রাজনৈতিক আন্দোলনে নারী : তত্ত্বকাঠামো

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় রাজনৈতিক আন্দোলনে নারী : তত্ত্বকাঠামো – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী

রাজনৈতিক আন্দোলনে নারী : তত্ত্বকাঠামো

 

রাজনৈতিক আন্দোলনে নারী : তত্ত্বকাঠামো

 

বর্তমান গবেষণাটি বৃটিশ ভারতে অবিভক্ত বাংলায় রাজনৈতিক নারীর উন্মেষ ও তাৎপর্য বিশ্লেষণপূর্বক সামাজিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে নারীর অবস্থান নির্ণয় বা পুনঃমূল্যায়নের প্রচেষ্টা। বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানে নারীবিষয়কে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণের প্রচলন হয়েছে, যা গবেষণা ক্ষেত্রে তৈরি করেছে একটি নতুন ধারা। ফলে যে কোন নারীবিষয়ক গবেষণার পূর্বে নারীবাদের সম্যক আলোচনা প্রয়োজন।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, আদিম যুগের যাযাবর জনগোষ্ঠী যখন নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তে যখন পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রচলন হয় তারপর থেকেই নারীরা পুরুষের অধস্তন হয়ে গৃহে আবদ্ধ জীবনযাপন শরু করে।

আর এভাবেই যে কোন সমাজে নারীরা সমাজের মূলস্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যার কারণ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন নারীর অনুৎপাদনশীল গৃহস্থালীর কাজ করাকে। সাধারণত দেখা যায় যে, নারীরা গৃহস্থালীর যে কাজ করে তা থেকে কোন উপার্জন হয় না; যে কারণে অর্থনৈতিকভাবে নারীকে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।

এভাবেই অর্থনৈতিক ক্ষমতা পুরুষের হাতে থাকায় অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতাও পুরুষের কুক্ষিগত হয় এবং নারীকে সর্বক্ষেত্রে হতে হয় তার অধীন। একপর্যায়ে এই অধস্তন অবস্থানে সে হয়ে ওঠে অভ্যস্ত। নারীকে সমাজের মূলস্রোতধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতবাদ বা তত্ত্বের প্রচলন হয়েছে যা নারীবাদ বা Feminism হিসেবে পরিচিত।

Helen Tierney সম্পাদিত “Women’s Studies Encyclopedia” গ্রন্থে Feminism -এর যে সংজ্ঞাটি দেওয়া হয়েছে তা হচ্ছে, “Feminism affirms the value of women and women’s contributions to social life and anticipates a future where barriers to women’s full participation in public life will be removed.” °

এই সংজ্ঞা অনুসরণ করে বলা যায়, নারীবাদ একদিকে নারীর বিবিধ ভূমিকার মূল্যায়ন করে, অন্যদিকে সমাজে নারীর সর্ব্বোচ্চ ভূমিকা পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পথনির্দেশ করে। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে নারীবাদের দুটি দিক আছে, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক। জুডিথ অ্যাস্টেলারা তাঁর Feminism and Democratic Transition in Spain’ গ্রন্থে নারীবাদকে নিম্নোক্তভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন

নারীবাদ হচ্ছে সামাজিক রূপান্তর ও আন্দোলনের লক্ষে একটি পরিকল্পনা যা নারী নিপীড়ন বন্ধ করার চেষ্টা করে। এই দুইপ্রকার উপাদানের মধ্যে নারীবাদ সবসময় ঐতিহাসিক সমাজের অংশ হিসেবে অবস্থান করেছে যে সমাজের মধ্যে এটা বিকশিত হয়েছে: নারীবাদ এর সমাজের নির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। একটি আন্দোলন হিসেবে নারীবাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা কমবেশী সংগঠিত কিন্তু নারীকে নিম্নস্তরে

পরিণতকারী সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে সবসময় তা সোচ্চার। এরূপ বিরোধিতা সামাজিক সংগ্রামের অন্যান্য ধরণ থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং এই সম্পর্ক আন্দোলনের আদর্শ ও সংগঠন উভয়কেই প্রভাবিত করেছে।

যেহেতু নারীবাদের ক্ষেত্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গি তাই নারীবাদের সর্বজনস্বীকৃত বা গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নিরূপন করা দুরূহ বিষয়। তবে যে বিষয়টি বলা যায় তা হচ্ছে, নারীবাদ সমাজে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য এবং নিপীড়নের কারণ ও ফলাফল নির্দেশ করে এবং নারীর সর্বাঙ্গীন মুক্তি বা তার অধিকার নিশ্চিত করার পথনির্দেশ করে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ বা দৃষ্টিকোণ থেকে।

নারীবাদের ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ বা দৃষ্টিকোণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মতবাদের ভিন্নতা থাকলেও সাধারণভাবে কয়েকটি ক্ষেত্রে সবাই একমত পোষণ করে। বিষয়সমূহ হচ্ছে : সমাজে নারীর অবদানকে সুনির্দিষ্ট করা এবং নারীর মূল্যায়ণ,

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীকে কীভাবে অবমূল্যায়ণ করে তা অনুধাবনে অতীতকে সমালোচনার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা; সেক্স জেন্ডার প্রত্যয় দুটির গঠনকৌশল বিশ্লেষণ যা পুরুষ এবং নারীর পার্থক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং নারীদের মধ্যে যে পার্থক্যসমূহ রয়েছে তা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে, বিশেষত জাতি, বর্ণ, গোত্র, ধর্ম, শ্রেণি, বয়স,  শারীরিক গঠন সহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহ যার ভিত্তিতে কোন ব্যক্তিকে তার মেধা, চিন্তা মননশীলতা ও অন্যান্য গুণাবলী বিবেচনা না করেই তাকে অবমূল্যায়ন করা বা বাতিল করা হয়;

সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনে রীতিনীতি ও আচরণগুলি নারীর ভূমিকা, গুণাবলী ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবর্তনের জন্য সহমর্মীতার নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিস্কার করা; সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন আনার জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যাতে করে নারীরা সমাজে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে জনজীবনের অংশীদার হতে পারে।

প্রাচীন গ্রীস থেকে শুরু করে বিশ শতক পর্যন্ত নারীর বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা, তা থেকে বিকশিত হয়েছে নানান ভাবনা। এইসব চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যানধারণার ভিত্তিমূল ছিল প্রাচীন অ্যাথেনীয় গ্রীক দর্শন।

গ্রীক মতবাদ অনুসারে নারী সম্পর্কিত যে তত্ত্বগুলি পাওয়া যায় তা হচ্ছে : প্রকৃতিগতভাবে নারী ও পুরুষ ভিন্ন সত্ত্বার অধিকারী ও এ দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় রফার মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও শৃংখলা রক্ষিত হয়; একইভাবে, নারী ও পুরুষের ভূমিকা পরস্পরের বিপরীত ও প্রকৃতি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী একে অন্যের সম্পূরক।

সমাজের প্রয়োজনগুলিকে দুটি স্পষ্ট বিভাগে ভাগ করা যায় যা প্রকৃতির ও নারী-পুরুষের সামর্থ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যার একটি বাইরের জগৎ বা বহিরাঙ্গণ পরিমণ্ডল, এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ঃ ভারী শ্রমমূলক কাজ, সামরিক তৎপরতা এবং সমাজরক্ষা ও সামাজিক জীবনযাত্রা পরিচালনা – একাজগুলি পুরুষের জন্য নির্ধারিত।

অন্যদিকে, গৃহ বা অন্তরাঙ্গণ পরিমণ্ডলের কাজে কম শক্তির এবং অনেক বেশী ভালবাসা, মমতা ও লালন-পালনের প্রয়োজন, কাজেই এ কাজগুলি মেয়েদের ওপর ন্যস্ত। পুরুষ প্রকৃতিগতভাবে বহির্মুখী এবং অধিক শারিরীক শক্তি ধারণ করে, আর তাই তাদের জনসেবামূলক কাজ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা উপার্জন ও সরকারী কাজকর্মে নিয়োজিত হওয়াটাই যথার্থ।

নারী প্রকৃতিগতভাবে অন্তর্মুখী। এই যুক্তিতে সে পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট কাজগুলির আওতার বাইরে আর একই কারণে পারিবারিক ও জনগণের কাছে অপ্রকাশ্য নানা কর্মতৎপরতার ভার তার ওপর ন্যস্ত। গ্রীক দর্শন অনুসারে লোকপরিমণ্ডল নগর-জনপদগুলির অস্তিত্ব ও ঐ নগর-জনপদের অধিবাসীদের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত, এবং এই পরিমণ্ডলের কাজকর্ম একান্ত ঘরোয়া পরিমণ্ডলের কাজগুলির তুলনায় অনেক বেশী মর্যাদাসম্পন্ন, মহিমাময় ও গুরুত্বপূর্ণ।

বলা চলে গ্রীক দর্শন অনুসারে পুরুষ অপেক্ষাকৃত বেশি শক্তিমান, সাহসী ও উৎকৃষ্টতর; অন্যদিকে নারী দুর্বল, অসম্পূর্ণ, যুক্তিবর্জিত ও নিকৃষ্ট।’ গ্রীক মূল্যবোধে, রাজনৈতিক সংগঠন কর্মের মানবীয় সামর্থ্যটি নারী সামর্থ্যের তুলনায় কেবল বিসদৃশই নয় বরং তা নারীর স্বাভাবিক অনুষঙ্গের সরাসরি বিপরীত। গ্রীক ধারণা অনুযায়ি, নারী নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারগুলি তার তরফ থেকে পরিবারের পুরুষ সদস্যগণ প্রয়োগ করবে।

নারী প্রশ্নে গ্রীক দার্শনিক প্লেটো প্রথম একজন সত্যিকার আদর্শ নারীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত সেটি তার বিখ্যাত গ্রন্থ Republic-এ বর্ণনা করেছেন। মূলত এই গ্রন্থে প্লেটো আদর্শ রাষ্ট্রের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন আদর্শ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নারীর অবস্থান কী হবে সে সম্পর্কে তিনি তাঁর মতামত ব্যাক্ত করেছেন।

প্লেটো এমন একটা সমাজব্যবস্থার ধারণা দেন যেখানে মানবসমাজের বিশুদ্ধ চিত্রটি পাওয়া যাবে, যে সমাজে নারী- পুরুষ সবাই এক নিয়মের অধীনে একই ব্যবস্থার সুফল ভোগ করবে। প্লেটো তাঁর কল্পিত আদর্শ সমাজের শিক্ষা প্রসঙ্গে তার মতামত ব্যক্ত করে বলেন যে, সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য একই শিক্ষাব্যাবস্থা চালু থাকবে এবং উভয়ের সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য একই রকম হবে।

১০ প্লেটোর মতবাদে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হচ্ছে তিনি প্রতিটি মানুষের (ব্যক্তি পুরুষ বা নারী হিসেবে নয়) মেধা বিকাশের সমান সুযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, একইভাবে সমাজে কর্মবন্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রাধান্য দিয়েছেন।

যে ব্যক্তি (পুরুষ বা নারী নয়) যে কর্ম সম্পাদনে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন তিনি সেই দায়িত্ব পালন করবেন, ফলে নারী-পুরুষের কাজের পৃথক যে গণ্ডি তাকে তা দূর হবে। নারী-পুরুষের কাজের পৃথক গণ্ডিকে প্লেটো অযৌক্তিক মনে করেছেন।

রোম-এর ইতিাসে দেখা যায় যে প্রাথমিক যুগে রোমান নারীরা কোন ধরনের অধিকারই ভোগ করতেন না। ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্য বৃদ্ধি পেতে থাকলে সেখানকার নারীদের অবস্থাও পরিবর্তিত হতে থাকে এবং তারা কিছুটা সামাজিক অধিকার লাভ করে।

 

তবে কিছু কিছু অধিকার পেলেও রোমান নারীদের সবসময়ে তাদের অভিভাবকের অধস্তন হয়ে থাকতে হতো। পিতাকেই অভিভাবক হিসেবে গণ্য করা হতো । অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিত কোন কিছু করার অধিকার রোমান নারীর ছিল না। প্রকৃত অর্থে রোমান নারীও ছিল পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার।

খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর খ্রিষ্টীয় মতবাদের প্রাধান্য দেখা যায়। খ্রিষ্টীয় মতবাদে দেখা যায় বাহ্যিক ভাবে তা নারীর জন্য আধ্যাত্মিক মুক্তি ও অনন্য মর্যাদার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা ছিল নিরেট একটি পিতৃতান্ত্রিক মতবাদ। খ্রিষ্টের মুক্তির বাণীতে আকৃষ্ট হয়ে অনেক নারী তাদের দুরবস্থা থেকে মুক্তিলাভের জন্য খ্রিষ্টধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করে।

১৪ খ্রিষ্টের শিষ্য ও খ্রিষ্টধর্মপ্রচারক সেন্ট পল বলেন, পুরুষ স্রষ্টার আদলে তৈরি আর নারী পুরুষের আদলে গড়া, তাই তিনি বিধান দেন পরিবারে নারীর ভূমিকা হবে অধঃস্তনের এবং সে থাকবে স্বামীর কর্তৃত্বের অধীনে। তিনি চার্চে নারীর অধিকারকেও অস্বীকার করেন।”

বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট অংশের দশটি বিধানেও দেখা যায় নারীর উল্লেখ রয়েছে দশম বিধানটিতে এবং সেখানে দাসদাসী ও গৃহপালিত পশুর সঙ্গে নারীকেও এক করে দেখানো হয়েছে।১৬ খ্রিষ্টধর্মও তার পূর্ববর্তী অন্যান্য ধর্মের মতই নারীকে হেয় করে রেখেছিল।

যার ভিত্তিতে নারীসমাজকে রাজনীতি ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে মর্যাদার আসন থেকে বঞ্ছিত করা হয় ।
সতেরো শতকের শেষভাগ থেকে আঠারো শতকের শুরুতে এই দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকে, এসময়ে নারীর সামাজিক অবস্থান ও নারীর অধিকারের বিষয়গুলিতে প্রশ্ন ওঠে।

যে বিষয়গুলি এই সামাজিক পরিবর্তনের সাথে জড়িত ছিল সেগুলি হচ্ছে, ইউরোপের নবজাগরণ (রেনেসাঁ ), শিল্পবিপ্লব, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ-ব্যক্তিস্বাধীনতার তত্ত্ব ইত্যাদি।

এ সময়ে দেখা যায় নারী নিজেও তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ১৬৬২ সালে মার্গারেট লুকাস নামে একজন ওলন্দাজ নারীর একটি লেখা পাওয়া যায় ‘ফিমেল ওরেশনস’ নামে। এতে তিনি বলেন, পুরুষ আমাদের বিরুদ্ধে দারুণ বিবেচনাহীন ও নিষ্ঠুর আচরণ করে, ওরা সব ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে কিন্তু আমাদের বেলায় অবরোধ সৃষ্টি করে মেয়েদের সাথেও মিশতে দেয় না। আমরা

বাদুড় অথবা পেঁচার মতো বাস করি, পশুর মতো ভারবাহী জীব যেন আমরা। আমরা প্রতিনিয়ত পোকামাকড়ের মতো মৃত্যুবরণ করি। ”
১৬৭৫ খৃষ্টাব্দে Mrs Hannah Woolley নামে একজন স্কুল শিক্ষিকা “Gentlewomen’s Companion” নামে একটি বই প্রকাশ করেন, যার সূচনায় তিনি বলেন

The right education of the female sex, as it is in a manner everywhere neglected, so it ought to be generally lamented. Most in this depraved later Age think a women learned and wise enough if she can distinguish her husbands bed from anothers.

Certainly Mans Soul cannot boast of a more sublime original than ours, they had equally their efflux from the same eternal immensity, and (are) therefore capable of the same improvement by good education. Vain man is apt to think we were meerly intended for the world’s propagation, and to keep its human inhabitants sweet and clean: but by their leaves, had we the same literature, he would find our brains as fruitful as our bodie’s.”

যদিও লেখিকা তাঁর অভিযোগগুলি মেয়েদের কাছেই করেছিলেন, তবে এর মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিকতা, নারী- পুরুষের বৈষম্য, নারী-পুরুষের সমান মেধার বিষয়টি এবং নারীকে উচ্চশিক্ষার অধিকার থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্ছিত রাখার বিষয়টি খোলাখুলিভাবে সকলের সামনে আসে। এ

ই সময় দেখা যায় নারীশিক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পায় এবং ১৬৯৪ সালে মেরী অ্যাস্টেল তার ” A Serious Proposal to the Ladies for the Advancement of Their True and Greatest Interest” বইটিতে প্রথম নারীর উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণের দাবী জানান।

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত রয়েছে। প্রথমটি ১৭৭৬ সালে আমেরিকায় প্রণীত The Declaration of Independence ও দ্বিতীয়টি ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে প্রণীত The Declaration of the Rights of Man and of the Citizen ।

১৭৭৬ সালে আমেরিকা ইংরেজ দখলমুক্ত হতে থাকে, এ সময়ে “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র”-এর প্রণেতা John Adams -এর কাছে তার স্ত্রী Abigail Adams এর লেখা Remember the Ladies শীর্ষক চিঠির মাধ্যমে নারীর নিজের অধিকার দাবির সূচনা হয় বলা যেতে পারে।

এটি স্বামীর কাছে লেখা স্ত্রীর চিঠি না হয়ে বরং হয়ে উঠেছে একজন আইন প্রণেতার কাছে নারীজাতির পক্ষ থেকে পেশ করা দাবিনামা। তিনি আশা করেছেন, যে নতুন আইন প্রণয়নের সময়ে জন এডামস্ নারীদের কথা স্মরণ রাখবেন এবং তার পূর্বসূরীদের চাইতে তিনি নারীদের প্রতি অধিকমাত্রায় সংবেদনশীল এবং সহানুভূতিসম্পন্ন হবেন।

তিনি স্বামীদের হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদানের বিষয়ে নিষেধ করেন, যার কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে সকল পুরুষই সুযোগ পেলে নৃশংস ও জুলুমবাজ (এক্ষেত্রে তিনি Tyrants শব্দটি ব্যবহার করেছেন) হয়ে ওঠে।

তিনি সতর্ক করে বলেন যে, যদি নতুন আইন নারীদের প্রতি যথার্থ যত্নবান না হয় তাহলে তাঁরা বিদ্রোহ করবেন এবং যে আইনে নারীদের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকবে না বা নারীদের বলবার কোন সুযোগ থাকবে না, তেমন আইনের শাসন তারা মেনে নেবেন না।” নারীর আধিকারকে আইনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম প্রয়াস বলা যায় এটিকে।

আঠারো শতকের শেষ দুই দশকে ফ্রান্সে ফরাসী বিপ্লব নামে খ্যাত রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। সাম্য, স্বাধীনতা, সৌভ্রাতৃত্ববোধ -এই মন্ত্রে দীক্ষিত এই আন্দোলনে ফ্রান্সের নারীসমাজের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীরা শুধুমাত্র রাজতন্ত্রের বিরোধিতাই করেন নি, একই সাথে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অত্যাচারের অবসান এবং নারীর অধিকারের দাবিও করেন। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তীকালে দেখা যায় ফরাসী সংসদে The Declaration of the Rights of Man and of the Citizen গৃহীত হয় এবং পুরুষদের সীমিত ভোটাধিকার দেওয়া হয়।

পুরুষতান্ত্রিক এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নারীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং জাতীয় পরিষদের সামনে সমাবেশ করে বলেন “আপনারা অতীতের সকল কুসংস্কার দূর করলেও, সবচেয়ে ব্যাপক ও প্রাচীনতম কুসংস্কারটি বহাল থাকতে দিয়েছেন।

এর ফলে গোটা দেশের অর্ধেক মানুষ রাষ্ট্রীয় পদ অবস্থান সম্মান ও সর্বোপরি আপনাদের মাঝে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্ছিত হয়েছে।” অন্যতম ফরাসী নারীনেত্রী অলিমপি দ্য গোজ এসময়ে রচনা করেন The Declaration of the Rights of Women and of the Female Citizen ।

প্রাথমিকভাবে নারীদের এই অধিকারের ঘোষণাপত্র বিরোধিতার সম্মুখিন হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয় এর কিছু কিছু প্রস্তাব মেনে নিতে। এর মাধ্যমে ফরাসী মহিলারা যে কয়েকটি অধিকার লাভ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবার অধিকার; বিবাহ-বিচ্ছেদ মামলা শুরু করবার অধিকার; অবৈধ সন্তানের স্বীকৃতি; ও বংশানুক্রমিক আইনের ক্ষেত্রে নারীদের স্বীকৃতি।

২১ এই আইনের মাধ্যমে নারীরা তাদের জীবনের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেল। বিশেষত ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে বিয়ে করবার অধিকার ও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার নারীমুক্তির পথে বিশেষ অর্জন বলা চলে।

 

রাজনৈতিক আন্দোলনে নারী : তত্ত্বকাঠামো

 

উনিশ শতকে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী দর্শনচর্চার প্রচলন শুরু হলে এর প্রভাবে নারীমুক্তির প্রশ্নটিও সামনে এসে পরে এবং নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রসঙ্গটি বিভিন্ন লেখায় উঠে আসতে থাকে। এসময়ের দাবিদাওয়া ছিল মূলত নারীর জন্য পুরুষের সমান সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার। বিশ শতকে এসে নারীবাদী তাত্ত্বিকেরা নারী-পুরুষের বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধান করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে নারীর অধঃস্তন অবস্থার জন্য দায়ী করেন।

বিভিন্ন স্তরে নারীবাদী ধ্যানধারণা বিকাশের সময়ে গড়ে ওঠে নারীবাদের বিভিন্ন ধারা। নারীবাদের প্রধান ধারার মধ্যে পাওয়া যায় : উদারনৈতিক নারীবাদ; মার্ক্সীয় নারীবাদ; সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ; বৈপ্লবিক নারীবাদ; সাংস্কৃতিক নারীবাদ; পরিবেশ প্রধান নারীবাদ এবং উত্তরাধুনিক নারীবাদ ।

Leave a Comment