আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় উনিশ শতক : বাংলায় সংস্কার আন্দোলন ও নারীর নবজীবনের যাত্রা শুরু |
উনিশ শতক : বাংলায় সংস্কার আন্দোলন ও নারীর নবজীবনের যাত্রা শুরু

উনিশ শতক বাংলার ইতিহাসে বিশেষায়িত হয়ে আছে নবজাগরণের যুগ হিসেবে। তবে ঐতিহাসিকদের একাংশ একে নবজাগরণের পরিবর্তে নবজিজ্ঞাসার যুগ বলবার সপক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন। যেমন স্বপন বসু এ প্রসঙ্গে বলেন উনিশ শতকের বাংলায় এক নতুন যুগের এবং সেইসূত্রে আধুনিকতার সূত্রপাত একথা মোটামুটিভাবে স্বীকৃত। এই নতুন যুগকে আমরা বিশেষভাবে বলতে চাই নবজিজ্ঞাসার যুগ।
উনিশ শতকে ভারতীয় ঐতিহ্য ও ইউরোপীয় সভ্যতা- প্রায় পরস্পর বিরোধী এই দুই ধারার সম্মুখীন এদেশের মুষ্টিমেয় ‘সচেতন’ জনমনে এই জিজ্ঞাসার সূত্রপাত। এ জিজ্ঞাসা সচেতন বাঙালির আত্মজিজ্ঞাসা এবং তা প্রসারিত হয়েছে প্রচলিত ধর্ম, সমাজ রীতিনীতি ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে। ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে নারী প্রশ্নটি।
যে কারণে উনিশ শতক নারীযুগ হিসেবেও অভিহিত হয়েছে। ঐতিহাসিক রাধা কুমার তার History of Doing গ্রন্থে বলেন, “The nineteenth century could well be called an age of women, for all over the world their rights and wrongs, their ‘nature’, capacities and potential were the subjects of heated discussion.” ভারতবর্ষের জন্য ভিনদেশী শাসকবর্গের অধীন হওয়া নতুন অভিজ্ঞতা বলা যাবে না, বৃটিশ অধিকারের পূর্বে শক, হুন থেকে শুরু করে পাঠান,
মোগল, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ প্রভৃতি জাতি এই উপমহাদেশের ওপর প্রভূত্ব করেছে বহু যুগ ধরে। কিন্তু বৃটিশ শাসকদের সঙ্গে অন্যান্য শাসকবর্গের শাসনের গুণগত পার্থক্য ছিল।
ইংরেজদের আগমনের পূর্বে এ অঞ্চলে বারবার শাসকশ্রেণির পরিবর্তন ঘটেছে একথা যেমন সত্য তেমন একথাও সর্বজনস্বীকৃত যে, শাসকশ্রেণির এই পরিবর্তনে সমাজব্যবস্থার কোনরূপ হেরফের ঘটে নি। বরং দেখা যায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তার নির্ধারিত পথেই আবর্তিত হয়েছে।
ভারতবর্ষে বৃটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবার পর এর সমাজ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে আমূল পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কার্ল মার্কস এই পরিবর্তন সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করে বলেন যে যত গৃহযুদ্ধ, আক্রমণ, বিপ্লব, জয়, মন্বন্তর- হিন্দুস্থানের উপর যাদের লীলা-ক্রম অদ্ভূত জটিল, ক্ষিপ্র এবং ধ্বংসাত্মক মনে হয় – তার কোনটাই বহিরাবরণ ভেদ করে গভীরে বেশি দূর প্রবেশ কওে নি।
কিন্তু ইংলন্ড ভারতীয় সমাজের সেই গোটা কাঠামোটাকেই ভেঙ্গে দিয়েছে, পুনর্সংগঠনের কোন লক্ষণই এখনো প্রকাশ পাচ্ছে না। নতুন জগৎ না লাভ করেই পুরোনো জগৎ খোয়ানো হিন্দুর আজকের এই দুর্দশাকে এক বিশিষ্ট বেদনা লান করেছে এবং বৃটিশ-শাসিত হিন্দুস্থানকে তার সকল প্রাচীন ঐতিহ্য ও সমগ্র অতীত ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
বৃটিশ শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর ফলে বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত হয় শিল্প নির্ভর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থা। নতুন সমাজকাঠামোর ভিত্তিতে গড়ে ওঠে নুতন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, বিকাশ ঘটে বণিক, মুৎসুদ্দী, দালাল, জমিব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র আকারের শিল্পবিনিয়োগকারী পুঁজিপতি শ্রেণির মত এদেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণির।
পাশাপাশি এই সময়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্ভব বাংলার সামাজিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এই শ্রেণির মধ্যে একইসঙ্গে পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ ঘটায় তারা আত্মসমীক্ষার পথে পা বাড়ান। উনিশ শতকে বাংলার নব জিজ্ঞাসার ধারক ও বাহক বলা যায় এই শিক্ষিত- মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকেই। ঐতিহাসিক স্বপন বসু এই নবজিজ্ঞাসার সূচনাপর্বে তিনটি পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছেন।
প্রথমত, এই সময়ে বাঙালি জীবন পুরোপুরি দৈবনির্ভরতা কাটিয়ে কিছুটা মানবমুখী হয়ে ওঠে এবং মানুষ কিছুটা নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পায়।
দ্বিতীয়ত, অদৃষ্টবাদী বাঙালির জীবনে যুক্তিবাদ স্বল্পমাত্রায় হলেও প্রবেশাধিকার পায়, ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হয়ে ওঠে ইহমুখী, আর একই সঙ্গে অদৃষ্টের উপর নির্ভর না করে সে তার নিজের ভাগ্য নির্মাণে ব্রতী হয়।
তৃতীয়ত, এই সময়ে সমাজে কিছুটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য স্বীকৃত হয়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নারীমুক্তি আন্দোলনের। এর ফলেই নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে না দেখে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে মযার্দা দেবার চর্চা শুরু হয়। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, উনিশ শতকের এই নবজিজ্ঞাসা ছিল শহরকেন্দ্রিক কিংবা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে কলকাতাকেন্দ্রিক। বৃহত্তর বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই এই চেতনার বাইরে অবস্থান করছিল।
প্রাচীন যুগে দেখা যায় ভারতবর্ষে নারীরা পারিবারিক জীবনে, ধর্মীয় ক্ষেত্রে ও জনজীবনে সীমিত আকারে স্বাধীনতা ভোগ করত। সময়ের সাথে সাথে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং ক্রমে নারীদেরকে স্বাধীনতা ভোগ করবার অনুপযুক্ত মনে কারা হয়। বৈদিক যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ-খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ) নারীর সামাজিক অবস্থান অনেকটাই উন্নত ছিল।
এই যুগে বিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হতো এবং পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর সমান অধিকার স্বীকৃত ছিল, স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো না। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। ঋগ্বেদ অনুসারে দেখা যায় স্ত্রী-কে জুয়া খেলায় বাজী রাখা হতো এবং হেরে গেলে স্ত্রীকে জয়ী ব্যক্তির হাতে সমর্পন করা হতো, তবে ঋগ্বেদে এ প্রসঙ্গে সতর্ক করে যে শ্লোক আছে তা থেকে বলা যায়, এই প্রথা সমাজস্বীকৃত ছিল না, বরং এর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাও গড়ে উঠেছিল।
তবে বৈদিক যুগে সার্বিকভাবে নারীর অবস্থা সন্তোষজনক ছিল। এযুগে নারীশিক্ষার ব্যপারে সুস্পষ্ট সমর্থন ছিল। নারীর বেদ অধ্যয়নের অধিকার ছিল, তারা উপনয়নের অধিকারী ছিলেন।
এ সময়ে সমাজে নারীর উচ্চশিক্ষার প্রমাণ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে। ঋগ্বেদে কুড়িজন নারীর রচিত সুক্ত পাওয়া যায় যাদের ঋষি বলা হয়েছে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পাদনে নারীর অধিকার ধর্মীয় অনুশাসনে স্বীকৃত ছিল। ধনী এবং রাজপরিবারে বহুবিবাহের প্রচলন স্বল্প মাত্রায় থাকলেও, সাধারণত এক বিবাহই সমাজে প্রচলিত ছিল।
এসময়ে সতীদাহ প্রথার প্রচলন দেখা যায় না। বিধবা নারী চাইলে পুনরায় বিয়ে করতে পারত। পছন্দ অনুসারে স্বামী বেছে নেবার অনুমতিও ঋগবেদে দেখা যায়। তবে ঋগ্বেদেই এর বিপরীত অনুশাসনও দেখা যায়, যখন এতে বলা হয় ‘ভুক্তোচ্ছিষ্টং বধ্বৈ দদ্যাৎ’ অর্থাৎ ‘পুরুষ খেয়ে এঁটোটা স্ত্রীকে দেবে’। ১০ ঋগবেদে নারীকে ছায়ার মতো স্বামীর অনুগামিনী হতেও বলা হয়েছে।” নারী সম্পত্তির অধিকার এযুগে স্বীকৃত ছিল না।
১২ তবে সামগ্রিকভাবে বলা চলে যে, বৈদিক যুগে এবং পরবর্তী সময়ে সংহিতা ও উপনিষদের যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ খৃষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ) নারীর অবস্থান সন্তোষজনক ছিল, নারী কিছু পরিমাণ স্বাধীনতা – ভোগ করতো।
কালক্রমে (খৃষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ-১৮০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে) নারীর এই অবস্থান পরিবর্তিত হতে থাকে। উপনয়নের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করা হয়। ঐতিহাসিকরা নারীর অবদমনের সময়কাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আর্য-অনার্য সংমিশ্রণের যুগকে। এর কারণ হিসেবে তারা প্রথমত যে বিষয়টিকে দেখিয়েছেন তা হচ্ছে, আর্য সম্ভ্রান্ত পুরুষ কর্তৃক অনার্য নারী বিবাহ। ১৩ এই আর্য-অনার্য বিবাহই নারীর সামাজিক অবস্থান ধীরে ধীরে নিম্নমুখী করে তোলে।
আর্য সমাজে অন্তর্ভুক্ত অনার্য নারীর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার ছিল না অথবা তাদেরকে এর যোগ্য মনে করা হতো না। পর্যায়ক্রমে আর্য সমাজভুক্ত সকল নারীই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অযোগ্য বলে বিবেচিত হতে থাকে। মেয়েদের বিয়ের বয়স যা পূর্বে ১৬-১৭ ছিল তা ১০-১২ তে নেমে আসে, পরবর্তী সময়ে ৮ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে দেয়াকে পূণ্যের কাজ বলে বিবেচিত হতে থাকে। কম বয়সে বিয়ে হবার কারণে মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।
এই সময়কালের মধ্যে বিধবা নারীর পুনঃবিবাহের অধিকার হরণ করা হয়, সমাজে পুরুষের বহুবিবাহপ্রথার প্রচলন বেড়ে যায়। সতীদাহ প্রথার মত পৈশাচিক প্রথার উদ্ভবও এসময়ে ঘটে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যখন ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করে তখন ভারতে নারীসমাজ সকল অধিকার বঞ্চিত হয়ে এক মানবেতর জীবনযাপন করছিল। সামগ্রিকভাবে এ সময়ের সমাজে নারীর চিত্র অঙ্কন করতে গেলে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে:
- নারীর শিক্ষার কোন অধিকার ছিল না;
- গৃহের বাইরে জনপরিমণ্ডলে নারীর অংশগ্রহণের কোন অধিকার ছিল না;
- কঠোর পর্দাপ্রথা নারীর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল;
- ৮-১০ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল;
- অনেকক্ষেত্রে বাল্যকালেই মেয়েদের বৈধব্যের শিকার হতে হতো;
- বিধবাদের পুনঃবিবাহ নিষিদ্ধ ছিল, ফলে বিধবা মেয়েরা পিতা বা ভাইয়ের বাড়ীতে আশ্রিত হিসেবে থাকত বা বলা যায় কার্যত তাদের দাসীর জীবনযাপন করতে হতো;
- বিধবাদের জন্য বৈধব্যের কঠোর নিয়ম-কানুন মেনে চলা বাধ্যতামূলক ছিল;
- সতীদাহ প্রথার ব্যপক প্রচলন ছিল; এবং
- কুলীন প্রথার শিকার নারীরা বিবাহিত হয়েও পিতৃগৃহে বসবাস করতো।
নারীকে শুধু সন্তান উৎপাদন ও স্বামীর সেবা করার যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এবং শত শত বছর ধরে এই অবস্থার মধ্যে থাকার ফলে সমাজে এটাই স্বাভাবিক রীতি হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছিল, নারীরাও একে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিল।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করবার পর বাংলা তথা কলকাতা তাদের প্রশাসনিক কাজের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় এবং এর ফলে বাংলার দীর্ঘদিনের অচলায়তনে প্রথম আঘাতটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী করে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী উপলব্ধি করে যে, ভারতবর্ষের প্রশাসনকাজ পরিচালনা করা এককভাবে গুটিকয়েক ইংরেজ কর্মচারীর পক্ষে সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটতে থাকলে শাসকগোষ্ঠী শাসিতের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন ও জনসমর্থনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করে।
এই উপলব্ধি থেকে ইংরেজ শাসকেরা এদেশের জনগণের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং এদেশীয়দের শিক্ষার বিস্তারে ১৮১৩ সালে বাৎসরিক এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। ” বাঙালিদের একাংশও নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত পুরুষ প্রবেশ করে একটি নতুন জগৎ ও নতুন পরিমণ্ডলে।
এই নতুন পরিমণ্ডল পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক, যুক্তিবাদী ধ্যানধারণার আলোকে আলোকিত। এই আলোকিত পুরুষদের একাংশের মনে প্রথম প্রশ্ন ওঠে তৎকালীন ভারতীয় তথা বাংলার সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান নিয়ে। তারা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে শুরু করে সমাজকে।
যে বিষয়টি নব্যচিন্তাবিদদের সর্বাধিক দৃষ্টিআকর্ষণ করে তা হলো বাঙালি সমাজে নারীর অবস্থান। শিক্ষিত পুরুষের নিকট অশিক্ষা আর কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে থাকা, চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ নারী বিসদৃশ মনে হলো। এর একটি প্রধান কারণ ইংরেজরা এদেশে এসে অন্তঃপুরের ধারণাটাই পাল্টে দেয়।
বৃটিশরা তাদের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবার জন্য এবং ভারতীয়দের উপর তাদের শাসনের বৈধতা প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে নারীর অধস্তন অবস্থার চিত্রটি সামনে নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে মিশনারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তারা সতীদাহ, কন্যাসন্তান হত্যা, পর্দাপ্রথা, বহুবিবাহ প্রথা, নারীদের মধ্যে শিক্ষার অভাব ইত্যাদী চিত্র তুলে ধরে প্রমান করবার চেষ্টা করেন যে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারতীয় সমাজকে খ্রিস্টধর্মের জ্ঞানের আলোয় এনে রক্ষা করা সম্ভব।
মিশনারী সমাজের মধ্যে অন্যতম চার্লস্ গ্রান্ট ১৭৯২-তে Observations on the State of Society among the Asiatic Subjects of Great Bretain নামে এক প্রবন্ধে ভারতীয়দের প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত প্রকাশ করেন এই বলে-“While men were bound by no moral restraints and lived with the insensibility of brutes’, Indian Women were doomed to a life of servitude and self-imprisonment and a violent and premature death.” 1. ”
তিনি এই অভিমত প্রকাশ করেন যে কেবল খ্রিস্টধর্মের প্রসারের মাধ্যমেই ভারতীয় সমাজকে সভ্যতার স্তরে উন্নিত করা সম্ভব।
এছাড়া ইংরেজরাও বিভিন্ন সময়ে তাদের বিভিন্ন লেখায় এ দেশের সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন। ১৮১৮-তে জেমস স্টুয়ার্ট মিল তার History of British India তে বলেন, “The condition of women is one of the most remarkable circumstances in the manners of nations. Among rude people, the women are generally disregraded; among civilised people they are exalted.”১৭
এদেশীয় শিক্ষিত পুরুষদের একাংশ পাশ্চাত্য সমাজের সঙ্গে নিজেদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করে যে, পাশ্চাত্যের উন্নতির অন্যতম কারণ সে দেশে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান।* ফলস্বরুপ উনিশ শতকে বাংলায় যে নবজিজ্ঞাসার সূত্রপাত হতে দেখা যায় তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নারী সংক্রান্ত প্রশ্ন ।
বাঙালি মহিলাদের দুর্দশার কথা সর্বপ্রথম রাজা রামমোহন রায়ের কন্ঠে উচ্চারিত হতে দেখা যায়।১৯ সতীদাহের বিরুদ্ধে লেখনীতে তিনি বলেন “ একই সঙ্গে রান্না করতে পারে, শয্যাসঙ্গিনী হতে পারে এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে এরূপ উপযোগী জন্তু ব্যতীত মহিলাদের আর কিছু বলে বিবেচনা করা হয় না।
২০ নারীজাতির হীন অবস্থার জন্য তিনি পুরুষসমাজকে দায়ী করে বলেন, “স্ত্রীলোকের শারীরিক পরাক্রম পুরুষ হইতে প্রায় ন্যূন হয়, ইহাতে পুরুষেরা তাহাদিগকে আপনা হইতে দুৰ্ব্বল জানিয়া যে যে উত্তম পদবীর প্রাপ্তিতে তাহারা স্বভাবতঃ যোগ্যা ছিল, তাহা হইতে উহাদিগকে পূর্ব্বাপর বঞ্চিত করিয়া আসিতেছেন; পরে কহেন যে, স্বভাবতঃ তাহারা সেই পদ প্রাপ্তির যোগ্যা নহে।
নারীরা পুরুষদের চাইতে কম বুদ্ধিসম্পন্ন হবার কারণে তারা শিক্ষা গ্রহণের অনুপযুক্ত, সমাজে প্রচলিত এই ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে তিনি বলেন যে, “স্ত্রীলোকদিগের বুদ্ধির পরীক্ষা কোন কালে লইয়াছেন যে তাহাদিগকে অল্পবুদ্ধি কহেন? কারণ বিদ্যাশিক্ষা এবং জ্ঞানশিক্ষা দিলে পরে,
ব্যক্তি যদি অনুভব ও গ্রহণ করিতে না পারে, তখন তাহাকে অল্পবুদ্ধি কহা সম্ভব হইতে পারে; আপনারা বিদ্যাশিক্ষা জ্ঞানোপদেশ স্ত্রীলোককে প্রায়ই দেন নাই, তবে তাহারা বুদ্ধিহীন হয়, ইহা কীরূপে নিশ্চয় করেন? বরঞ্চ লীলাবতী, ভানুমতী, কর্ণাট রাজপত্নী, কালিদাসের পত্নী প্রভৃতি যাহাকে যাহাকে বিদ্যাভ্যাস করাইয়াছিলেন, তাহারা সর্ব্বশাস্ত্রপরায়না রূপে বিখ্যাতা আছেন। ২২
বিদ্যাসাগরের লেখনীতেও নারীজাতির দুর্দশার জন্য পুরুষসমাজকে দায়ী করে বলা হয়, “যে দেশের পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম্ম নাই, ন্যায়-অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদাসদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিক রক্ষাই প্রধান কর্ম ও পরম ধর্ম্ম, আর যেন সে দেশে হতভাগ্য অবলাজাতি জন্মগ্রহণ না করে। হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আসিয়া জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি না। ২০
উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালি পুরুষদের একাংশের আত্মপোলব্ধির পরিচয় পাওয়া যায় এই লেখনীসমূহে। পুরুষদের একাংশের মধ্যে যেহেতু এই উপলব্ধি জাগ্রত হয়েছিল যে, নারীজাতির বর্তমান হীনঅবস্থার কারণ পুরুষেরাই, তাই এই দুরবস্থা থেকে নারীর পরিত্রাতার ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হলেন তারা। অতএব বাংলায় নারীজাতির উন্নয়নকল্পে যে সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত হয় তা পুরুষদের হাত ধরেই শুরু হয়।
রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ইয়ং বেঙ্গল-এর সদস্যবৃন্দ প্রমুখের সহযোগিতায় বাঙালি নারী প্রথম আলোর স্পর্শ পান। এক্ষেত্রে মেয়েদের কোন ভূমিকা প্রথম পর্যায়ে ছিল না। অবশ্য পরবর্তীকালে পুরুষ প্রদত্ত শিক্ষায় শিক্ষিত নারীর সীমিতসংখ্যক রচনায় তাদের মতামত ও বক্তব্যও পাওয়া যায়। সমগ্র উনিশ শতক জুড়ে নারীকেন্দ্রিক যে সামাজিক আন্দোলন চলতে থাকে তা হচ্ছে
- সতীদাহ নিবারণ আন্দোলন;
- বিধবাবিবাহ আন্দোলন;
- বহুবিবাহ প্রথা রদ আন্দোলন; এবং
- বাল্যবিবাহবিরোধী আন্দোলন
আর এই সকল আন্দোলনের সঙ্গে যে বিষয়টি চলে আসে তা হচ্ছে, স্ত্রীশিক্ষা সংক্রান্ত আন্দোলন। সতীদাহপ্রথা নিবারণ, বিধবা বিবাহ প্রচলনসহ সমাজসংস্কার মূলক আন্দোলন শুরু হবার ফলে সংস্কারকদের মধ্যে যে উপলব্ধি জাগ্রত হয় তা হচ্ছে মেয়েদের সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে স্ত্রীশিক্ষা । কাজেই উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলনে স্ত্রীশিক্ষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্বীকৃত হয়।
তবে প্রাথমিক পর্যায়ে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চেতনা ধীরে ধীরে জাগলেও স্ত্রীশিক্ষার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার ও ধারণা দূর করা সম্ভব হয় নি।
২৪ স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির একটি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায় এ সময়ে শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে বিবাহ এবং পারিবারিক জীবন বা পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন।” শিক্ষিত পুরুষেরা উপলব্ধি করলেন স্ত্রী যদি অশিক্ষিত এবং অজ্ঞ থাকে তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার মানসিক দূরত্ব কিছুতেই ঘুচবে না।
বামাবোধিনী পত্রিকায় বলা হয়, “পরস্পর পরস্পরের আত্মার অভাব মোচনের উপায় সকল অন্বেষণ করিবেন, একসঙ্গে ঈশ্বরচিন্তা, একসঙ্গে ঈশ্বরোপাসনা, একসঙ্গে ধর্ম্মালোচনা, একসঙ্গে ধৰ্ম্মানুষ্ঠান, একসঙ্গে শয়ন, একসঙ্গে ভোজন, একসঙ্গে অধ্যায়ন ইত্যাদি ঈশ্বরাভিপ্রেত কর্তব্যসকল নিষ্পন্ন করিয়া আপনাদিগের সম্বন্ধের যথার্থ গৌরববৃদ্ধি করিবেন।
“২৬ বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে শিক্ষিত পুরুষের উপযুক্ত সহধর্মিনী হিসেবে নারীকে গড়ে তোলবার জন্য স্ত্রীশিক্ষা প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছিল। কাজেই বলা যায় নারীকে
শিক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয় পুরুষের নিজস্ব কারণে।
উনিশ শতকের নারীশিক্ষা সংক্রান্ত রচনা বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রগতিবাদী বা উদারনৈতিক দলের সঙ্গে রক্ষণশীল বা প্রথানুসারিদের লড়াই। তৎকালীন সমাজে স্ত্রীশিক্ষা প্রসঙ্গে প্রচলিত কুসংস্কারগুলি এবং স্ত্রীশিক্ষার বিরুদ্ধে রক্ষণশীল শ্রেণির যুক্তিসমূহের একটি চিত্র মদনমোহন তর্কালঙ্কার সর্বশুভাকরী পত্রিকায় স্ত্রী শিক্ষা শিরোনামে এক প্রবন্ধে তালিকা বদ্ধ করেছেন। যুক্তিসমূহ হল :
ক) শিক্ষা কর্মের উপযোগিনী যে সকল মানসিক শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির আবশ্যক স্ত্রীজাতির তাহা নাই;
খ) স্ত্রীজাতির বিদ্যাশিক্ষার ব্যবহার এদেশে কখনও নাই… অতএব লোকাচার বিরুদ্ধ…;
গ) স্ত্রীলোকেরা বিদ্যাশিক্ষা করিলে দুর্ভাগ্য দুঃখ ও পতিবিয়োগ দুঃখে চিরকাল জীবনযাপন করিবে;
ঘ) স্ত্রীজাতি বিদ্যাবতী হইলে স্বেচ্ছাচারিণী ও মুখরা হইবেক;
ঙ) বিদ্যার অহংকারে মত্ত হইয়া গুরুজনকে অবজ্ঞা করিবেক; এবং
চ) পরিশেষে স্বয়ং পতিত হইবেক;
অতএব স্ত্রী জাতিকে সর্বদা অজ্ঞাননান্ধকূপে নিক্ষিপ্ত রাখাই উচিত। যুক্তিসমূহ খণ্ডন করে স্ত্রী শিক্ষার স্বপক্ষে মদনমোহন লেখেন বিশ্বপিতা স্ত্রী ও পুরুষের কেবল আকারগত কিঞ্চিত ভেদ সংস্থাপন করিয়াছেন মাত্র। মানসিক শক্তি বিষয়ে কিছুই ন্যূনাধিক্য স্থাপন করেন নাই। অতএব বালকেরা যেরূপ শিখিতে পারে বালিকারা সেরূপ কেন না পারিবেক? – যাঁহারা কহেন বিদ্যাভ্যাস করিলে নারীগণ মুখর দুশ্চরিত্র অহঙ্কারী হইবে তাঁহাদিগকে উত্তরপ্রদান সময়ে কিছু হিত উপদেশ বিহিত বোধ হইতেছে।
বিদ্যাভ্যাসের ফলে মনুষ্যজাতি বিনয়ী সচ্চরিত্র ও শান্তস্বভাব না হইয়া তদ্বিপরীত হইয়াছে ইহা যদি কেহ প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন, তবে তিনি আকাশপথে মনোহর উদ্যান মধ্যে সুরম্য হর্ম্যপৃষ্ঠে উত্তানপাদ হইয়া গন্ধৰ্ব্ব বিদ্যাধরগণ গীতবাদ্য নাট্যক্রিয়াদি করিতেছে, ইহাও অহরহ দর্শন করিয়া থাকেন।
ফলতঃ আমরা সাহস পূর্ব্বক বলিতে পারি, বিদ্যাবান মানুষ্যেরা যে দেশে বসতি করেন কিম্বা যে সমাজে উপবিষ্ট হইয়া স্বৈরআলাপ করেন, এই অসম্ভব আপত্তিকারকেরা সেই-সেই দেশ ও তত্তং সমাজের ত্রিসীমা দিয়াও কখন গতায়ত করেন নাই — এভাবে সমকালীন রচনা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, উনিশ শতক জুড়েই স্ত্রীশিক্ষা শব্দটি সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এবং বাঙালি নারীর সামাজিক ভূমিকারপটপরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটে এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে।
উনিশ শতকের পূর্বে কি তবে নারীদের সঙ্গে শিক্ষার কোন সম্পর্কই ছিল না? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা চলে যে, প্রথাগত নারীশিক্ষার কোন ব্যবস্থা এর পূর্বে ছিল না একথা ইতিহাসস্বীকৃত। তবে মধ্যযুগ থেকে শুরু করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত একটি চিত্র পাওয়া যায়, যে ধারাটি অন্তঃপুর শিক্ষার একটি রূপ বলা যায়, তা হচ্ছে বৈষ্ণবীদের মাধ্যমে নারীশিক্ষা। বৈষ্ণবীরা অন্দরমহলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাত এবং এদের দ্বারাই অন্তঃপুরের নারীরা জ্ঞানের আলো পেত।
“এ্যাডামস রিপোর্ট অন দ্য স্টেট অব এডুকেশন ইন বেঙ্গল” থেকে জানা যায় তিনি কেবল নাটোরেই চোদ্দশ কিংবা পনেরশ বৈষ্ণবের খোঁজ পান যারা মেয়েদের লেখাপড়া শেখাত এবং এ্যাডাম মন্তব্য করেন যে, সর্বত্র পরিব্যপ্ত অজ্ঞানতার মধ্যে একমাত্র বৈষ্ণবরাই বিদ্যাচর্চা করত এবং ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে একমাত্র তারাই মেয়েদের শিক্ষার প্রতি যত্ন নিত। * বৈষ্ণবী ব্যতীত আরো এক শ্রেণির নারীর মধ্যে লেখাপড়ার প্রচলন পাওয়া যায়; এরা হলেন জমিদার শ্রেণি। জমিদার বংশীয় নারীরা প্রায় সকলেই কিছুটা লেখাপড়া করতেন।
এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, জমিদার বংশীয় মেয়েদের বিয়ে দেয়া হতো সমশ্রেণির বা বংশের ঘরে। কিছুটা লেখাপড়া জানা না থাকলে এই নারীরা বিধবা হলে স্বামীর সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাবে এই ভয়ে তারা কিছুটা লেখাপড়া করতেন। তবে এই প্রথা দুটিই সমাজে উচ্চশ্রেণির মধ্যে প্রচলিত ছিল বিধায় সাধারণ রীতির ব্যতিক্রম হিসেবেই পরিগণীত।
উনিশ শতকের প্রথম পর্যায়ে সংস্কার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ প্রায় সকলেই স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও বৃটিশ সরকার ভারতীয় তথা বাংলার নারীদের শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রথম পর্যায়ে কোন পদক্ষেপ নেয় নি। ১৮৩৪ সালে মেকলে ভারতে আগমন করে “জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনস”-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ শিক্ষার বিষয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন, দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যায় এই প্রস্তাবে তিনি নারীদের শিক্ষার প্রসঙ্গে কোন বক্তব্য দেন নি বা সুপারিশ করেন নি।১ পরবর্তীকালে ১৮৪৫-এ উত্তরপাড়ার বিখ্যাত জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখার্জী এবং রামকৃষ্ণ মুখার্জী মেয়েদের একটি স্কুল স্থাপনের জন্য কাউন্সিল অব এডুকেশনের কাছে প্রস্তাব রাখেন এবং তারা নিজেরা বিদ্যালয়ের অর্ধেক ব্যয় বহন করবার দায়িত্ব নিয়ে বাকি অর্ধেক সরকারকে বহন করবার অনুরোধ জানান।
৩২ জন ড্রিঙ্কওয়াটার বিটস্ এর নেতৃত্বে সভার কাজ শুরু হয়। বিট প্রস্তাবটি গ্রহণ করবার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন কিন্তু অন্যান্য সদস্যদের আর্থিক সংকটের যুক্তিতে প্রস্তাবটি বাতিল হয়। অবিভক্ত বাংলায় স্ত্রীশিক্ষার সূত্রপাত হয় কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে মিশনারীদের উদ্যোগে। রবার্ট মে নামে একজন পাদ্রি ১৮১৮ সালে চুঁচুড়ায় প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
ছবি বসু তাঁর বাঙলার নারী আন্দোলন গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, “রেইনি সাহেবের মতে, ১৭৬০ অব্দের সমকালে মিসেস হেজেস একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সম্ভবত উহাই প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। ঐ বিদ্যালয়ে নৃত্য ও ফরাসী ভাষা শেখান হতো বলে প্রকাশ। তবে ছবি বসুর এই তথ্যের যথার্থতা জানা যায় না।
১৮১৯ সালের মাঝামাঝি ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি নামে একটি খ্রিষ্টান মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমিতি নন্দন বাগান, গৌরীবেড়ে, জানবাজার ও চিৎপুর অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে। স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা জনসাধারণকে বোঝাবার উদ্দেশ্যে এই সমিতির সহযোগিতায় বিখ্যাত বাঙালি পণ্ডিত গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার প্রকাশ করেন ‘স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ নামে একটি গ্রন্থ। এর পর ১৯২৪ সালে চার্চ মিশনারী সোসাইটির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘লেডিজ সোসাইটি।
এই সোসাইটির মাধ্যম্যে মিস মেরী এ্যান কুক নারীশিক্ষা বিস্তারে ব্রতী হন। পরবর্তীকালে ১৮২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লেডিজ অ্যাসোসিয়েশন নামে অপর একটি মহিলা সমিতি। ইংরেজ মিশনারীগণ কর্তৃক গৃহীত নারীশিক্ষা বিস্তারের এইসব পদক্ষেপ উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চবর্ণের বাঙালি পরিবারের মেয়েদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে কোন কার্যকর ভূমিকা পালন কওে নি।
এর কারণ মিশনারীদের স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে ধর্মপ্রচার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বলে তাদের বিশ্বাস ছিল। তাদের মধ্যে ভয় জন্মে যে যদি স্ত্রীশিক্ষার সূত্রে খ্রিস্টান মহিলারা অন্তঃপুরে প্রবেশ করে তবে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয় ঘটবে। তাই এসকল স্কুলে নিম্নশ্রেণির হিন্দু বালিকারাই যেতো ঠাকুর তার “রিফর্মার” পত্রিকায় মিসেস উইলসনের কেন্দ্রীয় বালিকা বিদ্যালয় সম্পর্কে লেখেন প্রসন্নকুমার
The pupils of this institution consist for the most part of the lowest classes, who are not permitted to frequent the houses of the respectable natives. For these women it will be difficult to find access to the respectable females, particularly when it is known that their education consists chiefly of the knowledge of the New Testament and the religious facts.
Prejudice of caste and the stronger prejudice which the generality of natives continue to entertain against Christianity, are at present likely to raise an insurmountable barrier against the success of their endeavours.
খ্রিস্টান মিশনারীদের জনসেবামূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে ছবি বসুর বক্তব্য উল্লেখযোগ্য স্ত্রীশিক্ষা প্রচারে এদেশে নবাগত খৃস্টান মিশনারীরা যে যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করছেন সেকথা অনস্বীকার্য।
শুধু স্ত্রীশিক্ষা নয় সুদূর পল্লীমনে, অর্ধসভ্য সরল মানুষদের সঙ্গেও এক মানসিক যোগ-সাধনে এঁরা সক্ষম হয়েছিলেন। অবশ্য একথাও পুরোপুরি সত্য যে, মিশনারীদের এই পরহিতসাধন নিছক মানবপ্রীতি সম্ভূত নয়। তাঁরা যেখানে গিয়েছেন সেখানেই মুদ্রণযন্ত্র নিয়ে গিয়েছেন, স্থানীয় ভাষা শিখে সেই ভাষায় বাইবেল ও অন্যান্য বই ছাপিয়েছেন।
খৃস্টের বাণী প্রচার করেছেন আর এদেশের ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার নিন্দা করেছেন। যারা তাঁদের প্রলোভনে প্ররোচনায় বা শিক্ষায় স্বধর্ম ত্যাগ করেছেন, তাঁদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার জন্য স্কুল খুলেছেন।। তাই এঁদের হিতসাধনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মপ্রচারের তাগিদ এবং আরো কিছুদিন পরে অবশ্যম্ভাবীরূপে স্পষ্ট হয়ে উঠল বণিকের মানদণ্ড রক্ষা করবার কৌশল।
তৎকালীন বাঙালি উচ্চবর্ণের হিন্দুসমাজের মিশনারী শিক্ষার সম্পর্কে এরূপ শংকার যথার্থতা অবশ্য মিশনারীদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলের পাঠ্যতালিকা বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। মিসেস উইলসনের বিদ্যালয়ে ১৮২৯-এ পাঠ্যসূচি ছিল ওয়াটের ক্যাটসিসম, মোক্ষলাভের উপায় সম্পর্কে যিশুর উপদেশ নিয়ে মাতা ও কন্যার কথোপকথন, বাংলায় অনুদিত বাইবেলের ইতিহাস, সেন্ট ম্যাথুর গসপেল এবং খ্রিস্টের দ্বাদশ শিষ্যের প্রচারকার্যের বিবরণ।
১৮৩৩ সালে পাঠ্যক্রমটি বর্ধিত হয়ে দাঁড়ায় ১. যোশেফের ইতিহাস প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ, ২. বাইবেলের ইতিহাস, ৩. ভূগোল, ৪. এলারটনের কথোপকথন, ৫. নিউটেস্টামেন্ট, ৬. চার্চ ক্যাটসিসম, এছাড়া স্লোত মুখস্থ এবং সেলাই-এর কাজ পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।” এই পাঠ্যসূচী সব মিশনারী বিদ্যালয়গুলি অনুসরণ করত।
তবে মিশনারীদের প্রচেষ্টা হিন্দু সমাজে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এ বিষয়টি সন্দেহাতীত। এর ফলে স্ত্রীশিক্ষার উপকারিতা সম্পর্কে ক্রমে সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সমাজের উপরের স্তরে এই চেতনা সঞ্চারিত হতে থাকে।
স্ত্রীশিক্ষাকে কেন্দ্র করে মূলত তিনটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়; স্ত্রীশিক্ষার আদৌ কোন প্রয়োজন আছে কি? যদি স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজন থাকে তবে এ ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে? এবং স্ত্রীশিক্ষার বিষয়বস্তু কী হওয়া উচিত? স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যখন স্বীকৃত হতে থাকে তখন প্রশ্ন ওঠে স্ত্রীশিক্ষার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে সে প্রশ্নটি।
কারণ স্ত্রীশিক্ষাকে সমর্থন করলেও প্রকাশ্যে বিদ্যালয়ে মেয়েদের পাঠানোর বিষয়টি সম্ভ্রান্ত বংশীয় অনেকেরই আপত্তি ছিল। এক্ষেত্রে তৎকালীন হিন্দু সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি রাধাকান্ত দেব- এর উদাহরণ গ্রহণযোগ্য।
নীতিগতভাবে তিনি স্ত্রীশিক্ষার সমর্থক ছিলেন কিন্তু প্রকাশ্য বিদ্যালয়ে মেয়েদের প্রেরণের পক্ষপাতি ছিলেন না। ১৮৫১ সালে বিটন্ কে লিখিত পত্রে তার এ বিষয়ে তাঁর মতাদর্শ জানা যায় বর্তমানে আপনি যে মহৎ উদ্দেশ্যসাধনে ব্রতী হয়েছেন, আমি এতকাল উপদেশ ও নিজের কাজের দ্বারা দেশবাসীকে জানাতে চেয়েছি যে আমি স্ত্রীশিক্ষার একজন প্রধান সমর্থক।
১৮১৯ সালে আমি পাদরি পিয়ার্সকে লিখে জানিয়েছিলাম যে বিবাহের আগে মেয়েদের আমরা ঘরেই লেখাপড়া শেখাই, তাই কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা বাইরের স্কুলে লেখাপড়া করতে যাবে না। এরপর আমি বরাবরই একথা বলে এসেছি। নীতির দিক থেকে স্ত্রীশিক্ষার বিরোধিতা আমি করি নি, তবে প্রকাশ্য বালিকা বিদ্যালয়ের সার্থকতা সম্বন্ধে আমার মনে আগাগোড়াই সন্দেহ ছিল।
এভাবে রাধাকান্ত দেবের মতো রাজা বৈদ্যনাথ রায়, ধনকুবের মতিলাল শীলসহ অনেক সমাজগণ্যমান্য ব্যক্তির মধ্যেই প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক যুক্তির সমন্বয় দেখা যায় যারা স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও একে গৃহশিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছেন।
১৮৫০ সালের সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয় পত্রিকার এক প্রবন্ধ থেকেও জানা যায় ‘অনেক ভদ্রলোকই স্ত্রী শিক্ষার সমর্থক কিন্তু প্রকাশ্য স্থানে বালিকা প্রেরণ করিতে অসম্মত আছেন এবং তাহা ভদ্র পরিবারের যোগ্য এমন জ্ঞান করেন না। ২
স্ত্রীশিক্ষাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেন ইয়ং বেঙ্গল দল।
পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী শিক্ষায় বিশ্বাসী, শিক্ষার জন্যই শিক্ষা এই মতাদর্শে বিশ্বাসী ইয়ং বেঙ্গল গ্রুপের সদস্যরা স্ত্রীশিক্ষার প্রকৃত সামাজিক তাৎপর্য উপলব্ধি করেন এবং তাঁরা ছিলেন স্ত্রীশিক্ষার জোরালো সমর্থক। ১৮৪০ সালে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় স্ত্রীশিক্ষার সমর্থনে প্রবন্ধ রচনা করে পুরস্কার পান।
পরবর্তীকালে ১৮৪২ সালে রামগোপাল ঘোষ হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মধ্যে স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ রচনার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। এছাড়াও ইয়ং বেঙ্গল দলের মুখপত্র পার্থেনন, জ্ঞানান্বেষণ, এনকোয়েরারে প্রকাশিত হতো স্ত্রীশিক্ষার পক্ষে জোরালো যুক্তি সম্বলিত প্রবন্ধসমূহ। একাডেমিক এশোসিয়েশন ও সাধারণ জ্ঞানোপার্জিকা সভার অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল স্ত্রীশিক্ষা।
এভাবে দেখা যায় স্ত্রীশিক্ষা বিষয়টি উনিশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে প্রধানত মিশনারীদের প্রচেষ্টাধীন থাকলেও চতুর্থ দশকে এসে ক্রমেই তা বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই সময়ে অক্ষয়কুমার দত্ত বিদ্যাদর্শন পত্রিকায় লেখেন।
কিয়দ্বৎসর পর্যন্ত বঙ্গদেশীয় স্ত্রীলোকদের বিদ্যাভ্যাস বিষয় লইয়া যে সমুদয় সমাচার পত্র সম্পাদক মহাশয়েরা বাদানুবাদ করিতেছেন, তাঁহারা দুইদলে বিভক্ত হইয়া স্ত্রীবিদ্যার সাপক্ষ বিপক্ষরূপে বিখ্যাত হইয়াছেন।
যাঁহারা এতদ্বিষয়ের প্রশংসা করেন, তাঁহারা নানাবিধ দৃষ্টান্তদ্বারা মধ্যে মধ্যে সম্বাদপত্র….করিয়া থাকেন। তদ্বিপরীতে যে-সকল মহাশয়েরা স্ত্রীবিদ্যার গৌরব করেন না, তাঁহারা কেবল উপহাস করিয়াই আসিতেছেন। ফলতঃ কিরূপ উপায়দ্বারা দেশীয় রমণীগণের বিদ্যাশিক্ষা সম্পন্ন হইতে পারে, তাহা এপর্যন্ত কেহই দর্শাইতে পারেন নাই।…
আমরা সকল উপায়াপেক্ষা এ বিষয়ের জন্য একতার প্রতিই অধিক নির্ভর করিতে পারি এবং স্ত্রীবিদ্যার উন্নতিকল্পে দেশ হিতৈষি জনসমূহের যুক্ত সাহায্য ভিন্ন অন্য কিছুই শুভকর বোধ করি না; অতএব আমরা একান্তরূপে অনুরোধ করিতেছি দয়াশীল মহাশয়েরা ঐক্যবাক্যে একত্র হইয়া এতদ্বেশীয় স্ত্রীবিদ্যার উন্নতি নিমিত্ত একটি সভা স্থাপন করুন, এবং দৃঢ়রূপে তৎসমাজের কার্য্যবিষয় মনযোগী হউন।”
বিদ্যাদর্শন সম্পাদকের আহ্বান থেকে বলা যায় যে, সমাজে স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল তবে তা কার্যে পরিণত করবার পদ্ধতি নিয়ে বিভক্তি ছিল। কাজেই তিনি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা শুভেচ্ছার পরিবর্তে সকলের প্রচেষ্টার সম্মিলিত রূপকেই সর্বাধিক কার্যকর উপায় হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তবে এই বিচ্ছিন্ন প্রয়াস শেষ হতে আরো কিছুদিন সময় লেগেছিল।
বাংলায় সম্ভ্রান্ত বাঙালিদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম প্যারীচরণ সরকার, কালীকৃষ্ণ মিত্র ও তাঁর ভাই নবীনকৃষ্ণ মিত্র সহ বারাসতের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির উদ্যোগে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। নবকৃষ্ণ ঘোষ এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে বলেন ব্রাহ্মণ অধ্যাপক বহুল গন্ডগ্রাম বারাসতে ঐ দেশাচার বিরুদ্ধ নব অনুষ্ঠানের জন্য প্যারীবাবু প্রমুখ ঐ বালিকা- বিদ্যালয়ের স্থাপনকর্তাগণকে কত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করিতে হইয়াছিল, কত লাঞ্ছনা-নিগ্রহ ভোগ করিতে হইয়াছিল।
প্যারীবাবু, নবীনকৃষ্ণবাবু এবং বালিকা বিদ্যালয়ের শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তিগণ বারাসতে সমাজচ্যুত হইয়াছিলেন। এমন কি বারাসত বিদ্যালয়ের তৎসাময়িক দ্বিতীয় শিক্ষক হরিদাসবাবুও প্যারীবাবুর বিপক্ষদলে যোগদান করিয়াছিলেন। পাঠকের যেন স্মরণ থাকে যে সে সময়ে স্ত্রীলোকে লেখা পড়া শিখিলে বিধবা হয়, জাতি যায় প্রভৃতি কুসংস্কার বঙ্গীয় পল্লীবাসিগণের অন্তরে বদ্ধমূল ছিল।
এমনকি একজন সম্ভ্রান্ত ইংরাজ কর্মচারী সস্ত্রীক বারাসতের বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনার্থ আসিয়া একটী দুগ্ধপোষ্যা বালিকার চিবুকে হাত দিয়া আদর করাতে জাতিনাশ আশঙ্কা করিয়া বারাসতবাসিগণ ঘোটমঙ্গল বসাইয়াছিলেন।
স্ত্রীশিক্ষার ইতিহাসে বারাসত বালিকা বিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে বৃটিশভারতে অবিভক্ত বাংলায় স্ত্রীশিক্ষার প্রকৃত সূত্রপাত ঘটে ১৮৪৯ সালে ৭ মে প্রতিষ্ঠিত ক্যালকাটা ফিমেল স্কুলে, যা পরবর্তীকালে বেথুন কলেজ হিসেবে খ্যাত হয়ে কেবল স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারেই নয় নারীজাতির অগ্রগতির প্রধান নিয়ামকে পরিণত হয়।
এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বিন, যিনি ভারতবর্ষের জনগণের কাছে বেথুন সাহেব নামে পরিচিত। উনিশ শতকের গোড়ায় রাজা রামমোহন রায় যখন সচেষ্ট হয়েছেন ভারতীয় হিন্দু নারীদের সতীদাহ প্রথার হাত থেকে রক্ষা করতে, আবার একদল চাচ্ছেন এই প্রথাটি বহাল রাখতে, তখন এই প্রসঙ্গে লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে দু’পক্ষই আবেদন করে।
যারা সতীদাহ প্রথার পক্ষে তারা তৎকালীন লন্ডনের তরুণ আইনজীবী বিটনকে তাদের পক্ষের উকিল নিয়োগ করেন। ভারতবর্ষ সম্পর্কে অজ্ঞ বিটন না জেনেই তাদের পক্ষে লড়ে যান। প্রথম জীবনে অজ্ঞতাপ্রসূত এই ভুল সংশোধনের জন্যই যেন ১৯৪৮ সালে যখন ভারতবর্ষের আইন সচিব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তখন এদেশের নারীকল্যাণে, নারীদের দুঃখমোচনে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
এরই ফলশ্রুতি বলা চলে ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল। এই বিদ্যালয়ে উচ্চ বর্ণের সভ্রান্ত বংশের হিন্দু এবং ব্রাহ্ম বালিকারা ভর্তি হতে পারত। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ছিলেন ছিলেন হিন্দু, এর পাঠ্যসূচিতে এমন কিছুই ছিল না যা হিন্দু ধর্মীয় আদর্শে কোন আঘাত করতে পারে। সর্বোপরি এর পরিচালনায় নিযুক্ত ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, কালীকৃষ্ণ দেব, হরচন্দ্র ঘোষ এর মতোন নেতৃস্থানীয় হিন্দু ব্যক্তিবর্গ।
কাজেই বলা যায় এক্ষেত্রে মিশনারীদের কোনপ্রকার সংযুক্তি না থাকার ফলে ধর্মান্তরের ভীতি থাকল না। এভাবে বেথুন স্কুল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সামনে প্রশ্ন রাখেন, ধর্মান্তরের ভীতি দূর হওয়ায় তারা তাদের কন্যাদের বিদ্যালয়ে প্রেরণ করবেন কিনা?” তবে কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় প্রাথমিকভাবে ২১জন মেয়ে নিয়ে স্কুল শুরু হলেও ক্রমেই ছাত্রীসংখ্যা কমতে থাকে এবং এই বিদ্যালয়টিও তীব্র সামাজিক প্রতিক্রিয়ারও জন্ম দেয়।
গোড়া রক্ষণশীল হিন্দুরা মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন না, বরং যারা মেয়েদের স্কুলটিতে পাঠাতেন তাদের তাদেরকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখবার জন্য তারা আন্দোলন করলেন। পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার তার মেয়েদের বেথুন স্কুলে পাঠাবার অপবাদে ও স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেবার কারণে প্রায় ৮/৯ বছর সমাজচ্যুত হয়ে থাকেন। অনেকে বিদ্যালয়গামী ছোট ছোট মেয়েদের উদ্দেশ্যেও কটুকথা বলতে দ্বিধা করতেন না।
রামনারায়ণ তর্করত্ন বলতে লাগলেন,“বাপরে বাপ, মেয়েছেলেকে লেখাপড়া শেখালে কি আর রক্ষা আছে? এক ‘আন’ শিখাইয়া রক্ষা নাই। চাল আন, ডাল আন, কাপড় আন করিয়া অস্থির করে, অন্য অক্ষরগুলো শেখালে কি আর রক্ষা আছে।”৪৮ হিন্দু ইন্টেলিজেন্স পত্রিকার নব্য ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কাশীপ্রসাদ ঘোষ তার পত্রিকায় এসময়ে স্ত্রীশিক্ষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখেন।
এই রক্ষণশীল মতবাদের বিপরীতে অনেক শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত সেসময়ে স্ত্রীশিক্ষার পক্ষে অবস্থান নেন। গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ তাঁর সম্বাদভাস্কর পত্রিকায় স্ত্রীশিক্ষার সমর্থনে লেখেন আমরা কলিকাতা নগরে উপস্থিত হইয়া রাজা রামমোহন রায়ের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ করি এবং তৎকালেই ব্যক্ত করিয়াছিলাম স্বদেশের কুপ্রথা ও সহমরণ নিবারণ এবং বিধবাদিগের বিবাহ,
স্ত্রীলোকদিগের বিদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বিষয় সম্পন্নার্থ প্রাণপণে চেষ্টিত আছি, তাহাতেই রাজা রামমোহন রায় আমারদিগকে নিকটে রাখেন, সহমরণ পক্ষাবলম্বি পাঁচ ছয় সহস্র পরাক্রান্ত লোকের সাক্ষাতে গবর্ণমেন্ট হৌসের প্রধান হালে লর্ড বেন্টিঙ্ক বাহাদুরের সম্মুখে সহমরণের বিপক্ষে দণ্ডায়মান হইতে হইতে যদি ভয় করি নাই তবে এইক্ষণে ভয়ের বিষয় কি, এখন আমরা আমারদিগকে স্বাধীন জ্ঞান করি ইহাতে দানবকেই ভয় করি না,
মানব কোথায় আছেন, . সহস্র সহস্র কি লক্ষ লক্ষ লোক যদি আমাদিগের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন তথাচ আমরা বালিকাদিগের বিদ্যালয়ের অনুকূল বাক্যই কহিব….. স্ত্রীশিক্ষার ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, উনিশ শতকের চতুর্থ ও পঞ্চম দশক মুখর ছিল স্ত্রীশিক্ষার সপক্ষ- বিপক্ষদের বাক-বিতণ্ডায়।
এসময়ে মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাফল্যের প্রেক্ষিতে বিশেষ করে বেথুন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর ভারত সরকার স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে তাঁদের উদাসীন ও নিরপেক্ষ নীতি কিছুটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন, ১৮৫১ সালের ১২ আগস্ট বেথুন সাহেবের অকালমৃত্যুর পর ডালহৌসির উদ্যোগে কোর্ট অব ডিরেক্টরস্ বিদ্যালয়টির দায়িত্বভার গ্রহণ করলে এই বিদ্যালয়টি হয় সরকারি পরিচালনায় প্রথম মহিলা বিদ্যালয়।
এরপর ১৮৫৪ তে উডের ডেসপাচে স্ত্রীশিক্ষা বাবদ ব্যয় বরাদ্দ করার অনূকূলে মতপ্রকাশ করা হয়। ১ ১৮৫৪ সালে হ্যালিডে বাংলার প্রথম ছোটলাট হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৫৭-এর শুরুতে তিনি স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী হয়ে সহযোগিতা ও পরামর্শের জন্য বিদ্যাসাগরকে ডেকে পাঠান। মেয়েদের শিক্ষার প্রসঙ্গে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব দেখে বিদ্যাসগর উৎসাহী হন এবং মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
তিনি নভেম্বর ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৮-এর মে এই সময়কালে ৩৫টি মেয়েদের স্কুল স্থাপন করেন, যার মধ্যে হুগলি জেলায় ২০টি, বর্ধমান জেলায় ১১টি, মেদেনীপুরে ৩টি ও নদীয়ায় ১টি। ২ বিদ্যালয়গুলির জন্য মাসিক খরচ হতো ৮৪৫ টাকা এবং ছাত্রীসংখ্যা ছিল ১৩০০। ৫৩
এই পর্যায়ে যে প্রশ্নটি স্ত্রীশিক্ষা আন্দোলনে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তা হচ্ছে, স্ত্রীশিক্ষার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিটি অনুসরণ করা হবে? যেহেতু উচ্চবর্ণের সম্ভ্রান্ত বংশীয় হিন্দু পরিবার তাদের মেয়েদের প্রকাশ্য বিদ্যালয়ে পাঠাবার পক্ষে ছিলেন না এবং বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা খুব অল্প সময় বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেতেন, অতএব সমাজসংস্কারকদের এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্ত্রীশিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা শুরু করতে হয়।
অন্তঃপুর শিক্ষাপদ্ধতির উৎপত্তি এইভাবে হয়। এই পদ্ধতিতে মহিলারা নিজ চেষ্টায় বাড়িতে স্বামী কিংবা অন্যকোনো আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করতেন, এধরণের শিক্ষাপদ্ধতি জেনানা বা অন্তঃপুর শিক্ষাপ্রণালী বলে পরিচিত হয়।
এ ক্ষেত্রেও প্রথম উদ্যোগটি গ্রহণ করে খ্রিস্টান মিশনারী সোসাইটিসমূহ। শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের মিসেস হানা মার্শম্যান শ্রীরামপুর অঞ্চলে অন্তঃপুর স্ত্রীশিক্ষা ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিটি অনুসরণ করা হবে? যেহেতু উচ্চবর্ণের সম্ভ্রান্ত বংশীয় হিন্দু পরিবার তাদের মেয়েদের প্রকাশ্য বিদ্যালয়ে পাঠাবার পক্ষে ছিলেন না এবং বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা খুব অল্প সময় বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেতেন, অতএব সমাজসংস্কারকদের এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্ত্রীশিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা শুরু করতে হয়।
অন্তঃপুর শিক্ষাপদ্ধতির উৎপত্তি এইভাবে হয়। এই পদ্ধতিতে মহিলারা নিজ চেষ্টায় বাড়িতে স্বামী কিংবা অন্যকোনো আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করতেন, এধরণের শিক্ষাপদ্ধতি জেনানা বা অন্তঃপুর শিক্ষাপ্রণালী বলে পরিচিত হয়।”
এ ক্ষেত্রেও প্রথম উদ্যোগটি গ্রহণ করে খ্রিস্টান মিশনারী সোসাইটিসমূহ। শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের মিসেস হানা মার্শম্যান শ্রীরামপুর অঞ্চলে অন্তঃপুর স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মিশনারীদের এই প্রচেষ্টাও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে নি। মিশনারীদের জেনানা মিশন সফল না হলেও এই কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রাহ্ম সমাজ অন্তঃপুর স্ত্রীশিক্ষার কাজে সর্বপ্রথম উদ্যোগী হন।
কেশবচন্দ্র সেন, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, অঘোরচন্দ্র গুপ্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, দুর্গামোহন দাস প্রমুখ ব্রাহ্ম নেতারা অন্তঃপুর স্ত্রীশিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রণীভূমিকা পালন করেন। ১৮৬৩ সালে কেশবচন্দ্র ব্রাহ্ম বন্ধুসভা স্থাপন করেন যার একটি বিভাগ ছিল স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক। এই বিভাগ অন্তঃপুর শিক্ষার ব্যবস্থা করে। পরবর্তী পর্যায়ে এই দায়িত্ব ‘বামাবোধিনী সভা’র উপর বর্তায়। এই পদ্ধতিতে লেখাপড়ার অগ্রগতি সম্পর্কে বছরে চারবার রিপোর্ট পাঠানোর ও’বছরে দুইবার পরীক্ষা গ্রহণ এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল।
এই পদ্ধতি প্রসঙ্গে গোলাম মুরশিদ অভিমত প্রকাশ করেন সবচেয়ে ভালো লেখাপড়া জানতেন সেইসব মহিলারা যারা বাড়িতে স্বামী অথবা অন্য কোন আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া শিখতেন। তবে মেয়েদের জন্য পাঠ্যক্রম কী হবে এ নিয়ে প্রবল মতপার্থক্য দেখা দিল। কেশব সেন সহ অনেক ব্রাহ্ম নেতাও মনে করতেন যে মেয়েদের বিজ্ঞান, গণিত বা ইতিহাস, ভূগোল পড়বার প্রয়োজন নেই।
তাদের কিছুটা সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ, সেলাই, গৃহবিজ্ঞান, স্বাস্থ্য এসব পড়ানো উচিত। বামাবোধিনী পত্রিকায় লেখা হয় “স্ত্রীজাতির প্রকৃতি কোমল, এইজন্য সুকুমার বিদ্যা তাহাদিগের প্রকৃতির বিশেষ উপযোগী। … চিত্রবিদ্যা, শিল্পবিদ্যা, রন্ধন, ভাস্করের কার্য্য প্রভৃতি আরও কতকগুলি সুকুমার বিদ্যা আছে তাহা যেমন তৃপ্তিকর, তেমন উপকারী।
”৫৮ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা মত প্রকাশ করে এই বলে, “আমরা স্ত্রীশিক্ষার বিরোধী নই। নিশ্চয়ই মেয়েরা লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হবেন এবং শিক্ষার আলোকে সর্বপ্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত হবেন। … আমরা মনে করি মেয়েদের এমন সব বিষয় পড়া উচিত যা তাদের যোগ্য স্ত্রী এবং যোগ্য মাতা হতে সাহায্য করবে ।”৫৯ ১২৭৭ বাংলা সনে বামাবোধিনী সভা পরিচালিত অন্তঃপুর স্ত্রীশিক্ষার পাঠ্যক্রম দেখা যায়,
১ম বৎসর :- সাহিত্য : বোধদয়, অঙ্ক, ব্যাকরণ, সঙ্কলন, নামতা ২০০ পর্যন্ত।
২য় বৎসর :- সাহিত্য : আখ্যানমঞ্জরি ২য় ভাগ, পদ্যপাঠ ১ম ভাগ ১৮ পৃষ্ঠা, ব্যাকরণ স্বরসন্ধি পর্যন্ত, ভূগোল পরিচয় আসিয়া (এশিয়া) ১৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, অঙ্ক : গুণন ও ভাগাহার, ধারাপাত : নামতা ৪০০ পর্যন্ত, কড়া ও গণ্ডা।
৩য় বৎসর :- সাহিত্য : চারুপাঠ প্রথম ভাগ (বিদ্যাশিক্ষা, বৃক্ষলতাদির উৎপত্তির নিয়ম, স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধিসাধন ও জলস্তম্ভ), নারীশিক্ষার নারীচরিত ১ম ভাগ ১০ থেকে ৫৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, পদ্যপাঠ ২য় ভাগ ২৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, ব্যাকরণ : সন্ধি এবং ণত্ব ও ষত্ব বিধান সমাপ্ত, ভূগোল : ভূগোল পরিচয় (আসিয়া ও ইউরোপ সমাপ্ত । বাদ ভারতবর্ষের বিশেষ বিবরণ), ইতিহাস: ২য় ভাগ বাংলার ইতিহাস প্রশ্নমালা (বসন্তকুমার দত্ত প্রণীত ) বস্তুবিচার, পাটীগণিত : লঘুকরণ, মিশ্র সঙ্কলন ও ব্যাকরণ, ধারাপাত, পণ, কাঠা ও সের।
৪র্থ বৎসর :- সীতার বনবাস ২য় পরিচ্ছদ পর্যন্ত, পদ্যপাঠ ৩য় ভাগ ১৭ পৃষ্ঠা (বাদ চকোর ও চাতক), ৩৭ পৃষ্ঠা মুমূর্ষু সময়ে ঈশ্বরপরায়ণ ব্যক্তির প্রতি উক্তি, ৫০ পৃষ্ঠা দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, ৫৫ পৃষ্ঠা পুষ্প পর্যন্ত, ব্যাকরণ : স্ত্রী প্রত্যয়, কারক ও সমাস (লোহারামের ব্যাকরণ), ভূগোল : ভূগোল পরিচয় – চার মহাদেশের সাধারণ জ্ঞান, বাদ ভারতবর্ষের বিশেষ বিবরণ, নারীশিক্ষা: দ্বিতীয় ভাগের ভূগোল,
ইতিহাস : ইংল্যান্ডের ইতিহাস (রামকমল কৃত), বিজ্ঞান : ২য় ভাগ নারীশিক্ষার বিজ্ঞান (৭০ থেকে ১১০ পৃষ্ঠা), পাটীগণিত : মিশ্র গুণন ও ভাগাহার, শুভঙ্করের হিসাব (শিশুবোধক থেকে), মনকষা, সেরকষা, বৎসর মাহিনা ও মাস মাহিনা।
৫ম বৎসর :- সাহিত্য : টেলিমেক্স প্রথম তৃতীয় সর্গ, সাবিত্রীচরিত কাব্য ৪র্থ সর্গ (সাবিত্রীর বিবাহ পর্যন্ত), ব্যাকরণ : তন্ধিৎ ও ছন্দ বিষয় (লোহারাম কৃত), ভূগোল : ভূগোল পরিচয় সম্পূর্ণ, প্রত্যেক মহাদেশের ভারতবর্ষের ও ইংল্যান্ডের মানচিত্র, ২য় ভাগ নারীশিক্ষা, বিজ্ঞান: নারীশিক্ষা বিষয়ক কথোপকথন ( ১১০ হইতে ১৫৯ পৃষ্ঠা), ইতিহাস : ভারতবর্ষের সংক্ষিপ্ত বিবরণ (যদুগোপাল চট্টোপাধ্যায় প্রণীত), বাদ ৩য় ও ৯ম অধ্যায়, পাটীগণিত : ত্রৈরাশিক ও বহুরাশিক, শুভঙ্করের হিসাব সম্পূর্ণ।
৬ষ্ঠ বৎসরের বিশেষ পরীক্ষা :- সাহিত্য: নারীজাতি বিষয়ক প্রস্তাব, সীতার বনবাস, টেলিমেক্স, চারুপাঠ ৩য় ভাগ, শকুন্তলা, সাবিত্রীচরিত কাব্য, মেঘনাদবধ কাব্য, পদ্মিনীর উপাখ্যান, ব্যাকরণ : অলংকার, প্রবন্ধ রচনা, ইতিহাস : ভারতবর্ষ, ইংল্যান্ড, রোম ও গ্রীসের ইতিহাস, গণিত : সম্পূর্ণ পাটিগণিত, ক্ষেত্রতত্ত্ব প্রথম অধ্যায়, বীজগণিত : সমানুপাত পর্যন্ত, বিজ্ঞান : ধাত্রীবিদ্যা, শিশুপালন, পদার্থের গুণ, প্রকৃত ভূগোল ও খগোল, বামাবোধিনীর বিজ্ঞান বিষয়ক সমস্ত প্রস্তাব।
পাঠ্যতালিকাটি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে স্ত্রীশিক্ষার লক্ষ্য ছিল মূলত নারীর চরিত্রগঠনের শিক্ষা বা বলা চলে যেসকল গুণাবলী অর্জন করলে বাঙালি নারীর চিরাচরিত ভূমিকা আরো সুনিপুনভাবে পালন করা সম্ভব হবে সে বিষয়েই নারীকে শিক্ষা দেয়া হতো।
সমাজে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হবার সাথে সাথে এটাও নির্ধারিত হয়েছিল যে, পুরুষের সমান শিক্ষা নারীর জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং যদি মেয়েরা শিক্ষিত হলে পারিবারিক বিশৃংখলা তৈরি হয় তাই তাদের পাঠ্যক্রমে ধর্ম, ভক্তি, নৈতিক উপদেশ সমৃদ্ধ এবং দৈনন্দিন পারিবারিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়।
পরবর্তীতে কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত স্ত্রী নৰ্মাল বিদ্যালয় যে পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করে তা বামাবোধিনী সভার অন্তঃপুর শিক্ষার পাঠ্যক্রমের অনুরূপ ছিল, নুতন বিষয় হিসেবে ইংরেজি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং কালীপ্রসন্ন ঘোষের নারীজাতি বিষয়ক প্রস্তাব ও দ্যা ল্যান্ডমার্ক অব এনসিয়েন্ট হিষ্টি নামে দুটি বই যুক্ত হয়। ১৮৮২-তে ভারত সংস্কার সভা মেয়েদের পরীক্ষার জন্য যে পাঠ্যক্রমের প্রস্তাব দিয়েছিল তা ছিল,
১। ইংরেজি – ক) হ্যামলেট ১ম অঙ্ক, ৩য় অঙ্ক যথাক্রমে ল্যারেটিসের প্রতি পোলোনিয়াসের উপদেশ; হ্যামলেটের স্বগোতক্তি এবং রাজার স্বগোতক্তি, মার্চেন্ট অব ভেনিস – বিচারদৃশ্য, খ) ঈশার পর্বতোপরি উপদেশ এবং রূপকোক্তি, মথু (ম্যাথিউ?) ৫ম, ৭ম অধ্যায়, মধু ১৩ ও ২৫ অধ্যায়, লুক ১৪ অধ্যায়, গ)
ব্যাকরণ ও রচনা।
২। বাংলা – ক) মহাভারতের বনপর্ব-শ্রীবৎসরাজার উপাখ্যান, নলদয়মন্তীর উপাখ্যান, যুধিষ্ঠির ও ধর্মের কথোপকথন; শান্তিপর্ব-ভীষ্মের যোগ বিষয়ে উপদেশ, খ) রচনা।
৩। গণিত
৪। ইতিহাস ও ভূগোল
৫। প্রাকৃতিক ধর্মবিজ্ঞান
৬। স্বাস্থ্যরক্ষা
৭। সঙ্গীত ইত্যাদি”
নারীর রমণীসুলভ গুণাবলী বিকাশের উদ্দেশে শুরু হলেও এই শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে ক্রমশ নারীশিক্ষা তাত্ত্বিক স্বীকৃতি পেতে থাকে যার প্রমাণ পাওয়া যায় মেয়েদের বিদ্যালয় এবং ছাত্রীসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার থেকে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী বৃটিশ ভারতে অবিভক্ত বাংলায় ১৮৬৩ তে বালিকা বিদ্যালয় সংখ্যা ছিল ৯৫ টি এবং ছাত্রীসংখ্যা ২,৪৮৬ জন, ১৮৭১-এ বিদ্যালয় সংখ্যা ৩৪৪ এবং ছাত্রীসংখ্যা ৬,৭১৭, ১৮৮১-তে বিদ্যালয় সংখ্যা ১,০৪২ এবং ছাত্রী সংখ্যা ৪৪,০৯৬, ১৮৯০-এ এই সংখ্যা দাঁড়ায় বিদ্যালয় ২,২৩৮ এবং ছাত্রী ৭৮ ৮৬৫।
১৯০১ সনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় ব্রাহ্ম পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার হার ৫৫.৬ শতাংশ এবং ইংরেজি জানেন ৩০.৯ শতাংশ, বৈদ্যদের মধ্যে মেয়েদের শিক্ষার হার ২৫.৯ শতাংশ, ইংরেজি জানেন ৮ শতাংশ, কায়স্থদের মধ্যে মেয়েদের শিক্ষার হার দেখা যায় ৮.০ শতাংশ এবং ইংরেজি শিক্ষার হার .৪ শতাংশ, আবার ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই হার দাড়ায় যথাক্রমে ৫.৬ শতাংশ এবং ১ শতাংশ।
এই সময়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাশ করেন এবং বেথুন কলেজে এফ এ এবং স্নাতক বিভাগ চালু হয়। ১৮৭৯ সালে কাদম্বিনী ও চন্দ্রমুখি বসু এই কলেজ থেকে প্রথম দুই বাঙালি মহিলা স্নাতক হিসেবে সম্মানিত হন। পরবর্তীকালে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ।
তবে ওপরে বর্ণিত চিত্র সমাজের হিন্দু ধর্মাবলম্বী অংশের জন্য প্রযোজ্য। অপরদিকে মুসলিম সমাজের চিত্র ছিল ভিন্ন। নারীশিক্ষার প্রশ্নে হিন্দু সমাজের চাইতে মুসলিম সমাজ অনেকটাই পিছিয়ে ছিল।
শুধু নারীশিক্ষাই নয়, বৃটিশদের কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে হতাশাগ্রস্থ মুসলিম সমাজ বৃটিশ প্রবর্তিত ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ থেকে বিরত ছিল, ফলস্বরূপ উনিশ শতকের শুরুতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যে সংস্কার আন্দোলন দেখা গিয়েছিল তা মুসলিম সমাজে দেখা যায় নি। এমনকি মুসলমানরা প্রতিবশী হিন্দুদের চাইতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল।
বাংলার মুসলমানদের নবচেতনার উন্মেষকাল বলা যায় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে। এই পর্যায়েই বাঙালি মুসলিম সমাজ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে আধুনিকায়নের পথে অগ্রসর হয়। বাংলায় এই অগ্রসর দলের নেতৃত্বে যাদের নাম নেওয়া হয় তারা হলেন সৈয়দ আমীর আলী, আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর হোসেন, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান প্রমুখ।
এই শ্রেণি সমাজসংস্কারের পাশাপাশি ধর্ম ও শিক্ষাসংস্কারের আন্দোলন শুরু করে মুসলিম সমাজের মানস জগতে পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হয়। ক্রমে এদের মধ্যে বাংলা ভাষা আয়ত্ব করবার প্রচলন শুরু হয় এবং বাংলার নবজাগরণের মূল স্রোতধারার সঙ্গে তাদের আত্মিক সংযোগ স্থপিন হলে তারা বাংলার মুসলমান থেকে বাঙালি মুসলমানে উন্নীত হয়।
তবে সামগ্রিকভাবে বাংলার মুসলমান সমাজে জাগরণ শুরু হলেও তাদের একাংশ অর্থাৎ নারীসমাজ তখনও পর্যন্ত ছিল উপেক্ষিত এবং তাদের শিক্ষার বিষয়টি ছিল অবহেলিত। বাংলার মুসলমানদের বিষয়ে বলতে হয় এই সম্প্রদায়ের এক বিরাট অংশ নারীশিক্ষার বিরোধী ছিল। পুরো উনিশ শতক জুড়ে মুসলিম নারী শিক্ষার হার ছিল খুবই নগণ্য ।

বোম্বেতে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে দুইজন বাঙালি নারী সর্বপ্রথম যোগদান করেন। এরা হলেন কংগ্রেস নেতা জানকীনাথ ঘোষালের স্ত্রী স্বর্ণকুমারী দেবী এবং দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। পরবর্তী বৎসর কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনে এই দু’জন প্রতিনিধির সম্মান নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
পরিশেষে বলা যায়, উনিশ শতকে বাংলাদেশে নবজাগরণের প্রভাব বাঙালি জীবনকে বহু ধারায় প্রবাহিত করেছিল । বঙ্গরমণীরাও সেই কর্মযজ্ঞে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন দক্ষতার সঙ্গেই।
স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের সঙ্গে নারীদের নিজস্ব ভাবনা বিকশিত হবার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। স্ত্রীশিক্ষার বিস্তারই নারীর জীবনে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনার বীজ বপন করে। এই পালাবদলের সুযোগ প্রাথমিকভাবে উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের কাছেই পৌঁছেছিল। পরবর্তী পর্যায়ে তা ধীরে ধীরে বিস্তারলাভ করে।
উনিশ শতকে নবজাগরণের মূল বিষয় হিসেবে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বলাভ করতে শুরু করে এবং মেয়েদের অধিকার সম্পর্কে সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় কুড়ি শতকে ভারতীয় জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে মেয়েরা অংশীদার হয়। আর এভাবেই বাঙালি নারীর রাজনীতিকরণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া সূচিত হয়।
