আকবরের মুদ্রা

আকবরের মুদ্রা – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “শাসনব্যবস্থা” বিভাগের একটি পাঠ। আকবরের মুদ্রা ছিল তিন রকমের— তামা, রূপো ও সোনার। কোনো এক কালে রূপোর মুদ্রাকে বলা হতো তঙ্কা, কিন্তু শেরশাহ-ই প্রথম দুই তঙ্কাকে মিলিয়ে টাকায় পরিণত করেন, সেই টাকা আকবরের আমলেও প্রচলিত ছিল। তাতে ১৭২.৫ যেন রূপো থাকত। খুব সম্প্রতি আমাদের দেশে যে-টাকা প্রচলিত ছিল, তাতে ১৮০ গ্রেন রূপো থাকত, অর্থাৎ উভয় টাকা প্রায় সমান সমান। ৪০ দামে এক টাকা হতো। শেরশাহের এক দামের ওজন ছিল ৩২৩.৫ গ্রেন, আকবরের আমলেও দামের ওজন একই ছিল।

আকবরের মুদ্রা

 

এক টাকায় ৪০ দাম কিংবা ২০ ডবল দাম। দামকে কাল্পনিক হিসেবে ২৫ জীতলে ভাগ করা হয়েছিল, তবে তার কোনো মুদ্রা ছিল না। মুদ্রা-বিন্যাস ছিল নিম্ন প্রকার—

 

 

আকবরের মোহর তৈরি হতো বিশুদ্ধ সোনায়, তার ওজন ছিল ১৭০ গ্রেন, অর্থাৎ ১ তোলা থেকে কিছু কম (১১.৩ মাসা)। সাড়ে নয় টাকায় এক তোলা সোনা বলে দেয় যে সে-সময় রূপোর মূল্য ছিল অনেক বেশি। আকবরের মুদ্রার সঙ্গে তার পূর্বে প্রচলিত মুদ্রার তুলনা নিম্নরূপ :

 

টাকশাল— আমাদের দেশে পুরনো রৌপ্যমুদ্রাকে বলা হতো টঙ্কা, সেজন্য টঙ্কা বানানোর জায়গার নাম হয় টঙ্কশাল বা টাকশাল । শেরশাহের আমলের টঙ্কা নাম আমাদের দেশ থেকে উঠে গেছে, কিন্তু বাংলা ও ওড়িশায় এখনও টাকা শব্দ প্রচলিত আছে । হিন্দী- ভাষী পূর্বাঞ্চলে দুই পয়সাকে টাকা বলা হতো। তিব্বত ও মধ্য-এশিয়ায় সাম্প্রতিক কালেও রৌপ্যমুদ্রাকে টঙ্কা বলা চলে আসছে।

 

আকবর ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে পূর্বকাল থেকে প্রচলিত টাকশাল-ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করেন। মুদ্রার উপর অঙ্কনের নিমিত্ত খাজা আব্দুস সামাদের মতো সু-লিপিকরকে দিয়ে অক্ষর তৈরি করান। সুন্দর অক্ষরের জন্য আব্দুস সামাদকে ‘শিরি-কলম’ (মধুরলেখনী) উপাধি দেওয়া হয় । নতুন সংস্কার-সাধন অনুযায়ী টাকশালের দায়িত্বভার চৌধুরীদের হাত থেকে নিয়ে প্রাদেশিক সিপাহসালার (রাজ্যপাল)-দের হাতে অর্পণ করা হয়, যেমন—

 

গ্রীক-ব্যাকটেরীয় প্রভুত্ব ও প্রভাবের কারণে চৌকো মুদ্রা কুষাণদের পূর্বেই উঠে যায়, তারপর মুদ্রা তৈরি হতে থাকে গোলাকার । আকবর কিছু নৌকো ও ছয় কোণবিশিষ্ট মুদ্রাও চালু করেন । প্রথমে ভারতে সমস্ত মুদ্রার উপরেই আঁকাবাঁকা আরবি লিপি খোদাই করা হতো। শেরশাহের মুদ্রাতেও আরবি লিপিই থেকে গিয়েছিল।

তৈমূরের শাসনকালে আরবি লিপি সংস্কার-সাধিত হয়ে অত্যন্ত সুন্দর নাস্তালিক লিপি আবিষ্কৃত হয়, বাবরের সঙ্গে তা ভারতে আসে । আকবর সর্বপ্রথম তা প্রয়োগ করেন। আকবরের সেই আরবি লিপি সংবলিত মুদ্রাও পাওয়া যায়। আকবরের প্রত্যেক মুদ্রায় টাকশালের সঙ্কেত রয়েছে। আবুল ফজল আকবরের ছাব্বিশ প্রকার মুদ্রার উল্লেখ করেছেন। যে-সব মুদ্রার উপর ‘আল্লাহু আকবর’ ‘জল্লে জেলালুহু’ অঙ্কিত থাকত, সেগুলোকে বলা হতো জলালী । পূর্বে বলা হয়েছে যে রাজস্বের হিসেব টাকার নয়, দামে করা হতো। সম্ভবত এর উদ্দেশ্য ছিল। সংখ্যাটাকে চল্লিশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে লক্ষের জায়গায় কোটি (করোড়) বলা যেতে পারে ।

 

 

Leave a Comment