আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন

সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা এবং জাতি গঠনমূলক কাজ ছাড়াও কতকগুলি বিশেষ কর্মসূচী পালনের ব্যাপারে আমাদের কার্যকাল ছিল কর্মবহুল। এ বিশেষ কর্মসূচীর মধ্যে ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ দিবস, মহান ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । এ অনুষ্ঠানগুলি প্রতিনিয়তই কর্মীদের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে এবং দলীয় কর্মীদের ‘জাতীয় দিবস’- মহান ১৬ই ডিসেম্বর এবং দুইবার ঐতিহাসিক ৭ই জুন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী কর্মব্যস্ত রেখেছে। অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে কতকগুলি বিশেষ মর্যাদার দাবীদার। এর মধ্যে আমাদের কার্যকালে দুইবার উদযাপন, নজরুল-রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মিঞার রক্ত-সিক্ত এ মহান দিনটি প্রথমবার পালনের সময় বিস্তৃত কর্মসূচী নেওয়া হয়। এই কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ৭ই জুনের উপর প্রতিকৃতি ও চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা। এছাড়া ঐ দিন সকালে ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলনের প্রথম শহীন মনু মিঞার বাড়ীতে গিয়ে আমি ও আমার সহকর্মীবৃন্দ জনাব আবদুর রাজ্জাক, সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব মুস্তফা সারওয়ার, অফিস সম্পাদক জনাব আনোয়ার চৌধুরী শহীদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করি এবং তাঁর ভ্রাতৃবধুকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সামান্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করি।
এ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। ৭ই জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দশ লক্ষাধিক জনতার সম্মুখে জাতির পিতা এ নব প্রতিষ্ঠিত জাতির আদর্শ পুনর্বার ঘোষণা করেন। লক্ষ লক্ষ জনতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বক্তব্য মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে দিয়ে গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য কঠোর পরিশ্রম করার জন্য জাতিকে আহ্বান জানান। এ জনসভায় সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল আওয়ামী লীগের উপর। এতে সহযোগিত দান করে ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ।
৭ই জুনে আমরা যে পোস্টার প্রকাশ করি তার ভাষা ছিল, “ঐতিহাসিক ৭ই জুনের ডাক- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- মুজিববাদের এ চারটি মূলনীতির বাস্তবায়ন করুন।” এছাড়া আমরা এ দিনের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করে প্রচারপত্র বিলি করি। ১৯৬৬-এর বিক্ষুব্ধ ৭ই জুন আমাদের নতুন পথের সন্ধান দেয়।
১৯৭৩-এর ৭ই জুন আমরা অনুরূপভাবে পালন করি। সম-মর্যাদা, উদ্দীপনা এবং গুরুত্বের সাথে এ দিনটি জাতীয় প্রেরণার দিন হিসেবে আমাদের মাঝে আসে। কিন্তু ‘৭৩-এর এ সময়গুলোতে বঙ্গবন্ধুর অসুস্থতার প্রাথমিক আভাস পাই। তাই স্বাভাবিকভাবে কর্মীদের মানসিক উদ্বেগ নিয়ে এ দিনটি পালিত হয়। ‘৭৩-এর ৭ই জুনের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়— ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে।
এ সভায় নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব গাজী গোলাম মোস্তফা সভাপতিত্ব করেন। সভায় বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী জনাব তাজুদ্দিন আহমেদ, জনাব আবদুর রাজ্জাক, আওয়ামী যুব লীগের প্রধান জনাব শেখ ফজলুল হক মনি, বাংলাদেশ ছাত্র লীগের প্রাক্তন সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম এবং আমি নিজে। এ সভায় বক্তব্য ছিলো দেশী- বিদেশী চক্রান্তের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান ।পশুশক্তির পরাজয় এবং বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ হানাদারমুক্ত করার গৌরবে জাতির ইতিহাসে একটি গৌরবান্বিত দিন- ঐতিহাসিক ১৬ই ডিসেম্বর- আমাদের জাতীয় দিবস। মুক্তির অপার আনন্দে বিজয়ী জাতি এ দিনটি স্মরণ করে শ্রদ্ধার সাথে ।
ঐতিহাসিক ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে আমরা স্বাধীনতার পর প্রথম পালন করি। এদিনের কর্মসূচীতে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন দিয়ে শুরু করি এবং শহীদদের মাজারে এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পমাল্য অর্পণ করি। ১৬ই ডিসেম্বর আমরা কতগুলি বিশেষ বক্তব্যপূর্ণ পোস্টার প্রকাশ করি ।১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭২ এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিকেল ৩টায় সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে জনসভা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের সঠিক অবস্থা বর্ণনা করে নীতি নির্ধারণী বক্তব্য রাখেন। সাথে সাথে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বন্ধু রাষ্ট্রগুলির মুক্তি যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে গড়ে তোলার সংগ্রামে অকুণ্ঠ সাহায্যের কথার কথা উল্লেখ করে তাঁদের ধন্যবাদ জানান।
এদিনে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমিও বক্তব্য রাখি। ১৬ই ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধুর মঞ্চারোহনের পর প্রথম অনুষ্ঠান ছিল আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন প্রদান। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান জনাব আবদুর রাজ্জাক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রদত্ত অভিবাদন গ্রহণ করেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী উপ-প্রধান জনাব মাহফুজুল বারী এ অভিবাদন জ্ঞাপন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
১৯৭২ এবং ১৯৭৩ দুই বৎসরেই আমরা দলের পক্ষ থেকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পুণ্য স্মৃতিতর্পণ করি। বাংলার গণমানসে শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি সংগ্রামী চেতনা। এ উপলক্ষে আমরা পর পর দুটি মৃত্যুবার্ষিকীতেই দু’দিনের কর্মসূচী গ্রহ করেছি। বঙ্গবন্ধু সহ নেতৃবৃন্দ মাজার জিয়ারত করেন।
এই কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত ছিল মরহুমের মাজার জিয়ারত মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, কোরানখানি, আলোচনা সভা ও স্মরণিকা প্রকাশ। ৫ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আমরা প্রায় এক মাস আগে দেশের সকল পর্যায়ের জ্ঞানী, গুণী বুদ্ধিজীবী সমন্বয়ে একটি সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন কমিটি গঠন করি। দু’বারই এ কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব আবদুর রাজ্জাক। এ উপলক্ষে স্মরণিকা সম্পাদনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক জনাব সরদার আমজাদ হোসেন।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে বাংলার মানুষের হৃদয় জয়ী নেতা মরহুম এ, কে, ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আমরা পালন করেছি ২৭শে এপ্রিল। ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সহযোগিতায় মিলাদ মাহফিল, মাজার জিয়ারত, কোরান তেলওয়াত, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। আনুষ্ঠানিক পুষ্পমাল্য প্রদান অনুষ্ঠানে মাননীয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি জনাব আবু সাঈদ চৌধুরী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যোগদান করেন।

এছাড়া সন্ধ্যায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে উন্মুক্ত চত্ত্বরে আলোচনা সভায় শোভাবর্ধন করেন বঙ্গবন্ধু নিজে আলোচনায় অংশ নিয়ে। এ গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে জাতির পিতা শ্রদ্ধা জানান বাংলার সংগ্রামী সৈনিক মরহুম এ, কে, ফজলুল হকের স্মৃতির উদ্দেশে। এছাড়া অন্যান্য মন্ত্রী-পরিষদ সদস্যবৃন্দ এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন ।বাংলার রাজনীতিতে দুই অগ্নিপুরুষ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে-বাংলা এ, কে, ফজলুল হকের পুণ্য স্মৃতিতর্পণের সময় আওয়ামী লীগ আয়োজিত কর্মসূচীর সাথে সারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ।
