আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় – আওয়ামী লীগের অভ্যুদয় পটভূমি । যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
আওয়ামী লীগের অভ্যুদয় পটভূমি

সাম্প্রদায়িক ও অবৈজ্ঞানিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি পৃথক ভূ-খণ্ড নিয়ে কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠিত হয়। এই দুই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি নু- তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও কোনো মিল ছিল না।
জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানের প্রকৃত রাষ্ট্রক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ত ভূ- স্বামী, ভারত প্রত্যাগত উর্দুভাষী অভিজাত সম্প্রদায় ও উঠতি ধনিক শ্রেণি এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কুক্ষিগত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এরা ছিল বাংলা বাঙালি এবং বাংলা ভাষা বিদ্বেষী। অচিরেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে রাষ্ট্রভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রশ্নে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে।
পূর্ব বাংলা ছিল সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অবাঙালি অভিজাত শ্রেণির হাতে থাকায় এবং রাজধানী পাকিস্তানে স্থাপিত হওয়ায়, শুরুতেই পূর্ব বাংলা বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়। শুরু থেকেই বেসামরিক প্রশাসনের চাকরি, সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ এবং উভয় ক্ষেত্রে পদোন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা স্থাপন এমনকি মন্ত্রিসভায় পর্যন্ত বাঙালির সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ছিল না।
পাকিস্তানের প্রথম মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভারত প্রত্যাগত (মোহাজের) লিয়াকত আলী খান। প্রধানমন্ত্রী বাদে ১৩ জন মন্ত্রী, ৩ জন প্রতিমন্ত্রী ও ২ জন উপমন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। লক্ষণীয় যে, ১৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ৪ জন পূর্ববঙ্গের ৩ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ১ জন মাত্র বাঙালি। এমনকি পূর্ব বাংলা থেকে নিয়োগকৃত ৪ জন কেবিনেট মন্ত্রীর ১ জন (ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা সাহাবুদ্দিন) ছিলেন উর্দুভাষী এবং অপর ১ জন বাঙালি হয়েও (ফজলুর রহমান) ছিলেন কট্টর উর্দুপন্থি, যিনি আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। টো মাহে নও, ১৯৫১)

পাকিস্তানের দুই অংশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, পূর্ব বাংলার সম্পদ দিয়ে পাকিস্তানকে গড়ে তোলা স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি চিত্তে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ক্রমশ বাঙালির মোহভঙ্গ ঘটতে থাকে। তবে ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তান সরকারের নীতি বাঙালির জাতীয় জাগরণকে তরান্বিত করে। বিতর্কটা শুরু হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে।
পাকিস্তান জন্মের আগেও এ বিতর্ক ছিল। তবে ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলা সফরে এসে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ সুস্পষ্ট ভাষায় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করায় অগ্নিতে ঘৃতাহুতি পড়ে। জিন্নার উক্তি ছিল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। তার এ কথা থেকেই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র পরিষ্কার হয়ে যায়। ছাত্রসমাজ, সংস্কৃতিসেবী, বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
এ পটভূমিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চার মাস ২০ দিন পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রথম সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ আত্মপ্রকাশ করে। ঐ দিন ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় নঈমউদ্দিন আহমেদকে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক করা হয়।
অন্যান্যের মধ্যে সদস্য ছিলেন আবদুর রহমান। চৌধুরী (বরিশাল), শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর), অলি আহাদ (কুমিল্লা), আজিজ আহমেদ (নোয়াখালী), আবদুল মতিন (পাবনা), দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), মফিযুর রহমান (রংপুর), শেখ আবদুল আজিজ (খুলনা), নত আলী (ঢাকা), নুরুল কবীর (ঢাকা শহর), আবদুল আজিজ (কুষ্টিয়া), সৈয়দ নুরুল আলম ও আবদুল কুদ্দুস প্রমুখ (প্রগতিশীল ছাত্রনেতা।
তেজোদীপ্ত তরুণ সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণায় এই ছিল পরবর্তীকালে বাঙালির জাতীয় আন্দোলনের মূলধারার অগ্রসর বাহিনী হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। এর আগে ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক যুব লীগ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সভাপতি ছিলেন তাসাদ্দুক আহমেদ। ১৯৪৮ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ একটি ইশতেহার প্রকাশ করে। এই ইশতেহারে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক পাকিস্তান গড়ে তোলার দাবি উত্থাপিত হয়। তবে এ সংগঠনটি বেশি দিন টেকেনি।
এই ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই ‘তমুদ্দন মজলিশ’ একটি নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠিত হয়। তমুদ্দনের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ লেকচারার আবুল কাশেম (পরবর্তীকালে প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম হিসেবে সমধিক পরিচিত)। তিন সদস্যের তমুদ্দুন মজলিশের অন্য একজন প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম যিনি পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই শাসক মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মুসলিম লীগের তরুণ কর্মীরা ঢাকায় গণতান্ত্রিক কর্মী শিবির অনুষ্ঠানের আহ্বান জানায়। ১৯৪৭ ও ৪৮ সালেও একাধিক কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে না ভাঙলেও ১৯৪৯ সালের টাঙ্গাইল উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগে ভাঙনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের অফিসিয়াল প্রার্থী খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা তরুণ নেতা শামসুল হককে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান করে।
তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এরপর পরাজয়ের ভয়ে মুসলিম লীগ আর কোনো উপ-নির্বাচন দিতে সাহস পায় নি। এদিকে ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক মুহূর্তে সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিমের অনুসারীদের একটি অংশ “১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় গণআজাদী লীগ (১৯৫০ সালে সিভিল লিবার্টিজ লীগ নাম ধারণ করে) গঠন করেন।
গণআজাদী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন কামরুদ্দিন আহমেদ। অন্যদিকে ১৯৪৮ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কোলকাতা কংগ্রেস থেকে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আলাদা হয়ে যায়। সাজ্জাদ জহিরকে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। মণি সিংহকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব বঙ্গে স্বতন্ত্র কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু কোলকাতা কংগ্রেসের উগ্র হঠকারি রাজনৈতিক লাইন গ্রহণ করার পর কমিউনিস্ট পার্টির উপর দমননীতি নেমে আসে।
কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনও ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন হিসেবে আলাদা কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন আখলাকুর রহমা (পরবর্তীকালে অর্থনীতির খ্যাতিমান অধ্যাপক ও জাসদের জন্মলগ্নের তাত্ত্বিক), সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শহিদুল্লাহ কায়সার (শহীদ সাংবাদিক)। কিন্তু ছাত্র ফেডারেশন ছাত্রদের মধ্যে তেমন কোনো প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।

এ কথা স্মতব্য যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অনিবার্যতা মেনে নেওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান ভিত্তিতে একটি অসাম্প্রদায়িক দল গঠনের প্রস্তাব করেন। “মাত্র ১০ জন তার প্রস্তাব সমর্থন করেন। … পরবর্তী কালে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী একটি ব্যাপকভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় রাজনীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ গঠনের প্রস্তাব দেন, যা সকল পাকিস্তানী নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বাইরে এসে অসাম্প্রদায়িক দল গঠনের চিন্তা করছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তো বটেই, তখন পর্যন্ত পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষও তা গ্রহণ করার মতো রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠেনি। ইতোমধ্যে অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানে একাধিক আঞ্চলিক দল গড়ে উঠেছিল।
মুসলিম লীগের ১৫০ মোগলটুলির অফিস ছিল সোহরাওয়ার্দীপন্থী মুসলিম লীগ নেতা-কর্মীদের দখলে। মুসলিম লীগ এই কার্যালয়টি দখলের কয়েকদফা ব্যর্থ চেষ্টা করে। তারপর “আমরা মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ নাম দিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলাম এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অফিসও করা হল।
এই অফিসকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের একটি প্রগতিশীল অংশ প্রথম থেকেই একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্লাটফরম গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। ছাত্রলীগ ও যুবলীগ গঠন সেই আগ্রহ এবং উদ্যোগেরই বহিঃপ্রকাশ। মুসলিম লীগের দুঃশাসন ও প্রচণ্ড দমননীতির মুখে এক প্রবল বৈরী পরিবেশে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনের কেএম বশির হুমায়ূনের বাসভবন ‘রোজ গার্ডেনে’ (হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি বলে সমধিক পরিচিত) মুসলিম লীগের খাজা নাজিমউদ্দিন ও অফিসিয়াল নেতৃত্বের বিরোধী প্রগতিশীল অংশটি গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন আয়োজন করে।
আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণ দেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। এই কর্মী সম্মেলনের প্রথম দিনেই একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
কর্মী সম্মেলনে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের মেনিফেস্টোর একটি খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পিত হয় শামসুল হকের ওপর সম্মেলনের পর ঐ খসড়া মেনিফেস্টো প্রকাশিত হয়। তবে সম্মেলনে শামসুল হক প্রণীত ‘মূল দাবি’ বলে একটি ১২ দফা দাবিনামা সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। দাবিনামায় বলা হয়-
১. পাকিস্তান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হবে। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনসাধারণ।
২. রাষ্ট্রে দু’টি আঞ্চলিক ইউনিট থাকবে- পূর্ব ও পশ্চিম।
৩. অঞ্চলগুলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। প্রতিরক্ষা-বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে থাকবে এবং অন্য সকল বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে।
৪. সরকারী পদাধিকারী ব্যক্তিরা কোন বিশেষ সুবিধা বা অধিকারভোগী হবেন না কিংবা প্রয়োজনাতিরিক্ত বেতন বা ভাতার অধিকারী হবেন না।
৫. সরকারী কর্মচারীরা সমালোচনার অধীন হবেন, কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থতার জন্য তাদের পদচ্যুত করা যাবে এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে তাদের ছোটখাটো বা বড় রকমের সাজা দেয়া যাবে। আদালতে তারা কোন বিশেষ সুবিধার অধিকারী হবেন না। কিংবা আইনের চোখে তাদের প্রতি কোনরূপ পক্ষপাত প্রদর্শন করা হবে না।
৬. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবেন- যথা বাকস্বাধীনতা, দল গঠনের স্বাধীনতা, অবাধ গতিবিধি ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকার।
৭. সকল নাগরিকের যোগ্যতানুসারে বৃত্তি অবলম্বনের অধিকার থাকবে এবং তাদের যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে।
৮ সকল পুরুষ ও নারীর জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে।
৯. পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোতে সকল নাগরিকের যোগদানের অধিকার থাকবে। একটি বিশেষ বয়সসীমা পর্যন্ত সকলের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর ইউনিট গঠন করা হবে।
১০. মৌলিক মানবিক অধিকারসমূহ দেয়া হবে এবং কোন অবস্থাতেই কাউকে বিনা বিচারে আটক রাখা হবে না। বিনা বিচারে কাউকে নতদান বা নিধন করা হবে না।
১১. বিনা খেসারতে জমিদারী ও অন্য সকল মধ্যস্বত্ব বিলোপ করা হবে। সকল আবাদযোগ্য জমি পুনর্বণ্টন করা হবে।
১২. সকল জমি জাতীয়করণ করা হবে।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সম্মেলনে সভাপতি, সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহম্মদ এমএলএ, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ খান ও অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান, টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। অন্য দু’জন সহ-সম্পাদক ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও একেএম রফিকুল ইসলাম কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। ইয়ার মোহাম্মদ খান। গঠিত হয় ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি। অচিরেই আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী সুসংগঠিত প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন, ২৪ জুন আরমানিটোলা মাঠে আওয়ামী লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী।
১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক মুখপত্র ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন মওলানা ভাসানী। পরে সম্পাদকের দায়িত্ব নেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।
১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলায় খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। দেশে খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হয়। সদ্য গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ সংকট সমাধানের দাবিতে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে ২০ অক্টোবর একটি বড় জনসভার আয়োজন করে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভা শেষে পুলিশ অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেফতার করে।
সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তান সরকার প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। এমনকী দীর্ঘদিন তার পূর্ব বাংলায় প্রবেশাধিকারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখে। সোহরাওয়ার্দী প্রথমে কলকাতা ত্যাগে ইচ্ছুক ছিলেন না। পরে তিনি স্থায়ীভাবে করাচিতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগকে নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন।
১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত এক কর্মী সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দীকে সভাপত্তি করে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ’। সোহরাওয়ার্দী এই উভয় প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকলেও, তখন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এই দুই দলের কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত হয় নি।
১৯৫২ সালের ডিসেম্বর মাসে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের সম্মেলনে শর্তসাপেক্ষে দুই দল একীভূত হয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের শর্ত ছিল, এর নামকরণ, মেনিফেস্টো ও কর্মসূচির স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ থাকবে, কেন্দ্রীয় আওয়ামী মুসলিম লীগ এতে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সাংগঠনিক কমিটির ১৯৫৩ সালের ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগে অধিভুক্ত বা একীকরণের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল একটি শিখিল ধরনের কনফেডারেশনের মতো। জন্মলগ্ন থেকে শেষাবধি ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক স্বাধীনতা এবং স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে।
জন্মলগ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগও আদর্শগতভাবে শিল্পীভূত দল ছিল না। এটিও ছিল সেকুলার জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী, ডানপন্থি, মধ্যপন্থি এবং বামপন্থিদের একটি অভিন্ন প্লাটফরম। এই ভাবাদর্শগত ও রাজনৈতিক বৈপরীত্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৫৭, ১৯৬৪, ১৯৬৬, ১৯৭২, ১৯৭৮ ও ১৯৮৩ সালে বিভক্ত হয়। ১৯৫৩ সালের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব খন্দকার মোশতাকসহ ৫৫ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটির ২৭ জনের বিরোধিতার কারণে পাস হতে পারেনি। জনমত যাচাইয়ের নামে এই প্রস্তাব দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ।
