আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃকুষ্টিয়া,যশোর,খুলনা সেক্টর। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
কুষ্টিয়া,যশোর,খুলনা সেক্টর

কুষ্টিয়া,যশোর,খুলনা সেক্টর
মেজর জেনারেল এমএইচ আনসারী ছিলেন ঢাকায় আমার লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার সাহসিকতার জন্য আমি তাকে পদোন্নতি দিই। তিনি ৯ম ডিভিশনের কমান্ড গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল।
শওকত রিজার কাছ থেকে। আনসারীর ডিভিশনে দুটি ব্রিগেড ছিল এবং তিনি যশোরে ৯ম ডিভিশনের সদরদপ্তর স্থাপন করেন। লড়াই শুরু হলে তিনি ফরিদপুর এগিয়ে যান এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী লড়াই করেন। অধীনস্থ ফরমেশনের সাথে কখনো কখনো তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। এ সময়ে আমি তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতাম।
৯ম ডিভিশন ছিল কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-যশোর ও খুলনা প্রতিরক্ষা লাইন রক্ষার দায়িত্বে। শত্রুদেরকে ঢাকা পৌঁছতে বাধা দিতে এ ডিভিশনের সৈন্যদের ফরিদপুরও এগিয়ে আসতে হয়। ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর আহমেদের নেতৃত্বাধীন ৫৭তম ব্রিগেড ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া রক্ষার জন্য দায়ী ছিল।
ব্রিগেডিয়ার হায়াত এসজে’র নেতৃত্বাধীন ১০৭তম ব্রিগেডকে বায়রা-যশোর রক্ষায় মোতায়েন করা হয়। শত্রুর ক্ষতিসাধন ও তাদের অগ্রযাত্রায় বিলম্ব ঘটিয়ে এ ব্রিগেডকে মাগুরা- ফরিদপুরে পিছু হটে আসতে হয়। এক ব্যাটালিয়নকে সাতক্ষীরা-খুলনা এলাকা ব্রহ্মায় রেখে আসা হয়। খুলনায় আমার সিএএফ’র একটি এডহক ব্রিগেড ছিল যেটাকে পরে আমি ঢাকায় স্থানান্তর করি।
৯ম ডিভিশনের বিপরীতে ছিল ভারতের হয় কোর, ঢাকা দখল করার জন্য এটা গঠন করা হয়। লেফটেন্যান্ট জেনারেল রায়নার নেতৃত্বাধীন এ কোরে ছিল। ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশন, ৯ম পদাতিক ডিভিশন, ৫০ (১)তম প্যারা ব্রিগেড গ্রুপ, দুটি ট্যাংক রেজিমেন্ট ও ৫ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ।
ঢাকা অভিযানের জন্য এ কোরকে বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়। ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনকে করিমপুর- হার্ডিঞ্জ ব্রিজ মেরুতে দ্বিমুখী এবং ঝিনাইদহ দখলের জন্য মেহেরপুর-কুষ্টিয়া মেরুতে দ্বিতীয় হামলা চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর যখন যুদ্ধ শুরু হলো, বায়রা আক্রমণ করলো ভারতীয়রা, কিন্তু এ জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হয় তাদেরকে। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী বায়রা পরিত্যাগ করা হলো। সৈন্যদেরকে আফ্রা-চৌগাছায় পরবর্তী প্রতিরক্ষা লাইনে প্রত্যাহার করা হয়। ২রা ডিসেম্বর দর্শনার পতন ঘটে। ৩৫০তম ইন্ডিয়ান ব্রিগেডের একটি অগ্রবর্তী হামলা প্রতিহত করা হয়। ভারতীয়দের ক্ষয়ক্ষতি হয় অনেক। তারা বেশ কিছু ট্যাংকও হারায়। এ এলাকায় গৌরিপুর গ্রামে প্রথম আকাশ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
১০৭তম পাকিস্তানি ব্রিগেডকে মোতায়েন করা হয় যশোর এলাকায়। ব্রিগেডিয়ার হায়াত, এসজে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য আমার অনুমতি প্রার্থনা করেন। আমি তাকে পরিস্থিতি যাচাই করতে বললাম এবং আরো বললাম যে, সৈন্য প্রত্যাহার সর্বোত্তম বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হলে তিনি তাও করতে পারেন। কারণ, তিনি শত্রুদের বাধা দেওয়ার অবস্থানেই দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং এ অবস্থান এক পর্যায়ে ছেড়েই দিতে হতো। তিনি খুলনার দিকে সৈন্য প্রত্যাহারের পরামর্শ দেন।
কিছু বিবেচনার পর আমি তাকে সৈন্য প্রত্যাহারের অনুমতি দিই। আমি ভেবে দেখি যে, এ উদ্যোগ জেনারেল রায়নাকে যশোর এলাকায় সৈন্য পাঠাতে উৎসাহিত করবে এবং এভাবে শত্রুর বিরাট সংখ্যক সৈন্যকে এখানে ব্যস্ত রাখা যাবে যাতে তারা পশ্চিম রণাঙ্গনে ছুটে যেতে না পারে। ৫ই ডিসেম্বর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রেরিত সংকেত অনুসারেই পরিকল্পনায় এ পরিবর্তন আনা হয়।
আমি আরো দেখতে পেলাম যে, হায়াত ভারতীয়দের পশ্চাৎভাগ এবং এলওসি’র প্রতি একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারেন। আমাদের এ প্ররোচিত উদ্যোগে ভারতীয় কোরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে এবং এর ডিভিশনগুলো বিচ্ছিন্ন লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। এতে ফরিদপুর ও ঢাকার প্রতি রায়নার হুমকি কমবে।
হায়াতকে বলা হলো, একসাথে সৈন্য প্রত্যাহার না করে পর্যায়ক্রমে সৈন্য প্রত্যাহার করতে, শত্রুকে ব্যস্ত রাখতে, তাদের ক্ষতি করতে এবং অধিকাংশ সৈন্যকে প্ররোচিত করতে । তিনি এ কাজ অত্যন্ত চমৎকারভাবে সম্পন্ন করেন।
প্রত্যাশা অনুযায়ী রায়নার নেতৃত্বাধীন ২য় কোরের অধিকাংশ সেনা হায়াতকে খুলনার পথে অনুসরণ করে। হিলি থেকে ব্রিগেডিয়ার তাজামুলের বগুড়া পশ্চাদপসরণ, ময়মনসিংহ থেকে ব্রিগেডিয়ার কাদিরের ঢাকা, সলিমুল্লাহর সিলেট, সানউল্লাহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ভৈরব বাজারে প্রত্যাহারের মতো হায়াতের খুলনায় প্রত্যাহারের ঘটনা সামরিক ইতিহাসে একটি শিক্ষার বিষয় হয়ে থাকবে।
তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ১০৭তম ব্রিগেডকে প্রত্যাহার করেন। শত্রুদের বিমান হামলা, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং প্রতি পদে মুক্তিবাহিনীর বাধা সত্ত্বেও তিনি এ প্রত্যাহার কার্য সম্পন্ন করেন। তিনি শত্রুদের অগ্রায্যত্রায় বাধা দেওয়ার অবস্থানগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যবহার করেন। তিনি প্রত্যাহারকালে তার ওপর শত্রুকে হামলা চালানোর সুযোগ দেন নি।
তিনি তার কৌশলগত বুদ্ধি ও সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে রায়নার কোরকে প্রলোভন দেখান এবং হ্যামিলনের বংশী বাদকের পেছনে যেভাবে শিশুরা দৌড়াচ্ছিল সেভাবে ভারতীয় সেনারা তার পিছনে ছোটে। হায়াত চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হন খুলনা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে দৌলতপুরে শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্য। এখানকার একদিকে ছিল বিশাল জলাভূমি এবং আরেকদিকে ছিল ভৈরব নদী।
তিনি এলাকার ভৌগোলিক সুবিধা গ্রহণ করেন। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোকে সর্বোত্তম সুবিধা হিসেবে ব্যবহার। করা হয়। এ পর্যায়ে মেজর জেনারেল দলবীর সিং ২য় কোরের আর্টিলারি ও বিমান বাহিনীর সহায়তা নিয়ে দৌলতপুর দখলের জন্য তার ডিভিশন নিয়ে। অগ্রসর হন। ১৫ই ডিসেম্বর এ হামলা চালানো হয়, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। গোটা ডিভিশনকে থামিয়ে দেওয়া হয়। শত্রুর সাঁজোয়া বাহিনী হায়াতের সুসমন্বিত ও
নির্ভুল গোলাবর্ষনের মুখে এগিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়। হায়াতের তৎপরতা ছিল অসাধারণ। একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে তিনি এক শক্তিশালী শত্রু বাহিনীর সাথে লড়াই করেন। তিনি ‘টি-৫৫’ ও ‘পিটি-৭৫’ ট্যাংক নিয়ে গঠিত শত্রুর সাঁজোয়া বহরকে স্তব্ধ করে দেন এবং পাল্টা হামলা চালিয়ে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করে দেন। হায়াত ছিলেন একজন সাহসী কমান্ডার।
১৯৬৫-এর যুদ্ধে তিনি আমার কমান্ডে কাজ করেছেন শিয়ালকোট সেক্টরে এবং একটি এফএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডে চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। এ জন্য তাকে এসজে পুরস্কার দেওয়া হয়।ভারতীয় নৌবাহিনীর দুটি বোট চালনা সমুদ্র বন্দরে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু এদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানের সমুদ্র বন্দর থেকে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখে।
এটি কোনো গুরুত্ব হয় না। তবে এখানে শত্রুর অগ্রাভিযানে গভর্নরের ওপর পারু চুয়াডাঙ্গার দিকে অগ্রসর হয় ৬ই ডিসেম্বর। যদিও কৌশলগতভাবে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কারণ, চুয়াডাঙ্গা ছিল তার নিজ শহর।।
বিদ্রোহীরা স্থানীয় লোকজনের ওপর নৃশংসতা চালায় এবং অনেকে নিহত হয়। আমরা ৬ই ডিসেম্বর যশোর ত্যাগ করি। ৭ই ডিসেম্বর শত্রু এ শহর দখল করে। নিলে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। বেপরোয়া গভর্নর মালিক তখন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে থাকেন।
আমি তাকে ব্রিফিং-এর জন্য ইস্টার্ন কমান্ডে আমন্ত্রণ জানাই। আমি তাকে জানাই যে, আরো কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। আমরা পশ্চিমে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও খুলনায় পিছু হটে আসবো।
তার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পরিবর্তে তার মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন। গভর্নর বেসামরিক লোকজনের নিরাপত্তা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি প্রাণহানি এবং নিরীহ লোকজনের হত্যাকাণ্ডে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন।
মাগুরার পর ৬২তম ভারতীয় ব্রিগেড মধুমতির দিকে এগিয়ে আসে। এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল মধুমতিকে পদানত করে ফরিদপুর দখল করা। অন্যদিকে, শত্রু বাহিনীকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করা ছিল আমাদের অভিযানের লক্ষ্য আমাদের সৈন্যরা কুষ্টিয়ায় ভারতীয় বাহিনীকে উত্তর দিকে ঘুরে যেতে প্ররোচিত করে। ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। কুষ্টিয়ায় আমাদের সৈন্যরা ঝিনাইদহে ভারতীয়দের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
কুষ্টিয়ায় ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুরকে রাস্তা কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি অগ্রসর হওয়ার আগেই শত্রুরা তার দিকে ধাবিত হয়। জেনারেল বারার ৭ম মাউন্টেন ব্রিগেডকে কুষ্টিয়ায় হামলা চালানোর নির্দেশ দেন।
ভারতীয় সৈন্যরা কুষ্টিয়ায় এগিয়ে যাবার পথে একটি বৃত্তাংশে আটকা পড়ে যায়। এতে আমরা সংগঠিত হওয়ার জন্য অনেক সময় পাই। এ সময় আমরা ফরিদপুর ও গোয়ালন্দে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ পুনর্বিন্যাস করে ফেলি। ভারতীয় সৈন্যদের কুষ্টিয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। তারা সেখানে আটকা পড়ে এবং ফরিদপুর ও ঢাকার প্রতি হুমকি কমে যায়।
কুষ্টিয়ায় আমাদের ৫৭তম ব্রিগেডের সৈন্যরা ভারতীয়দেরকে সুরক্ষিত এলাকায় এগিয়ে আসতে দেয়। এ সময় আমাদের আর্টিলারি, অটোমেটিক ও রিকয়েললেস গান একযোগে গর্জে ওঠে। এক স্কোয়াড্রন ভারতীয় ট্যাংকের মধ্যে মাত্র একটি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাদ-বাকিগুলো হয় ধ্বংস নয়তো আটক হয় । ভারতের অগ্রবর্তী ব্যাটালিয়নের বিপুল ক্ষতি হয় ।
আমাদের সৈন্যদের তীব্র প্রতিরোধ এবং ভয়াবহ গোলাবর্ষণে ভারতীয় সৈন্যদের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ভারতীয়রা আক্ষরিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পেছনে ও রিজার্ভে যেসব সৈন্য ছিল তারাও একইভাবে পালিয়ে যায়। ভারতীয় কোর কমান্ডার ঝিনাইদহ থেকে কুষ্টিয়ায় আরেকটি ব্রিগেড নিয়ে আসেন। ৪১তম ব্রিগেডও এগিয়ে আসে। মধুমতিতে থেকে যায় কেবল একটি ব্যাটালিয়ন।
এভাবে ১০ই ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা ডিভিশনকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসা হয়। ৫৭তম ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুরকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম এবং অধিকাংশ সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে ১৬তম ডিভিশনের এলাকায় চলে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়।
এ সেতু তখন ১৬তম ডিভিশনের আওতায় ছিল। মঞ্জুর ভার অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে প্রাথমিকভাবে সৈন্য প্রত্যাহার করলে একটি রাইফেল কোম্পানিসহ তার সদরদপ্তর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি ঝিনাইদহ পৌঁছে। অন্যদিকে, মঞ্জুর তার ব্রিগেডের বাদ-বাকি সৈন্য ও টেকনিক্যাল সদর দপ্তর নিয়ে কুষ্টিয়ায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
তিনি তার সৈন্য নিয়ে ১৬তম ডিভিশনের এলাকায় পৌছলে মেজর জেনারেল আনসারী ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুরের অবশিষ্ট সেনা (ব্রিগেড সদরদপ্তর ও একটি রাইফেল কোম্পানি) এবং ঢাকা থেকে আসা দুটি নতুন ব্যাটালিয়ন নিয়ে একটি এডহক ব্রিগেড গঠন করেন।
তিনি তার কর্নেল স্টাফ কর্নেল কে. কে. আফ্রিদীর কাছে এ ব্রিগেডের কমান্ড ন্যস্ত করেন। আফ্রিদীকে ফরিদপুর থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত যোগাযোগ পথগুলো রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আনসারী নিজে ফরিদপুর দুর্গ রক্ষায় নিয়োজিত সৈন্য গোয়ালন্দ ঘাঁটির কমান্ড গ্রহণ করেন। কর্নেল আফ্রিদী চমৎকারভাবে লড়াই করেন। শত্রু কখনো ফরিদপুর পৌঁছতে পারে নি। ফলে তাদের ঢাকা অভিমুখী অগ্রযাত্রা বার বার ব্যর্থ হয়েছে।
৭ই ডিসেম্বরের মধ্যে যশোর ও ঝিনাইদহের পতন ঘটায় জেনারেল রায়না ঢাকা অভিমুখে দ্রুত অভিযানের অবস্থায় পৌঁছে যান। তিনি তার দুটি ব্রিগেড নিয়ে কুষ্টিয়া ও খুলনায় আনসারীর দুটি ব্রিগেডের অবশিষ্টাংশকে মোকাবেলা করার এবং তার কোরের অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে ফরিদপুর ও গোয়ালন্দ ঘাটে এগিয়ে যাবার অবস্থায় উন্নীত হন।
কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম যে, তিনি তার একটি ডিভিশনকে কুষ্টিয়ায় যুদ্ধে জড়িত করে ফেলেন এবং তার দ্বিতীয় ডিভিশনও খুলনার পথে রাস্তায় আটকা পড়ে। এভাবে ঢাকা পৌঁছার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যায়।
ভারতীয় লেখকের এ অভিমত থেকে সকল ক্ষেত্রে বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা স্পষ্ট ধরা পড়ে। তাদের প্রতি স্থানীয় জনগণের বিশাল সমর্থন ছিল। স্থানীয় জনগণ নাশকতামূলক তৎপরতা চালিয়েছে, ভারতীয়দের সর্বতোভাবে সহায়তা এবং তাদের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।
ঢাকা দখল তো দূরের কথা, সকল ভারতীয় কোর তাদের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু দখলেও ব্যর্থ হয়। ভারতীয় কমান্ডারদের প্রতিটি উদ্যোগ বার্থ করে দেওয়া হয়। কৃতসংকল্প পাকিস্তানি কমান্ডাররা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতীয় জেনারেলদের হার মানিয়েছে।
নদ-নদীর প্রতিবন্ধকতার সাহায্যে আমি ঢাকা রক্ষা করছিলাম। আমরা সফল হয়েছিলাম শত্রুকে কোণঠাসা করে রাখতে। ভারতীয় সেনা ফরমেশনগুলোকে ঢাকা থেকে দূরে এবং একটি থেকে আরেকটিকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়।
তারা তাদের নিজ নিজ সেক্টরে আবদ্ধ ছিল। আমরা তাদেরকে পুরোপুরি নিশ্চল করে রেখেছিলাম যাতে তারা পশ্চিম রণাঙ্গনে সৈন্য প্রত্যাহার করতে না পারে। শুধু তাই নয়, আমরা তাদেরকে এক সেক্টর থেকে অন্য সেক্টরে সৈন্য স্থানান্তর করতেও দিইনি
পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষায় আমাদেরকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া না হলে আমরা এক উল্লেখযোগ্য সময় লড়াই করতে পারতাম। আমরা শত্রুকে প্ররোচিত করে আমাদের দুর্গের কাছে নিয়ে আসি এবং আমাদের পছন্দসই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের সাথে লড়াই করি। এ সময় আমরা ছিলাম সুরক্ষিত বাংকারে।
অন্যদিকে, শত্রু ছিল উন্মুক্ত জায়গায়। ভারতীয়দেরকে বিস্তৃত এলওসি বজায় রাখতে হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের এরূপ করতে হয় নি অথবা করলেও তা ছিল খুবই সীমিত। ভারতীয়দেরকে সরবরাহ লাইন পাহারা দিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র, গোলা-বারুদ ও খাদ্য ছিল বহুদূরে আমাদের দুর্গে।
ভারতীয় দ্বিতীয় কোর কমান্ডার জেনারেল রায়নাকে ‘ইন্ডিয়ান আর্মি আফটার ইন্ডিপেন্ডেন্স’ বইয়ের লেখক যে পরামর্শ দিয়েছেন তা খুবই মজার। তিনি বলেছেন যে, রায়নার উচিত ছিল তার দুটি ব্রিগেড নিয়ে দৌলতপুর (খুলনা) ও কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানি দুটি ব্রিগেডকে মোকাবেলা করা এবং তার বাদবাকি সৈন্য নিয়ে স্বয়ং ঢাকার দিকে যাত্রা করা।
লেখকের এ মতামতে খানিক ভুল রয়েছে। তিনি যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত ও বাস্তবতার আলোকে এই কথা বলেন নি। তিনি আমাদের সৈন্যদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের নিম্নমানের তৎপরতাকে এড়িয়ে গেছেন। দুটি পাকিস্তানি ব্রিগেডকে কোনো অবস্থাতেই দুটি ভারতীয় ব্রিগেড মোকাবেলা করতে পারতো না। দুটি ভারতীয় ব্রিগেড এগিয়ে এলে রায়নার (এলওসি) অবরুদ্ধ হয়ে যেত।
ফলে তাকে এলওসি রক্ষার জন্য সৈন্য পাঠাতে হতো। এতে তার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা হ্রাস পেত। জেনারেল আনসারীর ব্যক্তিগত কমান্ডের আওতায় ফরিদপুর ও গোয়ালন্দ অত্যন্ত চমৎকারে ধরে রাখা হয়েছিল। এসব দুর্গ অভিমুখী সড়কগুলো রক্ষা করছিল কর্নেল কে. কে. আফ্রিদীর নেতৃত্বাধীন এডহক ব্রিগেড।

আফ্রিদীর ব্রিগেডই মধুমতি নদী রক্ষা করছিল। কিন্তু ভারতীয়রা তখনো এ নদী অতিক্রম করতে পারে নি। তার সৈন্যদেরকে ফরিদপুর ও গোয়ালন্দে পিছু হটে আসতে হয়। এতে এসব দুর্গের শক্তি ও প্রতিরক্ষা সামর্থ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এ পরিস্থিতিতে জেনারেল রায়নার পক্ষে ফরিদপুরে এগিয়ে আসা সম্ভব ছিল না কোনোভাবে।
