আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় – কাউন্সিল ২০০৯। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
কাউন্সিল ২০০৯

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলে আগত কাউন্সিলর ও ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা, সম্মানিত কূটনীতিকবৃন্দ,
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ,
সাংবাদিক বন্ধুরা,
উপস্থিত সুধিবৃন্দ,
এবং
দূর-দূরান্ত থেকে আগত আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী ভাই ও বোনেরা,
আস্সালামু আলাইকুম ।
বক্তব্যের শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার আদর্শকে ধারণ করে গণমানুষের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালোরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত জাতির জনকের সহধর্মিণী, আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর পুত্র, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধকালীন বীর সেনা কর্মকর্তা শেখ কামাল, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট শেখ জামাল, জাতির জনকের কনিষ্ঠ পুত্র শিশু শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর দুই নবপরিণীতা পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, কৃষক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি, তার স্ত্রী বেগম আরজু মনি, শিশু সুকান্ত বাবু, আরিফ এবং আব্দুল নঈম খান রিন্টুকে।
স্মরণ করছি শহীদ কর্নেল জামিলকে যিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে এসে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় নিহত চার জাতীয় নেতা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে।
স্মরণ করছি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দকে।
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত যে সমস্ত নেতা-কর্মী জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে, ঘাম-শ্রম ও মেধার বিনিময়ে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেছেন তাদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদান আর দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ। আজকের এ কাউন্সিল অধিবেশনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদের অবদানকে স্মরণ করছি।
গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বাঙালির ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সকল শহীদদের।
সম্মানিত কাউন্সিলর ও ডেলিগেটবৃন্দ,
২০০১ সালে কারচুপির নির্বাচনে জনগণের ভোট কেড়ে নিয়ে বিএনপি-জামাত জোট রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। নির্বাচনের রাত থেকেই সারাদেশে শুরু হয় আওয়ামী লীগ ক্লিনজিং অপারেশন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
শুধুমাত্র নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে ভোলার চর অন্নদা প্রসাদ গ্রামে এক রাতে শতাধিক নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। গফরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীর ভিটাবাড়ি কেটে পুকুর বানানো হয়। বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বরিশাল, নড়াইল, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ সারাদেশে হত্যা, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, দখল, মামলা, হামলা ও নির্যাতন ছিল প্রতিদিনের চালচিত্র।
এই প্রতিকূল পরিবেশেও আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর একটি সফল সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আপনারা বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিকে নির্বাচিত করেন।
বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতাকে ব্যবহার করেছে দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ লালনের উদ্দেশ্যে। তাঁদের অপকর্মের কারণে বাংলাদেশ বারবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এমন কোন খাত নেই যেখানে তারা দুর্নীতি ও লুটপাট করেনি।
প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সার্ভিস কমিশন এমনকি সর্বোচ্চ আদালতেও বিএনপি-জামাত জোটের দলীয়করণের শিকার হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। সৎ, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। দলীয় আনুগত্যই ছিল নিয়োগ ও পদোন্নতির একমাত্র পূর্বশর্ত।
হাওয়া ভবনের সিন্ডিকেট লুটপাটের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য জনগণের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের সরকার যে চাল রেখে গিয়েছিল ১০ টাকা কেজি তা মানুষ ৪০ টাকা কেজি দরে খেতে বাধ্য হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই ছিল বিএনপি-জামাতের একমাত্র নীতি। সাবেক অর্থমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এস এ এম এস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ উদ্দিন, খুলনার আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইমামসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে। বগুড়ায় মসজিদে কোরআন তেলাওয়াতরত অবস্থায় কৃষকলীগ নেতা আজমকে হত্যা করেছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমতে আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও জীবন দিতে হয় আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মীকে। পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। তাদের অনেককেই সারাজীবন পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে চলতে হবে।
আজ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল খালেদা জিয়ার এক উপ-মন্ত্রী, যার এক ভাই জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জেহাদের নেতা। অতিসম্প্রতি এদেরই আরেক ভাইকে তার ছাত্র সংগঠনের সভাপতি করে বিএনপি নেত্রী প্রমাণ করেছেন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও জঙ্গিবাদের তিনিই প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক দল। জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা এ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমাদের বিশ্বাস ছিল, জনগণ যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের রায় প্রদান করতে পারে ।
তবে তারা বিএনপি-জামাত জোটের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দলীয়করণের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দেবে। সে কারণেই ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই ১৪ দলের পক্ষ থেকে আমি ৩১ দফা নির্বাচনী সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করি। আমার এই প্রস্তাব দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়। সমগ্র জাতি নির্বাচনী সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হয়।
কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট গণদাবীকে অগ্রাহ্য করে। কারণ, তারা জানতো, তাদের পাপের পাল্লা এতোটাই ভারী যে অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে কোন অবস্থাতেই জনগণ তাদের পক্ষে রায় দেবে না। তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না ।
সে কারণেই তারা জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। বিচারপতি আজিজের মতো আজ্ঞাবহ ব্যক্তি যিনি পরবর্তীতে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন তাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করা হয়।
ভোটার তালিকায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভুয়া ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। এই চক্রান্তের অংশ হিসেবে কোন সরকারি কর্মকর্তাদের বয়স না বাড়িয়ে শুধুমাত্র সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা।
জনগণ বিএনপির এই নীল নকশা মেনে নেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয়করণের বিরুদ্ধে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ভোটের অধিকারের দাবীতে সারাদেশব্যাপী শুরু হয় আন্দোলন। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে দমন করতে বিএনপি-জামাত আশ্রয় নেয় হত্যা, সন্ত্রাস ও দমননীতির। বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীরা ঢাকায় প্রকাশ্য।
রাজপথে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে। জামাতের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পুলিশের ছত্রছায়ায় আন্দোলনকারী জনতার উপর হামলা চালায়। প্রকাশ্যে নির্দেশ দেয়- “বৃষ্টির মত গুলি কর, মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী”। নিরস্ত্র জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। আন্দোলনের চাপে কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে।
এরপর শুরু হয় ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়। বিএনপি-জামাতের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদ সংবিধানের ৫৮(ক) ধারা অনুসরণ না করে নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়ে যান। বিএনপি-জামাতের নির্দেশে তিনি। কারচুপির নির্বাচন করার সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার এ ধরনের কর্মকা-ের প্রতিবাদে উপদেষ্টারা পদত্যাগ করেন।
এতো কিছুর পরেও আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেই, মনোনয়নপত্র দাখিল করি। কিন্তু সারাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট করা হয়। একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগ, মহাজোটসহ সকল দল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন বয়কট করে। জনগণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবীতে আরও বেশি আন্দোলনমুখর হয়ে উঠে।
একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন, নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল বাতিল করেন। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে, ভোটার লিস্ট এবং আইডি কার্ড করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হয় অভিযান। ছবিসহ
এরই ফাঁকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশে যাতে নির্বাচিত সরকার না আসে সে লক্ষ্যে মাইনাস টু ফর্মূলা কার্যকর করতে তৎপর হলো। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিযান পরিণত হলো রাজনীতির বিরুদ্ধে অভিযানে। বড় দুর্নীতিবাজরা রয়ে গেল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য দুর্নীতি করেনি এমন অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হলো
যারা ভোটে দাঁড়ালে জামানত হারাবে তাদের ক্ষমতায় আনার জন্য দল ভাঙ্গা-গড়ার খেলা শুরু হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থা সরকারি অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে রাজনৈতিক এতিমদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রকল্প হাতে নিল। দুর্নীতিবাজদের ধরার নামে কোন নিয়মনীতি না মেনে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ গ্রেফতার, হয়রানি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মত অনৈতিক কাজ শুরু হল।
এর বিরুদ্ধে কোন রাজনৈতিক নেতা বা তথাকথিত সুশীল সমাজের কেউই কথা বলার সাহস পায়নি। কিন্তু আমি এই অপকর্মের বিরুদ্ধে বলেছি। সে কারণেই সস্তান সম্ভবা কন্যাকে দেখতে বিদেশ যাওয়ার পর আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হল। আমি বললাম, আমি দেশে এসে আদালতেই এই মিথ্যা মামলার মোকাবেলা করব। তারা আমাকে
আসতে বাধা দিল। আমাদেরও কোন কোন নেতা টেলিফোন করে দেশে ফিরতে বারণ করল। মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা থাকার পরেও আমি দেশে আসার পদক্ষেপ নেই। একজন উপদেষ্টা আমাকে সরকারের পক্ষ থেকে ফোন করে অনুরোধ।
করলো যাতে ফিরে না আসি। তারা নাকি একটি বড় কাজ করতে যাচ্ছে। বড় কাজটি হল- বিএনপি নেত্রীকে দেশ। থেকে বের করে দেয়া। তিনি নাকি বিদেশ চলে যেতে রাজী হয়েছেন। আমাকে এ কথাও বলা হল, আমি এসেছি। জানলে তিনি বাইরে যেতে রাজী হবেন না।
আমার বক্তব্য ছিল- কেউ যদি অপরাধ করে দেশের মাটিতেই তার বিচার হবে। জোর করে কাউকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া আমি সমর্থন করি না। কাজেই আমি দেশে ফিরব।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত এয়ার লাইন্সকে জানিয়ে দেওয়া হল যাতে আমাকে নিয়ে ঢাকায় না আসে।
ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন এলাম। লন্ডন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে প্লেনে উঠতে দেওয়া হল না। আমি সেখানেই এর তীব্র প্রতিবাদ করলাম। প্রবাসী বাঙ্গালীরা আমাকে সমর্থন করল। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ১৫৬টি দেশের সংবাদপত্রে আমাকে না আসতে দেওয়ার খবর হেডলাইন হল । বাংলাদেশে আপনারা, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহ আমার দেশে ফেরার পক্ষে জনমত গঠন করলেন।
একপর্যায়ে সরকার আমাকে দেশে আসতে দিতে বাধ্য হল। যদিও হুমকি দেওয়া হল বিমানবন্দরে নামলে গ্রেফতার করা হবে, অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে, এমনকি হত্যা করা হবে। আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আমি মুসলমান। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া আমি আর কারো কাছে মাথানত করিনি। করবো না। তাই সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমি দেশে ফিরে এলাম ।
সরকার এবং গোয়েন্দা সংস্থা যখন দল ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় লিপ্ত তখন একমাত্র আমিই এর প্রতিবাদ করেছিলাম। সে কারণেই ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই বিনা ওয়ারেন্টে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। বাসা তল্লাশী করে সকল কাগজপত্র নিয়ে যায়। এমনকি ড. ওয়াজেদ মিয়াকেও লাঞ্ছিত করে। সেদিন থেকেই তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান।
আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়। নির্জন সাব-জেলে মাসের পর মাস বন্দী রাখা হয়। বিশেষ আদালতে অনেক মামলা চালু করলেও আমাকে আমার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
আজ এখানে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত কথা বলতে চাই না। শুধু এটুকুই বলতে চাই, আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য। করার জন্য অনেকের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছে। অনেকেই সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, আবার অনেকেই নির্যাতন ও হুমকির কাছে নতিস্বীকার করেছেন। যারা সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি ও নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকিকে উপেক্ষা করে দিনের পর দিন সাব-জেল ও আদালতের সামনে
উপস্থিত থেকে অনেকেই আমাকে মনোবল ও সাহস যুগিয়েছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের পক্ষ থেকে আমার মুক্তির দাবীতে যারা স্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করেছেন, যারা স্বাক্ষর দিয়েছেন তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
জরুরী অবস্থাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে ২৫ লক্ষ মানুষ আমার মুক্তির দাবীতে স্বাক্ষর করেন। একজন রাজনীতিবিদের জীবনের সবচাইতে বড় পাওয়া জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস। বন্দী অবস্থায় আমি দল-মত নির্বিশেষে বাঙ্গালী জাতির যে আস্থা ও বিশ্বাস পেয়েছি তার জন্য আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের প্রতি। তাদের ঐতিহাসিক সাহসী ভূমিকা এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণেই সেদিনের দল ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র আওয়ামী লীগের কোন ক্ষতি করতে পারেনি।
এ প্রসঙ্গে আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, ২০০৮ সালের ২৬ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার কথা। ষড়যন্ত্রকারীদের ভয়-ভীতি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সেদিন যেভাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তাতে বাঙ্গালী জাতি আবারো উপলব্ধি করতে পেরেছে, একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে।
আপনারা তাদের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন হারানো আস্থা ও আত্মবিশ্বাস। আপনাদের সেদিনের সেই ভূমিকাই বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে গেছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে। জনগণ ফিরে পেয়েছে তাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র। আপনাদের অনমনীয় ভূমিকার কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের যে কোন সংকটে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাই বারবার দলকে টিকিয়ে রেখেছে। সে কারণেই প্রতিষ্ঠার পরের দীর্ঘ ৬০ বছরে অনেক ভাঙ্গা-গড়া, আঘাতের পর আঘাতের পরেও গণমানুষের সংগঠন আওয়ামী লীগ তার সংগ্রামী অবস্থান ধরে রেখেছে।
প্রিয় কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা,
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষে, মহাজোটের পক্ষে, নৌকার পক্ষে বিপুল ম্যান্ডেট দেয়। জনগণের এই রায় আমাদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। পাশাপাশি এই বিপুল বিজয় মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে। এবার আমাদের পালা মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার।
২০২১ সাল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। ২০২০ সাল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে আমরা নির্বাচনী ইশতেহার ভিশন ২০২১ ঘোষণা করেছিলাম। স্বাধীনতার পর ৩৯ বছর চলছে। এখনও স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ পূরণ হয়নি।
আমরা চাই, একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। যেখানে প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল এবং সুন্দর জীবন পাবে।
২০২১ সালের মধ্যে আমরা এমন একটি উন্নত দেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে থাকবে না ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অশিক্ষার অন্ধকার। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এদেশের দুখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে সোনার বাংলা কায়েম করা। সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ আজ আমাদের সামনে। সেই লক্ষ্য নিয়েই দলের প্রতিটি কর্মীকে কাজ করে যেতে হবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ভোগে নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী। নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করা। আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের শাসক নয়, আমরা জনগণের সেবক। এই সেবার মনোভাব নিয়েই প্রতিটি নেতা-কর্মীর পথ চলতে হবে।
দলের কোন পর্যায়ে কোন নেতা-কর্মীর ব্যক্তিগত লোভ-লালসা বা অন্যায় আচরণের কারণে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হলে তা কোনভাবেই বরদাশত করা হবে না। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস সবচাইতে বড় সম্পদ । এই সম্পদ যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
মনে রাখবেন, অসৎ পথে অর্জিত অর্থ-সম্পদ কিছুকাল ভোগ করা যায়, কিন্তু, জনগণের ভালোবাসা পাওয়া যায়। না। আমাদের পূর্বে যে দল ক্ষমতায় ছিল, তারা মনে করতো লুটপাট করে হাজার হাজার কোটি টাকা অর্জন করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা যাবে, সুখ কেনা যাবে।
যে কারণে জনগণের কথা না ভেবে অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করেছিল। তা কি তাদের কাজে লেগেছে? কাজে লাগেনি। এখান থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিতে হবে।
আদর্শবান, চরিত্রবান এবং ত্যাগী নেতা-কর্মীরাই পারে জনগণের কল্যাণ করতে, দেশের উন্নতি করতে। প্রতিটি নেতা-কর্মীকে আদর্শবান ও চরিত্রবান হয়ে সংযম রেখে চলতে হবে, জনগণের সেবা করতে হবে। এর কোন ব্যত্যয় যেন না ঘটে।
অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে আমরা আজ যে অবস্থানে এসেছি, মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছি তা অটুট রাখতে হবে। প্রতিটি নেতা-কর্মীকে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করতে হবে যেন সরকারের প্রতিটি পয়সা জনগণের জন্য ব্যয় হয়
প্রিয় কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা,
জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে এই বছরের ৬ জানুয়ারি আপনাদের প্রিয় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেয়ার প্রথম প্রহর থেকেই আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
সরকার গঠনের পর থেকেই আমাদেরকে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার ৫১ দিনের মাথায় বিডিআর সদর দফতরে নৃশংস হত্যাকা- সংঘটিত হয়। ৫৮ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। আমি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
এই ঘটনাকে পুঁজি করে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। যখন বিরোধী দলের উচিত ছিলো সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া তখন তারা চেষ্টা করেছে দেশকে অস্থিতিশীল করতে। জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা এই রক্তক্ষয়ী সমস্যার সমাধান করেছি যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। আমরা যখন সরকার গঠন করি তখন দুনিয়াজুড়ে চলছে বিশ্বমন্দা। তারপরেও অর্থনীতির চাকাকে আমরা সচল রেখেছি।
সরকারের ছয় মাসে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ বেড়েছে। প্রতিশ্রুত সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪৩ মিলিয়ন।মার্কিন ডলার। অবমুক্ত হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১২.৮ শতাংশ। মে মাস পর্যন্ত রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিলো ৮.৮ বিলিয়ন ডলার যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২২.৫ শতাংশ বেশী। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। বিশ্বমন্দা মোকাবেলায় ৩৪.২৪ বিলিয়ন টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমির ফসল ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘আইলা’য় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ত্রাণ হিসেবে ২৭ হাজার ৯৫১ মে. টন খাদ্যশস্য, ১৩ কোটি ১৩ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা নগদ অর্থ সাহায্য, ২০ কোটি ২ লক্ষ ৯২ হাজার টাকা গৃহনির্মাণ বাবদ এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ১১৬ কোটি টাকা মঞ্জুরী দেয়া হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে আমি হারিয়েছি আমার দীর্ঘদিনের সুখদুখের সাথী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে। তারপরেও ব্যক্তিগত শোক ও দুঃখকে পাশে ফেলে জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি।
আমরা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিলাম- আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হবে দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের লুটপাটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জিনিসপত্রের দাম মানুষের আরও নাগালের বাইরে চলে যায়।
সরকার গঠনের পরপরই আমরা জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেই। খোলা বাজারে চাল বিক্রির পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য কমমূল্যে চাল বিক্রির ব্যবস্থা নেই। যে চালের দাম বিএনপি- জামাতের সময় ছিলো ৪০ টাকা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ৪৫ টাকা তা এখন ১৬ থেকে ১৭ টাকা।
জামাতের আমলের ৪৫ টাকার আটা মানুষ এখন ১৮ টাকায় কিনতে পারছে। যে কোন জিনিসের দাম ৭ বছরের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক কম। জুলাই ২০০৮-এ মূল্যস্ফীতি ছিলো ১০.৮ শতাংশ যা এপ্রিল ২০০৯-এ এসে কমে ৫.৪-এ দাঁড়িয়েছে। বিএনপি-পুলিশ, আনসার, ভিডিপি, সশস্ত্র বাহিনী, কারারক্ষী, ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, এনএসআই-এর রেশনে সমতা আনা হয়েছে।
এবারই গত ৭ বছরের মধ্যে প্রথম বাজেট ঘোষণার পর বাজারে কোন জিনিসের দাম বাড়েনি। ইনশাল্লাহ সামনের দিনগুলোতে জিনিসপত্রের দাম আরো কমবে। আগামী রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিসিবিকে সত্রিনা করা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য নন-ইউরিয়া সারের দাম অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। ডিজেল ও কীটনাশকের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে। বোরো মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি করার ফলে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে।
আমরা ২০১২ সালের মধ্যে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করতে চাই। সে কারণেই এবার কৃষিখাতে ৮ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কৃষকদের মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। কৃষক যাতে স্বল্প মূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক পায় সেজন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি মাছ, দুধ, মুরগী ও গবাদিপশু উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। “জাল যার জলা তার” নীতির ভিত্তিতে প্রকৃত মৎস্য চাষীদের মধ্যে খাস পুকুর ও জলাশয় ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি।
আমাদের লক্ষ্য- গরীব মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা। সে কারণে, ভিজিএফ কার্ডের সংখ্যা ২৫% বৃদ্ধি করে ৫৬ লক্ষ ৫৪ হাজারের স্থলে ৭০ লক্ষ ৬৭ হাজার ৫ শত করা হয়েছে। ৭ লক্ষ ৪৯ হাজার ৯৯৩ জন দরিদ্র মহিলাকে ভিজিডি কর্মসূচীর আওতায় আনা হয়েছে।
বয়স্কভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা ও অসহায় এতিম শিশুদের জন্য গ্রান্ট বাবদ ৭১১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সারাদেশে ৮১০২টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে ২৯৪৯ একর খাস জমি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
“একটি বাড়ি একটি খামার” কর্মসূচি আমরা আবার চালু করতে যাচ্ছি। প্রায় পৌনে ৬ লাখ পরিবার এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে। উপকারভোগীর সংখ্যা হবে ২৯ লাখ মানুষ।
ঘরে ফেরা, গৃহায়ন ও আশ্রয়ন প্রকল্প আমরা আবার চালু করতে যাচ্ছি। ৫ বছর মেয়াদী প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।আমরা শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তুলে গ্রামকে সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।
গ্রামের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। পল্লী অঞ্চলে তথ্য-প্রযুক্তির প্রসার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ, মহিলাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নসহ তাঁদের আয়বর্ধক কর্মকা-ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি।
ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, পুনঃনির্মাণের জন্য এলজিইডি’র অনুকূলে ৩ হাজার ৫৭৫ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ১৩ হাজার ৭০০ কিলোমিটার রাস্তা ও ৫৪ হাজারের বেশি ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ হবে।গ্রামের মানুষের পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার জন্য ৮ হাজার ৩২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে ১৪ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা সর্বোচ্চ। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিনামূল্যে মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যপুস্তক প্রদান করা হবে। বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ১ হাজার ৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। ৩৭০টি বিদ্যালয় পুনঃনির্মাণ করা হবে।
শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে নতুন শিক্ষানীতি চালু হবে। পর্যায়ক্রমে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হবে। ছাত্রীবৃত্তি অব্যাহত রাখা হবে। অচিরেই আমরা ছাত্র উপ-বৃত্তি চালু করবো। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সেশন জট কমানো হবে। আমরা মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন করবো।
উপজেলা স্তরে কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা করে আমরা একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে চাই। ২০১০ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ১০০ ভাগ ভর্তি নিশ্চিত করতে চাই। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে চাই। ইতোমধ্যেই শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করা হয়েছে। আমরা যোগ্যতা সাপেক্ষে কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রারম্ভিক বেতন ১০০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমাদের সরকার শিক্ষকদের জন্য একটি স্থায়ী বেতন কমিশন এবং পৃথক চাকুরি কমিশন গঠন করবে।সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আরো ২৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করা।
সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১৩ সালের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে এবং ২০২১ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে কম্পিউটার এবং কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। আমরা ২০১২ সালের মধ্যে ই-কমার্স এবং ২০১৪ সালের মধ্যে ই-গভর্নেন্স চালু করতে চাই।
প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এর আওতায় আনা হবে। আমরা ন্যাশনাল আইসিটি রোডম্যাপ করেছি। আগামী অর্থবছরের জন্য এ খাতে ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ করা হয়েছে।
আমরা চাই, সারাদেশে ইন্টারনেট সুবিধা ছড়িয়ে দিতে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সাইবার ক্যাফে ও কল সেন্টার স্থাপনের গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সরকার সফটওয়ার শিল্প স্থাপনে যে কোন পৃষ্ঠপোষকতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আমরা ২০২১ সালের মধ্যেই শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫২ থেকে ১৫-তে এবং মাতৃমৃত্যুর হার ২.৯ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশে কমিয়ে আনব। গড় আয়ু ৭০-এর কোঠায় উন্নীত হবে। গতবার সরকারে থাকতে আমরা প্রতি ৬ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছিলাম, তা আবারো চালুর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
সেখানে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার সুযোগ ও মান বৃদ্ধি করা হবে। ৬ হাজার নতুন ডাক্তার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।২০১৪ সাল নাগাদ আমরা প্রতিটি পরিবার কমপক্ষে একজন কর্মক্ষম যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।তাই, ইতোমধ্যে দেশের বেকার যুবক-যুব মহিলার তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি।
উচ্চ মাধ্যমিক বা এর সমপর্যায়ে শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন যুবক ও যুব মহিলাদের পেশাগত দক্ষতা সৃজনমূলক প্রশিক্ষণের জন্য ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ কর্মসূচির আওতায় পাইলট ভিত্তিতে কাজ শুরু হবে। পরবর্তীতে তা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত হবে।
পথশিশুদের কর্মক্ষম সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি পথশিশুদের আশ্রয় নিশ্চিত করতে বড় বড় শহরে ৬টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য গতিশীল শিল্পায়ন এবং বাণিজ্য নীতি থাকা প্রয়োজন। তাই, বিদ্যমান শিল্পনীতি পর্যালোচনা করে আমরা নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন করার উদ্যোগ নিয়েছি।
আমাদের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ আসে শিল্প খাত থেকে। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা তা ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য প্রচলিত আইন এবং নিয়ম-নীতি সহজ এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে উৎসাহিত করার জন্য ব্যাংক ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।
প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এসএমই সার্ভিস সেন্টার খোলার অনুমতি প্রদান করা হবে। মহিলা উদ্যোক্তাগণ এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল আগামী ২০১৩ সালে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ অর্জনের ব্যবস্থা করা।
এজন্য ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত স্বাভাবিক বিনিয়োগের অতিরিক্ত প্রায় ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন । সরকারের একার পক্ষে এই বিপুল পুঁজির যোগান সম্ভব নয়। তাই, বাজেটে সরকারি-বেসরকারি খাতের
অংশীদারিত্ব (পিপিপি) আওতায় ব্যক্তি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই খাতে মোট আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত হবে। সরকার গঠনের পরই আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছি। কর্ণফুলিতে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের কাজ বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন বিশিষ্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
ঢাকাসহ বাংলাদেশের সবক’টি মহানগরীর ক্রমবর্ধমান যানজট, পানি, পয়ঃনালা ও পরিবেশ সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে।
২০ বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। ৩ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলওয়ে সেক্টর ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ইতোমধ্যেই আমরা নদীগুলোতে নিয়মিত ড্রেজিং করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছি। ঢাকা এবং আশেপাশের
নদীগুলোকে দখলদারমুক্ত করা হচ্ছে। শিল্প-কারখানার জন্য বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অধিক হারে গাছ লাগানো এবং উপকূলীয় এলাকায় বনায়নের কর্মসূচি নিয়েছি। সুন্দরবন এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
আমাদের অন্যতম অঙ্গীকার, নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবার সর্বাধিক সংখ্যক নারীকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছে। আমাদের মন্ত্রিসভায় চারজন নারী। সংসদ উপনেতা ও হুইপ নারী।
অর্থনীতিতে জেন্ডার সমতা বিধানের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রবাসীদের কল্যাণে আমাদের সরকার ইতোমধ্যেই বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমি পবিত্র ওমরাহ পালন করার
সময় সৌদি বাদশাহর সাথে আলোচনা করে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্পন্সরশীপ পরিবর্তনের সুবিধা নিশ্চিত করেছি। এর ফলে ১৫ লক্ষ শ্রমিকের চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। নিউজিল্যান্ড, রোমানিয়া, চীন ও ইরাকসহ নতুন নতুন দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রবাসীদের ইমিগ্রেশন কার্যাবলি সহজ করার জন্য স্পেশাল কাউন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অচিরেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক স্থাপন করা হবে।মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে সন্নিবেশিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হালনাগাদ করে গেজেট আকারে প্রকাশের উদ্যোগ সরকার নিয়েছে। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের মুক্তিযোদ্ধাদের রেল, বাস ও লঞ্চে বিনামূল্যে চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাবদ বরাদ্দ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২৫ হাজারে বৃদ্ধি করা হবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমার সবার সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বের নীতিতে অগ্রসর হচ্ছি। ভারতের সাথে টিপাইমুখসহ সকল সমস্যা আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করার উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। আমরা চাই, সংঘাত ও হানাহানির রাজনীতির চিরঅবসান। আমরা চাই, সংসদকে সকল কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে।
দেশে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র কায়েম করতে। তাই, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন করেছি। অন্যান্য দল থেকে আমরা ৭ জন সংসদ সদস্যকে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিয়েছি যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো হয়নি। বিরোধী দলের আনুপাতিক হারের চাইতে সামনের সারিতে প্রায় দ্বিগুণ আসন দেয়া হয়েছে।
আমরা শুরু থেকেই চেয়েছি, বিরোধী দল সংসদে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করুক। কিন্তু আমাদের উদারতার কোন মূল্য তারা দেননি। দিনের পর দিন তারা সংসদ বর্জন করে যাচ্ছেন। জনগণের স্বার্থসংশিৱষ্ট কোন ইস্যুতে তারা সংসদ বর্জন করছেন না।
আজকের এই কাউন্সিল থেকে আমি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানাবো, সংসদে আসুন। দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুন। ভোটারদের ভোটের মর্যাদা দিন।
সংগ্রামী কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা,
আমরা জানি, জনগণ যে দায়িত্ব আমাদের ওপর দিয়েছে তা সুচারুভাবে পালন করা খুবই কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। বিগত প্রায় ৭ মাস সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি, আমাদের আন্তরিকতা।
ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সে প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। গত ৭ বছরের পুঞ্জিভূত জঞ্জাল পরিষ্কার করে আমরা দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে চাই। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, এই দায়িত্ব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মীর। মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। সেই লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
১৯৭০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। বিনিময়ে আওয়ামী লীগ জাতিকে দিয়েছিল স্বাধীনতা, একটি জাতিরাষ্ট্র। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ২১ বছর দেশে গণতন্ত্র ছিল না, মানুষের অধিকার ছিল না।
১৯৯৬ সালে জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, বিনিময়ে আওয়ামী লীগ জাতিকে উপহার দেয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মানুষ আবারও আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে। আসুন, জনগণের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করি। জাতিকে উপহার দেই প্রত্যাশিত ডিজিটাল বাংলাদেশ, আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র, বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা।
অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এতো অল্প সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল করা সম্ভব হবে না। কিন্তু, আপনারা আবারো প্রমাণ করেছেন, আওয়ামী লীগ চাইলে যেকোন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। স্বল্পতম সময়ে যারা দিনরাত পরিশ্রম করে এই কাউন্সিলের আয়োজন করেছেন আমাদের সেসব নেতা-কর্মীকে
জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ ।

প্রিয় কাউন্সিলর ও ডেলিগেটবৃন্দ,
‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে আমার বাবা-মা, তিন ভাইসহ পরিবারের সকল সদস্যকে। বেঁচে আছি শুধু আমরা দুই বোন। আওয়ামী লীগ আমার পরিবার, আপনারাই আমার স্বজন। ধন-সম্পদ, পদ বা পদবী নয়, আপনাদের দোয়া এবং ভালোবাসাই আমার জীবনের একমাত্র সম্বল। আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসা নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
খোদা হাফেজ
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু । বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
