‘৯১-এর নির্বাচনী ইশতেহার

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –‘৯১-এর নির্বাচনী ইশতেহার। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

‘৯১-এর নির্বাচনী ইশতেহার

 

'৯১-এর নির্বাচনী ইশতেহার

 

পৃথিবীর মানচিত্রে সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় এক বিস্ময়কর ঘটনা ও অনন্য ইতিহাস । আবহমান কাল থেকে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কখনো বা রাজা বাদশাহের হাতে, কখনো বেনিয়া ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতে, আবার কখনো বা বিজাতি বা স্বজাতি স্বৈরাচারি শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর হাতে চরমভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়ে আসছে।

দেশ, রাষ্ট্র, শাসক ও ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে বার বার, কিন্তু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি তেমন করে, যেমন করে তারা প্রত্যাশা করেছে। আশা ভঙ্গের বেদনা তাই বার বার তাদের হতাশ করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে। তবু বার বার তারা শুভ দিনের আশায় আবারও বুক বেঁধেছে- প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রাম ও লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় । এমনি করে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে এই ভূখণ্ডের বাঙালীরা ১৯৭১ সালে এক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ছিনিয়ে আনলো স্বাধীনতা- সৃষ্টি হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ- আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।

এই স্বাধীনতা হঠাৎ করে অর্জিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৩ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলশ্রুতি এই স্বাধীনতা। বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। এই জাতীয় চেতনার ক্রমবিবর্তনের ধারায় চুয়ান্নর নির্বাচনে জনগণের ঐতিহাসিক রায়, বাষট্টির আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ‘৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ‘৬৯-এর গণ- অভ্যুত্থান, ‘৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, সর্বশেষে ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা লাভ- প্রতিটি ঐতিহাসিক লগ্নে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতিকে যুগিয়েছিল অদম্য সাহস ও অনুপ্রেরণা।

৭ই মার্চে ঢাকা রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে ঘোষিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে উপমহাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় অসহযোগ আন্দোলন প্রস্তুত করে স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমি। এ আহ্বানে অকুতোভয়ে সাড়া দেয় বাংলার আপামর জনসাধারণ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিসমূহ।

 

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জনগণকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। শুরু হয় মুক্তি সংগ্রাম। এই ঘোষণার পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তার ৩২নং সড়কস্থ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের কারাগারে সামরিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়। ২৫শে মার্চ দুপুরে আওয়ামী লীগ নেতা জনাব এম. এ. হান্নান সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ।

১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং জনাব তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ১৭ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ নয় মাস এই আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত ও পরিচালিত হয়।

যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হয়। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহার সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার ফলে। এই ধরনের ঘটনা ইতিহাসে নজিরবিহীন।

আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার পর পেয়েছে এক বিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বহু কারখানা, শূন্য কোষাগার, শূন্য বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল, স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী এক কোটি মানুষের পুনর্বাসনসহ অসংখ্য সমস্যা।

 

'৯১-এর নির্বাচনী ইশতেহার

 

স্বাধীনতা লাভের অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, এক কোটি মানুষের  পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা হলো পুনর্গঠন, ১১০০০ প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ ৪০০০০ প্রাথমিক স্কুল সরকারীকরণ, দুস্থ মহিলাদের কল্যাণের জন্য নাি পুনবাসন সংস্থা গঠন, মুক্তিযোজাদের জনা মুক্তিযোছা কল্যাগ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা জমির খাজনা मার বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, বন্ধ শিল্প কারখানা চালুকরণসহ অন্যান্য সমস্যার মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী করে দেশকে ধীরে ধীরে এবার সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস চালায়। অতি স্বল্প সময়ে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

Leave a Comment