বিদ্রোহ দমন অভিযানে সৈন্য মোতায়েন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ বিদ্রোহ দমন অভিযানে সৈন্য মোতায়েন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

বিদ্রোহ দমন অভিযানে সৈন্য মোতায়েন

 

বিদ্রোহ দমন অভিযানে সৈন্য মোতায়েন

 

বিদ্রোহ দমন অভিযানে সৈন্য মোতায়েন

যখন আমি ইস্টার্ন কমান্ডের দায়িত্বভার গ্রহণ করি, তখন বিরাজমান পরিস্থিতি আমাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেনানায়ক ফিল্ড মার্শাল ফচের একটি উক্তি মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কেন্দ্রভাগ ভেঙে পড়ছে। আমার দক্ষিণ পাশেরও পতন ঘটেছে তবু পরিস্থিতি চমৎকার।

আমি অবশ্যই হামলা করবো। আমি নিজে যে বলি, আমার কেন্দ্রভাগ বিধ্বস্ত। আমার উভয় পাশের পতন ঘটেছে। পরিস্থিতি ভালো হওয়ার লক্ষণ নেই। আমাকে এ অবস্থায়ও হামলা চালাতে হবে।’ তাই করেছিলাম আমি। ত্বরিৎ গতিতে আমি হামলা চালাই এবং আল্লাহর রহমতে যুদ্ধের প্রথম রাউন্ডে পূর্ণ সফলতা অর্জন করি। প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সব ফরমেশনে দুটি চিঠি পাঠাই। চিঠি দুটি ৩ ও পরিশিষ্টে দেওয়া হলো ।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছিল তিন দিক থেকে ভারত পরিবেষ্টিত। সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩ হাজার মাইল (২ হাজার ৫০০ মাইল স্থল এবং ৫০০ মাইল সমুদ্র)। এ সীমান্ত অভিন্ন রেখার অথবা অর্ধ- বৃত্তাকার অবস্থায় নেই ।

তবে সীমান্ত প্রদেশটিকে কম-বেশি একটি পূর্ণ বৃত্তে রূপ দিয়েছে। বড়ো বড়ো নদীগুলো মাঝ বরাবর প্রবাহিত হওয়ায় দেশটি ৪টি অংশে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। এ জন্য অব্যাহত প্রতিরক্ষা লাইন রক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

টিক্কা খানের সৈন্য মোতায়েন আমি অক্ষুণ্ণ রাখি। আমি গেরিলাদের উচ্ছেদ করার সংকল্প গ্রহণ করি। এ জন্য আমার সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা ছিল : ক. সীমান্তের দিকে গেরিলাদের ঠেলে দেওয়া এবং চূড়ান্তভাবে তাদের ধ্বংস করা অথবা ভারতের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়া।

এতে সময় লাগতে পারে এবং জান-মালের প্রচুর ক্ষতিও হতে পারে। আমাকে লড়াই করতে হবে গেরিলাদের সুবিধাজনক অবস্থানে যেখানে তারা পুনরায় শক্তি বৃদ্ধি এবং সুযোগ মতো প্রত্যাহারের সুবিধা ভোগ করছে এবং তাদের এ সুবিধা শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে।

ব উভয় পাশের ও পেছনের অবস্থানের চিন্তা বাদ দিয়ে সীমান্তের দিকে বিরাট বহর নিয়ে অগ্রসর হওয়া এবং গেরিলাদের পুনরায় শক্তি বৃদ্ধি ও প্রত্যাহারের রুট বন্ধ করে দেওয়া। আমাদের ক্ষিপ্র অভিযান ও উপর্যুপরি হামলায় আমরা বিস্ময় উৎপাদন করব এবং এভাবে গেরিলাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করব। এ প্রক্রিয়ায় গেরিলারা তাদের অবস্থান ত্যাগে বাধ্য হবে। এবং নিরাপত্তার জন্য ভারতের দিকে পালাবে। আমি দ্বিতীয় পথ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

জেনারেল টিক্কার সৈন্য মোতায়েন পদ্ধতি ছিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আত্মরক্ষামূলক। আক্রমণ অভিযানে নামার আগে গ্রুপিং এবং সৈন্য মোতায়েনে কিছুটা পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়োজন ছিল। আমি বিস্ময় সৃষ্টি এবং শত্রুর আক্রমণ করার ক্ষমতা ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম।

সুতরাং দ্রুত সীমান্তে পৌঁছানোর জন্য গতি ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই আমি সামান্য পরিবর্তন ঘটাই। ফরমেশনগুলোকে নতুন দায়িত্ব দিই এবং ক্ষিপ্র অভিযানের জন্য তাদের প্রস্তুত হতে বলি। আমি স্রেফ তাদেরকে বললাম, ‘সর্বোচ্চ গতিতে সংক্ষিপ্ততম সময়ে সীমান্তে পৌঁছে যাও।’

আমি নিচের চারটি পর্যায়ে পালনীয় নির্দেশ জারি করি :

পর্যায় ১ :

সীমান্তবর্তী সকল বড়ো শহর মুক্ত করা এবং অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের রুটগুলো বন্ধ করে দেওয়া । চট্টগ্রাম ঘাঁটি মুক্ত করা এবং এটাকে আর্টিলারি ও মর্টারের গোলাবর্ষণ থেকে নিরাপদ রাখা।

পর্যায় ২:

প্রয়োজনীয় নদী, সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত খুলে দেওয়া।

পর্যায় ৩:

মুক্তিবাহিনীর কব্জা থেকে অভ্যন্তরীণ সকল শহর ও উপকূলীয় এলাকা উদ্ধার করা।

পর্যায় ৪:

সারা প্রদেশে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা এবং বিদ্রোহী/ অনুপ্রবেশকারীদের নির্মূল করা । অন্তত ১৯৭১ সালের ১৫ই মে’র মধ্যে এসব কাজ সম্পন্ন করতে হবে। গতি ও উপর্যুপরি হামলার জন্য পুরস্কার প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হয়।

সৈন্যদল এবং দায়িত্ব

এ দিকে মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহর আওতাধীন ১৬তম ডিভিশনকে রাজশাহী সিভিল ডিভিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া এ ডিভিশনের ওপর দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া ও রাজশাহী ধরে রাখার দায়িত্বও অর্পণ করা হয়। ভারতীয় ক্যান্টনমেন্ট কাছে থাকায় এবং এলাকাটি ট্যাংক চলাচলের জন্য উপযোগী হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র ট্যাংক রেজিমেন্টটি দেওয়া হয় এই ডিভিশনকে।

মেজর জেনারেল শওকত রেজার নেতৃত্বাধীন ৯ম ডিভিশনকে ঢাকা ও খুলনা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ায় এবং একটি বিমান বন্দর থাকায় ঢাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার উত্তরাংশে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। তবে মধুপুর জঙ্গল ও টাঙ্গাইল শহরের আশপাশে আত্মগোপন করার মতো ভালো অবস্থান ছিল।

শক্তি দিয়ে ময়মনসিংহকে রক্ষা করতে হবে। রাজশাহী বিভাগের পর পরবর্তী অগ্রাধিকার দেওয়া হয় খুলনা বিভাগের ওপর। যশোরকেও শক্তি দিয়ে ধরে রাখতে হবে। ফরিদপুরের ওপর ঢাকা ও যশোরের নিরাপত্তা নির্ভর করছে বলে এটাকে ধরে রাখতে হবে। জলাবদ্ধ এলাকা চালনা, বরিশাল ও সুন্দরবনের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিএএফ’র ওপর।

মেজর জেনারেল আবদুর রহিম খানের নেতৃত্বাধীন ১৪তম ডিভিশনকে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামকে ধরে রাখতে হবে। চট্টগ্রাম ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে কমান্ডো মোতায়েন করা হয়।

ডিভিশনের এলাকা এবং দায়িত্ব বণ্টনের পর এগুলো পরিদর্শনে যাই আমি। এরপর আমি আমার বিস্তারিত পরিকল্পনা, পরবর্তী গ্রুপিং এবং ফরমেশনের নতুন সীমানা বন্টনের কাজ শুরু করি।

এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, যেখানে জনগণ আপনার বিপক্ষে এবং আপনার শত্রুর প্রতি সহানুভূতিশীল এমন একটি বৈরি ভূখণ্ডে কোনো শক্তি টিকতে পারে না। বিশ্বাসঘাতকরা শত্রুর সাথে সহযোগিতা করায় সশস্ত্র বাহিনীর বীরত্ব ও সাহসিকতা সত্ত্বেও জাতির মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়।

আমাদেরকে ভেতর ও বাইরের উভয় শক্তিকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। টিক্কা খানের নিষ্ঠুর সামরিক অভিযানের পর স্থানীয় জনগণ আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং একটি বৈরি ভূখণ্ডে আমরা বিদেশিদের মতো হয়ে যাই।

বাঙালিরা আমাদেরকে দখলদার বাহিনী’ বলতো। মুক্তিবাহিনী শুধু স্থানীয় জনগণ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নয়, ভারতের গোটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো এবং রুশ উপদেষ্টাদের সহযোগিতাও পেতো।

যদিও প্রতিপক্ষ সংখ্যায় ছিল বেশি এবং তারা ছিল স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে অভ্যস্ত ও রণাঙ্গনের সাথে পরিচিত এবং আক্রমণ করার সামর্থ্যের অধিকারী তবু আমরা রেকর্ড সময়ে সাফল্যের সাথে প্রথম পর্যায় ও দ্বিতীয় পর্যায়। সম্পন্ন করি।

৯৭১ সালে এপ্রিলের শেষ নাগাদ আমরা সব সীমান্ত শহর ও বিএপি দখল, অনুপ্রবেশের রুট বন্ধ এবং পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত পুনরুদ্ধার করি। মে মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম, খুলনা ও চালনার সমুদ্র রুট ও নদীগুলো মুক্ত করি এবং এসব বন্দরে নৌযান ও জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়। প্রদেশে রেল যোগাযোগও পুনরুদ্ধার করা হয়।

১৯৭১ সালের ১৩ই মে আমি রাওয়ালপিন্ডিতে একটি বার্তা পাঠাই যেখানে আমি সর্বশেষ পরিস্থিতি, বিদ্রোহী তৎপরতার ধরন, ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিস্তৃতি, সীমান্তের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন ফরমেশনের ওপর ন্যস্ত এলাকা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিই। শহর এলাকায় পরাজিত হয়ে বিদ্রোহীরা প্রত্যন্ত এলাকায় পিছু হটে অথবা সীমান্তের ওপারে চলে যায়। প্রায় ৩০ হাজার বিদ্রোহী নিহত অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

এই নতুন বিন্যাসে সৈন্য মোতায়েন করা হয় যা নিম্নরূপ : মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ-এর নেতৃত্বাধীন তিনটি ব্রিগেড ও একটি সাঁজোয়া রেজিমেন্টের সমন্বয়ে গঠিত ১৬তম ডিভিশনকে দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মেজর জেনারেল এমএইচ আনসারীর নেতৃত্বাধীন দুটি ব্রিগেডের সমন্বয়ে গঠিত ৯ম ডিভিশনকে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, ভোলা দ্বীপ, পটুয়াখালী, বুলনা, যশোর, চুয়াডাঙা ও মেহেরপুর এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাকশি সেতুও ঐ ডিভিশনের ওপর অর্পণ করা হয়। পানিবন্ধ এলাকা চালনা, বরিশাল। ও সুন্দরবনের দায়িত্ব সিএএফ’র ওপরই ন্যস্ত রাখা হয়।

মেজর জেনারেল রহিম খানের নেতৃত্বাধীন তিনটি ব্রিগেডের সমন্বয়ে গঠিত ১৪তম ডিভিশনের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় ময়মনসিংহ, সিলেট এবং কুমিল্লা পর্যন্ত এবং আরো অন্তর্ভুক্ত করা হয় ফেনী নদী, নোয়াখালি ও ঢাকাকে। এ ছাড়া, ১৪তম ডিভিশনের ওপর ভৈরব সেতুর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। একটি স্বতন্ত্র ব্রিগেড ও ইস্টার্ন কমান্ডের অধীনস্থ কমান্ডোদের ওপর চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

নতুন করে সৈন্য বিন্যাসে নিচের পরিবর্তন ঘটানো হয় : যুদ্ধের চাপে নিস্তেজ ও অকর্মণ্য হয়ে পড়ায় মেজর জেনারেল শওকত রেজাকে ৯ম ডিভিশনের কমান্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পদোন্নতি দেওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার এমএইচ আনসারীকে এবং তাকে ৯ম ডিভিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই ডিভিশনের মূল কাজ ছিল ঢাকা ও খুলনার সিভিল ডিভিশনের প্রতিরক্ষা। এক ব্রিগেড বাদে এ ডিভিশনকে শুধু খুলনা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম সিভিল ডিভিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ১৪তম ডিভিশনকে। এ এলাকা এতো বড়ো ছিল যে, একটি ডিভিশনের পক্ষে সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে। তাই এ এলাকাকে দুটি অংশে ভাগ করা হয়। ফেনী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে এ ডিভিশনের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং তাদের ওপর ফেনীর উত্তরে একটি সংযুক্ত এলাকার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৬তম ডিভিশনের এলাকায় কোনো পরিবর্তন আনা হয় নি।

এ সৈন্য বিন্যাস এবং এলাকা পুনর্গঠন রণকৌশলের দিক থেকে আরো কার্যকর বলে বিবেচিত হয়। ফরমেশন কমান্ডারদেরকে তাদের ভবিষ্যৎ কাজের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে বলা হয়। ভবিষ্যৎ কাজের মধ্যে ছিল যোগাযোগের উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি। শক্ত ঘাঁটির ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা ব্যূহ এবং অবস্থানে গোলাবারুদ ও রেশনের মজুদ গড়ে তুলতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে, বিরাট ক্ষতি হয় তাদের জানমালের। এ সময়ে বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা দুর্গম এলাকায় অথবা ভারতের মাটিতে নিরাপদ ঘাঁটিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এ পরিস্থিতিতে ভারত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম সরবরাহ করে বিদ্রোহীদের মনোবল চাঙ্গা করার পদক্ষেপ নেয়।

ভারতীয়রা সীমান্তের কাছে আমাদের অবস্থানে সরাসরি হামলা করে এবং সীমান্তের ওপার থেকে গোলাবর্ষণ করে বিদ্রোহীদের তৎপরতায় সমর্থন যোগাতে থাকে। কিন্তু হতোদ্যম বিদ্রোহীরা আমাদের সৈন্যদের সামনে দাঁড়াতেই পারছিল না। তারা ভয়ে পালিয়ে যেত নয়তো ভারতে আশ্রয় নিতো।

এসব অভিযানকালে প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল, ১০টি ভারি মেশিনগানসহ ৬৫টি মেশিনগান, ১৪০টি হালকা মেশিনগান, ৩১টি মর্টার, ১২টি রিকয়েললেস রাইফেল ও প্রচুর পরিমাণ গোলাবারুদ আমাদের হাতে আটক হয়। আমাদের ঝড়োগতিতে সামরিক অভিযান চালানোর ফলে শত্রুদের এতো বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র খোয়া যায় এবং তাদের এতো প্রাণহানি ঘটে।

যে গতিতে এসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয় গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসে সে ধরনের নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রচণ্ড গতিতে হামলা চালানোর ফলেই শত্রুরা ভেঙে পড়ে। তারা যুদ্ধ করার মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং আত্মরক্ষার জন্য এদিক-সেদিক ছুটে যায়।

এ সময় তারা প্রচুর গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র ও পরিবহন ফেলে রেখে যায়। তারা সংগঠিত উপায়ে ন বরং চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পিছু হটে। স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সমর্থন এবং ভারতীয়দের সহযোগিতা দান সত্ত্বেও দুই মাসেরও কম সময়ে বিদ্রোহীরা তাদের নিজেদের এলাকায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ অভিযানকে সঠিকভাবে বলা যেতে পারে ‘বজ্র অভিযান’। আমি এসব অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে যথা সময়ে রিপোর্ট পাঠাই এবং ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া মুক্তিবাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ভারতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করি।

জেনারেল হামিদ আমাকে টেলিফোনে বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও আমি উভয়ে আপনার বিস্ময়কর সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত। তবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করবেন না। আমি শিগগির আপনার সাথে আপনার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করবো।’ ব্যস এতোটুকুই।

সীমান্ত বন্ধ এবং যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় আমাদের দ্রুত অভিযান পাল্টে দেয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিসাব। ভারতীয়রা ধারণা করেছিল যে, মুক্তিবাহিনী প্রদেশের ভেতরে বড়ো বড়ো শহর ও ক্যান্টনমেন্টের আশপাশে পাকিস্তান। সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রাখবে এবং আমাদের সরবরাহে ঘাটতি ও অনিয়মের দরুন কয়েক মাসেই তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলবে।

জেনারেল টিক্কা কমান্ডে থাকলে অথবা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি কাজ করলে ভারতীয় কৌশলবিদদের এ সহজ সমীকরণ সফল হতো। ভারতীয়রা হিসাব করেছিল যে, একজন গেরিলা একজন করে পাকিস্তানি সৈন্য হত্যা করতে পারলে কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তান গ্যারিসন ফাঁকা হয়ে যাবে

মেজর জেনারেল ফজল মুকিম খান (অব) তার ‘পাকিস্তান’স ক্রাইসিস ইন লিভার শিপ’ বইয়ে লিখেছেন যে, “বিদ্রোহী বাহিনী ভারতে পিছু হটে এবং মনোবল হারিয়ে ফেলে। তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলাও চরমে পৌঁছে। পিছু হটে যাবার পথে তারা রাস্তাঘাট, নৌযান ও পরিবহন ধ্বংস করেছে। যেগুলো তারা ভারতে নিয়ে যেতে পারে নি সেগুলো হয় তারা ধ্বংস করেছে নয়তো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী দ্রুতগতিতে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। অভিযানে তারা যে ক্ষিপ্রগতির পরিচয় দিয়েছে তাতে শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই বিস্মিত হয়েছে। তাদের এ্যাকশন সে সময় ভারতকে পূর্ব পাকিস্তানে দুঃসাহসিক অভিযান চালাতে বিরত রেখেছে।

তাদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা তারা অর্জন করেছিল। তবে পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব ছিল সরকারের। ফজল মুকিম তার বইয়ের ১২৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন :

‘সেপ্টেম্বরে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে মোটামুটি শান্তি ছিল এবং মনে হচ্ছিল প্রদেশে নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসছে। এর কারণ হচ্ছে বর্ষকালে মুক্তিবাহিনীর বহুল। প্রচারিত অভিযান ব্যর্থ হয়। ভারতে বিদ্রোহীদের ক্যাম্পে বিদ্রোহের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। মুক্তিবাহিনী নিঃশেষ হয়ে যাবার মতো এবং আত্মসমর্পণ করার মতো।

অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছিল বলেও জানা গেছে। কিন্তু এ পরিস্থিতির কোনো রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করা হয় নি। মেজর জেনারেল শওকত রেজা (অব.) তার ‘দ্য পাকিস্তান আর্মি : ১৯৬৬-৭১’ বইয়ে লিখেছেন :

“পাকিস্তান সেনাবাহিনী বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ৮ সপ্তাহে প্রায় সব শহরে সরকারি কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। বিদ্রোহ দৃশ্যত নির্মূল হয়ে যায়। বিদ্রোহীরা নাজুক অবস্থায় পৌঁছে। কতিপয় বাঙালি নেতা রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। এ ধরনের একটি সমাধানের জন্য সেটাই ছিল সঠিক সময়। কিন্তু আমরা এ সুযোগ হাতছাড়া করি। এরপর পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হতে থাকে।

 

এ সময় প্রায় সব শহরে সরকারি কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করা হয়। বিদ্রোহীরা নিহত কিংবা গ্রেফতার হয় অথবা পালিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আত্মগোপন করে অথবা ভারতে পালিয়ে যায়। বাঙালি পুলিশ ও আমলারা ধীরে ধীরে তাদের কাজে ফিরে আসেন এবং সামরিক কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে থাকেন।’

মেজর জেনারেল খুশবন্ত সিং তার ‘দ্য ইনডিয়ান আর্মি আফটার ইনডিপেনডেন্স’ বইয়ের ৪৩৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন :

সীমান্তের ভেতর ও বাইরে থেকে বিদ্রোহীদের সাথে লড়াইয়ে প্রবল চাপের মুখে পড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৪২ হাজার নিয়মিত সৈন্যের পাকিস্তান বাহিনীকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী একটি বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে হয়েছে।

তারা প্রদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হলেও তাদেরকে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ দমন অভিযানে বহু মূল্য দিতে হয়েছে। প্রাণহানির সংখ্যা অনেক। ২৩৭ জন অফিসার, ১৩৬ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং ৩ হাজার ৫৫৯ জন সৈন্য নিহত হয়েছে।”

যখন জেনারেল আবদুল হামিদ খান ১৯৭১ সালের জুনে আমাদের দেখতে এলে আমি তাকে জানাই যে, ‘আমরা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং অভি সংক্ষিপ্ত সময়ে বিরাট নৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় অর্জন করেছি। আমাদের মনোবল উঁচু।

পক্ষান্তরে, বাঙালিদের নিচু। বাঙালিরা রয়েছে দৌড়ের ওপর। এতে ভারতীয়রা হাত গুটিয়ে নিচ্ছে এবং রুশরা অনেকটা বিস্মিত হয়ে গেছে। আমার সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয়রা মর্ম জ্বালায় ভুগছে।”

আমি আরো বললাম যে, ‘সময় থাকতে আমাদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। ভারতীয় ভূখণ্ডে বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে হামলা করে তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে এবং এভাবে বিদ্রোহীদের ভবিষ্যতে সহায়তা দানে ভারতকে বিরত থাকতে বাধ্য করতে হবে।

আমার কথা মতো কাজ করা হলে লাখ লাখ ভারতীয়কে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর জন্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটাতে হতো। সে ক্ষেত্রে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ হয়ে যেত এবং সরকারি অফিস ও অন্যান্য জায়গায় লোকজন আশ্রয় নিতো। এভাবে ভারতের বেসামরিক প্রশাসনের জন্য অসংখ্য সমস্যা সৃষ্টি হতো এবং ভারতীয় সৈন্যদের যে-কোনো অভিযান বাধাগ্রস্ত হতো।

তখন পর্যন্ত আমরা আমাদের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে লড়াই করছিলাম এবং বৈষয়িকভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলাম। কিন্তু ভারত সরকার যদি নিজেদের জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে দেখতে পেতো এবং তাদের সম্পদের হানি ঘটতো তাহলে তারা তাদের আগ্রাসী মনোভাবে বিরতি দিতে বাধ্য হতো। উপরন্তু, মুক্তিবাহিনীর সংগঠিত প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে যেতো। ফলে তাদের মনোবলে চিড় ধরতো এবং একেবারে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়তো।’

ভারতীয় সেনাবাহিনী সে মুহূর্তে আমাদের অপ্রত্যাশিত হামলা মোকাবিলায় মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতীয়রা সংঘটিত হয়ে যায় এবং আমার অগ্রাভিযান মোকাবিলার মতো অবস্থায় পৌঁছে যায়। আমাকে অনুমতি দেওয়া হলে আমি গেরিলা ক্যাম্প ধ্বংসের মাধ্যমে তাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন, গেরিলাদেরকে ভারতের গভীর অভ্যন্তরে বিতাড়িত এবং সীমান্তে মোতায়েন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে পিছু হটিয়ে দিতে পারতাম।

সামনেই ছিল বর্ষাকাল। তাই আমরা এ উদ্যোগ নিলে সে সময় ভারতীয়রা তাদের ভারী অস্ত্র ও বিমান বাহিনী ব্যবহার করে আমাদেরকে আমাদের অবস্থান থেকে হটাতে পারতো না। এ সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যারিসন এগিয়ে এলে

আমরা সফল হতাম। আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব ছিল যে, আমার ডিভিশনগুলোতে ট্যাংক ও কামানের ঘাটতি পূরণ এবং আমাকে এক স্কোয়াড্রন আধুনিক জঙ্গীবিমান ও বিমান- বিধ্বংসী সরঞ্জাম এবং একটি পদাতিক ব্রিগেড দেওয়া হলে আমি আগরতলা ও আসামের এক বিরাট অংশ দখল করে নেব এবং পশ্চিমবঙ্গে উপর্যুপরি চাপ সৃষ্টি করবো।

আমরা হুগলি নদীর ওপর সেতু এবং জাহাজ ও নৌযান ধ্বংস করে। কলকাতার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবো এবং বেসামরিক লোকজনের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি জিরো ফাইটার যেভাবে কলকাতায় বোমা ফেলেছিল সেভাবে এ শহরে একবার বিমান হামলা হলে কলকাতা একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়বে।

আমার তৃতীয় প্রস্তাব ছিল : আমার ঘাটতি পূরণ করতে হবে, আমাকে আরো দুটি ডিভিশন, কয়েকটি জঙ্গীবিমান ও কয়েকটি বিমান-বিধ্বংসী কামান দিতে হবে (পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ক্ষুণ্ণ না করে আমার এ দাবি সহজে পূরণ করা যেত) এবং আমাকে এগুলো সরবরাহ করা হলে আমি ভারতের মাটিতে শুধু পূর্ব পাকিস্তানের নয়; গোটা পাকিস্তানের লড়াই চালাতে পারবো। আমাদের ৫ ডিভিশনের বিপরীতে ভারতকে অন্তত ১৫ ডিভিশন সৈন্য এবং তাদের নৌ ও বিমান বাহিনীর এক বিরাট অংশ মোতায়েন করতে হবে।

একই সাথে ভারতকে চীন সীমান্তে কয়েক ডিভিশন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য আরো কয়েক ডিভিশন সৈন্য মোতায়েন রাখতে হবে। এভাবে ভারত পশ্চিম রণাঙ্গনে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আমাদের জন্য কাশ্মীর ও গুরুদাসপুর মুক্ত করা কোনো সমস্যা হবে না। পশ্চিম রণাঙ্গণে ভারত শক্তিশালী হলে পূর্ব রণাঙ্গনে সে দুর্বল হয়ে পড়বে। দুটি ফ্রন্টে তাদর শক্তিতে ভারসাম্য থাকবে না।

মিজো মুক্তিবাহিনীর নেতা লাল ডেঙ্গা, আসামে নাগা মুক্তিবাহিনীর নেতা এ. জেড, ফিজো ও পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদারের সাথে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তারা আমাদের সাথে যোগ দেবে এবং ভারতের মাটিতে লড়াই শুরু করে দিতে পারলে আমাদের নিজেদের বাঙালিরাও আমাদের সাথে যোগ দিতে পারে।

এটা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত একটি সুযোগ। আমাদেরকে এ সুযোগ কাজে লাগতে হবে। নৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ভারতে প্রবেশ করা যৌক্তিক। কারণ, তারা আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে এবং আমাদের ভূখণ্ডে লড়াই চালাচ্ছে।

জেনারেল হামিদ বলেন যে, আমার প্রস্তাবের অর্থ হচ্ছে ভারতের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। আমি তার সাথে একমত হলাম এবং বললাম যে, আমরা তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেই তারা শান্তির পথে আসতে বাধ্য হবে। ভারত কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টি মেনে নেয় নি।

পাকিস্তান ও মুসলমান বাঙালি অথবা অবাঙালি কারো প্রতিই তার সহানভূতি নেই। ভারত তার সুবিধামতো যে- কোনো সময় কোনো কারণ এবং হুঁশিয়ারি ছাড়াই আমাদের আক্রমণ করবে। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত কখনো শান্তি চায় নি।

ইতোমধ্যে সে ৭ বার আমাদের সাথে লড়াই করেছে এবং বর্তমানে সে পূর্ব পাকিস্তানে পরোক্ষ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, ‘আমাদেরকে দেরি না করে এখনই হামলা করতে হবে। তাহলে মুখে তারা অহিংসতার যে বাণী প্রচার করে বাস্তবে তাই করতে বাধ্য হবে।’

ধৈর্যের সাথে আমার যুক্তি শুনে জেনারেল হামিদ উত্তরে বলেন, ‘নিয়াজি আপনার প্রস্তাব সুন্দর, যুক্তি সঠিক এবং এগুলো বিবেচনার দাবি রাখে। আমি আপনার সহায়তায় সৈন্য ও সমরাস্ত্র পাঠাতে পারি এবং আমরা পূর্ব রণাঙ্গনে পাকিস্তানের লড়াই করতে পারি।

ভারতের মাটিতে এ যুদ্ধ নিয়ে যেতে অথবা কোনো রকম ঝামেলা ছাড়া আপনার শেষ প্রস্তাব রক্ষা করতে পারলে আমি খুশি। হতাম। কিন্তু আমাদের সরকার ভারতের সাথে প্রকাশ্যে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত। নয়। আমরা যেভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি সেভাবেই সরকার যুদ্ধ করার পক্ষে।

আপনি এ যুদ্ধে চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছেন। এখন মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আপনার কাজ হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশ সরকার গঠন করার সুযোগ না দেওয়া। আপনি এটুকু করতে পারলেই আমরা আপনার এবং আপনার অধীনস্থ সৈন্যদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবো।

আপনি ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ অথবা ভারতে হামলার জন্য কোনো সৈন্য পাঠাবেন না। শুধু তাই নয়, আপনি ভারতীয় ভূখণ্ডে গোলাবর্ষণও করবেন না। আপনি কেবল বৈরি শক্তিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশে প্রবল বাধা দেবেন এবং তাদের উৎখাত করবেন।

তখন আমি বললাম, “বাঙালিরা কি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য প্রস্তুত?” তিনি বললেন, ‘টাইগার, আপনি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য মাধ্য ঘামাবেন না। বিষয়গুলো খুবই জটিল কিন্তু। আমি বললাম, “ঠিক আছে স্যার।’

ভারতে প্রবেশ করে বিদ্রোহীদের সাথে লড়াই এবং ভারতের ভূখণ্ডে যুদ্ধকে বিস্তৃত করার আমার স্বপ্ন এবং চিন্তাধারা এভাবেই সেখানে শেষ হয়ে যায়। মেজর জেনারেল খুশবন্ত সিং তার ‘দ্য লিবারেশন অব বাংলাদেশ’ বইয়ের ৬৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিকে গেরিলাদের হটিয়ে দিতে এবং ভারতে তাদের ঘাঁটি ধ্বংসে পূর্বাঞ্চলে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করার যৌক্তিক সুযোগ ইয়াহিয়া খানের ছিল এবং তিনি পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতের ওপর হামলা করে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করতে পারতেন।

ভারতের জন্য সময়টা ছিল তখন খুবই নাজুক। কারণ, ভারতের রিজার্ভ ফরমেশনগুলো ছিল। পশ্চাৎভূমিতে। এ ছাড়া সামরিক সরঞ্জামের মারাত্মক ঘাটতি ছিল এবং সৈন্য ও জনগণ তাৎক্ষণিক একটি যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। ইয়াহিয়া খান তখন যুদ্ধ শুরু করলে বর্ষা আসার আগেই তিনি পূর্ব ও পশ্চিম উভয় রণাঙ্গনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করতে পারতেন।

 

বিদ্রোহ দমন অভিযানে সৈন্য মোতায়েন

 

ভারতীয় ফরমেশনগুলো যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তাই নয়, ভারত তখনো রাশিয়ার সাথে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে নি। সে সময় ইয়াহিয়া খান আঘাত হানলে পাকিস্তান অখণ্ড থাকতো এবং ভারতের চরম শিক্ষা হতো। অজেয় হয়ে থাকতে পারতো পাকিস্তান সেনাবাহিনী। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অবশেষে আমাদের পরাজয়বরণ করতে হয়েছে।

Leave a Comment