বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭

 

আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭

 

অক্ষয় সভানেত্রী,

মাননীয় সভাপতি মণ্ডলী

কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যবৃন্দ,

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ,

সংগ্রামী কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

আপনারা আমার সগ্রক সালাম ও বিপ্লবী অভিনন্দন গ্রহণ করুন। জাতীয় জীবনের এক চরম সন্ধিক্ষণে, এক ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে বাংলার গণ-মানুষের বা প্রতিষ্ঠান, সংগ্রামী ঐতিহ্যের পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পরিষদ জাতীয় কাউন্সিল’-এর এই মহতী অধিবেশনে আপনাদের স্বাগত জানাতে পেরে আমি গৌরব বোধ করছি।

সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদিকা হিসাবে আমার রিপোর্ট পেশ করার আগে আমি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করছি এ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী নেতা, জাতির জনক, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপাত্তা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, দশকোটি বাঙ্গালীর নয়নমনি, সংগঠনের প্রতিটি কর্মীর প্রাণ-শক্তির উৎস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে, স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধু পত্নী বেগম ফজিলাতুননেসা, পুত্র কামাল, জামাল, রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা ও রোজি, ভাই শেখ নাসের, বাংলার যুব মানসের বিপ্লবী কন্ঠস্বর, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃস্বত্বা পত্নী বেগম আরজু মনি, নিবেদিতপ্রাণ কৃষক নেতা জনাব আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং কর্নেল জামিলসহ ১৫ই আগষ্ট ৭৫-এর কালো রাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরাজিত শক্তির ক্রীড়নক চিহ্নিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুদের হাতে নিহত সকল শহীদদের।

আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ৩রা নভেম্বর ‘৭৫-এ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে একই শক্তির হাতে নৃশংসভাবে নিহত জাতীয় চারনেতা বিপ্লবী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, অন্যতম মন্ত্রী ও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব এম. মনসুর আলী এবং আমাদের প্রিয়- সংগঠনের এককালীন সভাপতি ও অন্যতম মন্ত্রী জনাব আৰু হেনা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে।

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা রক্তের আখরে আমাদের পথ চলার নির্দেশ রেখে গেছেন। সেই নির্দেশিত পথ ধরেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এগিয়ে চলছে ও চলবে।

৮১-র ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন এবং আজকে কাউন্সিল অধিবেশনের মধ্যবর্তী সময়কালে আমরা আমাদের অনেক নেতা, কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীকে হারিয়েছি।

আমরা হারিয়েছি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নেতা, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, ত্যাগীপুরুষ শ্রী ফনিভূষণ মজুদদার মহাশয়কে। হারিয়েছি আমাদের প্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগের এককালীন সভাপতি, সংগ্রামী পুরুষ, সর্বজনশ্রদ্ধেয় জননেতা জনাব মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সাহেবকে।

আমরা হারিয়েছি কেন্দ্রীয় নেতা সর্বজনান মােজউদ্দিন আহমদ, শাহ মাহতাব, ফজলুর রহমান, আবদুল বাসেত সিদ্দিকী, আবদুল মালেক খান, রাজা মিয়া, রবিউল আউয়াল কিরণ, আলী আহমদ চুনকা, আবদুল মালেক, রফিক উল্লাহ এডভোকেট, গোলাম রহমান, মফজল আহমদসহ আরো অনেককে।

সংগঠনের প্রিয় নেতা ময়েজ উদ্দিন ভাই স্বৈর-সামরিক শাসনের চির অবসান ঘটিয়ে সর্বভৌম পার্লামেন্ট এবং নিগণের শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার প্রভাবে জাতীয় দাবী ৫ দফা আদায়ের সংগ্রামে আত্মদান করেছেন।

ময়েজ উদ্দীন দেশ আওয়ামী ভাইয়ের আত্মদান স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ও আন্দোলনকে করেছে তীব্রতর ও মহীয়া আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি স্বৈরাচার বিরোধী মুক্তি আন্দোলনের বীর শহীদ জাফর, জয়নাল, তিতাস, কাঞ্চন, মোজাম্মেল, দীপালী সাহা, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা দেলওয়ার, সেলিম, শ্রমিক নেতা তাজুল, রমিছ ছাত্রনেতা বসুনিয়া, শাজাহান সিরাজসহ নাম- জানা না-জানা সকল শহীদদের- যারা তাঁদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারের দুর্গে মরণাঘাত হেনে জাতীয় চেতনা ও আন্দোলনের স্তরকে করেছেন জনগণের হৃদয়ে উন্নীত।

আমরা পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ আবদুল মতিন চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম দরদী বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, সুসাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল, তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর প্রধান কৌশলী স্যার টমাস উইলিয়ামসহ আরো অনেক বিদগ্ধ গুণীজনকে।

আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন সময়ে আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেত্রী, ভারতের মহান নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ, আন্দ্রেপঞ্চ, চেরনোকো, মোজাম্বিকের বিপ্লবী রাষ্ট্রপতি স্যামুরা মাশেলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, বিপ্লবী ও প্রগতিশীল নেতাদের।

 

প্রিয় কাউন্সিলার ভাই ও বোনেরা,

সংগঠনের গঠনতান্ত্রিক বিধান অনুসারে প্রতি দু’বছরে একবার জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও আমাদের বর্তমান জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রায় দু’বছর পর। “জাতীয় কাউন্সিল” অনুষ্ঠানে এ দীর্ঘ বিরতি হয়েছে বাস্তবতার কারণে। এ ছ’বছরের মধ্যে জাতীয় জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ ও পরিস্থিতির মাঝে।

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী এবং বাংলার গণ-মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ঐতিহ্য পতাকাবাহী আমাদের প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই সময়ে এককভাবে দলীয় সংগঠনের দিকে না চেয়ে সামগ্রিক রাজনীতির উপর সামরিক নিষেধাজ্ঞা এবং তথাকথিত “ঘরোয়া রাজনীতি”র প্রাচীর ভেংগে আপামর জনতা এবং গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে সাথে নিয়ে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং জনগণের হৃত অধিকার আদায়ের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে লিপ্ত থাকে

উপরক্ত উপর্যুপরি সামরিক বিধি-নিষেধের কড়াকড়ির কারণেও ইউনিয়ন হতে কেন্দ্র পর্যন্ত ব্যাপ্ত এই বিরাট- সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কাউন্সিল অধিবেশন যথাসময়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিঘ্ন ও বিপত্তির সৃষ্টি হয়।

বিলম্বে হলের আজকের এ কাউন্সিল অধিবেশনে সারা দেশ হতে আগত সংগ্রামী কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরাসহ বিপুল সংখ্যক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীর অভূতপূর্ব সমাবেশ সংগঠনের নীতি ও আদর্শ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি আপনাদের সুগভীর আস্থা ও ভালবাসা আমাদের মতো গোটা জাতির প্রাণেও নবতর প্রাণ সঞ্চার করেছে।

দশকোটি অধিকার-বঞ্চিত মানুষ আজ আপনাদের দিকে চেয়ে আছে। জাতির আশা-আকাংখা, চিন্তা-চেতনার নিরিখে জাতিকে তার সংগ্রামী পথ চলার নির্দেশ দিতে হবে। আমাদের প্রাণ-শক্তি দিয়ে আশাহত জাতিকে জাগাতে হবে, সৃষ্টি করতে হবে দুর্বার গণ-আন্দোলন- গণঅভ্যুত্থান।

 

আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭

 

আপনারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। জাতি এবং বিশ্ব জানে, বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা পরাভব মানে না- আপোষ জানে না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- স্বৈরাচার বিরোধী মুক্তির লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী সাহসিকতাপূর্ণ, নির্ভুল ও উজ্জ্বল ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন, বাংলাদেশের মাটি হতে স্বৈরাচার ও সামরিক গণতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত সমাজ পরিবর্তনের আদর্শ- শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামকে কালিত লক্ষ্যে পৌঁছাবেন।

Leave a Comment