আজকে আমদের আলোচনার বিষয় অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক সরকার ১৯৩৭-১৯৪৭
অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক সরকার ১৯৩৭-১৯৪৭

অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক সরকার ১৯৩৭-১৯৪৭
প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকে ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মূলত দায়িত্বশীল সরকার ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ভারতবাসী আন্দোলন চালিয়ে যায়। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনে প্রথম প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয় এবং পরের বছর থেকে নির্বাচনের তৎপরতা শুরু হয়। এই আইনের আওতায় ১৯৩৭ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৩৭- ৪৭ সাল সময়ে বাংলায় মোট চারটি মন্ত্রিসভা ছিল- ১. ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা (১৯৩৭-৪১), ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা (১৯৪১-৪৩), নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভা (১৯৪৩-৪৫ ) এবং সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভা (১৯৪৬-৪৭)। ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই এক দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল।
এই সময়ে (১৯৩৭-৪৭) বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের উত্থান, বিকাশ এবং পাকিস্তান আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। পরিণামে ব্রিটিশ সরকার এ যুগের শেষের দিকে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে এদেশে দু’শো বছরব্যাপী বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে।
বঙ্গীয় আইনসভার গঠন ও শাসনতান্ত্রিক বিকাশ
ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম তাদের দেশের আদলে এদেশেও একটি শাসনতন্ত্রের অধীনে প্রতিনিধিত্বমূলক আইনসভার মাধ্যমে সরকার পরিচালনার পদ্ধতি চালু করে। ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং এ্যাক্টের অধীনে প্রবর্তিত চার সদস্য বিশিষ্ট গভর্নর জেনারেল এ্যান্ড কাউন্সিল’কে পরবর্তীকালের আইনসভা এবং বর্তমানকালের জাতীয় সংসদের ভ্রুণ বলে গণ্য করা যেতে পারে। আলোচনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের ভিত্তিতে কাউন্সিল রেগুলেশন পাশ করত।
১৭৮৪ সালের পিটস ইন্ডিয়া অ্যাক্টের মাধ্যমে গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে নাম রাখা হয় ‘গভর্নর জেনারেল এ্যান্ড কাউন্সিল’। ১৮৩৩ সালের চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কাজে সহায়তা করার জন্য কাউন্সিলে একজন আইন সদস্য নিযুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। ১৮৭৫ সালের মহাবিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া শাসন ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে নিজ হাতে তুলে নেন।
ফলে পুলিশী রাষ্ট্রব্যবস্থার অবসান ঘটে। পরিবর্তিত ব্রিটিশ নীতির আলোকে আইন প্রণয়নকারী সংস্থায় ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্তির লক্ষে ১৮৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত হয়। এর মাধ্যমে গভর্নর জেনারেলকে কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ছয় থেকে বারজন সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
উদ্বোধনী অধিবেশনে ( ১ ফেব্রুয়ারি ১৮৬২) খান বাহাদুর আবদুল লতিফসহ চারজন বাঙালি ছিলেন, যাদের সবাই ছিলেন রাজ অনুগত। ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের অধীনে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য সংখ্যা তেরো জনের স্থলে একুশ জন করা হয়। তবে এতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের কোনো বিধান রাখা হয়নি।
১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে বঙ্গীয় আইনসভায় জনগণের সাধারণ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা ১১৪ নির্ধারণ করা হয়। এতে আইনসভার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু প্রাদেশিক গভর্নরকে যে কোন বিলে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ১৯২০ সালে স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচন না হলেও ১৯২৩ সালের নির্বাচনে স্বরাজ পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
কিন্তু ১৯২৫ সালে পার্টি তথা আইনসভার প্রভাবশালী নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস পরলোকগমন করলে আইনসভার কার্যক্রম জনস্বার্থের জন্যে পুরোপরি অনুকূল হতে পারেনি। ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের সাংবিধানিক সমস্যা সুষ্ঠু সমাধানকল্পে জন সাইমনের নেতৃত্বে একটি মিশন প্রেরণ করে। স্বরাজ পার্টি ঐ কমিশন প্রত্যাখ্যান করে এবং পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে।
কিন্তু ব্রিটিশ সরকার আইনসভার স্বরাজ পার্টিভুক্ত সকল বিরোধী সদস্যকে প্রভাবিত করে সাইমন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেয়। ১৯২৮ সালের ৩১ জুলাই তারিখে আইনসভায় স্যার আবদুর রহিম কমিশনকে লক্ষ করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ সাত দফা সম্বলিত একটি দাবিনামা পেশ করেন। প্রস্তাবটি বঙ্গীয় আইন সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।
মূলত ১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং ১৯৩২ সালে র্যামজে ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে ব্রিটেনে জাতীয় সরকার গঠিত হলে তাদের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। এই দল ভারতের আত্মনিয়ন্ত্রাধিকারে বিশ্বাসী ছিল বলে নতুন শাসনতান্ত্রিক সুপারিশ করে এবং ঐ বছরই সম্প্রদায়গত পদক (Communal Award) ঘোষণা করা হয়।
তারা মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনাধিকার গ্রহণ করে এবং বিধান পরিষদগুলিতে সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। ম্যাকডোনাল্ড রোয়েদাদ অনুযায়ী দেশে শাসন সংস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করলে প্রদেশসমূহে দ্বৈতশাসন প্রথা বিলুপ্ত হয়।
এ আইনে পৃথক নির্বাচন প্রথা, কেন্দ্রে ফেডারেল সরকার ও প্রদেশে স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করা হয় এবং প্রদেশসমূহের ক্ষমতা পুনর্নির্ধারণ ও ভোটাধিকার দেওয়া হয়। ফলে এ দেশীয়দের কাছে প্রাদেশিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তন করা হয়। এ ছাড়া রেসিডুয়ারী বা বিশেষ সংরক্ষিত ক্ষমতা প্রদেশ বা কেন্দ্রের হাতে না দিয়ে স্বয়ং ভাইসরয়কে এবং প্রাদেশিক বিষয়গুলি মন্ত্রিসভার নিকট হস্তান্তরিত হয়।
নতুন শাসন সংস্কারের ফলে ভোটাধিকার অনেক সম্প্রসারণ হয়। ১৯৩৫ সনের আইন ১৯১৯ সনের অপেক্ষা নিঃসন্দেহে অনেক উন্নত প্রাগ্রসর ছিল। কিন্তু প্রাদেশিক গভর্নর ও কেন্দ্রে ভাইসরয়ের হাতে কতকগুলি বিশেষ ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়ার ফলে গণতন্ত্র অনুযায়ী প্রকৃত দায়িত্বশীল সরকার গঠন অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৩৭ সালের নির্বাচন ও ফলাফল
১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল হতে নতুন আইন কার্যকরী করা লক্ষে ১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাস থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। কৃষক পার্টি, মুসলিম লীগ মূলত এ নির্বাচনে বেশি তৎপরতা দেখায় । এ.কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক-প্রজা পার্টি আত্মপ্রকাশ করে। এ দলের ১৪ দফা নির্বাচনী কর্মসূচিতে-
১. জমিদারি উচ্ছেদ,
২. মহাজনী কারবার নিয়ন্ত্রণ,
৩. ঋণ সালিশী বোর্ড প্রতিষ্ঠা,
৪. বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা,
৫. পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন
৬. মন্ত্রীদের বেতন ১০০০ টাকায় হ্রাস,
৭. রাজবন্দিদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি প্রাধান্য পায়।
নির্বাচনের প্রাক্কালে সোহরাওয়ার্দীর ইউনাইটেড মুসলিম লীগ ও মুসলিম লীগের সমন্বয়ে বাংলার মুসলিম লীগ সংগঠিত হয়। মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন কার্যকরী করতে সাহায্য করা এবং দেশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন অর্জনের কথা মুসলিম লীগের নির্বাচনী কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কংগ্রেসসহ এই তিনটি দল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ১৯৩৭ সালের নির্বাচন মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টির মধ্যে প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িক কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম মধ্যবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণীর দল মুসলিম লীগ- এই দুই দলের পার্লামেন্টারি প্রতিযোগিতা হলেও এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় মোট ২৫০টি আসনের মধ্যে ১১৯টি সংরক্ষিত আসনে মুসলিম লীগ ৪০টি, কৃষক-প্রজা পার্টি ৩৮টি ও স্বতন্ত্র মুসলমানরা ৪১টি আসন পায়। সাধারণ আসনের মধ্যে কংগ্রেস পায় ৬০টি। বাকি আসন পায় অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র পার্টি। পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। বাংলায় মুসলিম লীগের নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার বেশ কিছু কারণ ছিল-
প্রথমত, তাদের প্রার্থীরা প্রজা পার্টির থেকে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারের জন্য লীগের নিজস্ব তহবিল ছিল;
দ্বিতীয়ত, মুসলিম পত্র-পত্রিকা যেমন-দৈনিক আজাদ, Star of India মুসলিম লীগের পক্ষে মুসলিম সংহতির জন্য প্রচারণা চালায়। ফলে অনেক কৃষক-প্রজা নেতা মুসলিম সংহতির প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করে লীগে যোগদান করেন;
তৃতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর হতে যে শিক্ষিত সচেতন মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-সমাজের সৃষ্টি হয়, তারাই বাংলার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সর্বোপরি ছিল মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ডের সেক্রেটারী জেনারেল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক প্রতিভা ও নিঃস্বার্থ কর্মপ্রেরণা।
পক্ষান্তরে কৃষক-প্রজা পার্টির নিজস্ব কিছু সুবিধা ছিল-
প্রথমত, কৃষক-প্রজা পার্টির প্রধান মূলধন ছিল এ.কে. ফজলুল হকের ব্যক্তিগত আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা;
দ্বিতীয়ত, ফজলুল হক সাধারণ জনসাধারণের মনস্তত্ত্ব বুঝতেন বলেই কিছু জন-সম্পৃক্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তার কয়েকটি হলো- জনগণের জন্য দু’বেলা ‘ডাল-ভাতের ব্যবস্থা’ করা, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ, খাজনা হ্রাস, সেলামি বন্ধ, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, পাটের ন্যায্য মূল্য, মুসলমানদের চাকরিতে ন্যায্য অংশ আদায় প্রভৃতি;
তৃতীয়ত, লীগ নেতাদের তুলনায় প্রজা পার্টির প্রার্থীদের জনসংযোগ ছিল অনেক বেশি, যেহেতু লীগের অধিকাংশ প্রার্থী ছিলেন উচ্চবিত্ত শ্রেণীর।
এ সমস্ত কারণে কৃষক-প্রজা পার্টি নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের কয়েকটি জেলায় বিপুল সংখ্যায় জয়ী হয়। পরবর্তীসময়ে ৩৭ জন স্বতন্ত্র সদস্যের মধ্যে ২১ জন মুসলিম লীগে এবং ১৬ জন কৃষক-প্রজা পার্টিতে যোগদানের ফলে পরিষদে কংগ্রেসের ৬০ সদস্যের পাশাপাশি লীগ ও প্রজা পার্টির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫৯ ও ৫৫ জন।
এই নির্বাচনে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধি খাজা নাজিমুদ্দিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েও নিজের জমিদারী পটুয়াখালীতে হক সাহেবের নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এতে একদিকে হক সাহেবের অভাবনীয় জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে বাংলার মুসলিম রাজনীতিতে জমিদার ও অভিজাত শ্রেণীর প্রভাব হ্রাস পায় এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন ও এর কার্যক্রম (১৯৩৭-১৯৪১)
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কোন একক রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম না হওয়ায় একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়ে। বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থে বঙ্গীয় আইনসভায় মুসলমান সদস্যরা বেশ ঐক্যবদ্ধ থাকে, সে জন্য মুসলমান জনমতের প্রচন্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও ফজলুল হক প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তা সফল হতে পারেনি। ফজলুল হকের এ সিদ্ধান্তে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত হয়ে পড়েন। ফলে কালবিলম্ব না করে তাঁর নেতৃত্বাধীনে একটি মন্ত্রিসভা গঠনে তাদের সম্মতি ও সক্রিয় সহযোগিতা দানের কথা ব্যক্ত করলে ফজলুল হক ও তাঁর দল এটি গ্রহণ করেন। সন্দেহ নেই, জিন্নাহ্র এই কৌশলগত চাল বাংলার রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
বাংলায় গভর্নর শাসনতন্ত্র অনুযায়ী প্রথমে কংগ্রেসের বাংলার সভাপতি শরৎ বসুকে আহ্বান জানিয়ে সাড়া না পেয়ে ফজলুল হককে মন্ত্রিসভা গঠনে আমন্ত্রণ জানান। প্রায় তিন সপ্তাহ সময় নিয়ে ফজলুল হকের পক্ষে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা সম্ভব হয়। এই মন্ত্রিসভায় ৬ জন ছিলেন মুসলমান এবং ৫ জন হিন্দু (৩ জন বর্ণ হিন্দু ও ২ জন তফসিলী হিন্দু)।
কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় যোগ না দেয়ায় হিন্দু সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি হিন্দু সম্প্রদায় বিশেষ করে ব্যাপক হিন্দু মধ্যবিত্তের জন্য প্রতিনিধিত্বশীল ছিল না। ১১ জন সদস্যের মধ্যে ৬ জন জমিদার, ১ জন পুঁজিপতি এবং ৪ জন আইনজীবী-রাজনীতিবিদ ছিলেন। নির্বাচনী এলাকা বিচারে ৩ জন বিশেষ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি, ২ জন জমিদার এসোসিয়েশন এবং ১ জন চেম্বার অব কমার্স এবং বাকি ৮ জনের মধ্যে ৪ জন শহর এলাকা থেকে নির্বাচিত ছিলেন।
১৯৩৭ সালে মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার কিছুদিন পরই মন্ত্রিসভার স্থিতিশীলতা ও সংহতির জন্য ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং এর সভাপতি নির্বাচিত হন। মন্ত্রিসভার মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হন দলের সাধারণ সম্পাদক। ফলে একই সঙ্গে দুই দলের সভাপতি পদে থাকলেও একসময় কৃষক-প্রজা পার্টি প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
ফলে হক মন্ত্রিসভা অনেকটা মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হয়ে ওঠে । নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হক মন্ত্রিসভা বিশেষ কৃতিত্বের দাবি করতে পারে-
১. ১৯৩৮ সালের ৫ নভেম্বর ফ্রান্সিস ফ্লাউডকে চেয়ারম্যান করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ সম্পর্কে তদন্ত কমিশন নিয়োগ করা হয়, যা ‘ফ্লাউড কমিশন’ নামে পরিচিত। ১৯৪০ সালের ২১ মার্চ কমিশন জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করার সুপারিশসহ রিপোর্ট পেশ করে। পরবর্তীকালে (১৯৫০ সালে ‘পূর্ববাংলা প্রজাস্বত্ব অধিগ্রহণ আইন’ পাশের মাধ্যমে) এই রিপোর্টের ভিত্তিতে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা হয়।
২. ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় চাষী খাতক আইনের আওতায় সমগ্র বাংলা প্রদেশে বহু সংখ্যক ‘ঋণ সালিসী বোর্ড’ গঠিত হয়। এই বোর্ড ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত বাংলার কৃষকের ঋণভার লাঘবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. দীর্ঘকাল যাবৎ বাংলার সরকারি চাকরি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের একচেটিয়া দখলে। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় চাকরি নিয়োগ বিধি প্রবর্তন করে হক মন্ত্রিসভা কর্তৃক চাকুরিতে নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে প্রণীত সম্প্রদায়ভিত্তিক বন্টনবিধির অধীনে ৫০% পদ মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়। এ নিয়োগনীতির যথার্থ তদারকি করার জন্য একজন বিশেষ কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া মুসলমানদের প্রতি মন্ত্রিসভার সাধারণ পক্ষপাতিত্ব যে ছিল- তা বলাই বাহুল্য।
৪. ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় মহাজনী আইন পাশ করে সরকার সকল মহাজনদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স থাকা অত্যাবশ্যকীয় করে। এ ছাড়া সুদের হারও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ সব আইন কৃষকদের এক বৃহদাংশকে ‘ভয়াবহ ঋণের বোঝা এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগী জমিদার ও মহাজনদের বিভিন্ন প্রকার অবৈধ আদায় থেকে মুক্তি দেয়।
৫. ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব (সংশোধন) আইন পাশ করে জমিদারদের দেয় জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত ফি, জমিদারদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার (Pre-emption), সার্টিফিকেট প্রথার মাধ্যমে খাজনা আদায় এবং চাষীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আদায় বা ‘আবওয়াব’ প্রভৃতি বাতিল করা হয়। কুড়ি বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে মাত্র চার বছরের খাজনা পরিশোধ করে চাষীরা সিকস্তি জমি পুনরুদ্ধারের সুযোগ লাভ করে।
বকেয়া খাজনার ওপর ধার্যকৃত সুদের হার ১২.৫% থেকে কমিয়ে ৬.২৫% স্থির করা হয়। এই আইনে জমিদারদের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের ও পর্যায়ের স্বত্ত্বাধিকারীদের ওপর খাজনা বৃদ্ধি দশ বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়। অবশ্য এই আইন পাশের পূর্বে বহু বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়।
৬. ১৯৪০ সালে দোকান কর্মচারী আইন পাশ করে হক মন্ত্রিসভা শ্রমিকদের সপ্তাহে একদিন বন্ধ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে ।
৭. পল্লী পুনর্গঠনে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে হক মন্ত্রিসভা ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পল্লী পুনর্গঠনের কাজ ত্বরান্বিত করা ও প্রচারাভিযানের জন্য জেলায় জেলায় অফিসার ও ৬০০ থানা কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। কৃষি, সেচ, রাস্তা, সেতু ইত্যাদি উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিটি গ্রামে একটি বয়স্ক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও মুষ্টি ভিক্ষা প্রদানের পরিকল্পনা করা হয়। এছাড়া মন্ত্রিসভা পল্লীর জনস্বাস্থ্য উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে ।
৮. প্রধানমন্ত্রীত্বের পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হাতে রেখে এ.কে. ফজলুল হক বাংলা প্রদেশের শিক্ষা বিস্তারে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। হক মন্ত্রিসভার আমলে তেজগাঁও কৃষি ইনস্টিটিউট (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), কলকাতা লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ, আদিনা ফজলুল হক কলেজ সহ অসংখ্য স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।
পল্লী অঞ্চলে নিরক্ষরতা দূরীকরণে বয়স্কদের জন্য অসংখ্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাছাড়া এ সময়কালে প্রাথমিক শিক্ষা আইনানুসারে স্কুল বোর্ড গঠন ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গঠনের জন্য বিল আনীত হয় ।
৯. হক মন্ত্রিসভার অন্যান্য কৃতিত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি। এর ফলে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বাংলার বহু বিপ্লবী ছাড়া পায়। এ ছাড়া নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পূর্ণ সহযোগিতায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার নামে কলঙ্ক স্থাপনকারী ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ অপসারণ করা হয় ।
ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভার সীমাবদ্ধতা
প্রথমত, কৃষক-প্রজা পার্টি নির্বাচনী কর্মসূচিতে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁর মন্ত্রিসভার ১১ জনের মধ্যে ৬ জনই জমিদার ছিলেন। সে কারণে কৃষক-প্রজার প্রতিনিধিত্ব ছিল কম। তাই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয়ত, হিন্দু আধিপত্যের যুগে হক মন্ত্রিসভায় ছিল মুসলমানদের প্রাধান্য এবং এ কৃতিত্ব ক্রমশ মুসলিম লীগের পক্ষে যায়। এমন কি কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতার মোকাবেলা করতে ফজলুল হক মুসলিম লীগের মতো সাম্প্রদায়িক অবস্থান নেন। ফলে কৃষক-প্রজা দল জনপ্রিয় হলেও মুসলিম লীগকে কেন্দ্র করে ক্রমান্বয়ে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
এ সুযোগে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হলে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা ও শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময় জিন্নাহ ক্রমান্বয়ে ক্ষমতাশালী হয়ে প্রাদেশিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ শুরু করলে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়। ১৯৪০-৪১ সালে কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগের বিরোধ দেখা দেয় এবং জিন্নাহ ফজলুল হককে মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কার করে।
মুসলিম লীগ সদস্যরা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক সংকটে পড়েন ফজলুল হক। এ অবস্থায় ১৯৪১ সালে তিনি পদত্যাগ করেন এবং হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রোগ্রেসিভ পার্টি গঠন করেন।
ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা গঠন ও কার্যক্রম (১৯৪১-৪৩)
প্রথম হক মন্ত্রিসভার পতনের পর পুনরায় ফজলুল হকেরই নেতৃত্বে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা দুই পর্যায়ে গঠিত হয়। প্রথম পর্যায়ে আংশিকভাবে ১৯৪১ সালের ১১ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে আংশিকভাবে গঠিত হয় ১৮ ডিসেম্বর।
এর পূর্বে খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বাধীনে একটি মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং নবঘোষিত প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির ডেপুটি লিডার ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শরৎচন্দ্র বসুর গ্রেফতার- এই দুই কারণে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন বিলম্বিত হয়।
গভর্নর হার্বাট শেষ চেষ্টা হিসেবে মুসলিম লীগসহ সকল রাজনৈতিক দল নিয়ে একটি যুদ্ধকালীন কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রচেষ্টা চালান, কিন্তু জিন্নাহর অসম্মতির কারণে তা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সুস্পষ্ট সমর্থন থাকায় এ.কে. ফজলুল হককে শেষপর্যন্ত সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়। হকের নতুন মন্ত্রিসভা বিভিন্ন দলের সদস্য নিয়ে গঠিত হয়।
মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণের দিনই সম্ভাব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শরৎ বসুর গ্রেফতার হক সাহেবের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় হলেও তাঁকে বাদ দিয়ে তিনি পরিস্থিতি মেনে নিতে চেষ্টা করেন। অবশ্য বঙ্গীয় কংগ্রেস এতে যোগদান করা থেকে বিরত থাকে। মন্ত্রিসভায় হক সাহেবের পাঁচ জন মুসলিম ও চারজন হিন্দু মন্ত্রী স্থান পেলেন। তাঁদের মধ্যে হিন্দু মহাসভার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী নাম উল্লেখের দাবি রাখে যিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন।
সে জন্য এই মন্ত্রিসভাকে কেউ কেউ ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রিসভা নামে অভিহিত করেন। মন্ত্রিসভার এরূপ গঠন দেখে গভর্নর জেনারেল লিনলিথগো’র অভিমত হলো- এটি খুবই লক্ষণীয় বিষয় হবে যদি এ মন্ত্রিসভা নয় বা বার মাস একত্রে থাকতে পারে। আর মুহম্মদ আলী জিন্নাহ উপহাস করে বলেন, “ভাইসরয়কে বড়দিনের উপহার দিলাম ফজলুল হককে, বাংলার গভর্নরকে নববর্ষের উপহার দিলাম ঢাকার নবাবকে।”
মুসলিম লীগ আইনসভায় বিরোধী দল গঠন করে, দলের নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন মূলত সোহরাওয়ার্দী বিরোধী রাজনীতির প্রধান নেতা । ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা মাত্র ৪৭৫ দিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। ঐ সময়ে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁকে কাটাতে হয়েছে মুসলিম লীগের বিরোধিতার মুখে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মন্ত্রিসভা উল্লেখযোগ্য কোন অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি।
পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ পুরোদমে সক্রিয় হয়ে দলের ভিত্তি সুদৃঢ় করে গড়ে তোলে । তবে ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার কৃতিত্ব কিছুটা হলেও একটা দিকে ছিল। তা হলো, এমন ধরনের মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে ফজলুল হক বাংলার রাজনীতি অঙ্গনে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের প্রয়াস নেন।
এর দ্বারা তিনি উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর পূর্বেকার অবস্থান থেকে সরে আসেন। তবে উদ্যোগটি মহৎ হলেও তা ছিল অতি বিলম্বিত, ইতোমধ্যে ‘কায়েদে আজম’-এর উত্থান ঘটেছে; সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করেছে, পাকিস্তান পরিকল্পনা মুসলিম লীগের মূল আদর্শে পরিণত হয়েছে, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছে,
হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের গুরুতর অবনতি ঘটেছে, মুসলমান জনসাধারণের মনে সর্বভারতীয় মুসলিম সংহতির ধারণা ভিত্তি লাভ করেছে। বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভার বিভিন্ন কার্যক্রমের দ্বারা উপকৃত হয়ে নিজেদেরকে মুসলিম লীগের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে।
ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার সীমাবদ্ধতা
প্রথমত, এই মন্ত্রিসভায় অখন্ড হিন্দুস্থানে বিশ্বাসী হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন নিখিল ভারত হিন্দুসভার কার্যকরী সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অন্তর্ভুক্তি ছিল ফজলুল হকের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (যার দ্বারা মুসলমান সম্প্রদায় আইনসভায় পূর্বাপেক্ষা বেশি আসন লাভ করে)-এর বিপক্ষে আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন অগ্রনায়ক।
হকের মন্ত্রিসভার আমলে চাকরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য কোটা নির্ধারণ, কলকাতা পৌর কর্পোরেশন (সংশোধন) বিল ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিল-এর চরম বিরোধিতা এবং ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে তাঁর ভূমিকা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে।
ফলে তিনি তাঁদের কাছে একজন কট্টর সাম্প্রদায়িকতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তাছাড়া মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির কিছু দিন পূর্বে হক সাহেবও তার সমালোচনায় মুখর ছিলেন। ফলে মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদের অন্তর্ভুক্তি হকের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তুলতে মুসলিম লীগের নেতাদের চমৎকার সুযোগ এনে দেয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলার মতো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মুসলিম লীগের নিকট ছিল উৎকণ্ঠার ব্যাপার। সেজন্য তারা জনসাধারণের নিকট জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হককে জনবিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। এই লক্ষে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিন ও তমিজদ্দিন খানের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী টিম প্রদেশব্যাপী গণসংযোগে বের হয় এবং কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় সাত-আটশ জনসভা করেন।
এ ছাড়া দৈনিক আজাদ, স্টার অব ইন্ডিয়া, দি মর্নিং নিউজ ইত্যাদি পত্রিকা হক বিরোধী প্রচারণায় সামিল হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক উদ্দীপ্ত বাংলার মুসলমান ছাত্র ও তরুণ সম্প্রদায়। ফলে মুসলিম লীগ তাদের উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হয়। হক সাহেব দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন ।
তৃতীয়ত, লীগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফজলুল হককে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপরে নির্ভর করতে হয়। যোগ্য নেতা হওয়া সত্ত্বেও শুধু দুর্বল সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে তিনি কৃষক-প্রজা দলকে গড়ে না তুলে মুসলমানদের সমর্থন পুনরুদ্ধারের জন্য প্রোগ্রেসিভ মুসলিম লীগ নামে একটি সাম্প্রদায়িক দল গড়ে তোলেন।
কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের একটি অংশ মুসলিম লীগ নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হওয়ায় তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। এভাবে ঘন ঘন দল গঠন ও পরিবর্তন করার বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক পতনকে ত্বরান্বিত করে।
চতুর্থত, ফজলুল হক বাংলার গভর্নর জন হার্বাট থেকে শুরু করে মহকুমা অফিসার পর্যন্ত সর্বস্তরের আমলাদের প্রতিকূল মনোভাবের মুখে পড়েন। ফলে এক সময় ভাইসরয়ের নিকট তিনি গভর্নরের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। স্পষ্টত গভর্নরের সাথে ফজলুল হকের বিরোধ প্রকট হয়।
১৯৪৩ সালের ২৮ মার্চ ফজলুল হককে অসাংবিধানিকভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, যা ছিল বরখাস্তের নামান্তর মাত্র। কারণ আইনসভার অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন তখনো তাঁর প্রতি ছিল।
নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভার গঠন ও কার্যক্রম (১৯৪৩-৪৫ )
এ. কে. ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার পদত্যাগের সময় গভর্নর একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের ধারণা দিলেও ভারতীয় রাজনীতির বিশেষ প্রেক্ষাপটে মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানানো হয়। ১৯৪৩ সালের ২৩ এপ্রিল নাজিমুদ্দিন ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
মুসলিম লীগের তরুণ নেতা ও ছাত্র সমাজের ইচ্ছা ছিল দলের মূল সংগঠক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবেন। কারণ হক সাহেবের পরে তিনিই ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে যোগ্যতম নেতা। আইনসভায় হিন্দুদের আসন কম থাকায় তারা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রার্থী হতেন না। তৎকালীন রাজনীতির ধারানুযায়ী জমিদার হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিনের প্রভাব ছিল।
তাছাড়া জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলী খানের বিশ্বস্ত লোক ছিলেন বলে নাজিমুদ্দিনই প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মন্ত্রিসভায় ৩ জন বর্ণহিন্দু ও ৩ জন তফসিলী হিন্দুর সমন্বয়ে ৬ জন হিন্দু সদস্য অন্তর্ভুক্ত হলেও এর দ্বারা প্রকৃতপক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব ঘটেনি। কেননা উক্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী বঙ্গীয় কংগ্রেসের কোন অংশই মন্ত্রিসভায় যোগদান করেননি।
ফজলুল হকের পদত্যাগের প্রাক্কালে মুসলমান সদস্যরা মুসলিম লীগে যোগ দিতে থাকেন। ফলে মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের সদস্য সংখ্যা রাতারাতি ৪০ থেকে ৭৯ জনে উন্নীত হয়। নাজিমুদ্দিনের পেছনে প্রতি ইউরোপীয় গ্রুপ, তফসিলী হিন্দুদের একাংশ, এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও অন্য আরো কিছু সদস্যের সমর্থন। আর গভর্নরের সমর্থনতো ছিলই। ফলে হক সাহেবের চেয়ে তিনি অনেক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত হন।
নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভার দুর্ভাগ্য যে প্রদেশের প্রশাসনিক বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার পূর্বেই বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। বাংলা ১৩৫০ সালে (ইংরেজি ১৯৪৩) হয়েছে বলে তা ‘পঞ্চাশের মনন্তর’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। খাদ্যশস্যের ঘাটতি প্রকৃতপক্ষে আরম্ভ হয় কংগ্রেস কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার আমলে। লীগ সরকার গঠনের পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়।
তৎকালীন বাংলা সরকার কর্তৃক ‘উডহেড কমিশন’ যে রিপোর্ট প্রদান করে তাতে বলা হয় যে, এই দুর্ভিক্ষের জন্য ভারত সরকার, হক মন্ত্রিসভা ও মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা সকলেই আংশিকভাবে দায়ী। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এক পর্যায়ে জাপান, বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) দখল করে চট্টগ্রামের উপকূলে এসে হাজির হলে বাংলার পতন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করা হয়।
শত্রুপক্ষকে সর্বাত্মক অসুবিধায় ফেলার লক্ষে ব্রিটিশ নীতি অনুযায়ী উপকূলীয় অঞ্চল হতে খাদ্য মজুত অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল করার লক্ষে সুপরিকল্পিতভাবে দেশীয় নৌকা ধ্বংস করা হয়। তাছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বার্মা থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে অনেক উদ্বাস্তু বাংলায় প্রবেশ করার ফলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে।
অনাবৃষ্টির ফলে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদনও হ্রাস পায়। দুর্ভিক্ষের আভাস পেয়ে ভারত সরকার সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে গুদামজাত করে রাখার ফলে খাদ্যশস্যের ঘাটতি দেখা দেয়। পাশাপাশি অসাধু ও অর্থলোভী ব্যবসায়ীরা তা মজুদ করে রাখে।
এ ছাড়া দেশে কর্ডনিং প্রথা চালু ও সর্বপ্রকার মালামাল সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্য, এমন কি স্টিমার ও রেলগাড়ি বাংলার বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য খাদ্যশস্যের অবাধ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। পাঞ্জাব সরকার বাংলার এই সংকটে গম ও আটা পাঠাতে রাজী হলেও দেশে কর্ডনিং প্রথার জন্য তা আমদানি করা সম্ভব হয়নি।
হিন্দু মহাসভাপন্থী কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী বাংলার মুসলিম লীগ সরকারের প্রতি বিরূপ থাকায় অন্যান্য প্রদেশ হতে খাদ্য আমদানিতে বাধার সৃষ্টি করেন। বিহার ও উড়িষ্যা সরকার তাদের উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাছাড়া সরকারি আমলাদের কর্তব্যে ত্রুটি ও দায়িত্বহীনতা এবং মুদ্রাস্ফীতির জন্য পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে।
এই সংকটজনক মুহুর্তে খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেন। তবে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার এ দিকটায় দৃষ্টিপাত করেনি, বাংলার মানুষের জীবনের চেয়ে সাম্রাজ্য রক্ষা করা তখন তাদের নিকট বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও সোহরাওয়ার্দী নিজ তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন জেলায় খাদ্যশস্য প্রেরণ করেন, সরবরাহ বিভাগকে তিনি জরুরি বিভাগ ঘোষণা করেন এবং অভিজ্ঞ অফিসার নিয়োগ করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেন। সরকারি প্রচেষ্টায় বহু লঙ্গরখানা খোলা হয় এবং নিরন্ন ও দুস্থ জনগণের আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।
কলকাতা এবং অন্যান্য শহরেও রেশনিং প্রথা চালু করা হয়, লীগ সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টায় অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব হলেও সারা বাংলায় ৩৫ থেকে ৩৮ লক্ষ লোক মৃত্যুবরণ করে। দু’বছরের শাসনকালে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার চেষ্টা ছাড়া নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা আর তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করতে সক্ষম হয়নি।
মাধ্যমিক শিক্ষাকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার লক্ষে একটি শিক্ষা বোর্ড গঠনের প্রস্তাবসহ যে মাধ্যমিক শিক্ষা বিল ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভার সময় উত্থাপিত হয়েছিল পুনরায় তা উত্থাপন করা হয়। কিন্তু পূর্বের মতই হিন্দু সদস্যেদের বিরোধিতার মুখে বিলটি পাশ করা সম্ভব হয়নি।
নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভার সীমাবদ্ধতা
খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর মন্ত্রিসভায় স্বীয় সহোদর খাজা শাহাবুদ্দিনকে অন্তর্ভুক্ত করে খোদ মুসলিম লীগের অভ্যন্তরেই সমালোচনার সম্মুখীন হন। মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ ছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। পঞ্চাশের মন্বন্তরের এ অবস্থার মধ্যে খাজা শাহাবুদ্দিনসহ মন্ত্রীদের স্ত্রীরা পর্যন্ত রাতারাতি ঠিকাদার বনে যায়। এসব কারণেই এই মন্ত্রিসভা তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে।
অন্যদিকে মুসলমানদের প্রতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৃষ্টপোষকতা ও আনুকূল্য প্রদর্শন এবং বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলন বিস্তৃতি লাভ করায় হিন্দু সদস্যরা আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সমর্থন হ্রাস পেতে থাকে। এমনি পরিস্থিতিতে ১৯৪৫ সালের ২৮ মার্চ তারিখে বাজেট বরাদ্দের ওপর ভোটাভুটি হলে সরকার সমর্থক সদস্যরা বিরোধী শিবিরে যোগ দিলে ১০৬-৯৭ ভোটে নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে।
সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার গঠন ও কার্যক্রম (১৯৪৬-৪৭)
নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভার পতনের এক বছরের মধ্যে ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাসহ সারা ভারতের সকল প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনাধীনে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন বলে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের অপূর্ব নেতৃত্বে মুসলিম লীগ বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে ২৫০ সদস্য বিশিষ্ট বঙ্গীয় আইনসভায় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ১২২টি মুসলিম আসনের মধ্যে ১১৪টি আসন লাভ করে। নির্বাচনের পর পরই সোহরাওয়ার্দী সর্বসম্মতিক্রমে লীগ পার্লামেন্টারি দলের নেতা নির্বাচিত হন। ২ এপ্রিল বাংলার নতুন গভর্নর ফ্রেডারিক বারোজ সোহরাওয়ার্দীকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানান ।
যদিও নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলের ভিত্তিতে সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে এককভাবে মন্ত্রিসভা গঠনে কোন সমস্যা ছিল না। তিনি বাস্তব প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ নেন। কারণ প্রায় একদশক ধরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের হিন্দুরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারেনি বলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। কিন্তু লীগের মধ্যে খাজা গ্রুপ এক্ষেত্রে সমর্থন দেয়নি।
এমনকি কংগ্রেসের পার্লামেন্টারি দলের নেতা কিরণ শংকর রায়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর দিল্লিতে কংগ্রেস এবং লীগ উভয় দলের হাই কমান্ডের সাথে আলোচনা করলেও সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। কারণ ধারণা করা যায়, এরা কেউ চাননি সর্বভারতীয় পর্যায়ে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পূর্বে প্রাদেশিক ক্ষেত্রে বাংলার উভয় সম্প্রদায় কোন ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হোক।
অবশেষে সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল ৭ জন মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য এবং ১ জন তফসিলী হিন্দু (যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল) সদস্যসহ মোট ৮ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এতে চারজন প্রাক্তন মন্ত্রী ও চারজন খান বাহাদুর খেতাবধারী অন্তর্ভুক্ত হলেও মূলত এই মন্ত্রিসভা মধ্যবিত্ত স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে। এই পর্যায়ে খাজা গ্রুপের কোন সদস্যও ছিলেন না।
কিন্তু যখন কংগ্রেসের মন্ত্রিসভায় যোগদান একদম নিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভার খাজা গ্রুপের প্রভাবশালী সদস্য ও প্রাক্তন চিফ হুইপ ফজলুর রহমান অন্তর্ভুক্ত হন এবং অপর সদস্য নুরুল আমীন হন স্পিকার। ১৩ জন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারির মধ্যে অন্তত ৫ জন এই গ্রুপ থেকে নেয়া হয়।
সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার সীমাবদ্ধতা
সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার শুরু থেকেই খাজা-সমর্থকদের মালিকানাধীন তিনটি প্রভাবশালী পত্রিকা দৈনিক আজাদ, স্টার অব ইন্ডিয়া এবং দি মর্নিং নিউজ শীতল দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করে এবং সময় বিশেষে প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচরণ করে। মন্ত্রিসভার সমর্থনে জনমত গঠনে একমাত্র আবুল হাশিমের সাপ্তাহিক মিল্লাত কিছুতেই প্রয়োজনোপযোগী ছিল না।
১৫ মাসে ক্ষমতায় থেকেও সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা উল্লেখযোগ্য কোন আইনগত বিধান রচনা করতে পারেনি। এ সময় বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন নামে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন চলছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভা কর্তৃক বঙ্গীয় আইন সভায় ‘বেঙ্গল বর্গাদার (প্রভিশনাল) কন্ট্রোল বিল’ নামে একটি বিল উপস্থাপন করা হলে লীগের জোতদার সদস্যদের বিরোধিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়।
বাংলার কৃষক অসন্তোষের মূলে ছিল জমিদারী প্রথা। ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভার আমলে গঠিত ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করার বিষয়টি ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে আইনসভায় তোলা হলেও বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা আইনে পরিণত হতে পারে নি । প্রকৃতপক্ষে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার কার্যকাল বাংলা ও ভারতের ইতিহাসে ছিল খুবই ঘটনাবহুল।
ভারত থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে এই অধ্যায়ের রাজনীতি আবর্তিত হয়। বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে ভয়াবহ ‘কলকাতা দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যা সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার ভাবমূর্তি নষ্ট করে। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে সোহরাওয়ার্দী শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে স্বাধীন অখন্ড বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নেন।
কিন্তু শেষপর্যন্ত এ চেষ্টা ব্যর্থ হয়, এবং ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। পূর্ববাংলা (বাংলাদেশ) পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।
সারসংক্ষেপ
১৯৩৭-৩৮ সাল পর্যন্ত চারটি মন্ত্রিসভা ক্ষমতাসীন হলেও ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা ছাড়া কোন মন্ত্রিসভা গুরুত্বপূর্ণ কোন আইন প্রণয়ন করতে পারেনি। অন্যান্য মন্ত্রিসভার সময় ছিল স্বল্প এবং উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবেলায় পুরো সময়ই ব্যয় করতে হয়।
হিন্দুদের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ, মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের স্বার্থপরতা, বাংলার অবাঙালি নেতৃত্বের ষড়যন্ত্র, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বাঙালি নেতৃবৃন্দের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ- এই মন্ত্রিসভাগুলোর দীর্ঘস্থায়িত্বের অন্তরায় ছিল। কৃষক-প্রজা পার্টি রাজনীতিতে যে অসাম্প্রদায়িক ধারা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করার ফলে সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়।
এতে হিন্দু- মুসলিম সম্পর্ক যে কোন সময়ের চেয়ে অবনতির দিকে চলে যায়। শেষ মুহুর্তে উভয় সম্প্রদায়ভুক্ত নেতৃত্বের একটি অংশ যৌথভাবে স্বাধীন অখন্ড বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বাংলা বিভক্তির মাধ্যমে পূর্ববাংলা আবার নতুন করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ঔপনিবেশে পরিণত হয় ।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, ‘বঙ্গীয় আইন সভা ও শাসনতান্ত্রিক বিকাশ, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, ঢাকা, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৩।
২। হারুন অর রশিদ, ‘বঙ্গীয় মন্ত্রিসভা, ১৯৩৭-১৯৪৭’, পূর্বোক্ত।
৩। সিরাজউদ্দিন আহমদ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ঢাকা, ভাস্কর প্রকাশনী, ১৯৯৬।
৪। এম.এ.রহিম, বাংলার মুসলামানদের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৪৭), ঢাকা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০০২ ।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। সংক্ষেপে বঙ্গীয় আইনসভার গঠন ও শাসনতান্ত্রিক বিকাশ লিখুন।
২। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের ফলাফল লিখুন।
৩। ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভার সীমাবদ্ধতা আপনি কিভাবে চিহ্নিত করবেন?
৪। সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার সীমাবদ্ধতা সংক্ষেপে লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। বঙ্গীয় আইনসভার গঠন ও শাসনতান্ত্রিক বিকাশ সংক্ষেপে বর্ণনা করুন। ১৯৩৭ সালের আইনসভার নির্বাচন ও এর ফলাফল আলোচনা করুন।
২। ১৯৩৭-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলার মন্ত্রিসভার কার্যক্রম সংক্ষেপে পর্যালোচনা করুন। এই মন্ত্রিসভাগুলোর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করুন ।
