আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ আমি হলাম কমান্ডার ইস্টার্ন কমান্ড। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
আমি হলাম কমান্ডার ইস্টার্ন কমান্ড

আমি হলাম কমান্ডার ইস্টার্ন কমান্ড
পশ্চিম পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালায়। তবে সামরিক অভিযান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সন্তোষজনক ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয় । জেনারেল ইয়াকুবের অসময়োচিত পদত্যাগ এবং লক্ষ্য অর্জনে টিক্কার অদক্ষতা ছিল একটি অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়।
পূর্ব পাকিস্তান গ্যারিসন থেকে টিক্কাকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমি তখন লাহোরে অবস্থিত ১০ম ডিভিশনের কমান্ড দিচ্ছিলাম। ১৯৭১ সালের ২রা এপ্রিল সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খান আমাকে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে ডেকে পাঠান।
যথারীতি পরদিন আমি জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে পৌঁছি এবং সোজা জেনারেল হামিদের অফিসে ঢুকে পড়ি। তিনি আমাকে জানান যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ইস্টার্ন গ্যারিসনের কমান্ডার টিক্কা খানের সামরিক অভিযান পরিচালনায় সন্তুষ্ট নন ।
তিনি আমাকে আরো জানান যে, কতিপয় জেনারেলের চেয়ে আমি জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও সংকটকালে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট আমাকে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ দায়িত্বটা তাই আপনাকে পালন করতে হবে।
‘আপনার আর কোনো প্রশ্ন?’ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি । আমি উত্তর দিলাম, ‘একজন সৈনিকের কর্তব্য হচ্ছে নির্দেশ পালন করা । প্রশ্ন করা অথবা আপত্তি পেশ করা নয়। প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং সেনা কমান্ডার সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করবেন।
‘ আমি আরো বললাম যে, ‘আমি প্রত্যাশা পূরণের আপ্রাণ চেষ্টা করবো । তারপর আমার ওপর এ গুরুদায়িত্ব অর্পণ করায় আমি বিশেষ ধন্যবাদ জানালাম তাকে। তিনি আমার সাফল্য কামনা করে বিনয় ও সম্মানের সাথে বিদায় জানান ।
সেনাবাহিনী প্রধানের সাথে মিটিংয়ের একদিন পর ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল ঢাকা পৌঁছালাম। এ পরিবর্তনের কথা শুনে টিক্কা খান একেবারে বোকা বনে যান। সক্রিয় অপারেশনকালে একজন কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ অথবা কমান্ডে রদবদল ঘটানো সংশ্লিষ্ট কমান্ডারের জন্য খুবই অসম্মানজনক হয়ে থাকে। টিক্কা কমান্ড হস্তান্তর স্থগিত রাখার জন্য সম্ভাব্য সব চেষ্টা করেন।
তিনি আমাকে তার অধঃস্তন কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ করারও অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী প্রধান এ অনুরোধ চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তাকে বললেন, ‘আপনাকে একটা সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ হারিয়েছেন আপনি।’ ঢাকা পৌঁছানোর এক সপ্তাহ পর ১০ এপ্রিল টিক্কা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার কাছে কমান্ড হস্তান্তর করেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান।
১১ই এপ্রিল পুরোপুরি পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়। জেনারেল টিক্কা খান গভর্নর হন। তিনি সামরিক আইন প্রশাসকও ছিলেন। তাই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক আইনের দায়িত্ব পালন উভয়ের জন্য দায়ী ছিলেন।
তার নির্দেশেই সকল গ্রেফতার, শাস্তি ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো। শফিকুর রহমান ছিলেন চিফ সেক্রেটারি, রাও ফরমান আলী গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা এবং ব্রিগেডিয়ার ফকির মোহাম্মদ ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মার্শাল ল’।
ব্রিগেডিয়ার জিলানি (পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও গভর্নর) আমার সিওএস (চিফ অব স্টাফ)। মেজর জেনারেল শওকত রেজা ছিলেন ৯ম ডিভিশনের নেতৃত্বে। মেজর জেনারেল খাদিম রাজার স্থলে মেজর জেনারেল রহিম ১৪তম ডিভিশনের জিওসি হন।
মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ ছিলেন ১৬তম ডিভিশনের জিওসি। ব্রিগেডিয়ার নিসারের স্থলে মেজর জেনারেল জামশেদকে সিএএফ (সিভিল আর্মড ফোর্সেস)-এর প্রধান পদে নিযুক্তি দেওয়া হয়। রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ নৌবাহিনী ও এয়ার কমোডর ইনাম বিমান বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন।
পিপিপি দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর আমলে টিক্কা খান সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এমন একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, আমি তার কমান্ডে কাজ করেছি। যা মোটেও সঠিক ছিল না। আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আমি ছিলাম সামরিক কমান্ডার এবং কেবল সামরিক অপারেশনের জন্য দায়ী। আমি সরাসরি সেনাবাহিনী প্রধানের অধীনে কাজ করেছি। পক্ষান্তরে, টিক্কা ছিলেন গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক এবং তিনি প্রেসিডেন্টের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা দুজনে স্বাধীনভাবে এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করেছি।
জেনারেল টিক্কাকে সাহায্য করার জন্য মেজর জেনারেল মিট্রাকে পাঠানো হয় । তিনি অতিরিক্ত সৈন্য চেয়ে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে একটি বার্তা পাঠান। বার্তাটি নিচে দেওয়া হলো :
*এই অপারেশন এখন রূপ নিয়েছে একটি গৃহযুদ্ধে। দূরে যাওয়া যাচ্ছে না.. রেলগাড়িও ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো ফেরি অথবা নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না। বস্তুত, সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে চলাচল একটি প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এ অবস্থা চলবে আরো কিছু দিন। সুতরাং সশস্ত্র বাহিনীকে সব ক্ষেত্রে নিজস্ব সামর্থ্যের ওপর চলতে হবে।
এ জন্য আমি নিম্নোক্ত ইউনিট গঠন এবং পাঠানোর জন্য প্রস্তাব করছি। আলফা-চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নেভির পোর্ট অপারেটিং ব্যাটালিয়ন, ব্র্যাভো- আর্মি বা নেভি অথবা ইঞ্জিনিয়ার রিভার ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়ন এবং রিভার মেরিন ব্যাটালিয়ন এবং আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিয়ারের রেল অপারেটিং ব্যাটালিয়ন। চার্লি-নেভির কার্গো এবং ট্যাংকার ফ্লোটিলা । রসদ ও সৈন্য চলাচলের জন্য আরো হেলিকপ্টার অপরিহার্য।’
মিঠা খান যেসব ইউনিট গঠন ও পাঠানোর জন্য প্রস্তাব করেছিলেন সেগুলোর একটিও গঠন অথবা পাঠানো হয় নি। শুধু তাই নয়, পূর্ব পাকিস্তানে লড়াইরত পুরনো ইউনিটগুলোর ঘাটতিও পূরণ করা হয় নি। অথবা পুরনো ইউনিটের জায়গায় নতুন ইউনিটও পাঠানো হয় নি। হাই কমান্ড শুধু আশ্বাসই দিচ্ছিল । কিন্তু তারা তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন নি এতোটুকু।
আমি যখন ইস্টার্ন কমান্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন মিঠা খানকে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। টিক্কা সামরিক কমান্ডারের বাসভবন ছাড়ছিলেন না। লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান প্রায়ই সে সময় ঢাকা অবস্থান করতেন। তিনি টিক্কাকে ফ্লাগ স্টাফ হাউস ছেড়ে দিয়ে গভর্নর হাউসে উঠতে রাজি করান।
দায়িত্ব গ্রহণ করে একটি পদ ছাড়া আমি আর কোথাও কোনো রদবদল ঘটাই নি। আমি রদবদল ঘটালাম আমার চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার এল ইদ্রসকে। যতো দূর মনে পড়ে, তিনি ছিলেন হায়দারাবাদ স্টেট ফোর্সের শেষ কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল ইন্দ্রসের ছেলে।
ব্রিগেডিয়ার এল ইদ্রস স্মার্ট ও মার্জিত হলেও তাকে কেন যেন বিমর্ষ মনে হচ্ছিল। তাকে আমার কাছে অনেকটা ক্লান্ত ও অসুস্থ মনে হলো। এ জন্য আমি তার স্থলে ব্রিগেডিয়ার গোলাম জিলানি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব), পাঞ্জাবের ভূতপূর্ব গভর্নরকে নিয়োগ দান করি। তিনি ঢাকায় সামরিক আইন সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আকবর (ডাইরেক্টর জেনারেল, ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) আমাকে বললেন যে, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় অবসর গ্রহণের জন্য জিলানিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। জিলানি আমার অধীনে দুই বার কাজ করেছে।
একবার আমি যখন মালিরে ৫১তম ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলাম তখন সিন্ধুতে একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে এবং আবার আমি যখন লাহোরে ১০তম ডিভিশনের জিওসি তখন একজন ব্রিগেডিয়ার হিসেবে। তাকে আমি অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী এবং যোগ্য বলে জানতাম। তাই আমি তাকে সেনাবাহিনীতে রেখে দিতে চেয়েছিলাম। আমি তাকে ব্রিগেডিয়ার এল ইদ্রুসের জায়গায় চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত করি।
জেনারেল টিক্কা ব্রিগেডিয়ার রহিম দুররানী, ব্রিগেডিয়ার জুলফিকার এবং ব্রিগেডিয়ার খুশি মোহাম্মদ খালিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফকাত বালুচকে অদক্ষতা ও শত্রুর বিরুদ্ধে সাহস প্রদর্শনে ব্যর্থতার জন্য সৈন্যদের কমান্ড থেকে অপসারণ করেছিলেন।
আমার নেতৃত্বকালে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রহিমের সুপারিশে লুটতরাজ এবং চুরির অভিযোগে ব্রিগেডিয়ার আরবাবকে কমান্ড থেকে অপসারণ করা হয়। তদন্ত আদালতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সামরিক আদালতে বিচার করার জন্য তাকে তখন পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।
জিলানি কঠোর পরিশ্রম করেন এবং আমার অধীনে তার দায়িত্ব পালনকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সম্পন্ন করেন। তিনি বেশ কিছুদিন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করেন এবং পরে মহাপরিচালক হিসেবে আইএসআই অধিদপ্তরে বদলি হন । ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী তার স্থলাভিষিক্ত হন। তাকে আমি আগে চিনতাম না। তবে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আমার সাথে ছিলেন। তাকে আমার ভালো লেগেছিল।
পূর্ব পাকিস্তানের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও আবহাওয়া আমার কাছে নতুন ছিল না। আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাঁচি এবং টেকনাফে (বর্তমানে পূর্ব পাকিস্তান) জঙ্গল যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং বার্মা (মায়ানমার), সিঙ্গাপুর, মালয় (বর্তমানে মালয়েশিয়া) এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিস (বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া), ও বার্মায় যুদ্ধ করেছি। এসব দেশের ভূ-প্রকৃতি ও আবহাওয়া কম-বেশি অনেকটা পূর্ব
পাকিস্তানের মতো। ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর আমি ঢাকায় ১/১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্টও কমান্ড করেছি। আমার নামানুসারে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় টাইগার রোড’। সুতরাং হস্তান কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে আমি পূর্ব পাকিস্তানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম এবং আমি আমার দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সতর্ক ছিলাম।
আমার দায়িত্ব গ্রহণকালে আমি দেখতে পেলাম যে, প্রাদেশিক সরকার অকার্যকর। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ছিল জনগণ ও বাঙালি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন। বাঙালিরা ঘূর্ণিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের কোনোরূপ সহায়তা না করতে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
আমরা আমাদের নিজেদের দেশে অবাঞ্ছিত বিদেশি হয়ে পড়লাম। হাট-বাজার ছিল। কম-বেশি বন্ধ এবং জীবনব্যবস্থা প্রায় অচল। উর্দুভাষীদের ঢাকা বিমান বন্দরে থামিয়ে মারধর করা হতো। সৈন্যদের জন্য কোনো নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল না। সারা প্রদেশেই চলছিল বিদ্রোহ। সকল মানুষই ছিল প্রতিবাদী।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট এবং ক্যাম্পের আশপাশে যুদ্ধ করছিল এবং ক্যান্টনমেন্ট ও ক্যাম্পগুলো তাদের দুর্গে পরিণত হয়। ঢাকা ও অন্যান্য এলাকায় বিমান ছাড়া যোগাযোগের আর কোনো উপায় ছিল না।
যোগাযোগের সব সুযোগগুলো বিচ্ছিন্ন অথবা অকেজো করে দেওয়া হয়। বাদবাকি দেশ ছিল। মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। আর বিস্ময়কর ব্যাপার হলো তাদের মনোবল ছিল। আকাশচুম্বী। অধিকাংশ ফেরি ও ফেরি এলাকাগুলোতে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সীমানার চিহ্ন ছিল না। কোনো।
ভারত থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দুষ্কৃতিকারীতে ছেয়ে যায়। গোয়েন্দা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সর্বশেষ তথ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। আমাদের বিপক্ষে চলে যায় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।
তারা অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিক সংবাদ প্রচার করতে থাকে। সরকার এসব অপ্রপ্রচার বন্ধের কোনো চেষ্টা করে নি। একসাথে বহুসংখ্যক সৈন্য ছাড়া বাইরে বেরুনো যেত না। দুই একজন করে অথবা ক্ষুদ্র দলে বের হলেই আক্রান্ত হতে হতো।
যুদ্ধ ক্ষেত্রে সর্বত্র মৃত্যুর ফাঁদ। এ জন্য প্রতিটি সৈনিক ধর্মভীরু এবং সৎ হয়ে ওঠে। সৈন্যদেরকে প্লাটুন (৩৬ জন সৈন্য) ও কোম্পানিতে (১২০ জন সৈন্য) তাদের নিজ নিজ অফিসারের আওতায় অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেনাবাহিনী যে ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত হয় সে ধরনের কর্মকাণ্ডে কেউ লিপ্ত হওয়ার সাহস দেখাতে পারতো না।
কেউ একা একা বের হওয়ার দুঃসাহস দেখালে সে জীবিত ফিরে আসতে পারতো না। এক কথায় সামরিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা ছিল চরমে এবং সর্বত্র বিরাজ করছিল বিভ্রান্তি। সে সময়টা আমাদের জন্য ছিল ভয়ঙ্কর। আমাদের আগে অনেক দুঃসাধ্য সমস্যা ছিল। কোনো কিছুই মসৃণ ছিল না ।
বুঝতে পারলাম যে, দুটি জিনিস করতে হবে- এক. হারানো এলাকা পুনর্দখলে একটি ব্যাপক এবং শক্তিশালী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান বিজয়ের একটি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দুই. এটা কোনোভাবেই সুশৃঙ্খল অভিযান হবে না। এ অভিযান হবে টিকে থাকার জন্য এক নির্মম লড়াই ।
আমার অধীনে তিনটি অপূর্ণাঙ্গ এবং অর্ধসজ্জিত ডিভিশন ছিল। দুটি ডিভিশনকে বিমান যোগে ঢাকা পাঠানো হয়। এ জন্য তারা তাদের ট্যাংক, কামান, প্রকৌশল সামগ্রী, সাজ-সরঞ্জাম, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষা সামগ্রী যেমন— মাইন, কাঁটাতার প্রভৃতি সাথে নিয়ে আসতে পারে নি। আমার কমান্ডে মোট ৪৫ হাজার সৈন্য ছিল। এদের মধ্যে ৩৪ হাজার ছিল সেনাবাহিনীর এবং অবশিষ্ট ১১ হাজার ছিল সেনাবাহিনীর বাইরের লোক।
এদের মধ্যে ছিল সিএএফ, পশ্চিম পাকিস্তান পুলিশ এবং সশস্ত্র বেসামরিক লোকজন। ৩৪ হাজার নিয়মিত সৈন্যের মধ্যে ১১ হাজার ছিল সাঁজোয়া, গোলন্দাজ, প্রকৌশল, সিগনাল ও সহায়তাদানকারী ইউনিটের সদস্য।
মাত্র ২৩ হাজার পদাতিক সৈন্যকে এফডিএল (ফরোয়ার্ড ডিফেন্ডেড লোকালিটিজ) এর ট্রেঞ্চ ও রণাঙ্গনে পাঠানো সম্ভব ছিল। সর্বোচ্চ ৪০ হাজার লোককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতো পারতাম আমি। আবার এদের অনেকেরই না ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্র, না ছিল নিয়মিত যুদ্ধের প্রশিক্ষণ।
আমি ভারতীয়দের চোখে ধুলো দিই যে, আমার তিনটি অসম্পূর্ণ ডিভিশন নয়; বরং ৪টি পূর্ণাঙ্গ ডিভিশন রয়েছে। আমাদের শক্তি সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকায় ভারতীয়রা আমাদের সৈন্য সংখ্যা ১ লাখ বলে অনুমান করতো এবং তারা তাদের পৃষ্ঠপোষকদের সেভাবে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতো ।
আজকের দিনে বিমান বাহিনীর সহায়তা ছাড়া কোনো সেনাবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের ছিল মাত্র ১ স্কোয়াড্রন পুরনো জঙ্গীবিমান। বিমান ঘাঁটি ছিল মাত্র একটি। উল্লেখ করার মতো কোনো রাডার ব্যবস্থাও ছিল না। ৫০০ মাইল সমুদ্র উপকূল এবং তিনটি বড়ো নদী রক্ষায় আমার হাতে ছিল মাত্র
৪টি নেভাল গানবোট। আমার ডিভিশনগুলো অপারেশনাল এলাকা অথবা ভারতের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধ করার জন্য যথাযথভাবে এতটুকু সুসজ্জিত ছিল না। ট্যাংক, কামান, ট্যাংক-বিধ্বংসী গান ও বিমান-বিধ্বংসী কামানের ঘাটতি ছিল মারাত্মক।
আমাকে চার জন আর্টিলারি ব্রিগেডিয়ারের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছিল মাত্র একজন। ব্যাটালিয়নে কোনো আর্টিলারি উপদেষ্টা ছিল না। সুতরাং মাত্র একজন আর্টিলারি ব্রিগেডিয়ারকে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে আর্টিলারি সহায়তা নিয়ন্ত্রণ ও সংগঠন করতে হতো।
শত্রুর ১৩০ মিলিমিটার কামানের পাল্লা ছিল যেখানে ৩০ হাজার গরু সেখানে আমাদের কামানের পাল্লা ছিল মাত্র ১১ হাজার। সহায়ক অস্ত্রশস্ত্রের ঘাটতি ছাড়াও আমার আরেকটি সমস্যা ছিল। আমাদের ক্ষুদ্র অস্ত্রগুলো ছিল।
জার্মান, ব্রিটিশ আমেরিকান এবং চীনা। এগুলো ছিল আবার বিভিন্ন ক্যালিভারের। এ জন্য গোলাবারুদের সরবরাহ এবং এক সেক্টর থেকে আরেক সেক্টরে ইউনিটের বদলির সময় সমস্যা হতো খুব। এসব বিষয় খুব সামান্য ও তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলোর সমন্বয় সাধন খুবই জরুরি, নয়তো যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রতিকূলতায় পড়তে হয়।
এখানে আমার জন্য বরাদ্দ করা হয় তিনটি মাঝারি ট্যাংক রেজিমেন্ট এবং আরেকটি হালকা ট্যাংক রেজিমেন্ট। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি পেয়েছিলাম মাত্র একটি ট্যাংক রেজিমেন্ট এবং এম-২৪ লাইট চ্যাফে ট্যাংকসহ এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক। এগুলো ছিল কোরীয় যুদ্ধে ব্যবহৃত ট্যাংক। ১৯৪৪ সালে এই ট্যাংক যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামানো হয়।
এতে ৭৫ মিলিমিটার ব্যাসের একটি কামান বসানো থাকে। এসব ট্যাংক ভারতের আধুনিক ট্যাংকের বিরুদ্ধে অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ট্যাংকে ফ্যান বেল্টের বদলে ছিল দড়ি এবং আরো কিছু ট্যাংক ছিল যেগুলোকে অন্যান্য ট্যাংক দিয়ে টেনে টেনে স্টার্ট করাতে হতো।
আমার জন্য ৪টি মাঝারি এবং একটি ভারী গোলন্দাজ রেজিমেন্ট বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু আমার একটিও ভারী অথবা মাঝারি কামান ছিল না। আমার জন্য যতগুলো ফিল্ড গানের অনুমোদন দেওয়া হয় তার মধ্যে পেয়েছিলাম বড়ো জোর অর্ধেক।
আরেকটি বিষয় হলো সৈন্যদের স্বাস্থ্য রক্ষা করা ছিল আরেকটি বড়ো সমস্যা। জলবায়ু ছিল আর্দ্র। এ ধরনের জলবায়ুতে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকজনের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র জলবায়ুর কারণে সৈনাদের পায়ে ঘা এবং ছত্রাক দেখা দেয়। হাসপাতাল ছিল খুবই কম।
এ ছাড়া, ওষুধ ও ডাক্তার বিশেষ করে বিশেষজ্ঞের অভাব ছিল প্রকট। সামরিক সরঞ্জাম ও চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে মেডিকেল ইউনিটগুলো কাজের উপযোগী ছিল না। সন্তোষজনক ব্যবস্থা ছিল না হতাহতদের সরিয়ে আনার। সব মিলিয়ে যেন একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
ফলে অনেকেই পথে মারা যেত নয়তো পঙ্গু হয়ে যেত যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে। আহত সৈন্যদের ড্রেসিং করার অথবা তাদের মরফিন ইনজেকশন দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আমার সৈন্যরা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শুরু অঞ্চলের লোক।
তাদের অনেকেই জীবনে বড়ো নদী দেখে নি। কোমর পানির চেয়ে বেশি পানিতে কীভাবে সাঁতার দিয়ে পাড়ি দিতে হয় তাও তারা জানতো না। পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি পাঁচ থেকে ছয় মাইলের মধ্যে অন্তত একটি নদী অথবা খাল। বড়ো বড়ো নদীগুলো আমাদের কাছে সমুদ্র বলে মনে হতো। অপারেশনকালে সাঁতার, দাঁড় টানা ও ডুব দেওয়া শেখানো হতো। এ কারণে বর্ষাকালে প্রদেশব্যাপী সৈন্য চলাচল ব্যাহত হয়। যুদ্ধের বছর পূর্ব পাকিস্তানে বড়ো বন্যা দেখা দেয় ।
যুদ্ধ-বহির্ভূত কিছু উপদ্রব ছিল যেগুলো যুদ্ধ সংক্রান্ত ভীতির চেয়েও ছিল বিপজ্জনক। এগুলোর মধ্যে ছিল মশা এবং ম্যালেরিয়া, মাছি, ছারপোকা, জোঁক এবং আরো অনেক প্রাণী। এদের মাধ্যমে নানা রোগ ছড়াতো। বর্ষাকাল কয়েক মাস স্থায়ী হয় । তখন গ্রামাঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। গাড়ির বদলে নৌকা। এসব ঘটনা সৈন্যদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
এমন একটি প্রতিকূল পরিবেশে আমাকে প্রদেশে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশ সরকার গঠনে বাঙালিদের প্রচেষ্টা নস্যাৎ এবং ভারতীয় আগ্রাসন হলে সে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আমাকে প্রদেশে এক ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য ভাঙা মাস্তুল সম্বলিত একটি প্রাচীনকালের জাহাজ দেওয়া হয়েছিল। আমার গন্তব্য নির্ধারণে কোনো বাতিঘর ছিল না। আমার মিশন ও দায়িত্বের কোনো লিখিত দিক-নির্দেশনাও আমাকে দেওয়া হয় নি তখন।
ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী তারই বই ‘সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ : বিফোর অ্যান্ড আফটার’-তে লিখেছেন, ‘জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার উপদেষ্টারা পুরো বিষয়টিকে এতো হালকাভাবে দেখেছেন যে, তারা লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজিকে কোনো সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দানের প্রয়োজনবোধ করেন নি।
আমি নিশ্চিত যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। কারণ ইয়াহিয়া খান বুঝতে পেরেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের পতন বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। তাই তিনি এ ঘটনার দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে না নিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমাদের ঘাটতি, সমস্যা ও বাধা-বিপত্তি যেমন ছিল তেমনি কিছু সুবিধাও ছিল।
সৈন্য পরিচালনায় আমার ছিল ব্যাপক অভিজ্ঞতা। আমার অধীনস্থ সৈন্যরা ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সৈন্য। আমরা ছিলাম নিয়মিত বাহিনীর সৈন্য। ও ছাড়া আমাদের সামরিক ঐতিহ্য এবং পটভূমি ছিল। আমার অধীনস্থ অধিকাংশ ইউনিট পাকিস্তানের প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
আবার কিছু কিছু ইউনিট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও লড়াই করেছে। আমার সিনিয়র অফিসারগণ বিশেষ করে জেনারেলগণ পাকিস্তানের প্রতিটি যুদ্ধে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। শান্তি ও যুদ্ধকালে তাদের সৈন্য পরিচালনায় ছিল বিস্তর অভিজ্ঞতা। আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে ওপরের দিকে প্রতিটি অফিসার এবং অনেক জুনিয়র কমিশন্ড ও নন-কমিশন্ড সিনিয়র অফিসারদের চিনতাম।
ব্রিটিশরা আমাদের প্রতিপক্ষ বাঙালিদের কখনো একটি যোদ্ধা জাতি হিসেবে বিবেচনা করে নি। তাদের কোনো সামরিক ঐতিহ্য, পটভূমি অথবা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। তাদেরকে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিশেষ করে লড়াকু ইউনিটে তালিকাভুক্ত করা হতো না। তারা কোনো সুসংবদ্ধ টিম ছিল না, তারা ছিল বিভিন্ন ইউনিট, গ্রুপ বা ব্যক্তিবর্গের সমষ্টি মাত্র।
তাদের কমান্ডার কর্নেল এমএজি ওসমানী সে ধরনের লোক ছিলেন না, যিনি তার অধঃস্তনদের মাঝে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারেন। তিনি ছিলেন মূলত রয়াল ইন্ডিয়ান আর্মি সার্ভিস কোরের লোক এবং ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর তিনি পদাতিক বাহিনীতে বদলি হন। অফিসের কাজ-কর্মে তার অভিজ্ঞতা ছিল, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনায় তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
সার্ভিসে তিনি ছিলেন আমার সিনিয়র। রাওয়ালপিন্ডিতে যখনি তিনি আমাকে টেলিফোন করতেন তখনি বলতেন, টাইগার, সিনিয়র টাইগার বলছি। কারণ, তিনি ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিনিয়র অফিসার যার ব্যাজ ছিল ‘টাইগার’। আমার সুশৃঙ্খল ও অভিজ্ঞ সৈন্যদের বিরুদ্ধে কর্নেল ওসমানী ও বাঙালিদের লড়াই করে টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিল খুবই সামান্য।
আমি আশাবাদী ছিলাম যে, বাঙালিরা সংখ্যায় বেশি এবং ভারতও তাদেরকে দৈহিক, অস্ত্রগত ও আর্থিক সহায়তা এবং রাশিয়া তাদেরকে পরামর্শ এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া সত্ত্বেও আমরা সফল হবো। ভারতীয়রা তখনো ইউনিট অথবা ফরমেশনের আকারে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না।
বিশেষ ক্ষেত্রে ভারতীয় অফিসার ও অন্যান্য পর্যায়ের লোকজনের উপস্থিতি ছিল। যেমন- সেতু ও রাস্তাঘাট ধ্বংস ইত্যাদি এবং বাঙালিদের শক্তি ও নৈতিক মনোবল বৃদ্ধিসহ কয়েকটি। ভারত সরকার জয়লাভের ব্যাপারে ১০০ ভাগ নিশ্চিত না হয়ে অথবা যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া বিশৃঙ্খলভাবে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ অথবা প্রকাশ্য যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে না।
পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছানোর পর আমি এলাকা এবং বিরাজিত পরিস্থিতির সাথে পরিচিত হতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কমান্ড গ্রহণকালে আমি যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে জ্ঞাত ছিলাম। তাই ডিভিশনের কমান্ডারদের কাছে নতুন করে নির্দেশ পাঠাতে আমাকে বেগ পেতে হয় নি।
প্রতিটি লড়াইয়ের আগে, লড়াই চলাকালে এবং লড়াই শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি অগ্রবর্তী এলাকা পরিদর্শন অব্যাহত রাখি। সারাক্ষণ আমাকে টেলিফোন অথবা ওয়ারলেসে ব্যস্ত থাকতে হতো। টেলিফোনের কাজে নিয়োজিত ছিল বাঙালিরা। তাই তা বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। ওয়ারলেস একটি ভালো সংযোগ কিন্তু এটা ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিকল্প নয়।
আমার পরিদর্শন টনিকের মতো কাজ করতো এবং সকল স্তরের সৈন্যরা সুসজ্জিত হয়ে অভিনন্দন জানাতো। আমি শুধু ইউনিট অথবা ফরমেশনের সদর দপ্তরই নয়, সৈন্যদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অগ্রবর্তী এলাকাও পরিদর্শন করেছি। এসব স্থানে আমি বার বার গিয়েছি।

ইস্টার্ন কমান্ডে সকল যুদ্ধের পরিকল্পনা আমি করতাম। এ ব্যাপারে আমি ডিভিশন ও অন্যান্য ইউনিটের কমান্ডারদের সাথে পরামর্শ করতাম। তবে সার্বিক কৌশলগত পরিকল্পনা ও টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত ছিল আমার। এ নিয়ে সব সময় আমি ভাবতাম। কীভাবে সঠিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা যায়, কীভাবে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায়, এটাই ছিল আমার ধ্যান ।
