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সরকারকে বহিস্কার করে। অন্যদিকে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এ অবস্থায় দেশের বিশেষ করে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চরমে পৌঁছে। প্রাদেশিক সরকার নিয়ে রীতিমত মিউজিক্যাল চেয়ার শুরু হয়ে যায় ।
ডেপুটি স্পিকার হত্যা:
যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যাবার পর পূর্ববাংলায় আওয়ামী লীগ এবং কৃষক-প্রজা পার্টির ভেতর দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল। প্রাদেশিক সরকার নিয়ে দু’পক্ষের লড়াই ছিল তিক্ততম পর্যায়ে। এরই এক পর্যায়ে ১৯৫৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পূর্ববাংলার আইন পরিষদে বিরোধী দল কৃষক-প্রজা পার্টির আক্রমণের এক পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী মাথায় আঘাত পেয়ে নিহত হন।
ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর মৃত্যু ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য দারুণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। বলা যায় এই ঘটনা সেনা শাসন আনয়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রত্যক্ষ নিয়ামক হিসাবে কাজ করে ।
ইস্কান্দার মীর্জার অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত:
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা দেশে সামরিক আইন জারি করেন। তিনি তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, অস্থিতিশীল সরকার, অবাধ দুর্নীতি, রাজনৈতিক কোন্দল, সংবিধান অকার্যকর হওয়া প্রভৃতি কারণে তাঁর পক্ষে দর্শক হয়ে থাকা সম্ভব হয়নি; বরং সেনা শাসন জারিতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু ইস্কান্দার মীর্জার এই আচরণ ছিল অগণতান্ত্রিক, সংবিধান বিরোধী এবং স্বার্থতাড়িত।
যেসব অভিযোগে তিনি সামরিক শাসন জারি করেছিলেন তার দায়িত্ব তিনি নিজেও এড়াতে পারেন না; উল্টো এসব পরিস্থিতির বেশির ভাগের পেছনেই তাঁর হাত ছিল । তাছাড়া ১৯৫৬ সালের সংবিধান অনুসারে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির এ ধরনের কোন চরম সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার ছিল না। তিনি প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাবর্গ এবং এলিট গোষ্ঠীর প্রতিভূ হিসাবে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের নিমিত্তে সেনা শাসন জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সামরিক শাসন ঘোষণা
প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং সেনা প্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। সামরিক আইন জারি করা হয় গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। যেখানে রাষ্ট্রপতি সামরিক শাসন জারির কারণ হিসাবে দুর্নীতি, কোন্দল, অস্থিতিশীলতা প্রভৃতিকে চিহ্নিত করেন।
গণতন্ত্রের মাধ্যমে যে দেশের সংকট দূর হবে না তা মীর্জা তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা এতই নীচে নেমে গেছে যে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানের গোলযোগপূর্ণ অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। নির্বাচনে জয়ী হলে তারা পুনরায় দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির পদ্ধতি প্রয়োগ করবেন।”
তিনি আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমেও সমস্যার কোন সমাধান দেখছেন না বলে ঘোষণা করেন। সামরিক শাসনের ঘোষণা দিয়ে বলা হয় :
ক. ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল থাকবে।
খ. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারসমূহ বরখাস্ত করা হলো।
গ. জাতীয় পার্লামেন্ট ও প্রাদেশিক পরিষদসমূহ ভেঙ্গে দেয়া হলো।
ঘ. সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো।
ঙ. বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সেনা শাসন বহাল থাকবে।
এভাবেই ১৯৫৮ সালের সেনা শাসনের শুরু। পরবর্তীকালে আরো একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেখা যায় প্রধান সামরিক শাসকের আদেশ জারি করা হয়। ২৭ অক্টোবর আইয়ুব খান রাষ্ট্রপতির পদও দখল করেন। তখন থেকে তাঁর নামেই সেনা শাসন শুরু হয়।
সারসংক্ষেপ
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে নানাবিধ পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিল। আর সংসদীয় গণতন্ত্রের ব্যর্থতার সুযোগেই শেষপর্যন্ত সেনা শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন হবার পর থেকে যেভাবে দেশ চলছিল তাতে দিনে দিনে একটি অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপট সবার অজান্তেই তৈরি হচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটের ওপর ভর করে সেনাবাহিনী ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হয়।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯২।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খান কিভাবে সামরিক শাসনের পথ তৈরি করেন লিখুন।
২। সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যর্থ হবার ৫টি কারণ চিহ্নিত করুন ।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পটভূমি আলোচনা করুন। সংসদীয় গণতন্ত্র অকার্যকর হওয়ার কী কী কারণ আপনি চিহ্নিত করেন?
