আজকে আমদের আলোচনার বিষয় আগরতলা মামলার ষড়যন্ত্র
আগরতলা মামলার ষড়যন্ত্র

আগরতলা মামলার ষড়যন্ত্র
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল আইয়ুব খানের শাসনামলের (১৯৫৮-৬৯) সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য ও প্রহসনমূলক ঘটনা। ১৯৬৬ সালে উত্থাপিত ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে যখন গণআন্দোলন জোরদার হতে থাকে তখনই প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আন্দোলনকে স্তিমিত করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি উৎখাত করার লক্ষে এ প্রহসনমূলক নীতি গ্রহণে তৎপর হন।
পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বশূন্য করে এ অঞ্চলে আইয়ুব খানের ক্ষমতা ও প্রভাব সুদৃঢ় করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই ফল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। যদিও গণদাবির মুখে শেষপর্যন্ত এ মামলা তুলে নেওয়া হয় এবং আইয়ুব খানের পতনের মাধ্যমে মামলার অসারতা প্রমাণিত হয়।
আগরতলা মামলার পটভূমি
আইয়ুব খান ছিলেন একজন স্বৈরাচারী সামরিক শাসক। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে, বিশেষ করে বিরোধীদের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল ক্ষোভ। ১৯৫৮ সালে অক্টোবর মাসে সামরিক আইন জারি করেই দেশের জনগণের সকল রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে নেন। দেশের উভয় অঞ্চল থেকে রাজনৈতিক নেতাদের সামরিক আইনে গ্রেফতার করতে থাকেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ মানুষের সকল প্রকার মৌলিক অধিকার হরণ করে নিয়ে দেশে একনায়কত্ব শাসনব্যবস্থা চালু করেন। আইয়ুব খান একদিকে ক্ষমতা বৈধকরণ অপরদিকে ক্ষমতাকে আরো সুদৃঢ় করার লক্ষে ১৯৬২ সালে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামক বিশেষ কৌশল আবিষ্কার করেন। এবং এ প্রেক্ষাপটে সকল রাজবন্দির মুক্তি প্রদান করেন।
কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন এবং আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে থাকেন। এরফলে শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক জান্তা আইয়ুবের প্রধান শত্রুতে পরিণত হন।
১৯৬৪ সালে আইয়ুবের অধীনে দ্বিতীয় নির্বাচনেও শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল লক্ষণীয় যা আইয়ুব খানকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য পাহাড় পরিমাণ রূপ লাভ করে । শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন জনসভা ও বিবৃতির মাধ্যমে এ বৈষম্য জনসম্মুখে তুলে ধরে আইয়ুব বিরোধী শক্তিকে আরো বলীয়ান করে তুলতে থাকেন।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্লিপ্ততার বিষয়টি শেখ মুজিব ফলাও করে প্রচার করতে থাকেন । যুদ্ধোত্তর ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে পাকিস্তানের জাতীয় কনফারেন্সে শেখ মুজিব পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের বৈষম্য তুলে ধরে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন।
এ ছয় দফা দাবি উত্থাপিত হলে আইয়ুব খান আরো বিচলিত হয়ে ওঠেন। বস্তুতপক্ষে, ৬ দফা দাবি আইয়ুবের পক্ষে মেনে নেওয়া কখনো সম্ভব ছিল না। তাই আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে ছয় দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। অপরদিকে ছয় দফা ভিত্তিক দাবি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববাংলায় স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এক গণআন্দোলন গড়ে তোলেন ।
আইয়ুব খান ছয় দফা দাবি নস্যাৎ করার লক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আন্দোলনের পক্ষের বহু নেতা- কর্মীকে গ্রেফতার করতে থাকেন। এর প্রতিবাদে পূর্ববাংলায় ছয় দফা আন্দোলন আরো গতিশীলতা লাভ করে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ঐদিন ছাত্র জনতার মিছিলে গুলি চালিয়ে পুলিশ কয়েকজনকে হত্যা করে এবং বহু লোক আহত হয়।
কিছুদিন পরেই সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সংবাদপত্র ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেফতার এবং ইত্তেফাকসহ কিছু কিছু পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের বিরোধী দলীয় সদস্যগণ ওয়াক আউট করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিক, সংবাদপত্রকর্মী এবং ছাত্র-জনতা প্রতিবাদ জানায় ও ধর্মঘট পালন করে।
ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন যখন সর্বস্তরে প্রসারতা লাভ করেছিল তখনই সরকার রবীন্দ্র সঙ্গীত ও পহেলা বৈশাখ পালন নিষিদ্ধ এবং আরবি হরফে বাংলা চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিল। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফা আন্দোলন এক গণআন্দোলনে পরিণত হয়। সরকার এ গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করার লক্ষে বিভিন্ন হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এরূপ হীন চক্রান্তেরই বাস্তব রূপায়ন।
মামলার বিষয়বস্তু
১৯৬৭ সালে ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি যখন ব্যাপক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে রূপ লাভ করে তখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আন্দোলনকে স্তিমিত করার এক কূটকৌশল আবিষ্কার করেন। ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি ২ জন সি.এস.পি অফিসারসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়।
তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তাঁরা পূর্বের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতে আগরতলায় এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং ভারতীয়দের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করেন। অভ্যুত্থান সফল করার জন্য তাঁরা ভারতীয়দের নিকট থেকে অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। এই মর্মে অর্থ ও অস্ত্রের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়।
কয়েকদিনের মধ্যে এক প্রেসনোটে বলা হয় যে, গ্রেফতারকৃত আসামীরা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন এবং এ ব্যাপারে আরো তদন্ত চলছে।
৬ জানুয়ারি আসামীদের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে ১৯৬৮ সালে ১৮ জানুয়ারি “ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা ও পরিচালনার” অভিযোগ এনে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামী করে পূর্বের ২৮ জন সহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আর একটি মামলা দায়ের করা হয়। এটাই “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা” নামে খ্যাত ।
মামলার আসামী
১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি মামলার অধীনে চূড়ান্তভাবে প্রণীত আসামীদের তালিকা ছিল নিম্নরূপ-
১. শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর)
২. লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন (বরিশাল)
৩. স্টুয়ার্ড মজিবর রহমান (মাদারীপুর)
8. প্রাক্তন এল.এস. সুলতান উদ্দিন আহমদ (নোয়াখালী)
৫. এল.এস. নূর মোহাম্মদ (ঢাকা)
৬. জনাব আহমদ ফজলুর রহমান সি.এস.পি (ঢাকা)
৭. ফ্লাইট সার্জেন্ট মজিফুল্লাহ (নোয়াখালী)
৮. প্রাক্তন কর্পোরাল এ.সি. সামাদ (বরিশাল)
৯. প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন (বরিশাল)
১০. জনাব রুহুল কুদ্দুস সি.এস.পি. (খুলনা)
১১. ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (বরিশাল)
১২. ভূপতি ভূষণ (মানিক) চৌধুরী (চট্টগ্রাম)
১৩. বিধানকৃষ্ণ সেন (চট্টগ্রাম)
১৪. সুবেদার আবদুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)
১৫. মুজিবর রহমান ই.পি.আর.টি.সি.ক্লার্ক (কুমিল্লা)
১৬. সাবেক ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)
১৭. সার্জেন্ট জহুরুল হক (নোয়াখালী)
১৮. মোহাম্মদ খুরশীদ (ফরিদপুর)
১৯. কে.এম. শামসুর রহমান সি.এস.পি. (ঢাকা)
২০. রিসালদার শামসুল হক (ঢাকা)
২১. হাবিলদার আজিজুল হক (বরিশাল)
২২. এস.এ.সি. মাহফুজ বারি (নোয়াখালী)
২৩. সার্জেন্ট শামসুল হক (নোয়াখালী)
২৪. মেজর শামসুল আলম (ঢাকা)
২৫. ক্যাপ্টেন মুত্তালিব (ময়মনসিংহ)
২৬. ক্যাপ্টেন শওকত আলী (ফরিদপুর)
২৭. ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা (বরিশাল)
২৮. ক্যাপ্টেন নূরুজ্জামান
২৯. সার্জেন্ট আবদুল জলিল (ঢাকা)
৩০. মাহবুবুদ্দিন চৌধুরী (সিলেট)
৩১. লে. এম.এস.এম. রহমান (যশোর)
৩২. প্রাক্তন সুবেদার তাজুল ইসলাম (বরিশাল)
৩৩. মোহাম্মদ আলী রেজা (কুষ্টিয়া)
৩৪. ক্যাপ্টেন খুরশীদ (ময়মনসিংহ)
৩৫. লে. আবদুর রউফ (ময়মনসিংহ)
এছাড়া আরো ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয় যারা পরে রাজসাক্ষী হতে রাজী হওয়ায় মুক্তি পান। উপরোক্ত আসামীদের প্রথমে দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে ১৮ জানুয়ারি দেশ রক্ষা আইন হতে মুক্তি দিয়ে ‘আর্মি, নেভী এন্ড এয়ারফোর্স এ্যাক্ট’-এ পুনরায় গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় জেল হতে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে স্থানান্তরিত করা হয়।
মামলার উদ্দেশ্য
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পশ্চাতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের যে সকল উদ্দেশ্য নিহিত ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ ধারণা করেছেন সেগুলো নিম্নরূপ-
১. পূর্ববাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নির্মূল করা ।
২. পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে এ মনোভাব জাগিয়ে দেওয়া যে বাঙালিরা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয় ।
৩. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে বিভেদ ও ব্যবধান আরো বাড়িয়ে দেওয়া ।
৪. শেখ মুজিবকে রাজনীতি থেকে নির্মূল করা ।
৫. আসামীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় চক্রান্তে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনের ষড়যন্ত্রের কথা প্রচার করে রায় প্রদত্ত হলে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক উত্থান প্রচেষ্টা বন্ধ হবে। এবং গণসমর্থন সরকারের পক্ষে চলে আসবে । এর ফলে পরবর্তী নির্বাচনে আইয়ুব খান ও তাঁর কনভেনশন মুসলিম লীগের বিজয় সুনিশ্চিত হবে।
বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন ও মামলার অভিযোগ:
১৯৬৮ সালের ২২ এপ্রিল আইয়ুব খান কর্তৃক জারিকৃত অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট মামলার বিচারের স্থান নির্ধারিত হয় এবং ১৯ জুন বিপুল সংখ্যক দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও টেলিভিশন প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে মামলার শুনানি শুরু হয়।
পূর্বের ফৌজদারী অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি এস.এ. রহমান ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম.আর. খান ও পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি মকসুমুল হাকিম এর সদস্য নিযুক্ত হন। প্রধান ফরিয়াদী হিসেবে থাকেন পাকিস্তানের এককালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রখ্যাত পাঞ্জাবি আইনজীবী মঞ্জুর কাদের।
অপরদিকে আসামীদের পক্ষ নেন ইংল্যান্ডের রাণীর আইন বিষয়ক উপদেষ্টা প্রখ্যাত আইনজীবী টমাস উইলিয়াম। এছাড়া তাদের পক্ষে ছিলেন ড. আলীম আল রাজী, আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম খান, জুলমত আলী, মোল্লা জালাল উদ্দিন ও মওদুদ আহমদসহ বহুসংখ্যক আইনজীবী। সরকার দু’টি প্রধান খাতে ৪২ পৃষ্ঠার একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
কয়েকটি পরিশিষ্টে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নামের তালিকা, সাক্ষী, দলিলপত্রাদি, আলামত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ছদ্মনাম সংযোজন করা হয়। অভিযোগে বলা হয় যে, অভিযুক্তরা ভারত কর্তৃক সরবরাহকৃত অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং তহবিলের সাহায্যে অনুষ্ঠেয় একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছেন।
এক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণ, অস্ত্র লেন-দেন সংক্রান্ত কিছু দলিলপত্র উত্থাপন করা হয় যা পরে তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। অপরপক্ষে মামলার প্রধান আসামী শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এছাড়া আদালতে ১১ জনের নামের একটি তালিকা রাজসাক্ষী হিসেবে এবং ১২টি চিঠি, ২ কপি টেলিগ্রাম, ‘বাংলাদেশ’ ও ‘বেতারবাণী’ লেখা দু’টি তারিখ বিহীন কাগজ,
অর্থ লেন-দেন সংক্রান্ত দলিল, ১০টি প্রবন্ধের একটি তালিকা এবং ২০০ সাক্ষীর নামসহ ৮২টি দলিল উত্থাপিত হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনের পর অভিযুক্তদের পক্ষাবলম্বনকারীদের মামলা তৈরির সুযোগ দিয়ে প্রায় চার সপ্তাহের জন্যে মামলা মুলতবী রাখা হয় । কিছুদিন পর মামলার বিচার শুরু হয়। আসামীদের জবানবন্দি ও সওয়াল-জবাব শুরু হয়।
জবানবন্দিতে প্রথমেই শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা মামলা সরকারের হীন ষড়যন্ত্র ও মামলাকে মিথ্যা বলে আখ্যা দেন এবং এতে তালিকাভুক্ত আসামীদের নির্দোষ দাবি করেন। এভাবে সকল আসামী নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। অপরপক্ষে রাজসাক্ষীদের অনেকেই গোপন কথা ফাঁস করে দেন এবং তাদের জোরপূর্বক সাক্ষ্য দিতে বলা হয়েছে বলে স্বীকার করেন।
এর ফলে বিচারকগণ বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে থাকেন। এর মধ্যদিয়ে শুনানী ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে । একদিকে সাক্ষীদের মিথ্যা বলার অনীহা, অপরদিকে আসামীদের জোরালো প্রতিবাদের মুখে আগরতলা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শিথিল হয়ে আসে।
আবার ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি আসাদুজ্জামান নামক ছাত্রকে, ১৫ ফেব্রুয়ারি জেলে আগরতলা মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করার প্রতিবাদে মামলার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণআন্দোলন দেখা দেয়।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান নিজের দুর্বল অবস্থান অনুমান করতে পেরে ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এক বেতার ভাষণে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও বন্দীদের নিঃশর্তে মুক্তি প্রদান করেন। এভাবে আগরতলা মামলা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক মামলা বলে প্রমাণিত হয়।
প্রতিক্রিয়া
আগরতলা মামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হতে থাকে। ১৯৬৮ সালের জুন মাস থেকে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত-আট মাস ধরে এ মামলার শুনানি ও জেরার কাজ চলছিল। এ সময় পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় প্রতিদিনের মামলার বিচারের বিবরণ প্রচার করা হতো।
পত্র- পত্রিকা পাঠে জনগণ উপলব্ধি করতে পারলো যে, পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা মামলায় মিথ্যাভাবে জড়িত করা হয়েছে। তাছাড়া বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামীদের সাহসিকতা ও সরকারের দুর্বল অভিযোগ জনগণকে আরো উত্তেজিত ও সাহসী করে তোলে। এ সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দেওয়ায় আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব গ্রহণ করে পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ।
আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষে ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের ১১ দফা দাবির মধ্যে একটি প্রধান দাবি ছিল আগরতলা মামলার প্রত্যাহার ও আসামীদের নিঃশর্ত মুক্তিদান।
একদিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফাভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন যখন জোরালো হতে থাকে ঠিক সে মুহূর্তে ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের ৮টি রাজনৈতিক দল মিলে “গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ” (ডাক) নামক সংগঠনের উদ্যোগে ৮ দফাভিত্তিক দাবি নিয়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয়। এ আট দফার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল আগরতলা মামলায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য বন্দিদের মুক্তিদান, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা এবং ‘ডাক’-এর ৮ দফাভিত্তিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী এক গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়। ডাক এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পৃথক পৃথকভাবে ১৭ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস ঘোষণা করে। এদিন ১৪৪ ধারা অমান্য করে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশের লাঠিচার্জে বহু ছাত্র আহত হয়।
এরপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৮ জানুয়ারি থেকে প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভ চলতে থাকে। ১৮ জানুয়ারি ছাত্রদের ওপর হামলা এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্ররা জমায়েত হয় এবং মিছিল নিয়ে সমগ্র ঢাকা প্রদক্ষিণ করে। ঐদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান নিহত হন।
আসাদের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হলে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চরম গতিশীলতা লাভ করে। ২১ জানুয়ারি ঢাকায় মশাল মিছিল বের করা হয় এবং ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়। ঐদিন পুলিশের গুলিতে কিশোর ছাত্র মতিউর রহমানসহ কয়েকজন নিহত হয়। উত্তেজিত জনতা পাকিস্তান পন্থী পত্রিকা “দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ’-এর ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়।
পূর্ববাংলার ঢাকা শহর সাময়িকভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ২৪ জানুয়ারির পর থেকে আন্দোলন ১ দিনও থেমে থাকেনি। প্রতিদিন একদিকে হরতাল ধর্মঘট চলতে থাকে, অপরদিকে পুলিশি নির্যাতন গ্রেফতার ও হত্যা অব্যাহত থাকে।
মামলার ফলাফল বা গুরুত্ব
পাকিস্তান সরকার যে লক্ষ নিয়ে আগরতলা মামলা দায়ের করেছিল তা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। অর্থাৎ সরকারের পক্ষে এ মামলার ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক। অপরপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তথা সমসাময়িক রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখপাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য এ মামলার ফলাফল বা গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
প্রথমত, জনগণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের কথা বিশ্বাস করার পরিবর্তে এ মামলাকে বাঙালিদের স্বাধিকার আদায়কারী আন্দোলন দমন করার জন্য পাঞ্জাবিদের ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করে। পূর্ব পাকিস্তানিদের মনে পাঞ্জাবি শাসকদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। তারা ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার কথা চিন্তা করতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, শেখ মুজিব অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতায় পরিণত হন এবং ছয় দফা ও ১১ দফা কর্মসূচি পূর্ববাংলায় সত্যিকারের গণদাবিতে পরিণত হয়। উক্ত মামলার বিবাদীপক্ষের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে স্বায়ত্তশাসন দাবি ও এর যৌক্তিকতা প্রচার করার চমৎকার সুযোগ পাওয়া যায়। তারা পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর ঘৃণা ও বৈষম্যের কথা সর্বসমক্ষে তুলে ধরেন।
তৃতীয়ত, আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের মধ্যদিয়ে পাকিস্তান সরকারের দুর্বলতা প্রমাণিত হয় । চতুর্থত, আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এটা ছিল বাঙালিদের একটা বিরাট বিজয়।
১৯৭০-এর নির্বাচনে প্রভাব
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আগরতলা মামলার প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রতিফলিত হয়। সরকার মামলায় অভিযুক্ত করে শেখ মুজিবুর রহমান তথা আওয়ামী লীগকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করে পরবর্তী নির্বাচনে সফলকাম হবে এমন আশা করেছিল। কিন্তু এর ফল হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। পূর্ববাংলার জনগণ উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে আগরতলা মামলা বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটি উদ্দেশ্যমূলক মামলা।
তারা এটাও উপলব্ধি করল যে, পাকিস্তান সরকারের হাতে বাঙালিদের জীবন ও সম্পত্তি কখনোই নিরাপদ নয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পায়।
ফলে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় পরিষদের পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে, ‘৭০ সালের নির্বাচনে তার সক্রিয় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
সারসংক্ষেপ
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে গৃহীত এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনা। সরকার চেয়েছিল এ মামলার মাধ্যমে পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান আন্দোলনকে দমিয়ে রেখে ক্ষমতা আরো দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করতে।
কিন্তু শেষপর্যন্ত সরকারি কূটকৌশল মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয় এবং সরকার গ্রহণযোগ্যতা হারায়।প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পদত্যাগ ও মামলা প্রত্যাহারের মধ্যদিয়ে ঐতিহাসিক ৬ দফা, ১১ দফা তথা বাঙালিদের বিজয় অর্জিত হয়।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। সাহিদা বেগম, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ২০০০।
২। আবদুর রউফ, আগরতলা মামলা ও আমার নাবিক জীবন, ঢাকা, প্যাপিরাস, ১৯৯২।
৩। মওদুদ আহমদ (অনুবাদ: জগলুল আলম), বাংলাদেশ : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯২ ।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। আগরতলা মামলার বিষয়বস্তু বর্ণনা করুন ।
২। আগরতলা মামলার পরিণতি কি হয়েছিল বিবরণ দিন।
৩। এই মামলার ফলাফল সংক্ষেপে লিখুন।
৪। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পেছনে এই মামলার কোন ভূমিকা ছিল বলে আপনি মনে করেন?
রচনামূলক প্রশ্নঃ
১। আগরতলা মামলা সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা দিন। এই মামলার প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব মূল্যায়ন করুন।
