স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম নিয়ে আজকে আমরা আলোচনা করব

জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রায় ৯ বছর বাংলাদেশ শাসন করেন। জিয়ার উত্তরসূরি এরশাদের সামরিক/স্বৈরশাসন কার্যত পঁচাত্তর-পরবর্তী শাসনামলেরই ধারাবাহিকতা। রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগতভাবে জিয়ার সঙ্গে এরশাদের কোনো মৌলিক পার্থক্য ছিল না। এরশাদের শাসনামল অগণিত রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত জাতীয় জীবনের আরেকটি কালো অধ্যায়।

অন্যদিকে এই কালপর্বটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাপকতম ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জন্যও বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে । এই কালপর্বটি ছিল শেখ হাসিনার জাতীয় রাজনীতির মূলধারার নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সময়। বাস্তব আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এবং তার সাহস, দৃঢ়তা ও যোগ্যতা প্রমাণ এবং জনগণের আস্থা অর্জনেরও সময় ছিল এটি।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম 

অতীতের সামরিক শাসকদের মতো গৎ বাধা পথে এরশাদও প্রথমে সংবিধান স্থগিত এবং রাজনৈতিক কর্মকার নিষিদ্ধ করে। সামরিক আদালত গঠন করে দুর্নীতির বিচারের নামে জনগণের সমর্থন ও সহানুভূতি লাভের কৌশল নেওয়া হয় । একইভাবে শিক্ষানীতি, ভূমি সংস্কার, শিল্পনীতি প্রভৃতি গ্রহণ করে বহুবিধ সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে হাত দেন তিনি।

জিয়ার ১৯-দফার মতো এরশাদও ১৯৮৩ সালের ১৭ মার্চ একটি ১৮-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কিন্তু এক বছর না পেরুতেই গণপ্রতিরোধের মুখে পড়েন জেনারেল এরশাদ। ১৯৮২ সালেই শিক্ষানীতি নিয়ে ছাত্রসমাজের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ধূমায়িত হয়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালের শুরুতেই এরশাদ নিয়োজিত ড. মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করে। গড়ে ওঠে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৮৩ সালের ৯ জানুয়ারি সামরিক কর্তৃপক্ষ সামরিক আইন ভঙ্গ করে ছাত্রসমাজের সভা-সমাবেশ মিছিলের কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে। কিন্তু ছাত্রসমাজ তা উপেক্ষা করে মজিদ খানের শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিল ও সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়।

১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারি কুখ্যাত রাজাকার আবদুল মান্নান আহত ‘জমিয়াতুল মোদাররেসিন’ নামক মাদ্রাসা শিক্ষকদের এক সমাবেশে জেনারেল এরশাদ ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও শহীদ মিনার সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ কটূক্তি করেন। তার এই কটূক্তি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত স্বরূপ ছিল। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ১২ জানুয়ারি মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের বাসভবনে আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দ মিলিত হন। রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ, সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণের ব্যাপারে একমত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জানুয়ারি ১৫টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গড়ে ওঠে ১৫ দলীয় ঐক্য জোট।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

১৫ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলো হলো-

১. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২. বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ৩. ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (চৌধুরী হারুণ-পংকজ ভট্টাচার্য) ৪. সাম্যবাদী দল (তোয়াহা) ৫. আওয়ামী লীগ (দেওয়ানা ফরিদ গাজী) ৬. ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (মোজাফফর) ৭. আওয়ামী লীগ (মিজানুর রহমান চৌধুরী) ৮. একতা পার্টি ৯. শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল ১০. সাম্যবাদী দল ( নগেন সরকার) ১১. জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জোসন ১২. ওয়ার্কার্স পার্টি ১৩. গণআজাদী লীগ ১৪. বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ ১৫. মজদুর পার্টি।

বিএনপিও এ সময় তাদের সমমনা দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের চেষ্টা করে। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে বিএনপির নেতৃত্বে সাতদলীয় জোট আত্মপ্রকাশ করে। সাত দলের শরিক ছিল- ১. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি ২. ইউপিপি ৩. কমিউনিস্ট লীগ ৪. জাতীয় লীগ (আতাউর রহমান খান) ৫. কৃষক-শ্রমিক পার্টি (নান্না মিয়া ৬. ন্যাপ (ভাসানী) এবং ৭. গণতান্ত্রিক পার্টি।

সাত দলের মূল দাবি ছিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বহাল রাখা, মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল ও সামরিক আইন প্রত্যাহার।

১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসমাজ মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে মৌন মিছিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করে। এরশাদ সরকার শিক্ষা ভবনের সামনে মিছিলে বাধা দেয় এবং শান্তিপ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। ঐদিন এবং পরের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, মোজাম্মে ও দীপালি সাহা প্রমুখ পাঁচ ছাত্র নিহত হয়। ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। বহু সংখ্যক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে। এ এক ঘোষণা ও সমবেদনা ছানাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ১৫ দলের নেতৃবৃন্দ দ্বার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যান । ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়।

ছাত্রসমাজের এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা ও করণীয় নির্ধারণের জন্য নেতৃবৃন্দ ড. কামাল হোসেনের বানভ মিলিত হন ।

১৫ ফেব্রুয়ারি বৈঠকরত অবস্থায় সেনাবাহিনী কামাল হোসেনের বাসভবন ঘেরাও করে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা, আবদুস সামাদ আজাদ, আবদুল মান্নান, ড. কামাল হোসেন, আমির হোসেন আনু, তোফাে আহমেদ, আবদুল জলিল, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমেদ, মো. রহমত আলী, ডা এসএ মালেক, গোলম আকবর চৌধুরী, সাহারা খাতুন, অধ্যাপক মানিক গোমেজ, সিপিবি-র মোহাম্মদ ফরহাদ, মন্জুরুল আহসান খা একতা পার্টির সৈয়দ আলতাফ হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়ুয়া বাসদের খালেকুজ্জামান প্রমুখ ১৫ দলের নেতাদের গ্রেফতার করে।

সেনা সদস্যরা নেতৃবৃন্দকে চোখ বেঁ ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। ওইদিন সন্ধ্যা থেকে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়। ছয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

সারাদেশে সৃষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই ঐক্যবদ্ধভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালিত হয়। ১৫ দলের উদ্যোগে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিটি সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। জনমতের চাপে অবশেষে মার্চ ১৯৮৩ শেখ হাসিনাসহ গ্রেফতারকৃত ২৭ নেতা মুক্তি লাভ করেন।

১২ মার্চ জেনারেল এরশাদ ১৯৮৪ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও সামরিক শাসন তুলে নেওয়ার ঘোষ দেন। ১ এপ্রিল থেকে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেওয়া হয়। ২৬ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধের সমাবেশে সামরি শাসন প্রত্যাহার, অবাধ সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সার্বভৌম পার্লামেন্ট গঠন এবং ‘৭২-এর সংবিধ পুনঃপ্রত্যাবর্তনের দাবি সংবলিত ১১-দফা দাবি ঘোষণা করে ১৫ দল।

রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রেণী ও পেশার আন্দোলনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। গড়ে ওঠে ১১টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম ‘শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’ এবং ১৭টি কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠনের জোট।

একদিকে যখন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছিল, তখন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও বিভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলছিল। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উপদলীয় তৎপরতা দলটিকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দেয়। আবদুর রাজ্জাকের প্রেরণার প্রথমে ১৯৮২ সালের ১ মে ছাত্রলীগের একটি অংশ আলাদাভাবে সম্মেলন অনুষ্ঠান করে এবং স্বতন্ত্র ছাত্রলীগ (ফজলু-চুন্নু) গঠন করে। পরে এই ছাত্রলীগ বাকশালপন্থি ছাত্রলীগ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

আওয়ামী লীগে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং অব্যাহত উপদলীয় কর্মকারের প্রেক্ষিতে ১৯৮৩ সালের ৩ আগস্ট ৬ জনের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও নোটিস দেওয়া হয়। দলের ভাঙনরোধে ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আবদুর রাজ্জাক ও মহিউদ্দিন আহমদসহ ৬ নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। তারা দল থেকে বহিষ্কৃত হন।

১৯৮৩ সালের ২২ অক্টোবর মহিউদ্দিন আহমদকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করে ‘বাকশাল’ নামে বহিষ্কৃত ও আওয়ামী লীগের দলত্যাগীরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ছাত্রলীগের মতো কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগেও বাকশালপন্থিরা ভাঙন সৃষ্টি করে আলাদা আলাদা সংগঠন দাঁড় করায়।

আওয়ামী লীগে এই ভাঙন সাময়িকভাবে হলেও দলকে দুর্বল করে। কিন্তু প্রথম দিকে যারা বিভ্রান্ত হয়ে বাকশালে যোগদান করেছিলেন, অচিরেই তাদের ভুল ভাঙতে শুরু করে। ১৯৮৪ সালের মধ্যে অনেকেই আবার আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন।

বাকশাল গঠন বা আওয়ামী লীগে ভাঙন ধরানোর মূলে কোনো আদর্শগত বিরোধ ছিল না। কার্যত এটি ছিল কতিপয় নেতার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে অস্বীকার করে দলের মধ্যে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। ফলে এই দল বেশি দিন টিকেনি। ১৯৯১-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই দলটি বিপর্যয়ের কবলে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ৩০ জুলাই বাকশাল বিলুপ্ত করে দলত্যাগীরা আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন।

১৯৮৩ সালের ১৪ নভেম্বর দেশে প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। ফলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সুযোগ কিছুটা সম্প্রসারিত হয় জেনারেল এরশাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তালবাহানা শুরু করেন।

নিজের ক্ষমতা ও শাসনকে প্রলম্বিত করার লক্ষ্যে প্রায় হুবহু জিয়াউর রহমানের কারনায় এরশাদ সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন দলের সুবিধাবাদী দলছুট ব্যক্তি, সাবেক সামরিক-অসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী এবং দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিদের জুটিয়ে প্রথমে এরশাদের ১৮-দফা বাস্তবায়ন পরিষদ এবং পরে ১৯৮৩ সালের ২৭ নভেম্বর ‘জনদল’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

১৯৮৪ সালের ২৩ মার্চ ‘জনদল’ ও ‘১৮-দফা বাস্তবায়ন পরিষদ’ একীভূত হয়। ১৯৮৪ সালের ৯ জুলাই আওয়ামী লীগের কোরবান আলী, ৩০ জুলাই বিএনপির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ইউপিপির ক্যাপটেন আবদুল হালিম চৌধুরী, কাজী জাফর আহমেদ সরকারবিরোধী অবস্থান ত্যাগ করে এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন।

১৯৮৫ সালের ৫ আগস্ট বিএনপির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এরশাদ যাকে ১৯৮২ সালের ১৪ নভেম্বর দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করে সামরিক আদালতে শান্তি দিয়েছিলেন, মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন। ইতোমধ্যে জনদল, বিএনপি (শাহ আজিজ) ইউপিপি (কাজী জাফর) মুসলিম লীগ (বি.এ সিদ্দিকী) এবং গণতান্ত্রিক পার্টিকে নিয়ে এরশাদ সমর্থক একটি জাতীয় ফ্রন্ট গড়ে তোলা হয়েছিল। ক্ষমতার হালুয়া-রুটি বিতরণ করে সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উল্লিখিত পাঁচ দলকে একীভূত করে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গড়ে তোলা হয় জেনারেল এরশাদের ‘জাতীয় পার্টি’।

রাজনৈতিক শক্তির নতুন মেরুকরণ, রাজনীতি ও অর্থনীতির সার্বিক দুর্বৃত্তায়ন সত্ত্বেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার নীতিতে অটল থাকে।

১৯৮৩ সাল থেকেই সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনকে অভিন্ন লক্ষ্যে এবং অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ধারার সংগঠিত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল ও বেগম ভালো লিভার নেতৃত্বে গঠিত সাতদলীয় জোট দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর একটি অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়ন করাতে সক্ষম হয়। ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর উভয় জোটের সর্বসম্মত ৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

ঐতিহাসিক ৫ দফা দাবি ছিল নিম্নরূপ-

১. অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে ।

২. অবিলম্বে দেশে মৌলিক অধিকারসহ গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং রাজনৈতিক তৎপরতার উপর থেকে সকল বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।

৩. দেশে অন্য যে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই আগামী শীত মৌসুমের মধ্যে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে এবং সার্বভৌম জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসাতে হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, সকল জাতীয় ইসুতে সিদ্ধান্ত মহলের ক্ষমতা সার্বভৌম জাতীয় সংসদের হাতে নাস্ত থাকবে, সংবিধান সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতা কেবলমাত্র জনগণের নির্বাচিত সার্বভৌম জাতীয় সংসদেরই থাকবে, অন্য কারো নয়।

৪. রাজনৈতিক কারণে আটক বিচারাধীন এবং সামরিক আইনে দণ্ডিত সকল রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৫. মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ছাত্র হত্যার তদন্ত, বিচার, দোষীদের শান্তি, নিহত ও আহতদের তালি প্রকাশ ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই জন্য দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার এখতিয়ার তদন্ত কমিটিতে দিতে হবে। শ্রমিক, কর্মচারী, কৃষক, ক্ষেতমজুরসহ সকলের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।

৫-দফা দাবিতে উভয় জোট ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চ থেকে অভিন্ন কর্মসূচি পালন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনর বেগবান করার উদ্যোগ নেয় ৮৩ থেকে ৮৬ সাল পর্যন্ত হরতাল, ধর্মঘট, সমাবেশ মহাসমাবেশ, পদযাত্র বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়। এ জন্য সরকারের কোপানলে পড়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ দলের নেতাদের একাধিকবার গ্রেফতার-নির্যাতন ভোগ করতে হয়। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি আহ উদ্দিনকে বিদায় দিয়ে এরশান নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জেনারেল এরশাদ ১৯৮৪ থেকে ৮৫ সাল, এ দুই বছরে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হন। এরশান ঘোষিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচন প্রতিহত করার ১৫ দল ও সাত দলের ঘোষণা ও কর্মসূচিতে রক্তগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলের ওপর ট্রাক চালিয়ে হত্যা করা হয় সেলিম-দেলোয়ার নামে দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে।

১ মার্চ আদমজীতে শ্রমিক নেতা তাজুলকে এবং ২৭ সেপ্টেম্বর হরতালের দিন কালীগঞ্জে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ময়েজ উদ্দিনকে সরকারি জনদলের গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়। ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভের পটভূমিতে ১৫ দল ও সাত দল ১৯৮৪ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকায় যুগ্ম জাতীয় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

৫ অক্টোবর ১৫ দল ও সাত দল সরকার ঘোষিত নির্বাচনী কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করে। ১৪ অক্টোবর মানিক মিয়া এভিনিউতে ১৫ দলের উদ্যোগে স্মরণকালের বৃহত্ত মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মহসমাবেশ থেকে ১৫ দল ২১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২১-দফায় সকল শ্রেণি-পেশার দাবিসহ সামরিক শাসন অবসান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি অন্তর্ভুক্ত হয়।

বিরোধী দলের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে একবার উপজেলা নির্বাচন তারিখ ও সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণ করেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন এরশাদ। পরে সামরিক আইনের কড়াকড়ি পুনর্বহাল, রাজনৈতিক তৎপরতা নিচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ ঘোষণা এবং রাজনৈতিক নেতাদের আটক করে রেখে ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ এরশান তার ১৮-দফা কর্মসূচির পক্ষে গণভোট অনুষ্ঠান করেন।

গণভোটে জনগণ অংশগ্রহণ না করলেও জিয়ার পথ অনুসরণ করে এরশাদ ৯৪.১৪ শতাংশ আস্থা ভোট লাভ করেছেন বলে দেখানো হয়। এর কিছুদিন পর ‘৮৫-এর ১৬ ও ২০ মে একতরফা উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৫ দল ও সাত দলের যুগপৎ আন্দোলন সামরিক স্বৈরাচারের ভিতকে যতই দুর্বল করে তোলে। এরপর ভাই এঁকো জানে এবং বিভিন্ন সুবিধাবাদী নেতাদের মন্ত্রিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তার দলে ভিড়াতে সক্ষম হন। ইতোমধ্যে কিছু ব্যক্তির নাম আমরা উল্লেখ করেছি। এরশাদ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে প্রলোভন দেখিয়ে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ১৫ দল থেকে এবং আতাউর রহমান খানকে সাতদলীয় জোট থেকে এরশাদের ফ্রন্টে যোগদান করাতে সক্ষম হন। আতাউর রহমান খান, মিজান চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ও কাজী জাফর আহমদের মতো চরম সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদগণ পর্যায়ক্রমে এরশাদের প্রধানমন্ত্রিত্বের স্থান গ্রহণ করেন।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

এই পটভূমিতে ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ১৫ দল ও সাত দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়। সিদ্ধান্ত হয় সামরিক শাসন অবসানের মূল লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্য সামনে রেখে দুই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। ১৫ দল ১৮০টি আসনে এবং সাত দল ১২০টি আসনে প্রার্থী নিয়ে জাতীয় পার্টিকে মোকাবিলা করবে বলে ঐকমত্য হয়। কিন্তু হঠাৎই রহস্যজনক কারণে সাত দল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। ১৫ দলের অন্তর্ভুক্ত ওয়াকার্স পার্টি, বাসদ, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, সাম্যবাদী দলও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করে। স্বভাবতই এরশাদ ও জাতীয় পার্টি এতে উৎসাহিত হয়। ১৫ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

সন্ত্রাস, ভোটকেন্দ্র দখল, টাকার ছড়াছড়ি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার মধ্যেও ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এত কিছু করেও ১৫ দলের বিজয় ঠেকাতে না পেরে ৭ তারিখ রাতে আকস্মিকভাবেই নির্বাচনের ফল ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টা গণমাধ্যমে ফল ঘোষণা বন্ধ রাখার পর মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে ফল উল্টে দিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় জাতীয় পার্টিকে। এই অকল্পনীয় মিডিয়া কার বিরুদ্ধে ১৪ মে দেশব্যাপী পূর্ণ হরতাল পালন করা হয় আওয়ামী লীগ ও ১৫ দলের বিজয় ছিনতাই হওয়া সত্ত্বেও শর্তসাপেক্ষে সংসদে যোগদান করে ১৫ দল। ১৫ দল ঘোষণা করে সামরিক আইন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ১৫ দলীয় সংসদ সদস্যগণ সংসদে বসবেন না’।

আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদ ও ১৫ দল মনে করে ৭ মে ৮৬-এর সংসদ নির্বাচনে সাত দল অংশগ্রহণ করলে নির্বাচনের ফলাফল তো বটেই, দেশে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বড় পরিবর্তন সাধিত হতে পারত। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসেবে নিজেকে বিজ্ঞাপিত করতে সক্ষম হলেও সাত দলের এই সিদ্ধান্তের ফলে স্বৈরাচারী এরশাদের দুঃশাসনই কেবল প্রলম্বিত হয়।

১০ জুলাই ১৯৮৬ সংসদ অধিবেশন বসলেও সামরিক আইন বহাল থাকে। সামরিক আইন বহাল রেখেই ‘৮৬- এর ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়। সামরিক শাসকরা বিরোধী দলগুলোর হরতাল, সমাবেশ এবং জনগণের অংশগ্রহণের তোয়াক্কা না করেই গায়ের জোরে ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান করে।

শুধু তাই নগ্ন প্রহসনমূলক এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এরশাদের মদতপুষ্ট ফ্রিডম পার্টির পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল ফারুককে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করা হয়। প্রকৃতপক্ষে গণধিকৃত এরশান সমস্ত নির্বাচন ব্যবস্থাটিকেই ধ্বংস করে দেয়। স্বভাবতই বাংলাদেশের মানুষ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ১ নভেম্বর সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী উত্থাপন করা হয় জাতীয় সংসদে।

১৫ দল সপ্তম সংশোধনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সংসদে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ১০ নভেম্বর মুসলিম লীগ, জাসদের উভয় গ্রুপ, বাকশাল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সহায়তায় জাতীয় পার্টি সপ্তম সংশোধনী পাস করে নেয়। সপ্তম সংশোধনীর দ্বারা ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে জারিকৃত সকল সামরিক ফরমান, আদেশ, অধ্যাদেশ এবং শাসকদের সকল কৃতকর্ম ‘বৈধতা’ অর্জন করে।

অতঃপর থেকে দেশ থেকে প্রত্যক্ষ সামরিক আইন তুলে নেওয়া হয়। তবে প্রকৃত ক্ষমতা আগের মতোই সেনাবাহিনীর হাতেই থেকে যায়। জেনারেল এরশাদকে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে বৈধতার ছাপ দিলেও বেসামরিক পোশাকে দেশ কার্যত স্বৈরতন্ত্রের ধারায়ই শাসিত হতে থাকে।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের পর একদিকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, সামরিক আইনের কড়াকড়ি ও গ্রেফতার নির্যাতনের ফলে যথাসময়ে কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সুযোগ পাওয়া যায় নি। উপরন্ত এই সময়ে প্রথমে মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ নামে স্বতন্ত্র দল গঠন করে। পরবর্তীকালে, দলে ফিলে এলেও মিজান চৌধুরীর প্ররোচনায় দল ত্যাগ করে দেওয়ান ফরিদ গাজী, মোজাফফর হোসেন পল্টু প্রমুখ।

আওয়ামী লীগ নামেই আরেকটি দল গঠন করেছিলেন। এই উভয় ‘দলই’ আবার ১৫ দলের শরিক ছিল। আ উল্লেখ করা হয়েছে দলে বড় ধরনের ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হয় আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে। তারা বাকশাল প করেন । আবদুর রাজ্জাক দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ স করা হয় । শেখ হাসিনা জেলায় জেলায় ঘুরে আওয়ামী লীগকে আবার শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করান।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

১৯ এর ১০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক আইন প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয় । ১৯৮৭ সালের ১, ২ ও ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের চন্দ্র জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও সাজেদা চৌধুরীকে সাধারণ সম্পা নতুন কার্যনির্বাহী সংসদ গঠিত হয়। যাদের নিয়ে নবনির্বাচিত কমিটি গঠিত হয়। তারা হলেন-

সভাপতি

১. শেখ হাসিনা

সভাপতিমণ্ডলী

২. কামাল হোসেন

৩. আবদুস সামাদ আজাদ

৪. আবদুল মান্নান

৫. পুলিন দে

৬. সালাউদ্দিন ইউসুফ

৭. সিরাজুল ইসলাম

৮. ম আলাউদ্দীন

৯. মতিউর রহমান

১০. জিল্লুর রহমান

১১. শেখ আবদুল আজিজ

১২. সুধাংশু শেখর হালদার

১৩. সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন

সাধারণ সম্পাদক

১৪. বেগম সাজেদা চৌধুরী – সাধারণ সম্পাদক

১৫. আমির হোসেন আমু – যুগ্ম সম্পাদক

১৬. আবদুল জলিল – যুগ্ম সম্পাদক

সম্পাদকমন্ডলী

১৭. ফজলুল হক বিএসসি – দফতর সম্পাদক

১৮. মোহাম্মদ নাসিম – প্রচার সম্পাদক

১৯. তোফায়েল আহমেদ – সাংগঠনিক সম্পাদক

২০. মফিজুল ইসলাম – সমাজকল্যাণ সম্পাদক

২১. অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম – আন্তর্জাতিক সম্পাদক

২২. বেগম মতিয়া চৌধুরী – কৃষি বিষয়ক সম্পাদক

২৩. মনুজান সুফিয়ান – শ্রম বিষয়ক সম্পাদক

২৪. শাজাহান খান – খাদ্য বিষয়ক সম্পাদক

২৫. ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম – আইন বিষয়ক সম্পাদক

২৬. আইভি রহমান – মহিলা বিষয়ক সম্পাদক

২৭. শফিকুল আজিজ মুকুল – তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক

২৮. মমতাজ হোসেন – সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক

২৯. ডা. মোস্তফা জালাল মহীউদ্দীন – সহ-প্রচার সম্পাদক সম্পাদক

৩০. খ. ম. জাহাঙ্গীর – সহ-দফতর সম্পাদক

তৃতীয় সংসদের আয়ুষ্কাল খুব বেশি দিন ছিল না। ১৫ দল সংসদের ভিতরে বাইরে সংগ্রামের কৌশল নেয়। পনের দলের নেতৃত্বে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন কেবল অব্যাহতই থাকে না তা আরও বেগবান হয়। ৭ মে ‘৮৬- এর সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৫ দল ও ৭ দলের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হলেও, তা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

 

১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর দুই বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে বৈঠক হয়। ১৫ দল, ৭ দল এবং ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ৫ দলীয় বাম জোট যুগপৎ আন্দোলনের ব্যাপারে ঐকমতো পৌঁছায়। ১০ নভেম্বর বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে ঢাকা অভিযানের কর্মসূচি নেওয়া হয়। সরকার কর্মসূচি ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১০ নভেম্বর ঢাকার সকল প্রবেশ পথ সরকার বন্ধ করে দিলেও হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় সমবেত হয়।

সেদিন পুলিশের গুলিবর্ষণে ঢাকার জিরো পয়েন্টের কাছে শরীরে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক’ লিখে বিক্ষোভরত যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে আসা সিপিবির কর্মী আমিনুল হুদা টিটু নিহত হয়। সরকার শেষ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ১১ নভেম্বর গৃহে অন্তরীণ করে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ব্যাপক ধরপাকড় করে। বিরোধী দলের আহ্বানে ১১ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত অর্ধদিবস এবং ২১ নভেম্বর থেকে একটানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল বাংলাদেশকে অচল করে দেয়।

২৭ নভেম্বর জেনারেল এরশাদ সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হয় । ২৮ নভেম্বর এরশাদ জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আলোচনার প্রস্তাব দেন। বিরোধী দলগুলো ২৯ নভেম্বর টানা ৭২ ঘন্টা হরতাল ঘোষণা করে তার জবাব দেয়। এই পটভূমিতে ‘৮৭-এর ৬ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এরশাদ জাতীয় সংসদ বিলুপ্তি ঘোষণা করে।

বিরোধী জোট ও দলগুলো হরতালসহ আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। ১৯৮৮-এর ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ১৫ দলের মিছিলে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৯ জন নিহত হয়।

জরুরি অবস্থা ও তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ২৩ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ছোট-বড় প্রায় সকল দল এই নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে আ স ম রবের জাসদ, খুনি রশিদ ফারুকের ফ্রিডম পার্টিসহ প্যাড সর্বস্ব কয়েকটি দলকে দাঁড় করানো হয়। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। সংসদে ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন একদার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী আ. স. ম. রব ।

নতুন বাবার স্ট্যাম্প সংসদ গঠনের পর ১৯৮৮ সালের ১২ এপ্রিল ৮৭-এর ২৭ নভেম্বর জারিকৃত জরুরি আইন প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৮৮ সালের ৭ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিল পাস করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১০ জুলাই পাস করা হয় নবম সংবিধান সংশোধনী।

১৯৮৮ সালে বন্যাজনিত কারণে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কিছুটা ভাটার টান থাকলেও ১৯৯০ সালের শুরুতে এরশাদের দুঃশাসনে জনমনে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ক্রমেই বিস্ফোরণুর হয়ে উঠতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট শেষ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে তার বাসভবনে ফ্রিডম পার্টির দুষ্কৃতিকারীরা হামলা চালায় পুলিশের পাল্টা গুলিবর্ষণের ফলে তারা পালিয়ে যায়। সমগ্র দেশে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

১৯৯০ সালের ৫ জুন শেষ হাসিনা অবিলম্বে এরশাদের পদত্যাগ দাবি করেন এবং নতুন করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল (৮ দল) আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়। ৭ দল ও পাঁচ ৰাম নলও নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে থাকে। ১৯৯০-এর ১০ অক্টোবর বিরোধী জোট ও দলগুলোর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিবর্ষণে ৫ জন নিহত হয়।

১০ নভেম্বর ২২টি ছাত্র সংগঠন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৫ দল (৮ দল) ৭ দল ৫ দলীয় জোট, ঐক্যবদ্ধভাবে আবার অভিন্ন যুগপৎ কর্মসূচি দিলে জনগণের মধ্যে বিপুল সাড়া পড়ে। লাগাতার হরতাল, অবরোধ প্রভৃতি কর্মসূচির ফলে দেশে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় ।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শ্রমিক, কর্মচারী, আইনজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীর শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাট্যকর্মী এবং নারী সমাজসহ পেশাজীবী জনগণ ক্রমবর্ধমান হারে বিপু সংখ্যার অংশগ্রহণ করতে থাকে। ফলে তিন জোট আরও সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়। ১৯৯০ সালের ১৯. তিন জোট এরশাদের পদত্যাগ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে ক্ষমত হস্তান্তরের একটি ফর্মুলা, যা তিন জোটের রূপরেখা’ হিসেবে পরিচিত ঘোষণা করে।

তিন জোটের যৌথ ঘোষণা রূপরেখার বলা হয়-

“স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের দুঃশাসনের কবল হতে মুক্তিকামী জনগণ এরশাদ সরকার অপসারণের দাবিতে এবং দেশে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা ও জীবন পদ্ধতি কায়েম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান গণআন্দোলনে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। এ সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে জেল-জুলুম নির্যাতন এমনকি মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করে মানুষ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে একটি প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার লক্ষে।

দেশবাসী বুকের রক্ত দিয়ে যে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হল হত্যা, তা প্রভৃতি অসাংবিধানিক পন্থার ক্ষমতা বদলের অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক পন্থায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল ও হস্তান্তর নিশ্চিত করা এজন্য আমাদের সংগ্রামের দাবির কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হল একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু অসাংবিধানিক ধারার অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এরশাদ সরকার প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ছলে-বলে-কৌশলে তার ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে কুক্ষিগত রাখার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে ভোট চুরি, ভোট জালিয়াতি, ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই এমনকি নির্লজ্জ ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু, অবশেষে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী ফল প্রকাশের অব্যাহত প্রক্রিয়া চলে আসছে। এমতাবস্থায় এই সরকারের অধীনে কোন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। স্বৈরাচারী ও অবৈধ এরশাদ সরকারের অধীনে কোন জাতীয় নির্বাচনে আমরা ১৫, ৭ ও ৫ দলীয় ঐক্যজোট অংশগ্রহণ করবো না, তা রাষ্ট্রপতি বা সংসদ যে কোন নির্বাচনই হোক না কেন এসব নির্বাচন শুধু বর্জনই নয় প্রতিহতও করবো।

একমাত্র একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আমরা ১৫, ৭ ও ৫ দলীয় ঐক্যজোট কেবলমাত্র সার্বভৌম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশবাসীর আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফল ঘটিয়ে আমরা চলমান আন্দোলনের মূল দাবি ও লক্ষ্যসমূহ সম্পর্কে ঐক্যবদ্ধভাবে নিম্নরূপ সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করছি-

১. হত্যা, ক্যু, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ধারায় প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারী এরশাদ ও তার সরকারের শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে-

(ক) সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রেখে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তথা সংবিধানের ৫১(ক) অনুচ্ছেদের ৩নং ধারা এবং ৫৫(ক) ১ ধারা এবং ৫১ অনুচ্ছেদের ৩নং ধারা অনুসারে এরশাদ ও তার সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলনরত তিন জোটের নিকট গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ করবেন। সরকার ও সংসদ বাতিল করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করে উক্ত উপরাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমতা হলে করবেন। বর্তমান

(খ) এ পদ্ধতিতে উরু ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতি হবে, যার মূল দায়িত্ব হবে তিন মাসের মধ্যে একটি সার্বভৌম জাতীয় সংসদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা।

২. (ক) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হবেন অর্থাৎ তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে
কোন রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা দলের সাথে সম্পৃক্ত হবেন না এবং তিনি রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি
বা সংসদে সদস্য পদের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন ম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না।

(খ) অন্তবর্তীকালীন এই সরকার শুধুমাত্র প্রশাসনের দৈনন্দিন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনাসহ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও দারিত্ব পুনর্বিন্যাস করবেন।

(গ) ভোটারগণ যাতে করে নিজ ইচ্ছা ও বিবেক অনুযায়ী প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ কর পারে সেই আস্থা পুনঃস্থাপন এবং তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

(ঘ) গণপ্রচার মাধ্যমকে পরিপূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাখার উদ্দেশ্যে রেডিও টেলিভিশনসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করতে হবে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দী সকল রাজনৈতিক দলকে প্রচার প্রচারণায় অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদের নিকট অন্তবর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে এবং এ সংসদের নিকট সরকার জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।

 

স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
স্বৈরশাসন : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

 

৩. (ক) জনগণের সার্বভৌমত্বে স্বীকৃতির ভিত্তিতে দেশে সাংবিধানিক শাসনের ধারা নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত রাখা হবে এবং অসাংবিধানিক যে কোন পন্থায় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করতে হবে। নির্বাচন ব্যতীত অসাংবিধানিক বা সংবিধান বহির্ভূত কোন পন্থায় কোন অজুহাতেই নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না।

(খ) জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।

(গ) মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সকল আইন বাতিল করা হবে।

৪. দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অসাংবিধানিক ও অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের সকল প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে।

৫. জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সকল আইন ও কালা-কানুন বাতিল করতে হবে।

৬. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Comment