আজকের আলোচনার বিযয় আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, পাকিস্তানে ১৯৬৮-৬৯ সালের গণআন্দোলনের জোয়ার সরকারের সযত্নে গড়ে তোলা ভঙ্গুর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে। জনসাধারণের সাধারণ আশা-আকাঙ্ক্ষা যথাবিবেচনায় নিয়ে সেগুলি মেটাতে প্রশাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণেই এটি ঘটে। কথাটা এভাবেও বলা যায় যে, এতে পাকিস্তানের আধা-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অক্ষমতাই প্রমাণিত হয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদই (APSAC) প্রধানত আইয়ুববিরোধী বিক্ষোভের সূচনা ও পরিচালনা করে। আর এ আন্দোলনের মধ্যে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের দীর্ঘকালের অসন্তোষের সর্বসম্মত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আরো একটি সমান তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রদেশের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলের অবস্থানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উত্তরণ এই অ্যাপস্যাকের অবদান।
এগারো-দফা দাবির সনদে ছয়-দফা ফর্মুলাকে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছয়-দফা ফর্মুলা, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে নবশক্তি দান করে । পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এভাবে নব প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত না হলে পাকিস্তানী রাজনীতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি ভিন্ন ধারার হতে পারতো ।
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১
![আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 2 আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ02.jpeg)
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এগারো-দফাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে অ্যাপস্যাক গঠিত হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সংগঠনটিকে সাধুবাদ জানায়। তবে ছয়-দফার আশু প্রয়োজনীয়তা ও এগারো দফার চূড়ান্ত অনিবার্যতার মধ্যে একটা কৌশলগত পার্থক্য সব সময় বজায় রাখা হয় ।
এগারো-দফার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গোড়ার দিকের সন্দেহ-সংশয়কে এভাবে যুক্তির বুনিয়াদ দেওয়া যায় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কৌশলগত কারণেই ছাত্রদেরকে স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসেবে রাখতে চেয়েছিল যাতে ছাত্রসমাজের সচলতা আরো অনেক ফলদায়ক হয়। প্রস্তাবিত বিরোধী ফ্রন্টের অনিশ্চিত প্রকৃতি ও অ্যাপস্যাকের গঠনবিন্যাস—এই উভয় কারণেও হয়তোবা এই কৌশল গ্রহণ করা হয়ে থাকবে।
অ্যাপস্যাকের তিন অঙ্গ সংগঠন: ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) মধ্যে ছাত্রলীগ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যাবলির সাথে একাত্ম ছিল। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ছয়-দফাকে ছাত্রলীগের মতো “মুক্তি সনদ” হিসেবে গ্রহণ করেনি। কেননা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) (বা পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি)৺ ধারণা অনুয়ায়ী ছয়-দফা দেশে সমাজতন্ত্র কায়েমের পর্যাপ্ত সাধনী নয় । পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছয়-দফা ফর্মুলা বা স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের কোনোটিকেই প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়নি।
তারা তাদের বিক্ষোভ স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করে। পুলিশের নিষ্ঠুরতা ও অন্যান্য নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাদিই মনে হয় দুর্ভোগ-দুর্দশার মধ্যে এদের সবাইকে একে অন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসে। ১৯৬৮ সালের গোটা বছর জুড়ে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সংগঠনগুলি সম্মিলিত কিংবা স্বতন্ত্র থেকে বিভিন্ন বিক্ষোভ খণ্ড খণ্ডভাবে পরিচালনা করে।
ফলে প্রদেশব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হলগুলি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাপক ধরপাকড় চলে, পুলিশ গুলি চালায়। মাঝে মাঝে এদের কোনো কোনো সংগঠন, বিশেষ করে, মতিয়াপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অভিন্ন দুশমনের বিরুদ্ধে প্রত্যয়ী এক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে সকল বিরোধীদলের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে।
পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্ররা যখন এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এক প্রগতিবাদী বিরোধী ফ্রন্ট গঠন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছিল ঠিক সেই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানেও গোলযোগের খবর পাওয়া যায়। লান্ডিকোটালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক হাঙ্গামা ঘটে।
১৯৬৮ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের এই গোলযোগে পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন ছাত্রের প্রাণহানি ঘটে। প্রধান ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান ও উদীয়মান পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করা হলে সরকারবিরোধী ছাত্রবিক্ষোভ আরো ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৮ সালের ১৯ নভেম্বর গোটা পশ্চিম পাকিস্তানে হরতাল পালিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করে। তারা বিরোধীদলগুলির মধ্যে নতুন করে ঐক্যের আহ্বান জানায়। ঐ সময় তারা নিজেরাই সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও এগারো-দফা প্রণয়ন চূড়ান্ত করে ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা ছাত্রদের সাথে নিজেদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচ্ছন্ন অনুমোদন সত্ত্বেও তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এগারো- দফাকে অনুমোদন করিয়ে নিতে পারেননি। এই সময়ে শেখ মুজিব ছিলেন কারাগারে।
এগারো-দফার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন হয়তো খন্দকার মোশতাক আহমদের মত কিছু সদস্য বিরোধিতা করতে পারতেন কারণ খন্দকার মোশতাক মনে করতেন এগারো দফা ছয়-দফাকে নিষ্প্রভ করার জন্যেই প্রণীত হয়েছে রাজনীতিকদের স্তরে সবচেয়ে প্রবল ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন মওলানা ভাসানী ন্যাপ (ভাসানী) ও এই দলের অঙ্গ সংগঠন যেমন, কৃষক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশন কর্তৃক ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এক সভায় মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্টকে “ক্ষমতা ছেড়ে” দিয়ে অবসর জীবনযাপন করার জন্য বলেন।
পাকিস্তান আন্দোলনের সময় যে সব অঙ্গীকার করা হয়েছিল সেগুলি মেনে চলার ও পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার জন্য তিনি ক্ষমতাসীন শাসকচক্রের প্রতি আহ্বান জানান । অন্যথায় তিনি এই মর্মে হুমকি দেন যে, এভাবে এই দাবি উপেক্ষিত হতে থাকলে পূর্ব পাকিস্তানীরা এক “স্বাধীন পূর্ব বাংলা”র জন্ম দেবে।
ভাসানী ৭ ডিসেম্বর হরতালের ডাক দেন। ঐ দিন পুলিশী অত্যাচার-নিপীড়ন সরকারের মুখোশ পুরো উন্মোচন করে এবং অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর অবসানের লক্ষ্যে জনগণের লাগাতার সংগ্রামের সূচনা হয়। ঐ একই দিন সন্ধ্যায় মওলানা ভাসানী যখন গভর্নর হাউস অভিমুখে এক বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন গভর্নরের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করার জন্য সেই সময়ে আওয়ামী লীগ, পিডিএম, পিপিপি, নিজাম-এ-ইসলাম ও ন্যাপ (মোজাফফর) সাড়ে ছয় ঘণ্টার এক দীর্ঘ আলোচনার পর পরের দিন হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
আইয়ুব খান ডিসেম্বরের পয়লা সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন, বিরোধীদল সংকল্প এঁটেছে রক্তপাত তারা ঘটাবেই।” বাস্ত বিকপক্ষেই এ রকম পরিণতির জন্য এ সব উস্কানি যেন পরিকল্পিতই ছিল । দৃষ্টান্তস্বরূপ, ৭ ডিসেম্বর হরতালের সময় নিহতদের জন্য গায়েবানা জানাযা নামাজে পুলিশের কুৎসিত, নগ্ন হস্তক্ষেপ ঘটে। তারা ধর্মীয় নামাজের অনুষ্ঠান থেকেও লোকজনকে টানাহেঁচড়া করে।
১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বরের ঘটনা দিয়ে শুরুর পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় যথেষ্ট পরিবর্তন দেখা দেয়। ভাসানীর প্রতিক্রিয়া খোদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়ার তুলনায় বিস্ফোরক পরিস্থিতির সাথে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যখন সম্মিলিত বিরোধী পক্ষের এক সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ তখন মওলানা ভাসানী এই উল্লেখমাত্র করেন যে, প্রস্তাবিত বিরোধী পক্ষের উদ্দেশ্য নির্বাচনে লড়া নয় বরং এর কাজ হবে সমাজবাদী কাঠামোর এক নতুন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা যার আওতায় থাকবে সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকার এবং সকল অঙ্গ ইউনিটের জন্য (অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশের জন্য) পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হলো এই, ১৯৫৭ সালে তিনি যে ধ্যানধারণা ব্যক্ত করেছিলেন স্বায়ত্তশাসনের সংজ্ঞায়নে তিনি সে কথাগুলিই পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে সমঝোতার কিছু কিছু আভাস দেখা যাচ্ছে বলে মনে হলেও প্রতিটি দলকেই যেন অন্যের সাফল্যের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত বলে মনে হয় । মূল ইস্যু নিয়ে তখনো তারা ঐকমত্যে আসতে পারেনি। আদতে মূল ইস্যু ছিল: গঠনের বা আকারের দিক থেকে আংশিক গণতান্ত্রিক অথচ সারবস্তুর দিক থেকে অগণতান্ত্রিক এক ব্যবস্থার আওতায় আয়োজিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করাই যথেষ্ট হবে? না, একটা গণআন্দোলন অনিবার্য? যদি গণআন্দোলনই করতে হয় তা কি কেবল আইয়ুব খানকেই গদিচ্যুত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হলেই হবে? না আন্দোলনের কিছু অর্থনৈতিক দাবিদাওয়াও থাকা দরকার?
১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রে কিছু সংশোধনী হলেই চলবে? না ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন চাওয়া হবে? চরম বাম ও চরম ডানপন্থীদের যেমন বহু রাজনৈতিক দল, উপদল/গোষ্ঠী ছিল তেমনি তাদের মতামতও ছিল অনেক ধরনের। ন্যাপ (ভাসানী) নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধী ছিল। এ দল সাধারণভাবে এক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণআন্দোলনে বিশ্বাস করতো। তবে দলের কিছু লোক গণউত্থানের পক্ষপাতী ছিল। তাদের মতে, এ গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হবে ‘ঘেরাও কর্মসূচি’ দিয়ে।
তবে তাদের সমালোচকরা এ ধরনের কর্মসূচিতে কতকগুলি মৌলিক বিষয়ের অনুপস্থিতির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেন। গণঅভ্যুত্থান হতে হলে কর্মী ও চাষীদের মাঝে অত্যন্ত শক্তিশালী সাংগঠনিক বুনিয়াদ থাকতে হবে, থাকতে হবে সুপ্রশিক্ষিত ক্যাডার শ্রেণী ইত্যাদি। তাদের সুনিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, দুর্দশাপীড়িত অপ্রস্তুত গণমানুষ এ আন্দোলনে হিতে বিপরীত ঘটাতে বাধ্য। ন্যাপের অন্য অংশ তথা ন্যাপ (ওয়ালী) যা পূর্ব পাকিস্তানে ন্যাপ (মোজাফফর) বা ন্যাপ (মস্কো) নামে অভিহিত এই দলটি ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সামাজিক পরিবর্তনে বিশ্বাসী।
দলটি ‘বুর্জোয়া’ সমাজব্যবস্থায় যা কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় তা কাজে লাগাতে তৈরি ছিল। এই দলের মতে, কোনো সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর অস্তিত্ব না থাকায় একমাত্র বিকল্প হলো বহু শ্রেণীভিত্তিক আন্দোলন। প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নকরা যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দখল না করতে পারে সে জন্য ন্যাপ (মোজাফফর) ছয়-দফাপন্থী আওয়ামী লীগের সাথে, এমনকি, পিডিএম-এর উদারপন্থী অংশের সাথে হাত মিলিয়ে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে নামতেও তৈরি ছিল। পিডিএম—যাকে কার্যত মৃতবৎবিরোধী ফ্রন্ট বলা যায়—ছিল কার্যত বিভক্ত।
এনডিএফ-এর প্রতিনিধি মাহমুদ আলী নির্বাচনের সকল স্তরে অংশগ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগার সালাম খান কেবল নির্বাচনের নিম্নতম স্তরে অর্থাৎ মৌলিক গণতন্ত্র স্তরে অংশগ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। পিডিএম-এর অন্য কিছু সদস্যের মতে, ছয়-দফাপন্থী আওয়ামী লীগ এবং দুই ন্যাপ তাদের সাথে যোগ না দিলে কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে না । নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান ও মিয়া মমতাজ দৌলতানা পশ্চিম পাকিস্তানে জনবিক্ষোভের অবস্থা দৃষ্টে বিরোধীদলের প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কাউন্সিল মুসলিম লীগ ও নিজাম-এ-ইসলাম প্রয়োজনে মৃদু নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুকূলে মত ব্যক্ত করে।
জামায়াত-ই-ইসলামী সরকারের অপসারণ চাইলেও তারা শান্তিপূর্ণ আইন অমান্যভিত্তিক কোনো আন্দোলনের জন্য তৈরি ছিল না, কেননা তাতে বিত্তবানদের স্বার্থে বিরূপ আঘাত পড়তে পারে। তাছাড়া, স্পষ্ট আদর্শিক কারণেও জামায়াত-ই-ইসলামী ন্যাপের সাথে কোনোযৌথ কর্মসূচিতে হাত মিলাতে তৈরি ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ উভয় ন্যাপের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনের জন্য তৈরি ছিল, কিন্তু ন্যাপ (মোজাফফর) ন্যাপ (ভাসানী)-এর সঙ্গে কাজ করতে রাজি ছিল না।
দৃষ্টত তখনকার পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতি (পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিও) ছিল জটিল এক হেঁয়ালি ভরা ধাঁধা বিশেষ । ১২ অথচ সে তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ সর্বদাই যে কোনো বিরোধীদলীয় আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে দ্বিধান্বিত কুণ্ঠিত রাজনীতিকদের পিছে ফেলে স্বকীয় রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে । বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন তাদের আদর্শগত মতপার্থক্য পেছনে ফেলে অ্যাপস্যাক বা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনে এগিয়ে আসে। তারা ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের ঐতিহাসিক বটতলায় এক সভায় মিলিত হয় ।
এই সভায় তারা তাদের সর্বাত্মক রাজনৈতিকীকরণের আভাস দিয়ে ঘোষণা করে যে, ছাত্র সম্প্রদায়ের কিছু সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়ার জন্য লড়লেও তারা যুগপৎ অন্যান্য আর্থ- রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলিতেও অংশগ্রহণ করবে কেননা সমাজেরই একটি অংশ হিসেবে জনগণের দুঃখ-দুর্দশায় তারা উদাসীন থাকতে পারে না। ধর্মঘটের ডাক অবশ্য স্থগিত করা হয়৺ দৃষ্টত রাজনীতিক যারা তখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন তাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঘন ঘন সলাপরামর্শ করছিলেন মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আর সেটি স্পষ্টত সঠিক কৌশল সম্পর্কিত পরামর্শ লাভের জন্য—তাঁকে বিরাট আকারে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আন্দোলনে খুবই প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব দিতে বলার জন্য না হলেও। আর এও নিশ্চিত ছিল যে, সেই সময় নাগাদ সরকারের সঙ্গে মওলানা ভাসানীর মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়ে যায়। তিনি আর তখন এই ভ্রান্তিবিলাসী যুক্তির নিগড়ে বন্দী ছিলেন না যে, সমাজতান্ত্রিক দেশের সাথে কোনো সরকার বন্ধুভাবাপন্ন হলে তা দেশে সমাজতন্ত্র প্রবর্তনের সম্ভাব্য সাধনী হিসেবে কাজ করতে পারে।
এখন তাঁর এই বাস্তবতার উপলব্ধি ঘটে যে, সমাজের যে পুনর্নির্মাণে তিনি বরাবরই প্রয়াসী তা নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা আরোপিত হবে এমন আশা করা যায় না, কারণ সে ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে বাধ্য। তিনি আরো জানতেন, এ ধরনের সমাজ-পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সুদীর্ঘ সংগ্রামের। তবে এ কথা ঠিক যে, সূচনা তো একটা করতেই হয় আর সে জন্য প্রথমে সাধারণ মানুষকে তাদের স্থবির, জড়, অলস অবস্থা থেকে অবশ্যই জাগিয়ে তুলতে হবে। আর এই কারণেই কোনো সুযোগ এলে তা কাজে লাগাতেও হবে।১৪ এর ফল হিসেবে আমরা যা দেখি তা হলো মওলানা ভাসানীই সেই ব্যক্তি যিনি প্রয়োজনে জেলের দেওয়াল ভেঙে শেখ মুজিবকে মুক্ত করার জন্য প্রত্যয়-দৃঢ় আহ্বান জানিয়ে পূর্ব পাকিস্তানী যুবক-তরুণদের মনে বিপ্লবী চেতনার আগুন জ্বালিয়েছিলেন।
কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা এগুচ্ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক পদবিক্ষেপে, বিকল্প উপায়গুলি হাতে রেখে । তাঁরা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছিলেন, ছাত্রদের কর্মসূচির প্রতি সমর্থনও জানাচ্ছিলেন। আবার, যারা যৌথ ফ্রন্ট গড়ায় আগ্রহী তাদের সাথেও কথা বলছিলেন। পরিশেষে তাঁরা যোগ দেন আটদলীয় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। পরিষদে (Democratic Action Committee)। আনুমানিক তিন মাসের আলোচনার পর ১৯৬৯ সালের জানুয়ারির গোড়ার দিকে ড্যাক (DAC) গঠিত হয়।
এই ড্যাক প্রকৃতপক্ষে গঠিত হয় পিডিএম (Pakistan Democratic Movement), নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (ছয়-দফাপন্থী), জমিয়তুল উলেমা-ই-ইসলাম ও ন্যাপ (ওয়ালী)-কে নিয়ে । ন্যাপ (ভাসানী) বা পিপিপি কেউই ড্যাকে যোগ দেয়নি।১৫ ড্যাক নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । আর আট-দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে । তবে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি তাতে ছিল না।
এ কারণে, ড্যাকে যোগদানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত রীতিমতো হেঁয়ালি মনে হতো কিন্তু এ-ও দেখার মতো বিষয় যে, ড্যাকের কর্মসূচির ৫নং দফায় শেখ মুজিবুর রহমান, খান আবদুল ওয়ালী খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সকল রাজবন্দী, ছাত্র, শ্রমিক ও সাংবাদিকের মুক্তির দাবিটি ছিল। এই দফায় রাজনীতিবিদ সম্পর্কিত এমন সকল ঝুলে থাকা আদালতের মামলা প্রত্যাহারই কেবল নয় ট্রাইব্যুনালগুলির আওতাধীন মামলাগুলির প্রত্যাহারও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আগেই ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ব্যাপকতর সমর্থনের প্রয়োজন ছিল । তাছাড়া, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদের জন্য ছাত্রদের রাজনীতির অতিমাত্রায় বামপন্থীকরণ ঠেকানোর এটিই ছিল একমাত্র পথ। এটি তাদের নিজ অবস্থান বজায় রাখা নিশ্চিত করতেও দরকার ছিল । তৃতীয়ত, এই পন্থা ছাত্র উদ্যোগ ও উদ্যমের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা থেকে তাদের রক্ষাও করে। অবশ্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ড্যাকে যোগদানের জন্য তার নিজ কর্মসূচিকে বিসর্জন দিতে হয়নি।
ড্যাক যখন গঠন পর্যায়ে ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির এক সভা কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এ সব প্রস্তাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ছয়-দফা আদায় ও সকল স্তরে নির্বাচন বয়কটের লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিতে গণআন্দোলন সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল ।১৭ ছয়-দফার প্রতি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অঙ্গীকারের কথা আরো একবার প্রমাণিত হয় ১৯৬৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে ।
ঐ বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান ছয়-দফা কর্মসূচিতে অটল থাকেন ও পরে, ড্যাক পরিত্যাগ করেন। তবে ড্যাকের সাথে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একটি সম্পর্ক না থাকলে এ দলের হয়তো কখনো প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সাথে সরাসরি সংলাপের অবকাশ ঘটতো না—এ কথা বোধগম্য। এই পদক্ষেপের সুবাদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানে কথিত অন্য জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলির সমান মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়। তবু নিরেট বাস্তবতাও থেকে যায়।
সেটি হলো সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে ড্যাক যে কর্মসূচি দিতে পারে তার চেয়ে ভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তাই অ্যাপস্যাক ১৯৬৭ সালে মূলত যা স্থির হয়েছিল সেই কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্ত তখনই বস্তুত নেওয়া হয় যখন ছাত্ররা নিশ্চিত হয় যে, ড্যাকে ডানপন্থীদের আধিপত্যের কারণে কোনো পূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচিনিতে গেলে তারা তাতে বাধা দেবে। তাই তারা বরং অনুরূপভিত্তিতে আন্দোলনের ডাক দেওয়ার জন্য ড্যাককে চাপ দেয়। ড্যাক এ চাপে সাড়া দেয়নি । তবে অ্যাপস্যাক পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে
এক তৃতীয় মাত্রা যোগ করে। আইয়ুবী শাসনের অবসানের জন্য পূর্ব পাকিস্তানী দাবির সাথে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিও যোগ করা হয় । এর সাথে উন্নততর সামাজিক ন্যায়বিচার-সংক্রান্ত বিষয়ে আরো কিছু দাবি যোগ করে গোটা দাবিদাওয়াকে আরো মজবুত করে তোলা হয় ।
ছাত্রদের এগারো-দফায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত ফর্মুলা অঙ্গীভূত করে নেওয়া ছাড়াও শিল্প ব্যবস্থায় পরিবর্তন, ব্যাংক, বীমা ও বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির জাতীয়করণ ও চাষীদের ওপর করভার কমানো, শ্রমিকদের উন্নততর মজুরি প্রদানের দাবিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সব দাবি অবশ্য পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ/পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে নিয়মিত বৈশিষ্ট্য হিসেবেই অস্তিত্বশীল ছিল। তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য মধ্যপন্থীদের থেকে ব্যতিক্রম হিসেবে অ্যাপস্যাক এক ধরনের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা কার্যব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প বেছে নেয়।
এটি বিশেষ করে ঘটে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণে একজন আইনের ছাত্রের মৃত্যুর পর ।২° ২৫ জানুয়ারি অ্যাপস্যাক সেনাবাহিনী ও ইপিআর-এর সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায় এবং ঘোষণা করে যে, তাদের দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ছাত্ররা তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। তারা জানায়, অ্যাপস্যাক বৃহত্তর কর্মসূচির বিস্তারিত ঘোষণা করবে। আপাতত জনগণ যাতে আরো তীব্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে সে জন্য জনগণের প্রতি—
১. জেলা, মহকুমা, থানা, গ্রাম পর্যায়ে এবং সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানে অ্যাপস্যাকের স্থানীয় ইউনিটের সহযোগিতায় কমিটি গঠন;
২. অ্যাপস্যাকের কর্মসূচি প্রচারের জন্য পুস্তিকা, প্রচারপত্র ও পোস্টার বিতরণ এবং মাইক্রোফোন সহযোগে পথিপার্শ্বে সভার আয়োজন, জনগণকে সংগঠিতকরণ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন; এবং
৩. শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আবেদন জানানো হয় ।
এ ছাড়াও ছাত্র ও শ্রমিকদের প্রতি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানানো হয়। ২১
পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন, নিষ্পেষণ ছাড়াও মাঠে কর্মরত চাষী, শিশুকে স্তন্যদানরত মাতা এবং রুটি কিনতে আসা শ্রমিকের ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে পশ্চিম পাকিস্তানেও ক্রোধের সঞ্চার হয়। ফলে লাহোর, করাচি, পেশোয়ার, ও গুজরানওয়ালায় সেনা তলব করা হয়।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে ছাত্রদের সাথে একস্বরে বলেন যে, পরিস্থিতি এমন সীমায় পৌঁছেছে যখন পশুর মতো মানুষ হত্যাকে নীরব দর্শকের মতো দেখা আর সম্ভব নয়। তিনি সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এ সব অত্যাচার-নিপীড়ন সরকারের নিজ অবস্থান বজায় রাখতে যেমন সহায়ক হবে না তেমনি তা ১২ কোটি মানুষের উত্থানকেও দমিয়ে রাখতে পারবে না। এ কারণে, এখন সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে সরিয়ে নেওয়ারই উত্তম সময়। অন্যথায়, তিনি জানান, খুব দেরি হয়ে যাবে।
বিক্ষোভ-নিপীড়ন-সহিংসতার ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি যত ঘটছিল নিপীড়নের সব হাতিয়ার, প্রধানত পুলিশ ও ইপিআর প্রয়োগের কার্যকারিতাও কমে যাচ্ছিল। বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল এমনকি তারা তাদেরকে দেওয়া কাজ করতেও আগ্রহী নয় । আর এ জন্য সেনাবাহিনী তলবের দরকার পড়ে। স্পষ্টতই আইয়ুব সরকারের এ ছিল শেষ অবলম্বন । কেননা, এর অল্পকালের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট “দায়িত্বশীল” রাজনৈতিক দলগুলির সাথে আলোচনায় বসতে তার ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেন।
অ্যাপস্যাক এ প্রস্তাবের জোর বিরোধিতা করে । কেননা, তাদের বিবেচনায় এ প্রস্তাব এগারো-দফার অনুকূলে গণআন্দোলন থেকে মনোযোগ বিভ্রান্ত করার এক ধোঁকা মাত্র ২৬ অ্যাপস্যাকের শীর্ষ দশ নেতার সাথে এক সাক্ষাৎকারে দৈনিক আজাদের একজন স্টাফ রিপোর্টার বলেন, তিনি যতদূর ছাত্রদের দেখেছেন তাতে এগারো দফা কোনোক্রমেই দরকষাকষিযোগ্য নয়। আজাদ-এর এই প্রতিবেদক ছাত্রদের এই দশ শীর্ষ নেতাকে “জানুয়ারি আন্দোলনের মস্তিষ্ক ও এগারো দফার প্রধান” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই ছাত্রনেতারা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোনো দলের সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নে তাদের দৃঢ় ভূমিকার কথা খুব পরিষ্কার করে বলেন যে, এই সহযোগিতা এগারো-দফার প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান কী সেই শর্তসাপেক্ষ হবে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তাঁরা বলেন:
আমরা প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন চাই, স্রেফ সরকার পরিবর্তন নয়…… আমরা এগারো-দফাবিরোধী যে কোনো সরকারের বিরোধিতা করবো….. সরকারকে উৎখাত করে একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করার পর পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, অবশিষ্ট একচেটিয়া পুঁজির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী ও ছোট ও মাঝারি শিল্পমালিকদের নানা সমস্যার সমাধান না হওয়া অবধি আমাদের আন্দোলন থামবে না ।
ওপরে বর্ণিত লক্ষ্য, ও উদ্দেশ্যগুলিতে ছাত্রসমাজের বিভিন্ন স্তরের মতের প্রতিফলন রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসমাজের প্রেক্ষাপটে এই অভিমতে কেবল শহুরে শিক্ষিতদের অনুভূতিই নয় বরং নিরক্ষর, অর্ধশিক্ষিত, রাজনীতিক না হলেও দারিদ্র্য-সচেতন পূর্ব পাকিস্তানী সমাজের স্তরগুলির অনুভূতিও নিহিত রয়েছে। তবে এ সব কিছুর পরেও কিছু কিছু দ্বিধা-সংশয় ছিল—এও সত্যি । যেমন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা”র প্রকৃতি ঠিক কী হবে? অর্থনীতির গঠন কাঠামো কী হবে যা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং ছোট ও মাঝারি আকারের শিল্পপতিদের স্বার্থ যুগপৎ রক্ষা করবে? এ সব ও আরো অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়ের রূপরেখা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়নি। আর সম্ভবত এগারো দফার এ রকম
প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের কারণেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাছে এগুলি তুলনামূলকভাবে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে কেননা এ দলটিও কমবেশি অনুরূপ লক্ষ্য অর্জনের কথাই বলে আসছিল লক্ষ্যগুলি অর্জনের পদ্ধতিগুলি কী হবে তার উল্লেখ না করেই। অ্যাপস্যাকের অস্পষ্টতার কারণ তার নিজ গঠনবিন্যাসে নিহিত । প্রথমত, এই কমিটিতে প্রতিনিধিত্বকারী ছাত্র সংগঠনগুলির ছিল বিভিন্ন ধরনের আদর্শিক ঝোঁক বা প্রবণতা।
দ্বিতীয়ত, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন দুই ন্যাপের সাথে শিথিলভাবে সম্পর্কিত যদিও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের দ্বিধাবিভক্তি ঘটে ন্যাপের বিভক্তিরও আগে। আর এ বিভক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির। বস্তুত আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির পরপরই ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হয়। জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন বা এনএসএফ ছিল মূলত ক্ষমতার কায়েমি গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর অবস্থান ও নেতৃত্ব বদলায় যদিও সুনিশ্চিতভাবেই এ সংগঠন দুই ছাত্র ইউনিয়নের কোনোটিরই আদর্শের অংশীদার ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ তার অনানুষ্ঠানিক পিতৃ রাজনৈতিক সংগঠনের মতোই ছিল মূলত মধ্যপন্থীদের এক কোয়ালিশন বিশেষ যেখানে মধ্যবাম ও মধ্যডান উভয় তরফের লোক ছিল।
কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক, ছাত্রলীগ থেকে নিয়মিতভাবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে নিয়মিত সদস্যভুক্তি একদিকে ও অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে প্রত্যক্ষ ও নিবিড় সম্পর্কের কারণে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন হয়ে ওঠে। তাই ছাত্রলীগ অ্যাপস্যাকের অবশিষ্টদের প্রতি তর্জনী নির্দেশের মতো অবস্থানে থাকায় শেষোক্ত সংগঠনের “বিপ্লবী” কর্মসূচি লঘু ও জলো হয়ে যায়।
অ্যাপস্যাকের অভ্যন্তরে সুসংবদ্ধতার অভাব সদস্যদের যে কোনো আলোচনার ভিত্তি সম্পর্কে তাদের নিজ নিজ অবস্থান ও ভূমিকায় প্রতিফলিত। একটি অত্যন্ত অস্পষ্ট অভিমতে বলা হয় যে, আলোচকের আন্তরিকতা সম্পর্কে ছাত্ররা নিশ্চিত হলেই কেবল দরকষাকষি হওয়াটা সম্ভব ছিল । আরেকটি অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট মত হলো এই যে, এগারো-দফার বিরোধিতা করা হবে না— —এই মর্মে প্রতিশ্রুতিই কোনো দরকষাকষির জন্য যথেষ্ট ছিল।
তৃতীয় অভিমত ছিল এই যে, ছাত্রদের নিজেদের সম্পর্কিত সকল দাবিদাওয়া গৃহীত হলে, সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দেওয়া হলে, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হলে, সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হলে, এবং সর্বোপরি এগারো-দফারভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সুনিশ্চিত আশ্বাস দেওয়া হলেই কেবল আলোচনা ও দরকষাকষি সম্ভব ছিল।
অবশ্য অ্যাপস্যাকের চূড়ান্ত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বা চতুর্থ মতটি হলো এই যে, “আমরা জানি, এগারো-দফা তথা জনসাধারণের দাবি মেনে নেওয়ার অর্থ হবে খোদ সরকারের নিজের অস্তিত্বহীন হয়ে পড়া—এ কথা সরকারেরও জানা। তাই তারা যদি কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে একান্ত স্ব-স্বার্থে তারা তা ভাঙতে বাধ্য আর সে কারণেই এগারো দফা নিয়ে দরকষাকষির কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না।”
আজাদ ঐতিহ্যগতভাবে এক রক্ষণবাদী সংবাদপত্র । এহেন খবরের কাগজও কিছুটা উদারনৈতিক হয়ে ওঠে। পত্রিকাটি ইতোমধ্যে আইয়ুব সরকারের রোষানলেও পড়েছিল। যে দিন প্রেসিডেন্ট প্রাদেশিক রাজধানীতে আসছিলেন ঠিক সেই দিনটিকেই বেছে নিয়ে আজাদ এগারো-দফার ওপর এক বিশেষ ফিচার প্রকাশ করে । এই বাস্তবতাটি ছিল এই মর্মে পরিষ্কার আভাস যে, পূর্ব পাকিস্তানে সরকারের কর্তৃত্ব নিতান্তই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছে সংবাদপত্রগুলিকে জানান যে, তিনি জরুরি অবস্থা, পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন ও অধ্যাদেশ ব্যবহার প্রত্যাহারের বিষয় বিবেচনা করছেন। এ ছাড়া সরকারের আপোসরফার মনোভাবের অন্যান্য আভাসও পাওয়া যায় । পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর অবস্থানকালে নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসের বাজেয়াপ্তি প্রত্যাহার করা হয়। ন্যাপ (মো)-এর মোজাফফর আহমদ ও আলতাফ হোসেনের মতো কিছু রাজবন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তবে তাঁর এই পরীক্ষামূলক কৌশল অবলম্বনের ঘটনায় খুব একটা কাজ হয়নি। অ্যাপস্যাকের মেজাজ নরম করার কোনো আভাসই ছিল না। বরং এ ধরনের রেয়াত বা ছাড়ে ছাত্ররা এগারো-দফা নিয়ে কোনো রকম দরকষাকষির বিরুদ্ধে তথা এগারো-দফাকে কোনো রকম ক্ষুণ্ন করার বিরুদ্ধে আরো অটল হয়ে দাঁড়াতে উৎসাহিত হয়। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে বৃহত্তম বলে বর্ণিত পল্টন ময়দানে অ্যাপস্যাকের জনসভায় তোফায়েল আহমদ, আবদুর রউফ, মোস্তফা জামাল হায়দার, সাইফুদ্দিন মানিক, ফখরুল ইসলাম, মাহবুবুল্লাহ, ইবরাহিম খলিল, খালেদ মোহাম্মদ আলী ও শামসুদ্দোহা তাঁদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এগারো-দফার চেয়ে কোনো কিছু কম হলে তাতে কাজ হবে না।
উল্লেখ করে বলা হয় যে, বহু দোষারোপিত রাজনীতিকদের সাথে আলোচনায় বসার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব, ইত্তেফাক-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জরুরি অবস্থা ও পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন প্রত্যাহার—এ সবই এই ইঙ্গিত বহন করে যে, গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী শাসনের বুনিয়াদ ধসে পড়ছে। ছাত্ররা দাবি করে বিজয় তাদের প্রায় করায়ত্ত । প্রয়োজনে বিক্ষুব্ধ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তিসহ অন্যান্য দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার বিষয়টি তারা দেখবে। প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠক আন্দোলনের বিজয়ের পথে এক ধাপ অগ্রগতি ধরে নেওয়া হলেও একে সংগ্রামের পথ থেকে জনগণকে বিভ্রান্ত করার ধূম্রজাল হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। এ কথা বলা হয় যে, প্রথমে দাবিদাওয়াগুলি পূরণ না করা হলে ছাত্ররা আলোচনার ধারণাকে সমর্থন করবে না।
![আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 3 আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ01.jpg)
ঐ সভায় এই পূর্বশর্তগুলি প্রস্তাবাকারে পাস করা হয়। প্রস্তাবগুলির অন্তর্ভুক্ত ছিল: শেখ মুজিব, ওয়ালী খান, ভুট্টো, মণি সিং ও আব্দুল জব্বারের মুক্তি, আগরতলা মামলাসহ সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনবলে আটক ছাত্রসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তি, প্রাদেশিক গভর্নর মোনেম খানের পদত্যাগ, আন্দোলন চলাকালে যে সব সরকারি কর্মকর্তা বাড়াবাড়ির সাথে জড়িত তাদেরকে জরিমানা, আন্দোলনে যে সব ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবারের জন্য পেনশন,
পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলি সম্পর্কে বিচার বিভাগীয় তদন্তানুষ্ঠান, মোহাম্মদ তোয়াহা, জ্ঞান চক্রবর্তী, সুখেন্দু দস্তিদার, কাজী জাফর আহমদ, মোহাম্মদ ফরহাদের মতো রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ভুলিয়া প্রত্যাহার, সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংখ্যালঘু অধ্যাদেশসহ সকল কালাকানুন বাতিল, কৃষক, শ্রমিক ও বেতনধারীদের দাবি পূরণ ইত্যাদি । এমনিভাবে, অ্যাপস্যাকের ব্যাপক ব্যাপ্তি এবং মূলধারার রাজনীতিতে সর্বাত্মক ছাত্রসংগ্রামের বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার।
![আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 1 আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/আইয়ুববিরোধী-আন্দোলন-পর্ব-১.png)